ঝরা পালক - জীবনানন্দ

ঝরাপালক জীবনানন্দ দাশের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। ১৯২৭ সালে এটি প্রকাশিত হয়েছিল।

প্রকাশ : ১৩৩৪ [১৯২৭]

উৎসর্গ : ‘ – কল্যাণীয়াসু – ’
কবি রচিত ভূমিকা :
ঝরা পালকের কবিতাগুলি কবিতা, প্রবাসী, বঙ্গবাণী, কল্লোল, কালি-কলম, প্রগতি, বিজলী প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। বাকিগুলি নূতন।
কলিকাতা। ১০ই আশ্বিন ১৩৩৪ শ্রীজীবনানন্দ দাশ


কবিতাসমূহ

১. আমি কবি-সেই কবি ২. নীলিমা ৩. নব নবীনের লাগি ৪. কিশোরের প্রতি ৫. মরীচিকার পিছে ৬. জীবন-মরণ দুয়ারে আমার ৭. বেদিয়া ৮. নাবিক ৯. বনের চাতক- মনের চাতক ১০. সাগর-বলাকা ১১. চলছি উধাও ১২. একদিন খুঁজেছিনু যারে ১৩. আলেয়া ১৪. অস্তচাঁদে ১৫. ছায়া-প্রিয়া ১৬. ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল ১৭. কবি ১৮. সিন্ধু ১৯. দেশবন্ধু ২০. বিবেকানন্দ ২১. হিন্দু-মুসলমান ২২. নিখিল আমার ভাই ২৩. পতিতা ২৪. ডাহুকী ২৫. শ্মশান ২৬. মিশর ২৭. পিরামিড ২৮. মরুবালু ২৯. চাঁদিনীতে ৩০. দক্ষিণা ৩১. সে কামনা নিয়ে ৩২. স্মৃতি ৩৩. স্মৃতি ৩৪. সেদিন এ-ধরণীর ৩৫. ওগো দরদিয়া ৩৬. সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়

ঝরা পালক : কবিতা ০১-০৮

নাবিক


কবে তব হৃদয়ের নদী
বরি নিল অসম্বৃত সুনীল জলধি!
সাগর-শকুন্ত-সম উল্লাসের রবে
দূর সিন্ধু-ঝটিকার নভে
বাজিয়া উঠিল তব দুরন্ত যৌবন!
পৃথ্বীর বেলায় বসি কেঁদে মরে আমাদের শৃঙ্খলিত মন!
কারাগার-মর্মরের তলে
নিরাশ্রয় বন্দিদের খেদ-কোলাহলে
ভ’রে যায় বসুধার আহত আকাশ!
অবনত শিরে মোরা ফিরিতেছি ঘৃণ্য বিধিবিধানের দাস!
-সহস্রের অঙুলিতর্জন
নিত্য সহিতেছি মোরা-বারিধির বিপ্লব-গর্জন
বরিয়া লয়েছ তুমি, তারে তুমি বাসিয়াছ ভালো;
তোমার পক্ষরতলে টগ্‌বগ্ করে খুন-দুরন্ত, ঝাঁঝালো!-
তাই তুমি পদাঘাতে ভেঙে গেলে অচেতন বসুধার দ্বার,
অবগুণ্ঠিতার
হিমকৃষ্ণ অঙুলির কঙ্কাল-পরশ
পরিহরি গেলে তুমি-মৃত্তিকার মদ্যহীন রস
তুহিন নির্বিষ নিঃস্ব পানপাত্রখানা
চকিতে চূর্ণিয়া গেলে-সীমাহারা আকাশের নীল শামিয়ানা
বাড়ব-আরক্ত স্ফীত বারিধির তট,
তরঙ্গের তুঙ্গ গিরি, দুর্গম সঙ্কট
তোমারে ডাকিয়া নিল মায়াবীর রাঙা মুখ তুলি!
নিমেষে ফেলিয়া গেলে ধরণীর শূন্য ভিক্ষাঝুলি!
প্রিয়ার পাণ্ডুর আঁখি অশ্রু-কুহেলিকা-মাখা গেলে তুমি ভুলি!
ভুলে গেলে ভীরু হৃদয়ের ভিক্ষা, আতুরের লজ্জা অবসাদ,-
অগাধের সাধ
তোমারে সাজায়ে দেছে

ঝরা পালক : কবিতা ০৯-১৬

ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল



ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল,-
ডালিম ফুলের মতো ঠোঁট যার রাঙা, আপেলের মতো লাল যার গাল,
চুল যার শাঙনের মেঘ, আর আঁখি গোধূলির মতো গোলাপী রঙিন,
আমি দেখিয়াছি তারে ঘুমপথে, স্বপ্নে-কত দিন!
মোর জানালার পাশে তারে দেখিয়াছি রাতের দুপুরে-
তখন শুকনবধু যেতেছিল শ্মশানের পানে উড়ে উড়ে!
মেঘের বুরুজ ভেঙে অস্তচাঁদ দিয়েছিল উঁকি
সে কোন্‌ বালিকা ‌একা অন্তঃপুরে এল অধোমুখী!
পাথারের পারে মোর প্রাসাদের আঙিনার পরে
দাঁড়াল সে- বাসররাত্রির বধু-মোর তরে, যেন মোর তরে!
তখন নিভিয়া গেছে মণিদীপ-চাঁদ শুধু খেলে লুকোচুরি,-
ঘুমের শিয়রে শুধু ফুটিতেছে-ঝরিতেছে ফুলঝুরি, স্বপনের কুঁড়ি!
অলস আঢুল হাওয়া জানালায় থেকে থেকে ফুঁপায় উদাসী!
কাতর নয়ন কার হাহাকারে চাঁদিনীতে জাগে

ঝরা পালক : কবিতা ১৭-২৩


কবি



ভ্রমরীর মতো চুপে সৃজনের ছায়াধূপে ঘুরে মরে মন
আমি নিদালির আঁখি, নেশাখোর চোখের স্বপনে!
নিরালায় সুর সাথি, বাঁধি মোর মানসীর বেণী,
মানুষ দেখে নি মোরে কোনোদিন, আমারে চেনে নি!
কোনো ভিড় কোনোদিন দাঁড়ায় নি মোর চারি পাশে-
শুধায় নি কেহ কভু-আসে কি রে,- সে কি আসে-আসে।
আসে নি সে ভরাহাটে-খয়াঘাটে-পৃথিবীর পসরায় মাঝে
পাটনী দেখে নি তারে কোনোদিন-মাঝি তারে ডাকে নিকো সাঁঝে।
পরাপার করে নি সে মণিরত্ন-বেসাতির সিন্ধুর সীমানা,-
চেনা-চেনা মুখ সবই-সে যে সুদুর-অজানা!

ঝরা পালক : কবিতা ২৪-৩০

মিশর
‘মমী’র দেহ বালুর তিমির জাদুর ঘরে লীন-
‘স্ফীঙ্ক্‌স-দানবীর অরাল ঠোঁটের আলাপ আজি চুপ!
ঝাঁ ঝাঁ মরুর ‘লু’য়ের ফুঁয়ে হচ্চে বিলীন-ক্ষীণ
মিশর দেশের কাফন্‌ পাহাড়-পিরামিতের স্তুপ!
নিভে গেছে ঈশিশের রই বেদীর থেকে ধূমা,
জুড়িয়ে গেছে লক্‌লকে সেই রক্তজিভার চুমা!
এদ্দিনেতে ফুরিয়ে গেছে কুমিরপূজার ঘটা,
দুলছে মরুমশান শিরে মহাকালের জটা!
ঘুমন্তদের কানে কানে কয় সে-ঘুমা ঘুমা!
ঘুমিয়ে গেছে বালুর তলে ফ্যারাও, ফ্যারাওছেলে-
তাদের বুকে যাচ্চে আকাশ বর্শা ঠেলে ঠেলে!
হাওয়ার সেতার দেয় ফুঁপিয়ে মেম্ননেরই বুক,
ডুবে গেছে মিশররবি-বিরাট বেলের ভুখ
জিহ্বা দিয়ে জঠর দিয়ে গেছে তোমার জ্বেলে!
পিরাপিডের পাশাপাশি লালচে বালুর কাছে
স্থবির মরণ-ঘুমের ঘোরে মিশর শুয়ে আছে!
সোনার কাঠি নেই কি তাহার? জাগবে না কি আর!
মৃত্যু সে কি শেষের কথা? শেষ কি শবাধার?
সবাই কি গো ঢালাই হবে চিতার কালির ছাঁচে!
নীলার ঘোলা জলের দোলায় লাফায় কালো সাপ।
কুমিরগুলোর খুলির খিলান, করাত দাঁতের খাপ
উর্ধ্বমুখে রৌদ্র পোহায়; ঘুমপাড়ানির ঘুম
হানছে আঘাত-আকাশ বাতাস হচ্ছে যেন গুম্‌!
ঘুমের থেকে উপচে পড়ে মৃতের মনস্তাপ!
নীলা নীলা- ধুক্‌ধুকিয়ে মিশরকবর পারে
রইলে জেগে বোবা বুকের বিকল হাহাকারে
লাল আলেয়ার খেয়া ভাসায় রামেসেসের দেশ!
অতীত অভিশাপের নিশা এলিয়ে এলোকেশ
নিভিয়ে দেছে দেউটি তোমার দেউল-কিনারে!
কলসি কোলে নীলনদেতে যেতেছে ঐ নারী
ঐ পথেতে চলতে আছে নিগ্রো সারি সারি
ইয়াঙ্কী ঐ ঐ য়ুরোপী-চীনে-তাতার মুর
তোমার বুকের পাঁজর দ’লে টলতেছে হুড়মুড়্‌-
ফেনিয়ে তুলে খুন্‌খারাবি, খেলাপ, খবরদারি!
দিনের আলো ঝিমিয়ে গেল-আকাশে ঐ চাঁদ!
চপল হাওয়ায় কাঁকন নীলনদেরই বাঁধ!
মিশর ছুঁড়ি গাইছে মিঠা শুড়িখানার সুরে
বালুর খাতে, প্রিয়ের সাথে- খেজুরবনে দূরে!
আফ্রিকা এই, এই যে মিশর-জাদুর এ যে ফাঁদ!
ওয়েসিসের ঠান্ডা ছায়ায় চৈতি চাঁদের তলে
মিশরবালার বাঁশির গলা কিসের ক

ঝরা পালক : কবিতা ৩১-৩৫

 সে কামনা নিয়ে


যে কামনা নিয়ে মধুমাছি ফেরে বুকে মোর সেই তৃষা!
খুঁজে মরি রূপ, ছায়াধূপ জুড়ি,
রঙের মাঝারে হেরি রঙডুবি!
পরাগের ঠোঁটে পরিমলগুঁড়ি-
হারায়ে ফেলি গো দিশা!
আমি প্রজাপতি-মিঠা মাঠে মাঠে সোঁদালে সর্ষেক্ষেতে;
বোদের সফরে খুঁজি নাকো ঘর,
বাঁধি নাকো বাসা-কাঁপি থরথর
অতসী ছুঁড়ির ঠোটের উপর
শুঁড়ির গেলাসে মেতে!
আমি দক্ষিণা-দুলালীর বীণা,পউষপরশহারা!
ফুল-আঙিয়ার আমি ঘুমভাঙা
পিয়াল চুমিয়া পিলাই গো রাঙা
পিয়ালার মধু তুলি রাতজাগা
হোরীর হারারা সাড়া!
আমি গো লালিমা-গোধূলির সীমা, বাতাসের লাল, ফুল।
দুই নিমেষের তরে আমি জ্বালি
নীল আকাশের গোলাপী দেয়ালী!
আমি খুশরোজী, আমি গো খেয়ালী,
চঞ্চল, চুলবুল।
বুকে জ্বলে মোর বাসর দেউটি-মধুপরিণয়রাতি!
তুলিছে ধরণী বিধবা-নয়ন
মনের মাঝারে মদনমোহন
মিলননদীর নিধুর কানন
রেখেছে রে মোর পাতি!




স্মৃতি

থমথমে রাত, আমার পা

সবিস্তার সূচীপত্র
টেম্পলেট কাষ্টমাইজেশন - তরঙ্গ ইসলাম | তরঙ্গ ইসলাম