উইকিলিকস ► পিলখানা হত্যাকান্ড - ফারুককে দায়িত্ব দেওয়ায় নিষ্ক্রিয় হন সাহারা

২০০৯ সালের ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় সংঘটিত ভয়াবহ বিডিআর বিদ্রোহের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানকে বিদ্রোহ-সংক্রান্ত তদন্ত সমন্বয়ের দায়িত্ব দেন। এর পরই এ ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান সাহারা খাতুন। বিষয়টি উঠে এসেছে উইকিলিকসের ফাঁস হওয়া তারবার্তায়।
বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানকে দায়িত্ব দেওয়া প্রসঙ্গে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি ওয়াশিংটনে প্রেরিত তারবার্তায় মন্তব্য করেন, খুব সম্ভবত বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে অনেক সেনা কর্মকর্তা যে আপত্তি তুলেছিলেন তারই ফলে ফারুক খানকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফারুক খান একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। সেনানিবাসগুলোতে সে কারণেই তাঁর গ্রহণযোগ্যতা আছে। মরিয়ার্টি আরও মন্তব্য করেন, ফারুক খানের আরেকটি পরিচয় তিনি প্রধানমন্ত্রীর এলাকা গোপালগঞ্জের একটি আসন থেকে নির্বাচিত সাংসদ ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের একজন।
বিদ্রোহের সময় ‘ব্যক্তিগত সফরে’ যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ ওরফে সোহেল তাজ। সরকারের ও দেশের জন্য এমন বিপর্যয়কর একটি পরিস্থিতিতেও সেই ব্যক্তিগত সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে না আসায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন সোহেল তাজ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ ব্যাপারে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ ছিলেন। উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া তারবার্তায় তা জানা গেছে।
দেশে ফেরার পর সে সময়ের মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টিকে দেরিতে দেশে ফেরার ব্যাপারে সোহেল তাজ বলেন, একটি পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তিনি সফর সংক্ষিপ্ত করতে পারেননি। তাঁর এক আত্মীয়ের হার্টের অপারেশন ছিল। তা ছাড়া নিজের চিকিৎসার কারণেও তাজ দেশে ফিরতে পারেননি বলে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে জানান। সেই বৈঠকে সোহেল তাজকে কিছুটা অসুস্থ দেখাচ্ছিল বলেও ওয়াশিংটনে পাঠানো তারবার্তায় মরিয়ার্টি জানান।
মরিয়ার্টি তাঁর তারবার্তায় সেই বৈঠকে উপস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের প্রসঙ্গও এনেছেন। তিনি ওয়াশিংটনকে জানান, বৈঠকের সময় সোহেল তাজ ও সাহারা খাতুন দুজনই উপস্থিত ছিলেন। বেশির ভাগ কথাই বলছিলেন সোহেল তাজ। তবে মরিয়ার্টি লক্ষ করেন, তাজের প্রায় সব কথাতেই যেন ইচ্ছাকৃতভাবে বিরোধিতা করছিলেন সাহারা।
বিডিআর বিদ্রোহের সময় পিলখানায় ঢুকেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন। রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি এক বৈঠকে তাঁর কাছে সে সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। সেই ব্যাপারটিও উঠে এসেছে উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া গোপন তারবার্তায়। সাহারা খাতুন বলেন, তিনি পিলখানায় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত প্রায় সাত-আট শ বিদ্রোহকারীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। বারবার নির্দেশ দেওয়ার পর প্রায় শ খানেক বিদ্রোহী বিডিআর জওয়ান তাঁর কাছে এসে অস্ত্র সমর্পণ করেছিলেন। সাহারা খাতুন মরিয়ার্টিকে বর্ণনা দেন কীভাবে তিনি পিলখানার ভেতর থেকে সেনা কর্মকর্তাদের আটকে পড়া অসহায় পরিবারগুলোকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। সাহারা খাতুন বলেন, তিনি একজন বন্দী সেনা কর্মকর্তাকে বিদ্রোহীদের হাত থেকে উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসেন। বিদ্রোহীরা সেই সেনা কর্মকর্তাকে তাঁর হাতে তুলে দিতে চাচ্ছিল না। তাঁরা বলেছিলেন, এই সেনা কর্মকর্তা তাঁদের ওপর অতীতে অনেক অত্যাচার চালিয়েছেন। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিদ্রোহীদের ধমক দিয়ে বলেন, ‘আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। উনি যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন তার বিচার আমি করব, তোমরা নয়, তাঁকে ছেড়ে দাও।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তিনি পিলখানার ভেতর থেকে যে পরিবারগুলোকে উদ্ধার করেছিলেন তাদের মধ্যে পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদের মেয়েও ছিলেন।Source

উইকিলিকস ► মইনের কাছে র‌্যাব সদস্যদের তালিকা চান মার্কিন মন্ত্রী

আড়াই লাখ মার্কিন তারবার্তা ফাঁস করেছে উইকিলিকস। মার্কিন কূটনীতিকদের ভাষ্যে এসব তারবার্তায় বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার অন্দরমহলের খবর

দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন উপসহকারী মন্ত্রী ডন ক্যাম্প ২০০৮ সালে ঢাকা সফরকালে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের কাছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী সদস্যদের নামের তালিকা চান। জবাবে জেনারেল মইন বলেন, সন্ত্রাস ও দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে ‘সন্তোষজনক’ পারদর্শিতা দেখিয়েছে র‌্যাব। পূর্ববর্তী বছর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হ্রাস পাওয়া, ক্রসফায়ারে মৃত্যু বন্ধ হওয়া ও সন্ত্রাসবাদী ছয় নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়গুলোর ওপর জোর দেন মইন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ব্যাপারে মইন বলেন, অতীতের বিভিন্ন ঘটনার ব্যাপারে তিনি মন্তব্য করতে পারবেন না। এ ছাড়া র‌্যাবের অন্যায় কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তদন্ত করার এখতিয়ার সেনাবাহিনীর নেই।
মার্কিন কূটনৈতিক তারবার্তা থেকে এ তথ্য জানা গেছে। সাড়া জাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকস সম্প্রতি এ তারবার্তা প্রকাশ করেছে।

তারবার্তায় বলা হয়, ২০০৮ সালের ৩ ও ৪ ফেব্রুয়ারি দুই দিনের সফরে ঢাকা যান ডন ক্যাম্প। সফরকালে তিনি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান টেকসই সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল দায়িত্ব হিসেবে পুনরায় উল্লেখ করেন। ঢাকা সফরের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদসহ অন্যান্য উপদেষ্টা, সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ডন ক্যাম্প। এক মধ্যাহ্নভোজে তিনি বাণিজ্য, দ্বিপক্ষীয় সহায়তা, মানবাধিকার প্রভৃতি বিষয় নিয়ে পররাষ্ট্রসচিব তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে আলোচনা করেন। এ সময় স্বরাষ্ট্র ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিবেরা উপস্থিত ছিলেন। মধ্যাহ্নভোজ চলাকালে স্বরাষ্ট্রসচিব আবদুল করিম একটি ফোন ধরেন। ওই ফোনে তাঁকে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উদ্যোগে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়েছেন বাংলাদেশের অধিকারকর্মী ও এনজিও কর্মকর্তা মেহেদী হাসান।

২০০৮ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ওপর জোর দেন ক্যাম্প। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গৃহীত সংস্কার উদ্যোগের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বিগত বছরগুলোতে মানবাধিকার সমস্যার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পররাষ্ট্রসচিবকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার-বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরির সময় এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পুলিশ ও র‌্যাবের হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি স্বাগত জানান ক্যাম্প এবং অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার-সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন। এ ছাড়া তিনি শেখ হাসিনার বিচার-প্রক্রিয়ায় পর্যবেক্ষক পাঠানোর কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন। এরপর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে এক বৈঠকেও তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনে র‌্যাবের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

মার্কিন মন্ত্রী ক্যাম্প সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে গিয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স গীতা পাসি। এ সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিভিন্ন সাফল্যের কথা স্বীকার করেন ক্যাম্প। মইন উ আহমেদ মার্কিন মন্ত্রীকে বলেন, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তবে মইন উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক দলগুলোতে সংস্কারের ঘাটতির ফলে এ কাজে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, দেশের সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, তাঁদের শক্তিশালী ভাবমূর্তি রয়েছে এবং তাঁদের ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলো আসলে তেমন কিছু করতে পারবে না। তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরি হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে এ ধরনের সচেতনতা তৈরি হয়নি। তাই সংস্কার সম্ভব হচ্ছে না। সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ায় সংস্কার হচ্ছে না বলে রাজনৈতিক দলগুলো যে অভিযোগ করেছে, মইন সেটিকে ‘খোঁড়া যুক্তি’ বলে মন্তব্য করেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে ক্যাম্প বলেন, বাংলাদেশে যদি সময়মতো নির্বাচন না হয়, তাহলে সবাই হতাশ হবে।Source

উইকিলিকস ► ক্ষমতা ছাড়ার আগে র‌্যাব ভেঙে দিতে চান তাঁরা

আড়াই লাখ মার্কিন তারবার্তা ফাঁস করেছে উইকিলিকস। মার্কিন কূটনীতিকদের ভাষ্যে এসব তারবার্তায় বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার অন্দরমহলের খবর

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ভেঙে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল সরকারি দলের কয়েকজন নেতার। চারদলীয় জোট সরকারের একজন মন্ত্রী মার্কিন দূতাবাসকে এ কথা জানান বলে উইকিলিকসের ফাঁস করা গোপন তারবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।
র‌্যাব প্রতিষ্ঠার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এ বাহিনীর মূল্যায়ন করতে গিয়ে মার্কিন দূতাবাসের তারবার্তায় বিভিন্ন তথ্য ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
২০০৫ সালের মার্চ মাসের ওই তারবার্তায় বলা হয়, সম্প্রতি একজন মন্ত্রী মার্কিন দূতাবাসকে জানান, তাঁর দলের কয়েকজন নেতা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে র‌্যাব ভেঙে দিতে চান। কারণ, তাঁদের ভয়, দুর্নীতি ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ওপর তখন চড়াও হবে র‌্যাব। বার্তায় মন্তব্য করা হয়, র‌্যাব ভেঙে দেওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ এবং ওই মন্ত্রীও তা স্বীকার করেছেন।
তারবার্তায় উল্লেখ করা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ২০০৪ সালের জুন মাস থেকে কার্যক্রম শুরু করে র‌্যাব। এতে র‌্যাবে নিযুক্ত সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ একজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘সহিংস অপরাধ ও পুলিশের দুর্নীতি থেকে দরিদ্র জনগণকে রক্ষা’ করাই র‌্যাবের লক্ষ্য। প্রথমদিকে লক্ষণীয় সাফল্যের জন্য জনগণ ও গণমাধ্যমের বেশ সমর্থন পায় আধাসামরিক এই বাহিনী। তবে বহু ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা ও দুর্নীতির অভিযোগের কারণে এই বাহিনী বিতর্কিত হয়ে ওঠে।
মার্কিন তারবার্তায় বলা হয়, কয়েক মাস ধরে মূলত ইংরেজি দৈনিকগুলো র‌্যাবের কথিত দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর র‌্যাবের সদস্যদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘কারও বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ প্রতিমন্ত্রীর এ ঘোষণার পর বিভিন্ন অপরাধের জন্য র‌্যাবের অন্তত ১০৯ জন সদস্যকে শাস্তি দেওয়া হয়। তাঁদের অনেকে চাকরিচ্যুত হন। কাউকে কাউকে কারাগারে যেতে হয়। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ক্রসফায়ারে হত্যার জন্য কারও শাস্তি হয়নি। তারবার্তায় উল্লেখ করা হয়, সরকার প্রায় খোলাখুলিভাবে র‌্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে বলে তাদের মধ্যে বিচারের আওতাবহির্ভূত থাকার বোধ প্রসারিত হয়েছে। কাজেই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে এ পর্যন্ত বেশ কিছু বড় ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে।
তারবার্তায় আরও বলা হয়, র‌্যাবের ক্রসফায়ারে কুখ্যাত অপরাধীরা নিহত হওয়ায় তা জনপ্রিয় হয়েছে—এ যুক্তিতে এর পক্ষে কথা বলে সরকার। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের অনেকেই মার্কিন দূতাবাসকে বলেন, র‌্যাবের সদস্যরা আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালান। যারা নিহত হচ্ছে, তারা অপরাধী। তাদের পরিণতি এটাই হওয়া উচিত।
এই পরিবেশে বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো র‌্যাবের সমালোচনায় অনাগ্রহী বলে মার্কিন তারবার্তায় উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, এ ক্ষেত্রে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র ব্যতিক্রম। ২০০৫ সালের জুন মাসে সংগঠনটি র‌্যাবকে নিয়ে একটি বই প্রকাশ করে। এতে র‌্যাব ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাস’ করছে বলে উল্লেখ করা হয়।
মার্কিন তারবার্তায় বলা হয়, বিএনপি সরকার দৃশ্যত র‌্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড মোটের ওপর ইচ্ছামতো কমাতে বা বাড়াতে পারে। এ বক্তব্যের পক্ষে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দেওয়ার পর ২০০৫ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে ক্রসফায়ারের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে আসে। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরের সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে ও তা চলাকালে ক্রসফায়ারের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে কম ছিল। Source

উইকিলিকস ► রাবি শিবিরের সঙ্গে মার্কিন দূতাবাসের গোপন বৈঠক

২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাঝামাঝি মার্কিন দূতাবাসের একটি দল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ে ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে। এসংক্রান্ত একটি একইবছর ৫ মার্চ ঢাকা থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো হয়।

তারবার্তায় বলা হয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাবশালী ইসলামী ছাত্র সংগঠন শিবিরের ব্যাপক কার্যক্রম রয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিক ও ধর্ম নিরপেক্ষ মূল্যবোধে বিশ্বাসী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ক্যাম্পাসে শিবিরের ভয়ে কথাও বলতে চায় না। তাদের মতে, শিবির নেতাকর্মীরা ছাত্রত্ব শেষে বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতাসহ নানা পেশায় ঢোকেন। ক্যাম্পাসে তারা ক্ষমতার দাপটই দেখায় না, জামায়াতের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রেখে চলে।

ঢাকার মার্কিন দূতাবাস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ওই বৈঠক সম্পর্কে তারবার্তায় বলা হয়, শিবিরের মূল লক্ষ্য গণতান্ত্রিক ও অহিংস উপায়ে জাতীয় জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা। তবে তাদের দাবির ব্যাপারে অন্যদের সন্দেহ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের উচিৎ শিবির নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। কারণ বেশ কয়েক বছর ধরে তারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাব ধরে রেখেছে।

শিবিরকে ধর্ম নিরপেক্ষ দলগুলোর নেতাকর্মীর একদমই পছন্দ করে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরকে কখনোই সংগঠিত হতে দেয়নি এসব দল। যদিও শিবির দেশের অনেক ক্যাম্পাসে সক্রিয় রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়টি শিবিরের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির সভাপতি দেলোয়ার হোসেনের কথা হয় দূতাবাসের। এসময় দেলোয়ার হলুদ স্ট্রিপের শার্ট ও বাদামি রঙের জ্যাকেট পরেছিল। শৌখিন কালো চুল বেশ কেতা করে ছাঁটা। তার ভাষায়, শিবির জাতীয় জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে চায়। তিনি জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘তারা সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালাচ্ছে।’ এর কিছুদিন আগে জেএমবি রাজশাহীতে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালায়।

ক্যাম্পাসে শিবিরের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান দেলোয়ারের বক্তব্যের সঙ্গে যোগ করে বলেন, আমরা জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদা ও তালেবানের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমেরও বিরোধিতা করি। শিবির নেতারা জানান, গত আগস্টের সরকারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তারা শিবির সদস্যদের তা থেকে বিরত থাকতে আদেশ দেওয়া হয়। নেতারা মার্কিন দূতাবাসের কাছে এও দাবি করে, তারা জামায়াত থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র সংগঠন। তাদের এ দাবি একেবারেই বিশ্বস্ত না। কারণ এক বৈঠকে দূতাবাসকে জামায়াতের নেতারা জানায়, তাদের সঙ্গে শিবিরের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

রাজশাহীর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতার মতে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির সংযত ও অহিংস কার্যক্রম চালায় বলে পরিচিত না। তবে রাজশাহীর স্থানীয় একজন সাংবাদিক দূতাবাসকে বলেন, শিবির কর্মীরা প্রায়ই সহিংস তৎপরতা চালায়। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ হাজার ছাত্রের শিবিরের সদস্য রয়েছে ৭০০ জন। জামায়াতের দাবি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নিং বডিতে তাদের আধিপত্য রয়েছে।

তারবার্তায় দূতাবাসের শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স গীতা পাসি লেখেন, শিবির নেতারা অত্যন্ত সংগঠিত এবং ইসলামের বিস্তারে তারা মনোযোগী। তাদের প্রধান কাজ সহপাঠীদের কোরান এবং নবী হযরত মোহাম্মদের (সা.) কথা ও কর্মের (হাদিস) শিক্ষা দেওয়া।

তারবার্তায় গীতা পাসি মন্তব্য করেন, শিবির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এটা স্পষ্ট হওয়া সম্ভব হয়নি যে, তারা কী ধরনের পরিবর্তন চায়। কী ধরনের ইসলামি সমাজ চায় জিজ্ঞাসা করা হলে দেলোয়ার হোসেন ও তার সহকর্মীরা অস্পষ্ট কথাবার্তা শুরু করে। তবে তারা যা বিশ্বাস করে তাতে মার্কিন নাগরিকদের ভালো লাগবে না।
সূত্র: বি.নিউজ

উইকিলিকস ► ‘উইকিলিকস’-এর দলিলপত্রে বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামী





গোপন রাষ্ট্রীয় তথ্য ও দলিলপত্র ফাঁস করার মধ্য দিয়ে দুনিয়া কাঁপানো ‘উইকিলিকস’ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট অনেক তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করতে শুরু করেছে। যেমন ‘উইকিলিকস’-এর সর্বশেষ ফাঁস করা এক তথ্যে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহি চৌধুরী মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির কাছে অঙ্গীকার করেছিলেন, মার্কিন কোম্পানিকে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হবে। সে অঙ্গীকার অনুযায়ীই সম্প্রতি জাতীয় স্বার্থকে তিগ্রস্ত করে কনোকো ফিলিপ্স-এর সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। এর পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এদেশের কোনো এক বিশেষজনের পুত্রও জড়িত রয়েছেন বলে জানা গেছে।

ফাঁস করার প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি আলোড়ন উঠেছে পিলখানা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত কিছু তথ্যের পরিপ্রেেিত। এসব তথ্য প্রথমে প্রকাশিত হয়েছে ভারতের পত্রপত্রিকায়। ‘উইকিলিকস’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে গত ২৭ মার্চ ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’ এবং ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’য় প্রকাশিত তথ্যগুলোকে এভাবে সাজানো যায় :

১. পিলখানায় কথিত বিডিআর বিদ্রোহের পর ‘সাহায্য চেয়ে’ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জিকে টেলিফোন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২. তিনি ঠিক কোন ধরনের ‘সাহায্য’ চেয়েছিলেন তার উল্লেখ না করলেও খবরে বলা হয়েছে, প্রণব মুখার্জি ‘ইতিবাচক সাড়া’ দিয়ে বলেছিলেন, ‘প্রয়োজন অনুযায়ী’ সাহায়তা করা হবে।

৩. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেলিফোন পাওয়ার পরই প্রণব মুখার্জি বিষয়টি নিয়ে লন্ডন, বেইজিং এবং টোকিওর সঙ্গে কথা বলেছিলেন।

৪. ২০০৯ সালের ফেব্র“য়ারি মাসের শেষ শনিবার (২৬ ফেব্র“য়ারি) অর্থাৎ হত্যাকাণ্ডের পরদিনই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শিবশংকর মেনন নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স স্টিভেন হোয়াইটকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। মার্কিন দূত ল করেছিলেন, শেখ হাসিনার নতুন সরকারের ওপর বিদ্রোহের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল ভারত সরকার।

৫. পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে আলোচনার বিস্তারিত বিবরণসহ ২০০৯ সালের ২ মার্চ ওয়াশিংটনে পাঠানো ১৯৪৬৬১ নম্বর গোপনীয় তারবার্তায় মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জানিয়েছিলেন, ভারতের ভয় ছিল, বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকার’ করতে পারে। কারণ, ২০০৮ সালের ডিসম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল এবং আওয়ামী লীগ সরকারের নেয়া কার্যক্রমে জামায়াত ‘নাখোশ’ ছিল। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেছিলেন, এই বিদ্রোহের পেছনে ছিল দীর্ঘ পরিকল্পনা, যদিও ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত সময় ‘দীর্ঘ’ হতে পারে না।

৬. ভারতের দ্বিতীয় ভয় ছিল, বিদ্রোহের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারের সম্পর্কে অবনতি ঘটতে পারে। পররাষ্ট্র সচিব অবশ্য একটি কারণে আশাবাদী ছিলেন। কারণটি ছিল, পরিস্থিতি ‘স্থিতিশীল করতে’ সেনাপ্রধান (জেনারেল মইন উ আহমেদ) সরকারের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠভাবে’ কাজ করছিলেন।

৭. ২০০৯ সালের ১৩ ও ১৪ এপ্রিল ঢাকা সফরের পর পররাষ্ট্র সচিব শিবশংকর মেনন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার বার্গিলের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। ১৬ এপ্রিলের ২০২৬১৫ নম্বর তারবার্তায় মার্কিন দূতাবাস জানায়, ভারতের ভয়ের কারণ জানাতে গিয়ে মেনন বলেছেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি এমন যে, জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো সরকারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং ভারতে আক্রমণ চালানোর মতো ‘ফ্রি হ্যান্ড’ বা অবাধ সুযোগ নিতে পারে। অর্থাৎ এরা ভারতের ভেতরে ঢুকে আক্রমণ চালাতে পারে।

৮. জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর পরিচিতি দিতে গিয়ে শিবশংকর মেনন জামায়াতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক দল এবং হরকাতুল জেহাদ আল ইসলামী বা হুজি’র মতো মৌলবাদী গ্র“পের কথা জানিয়েছিলেন।

‘দ্য হিন্দু’ এবং ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’য় প্রকাশিত খবরে এসবের বাইরে আর কিছু জানানো হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে পড়লে মনে হতে পারে যেন বিদ্রোহের আড়ালে সেনা অফিসারদের হত্যাকাণ্ডে ভারতের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না, ভারতীয়রাও ছিল অন্ধকারে। অন্যদিকে ঘটনাপ্রবাহে কিন্তু অন্য রকম তথ্যই প্রাধান্যে এসেছিল। এখানে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের কথা উল্লেখ করা দরকার। বাংলাদেশের কোনো মানুষ জানার, এমনকি কল্পনা করারও অনেক আগে, বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর পর বেলা ১২টার দিকেই ভারতীয় টিভি চ্যানেল সিএএন-আইবিএন ও এনডিটিভি প্রচার করেছিল, বিডিআরের ডিজি ও তার স্ত্রী নিহত হয়েছেন। এটা এমন কারো পইে শুধু জানা সম্ভব, যারা মূল পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকে। খবরের ‘সূত্র’ও ছিল যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ। ভারতীয়দের প্রত্যেকেই খবর পেয়েছিল ভারতীয় গোয়েন্দা ‘সূত্রে’। সেকথা তারা উল্লেখও করেছিল। এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, ঘটনাপ্রবাহে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গভীরভাবেই জড়িত ছিল।

দ্বিতীয়ত, উইকিলিকস ভারতের ‘সাহায্য’ চেয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুরোধ জানানোর কথা প্রকাশ করেছে সত্য কিন্তু জানায়নি, ‘সাহায্য’ করার জন্য ভারত ঠিক কোন ধরনের পদপে নিয়েছিল। প্রকাশিত তথ্যগুলো পড়লে মনে হতে পারে যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করার এবং মুখে মুখে ‘ইতিবাচক সাড়া’ দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন প্রণব মুখার্জি। অন্যদিকে সত্য হলো, ঢাকা থেকে সাহায্যের জন্য ‘সুনির্দিষ্ট অনুরোধ’ যাওয়ার পর রাতারাতি ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্যারাস্যুট রেজিমেন্টকে আগ্রা থেকে পশ্চিম বঙ্গের কালাইকুন্ডে নিয়ে আসা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে এই রেজিমেন্টের সেনাদেরই বিমানযোগে বাংলাদেশে নামানো হয়েছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশ ছিল তাদের ‘নখদর্পণে’। ওদিকে পশ্চিম বঙ্গের পাশাপাশি আসামেও ‘প্রস্তুত’ ছিল ভারতীয় বিমান বাহিনীর বোমারু বিমান। এসব খবর সে সময় ভারতের সংবাদ মাধ্যমই জানিয়েছিল। অর্থাৎ শেখ হাসিনার সরকারকে ‘সাহায্য’ করার জন্য ভারত রীতিমতো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিল।

হঠাৎ উইকিলিকস’-এর ফাঁস করা তথ্যগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়ার কারণ তৈরি করেছেন ভারতের ‘বিশিষ্ট পন্ডিত’ ভাস্কর রায়। পিলখানায় দেশপ্রেমিক সেনা অফিসারদের হত্যাকাণ্ডের ঠিক পরপর প্রথমবারের মতো দৃশ্যপটে এসেছিলেন এই পন্ডিত। সেটা এমন এক সময় ছিল, যখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের মিডিয়া ভয়ংকর রকমের তথ্যযুদ্ধ শুরু করেছিল। ভারতীয়রা তখন কেবল নিত্য নতুন তথ্যই ‘আবিষ্কার’ করেনি, একই সাথে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও হাজির করেছে। ভারতীয় টিভি চ্যানেল ও দৈনিকগুলোর সঙ্গে থিংক ট্যাংকের মুখপত্র নামধারী কিছু সাময়িকীও সে তথ্যযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। এরকম একটি সাময়িকীর মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো হাজির হয়েছিলেন ভাস্কর রায়। তার সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে বলা হয়েছিল, তিনি শুধু পন্ডিত নন, ‘অভিজ্ঞ’ বিশ্লেষকওÑ বাংলাদেশের ব্যাপারে যার ‘প্রচুর পড়াশোনা’ রয়েছে এবং যিনি বাংলাদেশের ব্যাপারে ‘নিয়মিত’ খোঁজ-খবর রাখেন!

‘খোঁজ-খবর’ রাখার নমুনা পাওয়া গিয়েছিল ‘সাউথ এশিয়ান অ্যানালিসিসে’ প্রকাশিত এক নিবন্ধে। নিজের এক ‘মহাআবিষ্কারের’ আলোকে বিশ্লেষণ দিতে গিয়ে ভাস্কর রায় বলেছিলেন, বিডিআরের কথিত বিদ্রোহ সফল হলে নাকি ‘ডানপন্থী’ বিএনপি ও ‘ইসলামপন্থী’ জামায়াতে ইসলামীর জোট মতায় ফিরে আসতো। বিডিআর বিদ্রোহের ‘ষড়যন্ত্র’ নাকি সে উদ্দেশ্যেই ‘অত্যন্ত যতœ ও সতর্কতার সঙ্গে’ তৈরি করা হয়েছিল এবং ষড়যন্ত্রের নাকি দীর্ঘমেয়াদী ও বৃহত্তর ‘গেম প্ল্যান’ও ছিল! নিজের এই বিচিত্র তত্ত্বকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার উদ্দেশ্যে ভাস্কর রায় বাংলাদেশ ও ভারতের কারো কারো বরাতে এমন কিছু তথ্যের উল্লেখ করেছিলেন, যেগুলো সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষই কিছু জানতো না। আর না জানার কারণ, ভারতের এই পন্ডিত প্রবর বাংলাদেশের ভারতীয় ঘরানার এমন দু-একটি দৈনিককে সূত্র হিসেবে অবলম্বন করেছিলেন, গল্প ফেঁদে বসার জন্য যে দৈনিকগুলোর বিশেষ কুখ্যাতি রয়েছে।

অতি সম্প্রতিও নতুন করে কিছু পাণ্ডিত্যপূর্ণ কথা শুনিয়েছেন খোঁজ-খবর ‘রাখনেওয়ালা’ ভাস্কর রায় (দেখুন : সেন্টার ফর চায়না স্টাডিজ, সি৩এস পেপার নম্বর ৮০১)। ‘লেট বাংলাদেশ সল্ভ ইট্স ওন পলিটিক্যাল ইস্যুস’ শিরোনামে ৪ জুন লেখা এক নিবন্ধে তিনি জানিয়েছেন, গত মাস মে’তে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় মার্কিন কর্মকর্তারা নাকি বেগম খালেদা জিয়াকে আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার যদি ড. মুহম্মদ ইউনূসের বিষয়টি সম্মানজনকভাবে মীমাংসা না করে তাহলে ওয়াশিংটন বাংলাদেশকে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট অ্যাকাউন্টস (এমডিএ)-এর প্রতিশ্র“ত সাহায্য স্থগিত করবে। এরও আগে রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টিসহ ঢাকা সফরকারী মার্কিন কর্তাব্যক্তিরাও নাকি আওয়ামী লীগ সরকারকে সম্পর্কে অবনতি ঘটানোর একই হুমকি শুনিয়েছেন। অথচ সত্য হচ্ছে, ভাস্কর রায় যে এমডিএ-র কথা বলেছেন, তার ৩০ মিলিয়ন ডলার সাহায্য ওয়াশিংটন গত বছরের ডিসেম্বরেই স্থগিত ঘোষণা করেছে। এর সঙ্গে খালেদা জিয়ার যুক্তরাষ্ট্র সফরের কোনো সম্পর্ক নেই।

খালেদা জিয়াকে দিয়ে শুরু করলেও ভাস্কর রায় তার মূলকথাগুলো বলেছেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূসকে কেন্দ্র করে। বিশেষ ইঙ্গিত দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, ড. ইউনূসের উত্থান নাকি বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে ঘটেছিল। খ্যাতিও তিনি নাকি জোট সরকারের বদৌলতেই পেয়েছিলেন। বড়কথা, ড. ইউনূসের নাকি বিএনপির সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ ছিল, এখনও আছে। ভাস্কর রায় লিখেছেন, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটের মতো ইসলামী দলগুলো নাকি নারীদের উন্নয়নের ব্যাপারে ড. ইউনূসের নীতি ও কার্যক্রমের ঘোর বিরোধী। কারণ, ইসলামের সামাজিক আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে নারীদের সুযোগবঞ্চিত অবস্থায় রাখাই ইসলামী এই দলগুলোর উদ্দেশ্য! বিএনপির সঙ্গে ড. মুহম্মদ ইউনূসের ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কে জানানোই অবশ্য মিস্টার রায়ের উদ্দেশ্য নয়। কিছুদিন আগে স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাছে কলকাতাস্থ মার্কিন কনস্যুলেটের পাঠানো একটি তারবার্তার উল্লেখ করে ভাস্কর রায় বলেছেন, এতে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ড. ইউনূসকে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিকল্প ও তৃতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়ার চেষ্টা করছে। ‘উইকিলিকস’-এর ফাঁস করা তারবার্তাটিতে নাকি বলা হয়েছে, ড. ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের এ পরিকল্পনায় ‘সম্মত’ হয়েছেন। ভাস্কর রায় লিখেছেন, এর অর্থ অবশ্য এমন নয় যে, ওয়াশিংটন খালেদা জিয়াকে সমর্থন জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও কৌশল অবশ্যই শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের স্বার্থবিরোধী।

ভাস্কর রায় লিখেছেন, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর ড. ইউনূসকে প্রথমে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, গ্রামীণ জনগণের মধ্যে ড. ইউনূসের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক আদর্শ বা মতবাদ না থাকায় ড. ইউনূসকে বিকল্প নেতা হিসেবে দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। মিস্টার রায়ের মতে ড. ইউনূসের পে জাতিকে রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব নয়। সে কারণে বিএনপি ও আওয়ামী লীগে ভাঙন ঘটিয়ে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে তৃতীয় কোনো দল গঠন করা গেলেও এবং তার ওপর ওয়াশিংটনের কঠিন নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকলেও সে দলটিকে দিয়ে মার্কিন স্বার্থ উদ্ধার করানো যাবে না। মিস্টার রায় লিখেছেন, ড. ইউনূসের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের পরিপ্রেেিত বিএনপি যথেষ্ট উল্লসিত হয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু খালেদা জিয়া ও জামায়াতসহ তার সহযোগীরা বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারকে মতাচ্যুত করার এক দফা কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তারা জানেন না, ওয়াশিংটন কখন তার ‘হট পট্যাটো’টি ছুঁড়ে দেবে। শাসনকালের দুর্নীতি এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীদের প্রতি সমর্থনের কারণে বিএনপি নিজেও যে ওয়াশিংটনের ‘গুডবুকে’ নেই সে কথা জানাতেও ভুল হয়নি এই পন্ডিতের।

অনেকাংশে নসিহত করার স্টাইলে ভাস্কর রায় লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা রাষ্ট্রমতায় পরিবর্তন ঘটানো কিংবা একেবারে নতুন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠিকে মতায় বসানোর চিন্তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদজনক। অনেক বাস্তব এবং কল্পিত কারণেই আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করা যেতে পারে কিন্তু একথাও স্বীকার করতে হবে, প্রবল প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও শেখ হাসিনার সরকার উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে চলেছে এবং সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের মাধ্যমে এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র যদি বাংলাদেশের রাষ্ট্রমতায় পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করে তাহলে আওয়ামী লীগ সরকার এ পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যা কিছু অর্জন ও সংহত করেছে তার সবই ধ্বংস হয়ে যাবে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশকে পেছন দিকে নিয়ে যাবে এবং তার ফলে এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও নানাভাবে তির সম্মুখীন হতে থাকবে। মিস্টার রায় সতর্ক করতে গিয়ে বলেছেন, একটি বিষয় অবশ্যই বিবেচনায় রাখা দরকার। সেটা হলো, মার্কিনবিরোধী বিদেশী ইসলামী জঙ্গী ও জেহাদীরা এখনও জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী গ্র“পের সহযোগিতায় বাংলাদেশে নিজেদের ভিত্তি সংহত করার চেষ্টা চালাচ্ছে এবং আওয়ামী লীগ সরকার তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে যুদ্ধ করছে। ওয়াশিংটন নিশ্চয়ই চাইবে না, বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদীদের ‘নিরাপদ স্বর্গ’ তৈরি হোক।

এভাবেই কথার মারপ্যাঁচে ভাস্কর রায় বলতে চেয়েছেন, কথিত ইসলামী জঙ্গী-জেহাদী ও সন্ত্রাসবাদীদের দমন ও ধ্বংস করতে হলে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের চাইতে নির্ভরযোগ্য আর কোনো সরকার হতে পারে না। সুতরাং ড. মুহম্মদ ইউনূসকে পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং বিএনপি-জামায়াতের সমর্থন নিয়ে তাকে মতায় আনার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জন্যই তিকর হয়ে উঠবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের উচিত আওয়ামী লীগকেই মতায় টিকিয়ে রাখা!

পান্ডিত্যপূর্ণ মনে হলেও ভাস্কর রায় কিন্তু তার এ তত্ত্বটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর কারণ, বিশ্লেষণে দেখা যাবে, মিস্টার রায়ের নিজের বিভিন্ন তথ্য ও কথার মধ্যেই স্ববিরোধিতা রয়েছে। যেমন ড. ইউনূস সম্পর্কে জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলোর মনোভাব নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। বলেছেন, ইসলামী দলগুলো নাকি নারী উন্নয়নের ব্যাপারে ড. ইউনূসের নীতি ও কার্যক্রমের ঘোর বিরোধী। তা-ই যদি সত্য হয় তাহলে এই দলগুলো আবার ড. ইউনূসকে সমর্থন জানায় কি করে? তেমন েেত্র ড. ইউনূসের প্রতি বিএনপির সমর্থন নিয়েও তো প্রশ্ন ওঠে। কারণ, ভাস্কর রায়ের মতে শেখ হাসিনার শুধু নয়, যুক্তরাষ্ট্র ড. ইউনূসকে একই সঙ্গে খালেদা জিয়ারও প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। এটা সত্য হলে খালেদা জিয়ার মতো একজন ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় নেত্রী কিভাবে ড. ইউনূসের পে দাঁড়াতে পারেনÑ বিশেষ করে ড. ইউনূসকেই যেখানে মতায় আনার জন্য চেষ্টা চালানো হচ্ছে? খালেদা জিয়া নিশ্চয়ই নিজের পায়ে নিজে ‘কুড়াল’ মারতে চাইবেন না। অতীতের মতো কথিত ইসলামী জঙ্গী ও জেহাদীদের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক আবিষ্কার করেও হাসিরই খোড়াক যুগিয়েছেন ভাস্কর রায়। কারণ, বহুবার বহুভাবে চেষ্টা করেও কথিত জঙ্গিদের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি এ পর্যন্ত কেউই প্রমাণ করতে পারেনি।

বানোয়াট তথ্য ও বিশ্লেষণ হাজির করলেও ভারতের এই পন্ডিতের মূলকথাগুলোকে গভীর গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া দরকার। কারণ, ভাস্কর রায় সাধারণত বিশেষ বিশেষ সময়ে দৃশ্যপটে এসে থাকেন-যেমনটি এসেছিলেন পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঠিক পর পর। তার মন্তব্য ও বিশ্লেষণও ছিল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পেছনে তিনি নিজে থেকে বিএনপি-জামায়াতের ‘কালোহাত’ ও ‘ষড়যন্ত্র’ আবিষ্কার করেননি। তার এ আবিষ্কারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এ ব্যাপারে জানা গেছে ‘উইকিলিক্স’-এরই ফাঁস করা বিভিন্ন তথ্যে। এরকম একটি তথ্য হলো, বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে ‘নাখোশ’ জামায়াতে ইসলামী ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকার’ করতে পারে বলে ভারত ভয় পেয়েছিল। ভারতের পররাষ্ট্র সচিবও ভাস্কর রায়ের মতোই মার্কিন দূতকে বলেছিলেন, ওই বিদ্রোহের পেছনে ছিল ‘দীর্ঘ পরিকল্পনা’। ভাস্কর রায়ের প্রাঙ্গিক মন্তব্যটুকুও স্মরণ করা দরকার। তিনি লিখেছিলেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল ‘দীর্ঘমেয়াদী ষড়যন্ত্র’ ও বৃহত্তর ‘গেম প্ল্যান’ এবং ওই বিদ্রোহ সফল হলে ‘ডানপন্থী’ বিএনপি ও ‘ইসলামপন্থী’ জামায়াতে ইসলামীর জোট মতায় ফিরে আসতো! শিবশংকর মেনন মার্কিন দূতকে জানিয়েছিলেন, বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারের সম্পর্কে অবনতি ঘটতে পারে। কথাটা ভাস্কর রায়ও সে সময় লিখেছিলেন।

এভাবে একটির পর একটি তথ্য সাজিয়ে দেখলে পরিষ্কার হয়ে যাবে, ভাস্কর রায় একজন ব্যক্তি মাত্র নন। তাকে দিয়ে আসলে ভারত সরকারই কথা বলিয়ে থাকে। বর্তমান পর্যায়েও ভারত সরকারের হয়েই তিনি দৃশ্যপটে এসেছেন কি না সে প্রশ্ন তাই গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করা দরকার। বেশি দরকার ড. মুহম্মদ ইউনূসকে হঠাৎ সামনে নিয়ে আসার এবং বাতাসে গুজব ভাসিয়ে দেয়ার কারণ সম্পর্কে চিন্তা করা। একই সঙ্গে বিএনপিকে টেনে আনার কারণে তো বটেই, কথিত ইসলামী জঙ্গী-জেহাদী ও সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে আবারও জামায়াতে ইসলামীকে যুক্ত করার পেছনে কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে-সে প্রশ্নের উত্তর নিয়েও চিন্তা করা দরকার।

উইকিলিকস ► সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে জামায়াত




উইকিলিকসের তথ্য : সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে জামায়াত

গত নির্বাচনে ভরাডুবি হলেও বাংলাদেশকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে জামায়াতে ইসলামী- ওয়াশিংটনে এ মূল্যায়নই পাঠিয়েছে ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস, যা প্রকাশ করেছে উইকিলিকস।

দূতাবাসের শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স নিকোলাস ডিন ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি ওয়াশিংটনে 'জামায়াতে ইসলামী: দ্য টরটয়েজ, নট দ্য হেয়ার' শিরোনামের তারবার্তাটি পাঠান। প্রায় দেড় লাখ নতুন কেবলের সঙ্গে এ বার্তাটিও গত ৩০ অগাস্ট প্রকাশ করেছে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের সাড়াজাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকস।

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলোচনা এবং দলটির মজলিশে সুরায় আলোচিত বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করেই এ মূল্যায়ন তৈরি করা হয়েছে।

তারবার্তায় বলা হয়, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভরাডুবি হলেও নিজেদের লক্ষ্য থেকে তারা বিচ্যুত হচ্ছে না জামায়াতে ইসলামীর নেতারা।

"আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন বাড়ানোর মতো স্বল্প মেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে জামায়াত চিন্তিত নয়। আমরা বাংলাদেশকে পরিপূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছি", যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুর রাজ্জাক।

গত সংসদ নির্বাচনে মাত্র তিনটি আসনে জেতার পর ২০১০ সালের মাঝামাঝিতে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন জামায়াতের শীর্ষ দুজনসহ পাঁচ নেতা।

চারদলীয় জোটে থাকলেও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা (বর্তমানে অন্তরীণ) মনে করেন, তাদের একটি রাজনৈতিক আদর্শ আছে, যা অন্য দুটি প্রধান দলের (বিএনপি, আওয়ামী লীগ) নেই।

তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের বলেন, "বাংলাদেশের সমস্যাগুলো দূর হবে শুধু ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে।"

বিশ্বের অন্য কোনো দেশের 'জামায়াতে ইসলামী' নামের কোনো দলের সঙ্গে আর্থিক, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন কাদের মোল্লা।

তবে কাদের সম্পর্কে নিকোলাস ডিন মন্তব্য করেন- "পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে তিনি ভালোই জ্ঞান রাখেন এবং তিনি দাবি করেন পাকিস্তানের দলটির সাবেক নেতা মাওলানা ফায়জুর রেহমানের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব আছে।"

১৯৪১ সালে অবিভক্ত ভারতে জামায়াতে ইসলামী নামের দলটি প্রতিষ্ঠা করেন সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী। দেশ ভাগের পরে মওদুদী পাকিস্তানে চলে যান। আহমদিয়া স¤প্রদায়ের মানুষদের হত্যায় প্ররোচনা যোগানোয় পাকিস্তানে তার ফাঁসির আদেশও হয়েছিলো, তবে পরে বেঁচে যান তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের পর সা¤প্রদায়িক দল হিসেবে জামায়াত নিষিদ্ধ হলেও জিয়াউর রহমানের সময়ে দেওয়া সুযোগ নিয়ে পুনরুজ্জীবিত হয় দলটি। আগে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ নামে নিজেদের পরিচয় দিলেও অন্য দেশের কোনো শাখা দল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক ওঠার পর তারা নাম বদলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী করে।

কাদের মোল্লা মার্কিন কর্মকর্তাদের জানান, তাদের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম মজলিসে শূরায় দেশের সাধারণ মানুষদের মধ্যে নিজেদের মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার পন্থা নিয়ে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা তৃণমূল নেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

জামায়াতে ইসলামী সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে এগোলেও তাদের সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বলে তারবার্তায় বলা হয়।

মার্কিন দূতাবাসের রাজনৈতিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনায় শিবির নেতারা অন্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে তাদের বিভিন্ন সংঘর্ষের অসংখ্য ছবি বার বার দেখানোর চেষ্টা করে। তারা দাবি করেন, সারাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবির নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তবে শিবির নেতা-কর্মীর নির্যাতনের শিকার ছাত্রদের বিষয়ে নিশ্চুপ ছিলেন তারা।

শিবির নেতারা দাবি করেন, তাদের তহবিলের একমাত্র উৎস বর্তমান ও সাবেক সদস্যদের দেওয়া চাঁদা। কিন্তু নিকোলাস ডিন মনে করেন, মগবাজারের মতো জায়গায় শিবিরের প্রধান কার্যালয় এ দাবির অসারতা প্রমাণ করে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের মতো শিবিরও চাঁদাবাজি করে।

জামায়াত ও শিবির নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর মার্কিন এ কূটনীতিক বলেন, তারা নিজেদের যতই গণতান্ত্রিক দাবি করুক না কেন, সব সিদ্ধান্ত আসে ওপরের স্তর থেকে।

উইকিলিকস ► সাহায্য চেয়ে হাসিনার ফোন, ভারতের জামায়াত-শঙ্কা


উইকিলিকসের তথ্য : বিডিআর বিদ্রোহ : সাহায্য চেয়ে হাসিনার ফোন, ভারতের জামায়াত-শঙ্কা

বিডিআর বিদ্রোহের সময় আন্তর্জাতিক সাহায্য চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী, অন্যদিকে ভারতের শঙ্কা ছিলো জামায়াতে ইসলামী এ পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে- উইকিলিকসের বরাত দিয়ে বলছে ভারতের একটি দৈনিক।

ভারতের ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দু বলেছে, নয়া দিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স স্টিভেন হোয়াইটের ওয়াশিংটনে পাঠানো এক তারবার্তায় এ কথা বলা হয়।

স্টিভেন হোয়াইটের সঙ্গে সাক্ষাতে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শিব শংকর মেনন ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি জানান, ভারত সরকার এই বিষয়ে লন্ডন, বেইজিং, টোকির সঙ্গে যোগযোগ রক্ষা করে চলেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহিংসতা চলাকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে কথা বলে আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের সাহায্যের কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। তবে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো সাহায্য চাননি। এ অবস্থায় মুখার্জী তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন।

পররাষ্ট্র সচিব শিব শংকর মেনন মনে করেন, ওই অবস্থায় জামায়াত ইসলামী 'ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের' চেষ্টা করতে পারে- এ কথা উল্লেখ করে স্টিভেন তার তারবার্তায় লেখেন, এই বিদ্রোহে জামায়াতে ইসলামী সরাসরি জড়িত বলে সরাসরি উল্লেখ করেননি পররাষ্ট্র সচিব। তবে তিনি বলেছেন, ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী ফল এবং সরকারের নেওয়া বিভিন্ন হুমকিজনক পদক্ষেপে দলটি [জামায়াত] চরম হতাশ। এই সহিংসতার ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণে দলটি বৈঠক করেছে বলেও উল্লেখ করেন মেনন।

২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্র"য়ারি পিলখানায় বিডিআর সদরদপ্তরে (বর্তমান বিজিবি) জওয়ানদের বিদ্রোহে ৫৬ সামরিক কর্মকর্তাসহ ৭৩ জন নিহত হয়।

তার বার্তার শুরুতে বলা হয়, ২৮ ফেব্র"য়ারি শনিবার বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে ভারতের উদ্বেগের কথা শুনতে পররাষ্ট্র সচিব মেননের সঙ্গে দেখা করতে যান স্টিভেন। মেনন তাকে জানান, বিডিআর বিদ্রোহের সমাপ্তির খবরে ভারত স্বস্তি বোধ করছে। তবে সদ্য ক্ষমতায় আসা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য জামায়াতে ইসলামী ওই গোলযোগকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে পারে- এই ভেবে চিন্তিত দিল্লি।

ওই সাক্ষাতে খুব কম সময়ের বিজ্ঞপ্তিতে হোয়াইটকে ডেকে পাঠানোর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন মেনন।

২০০৯ সালের ২ মার্চ নয়াদিল্লি থেকে পাঠানো তারবার্তাটি উইকিলিকসের মাধ্যমে পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে দ্য হিন্দু। দৈনিকটির রোববারের মুদ্রিত সংস্করণে এর ভিত্তিতে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ হয়।

তারবার্তায় বলা হয়- বাংলাদেশে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা নিয়ে ভারত সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স স্টেভেন হোয়াইট দেখা করতে এলে পররাষ্ট্র সচিব শিব শংকর মেনন ভারতের সেই উদ্বেগের কথা তাকে অবহিত করেন।

"স্টিভেন মেননকে বলেন, বাংলাদেশে বিডিআর সহিংসতার খবর তিনি যখন শুনতে পান তখন তারা কলম্বোতে সার্কের স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক করছিলেন। তবে শুরুতে ভারতের প্রাথমিক ভাষ্য ছিলো- এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বৈঠক চলার সময়েই গণকবরের সন্ধান পাওয়ার বিষয়টি তারা জানতে পারেন। এই খবরে ভারত সরকার ধারণা করে যে, এটি স্বতস্ফূর্ত নয় বরং বিস্তৃত পরিকল্পনারই অংশ।"

সচিব শিব শংকরের মতে, শেখ হাসিনার সরকার বিদ্রোহ প্রশমনে সঠিক পন্থা অবলম্বন করেছে এবং সরকারের কার্যক্রমে সেই সময় বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সংহতি প্রকাশে ভারত সরকার আনন্দিত- বলা হয়েছে তারবার্তায়।

"তবে ওই সহিংতার প্রভাব সেনাবাহিনীতে পড়ার বিষয়টি নিয়ে ভারত চিন্তিত। কারণ এ ঘটনায় বহু সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। কারো কারো মৃতদেহ সুয়ারেজে ফেলে দেওয়া হয়েছে- উল্লেখ করে মেনন বলেন, এই আকষ্মিক হত্যাকাণ্ডে সেনাবাহিনীতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।"

উইকিলিকস ► একাত্তরের পর প্রথম মুশকিলে জামায়াত


উইকিলিকসের তথ্য : একাত্তরের পর প্রথম মুশকিলে জামায়াত

'১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত স্বাধীনতা যুদ্ধের পরবর্তী যে কোনো সময়ের চেয়ে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিকভাবে ভীষণ বেকায়দায় পড়েছে। দলটি খুব মুশকিলে আছে। উচ্চ আদালতের রায়ে সংবিধানে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হওয়া এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় জামায়াতে ইসলামী এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।'
জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির এক বৈঠক এবং অন্য সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এ মন্তব্য করা হয়। ২০১০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এ 'মন্তব্য করা' কূটনৈতিক তারবার্তাটি রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি ওয়াশিংটনে পাঠান। এর বরাত দিয়ে গত ৩০ আগস্ট উইকিলিকস এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের গোপন তারবার্তায় বলা হয়, ২০১০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টির বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘটিত সাম্প্রতিক রক্তাক্ত সংঘাত নিয়ে কথা হয়। ডরমিটরিতে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মধ্যে সৃষ্ট তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে ওই সংঘাত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ব্যারিস্টার রাজ্জাক। ওই ঘটনায় ৩ জন নিহত হয়। রাজ্জাক স্বীকার করেন ছাত্রদের মধ্যে এ ধরনের প্রাণঘাতী সংঘাত সমর্থনযোগ্য নয়, নিন্দনীয়। তার দল এ সংঘর্ষে ইন্ধন জোগায়নি বরং তদন্তে সহায়তা করবে।
ব্যারিস্টার রাজ্জাক সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টিকে বলেন, সরকার দেশে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন কায়েম করতে চায়। সে কারণেই সরকারের ইচ্ছামাফিক পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করা হয়েছে। ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের মতে, দেশের শীর্ষ আদালতের (হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট) স্বাধীন ইচ্ছায় এ রায় দেওয়া হয়নি। এ রায়ে আদালত সাংবিধানিক আইনের ধার ধারেনি। এ রায়ের মাধ্যমে সরকার এখন জামায়াত ইসলামীসহ সব ইসলামী দল নিষিদ্ধ করে দিতে পারে। আবদুর রাজ্জাক বলেন, তার দল গণতন্ত্র ও আইনের শাসনে বিশ্বাস করে। তাই সরকার যদি দেশে ধর্মভিত্তিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে দেয় তা হলে জামায়াতে ইসলামী নাম পরিবর্তন করবে। গঠনতন্ত্র সংশোধন করে দলের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রবণতা বা ঘোষণা বাদ দেবে। কারণ, জামায়াত আদালতের রায় মেনে চলতে আগ্রহী।
আবদুর রাজ্জাক বলেন, 'বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দল থাকার নজির আছে। যেমন আছে তুরস্কে।' তিনি রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টিকে স্মরণ করিয়ে দেন ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যারা যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে হামলা চালিয়েছে তারা কেউই গণতান্ত্রিক দেশের লোক নন। তাদের বেড়ে ওঠা স্বৈরতান্ত্রিক সমাজে। নিজামীর মতে, বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে ইসলামী চরমপন্থি মাথাচাড়া দেবে।
যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গ : এ সম্পর্কে ব্যারিস্টার রাজ্জাক রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টিকে বলেন, 'এক. এ ইস্যু ইতিমধ্যেই মীমাংসিত। দুই. রাজনৈতিক কারণে পুরনো এ ইস্যু আবার সামনে আনা হয়েছে। তিন. যুদ্ধাপরাধের বিচার করার জন্য দেশে যে আইন বলবৎ আছে তা আন্তর্জাতিক মানের নয়।' তারা দু'জনই একমত হন ১৯৭৩ সালে প্রণীত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচার করার জন্য পূর্ণাঙ্গ নয়। রাজ্জাক ও মরিয়ার্টি একমত হন যে, 'যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে হলে ১৯৭৩ সালের আইনটি যুগোপযোগী করতে হবে। তা না হলে নতুন আইন করতে হবে। পাশাপাশি এ বিচারের সময় আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক মানের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।'
মরিয়ার্টির ওই বার্তায় মন্তব্য কলামে আরও বলা হয়, ব্যারিস্টার রাজ্জাক যদিও বলছেন জামায়াতে ইসলামী 'আইনের শাসন' মেনে চলবে; কিন্তু তার পার্টির কট্টরপন্থিরা এ রকম কিছু গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে শাসক দল আওয়ামী লীগের কট্টর জামায়াতবিরোধীরা এখনই জামায়াত ও অন্য ইসলামী দলগুলোকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবছে কি-না তা এখনও পরিষ্কার নয়। এ বিষয়ে সংশয় রয়েছে।

উইকিলিকস ► কিংস পার্টিতে সমর্থন ছিল জামায়াতের


উইকিলিকসের তথ্য : কিংস পার্টিতে সমর্থন ছিল জামায়াতের

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কিংস পার্টি গঠনের বিষয়টি আলোচনায় ছিল। বিশেষ করে বিএনপির দলত্যাগী নেতাদের ওই দলে ভেড়াতে 'টোপ' দেওয়া হলেও জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের এতে ডাকা হয়নি। তবে এমন কোনো দল গঠনের উদ্যোগে সমর্থন ছিল জামায়াত নেতাদের। এ ছাড়া তখন বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতির ভূরি ভূরি অভিযোগের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে বিস্ময় প্রকাশ করেছিল জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব। উইকিলিকসে প্রকাশ করা ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে পাঠানো এক বার্তায় এমন কথা বলা হয়েছে।
ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস তাঁর বিদায়ের আগে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দলটির আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামরুজ্জামান, আবদুর রাজ্জাকসহ কয়েকজন। তখন আলোচনায় থাকা কিংস পার্টি ও বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক ও মনোভাব তুলে ধরে ২০০৭ সালের ১৭ জুন রাষ্ট্রদূত যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে ওই বার্তা পাঠান।
বার্তায় বলা হয়, বাংলাদেশে 'বন্ধুত্বপূর্ণ' অবস্থানের কারণে মতিউর রহমান নিজামী রাষ্ট্রদূতকে ধন্যবাদ জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাষ্ট্রদূত ভালো কিছু স্মৃতি নিয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করবেন। এ সময় নিজামী আলোচনা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যেকোনো সমস্যা সমাধানে তাঁর দলের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের অন্যতম উন্নয়নসঙ্গী এবং আমরা সবসময় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করি।
বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মতামত জানতে চাওয়া হলে নিজামী বলেন, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করা, রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নির্বাচনের সূচি ঘোষণার আগ পর্যন্ত এ ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামীর তেমন কিছু বলা বা করার নেই। সাবেক সহযোগী দল বিএনপির সঙ্গে সম্প্রতি সৃষ্ট দ্বন্দ্বের উল্লেখ করে নিজামী তাঁদের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য না করে এ ব্যাপারে তাঁদের ধীরে চলার নীতি অনুসরণের কথা জানান।
রাজনৈতিক সংস্কার প্রসঙ্গে বড় দলগুলোর হিংসাত্মক রাজনীতি ও দুর্নীতিগ্রস্ততার কারণে জামায়াতে ইসলামীর মতো ছোট দলগুলো লাভবান হবে_রাষ্ট্রদূতের কাছে এমন মতামত প্রকাশ করেন নিজামী। রাষ্ট্রদূত এ সময় জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবিরের সহিংস কর্মকাণ্ডের কথা তুললে নিজামী কোনো উত্তর দিতে পারেননি। তবে তিনি বলেন, তাঁর দল রাজতন্ত্রভিত্তিক শাসনের চর্চা করে না, বরং তাঁর দলের ভেতর যথেষ্ট গণতান্ত্রিক পরিবেশ রয়েছে।
নিজামী দাবি করেন, সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টায় কিংস পার্টি গড়ে তোলার ব্যাপারে তাঁদের কাছে সরাসরি কোনো তথ্য নেই। এ সময় মুজাহিদ যোগ করেন, তাঁদের দলের নেতারা এতটাই সৎ যে, এমন কোনো দলে যোগ দিতে তাঁরা আগ্রহী হবেন না। মুজাহিদ বলেন, দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের নিয়ে গড়ে তোলা কোনো দল আমাদের জন্য হুমকি। এ সময় নিজামী যোগ করেন, বাংলাদেশে সেনা-সমর্থিত আগের দুটি শাসনের (জেনারেল আইয়ুব খান ও এরশাদ) অভিজ্ঞতা রয়েছে। নিজামী বলেন, 'আমরা তৃতীয় এই দলের সাফল্য কামনা করি। অন্যথায় নির্বাচন বিলম্বিত হবে।'

উইকিলিকস ► সেনা সমর্থনে কিংস পার্টি গঠনের চেষ্টা


উইকিলিকসের তথ্য : সেনা সমর্থনে কিংস পার্টি গঠনের চেষ্টা

২০০৭ সালে গঠিত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শুরু থেকেই 'মাইনাস টু' তত্ত্বটি ছিল আলোচিত বিষয়। প্রধান দুই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে দুই নেত্রীকে হটিয়ে দেওয়ার জন্য ওই সময় সেনাবাহিনী বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এ জন্য বিকল্প রাজনৈতিক দল গঠনেরও উদ্যোগ নেয় তারা। 'কিংস পার্টি' গঠনের শুরুতেই বিএনপির নেতাদের টোপ ও চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের মধ্য থেকে সারা দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক নেতা না পাওয়ায় এবং জেনারেল মইন উ আহমেদের 'ধরি মাছ না ছুঁই পানি' ধরনের রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের কারণে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে সেনা কর্মকর্তাদের সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যায়।
ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো এক তারবার্তায় এমন কথা বলা হয়েছে। ২০০৭ সালের ৪ জুন এটি পাঠানো হয়। বিকল্প ধারার সংবাদমাধ্যম উইকিলিকস গত ৩০ আগস্ট বার্তাটি ফাঁস করে।
ওই তারবার্তায় বলা হয়, যদি প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলকে উচ্ছেদের অংশ হিসেবে 'কিংস পার্টি' গঠন করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা ছাড়ত এবং এই দলটিকে দিয়ে পরবর্তী সরকার গঠনের পরিকল্পনা করত; তাহলেও বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে অনুমান করা যায়, নির্বাচনে জেতার জন্য (মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য) এই দলটির লাগত প্রচুর সময়। একই সঙ্গে প্রয়োজন হতো সেনাবাহিনীর সক্রিয় সমর্থন।
যেভাবে প্রচেষ্টার শুরু : এক-এগারোর পটভূমিকায় ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই। তবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তারা কোনো যোগাযোগ করেনি। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও এলডিপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা কথা বলে জানতে পারেন, ডিজিএফআইয়ের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুর বারী (ফজলুল বারী) এবং একই সংস্থার সন্ত্রাস দমনবিষয়ক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম আমিন এসব নেতাকে সেনা সমর্থিত নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে প্রয়োজনীয় সমর্থন দিতে বলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, রাজনৈতিক দলগুলোর জ্যেষ্ঠ ও মধ্যম সারির নেতাদের বাগিয়ে আনা; একই সঙ্গে সুশীল সমাজের কিছু প্রথিতযশা ব্যক্তিকেও নতুন দলভুক্ত করা। এ জন্য অনেক নেতাকে ভয়ও দেখানো হয়েছিল। আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য (নাম প্রকাশ করা হয়নি) দাবি করেন, তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, নতুন দলে যোগ না দিয়ে ঝামেলা করলে তাঁকে দুর্নীতির মামলায় ফাঁসানো হবে। তবে অন্য নেতারা ভয়ে থাকলেও সুনির্দিষ্ট হুমকি তাঁরা পাননি।
বিএনপির একজন সাবেক মন্ত্রী মার্কিন কর্মকর্তাদের জানান, দুর্নীতির মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আশায় দলটির শতাধিক সংসদ সদস্য 'কিংস পার্টি'তে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এই দল গঠনের প্রক্রিয়া এবং দলে নতুন নেতা সংগ্রহের কর্মসূচি ওই বছরের ৭ মে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সময়ও অব্যাহত ছিল। ওই বছরের শুরুর দিকে 'মাইনাস টু' ফর্মুলা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সময় শেখ হাসিনা কানাডায় গিয়েছিলেন। সেনা সরকার হাসিনাকে আর দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না বলে পরিকল্পনা করে, এমনকি তাঁকে বিমানবন্দরেই গ্রেপ্তার করার জোর গুজব রটানো হয়। কিন্তু, ৭ মে হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক রাস্তায় নেমে তাঁর দেশে ফেরাকে স্বাগত জানায়। এ সময় শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্ব না ছাড়ার ব্যাপারে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেন। ফলে কিংস পার্টি গঠনে গোয়েন্দা ও সেনা কর্মকর্তারা চাপ তৈরি করে বিএনপির ওপর। বিএনপিতে তখন সেনা সমর্থিত সংস্কারবাদী অংশ দলের গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আনার ব্যাপারে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়াকে চাপের মুখে রাখে। মে মাসের শেষ ১০ দিনের মধ্যে ডিজিএফআইয়ের পরিচালক ফজলুল বারী কমপক্ষে দুবার স্থানীয় রেস্তোরাঁয় বিএনপির পেছনের সারির অনেক নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্য রাজনীতিতে অংশগ্রহণে বিরত রাখার ব্যাপারটিকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে বাকিদের প্রকারান্তরে জানান দেওয়া হয়, কিংস পার্টিতে যোগ না দিলে তাঁদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
শুরুতেই হোঁচট : মে মাসের শেষ দিকেই সেনা সরকারকে সমর্থনকারী বিএনপির সংস্কারপন্থী নেতারা মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেন, দুই নেত্রীকে সরানোর সুবর্ণ সুযোগ থাকলেও ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তা এবং সেনাপ্রধান জেনারেল মইনের দল গঠন ও রাজনীতিতে আসা নিয়ে বিভিন্ন রকম কথা-বার্তায় তাঁরা সংশয় ও দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেছেন। একই মাসে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার ঘটনাও তাঁদের স্নায়বিক চাপে ফেলে। এ সময় খালেদা জিয়াকে দেশছাড়া করার উদ্যোগটিও ব্যর্থ হওয়ায় বিএনপিতে সংস্কার চালানো এবং নতুন নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়াটিও হোঁচট খায়। ফল হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে সুসংহত দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের বিপক্ষে নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়ায় পিছু হটতে হয়।
জেনারেল মইনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল ধোঁয়াশাচ্ছন্ন : প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেননি। দলছুট হওয়ার প্রস্তাব পাওয়া রাজনৈতিক নেতাদের ডিজিএফআই পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলুল বারী জানিয়েছিলেন, নতুন রাজনৈতিক দলটিকে সম্পূর্ণ সেনা সমর্থন দেওয়া হবে। কিন্তু ডিজিএফআইয়ের অপর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম আমিন ও অন্য কর্মকর্তারা পরে ওই নেতাদের জানান, নতুন দল গঠনের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সর্তকর্তামূলক পদক্ষেপ : বিএনপি নেতা হান্নান শাহ 'কিংস পার্টি' গঠনের প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপির মূল ধারার পক্ষে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করেন। এ জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। একইভাবে ২৮ মে আওয়ামী লীগের আরেক নেতাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় মইন উ আহমেদের উপদেষ্টা ড. কামাল হোসেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আতাউর রহমান প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় কাঠামো ও গঠনতন্ত্রে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংস্কার আনতে ব্যর্থ হয়েছে। এ জন্যই একটি নতুন 'পরিচ্ছন্ন' দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ সময় ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম মন্তব্য করেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি হোঁচট খেয়ে খেয়ে এগোনোর পরও এখনো প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে এবং বাংলাদেশকে তারা এক-এগারো পূর্ববর্তী অবস্থার দিকেই ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় একটি 'কিংস পার্টি'র আবির্ভাব ছিল নির্বাচনে জয়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। সংবিধানে বড় ধরনের সংশোধনের জন্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও এই দল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল; যাতে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা এবং সেনা সমর্থিত জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা গঠন করা যায়।
কিংস পার্টি গঠনের উদ্দেশ্য : ওই তারবার্তায় বলা হয়, জেনারেল মইন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলুল বারী তাঁদের জানিয়েছেন, কিংস পার্টি গঠন বা রাজনৈতিক কোনো অভিপ্রায় তাঁদের ছিল না। এতে মন্তব্য করা হয়, যদি তাঁদের এই কথাটি সঠিক বলে ধরে নেওয়া হয় এবং ডজন ডজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগকেও মিথ্যা বলে ধরে নেওয়া হয়, যদি 'প্লান বি' খ্যাত কিংস পার্টি গঠনের নামে পরোক্ষভাবে সেনা শাসনের বিষয়টাও অমূলক হয়, তার পরও এটি ছিল সেনা কর্তাদের সামরিক উর্দি খুলে বেসামরিক নাগরিকের বেশ ধরে ক্ষমতায় আরোহনের পদক্ষেপ এবং পরবর্তী সরকার গঠনে বিএনপিকে ঠেকানোর জন্য পরিকল্পিত প্রত্যাঘাত। জিয়া এবং এরশাদের রাজনৈতিক দল গঠনের ইতিহাস পর্যালোচনা করে অনেক বাংলাদেশি ধারণা করেন, শত বাধা এলেও তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলকে মাটির সঙ্গে সম্পর্কহীন কিংস পার্টির পক্ষে কোনোভাবেই দুর্বল করা সম্ভব হবে না। যদি বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখা হয় এবং ব্যাপক জালভোটের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে নিজেদের পক্ষে টানা সম্ভব হয়; তাহলেই কেবল এ ধরনের দলের বিপক্ষে জয়লাভ সম্ভব হতে পারে।
প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভেতরে এ সময় স্পষ্টভাবে অনুগত ও সংস্কারবাদী দুই ধরনের নেতা ছিলেন; যাঁরা প্রত্যেকেই বিশ্বাস করতেন, সরকার 'কিংস পার্টি' গঠন না করা পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি চালানোর অনুমতি দেবে না। দলগুলোর প্রতি অনুগতরা দাবি করতেন, এখনই প্রকাশ্য রাজনীতির অনুমতি দেওয়া হোক। কিন্তু কিংস পার্টির দিকে হেলে যাওয়া নেতারা_যেমন ড. কামাল হোসেন এ সময় মত পোষণ করেন, রাজনীতি এখনো নীতিবর্জিত লোকদের দ্বারা প্রভাবিত। তাই প্রকাশ্য রাজনীতির অনুমতি আরো কিছুটা দেরিতে দেওয়া হোক।
এর পরে কী? : বার্তায় বলা হয়, দুই নেত্রীকে দেশছাড়া করতে ব্যর্থ হওয়ার পর সরকারের হাতে পরবর্তী উপায় ছিল, শেখ হাসিনার সঙ্গে আপস করে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থরক্ষায় খালেদা জিয়া পরিবারকে দুর্নীতি মামলাসহ অন্যান্য মামলায় ফাঁসানো। এর আগে হাসিনাকেও বিভিন্ন মামলায় ফাঁসানোর ব্যাপারে সরকার সুস্পষ্টভাবেই চেষ্টা করে। কানাডা সফররত হাসিনাকে দেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না বলেও ঠিক করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে সাহস না থাকায় এবং হাসিনাকে কোনো বিষয়ে দোষী সাব্যস্ত করার মতো কিছু খুঁজে না পাওয়ায় কালক্ষেপণ করেন তাঁরা। এ ছাড়া সে বছরের জুন মাসে শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। সে সময়টাকেও তাঁরা হাসিনাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার পরবর্তী সম্ভাবনা হিসেবে দেখছিলেন।
সে সময়ে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের অবস্থা ছিল বিপরীতধর্মী। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ব্যস্ত ছিলেন ছেলেদের রক্ষায়। দলে তাঁর নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন_এমন কোনো মানসিক ও নৈতিক গুণসম্পন্ন নেতাও ছিলেন না। অন্যপক্ষে, বেশ কিছু নেতা গ্রেপ্তার হওয়ার পরও আওয়ামী লীগ ছিল তুলনামূলক একাট্টা। জরুরি অবস্থার শুরুর দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যানারে ও সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে দুর্নীতি দমনের নামে বিএনপিকে নির্মূল করার জন্য দলটির একটি অংশকে চেপে ধরা হয়। তবে পরে সেনা কর্তারা আওয়ামী লীগকে, বিশেষ করে শেখ হাসিনার অনুসারীদের টার্গেট করেন। সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা তখন আওয়ামী লীগের বিরোধী ছিলেন। তাই বিএনপিকে ধ্বংস করে আওয়ামী লীগের জন্য পথ উন্মুক্ত করাও অসম্ভব ছিল।
আরেকটা ব্যাপার ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া। এই সরকারের রাজনৈতিক বৈধতার পথে এটিও ছিল বড় অন্তরায়। এশিয়া ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক (সে সময়ের) জরিপ ও চারদিকের কানাঘুষা ও কেচ্ছা কাহিনী এবং চাক্ষুষ ঘটনা এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে, মধুচন্দ্রিমার সময় শেষ। কারণ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও সরকারের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যর্থতায় গণ-অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে।
ওই তারবার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকা দূতাবাস ওয়াশিংটনকে আরো জানায়, জেনারেল মইন তাদের আশ্বস্ত করেছেন, সামরিক বাহিনী সরাসরি ক্ষমতা দখল করবে না এবং দেয়ালে পিঠ না ঠেকলে 'মার্শাল ল' বা সেনা শাসন জারিরও কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। যদিও কিংস পার্টি গঠনের ব্যাপারটি নিয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশির সামনে বা পেছনে সামরিক শাসনের ভূত আবছাভাবে আবির্ভূত হয়েই ছিল। এ সময় ধারণা করা হয়, কিংস পার্টি ব্যর্থ হওয়ার পরিণাম হিসেবে জারি করা হবে সামরিক শাসন। অন্যদের মত ছিল, কিংস পার্টিকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই জারি হবে সামরিক শাসন।
তারবার্তাটিতে মন্তব্য করা হয়, জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকার ঘোষিত পৌরসভা নির্বাচনেই (যদিও সেই নির্বাচন তখন অনুষ্ঠিত হতে পারেনি) সেনা অভিপ্রায়গুলোর 'এসিড টেস্ট' বা চূড়ান্ত পরীক্ষা হয়ে যাবে। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো অরাজনৈতিক নির্বাচন হলেও কিংস পার্টি মনোনীত ব্যক্তিরা যদি (মূল ক্ষমতা দখলের) মহড়া হিসেবে এই পদগুলোতে জিততে না পারেন, তাহলে জাতীয় নির্বাচনে এই দলের ভবিষ্যৎ কী হবে তা সহজেই অনুমেয়।
মন্তব্য : তারবার্তাটির মন্তব্য অংশে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রচারমাধ্যমগুলো তাদের প্রতিবেদনে একটা 'নতুন' রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যাপারে খুব খোলাখুলিই প্রতিবেদন ছাপাচ্ছে। তবে তারা সামরিক বাহিনীর সম্পৃক্ত থাকার তথ্য এড়িয়ে যাচ্ছে।
এতে আরো বলা হয়, সামরিক বাহিনী যদি তাদের প্রস্থানের পথ হিসেবে 'কিংস পার্টি' গঠনের কথা ভাবে, তবুও ধরে নিতে হবে, নির্বাচনে জিততে ওই পার্টির প্রচুর সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। যদি ব্যাপক প্রতারণা নাও করা হয়, তবু এ ধরনের রাজনৈতিক দলের গুছিয়ে উঠতে এবং এর প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে প্রচুর সময় দরকার। এ ছাড়া যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কেবল শহরের অভিজাত ও শিক্ষিত শ্রেণীই নয়, তৃণমূল পর্যায়ে হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিপুল সংখ্যক অনুসারী রয়েছে। এই দুই নেত্রীকে সরিয়ে দিয়ে নির্বাচন দিলে এদের সমর্থকদের একটি বড় অংশ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে না। তাই, 'কিংস পার্টি' যদি গঠন করা হয় এবং যদি নিশ্চিতভাবে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল ভেঙে এটি গড়ে ওঠে তাহলে তা নির্বাচনের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে।

উইকিলিকস ► শেখ হাসিনা বলেছিলেন সেনা হস্তক্ষেপ হলে ভালোই হবে


উইকিলিকসে মার্কিন গোপন বার্তা ফাঁস : শেখ হাসিনা বলেছিলেন সেনা হস্তক্ষেপ হলে ভালোই হবে : ২২ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এক বছরের মধ্যে নতুন নির্বাচন দিতে রাজি ছিলেন খালেদা জিয়া

২০০৭ সালের শুরুর দিনগুলোতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখেও তখনকার সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ২২ জানুয়ারির নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনড় ছিলেন। খালেদা প্রস্তাব দেন, পুনর্নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের দাবি অনুযায়ী ভোটার পরিচয়পত্র প্রবর্তনসহ নির্বাচন কমিশন সংস্কার করে ১২ থেকে ১৫ মাসের মধ্যে তিনি আবারও নির্বাচন দিতে পারেন। বিরোধী দলহীন স্বল্পমেয়াদি একটি সরকার গঠনের কথা ভেবেছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।
কিন্তু ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়া আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এ ধরনের কোনো প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। তখনকার পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী যদি হস্তক্ষেপ করেই এবং তারা যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতেই পারে, তাহলে সেটা ভালোই হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
ঢাকা থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া এ বিউটেনিসের গোপন তারবার্তা থেকে জানা গেছে এ তথ্য, উইকিলিকস যা প্রকাশ করেছে। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের হৈচৈ ফেলে দেয়া ওয়েবসাইট উইকিলিকস গত ৩০ আগস্ট প্রায় দেড় লাখ নতুন তারবার্তার সঙ্গে বিউটেনিসের এ সংক্রান্ত দুটি বার্তাও প্রকাশ করেছে।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সামরিক হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ওই তারিখের মাত্র দু’দিন আগে ৮ ও ৯ জানুয়ারি ওয়াশিংটনে দুটি বার্তা পাঠান যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত।
বিউটেনিস লেখেন, সেনাবাহিনী ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ করে অভ্যুত্থান করতে পারে কিংবা দু’নেত্রীকে নির্বাসনে পাঠানো হতে পরে—এমন কোনো আশঙ্কা মনে ঠাঁই দিতে প্রস্তুত ছিলেন না সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
এ দুটি ‘গুজব’ উড়িয়ে দিয়েছিলেন শেখ হাসিনাও; বরং তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসন দিলে তার জন্য ভালোই হবে, কেননা তাতে তিনি নাতনির সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন।
তখনকার নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ২২ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বিএনপির অনমনীয় অবস্থান, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা সামাল দিতে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের ব্যর্থতার মধ্যে ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনা এবং ৭ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত তখনকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস ও ব্রিটিশ
হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী।
উইকিলিকসে প্রকাশিত বার্তায় বলা হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সামরিক হস্তক্ষেপ কিংবা সামরিক আইন জারি এবং দু’নেত্রীকে দেশত্যাগে বাধ্য করার মতো সম্ভাবনাগুলো নিয়ে খালেদা ও হাসিনাকে ‘সতর্ক’ করে ‘রাজনৈতিক সমঝোতার’ প্রস্তাব দেন এ দুই কূটনীতিক। দু’নেত্রীকেই তারা বলেন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের একটি অংশের অনুরাধে তারা সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন এবং তাদের দেশ সামরিক অভ্যুত্থানের মতো কোনো অসাংবিধানিক ঘটনায় সমর্থন বা উত্সাহ দেবে না।
বিউটেনিস ও আনোয়ার এ-ও বলেন—কেবল দু’নেত্রীর সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমেই এ রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান হতে পারে। তাদের রাজনৈতিক সমঝোতা হলেই দেশজুড়ে সহিংসতা এবং সামরিক অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব।
‘খালেদা জিয়ার প্রস্তাব’ : ৭ জানুয়ারির একান্ত বৈঠকে কোনো ধরনের সামরিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে খালেদা জিয়া পাল্টা অভিযোগ তোলেন—কথিত সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যই এ ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে। তবে দু’রাষ্ট্রদূতই এ অভিযোগ অস্বীকার করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিউটেনিসের পাঠানো বার্তায়। খালেদা দুই কূটনীতিকের কাছে দাবি করেন, তিনি সবসময়ই আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু শেখ হাসিনা কখনই সাড়া দেননি।
‘এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে’ উল্লেখ করে খালেদা জিয়া সমঝোতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং ২২ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন। এর বদলে খালেদা প্রস্তাব দেন, পুনর্নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের দাবি অনুযায়ী ভোটার পরিচয়পত্র প্রবর্তনসহ নির্বাচন কমিশন সংস্কার করে ১২স থেকে ১৫ মাসের মধ্যে তিনি আবারও নির্বাচন দিতে পারেন।
এর আগে ১৯৯৬ সালেও এভাবে একতরফা নির্বাচন করে সংক্ষিপ্ত মেয়াদের জন্য সরকার গঠন করেছিলেন খালেদা জিয়া। সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর দাবিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ওই বছর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বর্জন করলে বিএনপি অবশ্যম্ভাবীভাবে পুনর্নির্বাচিত হয়। ওই সরকারের সংক্ষিপ্ত মেয়াদে সংবিধান সংশোধন করে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা চালু করে এবং জুনে আবারও নির্বাচন দেয়, যাতে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ।
উইকিলিকস প্রকাশিত বার্তায় বিউটেনিস লিখেছেন, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন হলে অনেকেই যে প্রশ্ন তুলবে, সে বিষয়ে সচেতন ছিলেন খালেদা। তবে তার যুক্তি ছিল, প্রশ্ন উঠলেও তার সেই সম্ভাব্য সরকার হবে সাংবিধানিকভাবে বৈধ।
আলোচনার একপর্যায়ে বিউটেনিস প্রশ্ন রাখেন, দেশের প্রায় অর্ধেক ভোটার যদি ২২ জানুয়ারির নির্বাচন মেনে না নেয়, সেক্ষেত্রে বিএনপি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে কি না।
‘কিন্তু দেশের মোট ভোটারের ৪০ শতাংশ আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেবে—এমন সম্ভবনা হেসেই উড়িয়ে দেন খালেদা জিয়া। বড় ধরনের গণআন্দোলন গড়ে তোলার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সামর্থ্য নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।’
দুই কূটনীতিক বিএনপি চেয়ারপার্সনকে জানান, সংবিধান পরিপন্থী যে কোনো ঘটনা এড়াতেই তারা রাজনৈতিক সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। এসব বিষয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গেও কথা বলেছেন তারা।
নিজের সরকারের কাছে পাঠানো বার্তায় মন্তব্যের অংশে বিউটেনিস লিখেছেন, বিএনপির একতরফা নির্বাচন পরিকল্পনার সমালোচনা করায় খালেদা জিয়া যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে জানতে পেরেছেন তারা। খালেদা জিয়ার ধারণা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের পিঠ এবার সত্যি সত্যি দেয়ালে ঠেকে গেছে এবং এ অবস্থা থেকে তারা আর ফিরে আসতে পারবে না।
‘তারচেয়ে সেনা হস্তক্ষেপ শ্রেয়’ মন্তব্য ছিল হাসিনার : খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলোচনার আগের দিন শেখ হাসিনার সঙ্গে বসে তাকে একই বিষয়ে সতর্ক করে সমঝোতার প্রস্তাব দেন বিউটেনিস ও আনোয়ার চৌধুরী। কিন্তু নির্বাসনে পাঠানোর সম্ভাবনার বিষয়টি হেসেই উড়িয়ে দেন হাসিনা। সামরিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কা নিয়েও দুই কূটনীতিকের সঙ্গে হালকা মেজাজে কথা বলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।
৮ জানুয়ারি ওয়াশিংটনে পাঠানো বার্তায় বিউটেনিস লেখেন, ‘হাসিনা পুরো বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছেন। এমনকি দেশত্যাগে বাধ্য করার গুঞ্জন বিষয়ে তিনি রসিকতা করে বলেছেন, সে রকম কিছু হলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে নাতনির সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন। নিজের নিরাপত্তার বিষয়টিতেও খুব একটা গুরুত্ব দেননি তিনি। সরাসরি সেনা হস্তক্ষেপ বা জরুরি অবস্থা জারির সম্ভবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, সেনাবাহিনী যদি হস্তক্ষেপ করেই এবং তারা যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতেই পারে, তাহলে সেটা ভালোই হবে।’
একবার ক্ষমতায় এলে সেনাবাহিনী স্বেচ্ছায় আবার রাজনীতিবিদদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবে—এমনটা কেন ভাবছেন, জানতে চাইলে হাসিনা মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে বলেন, তেমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না বলেই তার বিশ্বাস; কেননা অভ্যুত্থান করার মতো বলিষ্ঠ কোনো নেতা সেনাবাহিনীতে নেই বলে মনে করেন তিনি।
তাছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করতে যে সময় প্রয়োজন, তার বেশি সেনাবাহিনী ক্ষমতায় থাকতে চাইলে জনগণও তা মেনে নেবে না বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। দুই কূটনীতিককে তিনি বলেন, তেমন কিছু ঘটার পর সেনাবাহিনী ক্ষমতা ছাড়তে রাজি না হলে দেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে, রক্তপাত হবে, পুরো রাষ্ট্রই ভেঙে পড়বে।
২০০৬ সালের শেষ দিকে বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার পর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিলে যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, সেজন্য বিএনপিকেই দায়ী করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বিএনপি জানত যে, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগই জিতবে। এ কারণে তারা যাতে নির্বাচনে অংশ না নিতে পারে, সুপরিকল্পিতভাবে তেমন পরিস্থিতিই সৃষ্টি করেছে বিএনপি। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ আবার বিএনপির হাতে ক্ষমতা তুলে দিতেই ২২ জানুয়ারি নির্বাচন আয়োজন করতে চাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন হাসিনা।
আপাতত একতরফা নির্বাচন হলেও বিএনপি ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগের দাবি পূরণ করে এক বছরের মধ্যে আবারও নির্বাচন দিতে পারে—এমন সম্ভবনার কথা তুলে ধরে দুই কূটনীতিক শেখ হাসিনার কাছে জানতে চান—খালেদা জিয়া কোনো সমঝোতার প্রস্তাব দিলে আওয়ামী লীগ তা মানবে কি না।
জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি বরং সামরিক হস্তক্ষেপের মতো বিকল্প নিয়ে ভাবতে রাজি, বিএনপিকে আবারও ক্ষমতায় যেতে দিতে নয়—লিখেছেন বিউটেনিস।


উইকিলিকস ► প্রথম আলো মার্কিনপন্থী নিউএজ বিরোধী

উইকিলিকসের তথ্য : প্রথম আলো মার্কিনপন্থী নিউএজ বিরোধী

দৈনিক প্রথম আলো মার্কিনপন্থী পত্রিকা। আর নিউএজ মার্কিনবিরোধী। উইকি-লিকস’-এর ফাঁস করা ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের তারবার্তায় এ তথ্য পাওয়া গেছে।

‘প্রেসিডেন্ট ওবামার নোবেল প্রাপ্তিতে অভিনন্দন বাংলাদেশী মিডিয়ার’ শিরোনামে পাঠানো ওই তারবার্তাটি ওয়াশিংটনে পাঠানো হয় ২০০৯ সালের ১৪ অক্টোবর। বার্তাটি পাঠান দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স নিকোলাস ডিন। ওই তারবার্তায় প্রেসিডেন্ট ওবামার নোবেল বিজয়ের খবরটি কীভাবে কোন পত্রিকা কভার করেছে তা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে পত্রিকাগুলো কোনটি কোনপন্থী সে বিষয়ে মন্তব্য করা হয়।
তারবার্তায় সালমান এফ রহমানের ইংরেজি দৈনিক ইনডিপেন্ডেন্টকে আমেরিকাপন্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দৈনিক ইনকিলাবকে বলা হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গবিরোধী। তবে ওই সময় ইনকিলাব ভারতবিরোধী হলেও বর্তমানে ভারতপন্থি বলে পরিচিত। পত্রিকাটি বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক।
তারবার্তা থেকে জানা যায়, ইত্তেফাক মার্কিনপন্থি পত্রিকা। অবশ্য পত্রিকাটির এই পরিচিতি বাংলাদেশের মানুষ আগে থেকে জানতো। নিকোলাস ডিন ইংরেজি দৈনিক নিউ নেশনকে বিএনপিপন্থি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর নয়া দিগন্তের পরিচয় দিয়েছেন বিএনপি-জামায়াতপন্থি হিসেবে।
সমকালকে আওয়ামী ও পশ্চিমাপন্থি হিসেবে ওই তারবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে। জনকণ্ঠের ব্যাপারে একই ধরনের মন্তব্য করা হয়।
বিএনপিপন্থি হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়েছে দৈনিক আমার দেশকে। যায়যায়দিনকে বলা হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারপন্থি। পত্রিকাটির বর্তমান মালিক আওয়ামী লীগের এমপি সাবের হোসেন চৌধুরী ভাই সাঈদ চৌধুরী। তারবার্তায় সবশেষে ইংরেজি দৈনিক নিউএজ সম্পর্কে মন্তব্য করে বলা হয়, পত্রিকাটি মার্কিনবিরোধী।

উইকিলিকস ► হাসিনাকে মুক্তি না দিতে অনুরোধ জানান আমু

উইকিলিকসের তথ্য : হাসিনাকে মুক্তি না দিতে অনুরোধ জানান আমু

সেনাসমর্থিত বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিদেশে যাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে কারাগার থেকে মুক্তি না দেয়ার জন্য সরকারের কাছে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছিলেন দলটির তত্কালীন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু। এমনকি আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তিনি প্রচারণাও চালিয়েছিলেন। দুর্নীতির মামলায় শেখ হাসিনার সাজা হওয়ার ওপর তার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নির্ভর করছে বলেও মন্তব্য করেন।
ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি ওয়াশিংটনে পাঠানো গোপন তারবার্তায় এসব কথা উল্লেখ করেছেন। ২০০৮ সালের ১৮ জুন তত্কালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি ওয়াশিংটনে ওই গোপন তারবার্তাটি পাঠান। সাড়া জাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকস এ তারবার্তাটি ফাঁস করেছে।
মার্কিন তারবার্তায় বলা হয়েছে, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শেখ হাসিনা যেদিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন, সেদিন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের রাজনৈতিক দফতরকে বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্ব চালিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে দলের স্থানীয় কর্মীদের মধ্যে তিনি প্রচারণা চালাবেন। আমু মার্কিন দূতাবাসকে জানান, তিনি দীর্ঘ সময় হাসিনার সঙ্গে কাজ করবেন না। আমু নিশ্চিত করেন, তিনি হাসিনার কারামুক্তি ও দেশ ত্যাগ করার মধ্যবর্তী সময়ে হাসিনার সঙ্গে কথা বলবেন না।
তারবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে, আমু মার্কিন দূতাবাসের কাছে স্বীকার করেন, অনেকগুলো দুর্নীতি মামলার মধ্যে কমপক্ষে একটিতে শেখ হাসিনার সাজা হওয়ার ওপর এখন তার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নির্ভর করছে।
প্রেসিডেন্ট ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে প্রধান উপদেষ্টা থেকে পদত্যাগের চাপ দিয়েছিলেন মইনসহ সামরিক কর্মকর্তারা : সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মইন উ. আহমেদ, প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীসহ তিন বাহিনীর প্রধানরা ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি স্থানীয় সময় বিকাল প্রায় ৫টায় প্রেসিডেন্ট ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। ওই সাক্ষাতে তারা প্রেসিডেন্টকে কোনো সময় না দিয়ে তাকে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করতে বলেন। একই সঙ্গে তারা একজন নতুন প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ দিতে বলেন। ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করতে এবং সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য একটি নতুন নির্বাচনী শিডিউল দিতে বলেন। এ সময় প্রেসিডেন্টকে কোনো সময় দেয়া হয়নি। কারণ, তাতে তিনি বেঁকে বসতে পারেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ এদিন জরুরি অবস্থা জারির সেনাবাহিনীর প্রস্তাব মেনে নেন। অন্যদিকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হলে তিনি সে প্রস্তাবে রাজি হননি। ঢাকায় নিযুক্ত তত্কালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া এ বিউটেনিস ওয়াশিংটনে পাঠানো গোপন তারবার্তায় এসব কথা উল্লেখ করেন। গত ৩০ আগস্ট উইকিলিকসে ফাস হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক গোপন তারবার্তা থেকে এসব জানা যায়।
তারবার্তায় বলা হয়, ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স কাউন্টার টেররিজম প্রধান ব্রিগেডিয়ার এটিএম আমিন ১২ জানুয়ারি সাক্ষাত্ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে। তারবার্তায় বলা হয়েছে, এটিএম আমিনের মতে, তিন বাহিনী প্রধান ও আর্মি চিফ অব স্টাফ অফিসার মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মইন উ আহমেদ ১১ জানুয়ারি বিকাল প্রায় ৫টার দিকে প্রেসিডেন্ট ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। ওই বৈঠকে তারা প্রেসিডেন্টকে কোনো সময় না দিয়ে উপরের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে বলেন। আমিন দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট সেসব দাবি মেনে নিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের প্রাক্কালে ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্সের ডাইরেক্টর জেনারেল মেজর জেনারেল মো. রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। তবে তখনও নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি যে, তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে কিনা।
আমিন বলেন, মেজর হায়দারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং তাকে অবসরে যেতে বাধ্য করা হতে পারে। (বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে বলে অনেকেই মনে করেন)। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হলে আমিন বলেন, আমরা এ বিষয়টি দেখব। আমিন আরও বলেন, প্রেসিডেন্টের প্রেস সচিব এম. মোখলেসুর রহমান চৌধুরীকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তবে তাকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি। রাষ্ট্রদূতকে আমিন বলেন, এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টের কাছে যেতে সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্তকে দু’টি বিষয় প্রভাবিত করেছিল।
সেনাবাহিনী যদি একপক্ষীয় নির্বাচনে সমর্থন দিয়ে কাজ করে তাহলে তা নিয়ে জাতিসংঘে শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশের অব্যাহত অংশগ্রহণের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘ মহাসচিবের বাংলাদেশের ওপর একটি বিবৃতি। জাতিসংঘের স্থানীয় প্রতিনিধির জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনও নির্বাচনে সেনাবাহিনীর সমর্থনকে সম্পর্কিত করে বিবৃতি দেয়। তাতে নির্বাচনে সেনাবাহিনীর সমর্থনের বিষয়টি উঠে আসে। শুরুতেই জেনারেল মইন জাতিসংঘের কাছে অনুরোধ করেন, যাতে জাতিসংঘ একটি চিঠি ইস্যু করে। তিনি ওই চিঠি নিয়ে প্রেসিডেন্টকে রাজি করাতে পারেন যে, যদি রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান না করা যায় তাহলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন বাধাগ্রস্ত হবে।

উইকিলিকস ► রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে যুদ্ধাপরাধ ইস্যু


 
উইকিলিকসের তথ্যে এবার উঠে এসেছে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া। এতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই ইস্যুকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
২০০৯ সালে পাঠানো তত্কালীন রাষ্ট্রদূত জেম্স এফ মরিয়ার্টির গোপন তারবার্তায় এ বিষয়টি উঠে আসে। মরিয়ার্টি তার পাঠানো বার্তায় বলেছেন, যুদ্ধাপরাধ ইস্যু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে রাজনীতির ময়দান থেকে সরানোর জন্যই এই বিচার শুরু হয়েছে। মরিয়ার্টির বিবেচনায়, এর মাধ্যমে জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করা হচ্ছে।
মরিয়ার্টি উল্লেখ করেন, ১৯৭৩ সালের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী যে বিচার প্রক্রিয়া চলছে, তা আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারেনি। যদি বিচারে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হয় তাহলে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা দরকার। আর জাতিসংঘকে জড়ানো না হলে ইস্যুটি পুরোপুরি রাজনীতিকীকরণ হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে তিনি সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের প্রধান একে খন্দকারের বক্তব্য তুলে ধরেন। যেখানে তিনি বিচার প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য করার জন্য জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা দাবি করেন।
উইকিলিকসের তথ্যে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতের বরাত দিয়ে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচার চান না।
গত আগস্ট মাসে বাংলাদেশ নিয়ে এই মার্কিন গোপন তারবার্তা প্রকাশ করে উইকিলিকস।
মরিয়ার্টি বার্তায় বলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকার খুব দ্রুতই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ২৯ জানুয়ারি সংসদে এ ব্যাপারে প্রস্তাব নেয়া হয়। এ কারণেই যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। সরকারি দলের অনেকেই মনে করেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারের মাধ্যমে তারা জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিক ময়দান থেকে সরিয়ে দিতে পারবে।
তারবার্তায় স্পষ্ট করে বলা হয়, এটা এই দশকের এমন একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু, যাকে অতিমাত্রায় রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অন্ধকারে রাখা হয়েছে।
মরিয়ার্টি তার বার্তায় বলেন, অনেক বাংলাদেশী মনে করে, ১৯৭২ সালে সিমলা চুক্তির পর বাংলাদেশ এখন যুদ্ধাপরাধের বিচার করার ব্যাপারে নৈতিক শক্তি হারিয়েছে।
তারবার্তায় বলা হয়, যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট করে। সশস্ত্র বাহিনী, প্রতিরক্ষাবাহিনী ও সহযোগী বাহিনীর লোকদের মধ্যে যারা মানবতাবিরোধী, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচার করার জন্য আইনটি তৈরি করা হয়। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এই আইনের অধীনে ৩৭ হাজার মানুষ আটক করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার অপরাধ সামান্য হওয়ার কারণে প্রায় ২৬ হাজার মানুষকে ক্ষমা করে দেয়। ১১ হাজারের ব্যাপারে হত্যা, ধর্ষণের মতো অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ৭৫০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এতে আরও বলা হয়, ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান মারা যাওয়ার পর কলাবরেটর অ্যাক্ট বাতিল হয় এবং আইনে যারা জেলে রয়েছে তাদের ক্ষমা করে দেয়া হয়।
তারবার্তায় বলা হয়, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের নেতারা অভিযোগ করেছে, যুদ্ধকালে ৩০ লাখ বাঙালি মারা গেছে, ২ লাখ বাঙালি নারী ধর্ষিতা হয়েছে, এক কোটি মানুষ গৃহহারা হয়েছে। তারা বলছে, পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে আধাসামরিক বাহিনী ছিল রাজাকার বাহিনী। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ছিল আলবদর, আলশামস এবং শান্তি কমিটি। তারা পাকিস্তানি প্রশাসনের পক্ষে কাজ করত। এতে আরও বলা হয়, ২০০৭-২০০৮ সালে কেয়ারটেকার সরকারের সময় সেক্টর কমান্ডাররা আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের বিষয়টা প্রকাশ করত না। নতুন সরকার গঠনের পর এটা প্রকাশ পায়।
তারবার্তায় বলা হয়, জামায়াতে ইসলামীর প্রধান মতিউর রহমান নিজামী সমপ্রতি এক রিপোর্টারকে তাদের ভুলের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি ছিল ভুল এবং তা বাস্তবসম্মত ছিল না। কিন্তু আমরা কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না।’
তারবার্তায় বলা হয়, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম ও তাদের সমর্থকদের পক্ষে ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিদ্যমান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টের অধীনে। এখন তাদের প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা (বিশেষ করে জাতিসংঘ), যাতে বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও রাজনীতিমুক্ত হয়।
সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের প্রধান একে খন্দকার বলেছেন, ‘যদি বিচার প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ সম্পৃক্ত হয় তাহলে বিচারটা হবে সর্বগ্রহণযোগ্য। আর যদি জাতিসংঘ এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলেও তা বন্ধ করতে পারবে না।’
কিন্তু এ ব্যাপারে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া বাংলাদেশের। তা ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইম অ্যাক্ট অনুযায়ী হবে। তবে জাতিসংঘ চাইলে বিচার প্রক্রিয়া মনিটর করার জন্য পর্যবেক্ষক পাঠাতে পারে। জামায়াতে ইসলামী বলছে, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করার দাবি জানাবে।
মরিয়ার্টি তার বার্তায় মন্তব্য করেন, আওয়ামী লীগ তাদের ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নের জন্য সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে ফিরে যাচ্ছে।
তারবার্তায় বলা হয়, এই দশকে যুদ্ধাপরাধ বাংলাদেশের জন্য অতিমাত্রায় রাজনীতিপূর্ণ ইস্যু।
জেম্স মরিয়ার্টি অন্য এক তারবার্তায় বলেন, পাকিস্তানের হাইকমিশনার তাকে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে ইউএনডিপি প্রতিনিধির সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতও তাকে বলেছেন, ফ্রান্স সরকার মনে করে, এ ধরনের সম্পৃক্ততা পাকিস্তান সরকারের জন্য অতিরিক্ত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
তারবার্তায় বলা হয়, পাকিস্তানের হাইকমিশনার আলমগীর বাবর ১০ মে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তার অসন্তুষ্টির কথা জানান। তিনি বলেন, ইউএনডিপির প্রতিনিধি রেনেটা লকের সঙ্গে সাক্ষাত্ করে তার রাজনৈতিক সচিব জানিয়েছেন, ইউএনডিপি যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছে। বিশেষ করে আইনের শাসন ও সুষ্ঠু বিচারের জন্য তারা সাহায্য করছে।
১১ মে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত চার্লি কোসরেট মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে বলেন, যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের সম্পৃক্ততায় পাকিস্তানের হাইকমিশনার তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। ফ্রান্স সরকার মনে করে, এ ব্যাপারে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা পাকিস্তান সরকারের জন্য অতিরিক্ত সমস্যা সৃষ্টি করবে।
মরিয়ার্টি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিবেশে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা হলে তা রাজনীতিকরণ হয়ে যাবে। ফরাসি রাষ্ট্রদূত তাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচার চান না। এই কারণেই এর আগে ৫ বছরের শাসনামলে তিনি এই ইস্যু নিয়ে কিছুই করেননি।
রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি বার্তার শেষে মন্তব্যে বলেন, আসলে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া চলছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মাধ্যমে। আমাদের মত হচ্ছে, ১৯৭৩ সালের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী যে বিচার প্রক্রিয়া চলছে, তা আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। যদি বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হয় তাহলে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পৃৃক্ততা প্রয়োজন। যদি তা না হয়, তাহলে এটা পুরোপুরি রাজনীতিকীকরণ হয়ে যাবে।

উইকিলিকস ► ২৮ অক্টোবরের সন্ত্রাস : লগি-বৈঠা দিয়ে আ’লীগের লোকজনই ৫ জামায়াত কর্মীকে হত্যা করে


ভিন্ন ধারার গণমাধ্যম উইকিলিকসের ফাঁস করা তথ্যে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠা সহিংসতার ঘটনাও এবার ঠাঁই পেয়েছে। প্রকাশ্যে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করার লোমহর্ষক সে কথাই ওয়াশিংটনে জানিয়েছিলেন তত্-কালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস। গোপন বার্তায় তিনি বলে-ছিলেন, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের হাতেই ২৮ অক্টোবর জামায়াতের ৫ জন সমর্থক নির্মমভাবে নিহত হয়েছিল। তার বর্ণনামতে, লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে লাশের ওপর নর্তন-কুর্দনও করেছে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা। তার বর্ণনা থেকে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের হাতে পুলিশের প্যান্ট খুলে নেয়ার ঘটনার বর্ণনাও বাদ যায়নি।
সে সময় প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ কীভাবে রাজনৈতিক ময়দান সহিংস করে তোলে, তা-ও রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন মার্কিন বার্তায়। ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর ও ২ নভেম্বর পৃথক দুই তারবার্তায় বিউটেনিস এ কথা জানান।
২৯ অক্টোবর ওয়াশিংটনে পাঠানো গোপন বার্তায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস বলেন, রোববার ঢাকার রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ দিন প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন পৃথকভাবে বৈঠক করেন পরবর্তী প্রধান উপদেষ্টা পদে একজন সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়ার জন্য।
বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিনের স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করার প্রস্তাব সমর্থন করে। কিন্তু বিরোধী দল আওয়ামী লীগ তা প্রত্যাখ্যান করে।
বিউটেনিস লিখেছেন, শনিবার সহিংসতায় ১৫ জন মারা গেছে, শত শত আহত হয়েছে, আর এটা হয়েছে আওয়ামী লীগের প্ররোচনায়। বিচারপতি কেএম হাসান প্রধান উপদেষ্টা হতে আগ্রহী নন—এ ঘোষণা দেয়ার পরও রাস্তায় সহিংসতা করতে থাকে দলটি। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের মেয়র বন্দর বন্ধ করে দিয়েছে। ঢাকা ও সিলেটের সড়কও বন্ধ রয়েছে।
ক্ষমতাসীন জাতীয়তাবাদী দলের ক্ষমতা ছাড়ার কথা ছিল ২৮ অক্টোবর। সহিংসতা অব্যাহত থাকায় আগের দিন সন্ধ্যায় বিচারপতি হাসান বলেন, ‘আমি জাতীয় স্বার্থে দায়িত্ব গ্রহণে প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর সহিংস মনোভাবের কারণে আমার পক্ষে তা আর সম্ভব হচ্ছে না।’
বিউটেনিস বার্তায় লিখেন, আওয়ামী লীগ অভিযোগ করে আসছিল, বিচারপতি হাসান ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিএনপিপন্থী। বিচারপতি হাসানের পর সংবিধান অনুযায়ী বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কথা, কিন্তু জাতীয়তাবাদী দল তার ব্যাপারে একমত নয়। তারা বলছে, বিচারপতি মাহমুদুল আমিন গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আজিজ প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কথা। তিনিই সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। আওয়ামী লীগ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হামিদুল হকের নাম প্রস্তাব করেছিল, কিন্তু হামিদুল হক তার নাম প্রস্তাবের বাইরে রাখতে বলেন।
আওয়ামী লীগের দুজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে পৃথক বৈঠককালে রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস সহিংসতায় তার উদ্বেগের কথা জানান এবং বিচারপতি হাসানের বিষয়ে ক্রমাগত সহিংসতাকে উত্সাহিত করার কারণ জানতে চান।
রাষ্ট্রদূত লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগ প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার সাংবিধানিক প্রভিশনগুলো নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল বিচারপতি হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করে যাচ্ছিল।
বার্তার শেষে বিউটেনিস তার মন্তব্যে বলেন, ঢাকার পরিস্থিতি এখন উত্তেজনাপূর্ণ। নতুন করে সহিংসতার প্রেক্ষিতে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে, জরুরি অবস্থা জারি হতে পারে। কয়েকজন বিচারপতি ও রাজনৈতিক নেতা আমাদের জানিয়েছেন, রাজপথে যারা সহিংসতা করছে তারা সবাই আওয়ামী লীগের, অন্য দলের কেউ নয়। প্রেসিডেন্ট আহমেদ তার ভাষণে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার বিষয়গুলো জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস ২ নভেম্বর ওয়াশিংটনে পাঠানো গোপন তারবার্তায় বলেন, ২ নভেম্বর রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস ও পোলফ (নোট সংগ্রহকারী) জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিদায়ি শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামীর সঙ্গে বৈঠক করেন। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও বিদায়ি সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকও সভায় উপস্থিত ছিলেন।
নিজামী রাষ্ট্রদূতকে বলেন, তারা সবসময় সহিংসতার বিরুদ্ধে। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামী গত ২৮ ও ২৯ অক্টোবর আওয়ামী লীগের সহিংসতার শিকার হয়। তিনি বলেন, জাতীয় মসজিদের কাছে জামায়াতের সমাবেশে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা লগি-বৈঠা, বোমা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা করে। এতে তাদের ৫ সমর্থক ঘটনাস্থলেই মারা যায়। তিনি বলেন, সারাদেশে সহিংসতায় তাদের ১৩ জন সমর্থক নিহত হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর নেতারা রাষ্ট্রদূতকে ১০ মিনিটের ভিডিও ডকুমেন্টারি দেখান। সহিংসতা নিয়ে টিভি ফুটেজ দিয়ে এটা তৈরি করা হয়েছে। এতে জামায়াত কর্মীদের ওপর আওয়ামী লীগ কর্মীদের পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা ঠাঁই পেয়েছে।

উইকিলিকস ► বাংলাদেশকে চাপে রাখতে ২০০৫ সালের সার্ক-শীর্ষ সম্মেলন পন্ড করেছে ভারত

কার্যত: সার্ক এখন একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান ছাড়া কিছুই নয়। এর কার্যকারিতা আনুষ্ঠানিকতা ও আঞ্চলিক পিকনিকে পর্যবসিত হয়েছে।
উইকিলিকস-তথ্য দিয়েছে, বিগত চারদলীয় জোট সরকারের শেষদিকে ২০০৫ সালে অনুষ্ঠিতব্য ঢাকার সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ না দেবার ঘোষণা দিয়ে দিল্লী বাংলাদেশের ওপর তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থে চাপ প্রয়োগের কৌশল বাস্তবায়ন করেছে। নেপালের জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং ঢাকায় তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে যুক্তি দেখিয়ে সার্ক-শীর্ষ সম্মেলন বানচাল করে ভারত।
উইকিলিকস্-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অব্যাহতভাবে ভারতবিরোধী প্রচারণা, টাটার বিনিয়োগে অনাগ্রহ, ভারতকে ট্রানজিট-করিডোর-সমুদ্রবন্দর ইত্যাদি দিতে অস্বীকৃতির কারণে ক্ষুব্ধ ভারত বাংলাদেশ সরকারকে এর মাধ্যমে একটা বার্তা দিতে চেয়েছিল।
সার্ক-সম্মেলন বানচাল করার ভারতীয় দুরভিসন্ধি ফাঁস করে উইকিলিক্স যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তা ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’ সম্প্রতি প্রকাশ করেছে। ভারত সরকার বা তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত এর কোন প্রতিবাদ জানায়নি। উল্লেখ্য, দিল্লী ও ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো হয় এসব তথ্য ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এসব তথ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব নিলম ডিয়ো, পরিচালক তরনজিত সন্ধুর সাথে মার্কিন কূটনীতিকদের কথোপকথনের রেকর্ড উদ্ধৃত করা হয়েছে। উইকিলিক্স জানিয়েছে, ‘বাংলাদেশে বোমা বিস্ফোরণের কারণে সার্ক সম্মেলন বাতিল করা হয়নি। বরং বাংলাদেশে ভারত বিরোধী প্রচারণা তখন বেশ জোরেশোরে চলছিল এবং টাটার বিনিয়োগ বিষয়েও বাংলাদেশ বেঁকে বসেছিল। এসব কারণে বাংলাদেশকে বার্তা দেয়ার দরকার ছিল।’ উল্লেখ্য, ২০০৫ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকা সফরে আসা মার্কিন উপ-সহকারী পররাষ্ট্র সচিব জন গ্যাস্টরাইটের সাথে ভারতের কূটনৈতিক যোগসাজশে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে একটি যুথবদ্ধ কৌশল নেয়া হয়। তারা বাংলাদেশকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার চাপে রাখে।সার্ক সম্মেলন বাতিলে সফল ভারতীয় কূটনীতিকরা মার্কিন কূটনীতিকদের সাথে এমন সব কথাবার্তা বলেছেন, তাতে বাংলাদেশের প্রতি তাচ্ছিল্য ও ঔদ্ধত্যের পরিচয় পাওয়া যায়।
সার্ক-সম্মেলন বাতিল করার ফলে বাংলাদেশে সৃষ্ট ক্ষোভ ও হতাশাকে নয়াদিল্লী বাংলাদেশের প্রাপ্য বলেই মনে করেছে এবং এটা নিরসনে তারা কোন উদ্যোগ নেয়নি।
ভারতের কূটনীতিক তরণজিত বলেছেন : ‘ভারতের জন্য যে সব বিষয় উদ্বেগজনক’ সে বিষয়গুলো বাংলাদেশ উপেক্ষা করলে তা বাংলাদেশের জন্যও বিপজ্জনক হয়ে দেখা দিতে পারে’- এ বার্তাটিই তারা বাংলাদেশকে দিতে চেয়েছেন।ভারত যেন ইরান থেকে গ্যাস না নিয়ে বাংলাদেশের গ্যাস মজুদকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে চীন ও ইরানের ব্যাপারে মার্কিন ভীতি নিরসন করে ওয়াশিংটনের এ নিয়ে যথেষ্ট মাথাব্যথা ছিল।২০০৫ সালের ১৩ এপ্রিল ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটন একটি তারবার্তা পাঠানো হয়। ঐ তারবার্তার নম্বর ৩০৬৯৭। তাতে ঢাকায় সফররত মার্কিন উপ-সহকারী পররাষ্ট্র সচিব জন গ্যাস্টরাইটের সাথে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব নিলম ডিয়োর কথোপকথন সূত্র উল্লেখ করে উইকিলিকস লিখেছে : ‘দিল্লীর আগ্রহে ওয়াশিংটন বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে যথেষ্ট নজরদারি করছে এবং বাংলাদেশের সাথে এক সাথে কাজ করার একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমরা বাংলাদেশকে বোঝাতে চাচ্ছি, তাদের বিষয়ে আমরা যথেষ্ট মনযোগি।নিলমের মতে, অনেক বিষয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কাছে অভিন্ন বার্তা পাঠিয়েছে। বিশেষ করে ভারতের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করে চলার বিষয়ে উভয় দেশই বাংলাদেশকে অব্যাহত ছবক দান করেছে। কিন্তু এ বিষয়ে বাংলাদেশের অব্যাহত অনঢ় ভূমিকা তাদেরকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। এক পর্যায়ে ক্ষুদ্র ঋণের আইকন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ইউনূসকে পর্যন্ত মার্কিনীরা ভারতের পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশনে পাঠিয়ে ইন্দো-মার্কিন অক্ষের পক্ষে ওকালতি করিয়েছে।Source

উইকিলিকস ► দিলীপ বড়ুয়া যে কারণে মন্ত্রী

শেখ হাসিনা তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে দিলীপ বড়ুয়াকে কম হুমকি বলে মনে করেছিলেন। এ কারণেই বাম রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাকে বাদ দিয়ে তিনি দিলীপ বড়ুয়াকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি ওয়াশিংটনে পাঠানো তারবার্তায় এমনটিই উল্লেখ করেছিলেন। ৩০ আগস্ট সাড়া জাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকস এ তারবার্তাটি ফাঁস করে। ২০০৯ সালের ৯ মার্চ মরিয়ার্টি ওয়াশিংটনে পাঠানো তারবার্তায় শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়ার প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেন। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতায় শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভা পাঁচমিশালি ভাব আছে শিরোনামের ওই তারবার্তায় মরিয়ার্টি উল্লেখ করেন, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া তার কাছে স্বীকার করেছেন, তিনি মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন কাজ সম্পর্কে এখনো দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছেন। মরিয়ার্টি আরও লিখেন, দিলীপ বড়ুয়াকে সততার সঙ্গে সাহায্য করতেই শীর্ষ কর্মকর্তারা বেশির ভাগ বৈঠক করছেন।

মরিয়ার্টি দিলীপ বড়ুয়াকে মন্ত্রী করার নেপথ্যে আরও একটি কারণের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে দিলীপ বড়ুয়া আওয়ামী লীগের একজন প্রার্থীকে তার নিজ আসন ছেড়ে দিয়েছিলেন। বিনিময়ে মহাজোট সরকার গঠন করার পর তাকে মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়। দিলীপ বড়ুয়া বাংলাদেশের বর্তমান মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য, যারা সংসদ সদস্য নন। এখানে মরিয়ার্টি ওয়াশিংটনকে বুঝানোর জন্য একটি মন্তব্য লিখেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রিসভার ১০ শতাংশ সদস্য সংসদ সদস্য নাও হতে পারেন। যাদের প্রচলিত ভাষায় ‘টেকনোক্র্যাট’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। মরিয়ার্টি দিলীপ বড়ুয়ার সঙ্গে তার একটি সাক্ষাতের প্রসঙ্গ তারবার্তায় উল্লেখ করেন। তিনি তাতে বলেন, দিলীপ বড়ুয়া তাকে বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য শিল্পোন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। তিনি মরিয়ার্টিকে বলেন, বাংলাদেশ সরকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বৈচিত্র্য এনে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) প্রচলন ঘটিয়ে বাংলাদেশকে মধ্যআয়ের দেশে পরিণত করতে চায়। মরিয়ার্টি বলেন, দিলীপ বড়ুয়া ট্রেডমার্ক, প্যাটেন্ট ও বিভিন্ন মেধাস্বত্ব রক্ষায় নিজের প্রতিশ্রুতির কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশে শিল্প মন্ত্রণালয় যে ট্রেডমার্ক, পণ্যমান, প্যাটেন্ট ইত্যাদির দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় তাও ওয়াশিংটনে পাঠানো তারবার্তায় মরিয়ার্টি উল্লেখ করেন।Source

উইকিলিকস ► আওয়ামী লীগ জেতায় মরিয়ার্টির কাছে পিনাকের উচ্ছ্বাস


উইকিলিকসের তথ্য : আওয়ামী লীগ জেতায় মরিয়ার্টির কাছে পিনাকের উচ্ছ্বাস

সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল ভোট পেয়ে জয়ী হওয়ার ঘটনায় তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির কাছে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী।

২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে এ আনন্দ প্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা ও অন্যন্য ইস্যুতে আওয়ামী লীগের নতুন সরকারের সঙ্গে উন্নত সম্পর্ক চায় ভারত।

তারবার্তায় বলা হয়, ‘আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতায় পারস্পরিক সহায়তাই হবে আলোচনার কেন্দ্রীয় ইস্যু। সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে আঞ্চলিক টাস্ক ফোর্সের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানের প্রতি সমর্থন জানান পিনাক রঞ্জন।’

গোপন তারবার্তায় বলা হয়, ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে হওয়ায় পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে নয়াদিল্লির উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রয়েছে। মরিয়ার্টিকে পিনাক রঞ্জন বলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা আলোচনায় বাড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সফরের কথা ছিল।

তারবার্তায় দূতাবাস মন্তব্য করে, ভারত প্রায়ই অভিযোগ করে, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা। তাদের আরও অভিযোগ, সীমান্ত অতিক্রম সন্ত্রাসীরা ভারতে বোমা হামলা চালায়।

রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি জানান, মার্কিন সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আঞ্চলিক টার্স্ক ফোর্সের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপারে সচেতন। একইসঙ্গে এ ব্যাপারে দ্বিতীয় পথও (ট্র্যাক টু গ্রোগ্রামস) বিবেচনায় রাখছে যুক্তরাষ্ট্র, এই পথে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ব্যাপারটি সমন্বয়ের কাজ করতে পারে। পিনাক রঞ্জন এতে স্বাগত জানান।

মরিয়ার্টি বলেন, শেখ হাসিনার উচিৎ সন্ত্রাসবিরোধী কর্মসূচির অংশ হিসেবে এমন একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ করা, যার কাজ হবে বাংলাদেশের বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সমন্বয় করা। পিনাক রঞ্জন এতেও সম্মতি জ্ঞাপন করেন। এছাড়া আধা সামরিক বাহিনী র‌্যাবকে বিলুপ্ত করা উচিৎ হবে না মরিয়ার্টি অভিমত ব্যক্ত করলে, এর সঙ্গেও একমত পোষণ করেন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত।

তারবার্তায় বলা হয়, র‌্যাব বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতা পরিচালনার প্রধান বাহিনী। তবে বিএনপির আমলে এই বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে কিছু আওয়ামী লীগ নেতা একে সন্দেহের চোখে দেখে থাকেন।

তারবার্তায় বলা হয়, ‘মার্কিন সরকার র‌্যাবকে মানবাধিকার প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছে। রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) বাংলাদেশি সংস্করণ হতে পারে র‌্যাব। আর এর জন্য র‌্যাবই সবচেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে।

উইকিলিকস ► নির্বাচনের আগের দিন খালেদা-মরিয়ার্টি বৈঠক



উইকিলিকসের তথ্য : নির্বাচনের আগের দিন খালেদা-মরিয়ার্টি বৈঠক

ঢাকা: ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর আগের দিন বিএনপির চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি বৈঠকে করেন। বৈঠকে বিশ্বের সপ্তম জনবহুল দেশ বাংলাদেশে অবাধ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

তারবার্তায় বলা হয়, ‘নির্বাচনী প্রচারাভিযানে ক্লান্ত খালেদা জিয়া তার উপদেষ্টাদের পার্টির রূপরেখা নির্বাচনী ময়দানে উপস্থিত করার অনুমতি দেন। উপদেষ্টাদের কথাবার্তা অনুযায়ী, বিএনপির বিরুদ্ধে বিদ্যমান অভিযোগগুলো ছোটখাট মাপের। তবে বিএনপির নেতারা জানেন, ক্ষমতায় ফেরার সংগ্রাম কঠিনই হবে। বৈঠকে নতুন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা না হলেও এতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বৈঠকে বিএনপিকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে মার্কিন সরকার তথ্যবহুল ও বস্তনিষ্ঠ অভিমত ব্যক্ত করতে সমর্থ হবে।’

২৯ ডিসেম্বর ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে এসংক্রান্ত একটি তারবার্তায় পাঠানো হয়। সম্প্রতি তারবার্তাটি ফাঁস করেছে উইকিলিকস।

এতে বলা হয়েছে, ২০০৮-এর ২৮ ডিসেম্বর আয়োজিত মার্কিন দূতাবাস আয়োজিত বৈঠকে খালেদা জিয়া ছাড়াও অংশ নেন, বিএনপির উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত শমসের মবিন চৌধুরী, মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, সাংবাদিক শফিক রেহমান। সংসদীয় নির্বাচনী প্রচারাভিযান আরম্ভ হওয়ার পর এই প্রথম বিএনপির সঙ্গে বৈঠক। বিভিন্ন সময়ে খালেদা জিয়া নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন।

তারবার্তায় বলা হয়, ‘খালেদার উপদেষ্টারা তার অদম্য মনোবলের প্রশংসা করে বলেন, নির্বাচনী প্রচারাভিযানে তিনি সাত হাজার কিলোমিটারের বেশি সড়ক ভ্রমণ করেছেন। ৬৪ জেলার ৫০টিতে সফর করেছেন। ২০০টি জনসভা ও দেড় কোটি ভোটারের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেছেন।’

তারবার্তায় বলা হয়, ‘বৈঠকে রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি বংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, তা খালেদাকে অবহিত করেন। বলা হয়, নির্বাচনের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি বিরাজ করছে কি না তা মূল্যায়ন করতে দূতাবাসের একটি দল দেশব্যাপী সফর করেন। আমাদের (দূতাবাস) মূল্যায়ন হচ্ছে, নির্বাচনে ব্যাপক মানুষ অংশ নেবে এবং গ্রামের মানুষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও সন্তুষ্ট। একইসঙ্গে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রশংসা করে মরিয়ার্টি বলেন, উভয় দলের নির্বাচনী ইশতেহারে মিল রয়েছে। বিশেষ করে, উভয় দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে একমত পোষণ করেছে। প্রধান দুটি দলই ক্ষমতাসীন ও বিরোধী থাকা অবস্থায় একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে।’

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারও পরবর্তী সরকার ও বিরোধী দলের কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করে। রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দেখতে চায় বাংলাদেশে গণতন্ত্র দৃঢ় শেকড় পেয়েছে।

তারবার্তাটির মন্তব্য অংশে বলা হয়, খালেদা জিয়া রাষ্ট্রদূতকে জানান, প্রচারাভিযানের পর অত্যন্ত ক্লান্ত। তাকে দেখাচ্ছেও সেরকম। বৈঠকটি এ কারণে গুরুত্ব ছিল এ কারণে যে, একটা ধারণা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগকে পছন্দ করে। এ ধারণা ভাঙতে বৈঠটির গুরুত্ব রয়েছে। বস্তুত, এই বৈঠকের আগে শেখ হাসিনার সঙ্গেও বৈঠক করেন রাষ্ট্রদূত, যা খালেদার সঙ্গে বৈঠকের চেয়ে একবার বেশি।

উইকিলিকস ► ‘সমতা সৃষ্টির জন্য খালেদা জিয়াকেও গ্রেপ্তার করা হবে’


উইকিলিকসের তথ্য : ‘সমতা সৃষ্টির জন্য খালেদা জিয়াকেও গ্রেপ্তার করা হবে’

খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হবে সমতা সৃষ্টির খাতিরে। তিনি এটা জানেন এবং নিজের গ্রেপ্তারের জন্য তৈরি আছেন। তিনি নিশ্চয়ই দিন গুনছেন।
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারের পর খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গে ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম আমিন এ কথা বলেন বলে মার্কিন দূতাবাসের ফাঁস হওয়া তারবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।
২০০৭ সালের ১৭ জুলাই এ টি এম আমিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের কয়েকজন কর্মকর্তা। ১৯ জুলাই দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স গীতা পাসি ওয়াশিংটনে এ নিয়ে একটি তারবার্তা পাঠান।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম আমিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের বলেন, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া—উভয়কে সম্মানের সঙ্গে রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য কয়েকটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দুজনই তা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে শেখ হাসিনাকে আগের দিন গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং খালেদা জিয়াকে অচিরেই গ্রেপ্তার করা হবে।
হাসিনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ: শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ আনা হয়েছে উল্লেখ করে এ টি এম আমিন বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ১০-১১ জন মানুষকে হত্যার অভিযোগও আনা হবে। তিনি বলেন, ২০০৪ সালে হাসিনা একটি বাস পোড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, যার ফলে ওই লোকদের মৃত্যু ঘটে।
এ ছাড়া হাসিনার বিরুদ্ধে ২০টির মতো অভিযোগ আনা হতে পারে বলে জানান আমিন। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, প্রথম মামলাটি শিগগিরই, ১০ দিনের মধ্যেই আদালতে যাবে এবং শুরু হওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে মামলাটির নিষ্পত্তি হবে।’
‘কিংস পার্টি’: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিন বলেন, রাজনৈতিকভাবে অপরিচিত ফেরদৌস কোরেশি একটি ‘কিংস পার্টি’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এ দল গঠিত হচ্ছে প্রধানত অন্যান্য দল থেকে বেরিয়ে আসা লোকজন নিয়ে এবং এটা হবে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটা উৎস। তবে আমিন এও মনে করেন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অধিকাংশ সমর্থকই নিজ নিজ দলের সঙ্গেই থেকে যাবেন। সরকার অচিরেই ছাত্ররাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করবেও বলে তিনি জানান।
জামায়াতে ইসলামী: প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক ওলটপালটের ফলে জামায়াতে ইসলামী লাভবান হবে কি না—এই প্রশ্নের উত্তরে আমিন নেতিবাচক জবাব দিয়ে বলেন, জামায়াত কোনো নির্বাচনে একা জিততে পারে না। সাফল্য পেতে তাদের অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোট বাঁধতে হয়।
সহযোগিতার অনুরোধ: আমিন দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে মার্কিন সহযোগিতা চান। তিনি বলেন, দুর্নীতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ বিশেষভাবে আগ্রহী।

সবিস্তার সূচীপত্র
টেম্পলেট কাষ্টমাইজেশন - তরঙ্গ ইসলাম | তরঙ্গ ইসলাম