পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না । হঠাৎ ফোন আসলো বেলা ১২ টার দিকে , ২.৩০ এর মধ্যে থাকতে হবে নয়া পল্টন মোরে । বাসা মিরপুরে হ্ওয়ায় গাবতলি থেকে যোগ দিলাম মিছিলের সাথে উদ্দেশ্য ২টা এক প্রোগ্রাম কাভার করা সেই সাথে.......
আমার লাইফের সর্বোচ্চ হাঁটা ৫মে গাবতলী থেকে নয়া পল্টন ( আর দ্বীতীয়টা গোলাম আজমের জানাজার দিন) মাঝ খানের অনেক টা পথ , পথে পথে জনতার অভ্যর্থনা , আপ্যায়ন যে যে ভাবে পারছে তার সামর্থ অনুযায়ী । টেকনিক্যাল মোর পার হতেই বুট বিক্রেতা তার সব বুট বিলিয়ে দিচ্ছে সবার জন্য জোর করছে খা্ওয়ার জন্য । আর বলছে “আমার সামান্য এই সম্বল দিয়ে আমি আপনাদের সাথে শরিক হতে চাই” আরো কিছু দূর যাওয়ার পর দেখি ছোট্ট জীর্ণ ঘরের পাশে এক মা তার ছো্ট্ট শিশু কে নিয়ে কিছু পরোটা রুটি ডাল ভাজি আর ডিম ভাজি নিয়ে বসে আছে । সবাই কে বলছে তার খাবার থেকে কিছু নিয়ে তাকে ধন্য করার জন্য , বড় ছেলেকে পাঠিয়েছে মিছিলে আর তিনি ছোট শিশুকে নিয়ে বসেছে ।
গাবতলী থেকে নয়া পল্টন এমন ঘটনা প্রতিটি মোড়ে মোড়ে । শুধু বাঙলাদেশ কেন এমন গণজোয়ার এ উপমহাদেশে দ্বীতিয়টি আর আছে বলে আমার জানা নেই ।
আমি যখন কাকরাইল মসজিদ হয়ে ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালের সামনে ততক্ষণে পুরো এলাকা রণক্ষেত্র ! আকাশে খুব কাছ থেকে উডে যাচ্ছে হেলিকাপ্টার । বার বার মনে পড়ছিল মিশরের তাহরির স্কয়ারের কথা । এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আগুণ ।
একের পর এক আহত , রক্তাক্ত, গুলিবিদ্ধ মানুষ নিয়ে আসছে সেন্ট্রাল হসপিটালে । এই মানুষ গুলোর অধিকাংশই যুবক , প্যান্ট-শার্ট পরা । বুঝতে আর বাকি থাকেনা সংগ্রামী মিছিলের সামনে ছিল এরাই ।রাজপথের আন্দোলনে হেফাজতের লোকজন যে কতটা অনভিঙ্গ প্রতিটি পদে পদে তার প্রমান পেলাম । ইসলামের কোন বিজয় যে সংখাধিক্যর কারনে হয়নি যারা ৫ মে সারা রাত ছিল খুব সহজেই ধরতে পারবে ।
বিজয় নগর মোর থেকে পল্টন মোর এই রাস্তাটাতেই হচ্ছিল ইতিহাসের ভয়াবহ তম রক্তাক্ত ঘটনা ।দীর্ঘ পথ হেটে কোন শক্তি ছিল না দুই পায়ে ওই মিছিলে যোগ দেয়ার । কোন ফাকে কিভাবে যে পায়ে আঘাত পেলাম কিছুই্ বুঝতে পারিনি হাজারো মানুষেরে হুড়োহুড়িতে ।
আমি গিয়ে আশ্রয় নিলাম বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে । রাস্তার মাঝখানে আইলান্ডে বসে হাতে থাকা খিচুড়িটা শেষ করলাম । মাগরিবের আজান পড়ে গেল । আশ্রয় নিলাম বিএনপির অফিসের পাশের মসজিদে । আস্তে আস্তে অন্ধকার হতে থাকলো চার পাশ । আর এই সময়টার জনই অধির অপেক্ষায় ছিল সরকারের (দলীয় এবং প্রশাশন) লোক জন ।
মাগরিবের পর পরই শুরু হল আসল তান্ডব ! চার পাশ থেকে শুধু অনর্গল গুলি , গ্রেনেড শব্দ টিয়ার গ্যাসের ঝাঝালো বাতাস ।
রাজনৈতিক বিভিন্ন বিটে কাজ করতে গিয়ে অনেক টিয়ার গ্যাস খেয়েছি কিন্তু ওই রাতের টা ছিল আলাদা (আমার কাছে মনে হয়েছে ) এত দিন ছবিতে দেখেছি কিভাবে বন্দুকের নল থেকে গুলি বের হলে আগেুনের মত দেখা যায় । চাক্ষুষ দেখলাম ওই রাতে ।নাইটেং্গেল মোর থেকে বিজয় শরণী আবার বিজয় শরনী থেকে নাইটেঙ্গেল মোর , অসংখ গলি রাস্তার দুই পাশে । প্রতিটি গলিতে অবস্থান নিয়েছে ১০/১২ জনের এক একটি যুবক দল । আর যুবকদের কিছু কেৌশলের কাছে হাজার হাজার গুলি গ্রেনেড টিয়ারগ্যাস নস্ট হচ্চিল প্রশাষণের । চারতলা মসজিদের প্রতিটি ফ্লর হেফজতের যুবকদের দিয়ে পূর্ণ । তারা খুব অবাক হয়ে দেখছিল প্যান্ট শার্ট পরা খোচা খোচা দাড়ি ১০/১২ জন যুবক রা কিভাবে গুলি গ্রেনেড কে থোরাই কেয়ার করে একটু পর পর “নারায়ে তাকবীর” স্লোগান দিয়ে বোকা বানাচ্ছিল প্রশাষণ কে ।
মসজিদ থেকে বের হয়ে প্রেস ক্লাবে যাওয়া দরকার কিন্তু কোন ভাবেই পারছিলাম না । এক কলিক কে ফোন দিলাম ওর বাইক নিয়ে আসার জন্য । ও আসতে চেয়েও বার বার গুলি গ্রনেড আর রাস্তার মাঝখানে হাজারো প্রতিবন্ধকতার ফিরে জাচ্ছিল । ওর বাইক টা রাজধানী সিনেমা হলের সামনে রেখে ও যখন আসলো তখন রাত ১২ টা ছুই ছুই । বিএনপির অফিনের সামনে রাস্তাটায় তখনো থেমে থেমে আসছিল গুলির আওয়াজ । আমরা গলি পথ দিয়ে বের হওয়ার সিদ্ধা্ন্ত নিলাম ।
অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না । পুরো এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে সন্ধ্যার আগেই । একটা চিকন গলি দিয়ে হাটা শুরু করলাম । অনেক দুর গেলাম । কোন লোক জন নেই । ভুতুরে চার পাশ । সিদ্ধান্ত নিতে পারছিনা সামনে যাব নাকি আবার পেছনে ফিরবো । ওই গলিটার দিক থেকেই ব্যাপক গুলি আর গ্রেনেডের আওয়াজ আসছিল । ভয়ে ভয়ে হাটছিলাম সামনের দিকে । কোন এলাকা কার দখলে বুঝা মুশকিল ছিল । আমরা আরো একটু সামনের দিকে যেতেই আগুণের লেলিহান শিখা ।
কিছু মানুষ ও দেখতে পেলাম । গুলি গ্রেনেডের আওয়াজ গুলো আস্তো আস্তে বাড়ছিল । সাহস করে এগুলাম কারন আমাদের যেতেই হবে । অল্প কিছু হুজুর আর অধিকাংশ প্যান্ট শার্ট পরা যুবক দেখতে পেলাম । বুঝতে বাকি রইল না কাদের দখলে আছে এই এলাকাটি । সব চেয়ে অবাক হলাম তাদের কিছু কৌশল দেখে । এতক্ষণ যে গুলি আর গ্রেনেডের আওয়াজ পাচ্ছিলাম সেটা এখান থেকেই এবং তারাই করছিল সেটা ।
সে এক অভিনব পদ্ধতি চার পাচ জন যুবক পালাকরে করছে সেই কাজটি । দুই জনের হাতে গজারীর লাঠি আর একজনের হাতে একটা হামান দিস্তা ! গাজারীর লাঠি দিয়ে সমানে নতুন বিল্ডিংয়ে স্টিলের বেড়ার উপড় পিটা্চ্ছে এটাই দুর থেকে আমরা গুলির আওয়াজ শুনছিলাম আর কিছু ক্ষণ পর পর হামান দিস্তা দিয়ে বাড়ি টাকে মনে হচ্ছিল গেনেডের আওয়াজ ! কিছুক্ষণ দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছিলাম । আমাদের কে তাদেরই এক জন ভেবে বলল “আপনাদের কে খুব ক্লান্ত লাগছে এখানে যান সাদা ভাত এবং গরুর মাংস আছে খেয়ে নিন ।ধন্যাবদ দিয়ে কেটে পরার রাস্তা খুজছিলাম । আমাদের গন্তব্য প্রেস ক্লাব ।
সামনের দিকে এগুলাম । অলি গলি হাটতে হাটতে একটা বড় রাস্তা পেলাম । তখন রাত একটা । অনেক ক্ষণ পর বুঝলাম এটা বিজয় সরনীর । সামনেই জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় অফিস । পুরো বিজয় সরনী এক অচেনা পথ তখন ।রাস্তার দু পাশের গাছ গলো কেটে সাফ করা । বাইকটা খুজে পেলাম । রাজধানী সিনেমা হলের সামনেই ছিল । প্রশাষণের কিছু লোকের সাথে দেখা হতেই বললো “আপনারা এখনো এখানে কি করেন , বাসায় যান আজকে আর থাকার দরকার নেই “ ।
সেখান থেকে প্রেস ক্লাবের সামনে গেলাম । মুক্তাঙ্গন এবং প্রেস ক্লাবের দু পাস থেকে মার্চ করে আসছিল মুল অপারেশন এর জন্য । পুলিশ র্যা ব বিজিবি । তারা শুধু হুকুমেরে অপেক্ষায় । অনেক্ষণ ছিলাম । আর আমার পায়ের ব্যাথাটা ক্রমশ বাড়ছিল । কোন ভাবেই হাটার মত ক্ষমতা ছিলনা । ও আমাকে হলে নিয়ে গেল সূর্যসেন হলে গিয়ে বিছানায় এলিয়ে দিতেই রাজ্যের ঘুম এসে হাজির হল ।
ঘুমালাম । এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখবো পরের দিন ভোরে সেই প্রত্যাশায়…………. ।
- ব্লগার শঙ্খচিল
0 comments: