কুরআন অধ্যয়ন সহায়িকা


আমরা যদি এ কুরআনকে কোন পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম তাহলে তোমরা দেখতে পেতে আল্লাহর ভয়ে পর্বত ধ্বসে পড়তো এবং খন্ড-বিখন্ড ও চূর্ণ-বিচূর্ন হয়ে যেতো। -(সুরা হাশর:২১)
 
কুরআন থেকে শিক্ষালাভ করে হৃদয়কে আলোকিত করা এবং কুরআনের শিক্ষা অনুধাবন ও অনুশীলন করার জন্য একটা অসাধারণ সহজবোধ্য বই। কুরআনের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য খুব সহজে বুঝে নেবার উপকরণ সমৃদ্ধ বইটিতে ৭ টি ভিন্ন অধ্যায় রয়েছে। কুরআন অধ্যয়নের সর্বোৎকৃষ্ঠ পন্থা ও কুরআনের স্বাদ আস্বাদনের কৌশল বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে এতে। মূলত শিক্ষানবীস নতুন পাঠকদের জন্য বইটি সবচেয়ে উপকারী বলে প্রমাণিত হবে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের কর্মী ও ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টাদের জন্য কুরআনকে হৃদয়ঙ্গম করতে বইটি আলোকবর্তিকা হিসেবে পথ দেখাবে।

কুরআনিক ডিকশনারী (আন্ডারস্ট্যান্ডিং কুরআন)

 https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgHs9TFiMKD3JGK9vg8iCKSQbbkgBWayUloY_z8kxlvBDbDX-hLWKUmMsrjvMG0KF1ERyVVz8M1yIaFhFPX6IWxTLibFDmnYdEYi65S2BNYlCAaOQ_rYp50mutrGb2pWEr8zCmEFh0XIJ0/s1600/Quran_Priyoboi.jpg 

কোরআন এবং সালাত অনুধাবন - সহজ পদ্ধতি। প্রাথমিক স্তরের জন্য শর্ট কোর্স → ৯ ঘণ্টার একটিসহজ অথচ কার্যকর কোর্স, যেখানে কোরআনের দৈনন্দিন তেলাওয়াত ও বেছে নেয়া অন্য কিছু অংশ থেকে আপনি শিখবেন ১০০টি শব্দ - যেগুলো কোরআনে প্রায় ৪০,০০০ বার (সর্বমোট প্রায় ৭৮,০০০ শব্দ থেকে বা মোট শব্দের প্রায় ৫০%) এসেছে। উদ্দেশ্য হলো (১) প্রমাণ করা যে কোরআন শেখা সহজ; (২) মানুষকে কোরআন অধ্যয়নে উৎসাহিত করা; (৩) কীভাবে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক (interaction) স্থাপন করা যায় তা শেখানো...


তাফহিমুল কুরআন (পিডিএফ)


তাফহীমুল কুরআনের বৈশিষ্ট্য

তাফহীমুল কুরআন যে বৈশিষ্ট্যের দরুন বিশেষ মর্যাদার অধিকারী তা এ তাফসীরখানা না পড়া পর্যন্ত বুঝে আসতে পারে না । মধু কেমন তা খেয়েই বুঝতে হয় । অন্যের কথায় মধুর স্বাদ ও মিষ্ঠতা সঠিকভাবে জানা সম্ভব নয়। নবুয়াতের ২৩ বছর রাসূল (সা) কালেমা তাইয়্যেবার দাওয়াত থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সব ক্ষেত্রেই ইকামাতে দ্বীনের যে মহান দায়িত্ব পালন করেছেন সে কাজটি করবার জন্য কুরআন পাক নাযিল হয়েছে । রাসূল (সা) -এর নেতৃত্বে পরিচালিত ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন অবস্থায় ও পরিবেশে আল্লাহ পাক প্রয়োজন মতো যখন যে হেদায়াত পাঠিয়েছেন তা-ই গোটা কুরআনে ছড়িয়ে আছে । তাই কুরআনকে আসল রূপে দেখতে হলে রাসূল (সা)-এর ২৩ বছরের সংগ্রামী জীবনের সাথে মিলিয়ে বুঝবার চেষ্টা করতে হবে । তাফহীমুল কুরআন এ কাজটিই করেছে । এখানেই এর বৈশিষ্ট্য।

মা'রেফুল কুরআন (ডাউনলোড)


সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত তাফসির গ্রন্থগুলোর মধ্যে মা'রেফুল কুরআন সর্ববৃহৎ ও শ্রেষ্ঠরুপে পরিচিত। এ অসাধারণ গ্রন্থটিতে তাফসির শাস্ত্রের মূল উৎস থেকে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য বর্ণনাদির উদ্বৃতি ও পর্যালোচনার পাশাপাশি আধুনিক কালের নতুন নতুন জিজ্ঞাসারও জবাব রয়েছে।

প্রায় সাত হাজার পৃষ্ঠার এ অনন্য তাফসির গ্রন্থটির আর একটা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে,পবিত্র কুরআনের মর্মকথা যেন এর দ্বারা সর্বশ্রেণীর পাঠকের নিকটই সমভাবে বোধগম্য করে দেয়া হয়েছে।

এ তাফসিরের লেখক মুফতি মুহাম্মদ শফি ১৮৯৭ ইশায়ী সনে জন্মগ্রহণ করেন এবং তাফসির রচনা সমাপ্ত হবার ৪ বছর পর ১৩৯৬ হিজরীতে মৃত্যবরণ করেন। করাচীর চৌরঙ্গী এলাকায় তার দাফন হয়।

ফী-যিলালিল কুরআন (সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ)

আল্লাহর হাজার শোকর, এক সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই শতকের ক্ষণজন্ম ইসলামী চিন্তানায়ক সাইয়েদ কুতুব শহীদ-এর বিশ্ববিখ্যাত তাফসীর ‘ফী যিলালিল কোরআন’ –এর বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হলো। ৫ বছরের চাইতে কিছুটা কম সময়ের ভেতরে আল্লাহ্ তায়ালা যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ (সর্বমোট ২২ খন্ডে সমাপ্ত) এই তাফসীরের অনুবাদ প্রকাশনার কাজ শেষ করার যে তাওফীক আমাদের দান করেছেন তার জন্যে আমরা একান্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ্ তায়ালার কৃতজ্ঞতা জানাই। (প্রথম প্রকাশনা অনুষ্ঠান ৬ জানুয়ারী ৯৫ ও সমাপনী অনুষ্ঠান ১২ই মে ২০০০)


‘ফী যিলালিল কোরআন’ ও তার প্রণেতা সাইয়েদ কুতুব শহীদ-এর পরিচয় আজকের ইসলামী বিশ্বে নতুন করে দেয়ার অবকাশ নেই। আমরা শুধু এটুকুই বলতে পারি যে, ইসলাম প্রতিষ্ঠার মহান সংগ্রামে শহীদ কুতুবের নাম যেমনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, তেমনি তাঁর রচিত তাফসীর ‘ফী যিলালিল কোরআন’ও অনন্তকাল ধরে কোরআন অনুধাবনের ক্ষেত্রে একটি ‘মাইলফলক’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

তাফসির ইবনে কাসীর (কুরআন)

তাফসীর গ্রন্থ “তাফসীর ইবনে কাসীর” এর মুল তাফসীর করেছেন হাফেজ ইমামুদ্দিন ইবনু কাসীর (রহঃ)। বাংলা অনুবাদ করেছেন ডঃ মুহাম্মদ মুজিবর রহমান।

তাফসীর ইবনে কাসীর হচ্ছে কালজয়ী মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ ইবনে কাসীরের একনিষ্ঠ সাধনা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল। তাফসীর জগতে বহুল পঠিত সর্বসম্মত নির্ভরযোগ্য এই তাফসির গ্রন্থটি। ইবনে কাসীরের প্রকৃত নাম ইসমাইল,আবুল ফিদা তার ডাকনাম একং ইমামুদ্দিন (ধর্মের স্তম্ভ) তার উপাধি। তিনি সিরিয়ার বসরান মাজদল নামক স্থানে ৭০০ হিজরী সালে জন্মগ্রহণ করেন।

তাফসির ইবনে কাসিরের প্রথম খন্ডে তার বিস্তারিত জীবনী বিবরণ রয়েছে।

কুরআন তেলাওয়াত ডাউনলোড

 https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEj32HmCp8lUgytiLPopyqguKD_gSc2O9xY40VZoLT8NueV9FLgk-s4X5FnEbuamDm2y37EuGZcASbFomngRvEcryMhftcUbYvwdRXw0ODgpDiqGAOMXNXIsn0x0-X4sKLTHC43jfw7qLGE/s1600/mishari.jpgক্বারী মিশারী রাশীদ আল আফাসি ১৯৭৬ সালের ৫ ই সেপ্টেম্বর কুয়েতে জন্মগ্রহণ করেন। ইসলামি ইউনিভার্সিটি অফ মদীনা থেকে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে বর্তমানে ইমাম হিসেবে কর্মরত আছেন কুয়েতের মসজিদ আল কাবির গ্রান্ড মসজিদে। তিনি সারা বিশ্বের মুসলমানদের নিকট পরিচিত পেয়েছেন তার অত্যন্ত আকর্ষনীয় সুললিত কণ্ঠে  কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। তেলাওয়াতের পাশাপাশি ইসলামী সংগীত ও গেয়ে থাকেন এই জনপ্রিয় ক্বারী। তার কণ্ঠে তেলাওয়াতকৃত পবিত্র কুরআনের ১১৪ টি সূরার ডাউনলোড লিঙ্ক ১৩ খন্ডে নিচে দেয়া হলো।

সুরা আত-তাকবীর


১.) যখন সূর্য গুটিয়ে নেয়া হবে।১


১) সূর্যকে আলোহীন করে দেবার জন্য এটা একটা অতুলনীয় উপমা। আরবী ভাষায় তাকভীর মানে হচ্ছে গুটিয়ে নেয়া। মাথায় পাগড়ী বাঁধার জন্য “তাকভীরুল আমামাহ” বলা হয়ে থাকে। কারণ আমামা তথা পাগড়ী লম্বা কাপড়ের হয়ে থাকে এবং মাথার চারদিকে তা জড়িয়ে নিতে হয়। এই সাদৃশ্য ও সম্পর্কের কারণে সূর্য থেকে যে আলোক রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়ে সমগ্র সৌরজগতে ছড়িয়ে পড়ে তাকে পাগড়ীর সাথে তুলনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন এই বিছিয়ে থাকা পাগড়ীটি সূর্যের গায়ে জাড়িয়ে দেয়া হবে। অর্থাৎ তার আলোক বিচ্ছুরণ বন্ধ হয়ে যাবে‌।

তাফহিমুল কুরআন (এন্ড্রয়েড apk)


তাফহীমুল কুরআন তাফসীর সম্পূর্ণ। মূল- সাইয়েদ আবুল আ’লা মউদূদী (রহঃ)। ১১৪ টি সূরার তাফসীর, টীকা, আরবী আয়াত, তরজমা, নামকরন, বিষয়বস্তু, নাযিলের সময়কাল অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। ফোন বা ট্যাব যে কোন সাইজ ও ডিভাইসে সূদৃশ্য রেসপনসিভ ভিউ। সব টেক্সট ফন্ট ভিত্তিক। ইচ্ছেমত বড়-ছোট করা যাবে। ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট সরলীকৃত। ইমেজ ও ফাংশনের বাহুল্য বর্জিত। দীর্ঘ সময় অধ্যয়ন উপযোগী।

এপ্লিকেশন ক্রাশ করবে না ইনশাআল্লাহ। যে কোন পরামর্শ সাদরে গৃহীত হবে। নিয়মিত আপডেট করা হবে। ইনশা আল্লাহ।

সুরা ইউনুস (আয়াত ৬৮-৭০) : মারঈয়ামপূত্র ইশা আ: কেবল-ই আল্লাহর রাসুল ! আল্লাহ মহান ও পবিত্র !

সুরা ইউনুস (আয়াত ৬৮-৭০)

৬৮) লোকেরা বলে, আল্লাহ কাউকে পুত্র বানিয়েছেন৷ *৬৬ সুবহানাল্লাহ -তিনি মহান-পবিত্র! *৬৭ তিনি তো অভাবমুক্ত৷ আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তার মালিকানাধীন৷ *৬৮ একথার সপক্ষে তোমাদের কাছে কি প্রমাণ আছে? তোমরা কি আল্লাহর সপক্ষে এমন সব কথা বলো যা তোমাদের জানা নেই?
_____________________________________

(সূরা ইউসুফ:৮-১৮) : ইউসুফ (আ:) নবীর কুরআনিক গল্প - (পর্ব-১)



৮) এ ঘটনা এভাবে শুরু হয় : তার ভাইয়েরা পরস্পর বলাবলি করলো, “এ ইউসুফ ও তার ভাই, *৮ এরা দু’জন আমাদের বাপের কাছে আমাদের সবার চাইতে বেশী প্রিয়, অথচ আমরা একটি পূর্ণ সংঘবদ্ধ দল৷ সত্যি বলতে কি আমাদের পিতা একেবারেই বিভ্রান্ত হয়ে গেছেন৷ *৯



*৮. এখানে হযরত ইউসুফের সহোদর ভাই বিন ইয়ামীনের কথা বলা হয়েছে৷ এ ভাইটি তার থেকে কয়েক বছরের ছোট ছিল৷ তার জন্মের সময় তার মায়ের ইন্তিকাল হয়৷ এ কারণে হযর ইয়াকূব এ দু'টি মাতৃহীন সন্তানের প্রতি একটু বেশী নজর দিতেন৷ এ ছাড়াও এ স্নেহের আর একটি কারণ ছিল এই যে, তাঁর সব ছেলের মধ্যে একমাত্র হযরত ইউসুফই এমন ছিলেন যার মধ্যে তিনি সৌভাগ্য ও সত্য সঠিক পথের সন্ধান লাভের লক্ষণ দেখেছিলেন৷ হযরত ইউসুফের স্বপ্নের কথা শুনে তিনি যাকিছু বলেছিলেন ওপরে তার যে বর্ণনা এসেছে তা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, তিনি নিজের এ ছেলেটির অসাধারণ যোগ্যতা সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই জানতেন৷ অন্যদিকে সামনের দিকে যেসব ঘটনার প্রকাশ ঘটেছে তা থেকে তাঁর বাকি দশ ছেলের চারিত্রক মান সুস্পষ্ট হয়ে যায়৷ এ ক্ষেত্রে কোন সৎব্যক্তি এ ধরনের সন্তানদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন একথা কেমন করে আশা করা যেতে পারে? কিন্তু বাইবেলের বর্ণনায় অবাক হতে হয়৷ সেখানে ইউসুফের প্রতি তাঁর ভাইদের হিংসার এমন একটি কারণ বর্ণনা করা হয়েছে যার ফলে উল্টো হযরত ইউসুফই দোষী সাব্যস্ত হন৷ বাইবেলের বর্ণনা মতে হযরত ইউসুফ তাঁর পিতার কাছে ভাইদের বিরুদ্ধে চুগলখোরী করতেন৷ এ কারণে তাঁর ভাইয়েরা তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল৷



*৯. এ বাক্যটির মর্ম উপলব্ধি করার জন্য বেদুইনদের গোত্রীয় জীবনের অবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত করতে হবে৷ সেখানে কোন রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা থাকে না৷ স্বাধীন উপজাতিরা পরস্পর পাশাপাশি বসবাস করে ৷ সেখানে কোন ব্যক্তির বিপুল সংখ্যক ছেলে, নাতি-পুতি, ভাই ভাতিজা ইত্যাদির ওপর তার ক্ষমতা নির্ভর করে৷ তার ধন-প্রাণ, ইজ্জত-আবরু রক্ষার প্রয়োজনে তারা তাকে সাহায্য করে৷ এ ধরনের অবস্থায় মেয়েদের ও শিশুদের তুলনায় স্বাভাবিকভাবে জোয়ান ছেলেরাই মানুষের কাছে বেশী প্রিয় হয়৷ কারণ দুশমনের সাথে মোকাবিলায় তারা সাহায্য করতে পারে৷ এ কারণে ইউসুফের ভাইয়েরা বললো, বুড়ো বয়সে আমাদের বাপ দিশেহারা হয়েছে৷ আমাদের মতো দলবদ্ধ এ যুবক ছেলেরা, যারা খারাপ সময়ে তাঁর কাজে লাগতে পারে, তাঁর কাছে ততটা প্রিয় নয় যতোটা এ ছোট ছেলে দু'টি যারা তাঁর কোন কাজে লাগতে পারে না বরং উলটো তাদেরকেই হেফাজত করতে হবে৷



৯) চলো আমরা ইউসুফকে মেরে ফেলি অথবা তাকে কোথাও ফেলে দেই, যাতে আমাদের পিতার দৃষ্টি কেবল আমাদের দিকেই ফিরে আসে৷ এ কাজটি শেষ করে তারপর তোমরা ভালো লোক হয়ে যাবে৷ *১০



*১০. যারা নিজেদেরকে প্রবৃত্তির কামনা বাসনার হাতে সোপর্দ করে দেবার সাথে সাথে ঈমানদারী ও সততার সাথেও কিছুটা সম্পর্ক রেখে চলে এ বাক্যটির মধ্যে তাদের মানসিকতার একটি চমৎকার অভিব্যক্তি ঘটেছে৷ এ ধরনের লোকদের রীতি হচ্ছে, যখনই প্রবত্তি তাদের কাছে কোন খারাপ কাজ করার তাগিদ দেয় তখনই ঈমানের তাগিদ মুলতবি রেখে তারা প্রথমে প্রবৃত্তির তাগিদ পূর্ণ করার জন্য উঠে পড়ে লাগে৷ এ সময় বিবেক ভেতর থেকে দংশন করতে থাকলে তাকে এ বলে সান্তনা দেবার চেষ্টা করে যে, একটুখানি সময় করো, এ অনিবার্য গুনাহটি না করলে আমার কাজ আটকে থাকে, কাজেই এটা করে নিতে দাও, তারপর ইনশাআল্লাহ তাওবা করে আমি তেমনি সৎ হয়ে যাবো যেমনটি তুমি আমাকে দেখতে চাও৷





১০) এ কথায় তাদের একজন বললো, “ইউসুফকে মেরে ফেলো না৷ যদি কিছু করতেই হয় তাহলে তাকে কোন অন্ধ কুপে ফেলে দাও, আসা-যাওয়ার পথেকোন কাফেলা তাকে তুলে নিয়ে যাবে৷”



১১) (এ প্রস্তাবের ভিত্তিতে) তারা তাদের বাপকে গিয়ে বললো, “আব্বাজান৷ কি ব্যাপার, আপনি ইউসুফের ব্যাপারে আমাদের ওপর ভরসা করেন না ? অথচ আমরা তার সত্যিকার শুভাকাংখী



১২) আগামীকাল তাকে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিন, সে কিছু ফলমূল খাবে এবং দৌড়ঝাঁপ করে মন চাংগা করবে৷ আমরা তার হেফাজত করবো৷*১১



*১১. এ বর্ণনাটিও বাইবেল ও তালমূদের বর্ণনা থেকে ভিন্ন ধরনের৷ তাদের বর্ণনা হচ্ছে, ইউসুফের ভাইয়েরা তাদের পশু চরাতে সিককিমের দিকে গিয়েছিল৷ হযরত ইয়াকূব নিজেই তাদের সন্ধানে হযরত ইউসূফকে তাদের পেছনে পাঠিয়েছিলেন৷ কিন্তু একথা কল্পনাই করা যায় না যে, হযরত ইয়াকুব (আ) হযরত ইউসূফ আলাইহিস সালামের সাথে তার ভাইদের হিংসার কথা জানা সত্ত্বেও তাঁকে নিজের হাতে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবেন৷ তাই কুরআনের বর্ণনাই অধিকতর বাস্তবসম্মত বলে মনে হয়৷





১৩) বাপ বললো, “তোমরা তাকে নিয়ে যাবে, এটা আমাকে কষ্ট দেবে এবং আমরা আশংকা হয়, তোমরা তার প্রতি অমনোযোগী থাকবে এবং নেকড়ে থাকে খেয়ে ফেলবে৷”



১৪) তারা জবাব দিল, “যদি আমাদের সংঘবদ্ধ দল থাকতে তাকে নেকড়ে খেয়ে ফেলে তাহলে তো আমরা হবো বড়ই অকর্মন্য৷”



১৫) এভাবে চাপ দিয়ে যখন তারা তাকে নিয়ে গেলো এবং সিদ্ধান্ত করলো তাকে একটি অন্ধ কূপে ফেলে দেবে তখন আমি ইউসুফকে অহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিলাম, “এক সময় আসবে যখন তুমি তাদের এ কৃতকর্মের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে৷ তাদের কাজের ফলাফল সম্পর্কে তারা জানে না৷”*১২



*১২. মূল ইবারতে (আরবী) বাক্য এমনভাবে এসেছে যার ফলে তার তিনটি অর্থ হয় এবং তিনটি অর্থই এখানে মানানসই বলে মনে হয়৷ একটি অর্থ হচ্ছে, আমি ইউসুফকে এ সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম এবং তার ভাইয়েরা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ বেখবর ছিল যে, তাকে অহীর মাধ্যমে সবকিছু জানানো হচ্ছে৷ দ্বিতীয়টি হচ্ছে, তুমি এমন অবস্তায় তাদের এ কর্ম সম্পর্কে তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেবে যেখানে তোমার অবস্থানের ব্যাপারটি তারা কল্পনাও করতে পারবে না৷ তৃতীয় অর্থটি হচ্ছে, আজ এরা না জেনে বুঝে একটি কাজ করছে এবং ভবিষ্যতে এ ফলাফল কি হবে তা এরা জানে না৷



এ সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে ইউসুফ আলাইহি সালামকে যে কি সান্ত্বনা দেয়া হয়েছিল বাইবেল ও তালমূদে এর কোন উল্লেখ নেই৷ বিপরীত পক্ষে তালমূদে যে বর্ণনা এসেছে তা হচ্ছে এই যে, ইউসুফকে যখন কূপে ফেলে দেয়া হলো তখন তিনি জোরে জোরে কাঁদতে থাকলেন এবং চিৎকার করে ভাইদের কাছে ফরিয়াদ করলেন৷ কুরআনের বর্ণনা পড়লে মনে হবে এমন এক যুবকের কথা বলা হচ্ছে যিনি আগামীতে ইতিহাসের মহান ব্যক্তিদের অন্তরভুক্ত হবেন৷ অন্যদিকে তালমূদ পড়লে যে ছবিটা চোখের সামনে ভেসে উঠবে তা হচ্ছে এই যে, জনমানবশূন্য বিয়াবনে কয়েকজন বদ্দু একটি বালককে কূপের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে এবং এ সময় একজন সাধারণ বালক যা করে সে-ও তাই করছে৷



১৬) রাতে তারা কাঁদতে কাঁদতে তাদের বাপের কাছে আসলো



১৭) বললো, “আব্বাজান! আমরা দৌঁড় প্রতিযোগিতা করছিলাম এবং ইউসুফকে আমাদের জিনিসপত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম, ইতিমধ্যে নেকড়েবাঘ এসে তাকে খেয়ে ফেলেছে৷ আপনি তো আমাদের কথা বিশ্বাস করবেন না, যদিও আমরা সত্যবাদী৷”



১৮) তারা ইউসূফের জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে নিয়ে এসেছিল৷ একথা শুনে তাদের বাপ বললো, “বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি বড় কাজকে সহজ করে দিয়েছে৷ ঠিক আছে, আমি সবর করবো এবং খুব ভালো করেই সবর করবো৷ *১৩ তোমরা যে কথা সাজাচ্ছো তার ওপর একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাওয়া যেতে পারে৷”*১৪



*১৩. কুরআনের ইবারতে (আরবী) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ এর শাব্দিক অনুবাদ "ভালো সবর" হতে পারে৷ এর অর্থ হয় এমন সবর যার মধ্যে অভিযোগ, ফরিয়াদ, ভয়-ভীতি ও কান্নাকাটি নেই৷ একজন উচ্চ ও প্রসস্ত হৃদয়বত্তার অধিকারী মানুষের ওপর যে বিপদ আসে তাকে ধীর স্থির চিত্তে বরদাশত করে যাওয়াই এ সবরের প্রকৃতি৷



*১৪. বাইবেল ও তালমূদ এখানে হযরত ইয়াকূবের প্রতিক্রিয়ার এমন ছবি এঁকেছে যা যে কোন সাধারণ বাপের প্রতিক্রিয়া থেকে কোন অংশেই ভিন্নতর নয়৷ বাইবেলের বর্ণনা হচ্ছে, "তখন ইয়াকূব নিজের জামা ফেড়ে ফেলেন, নিজের কোমরের সাথে চট জড়িয়ে নেন এবং বহুদিন পর্যন্ত ছেলের জন্য মাতম করতে থাকেন৷" তালমূদে বলা হয়েছে, "ইয়াকূব ছেলের জামা চিনতে পেরেই উপড়ে হয়ে মাটিতে পড়ে যান এবং দীর্ঘক্ষণ নিথর-নিস্পন্দ হয়ে পড়ে থাকেন৷ তারপর উঠে বিকট জোরে চিৎকার দিয়ে বলেন, হাঁ এ আমার ছেলের জামা৷ এরপর তিনি বছরের পর বছর ধরে ইউসুফের জন্য মাতম করতে থাকেন৷" এ বর্ণনায় হযরত ইয়াকূবকে ঠিক তেমনিটি করতে দেখা যাচ্ছে যেমনটি এ অবস্থায় প্রত্যেক বাপ করে থাকে৷ কিন্তু কুরআন এর যে বর্ণনা দিয়েছে তা আমাদের সামনে একটি অসাধারণ ব্যক্তিত্বের ছবি তুলে ধরেছে৷ এ ব্যক্তি আপাদমস্তক ধৈর্য ও সহিষ্ণুতর প্রতিমূর্তি৷ এতবড় শোকাবহ ও হৃদয়বিদারক খবর শুনেও তিনি নিজের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন না৷ প্রখর বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পরিস্থিতির সঠিক চেহারা অনুমান করতে পারছেন৷ তিনি বুঝতে পারেন এটা একটা বানোয়াট কথা ৷ তাঁর হিংসুটে ছেলেরা ঘটনাটা সাজিয়ে তাঁর সামনে পেশ করেছে৷ তারপর বিশাল হৃদয় ব্যক্তিদের মতো তিনি সবর করেন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করেন৷

লিঙ্ক

(সূরা ইউসুফ:১-৭) : ইউসুফ ও তার ভাইদের ঘটনার মধ্যে অনেক বড় বড় নিদর্শন রয়েছে

১) আলিফ-লাম-র৷ এগুলো এমন কিতাবের আয়াত যা নিজের বক্তব্য পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে৷



২) আমি একে আরবী ভাষায় কুরআন বানিয়ে নাযিল করেছি, *১ যাতে তোমরা (আরববাসীরা) একে ভালোভাবে বুঝতে পারো৷ *২


*১. (আরবী) হচ্ছে (আরবী) ক্রিয়াপদের শব্দমূল৷ এর আসল মানে হচ্ছে 'পড়া', শব্দমূলকে যখন কোন জিনিসের জন্য নাম হিসেবে ব্যবহার করা হয় তখন তার অর্থ হয় সংশ্লিষ্ট জিনিসটির মধ্যে তার শব্দমূলের অর্থ পুরোপুরি পাওয়া যায়৷ যেমন যখন কোন ব্যক্তিকে বীর বলার পরিবর্তে 'বীরত্ব' বলা হবে যখন তার মানে হবে, তার মধ্যে সাহসিকতা ও বীর্যবত্তা এমন পূর্ণাংগ পর্যায়ে পাওয়া যায় যেন সে এবং বীরত্ব একই জিনিস হয়ে গেছে৷ কাজেই এ কিতাবের নাম 'কুরআন' (পড়া) রাখার অর্থ হচ্ছে এই যে, এ কিতাব সাধারণ ও অসাধারণ নির্বিশেষে সকলের পড়ার জন্য এবং খুব বেশী বেশী করে পঠিত হবার জিনিস৷

*২. এর মানে এ নয় যে, এ কিতাবটি বিশেষভাবে আরববাসীদের জন্য নাযিল করা হয়েছে৷ বরং এ বাক্যাংশটির আসল বক্তব্য হচ্ছে, "হে আরববাসীরা! এসব কথা তোমাদের ইরানী ও গ্রীক ভাষায় শুনানো হচ্ছে না, তোমাদের নিজেদেরই ভাষায় শুনানো হচ্ছে৷ কাজেই তোমরা এ ওজর পেশ করতে পারো না যে, এসব কথা তো আমরা বুঝতে পারছি না৷ আর এ কিতাবে অলৌকিকতার যে দিকগুলো রয়েছে, যা এর আল্লাহর বাণী হওয়ার সাক্ষ দিচ্ছে, সেগুলোও যে তোমাদের দৃষ্টির আগোচরে থেকে যাবে, এটাও সম্ভব নয়৷" কেউ কেউ কুরআন মজীদে এ ধরনের বাক্য দেখে আপত্তি করে থাকেন যে, এ কিতাব তো আরববাসীদের জন্য নাযিল হয়েছে, অনারবদের জন্য নয়৷ এ ক্ষেত্রে একে সমগ্র মানব জাতির জন্য হেদায়াত কেমন করে বলা যেতে পারে? কিন্তু এটি নিছক একটি হালকা ও ফাঁকা আপত্তি ছাড়া আর কিছুই নয়৷ আসল সত্য উপলব্ধি করার চেষ্টা না করেই এ আপত্তি উত্থাপন করা হয়৷ মানব জাতির ব্যাপক ও সার্বজনীন হেদায়াতের জন্য যে জিনিসই পেশ করা হবে তা অবশ্যি মানব সমাজে প্রচলিত ভাষাগুলোর যে কোন একটিতেই পেশ করা হবে৷ এ হেদায়াত পেশকারী এটিকে যে জাতির ভাষায় পেশ করছেন প্রথমে তাকে এর শিক্ষাবলী দ্বারা পুরোপুরি প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন৷ তারপর এ জাতিই অন্যান্য জাতির কাছে এর শিক্ষা পৌঁছাবার মাধ্যমে পরিণত হবে৷ কোন দাওয়াত ও আন্দোলনকে আন্তরজাতিক পর্যায়ে সম্প্রসারিত করার জন্য এটিই একটি বাস্তব ও স্বাভাবিক পদ্ধতি৷


৩) হে মুহাম্মদ! আমি এ কুরআনকে তোমার কাছে অহীর মাধ্যমে পাঠিয়ে উত্তম পদ্ধতিতে ঘটনাবলী ও তত্ত্বকথা তোমার কাছে বর্ণনা করছি৷ নয়তো ইতিপূর্বে তুমি (এসব জিনিস থেকে) একেবারেই বেখবর ছিলে৷*৩


*৩.সূরার ভূমিকায় আমি একথা বর্ণনা করে এসেছি যে, মক্কার কাফেরদের কোন কোন লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পরীক্ষা করার বরং তাদের মতে তাঁর মুখোশ খুলে দেবার জন্য সম্ভবত ইহুদীদের ইংগিতে তাঁকে হঠাৎ এ প্রশ্ন করে বসেছিল যে, বনী ইসরাঈলদে মিসরে চলে যাওয়ার কারণ কি ছিল? এ কারণে তাদের প্রশ্নের জবাবে বনী ইসরাঈলদের ইতিহাসের এ অধ্যায় বর্ণনা করার আগে ভূমিকা স্বরূপ একথা বলে দেয়া হলো৷ হে মুহাম্মাদ! তুমি এসব ঘটনা জানতে না, আমি অহির মাধ্যমে তোমাকে তাদের কথা জানাচ্ছি৷ আপাতদৃষ্টে এ বাক্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে কিন্তু আসলে এখানে এমন সব বিরোধীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখা হয়েছে যারা অহীর মাধ্যমে নবী (সা) যে সঠিক জ্ঞান লাভ করেন একথা বিশ্বাস করতো না৷


৪) এটা সেই সময়ের কথা, যখন ইউসুফ তার বাপকে বললো : "আব্বাজান! আমি স্বপ্ন দেখেছি, এগারটি তারকা এবং সূর্য ও চাঁদ আমাকে সিজদা করছে৷"


৫) জবাবে তার বাপ বললো : "হে পুত্র! তোমার এ স্বপ্ন তোমার ভাইদেরকে শুনাবে না ; শুনালে তারা তোমার ক্ষতি করার জন্য পেছনে লাগবে৷ *৪ আসলে শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু


*৪. এখানে হযরত ইউসুফের (আ) দশজন বৈমাত্রেয় ভাইয়ের কথা বলা হয়েছে৷ হযরত ইয়াকূব (আ) জানতেন এ বৈমাত্রেয় ভাইয়েরা ইউসুফকে (আ) হিংসা করে৷ নৈতিক দিক দিয়েও তারা এমন পর্যায়ের সচ্চরিত্র ছিল না যে, নিজেদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার জন্য কোন অবৈধ কাজ করতে কুন্ঠিত হবে৷ তাই তিনি নিজের সদাচারী পুত্রকে বলে দিলেন, তাদের থেকে সাবধান থেকো৷ স্বপ্নের পরিষ্কার অর্থ ছিল এইঃ সূর্য মানে হযরত ইয়াকূব (আ), চাঁদ মানে তাঁর স্ত্রী (হযরত ইউসূফের বিমাতা) এবং এগারটি তারকা মানে এগারটি ভাই৷

৬) এবং ঠিক এমনটিই হবে (যেমনটি তুমি স্বপ্নে দেখেছো যে,) তোমার রব তোমাকে (তাঁর কাজের জন্য) নির্বাচিত *৫ করবেন এবং তোমাকে কথার মর্মমূলে পৌঁছানো শেখাবেন *৬ আর তোমার প্রতি ও ইয়াকূবের পরিবারের প্রতি তাঁর নিয়ামত ঠিক তেমনিভাবে পূর্ণ করবেন যেমন এর আগে তিনি তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের প্রতি করেছেন৷ নিসন্দেহে তোমার রব সর্বজ্ঞ ও বিজ্ঞানময়৷"*৭


*৫. অর্থাৎ নবুওয়াত দান করবেন৷

*৬. (আরবী) মানে নিছক স্বপ্নের তাবীরের জ্ঞান নয়, যেমন মনে করা হয়ে থাকে৷ বরং এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তোমাকে সমস্যা ও পরিস্থিতি অনুধাবন করার এবং সত্য পর্যন্ত পৌঁছুবার জ্ঞান দান করবেন৷ আর এ সংগে এমন গভীর অন্তরদৃষ্টি দান করবেন যার মাধ্যমে তুমি প্রত্যেকটি বিষয়ের গভীর নামার এবং তার তলদেশে পৌঁছে যাবার যোগ্যতা অর্জন করবে৷

*৭. বাইবেল ও তালমূদের বর্ণনা কুরআনের এ বর্ণনা থেকে ভিন্নতর৷ তাদের বর্ণনা হচ্ছে, হযরত ইয়াকূব স্বপ্নের বর্ণনা শুনে ছেলেকে খুব ধমক দেন এবং তাকে বলেনঃ "আচ্ছা, এখন তাহলে এ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছো যে, আমি, তোমার মা ও তোমার সব ভাইয়েরা তোমাকে সিজদা করবো৷" কিন্তু একটু চিন্তা করলে সহজেই একথা উপলব্ধি করা যেতে পারে যে, বাইবেল ও তালমূদের বর্ণনা নয় বরং কুরআনের বর্ণনাটিই হযরত ইয়াকূবের নবীসুলভ চরিত্রের সাথে অধিক সামঞ্জস্যশীল৷ হযরত ইউসুফ নিজের স্বপ্ন বর্ণনা করেছিলেন, নিজের আকাংখা ও অভিলাষ ব্যক্ত করেননি৷ স্বপ্ন যদি সত্য হয়ে থাকে এবং বলা বাহুল্য যে, হযরত ইয়াকূব তার যে তাবীর করেছিলেন তা সত্য স্বপ্ন মনে করেই করেছিলেন, তাহলে এ পরিষ্কার অর্থ ছিল, এটা ইউসূফ আলাইহিস সালামের আকাংখা ছিল না বরং আল্লাহর তকদীরের ফায়সালা ছিল যে, এক সময় তিনি উন্নতির এহেন উচ্চ শিখরে আরোহণ করবেন৷ এ ক্ষেত্রে একজন নবী তো দূরের কথা একজন বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিও কি এরূপ আচরণ করতে পারেন? এ ধরনের কথায় কি তিনি অসস্তুষ্ট হতে এবং যে স্বপ্ন দেখেছে উলটো তাকে ধমক দিতে পারেন? কোন ভদ্র পিতাও কি এমন হতে পারেন যে, নিজের পুত্রের ভবিষ্যত উন্নতির সুখবর শুনে খুশী হবার পরিবর্তে তিনি উলটো বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট হবেন?

৭)

আসলে ইউসুফ ও তার ভাইদের ঘটনার মধ্যে এ প্রশ্নকারীদের জন্য বড় বড় নিদর্শন রয়েছে৷

 

-তাফহিম-ফেসবুক

(সূরা ইউসুফ:শানে-নুজুল): চারিত্রিক পবিত্রতা ও দৃঢ়তা - রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাষ্ট্রপরিচালনা - মহত্ত্ব -ঔদার্য : নাটকীয় এক সূরা !


নাযিল হওয়ার সময়-কাল ও এর কারণসমূহ
 এ সূরার বিষয়বস্তু থেকে একথা বুঝা যাচ্ছে যে, এটিও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কায় অবস্থানের শেষ যুগে নাযিল হয়ে থাকবে। তখন কুরাইশের লোকেরা নবীকে (সা) হত্যা বা দেশান্তর করবে, না বন্দী করবে, এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিল। এ সময় মক্কার কাফের সমাজের কোন কোন লোক (সম্ভবত ইহুদীদের ইংগিত) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পরীক্ষা করার জন্য তাঁকে প্রশ্ন করে, বনী ইসরাঈলরা কি কারণে মিসরে চলে গিয়েছিল? যেহেতু আরববাসীরা এ ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানতো না, তাদের কথা-কাহিনী ও পৌরানিক বৃত্তান্তসমূহে কোথাও এর কোন উল্লেখই পাওয়া যেতো না এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের মুখেও ইতিপূর্বে এ সম্পর্কিত কোন কথা শোনা যায়নি, তাই তারা আশা করছিল, তিনি এর কোন বিস্তারিত জবাব দিতে পারবেন না অথবা এ সময় টালবাহানা করে কোন ইহুদীকে জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করবেন এবং এভাবে তাঁর বুজরুকি ধরা পড়ে যাবে। কিন্তু এ পরীক্ষায় উলটো তারাই মার খেয়ে গেলো। আল্লাহ কেবল সংগে সংগেই ইউসুফ আলাইহি সালামের এ ঘটনা সম্পূর্ণ তাঁর মুখ দিয়ে শুনিয়েই ক্ষান্ত হলেন না বরং এ ঘটনাকে কুরইশরা ইউসুফের ভাইদের মতো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে যে ব্যবহার করছিল ঠিক তার সদৃশ ঘটনা হিসেবে উপস্থাপিত করলেন।


নাযিলের উদ্দেশ্য

একঃ এর মাধ্যমে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের প্রমাণ এবং তাও আবার বিরোধীদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা। এ সংগে তাদের স্থিরীকৃত পরীক্ষায় একথা প্রমাণ করে দেয়া যে, নবী শোনা কথা বলেন না বরং অহীর মাধ্যমে যথার্থ জ্ঞান লাভ করেন। ৩ ও ৭ আয়াতে এ উদ্দেশ্যটি সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে এবং ১০২ ও ১০৩ আয়াতে পূর্ণ শক্তিতে এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

দুইঃ কুরাইশ সরদারদের ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে এ সময় যে দ্বন্দ্ব চলছিল তার ওপর ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদের ঘটনা প্রয়োগ করে কুরাইশদেরকে একথা জানিয়ে দেয়া যে, আজ তোমরা নিজেদের ভাইয়ের সাথে ঠিক তেমনি আচরণ করছো যেমন ইউসূফের ভাইয়েরা তাঁর সাথে করেছিলেন। কিন্তু যেমন তারা আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে লড়াই করে সফল হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত যাকে চরম নির্দয়ভাবে কূয়ার মধ্যে ফেলে দিয়েছিলো সেই ভায়ের পদতলেই নিজেদের সঁপে দিতে হয়েছিল। ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহর কৌশল ও ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে তোমাদের শক্তি প্রয়োগ সফল হতে পারবে না। একদিন তোমাদেরও নিজেদের এ ভাইয়ের কাছে দয়া ও অনুগ্রহ ভিক্ষা করতে হবে, যাকে আজ তোমরা খতম করে দেবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছো। সূরার শুরুতে এ উদ্দেশ্যটিও পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছেঃ

"ইউসুফ ও তার ভাইদর ঘটনার মধ্যে এ প্রশ্নকারীদের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে।"

আসলে ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনাকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কুরাইশদের দ্বন্দের ওপর প্রয়োগ করে কুরআন মজীদ যেন একটি স্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল। পরবর্তীকালের ঘটনাবলী তাকে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণ করেছে। এ সূরাটি নাযিল হওয়ার দেড় দু'বছর পরই কুরাইশরা ইউসুফের ভাইদের মতো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। তাদের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাবার জন্য তাঁকে বাধ্য হয়ে মক্কা থেকে বের হতে হয়। তারপর তাদের প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধেই দেশান্তরী অবস্থায়ই তিনি ঠিক তেমনি উন্নতি ও কর্তৃত্ব লাভ করেন যেমন ইউসুফ আলাইহিস সালাম করেছিলেন। তারপর মক্কা বিজয়ের সময় ঠিক সেই একই ঘটনা ঘটেছিল যা মিসরের রাজধানীতে ইউসুফ আলাইহিস সালামের সামনে তাঁর ভাইদের শেষ উপস্থিতির সময় ঘটেছিল। সেখানে যখন ইউসুফের ভাইয়েরা চরম অসহায় ও দীন হীন অবস্থায় তাঁর সমনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে বলছিলেনঃ

"আমাদের প্রতি সাদকা করুন। আল্লাহ সাদকাকারীদেরকে উত্তম পুরস্কার দিয়ে থাকেন।"

তখন ইউসুফ আলাইহিস সালাম প্রতিশোধ নেবার শক্তি রাখা সত্ত্বেও তাদেরকে মাফ করে দিলেন এবং বললেনঃ

"আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের মাফ করে দিন। তিনি সকল অনুগ্রহকারীর চাইতে বড় অনুগ্রহকারী।"
অনুরূপভাবে এখানে যখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে পরাজিত বিধ্বস্ত কুরাইশরা মাথা নত করে দাঁড়িয়েছিল এবং তিনি তাদের প্রত্যেকটি জুলুমের বদলা নেবার ক্ষমতা রাখতেন তখন তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ "তোমরা কি মনে করো, আমি তোমাদের সাথে কেমন ব্যবহার করবো?" তারা জবাব দিলঃ "আপনি একজন উদারচেতা ভাই এবং একজন উদারচেতা ভাইয়ের সন্তান।" একথায় তিনি বললেনঃ

"আমি তোমাদের সেই একই জবাব দিচ্ছি যে জবাব ইউসুফ তার ভাইদেরকে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। যাও তোমাদের মাফ করে দিলাম।"

বিষয়বস্তু ও আলোচ্য বিষয়

এ দু'টি বিষয় তো এ সূরা উদ্দেশ্যের পর্যায়ভুক্ত। কিন্তু এ কাহিনীটিকেও কুরআন মজীদ নিছক গল্প বলার ও ইহিতাস লেখার ঢংয়ে বর্ণনা করছে না বরং নিজের রীতি অনুসারে তাকে মূল দাওয়াত প্রচারে ব্যবহার করছে। এ পুরো ঘটনাটিতে সে একথা সুস্পস্ট করে তুলে ধরছে যে, হযরত ইবরাহীম (আ) হযরত ইসহাক (আ), হযরত ইয়াকুব (আ) সেই একই দীনের অনুসারী ছিলেন যে দীনের অনুসারী ছিলেন হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং যে দাওয়াত তিনি দিচ্ছেন সেই একই দাওয়াত তাঁরাও দিতেন।

তাছাড়া সে একদিকে হযরত ইয়াকুব ও হযরত ইউসুফের কর্মকাণ্ড ও চরিত্র এবং অন্যদিকে ইউসুফের ভ্রাতৃবৃন্দ, বণিক দল, আযীযে মিসর, তার স্ত্রী, মিসরের অভিজাত পরিবারের নারী সমাজ ও শাসকদের কর্মকাণ্ড ও চরিত্র পরম্পদের মোকাবিলায় তুলে ধরছে এবং নিছক নিজের বর্ণনাভংগীর মাধ্যমে শ্রোতা ও পাঠকদের সামনে এ নীরব প্রশ্ন উপস্থাপন করছে যে, দেখো, একদিকে ইসলাম একটি আদর্শ চরিত্র পেশ করছে। আল্লাহর বন্দেগী ও আখেরাতে জবাবদিহির প্রতি বিশ্বাসের ভিত্তিতেই এ চরিত্র গড়ে উঠে। আবার অন্যদিকে রয়েছে আর একটি চরিত্র। কুফরী, জাহেলিয়াত, বৈষয়িক স্বার্থপূজা ও আখেরাতের সাথে সম্পর্কহীনতার ছাঁচে ঢালাই হয়ে এ চরিত্র তৈরী হয়। এখন তোমরা নিজেদের বিবেককে জিজ্ঞেস করো, সে এর মধ্য থেকে কোন চারিত্রিক আদর্শটি পছন্দ করে?

তারপর এ ঘটনা থেকে কুরআন মজীদ আরো একটি গভীর তত্ত্বও মানুষের হৃদয়পটে অংকন করে দেয়। সেটি হচ্ছে, আল্লাহ যে কাজ করতে চান তা যে কোন অবস্থায় সম্পাদিত হয়েই যায়। মানুষ নিজের বুদ্ধিমত্তা ও কলাকৌশলের মাধ্যমে তাঁর পরিকল্পনা প্রতিহত করার বা বদলাবার ব্যাপারে কখনো সফল হতে পারে না। বরং অনেক সময় মানুষ নিজের পরিকল্পনার লক্ষে একটি কাজ করে এবং মনে করতে থাকে যে, সে তীরটি ঠিক নিশানায় মেরে দিয়েছে কিন্তু শেষে প্রমাণ হয় যে, আল্লাহ তারই হাত দিয়ে এমন কাজ করিয়ে নিয়েছেন যা ছিল তার নিজের পরিকল্পনার বিরোধী এবং আল্লাহর পরিকল্পনার পুরোপুরি বাস্তবায়ন। ইউসুফ আলাইহি সালামের ভাইয়েরা যখন তাঁকে কূয়ায় ফেলে দিচ্ছিল তখন তারা মনে করছিলো আমরা নিজেদের পথের কাঁটা চিরতরে দূর করে দিচ্ছি।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা ইউসুফকে নিজেদের হাতে এমন এক উন্নতির প্রথম ধাপে চড়িয়ে দিয়েছিলো যার ওপর আল্লাহ তাঁকে চড়াতে চাচ্ছিলেন এবং এ কাজ করে তারা নিজেরা যে ফল লাভ করেছে তা এ ছাড়া আর কিছু‌ নয় যে, ইউসুফের উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছে যাবার পর তারা নিজের ভাইয়ের সাথে সসম্মানে সাক্ষাত করতে যাওয়ার পরিবর্তে লজ্জা ও অনুতাপের অনুভূতি সহকারে মাথা নত করে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। আযীযে মিসরের স্ত্রী ইউসুফকে কারাগারে পাঠিয়ে মনে করছিল সে প্রতিশোধ নিচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে তার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পৌঁছার পথ পরিষ্কার করেছিল। আর নিজের এ কৌশলের মাধ্যমে সে নিজের জন্য এর চেয়ে বেশী কিছু অর্জন করতে পারেনি যে, যথার্থ কাজের সময়ে দেশের শাসকের স্ত্রী হিসেবে 'মুরব্বী'র সম্মান লাভ করার পরিবর্তে তাকে নিজের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য লজ্জায় অধোবদন হতে হয়। এসব নিছক দু'চারটে বিছিন্ন ঘটনা নয়। বরং ইতিহাসের পাতা এমনি ধরনের অসংখ্য ঘটনায় ভরা। এগুলো এ সত্যটিরই সাক্ষ প্রদান করে যে, আল্লাহ যাকে ওপরে উঠাতে চান সারা দুনিয়ার লোকেরা মিলেও তাকে নিচে ফেলে দিতে পারে না। বরং দুনিয়ার লোকেরা তাকে নিচে ফেলে দেয়ার জন্য যে কৌশলটি অত্যন্ত কার্যকর ও নিশ্চিত মনে করে অবলম্বন করে সেই কৌশলের মধ্য দিয়েই আল্লাহ তার ওপরে ওঠার পথ বের করে দেন এবং যারা তাকে নামাতে চেয়েছিল তাদের জন্য লাঞ্ছনা ও অপমান ছাড়া আর কিছুই থাকে না। অনুরূপভাবে এর ঠিক বিপরীতে আল্লাহ যাকে ভূপাতিত করতে চান কোন কৌশলই তাকে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারে না। বরং দাঁড় করিয়ে রাখার যাবতীয় কার্যক্রম ও কৌশল উলটে যায় এবং এ ধরনের কৌশল অবলম্বনকারীকে ব্যর্থ মনোরথ হতে হয়।

যে ব্যক্তি এ সত্যটি উপলব্ধি করবে সে প্রথমে এ শিক্ষা লাভ করবে যে, মানুষকে নিজের উদ্দেশ্য ও কলাকৌশল উভয় ক্ষেত্রে এমন সব সীমারেখা অতিক্রম করা উচিত নয় যা আল্লাহর আইনে তার জন্য নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে। সাফল্য ও ব্যর্থতা অবশ্যি আল্লাহর হাতে। কিন্তু যে ব্যক্তি পবিত্র উদ্দেশ্যে সরল সোজা ও বৈধ কলাকৌশল অবলম্বন করবে সে ব্যর্থ হয়ে গেলেও তাকে লাঞ্ছনা ও অপমানের সম্মুখীন হতে হবে না। আর যে ব্যক্তি অপবিত্র উদ্দেশ্যে বাঁকা কলাকৌশল অবলম্বন করবে সে আখেরাতে তো অবশ্যি অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবেই, দুনিয়াতেও তার জন্য অপমান ও লাঞ্ছনার ভয় কিছু কম নেই। দ্বিতীয়ত সে এ থেকে লাভ করবে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল এবং তাঁর প্রতি আত্মসমর্পিত হবার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। যারা সত্য ও সততার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং দুনিয়াবাসীরা তাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে তারা যদি এ সত্যটি সামনে রাখে তাহলে এ থেকে তারা দুর্লভ মানসিক প্রশান্তি লাভ করবে এবং বিরোধী শক্তিবর্গের বাহ্যত অত্যন্ত ভয়াবহ কলাকৌশলসমূহ দেখে তারা মোটেই ভীত হবে না। বরং ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে নিজেদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করে যেতে থাকবে।

কিন্তু এ ঘটনাটি থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষটি পাওয়া যায় সেটি হচ্ছে এই যে, একজন মরদে মুমিন যদি সত্যিকার ইসলামী চরিত্রের অধিকারী হয় এবং সে বিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার গুণেও গুণান্বিত হয় তাহলে নিছক নিজের চরিত্র বলে সে সারা দেশ জয় করতে পারে। ইউসুফ আলাইহিস সালামের ব্যাপারটি দেখুন। ১৭ বছর বয়সে একাকী সহায় সম্বলহীন অবস্থায় বিদেশ বিভূঁইয়ে তিনি একেবারেই অপরিচিত পরিবেশে, অধিকন্তু চরম দুর্বল অবস্থায় নিপতিত। কারণ তাঁকে গোলাম বানিয়ে বিক্রি করা হয়। ইতিহাসের সেই অধ্যায়ে গোলামদের যে অবস্থা ছিল তা কারো অজানা নেই। এর ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘা স্বরূপ একটি মারাত্মক নৈতিক অপরাধে অভিযুক্ত করে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। এখানে শাস্তির কোন মেয়াদ নির্ধারিত হয়নি। এভাবে তাঁকে একেবারে চরম পর্যায়ে নামিয়ে দেবার পরও তিনি নিছক নিজের ঈমান ও চরিত্র বলে উঠে দাঁড়ান এবং শেষ পর্যন্ত সারা দেশের ওপর বিজয়ী হন।

ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক অবস্থা

এ ঘটনাটি সঠিকভাবে বুঝাতে হলে এ সম্পর্কে কিছু সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক তথ্য পাঠকদের সামনে থাকা উচিত।হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম ছিলেন হযরত ইয়াকূবের (আ) পুত্র, হযরত ইসহাকের পৌত্র এবং হরত ইবরাহীমের প্রপৌত্র। বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী (কুরাআনের ইংগিত থেকে এর সমর্থন পাওয়া যায়) হযরত ইয়াকূবের চার স্ত্রী থেকে ছিল বারটি ছেলে। হযরত ইউসুফ (আ) ও বিন ইয়ামীন ছিলেন এক স্ত্রীরর গর্ভজাত এবং বাকি দশজন অন্য স্ত্রীদের গর্ভজাত।

ফিলিস্তিনে হযরত ইয়াকূবের আবার ছিল হিবরূন (বর্তমান আল খাইল) উপত্যকায়। এখানে হযরত ইসহাক (আ) এবং তাঁর পূর্বে হযরত ইবরাহীমও (আ) থাকতেন। এ ছাড়া সিককিমে (বর্তমানে নাবলুস) হযরত ইয়াকূবের (আ) কিছু জমি ছিল।

বাইবেল বিশারদগণের গবেষণাকে সঠিক বলে ধরে নিলে হযরত ইউসুফের জন্ম খৃষ্টপূর্ব ১৯০৬ সালের কাছাকাছি সময়ে হয় বলে ধরা যায়। এ হিসেবে খৃষ্টপূর্ব ১৮৯০ সালের কাছাকাছি সময়ে যে ঘটনাটি ঘটে অর্থাৎ স্বপ্ন দেখা এবং কূয়ায় নিক্ষিপ্ত হওয়া, এ থেকে এ ঘটনাটির সূত্রপাত্র হয়। এ সময় হযরত ইউসুফের বয়স ছিল ১৭ বছর। যে কূয়ায় তাঁকে ফেলে দেয়া হয় সেটি বাইবেল ও তালমূদের ভাষ্যমতে সিককিমের উত্তর দিকে দূতান (বর্তমানে দূসান) নামক স্থানে কাছাকাছি অবস্থিত ছিল। আর যে কাফেলাটি তাঁকে কূয়া থেকে উদ্ধার করে তারা জাল'আদ (পূর্ব জর্দান) থেকে আসছিল এবং মিসরের দিকে যাচ্ছিল। (জাল'আদের ধ্বংসাবশেষ আজো জর্দান নদীর পূর্ব দিকে ইলিয়াবিস উপত্যকার কিনারে পাওয়া যায়।

এ সময় মিসরে পঞ্চদশতম রাজ পরিবারের শাসন চলছিল। মিসরের ইতিহাসে এ পরিবারটি রাখাল রাজন্যবর্গ (HYKSOS KINGS) নামে পরিচিত। এরা ছিল আরবীয় বংশজাত। খৃষ্টপূর্ব দু'হাজার বছরের কাছাকাছি সময়ে এরা ফিলিস্তিন ও সিরিয়া থেকে মিসরে গিয়ে দেশের শাসন কর্তৃত্ব দখল করেছিল। আরব ঐতিহাসিক ও কুরআনের তাফসীরকারগণ তাদের জন্য "আমালীক" নাম ব্যবহার করেছেন। মিসর সম্পর্কীয় আধুনিক অনুসন্ধান ও গবেষণার সাথে এটি পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। মিসরে এরা বিদেশী হানাদারের পর্যায়ভুক্ত ছিল এবং দেশে গৃহবিবাদের কারণে তারা যেখানে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল। এ কারণে তাদের রাজত্বে হযরত ইউসুফের (আ) উত্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল এবং তারা বনী ইসরাঈলকে সাদরে গ্রহণ করেছিল। দেশের

হযরত ইউসুফ (আ)-এর কাহিনী সংক্রান্ত মানচিত্র

মানচিত্র (অনলাইন ভার্সনে পাওয়া যাবেনা আপাতত)

দুতনঃ বাইবেলের মতে এ স্থানেই হযরত ইউসুফ কূপে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল।
সিক্কিমঃ এখানে হযরত ইয়াকূবের পৈতৃক সম্পত্তি ছিল। বর্তমানে এর নাম নাবলূস।
হিবরুনঃ এখানে হযরত ইয়াকূব বসবাস করতেন। এর আর এক নাম 'আল-খলীল।'
জুশানঃ হযরত ইউসুফ এখানে বনী ইরাঈলদেরকে পুনর্বাসিত করেন।
সবচেয়ে উর্বর এলাকা তাদের বসতি স্থাপন করার জন্য দেয়া হয়েছিল। সেখানে তারা বিপুল প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী হয়েছিল। কারণ তারা ছিল বিদেশী শাসকদের সগোত্রীয়। খৃষ্টপূর্ব পঞ্চদশ শতকের শেষ অবধি তারা মিসর শাসন করতে থাকে। তাদের আমলে কার্যত দেশের যাবতীয় কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বনী ইসরাঈলের হাতে ন্যস্ত থাকে। সূরা ময়েদার ২০ আয়াতে এ যুগের প্রতি ইংগিত করে বলা হয়েছেঃ


এরপর দেশে একটি প্রবল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সৃষ্টি হয়। এর ফলে হিক্‌সুস (HYKSOS) শাসনের অবসান ঘটে। আড়াই লাখের মতো আমালিকাকে দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়। একটি চরম বিদ্বেষী কিব্‌তী বংশোদ্ভূত পরিবার দেশের শাসন কর্তৃত্ব দখল করে। তারা আমালিকাদের আমলের প্রত্যেকটি স্মৃতি চিহ্ন খুঁজে খুঁজে বের করে এনে ধ্বংস করে দেয় এবং হযরত মূসার (আ) ঘটনা প্রসংগে বনী ইসরাঈলদের প্রতি যেসব অত্যাচারের কাহিনী উল্লেখিত হয়েছে তার ধারাবাহিকতার সূত্রপাত করে।

মিসরের ইতিহাস থেকে একথাও জানা যায় যে, এ রাখাল বাদশাহরা মিসরীয় দেবতাদেরকে স্বীকৃতি দেয়নি। তারা সিরিয়া থেকে নিজেদের দেবতা সংগে করে এসেছিল। মিসরে নিজেদের ধর্মের প্রসারে তারা প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। এ করণে কুরআন মজীদ হযরত ইসুফের সমকালীন মিসর সম্রাটকে "ফেরাউন" নামে উল্লেখ করছে না। কারণ ফেরাউন ছিল মিসরের ধর্মীয় পরিভাষা এবং এরা মিসরীয় ধর্মের প্রবক্তা ছিল না। কিন্তু বাইবেলে ভুলক্রমে তাকেও "ফেরাউন" বলা হয়েছে। সম্ভবত বাইবেল সংকলকগণ মনে করতেন যে, মিসরের সব বাদশাহই "ফেরাউন" ছিল।

বর্তমান যুগের অনুসন্ধানী ও গবেষকগণ বাইবেল ও মিসরীয় ইতিহাসের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করছেন। তারা সাধারণভাবে এ অভিমত পোষণ করেন যে, মিসরের ইতিহাসে রাখাল বাদশাহদের মধ্যে আপোফিস (APOPHIS) নাকম বাদশাহই ছিলেন হযরত ইউসুফের সমসাময়িক।

এ সয়ম মমফিস (মনফ) ছিল মিসরের রাজধানী। কায়রোর দক্ষিণে ১৪ মাইল দূরে এর ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। হযরত ইউসুফ (আ) ১৭/১৮ বছর বয়সে সেখানে পৌঁছেন। দু'তিন বছর আযীযে মিসরের বাড়িতে থাকেন। আট নয় বছর কারাগারে বাস করেন। ৩০ বছর বয়সে দেশের শাসক নিযুক্ত হন। ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত একচ্ছত্রভাবে সমগ্র মিসর শাসন করতে থাকেন। তাঁর শাসনকালের নবম বা দশম বছরে তিনি হযরত ইয়কূবকে (আ) তাঁর সমগ্র পরিবার পরিজনসহ ফিলিস্তিন থেকে মিসরে নিয়ে আসেন। তাদেরকে দিমীয়াত ও কায়রোর মাঝামাঝি এলাকায় আবাদ করেন। বাইবেলে এ এলাকার নাম জুশান বা গুশান বলা হয়েছে। হযরত মূসার (আ) আমল পর্যন্ত তারা সেখানেই বসবাস করতো। বাইবেলের বর্ণনামতে হযরত ইউসুফ একশো দশ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। মৃত্যুকালে তিনি বনী ইসরাঈলকে অসিয়াত করে যান, তোমরা যখন এ দেশ ত্যাগ করবে তখন আমার হাড়গুলো সংগে করে নিয়ে যাবে।

বাইবেলে ও তালমূদে ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনার যে বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে কুরআনের বর্ণনা তা থেকে অনেকটা ভিন্নতর। কিন্তু ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ অংশে তিনটি বর্ণনাই একাত্ম । আমার ব্যাখ্যা ও টীকাগুলোতে আমি প্রয়োজনমতো এ পার্থক্য সুস্পষ্ট করে যেতে থাকবো।

সুরা বুরুজ (আয়াত:৮-২২): ফেরাউন ও সামূদের 'সেনাদলের' খবর : যারা দলীয় শক্তির জোরে জুলুমের রাজত্ব কায়েম করেছিলো



৮) ওই ঈমানদারদের সাথে তাদের শত্রুতার এ ছাড়া আর কোন কারণ ছিল না যে তারা সেই আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল




৯) যিনি মহাপরাক্রমশালী এবং নিজের সত্তায় নিজেই প্রশংসিত , যিনি আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্বের অধিকারী ৷ আর সে আল্লাহ সবকিছু দেখছেন৷*৫



*৫. এ আয়াতগুলোতে মহান আল্লাহর এমন সব গুণাবলীর উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলোর মাধ্যমে তাঁর প্রতি ঈমান আনার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে৷ আবার অন্যদিকে এগুলোর প্রতি ঈমান আনার কারণে যারা অসন্তুষ্ট ও বিক্ষুব্ধ হয় তারা জালেম৷


১০) যারা মু’মিন পুরুষ ও নারীদের ওপর জুলুম - নিপীড়ন চালিয়েছে , তারপর তা থেকে তওবা করেনি , নিশ্চিতভাবেই তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আযাব এবং জ্বালা - পোড়ার শাস্তি৷*৬


*৬. জাহান্নামের আযাব থেকে আবার আলাদাভাবে জ্বালা পোড়ার শাস্তির উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে এই যে , তারা মজলুমদেরকে আগুনে ভরা গর্তে নিক্ষেপ করে জীবন্ত পুড়িয়েছিল৷ সম্ভবত এটা জাহান্নামের সাধারণ আগুন থেকে ভিন্ন ধরনের এবং তার চেয়ে বেশী তীব্র কোন আগুন হবে এ বিশেষ আগুনে তাদেরকে জ্বালানো হবে৷


১১) যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে নিশ্চিতভাবেই তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের বাগান যার নিম্নদেশে প্রবাহিত হতে থাকবে ঝরণাধারা৷ এটিই বড় সাফল্য৷




১২) আসলে তোমার রবের পাকড়াও বড় শক্ত৷




১৩) তিনিই প্রথমবার সৃষ্টি করেন আবার তিনিই দ্বিতীয় বার সৃষ্টি করবেন৷




১৪) তিনি ক্ষমাশীল , প্রেমময় ,




১৫) আরশের মালিক , শ্রেষ্ঠ সম্মানিত




১৬) এবং তিনি যা চান তাই করেন৷*৭


*৭. " তিনি ক্ষমাশীল " বলে এই মর্মে আশান্বিত করা হয়েছে যে , কোন ব্যক্তি গোনাহ করা থেকে বিরত হয়ে যদি তাওবা করে তাহলে সে আল্লাহর রহমত লাভ করতে পারে৷ " প্রেমময় " বলে একথা বলা হয়েছে যে , তিনি নিজের সৃষ্টির প্রতি কোন শত্রুতা পোষণ করেন না৷ অযথা তাদেরকে শাস্তি দেয়া তাঁর কাজ নয়৷ বরং নিজের সৃষ্টিকে তিনি ভালোবাসেন ৷ তাকে তিনি কেবল তখনই শাস্তি দেন যখন সে বিদ্রোহাত্মক আচরণ করা থেকে বিরত হয় না৷ " আরশের মালিক " বলে মানুষের মধ্যে এ অনুভূতি জাগানো হয়েছে যে সমগ্র বিশ্ব জাহানের রাজত্বের তিনিই একমাত্র অধিপতি ৷ কাজেই তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে কেউ তাঁর হাত থেকে নিস্তার পেতে পারে না৷ " শ্রেষ্ঠ সম্মানিত " বলে এ ধরনের বিপুল মর্যাদাসম্পন্ন সত্তার প্রতি অশোভন আচরণ করার হীন মনোবৃত্তির বিরুদ্ধে মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে ৷ তাঁর শেষ গুণটি বর্ণনা করে বলা হয়েছে , " তিনি যা চান তাই করেন৷ " অর্থাৎ আল্লাহ যে কাজটি করতে চান তাতে বাধা দেবার ক্ষমতা এ সমগ্র বিশ্ব জাহানের কারোর নেই৷


১৭) তোমার কাছে কি পৌঁছেছে সেনাদলের খবর ?




১৮) ফেরাউন ও সামূদের সেনাদলের ?*৮


৮. যারা নিজেদের দল ও জনশক্তির জোরে আল্লাহর এ যমীনে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা বুলন্দ করছে এখানে তাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে৷ বলা হচ্ছে , তোমাদের কি জানা আছে , ইতিপূর্বে যার নিজেদের দলীয় শক্তির জোরে এ ধরনের বিদ্রোহ করেছিল তাদের পরিণাম কি হয়েছিল ?


১৯) কিন্তু যারা কুফরী করেছে , তারা মিথ্যা আরোপ করার কাজে লেগে রয়েছে৷




২০) অথচ আল্লাহ তাদেরকে ঘেরাও করে রেখেছেন৷




২১) ( তোমার মিথ্যা আরোপ করায় এ কুরআনের কিছু আসে যায় না৷)




২২) বরং এ কুরআন উন্নত মর্যাদা সম্পন্ন , সংরক্ষিত ফলকে লিপিবদ্ধ৷*৯



৯. এর অর্থ হচ্ছে , এ কুরআনের লেখা অপরিবর্তনীয় ৷ এর বিলুপ্তি হবে না৷ আল্লাহর এমন সংরক্ষিত ফলকে এর লেখাগুলো খোদিত রয়েছে যেখানে এর মধ্যে কোন রদবদল করার ক্ষমতা কারোর নেই৷ এর মধ্যে যে কথা লেখা হয়েছে তা অবশ্যি পূর্ণ হবে ৷ সারা দুনিয়া একজোট হয়ে তাকে বাতিল করতে চাইলে ও তাতে সফল হবে না৷





সুত্র : এফবি
সূত্র : ওয়েব

সুরা বুরুজ (শানেনুজুল+আয়াত:১-৭):জুলুমের মোকাবেলায় অবিচল থাকলে 'সর্বোত্তম পুরস্কার' এবং আল্লাহ নিজেই 'জালেমদের থেকে বদলা নিবেন'

 
নামকরণ
প্রথম আয়াতে আরবী الۡبُرُوۡجِۙ শব্দটিকে এর নাম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

নাযিলের সময় -কাল
এর বিষয়বস্তু থেকেই একথা সুম্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে,এ সূরাটি মক্কা মুয়ায্‌যমায় এমন এক সময় নাযিল হয় যখন মুশরিকদের জুলুম নিপীড়ন তুংগে উঠেছিল এবং তারা কঠিনতম শাস্তি দিয়ে মুসলমানদের ইসলাম থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করছিল।

বিষয়বস্তু ও মুল বক্তব্য
এর মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে,ঈমানদারদের ওপর কাফেররা যে জুলুম করছিল সে সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করা এবং ঈমানদারদেরকে এই মর্মে সান্ত্বনা দেয়া যে, যদি তারা এসব জুলুম -নিপীড়নের মোকাবিলায় অবিচল থাকে তাহলে তারা এর জন্য সর্বোত্তম পুরস্কার পাবে এবং আল্লাহ নিজেই জালেমদের থেকে বদলা নেবেন।

এ প্রসংগে সর্বপ্রথম আসহাবুল উখদূদের (গর্ত ওয়ালাদের )কাহিনী শুনানো হয়েছে । তারা ঈমানদারদেরকে আগুনে ভরা গর্তে ফেলে দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিল। এ কাহিনীর মাধ্যমে মু’মিন ও কাফেরদেরকে কয়েকটি কথা বুঝানো হয়েছে ।

এক, গর্তওয়ালারা যেমন আল্লাহর অভিশাপ ও তাঁর শাস্তির অধিকারী হয়েছে তেমনি মক্কার মুশরিক সরদাররাও তার অধিকারী হচ্ছিল।

দুই, ঈমানদাররা যেমন তখন ঈমান ত্যাগ করার পরিবর্তে আগুনে ভরা গর্তে নিক্ষিপ্ত হয়ে জীবন দেয়াকে বেছে নিয়েছিল , ঠিক তেমনিভাবে এখনও ঈমানদারদের ঈমানের পথ থেকে সামান্যতমও বিচ্যুত না হয়ে সব রকমের কঠিনতম শাস্তি ভোগ করা উচিত।

তিন, যে আল্লাহকে মেনে নেবার কারণে কাফেররা বিরোধী হয়ে গেছে এবং ঈমানদাররা তাদের মেনে নেবার ওপর অবিচল রয়েছে, তিনি সবার ওপর ক্ষমতাশালী ও বিজয়ী, তিনি পৃথিবী ও আকাশের কর্তৃত্বের অধিকারী, নিজের সত্তায় তিনি নিজেই প্রশংসার অধিকারী এবং তিনি উভয় দলের অবস্থা দেখছেন। কাজেই নিশ্চিতভাবেই কাফেররা তাদের কুফরীর কারণে কেবল জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে না বরং এই সংগে নিজেদের জুলুম নিপীড়নের শাস্তিও তারা ভোগ করবে আগুনে দগ্ধীভূত হয়ে। অনুরূপভাবে যারা ঈমান এনে সৎকাজ করেছে তারা নিশ্চিতভাবে জান্নাতে যাবে এবং এটিই বৃহত্তম সাফল্য।

তারপর কাফেরদেরকে এ মর্মে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে , আল্লাহ অত্যন্ত শক্ত ও কঠোভাবে পাকড়াও করে থাকেন । যদি তোমরা নিজেদের বিরাট দলীয় শক্তির ওপর ভরসা করে থাকো তাহলে তোমাদের চাইতে বড় দলীয় শক্তির অধিকারী ছিল ফেরাউন ও সামুদরা। তাদের সেনাবাহিনীর পরিণাম থেকে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো। আল্লাহর অসীম শক্তি তোমাদেরকে চারদিকে থেকে ঘিরে আছে । এই ঘেরাও কেটে বের হবার ক্ষমতা তোমাদের নেই। আর যে কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য তোমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছো , তার প্রত্যেকটি শব্দ অপরিবর্তনীয়। এই কুরআনের প্রতিটি শব্দ লওহে মাহফুযের গায়ে এমনভাবে খোদিত আছে যে হাজার চেষ্টা করেও কেউও তা বদলাতে পারবে না।


১) কসম মজবুত দুর্গ বিশিষ্ট আকাশের *১



*১. বুর্জ বিশিষ্ট আকাশ ৷ প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা অনুযায়ী মুফাসসিরগণের কেউ কেউ এ থেকে আকাশের বারটি বুর্জ অর্থ করেছেন৷ অন্যদিকে ইবনে আব্বাস (রা) , মুজাহিদ , কাতাদাহ , হাসান বসরী , যাহহাক ও সুদ্দীর মতে এর অর্থ হচ্ছে , আকাশের বিশাল গ্রহ ও তারকাসমূহ৷

২) এবং সেই দিনের যার ওয়াদা করা হয়েছে *২



*২. অর্থাৎ কিয়ামতের দিন৷

৩) আর যে দেখে তার এবং সেই জিনিসের যা দেখা যায়৷ *৩



*৩. যে দেখে এবং যা দেখা যায় -- এ ব্যাপারে মুফাসসিরগণের বিভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যায় ৷ কিন্তু আমার মতে বক্তব্যের ধারাবাহিকতার সাথে যে কথাটি সম্পর্ক রাখে সেটি হচ্ছে , যে দেখে বলতে এখানে কিয়ামতের দিন উপস্থিত প্রত্যেক ব্যক্তিকে এবং যা দেখা যায় বলতে কিয়ামতকেই বুঝানো হয়েছে ৷ কিয়ামতের ভয়াবহ ও লোমহর্ষক ঘটনাবলী সেদিন যারা দেখে তারা প্রত্যেকেই দেখবে৷ এটি মুজাহিদ , ইকরামা , যাহহকা , ইবনে নুজাইহ এবং অন্যান্য কাতিপয় মুফাসসিরের বক্তব্য ৷

৪) মারা পড়েছে গর্তওয়ালারা যে গর্তে দাউ দাউ করে জ্বলা জ্বালানীর আগুন ছিল ,



৫) যখন তারা সেই গর্তের কিনারে বসেছিল



৬) এবং ঈমানদারদের সাথে



৭) তারা সবকিছু করছিল তা দেখছিল৷ *৪



*৪. যারা বড় বড় গর্তের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে ঈমানদারদেরকে তার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল এবং তাদের জ্বলে পুড়ে মরার বীভৎস দৃশ্য নিজেদের চোখে দেখেছিল তাদেরকে এখানে গর্তওয়ালা বলা হয়েছে৷ মারা পড়েছে অর্থ তাদের ওপর আল্লাহর লানত পড়েছে এবং তারা আল্লাহর আযাবের অধিকারী হয়েছে৷ এ বিষয়টির জন্য তিনটি জিনিসের কসম খাওয়া হয়েছে৷ প্রথম বুর্জ বিশিষ্ট আকাশের দ্বিতীয় কিয়ামতের দিনের , যার ওয়াদা করা হয়েছে৷ তৃতীয় কিয়ামতের ভয়াবহ ও লোমহর্ষক দৃশ্যাবলীর এবং সেই সমস্ত সৃষ্টির যারা এ দৃশ্যাবলী প্রত্যক্ষ করবে৷ প্রথম জিনিসটি সাক্ষ দিচ্ছে , যে সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন মহাশক্তিধর সত্ত্বা বিশ্ব জাহানের বিশাল তারকা ও গ্রহরাজির ওপর কর্তৃত্ব করছেন তাঁর পাকড়াও থেকে এ তুচ্ছ নগণ্য মানুষ কেমন করে বাঁচতে পারে ? দ্বিতীয় জিনিসটির কসম এ জন্য খাওয়া হয়েছে যে , দুনিয়ায় তারা ইচ্ছামতো জুলুম করেছে কিন্তু এমন একটি দিন অবশ্যি আসবে যেদিনটি সম্পর্কে সমস্ত মানুষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে সেদিন প্রত্যেক মজলুমের বদলা দেয়া হবে এবং প্রত্যেক জালেমকে পাকড়াও করা হবে৷ তৃতীয় জিনিসটির কসম খাওয়ার কারণ হচ্ছে এই যে , এ জালেমরা যেভাবে ওই ঈমানদারদের জ্বলে পুড়ে মরার দৃশ্য দেখছে ঠিক তেমনি কিয়ামতের দিন এদের শাস্তি দেয়ার দৃশ্য সমগ্র সৃষ্টি প্রত্যক্ষ করবে৷

গর্তে আগুন জ্বালিয়ে ঈমানদারদেরকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করার একাধিক ঘটনা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে৷ এ থেকে জানা যায় , এ ধরনের জুলুম ও নিপীড়নমূলক ঘটনা দুনিয়ায় কয়েকবার ঘটেছে৷

হযরত সুহাইব রুমী ( রা) এ ধরনের একটি ঘটনা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন৷ ঘটনাটি হচ্ছে : এক বাদশার কাছে একজন যাদুকর ছিল৷ বৃদ্ধ বয়সে সে বাদশাকে বললো , একটি ছেলেকে আমার কাছে নিযুক্ত করো , সে আমার কাছ থেকে এ যাদু শিখে নেবে৷ বাদশাহ যাদু শেখার জন্য যাদুকরের কাছে একটি ছেলেকে নিযুক্ত করলো ৷ কিন্তু সেই ছেলেটি যাদুকরের কাছে আসা যাওয়ার পথে একজন রাহেবের (যিনি সম্ভবত হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের দীনের অনুসারী একজন সাধক ছিলেন ) সাক্ষাত করতে লাগলো ৷ তাঁর কথায় প্রভাবিত হয়ে সে ঈমান আনলো ৷ এমন কি তাঁর শিক্ষার গুণে সে অলৌকিক শক্তির অধিকারী ও হয়ে গেলো৷ সে অন্ধদের দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দিতে এবং কুষ্ঠরোগ নিরাময় করতে লাগলো৷ ছেলেটি তাওহীদের প্রতি ঈমান এনেছে , একথা জানতে পেরে বাদশাহ প্রথমে রাহেবকে হত্যা করলো তারপর ছেলেটিকে হত্যা করতে চাইলো৷ কিন্তু কোন অস্ত্র দিয়েই এবং কোনভাবেই তাকে হত্যা করতে পারলো না ৷ শেষে ছেলেটি বললো , যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে চাও তাহলে প্রকাশ্য জনসমাবেশে " বিসমি রব্বিল গুলাম " ( অর্থাৎ এই ছেলেটির রবের নামে ) বাক্য উচ্চারণ করে আমাকে তীর মারো , তাতেই আমি মারা যাবো৷ বাদশাহ তাই করলো ৷ ফলে ছেলেটি মারা গেলো ৷ এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে লোকেরা চীৎকার করে উঠলো , আমরা এই ছেলেটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম৷ বাদশাহর সভাসদরা তাকে বললো , এখন তো তাই হয়ে গেলো যা থেকে আপনি বাঁচতে চাচ্ছিলেন৷ লোকেরা আপনার ধর্ম ত্যাগ করে এ ছেলেটির ধর্মগ্রহণ করেছে৷ এ অবস্থা দেখে বাদশাহ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলো৷ সে রাস্তার পাশে গর্ত খনন করালো৷ তাতে আগুন জ্বালালো ৷ যারা ঈমান ত্যাগ করতে রাজী হলো না তাদের সবাইকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করলো ৷ ( মুসনাদে আহমাদ , মুসলিম , নাসায়ী , তিরমিযী , ইবনে জারীর , আবদুস রাজ্জাক , ইবনে আবী শাইবা , তাবারানী , আবদ ইবনে হুমাইদ )

দ্বিতীয় ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু৷ তিনি বলেন , ইমানের এক বাদশাহ শরাব পান করে নিজের বোনের সাথে ব্যভিচার করে এবং উভয়ের মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায়৷ কথাটি প্রকাশ হয়ে গেলে বাদশাহ জনসমক্ষে ঘোষণা করে দেয় যে , আল্লাহ বোনের সাথে বিয়ে হালাল করে দিয়েছেন৷ লোকেরা তার একথা মানতে প্রস্তুত হয় না৷ ফলে সে নানান ধরনের শাস্তি দিয়ে লোকদের একথা মানতে বাধ্য করতে থাকে৷ এমনকি সে অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে যে ব্যক্তি তার একথা মানতে প্রস্তুত হয়নি তাকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করতে থাকে৷ হযরত আলী ( রা) বলেন , সে সময় থেকেই অগ্নি উপাসকদের মধ্যে রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়কে বিয়ে করার পদ্ধতি প্রচলিত হয়৷ ( ইবনে জারীর)

তৃতীয় ঘটনাটি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ( রা ) সম্ভবত ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে উদ্ধৃত করেছেন৷ তিনি বলেন : বেবিলনের অধিবাসীরা বনী ইসরাঈলকে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের দীন থেকে বিচ্যূত করতে বাধ্য করেছিল৷ এমন কি যারা তাদের কথা মানতে অস্বীকার করতো তাদেরকে জ্বলন্ত ভরা গর্তে নিক্ষেপ করতো৷ ( ইবনে জারীর , আবদ ইবনে হুমাইদ )

নাজরানের ঘটনাটিই সবচেয়ে বেশী প্রসিদ্ধ লাভ করেছে৷ ইবনে হিশাম , তাবারী , ইবনে খালদূন , মু'জামুল বুলদান গ্রন্থ প্রণেতা ইত্যাদি মুসলিম ঐতিহাসিকগণ এ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন৷ এর সংক্ষিপ্তসার হচেছ : হিময়ারের ( ইয়ামন ) বাদমাহ তুবান আসয়াদ আবু কারিবা একবার ইয়াসরিবে যায়৷ সেখানে ইহুদিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করে এবং বনি কুরাইযার দু'জন ইহুদি আলেমকে সংগে করে ইয়ামনে নিয়ে যায়৷ সেখানে সে ব্যাপকভাবে ইহুদি ধর্মের প্রচার চালায়৷ তারপর তার ছেলে যু - নুওয়াস তার উত্তরাধিকারী হয়৷ সে দক্ষিণ আরবে ইসায়ীদের কেন্দ্রস্থল নাজরান আক্রমণ করে৷ সেখানে থেকে ঈসায়ী ধর্মকে উৎখাত করা এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে জোরপূর্বক ইহুদি ধর্মে দীক্ষিত করাই ছিল তার লক্ষ৷ ( ইবনে হিশাম বলেন , নাজরানবাসীরা হযরত ঈসার আসল দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল৷) নাজরান পৌঁছে সে লোকদেরকে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করার আহবান জানায়৷ লোকেরা অস্বীকার করে৷ এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সে বিপুল সংখ্যক লোককে দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনের কুয়ায় নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দেয় এবং অনেককে হত্যা করে ৷ এভাবে মোট বিশ হাজার লোক নিহত হয়৷ নাজরানবাসীদের মধ্য থেকে দাউস যু সা'লাবান নামক এক ব্যক্তি কোনক্রমে প্রাণরক্ষা করে পালিয়ে যায়৷ এক বর্ণনা মতে , সে রোমের কায়সারের দরবারে চলে যায় এবং অন্য একটি বর্ণনা মতে সে চলে যায় হাবশার ( ইথিওপিয়া ) বাদশাহ নাজ্জাসীর দরবারে৷ সেখানে সে এই জুলুমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে৷ প্রথম বর্ণনা অনুযায়ী রোমের কায়সার হাবশার বাদশাকে লেখেন এবং দ্বিতীয় বর্ণনা অনুযায়ী নাজ্জাশী কায়সারে কাছে নৌবাহিনীর জাহাজ সরবরাহের আবেদন জানান৷ যাহোক সবশেষে হাবশার সত্তর হাজার সৈন্য আরইয়াত নামক একজন সেনাপতির পরিচালনাধীনে ইয়ামন আক্রমণ করে৷ যু নুওয়াস নিহত হয়৷ ইহুদি রাষ্ট্রের পতন ঘটে৷ ইয়ামন হাবশার ঈসায়ী রাষ্ট্রের অন্তরভুক্ত হয়৷

অন্যান্য ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণাদি থেকে মুসলিম ঐতিহাসিকদের এ বর্ণনার কেবল সত্যতাই প্রমাণিত হয় না বরং এ সম্পর্কিত আরো বিস্তারিত তথ্যাদিও জানা যায়৷ সর্বপ্রথম ৩৪০ খৃষ্টাব্দে ইয়ামন হাবশার ঈসায়ীদের দখলে আসে৷ ৩৭৮ খৃঃ পর্যন্ত সেখানে তাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত থাকে ৷ এ সময় ঈসায়ী মিশনারীরা ইয়ামনে প্রবেশ করতে শুরু করে ৷ এরি নিকটবর্তী সময়ে ফেমিউন( Faymiyun) নামক একজন সংসার ত্যাগী সাধক পুরুষ , কাশফ ও কারামতের অধিকারী ঈসায়ী পর্যটক নাজরানে আসেন ৷ তিনি স্থানীয় লোকদেরকে মূর্তি পূজার গলদ বুঝাতে থাকেন৷ তার প্রচার গুণে নাজরানবাসীরা ঈসায়ী ধর্মের দীক্ষিত হয়৷ সে সময় তিনজন সরদার তাদের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করতেন৷ তাদের একজনকে বলা হতো সাইয়েদ ৷ তিনি উপজাতীয় সরদারদের মতো একজন বড় সরদার ছিলেন৷ বিদেশ সংক্রান্ত বিষয়াবলী , সন্ধি চুক্তি এবং সেনাবহিনী পরিচালনা তার দায়িত্বের অন্তরভুক্ত ছিল৷ দ্বিতীয় জনকে বলা হতো আকেব৷ তিনি আভ্যন্তরীণ বিষয়াবলী দেখাশুনা করতেন৷ তৃতীয় জনকে বলা হতো উসকুফ ( বিশপ ) ৷ তিনি ছিলেন ধর্মীয় নেতা ৷ দক্ষিণ আরবে নাজরান ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ৷ এটি ছিল একটি বৃহত্তম বানিজ্য ও শিল্প কেন্দ্র৷ এখানে তসর , চামড়া ও অস্ত্র নির্মাণ শিল্প উন্নতি লাভ করেছিল৷ প্রসিদ্ধ ইয়ামনী বর্মও এখানে নির্মিত হতো ৷ এ কারণে নিছক ধর্মীয় কারণেই নয় বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেও যু-নুওয়াস এ গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি আক্রমণ করে৷ নাজরানের সাইয়েদ হারেশাকে , সুরিয়ানী ঐতিহাসিকগণ যাকে Arethas বলেছেন , হত্যা করে ৷ তার স্ত্রী রুমার সামনে তার দুই কন্যাকে হত্যা করে এবং তাদের রক্ত পান করতে তাকে বাধ্য করে ৷ তারপর তাকেও হত্যা করে ৷ উসকুফ বিশপ পলের (Paul) শুকনো হাড় কবর থেকে বের করে এনে জ্বালিয়ে দেয়৷ আগুন ভরা গর্তসমূহে নারী, পুরুষ , শিশু, যুবা , বৃদ্ধ , পাদরী , রাহেব সবাইকে নিক্ষেপ করে ৷ সামগ্রিকভাবে ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার লোক নিহত হয়েছিল বলা হয়৷ ৫২৩ খৃষ্টাব্দে এ ঘটনা ঘটে৷ অবশেষে ৫২৫ খৃষ্টাব্দে হাবশীরা ইয়ামন আক্রমণ করে যু - নুওয়াস ও তার হিমইয়ারী রাজত্বের পতন ঘটায়৷ প্রত্নতাত্বিক গবেষকগণ ইয়ামন হিসনে গুরাবের যে শিলালিপি উদ্ধার করেছেন তা থেকেও এর সত্যতা প্রমাণিত হয়৷

খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে ঈসায়ী লেখকদের বিভিন্ন লেখায় গর্তওয়ালাদের এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়৷ এর মধ্যে মূল ঘটনার সময় এবং এ ঘটনা যারা প্রত্যক্ষ করেছিল তাদের বিবরণ সহকারে লিখিত বেশ কিছু গ্রন্থ পাওয়া গেছে৷ এর মধ্যে তিনটি গ্রন্থের রচয়িতারা এই ঘটনার সমসাময়িক ৷ তাদের একজন হচ্ছেন : প্রকোপিউস দ্বিতীয় জন কসমস ইনডিকোপ্লিউসটিস ( cosmos Indicopleustis) তিনি নাজ্জাশী এলিস বুয়ানের( Elesboan) নির্দেশে সে সময় বাতলিমুসের গ্রীক ভাষায় লিখিত বইগুলোর অনুবাদ করছিলেন৷ এ সময় তিনি হাবশার সমুদ্রোপকূলবর্তী এডোলিশ ( Adolis) শহরে অবস্থান করছিলেন৷ তৃতীয়জন হচ্ছেন জোহান্নাস মালালা ( Johnnes Malala)৷ পরবর্তী বহু ঐতিহাসিক তাঁর রচনা থেকে ঘটনাটি উদ্ধৃতি করেছেন৷ এদের পর এফেসুসের জোহান্নাসের ( Johannes of Ephesus ) নাম করা যায়৷ তিনি ৫৮৫ খৃষ্টাব্দে মারা যান৷ তাঁর গীর্জার ইতিহাস গ্রন্থে নাজরানের ঈসায়ী সম্প্রদায়ের ওপর এই নিপীড়নের কাহিনী এ ঘটনার সমসাময়িক বর্ণনাকারী বিশপ শিমউনের (Simeon) একটি পত্র থেকে উদ্ধৃত করেছেন৷ এ পত্রটি লিখিত হয় জাবলা ধর্ম মন্দিরের প্রধানের( Abbot Von Gabula) নামে৷ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বিভিন্ন ইয়ামনবাসীর বর্ণনার মাধ্যমে শিমউন তাঁর এই পত্রটি তৈরি করেন৷ এ পত্রটি ১৮৮১ খৃষ্টাব্দে রোম থেকে এবং ১৮৮০ খৃষ্টাব্দে ঈসায়ী শহীদানের অবস্থা বর্ণনা প্রসংগে প্রকাশিত হয়৷

ইয়াকূবী পত্রিয়ার্ক ডিউনিসিউস ( Patriarch Dionysius ) ও জাকারিয়া সিদলিনি (Zacharia of Mitylene) তাদের সুরিয়ানী ইতিহাসেও এ ঘটনাটি উদ্ধৃত করেছেন৷ নাজরানের ঈসায়ী সমাজ সম্পর্কিত ইয়াকূব সুরুজীর গ্রন্থেও এর উল্লেখ রয়ে‌ছে৷ আর রাহা এর বিশপ পোলাস (PULUS) নাজরানের নিহতদের উদ্দেশ্যে শোকগীতি লিখেছেন ৷এটি এখনো পাওয়া যায়৷ সুরিয়ানী ভাষার বই " আল হিময়ারীন " এর ইংরেজী অনুবাদ ( Book of the Himyarites ) ১৯২৪ সালে লণ্ডন থেকে প্রকাশিত হয়েছে৷ এ বইটি মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনার সত্যতা প্রমাণ করে৷ বৃটিশ মিউজিয়ামে সেই আমলের এবং তার নিকটবর্তী আমলের কিছু ইথিয়োপীয় শিলালিপি সংরক্ষিত রয়েছে৷ এগুলো থেকেও এই ঘটনার সমর্থন পাওয়া যায়৷ কিলবি তাঁর Arabian Highlands নামক সফরনামায় লিখেছেন : গর্তওয়ালাদের ঘটনা যেখানে সংঘটিত হয়েছিল সে জায়গাটি আজো নাজরানবাসীদের কাছে সুস্পষ্ট৷ 'উম্মু খারাক' এর কাছে এক জায়গায় পাথরের গায়ে খোদিত কিছু চিত্রও পাওয়া যায়৷ আর নাজরানের কাবা যেখানে প্রতিষ্ঠিত ছিল বর্তমান নাজরানবাসীরা সে জায়গাটিও জানে৷

হাবশার ঈসায়ীরা নাজরান অধিকার করার পর সেখানে কাবার আকৃতিতে একটি ইমারত তৈরি করে৷ মক্কার কাবার মোকাবিলায় এই ঘরটিকে তারা কেন্দ্রীয় মর্যাদা দিতে চাচ্ছিল৷ এখানকার বিশপরা মাথায় পাগড়ী বাঁধতেন৷ এই ঘরকে তারা হারাম শরীফ গণ্য করেন৷ রোমান সম্রাটের পক্ষ থেকেও এই কাবাঘরের জন্য আর্থিক সাহায্য পাঠানো হতো৷ এই নাজরানের কাবার পাদরী তাঁর সাইয়েদ , আকেব ও উসকুফের নেতৃত্বে ' মুনাযিয়া ' (বিতর্ক ) করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাযির হয়েছিলেন ৷ সেখানে যে বিখ্যাত 'মুবাহিলা 'র ঘটনা অনুষ্ঠিত হয় সূরা আলে ইমরানের ৬১ আয়াতে তা উল্লেখিত হয়েছে৷ ( দেখুন তাফহীমূল কুরআন , আল ইমরান ২৯ ও ৫৫ টীকা ) 



সুত্র : এফবি
সূত্র : ওয়েব
 

(সুরা আন-নসর : আয়াত ১-৩) : যখন আল্লাহর সাহায্য এসে যায় এবং বিজয় লাভ হয়..

১. যখন আল্লাহর সাহায্য এসে যায় এবং বিজয় লাভ হয় *১


اِذَا جَآءَ نَصۡرُ اللّٰهِ وَالۡفَتۡحُۙ‏


১ ) বিজয় মানে কোন একটি যুদ্ধ বিজয় নয়। বরং এর মানে হচ্ছে এমন একটি চূড়ান্ত বিজয় যার পরে ইসলামের সাথে সংঘর্ষ করার মতো আর কোন শক্তির অস্তিত্ব দেশের বুকে থাকবে না এবং একথাও সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে , বর্তমানে আরবে এ দীনটিই প্রাধান্য বিস্তার করবে। কোন কোন মুফাসসির এখানে বিজয় মানে করেছেন মক্কা বিজয় । কিন্তু মক্কা বিজয় হয়েছে ৮ হিজরীতে এবং এ সূরাটি নাযিল হয়েছে ১০ হিজরীর শেষের দিকে। ভূমিকায় আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) ও হযরত সারাআ বিনতে নাবহানের (রা) যে হদীস বর্ণনা করেছি তা থেকে একথাই জানা যায়। এ ছাড়াও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) যে একে কুরআন মজীদের সর্বশেষ সূরা বলেছেন , তাঁর এ বক্তব্যেও এ তাফসীরের (রা) বিরুদ্ধে চলে যায়। কারণ বিজয়ের মানে যদি মক্কা বিজয় হয় তাহলে সমগ্র সূরা তাওবা মক্কা বিজয়ের পর নাযিল হয়। তাহলে আন নসর কেমন করে শেষ সূরা হতে পারে ? নিসন্দেহে মক্কা বিজয় এ দিক দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় ছিল যে , তারপর আরবের মুশরিকদের সাহস ও হিম্মত নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল । কিন্তু এরপরও তাদের মধ্যে যথেষ্ট শক্তি - সামর্থ ছিল। এরপরই অনুষ্ঠিত হয়েছিল তায়েফ ও হুনায়েনের যুদ্ধ । আরবে ইসলামের পূর্ণাংগ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হতে আরো প্রায় দু’বছর সময় লেগেছিল।



২.আর ( হে নবী ! ) তুমি (যদি দেখ যে লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দীন গ্রহণ করছে *২

وَرَاَيۡتَ النَّاسَ يَدۡخُلُوۡنَ فِىۡ دِيۡنِ اللّٰهِ اَفۡوَاجًاۙ‏


২ ) অর্থাৎ লোকদের একজন দু’জন করে ইসলাম গ্রহণ করার যুগ শেষ হয় যাবে । তখন এমন এক যুগের সূচনা হবে যখন একটি গোত্রের সবাই এবং এক একটি বড় বড় এলাকার সমস্ত অধিবাসী কোন প্রকার যুদ্ধ - বিগ্রহ ও চাপ প্রয়োগ ছাড়াই স্বতষ্ফূর্তভাবে মুসলমান হয়ে যেতে থাকবে। নবম হিজরীর শুরু থেকে এ অবস্থার সূচনা হয়। এ কারণে এ বছরটিকে বলা হয় প্রতিনিধিদলের বছর । এ বছর আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে একের পর এক প্রতিনিধি দল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামে কাছে আসতে থাকে। তারা ইসলাম কবুল করে তাঁর মুবারক হাতে বাই’আত গ্রহণ করতে থাকে। এমনকি দশম হিজরীতে যখন তিনি বিদায় হজ্জ করার জন্য মক্কায় যান তখান সমগ্র আরব ভূমি ইসলামের ছাড়াতলে আশ্রয় নিয়েছিল এবং সারাদেশে কোথাও একজন মুশরিক ছিল না।


৩.  তখন তুমি তোমার রবের হামদ সহকারে তাঁর তাসবীহ পড়ো *৩ এবং তাঁর কাছে মাগফিরাত চাও।*৪ অবশ্যি তিনি বড়ই তাওবা কবুলকারী। 

فَسَبِّحۡ بِحَمۡدِ رَبِّكَ وَاسۡتَغۡفِرۡهُ‌ؕ اِنَّهٗ كَانَ تَوَّابًا‏

৩ ) হামদ মানে মহান আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করা এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাও । আর তাসবীহ মানে আল্লাহকে পাক - পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন এবং দোষ- ত্রুটিমুক্ত গণ্য করা। এ প্রসংগে বলা হয়েছে , যখন তুমি তোমার রবের কুদরতের এ অভিব্যক্তি দেখবে তখন তাঁর হামদ সহকারে তাঁর তাসবীহ পাঠ করবে। এখানে হামদ বলে একথা বুঝানো হয়েছে যে , এ মহান ও বিরাট সাফল্য সম্পর্কে তোমার মনে যেন কোন সময় নিন্দুমাত্রও ধারণা না জন্মায় যে , এসব তোমার নিজের কৃতিত্বের ফল। বরং একে পুরোপুরি ও সরাসরি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ও মেহেরবানী মনে করবে । এ জন্যে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। মনে ও মুখে একথা স্বীকার করবে যে , এ সাফল্যের জন্য সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর প্রাপ্য। আর তাসবীহ মানে হচ্ছে , আল্লাহর কালেমা বুলন্দ হওয়ার বিষয়টি তোমার প্রচেষ্টা ও সাধনার ওপর নির্ভরশীল ছিল ---- এ ধরনের ধারণা থেকে তাঁকে পাক ও মুক্ত গণ্য করবে। বিপরীত পক্ষে তোমার মন এ দৃঢ় বিশ্বাসে পরিপূর্ণ থাকবে যে , তোমার প্রচেষ্টা ও সাধনার সাফল্য আল্লাহর সাহায্য ও সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তিনি তাঁর যে বান্দার থেকে চান কাজ নিতে পারতেন। তবে তিনি তোমার খিদমত নিয়েছেন এবং তোমার সাহায্যে তাঁর দীনের ঝাণ্ডা বুলন্দ করেছেন , এটা তাঁর অনুগ্রহ । এছাড়া তাসবীহ অর্থাৎ সুবহানাল্লাহ পড়ার মধ্যে বিস্ময়ের ও একটি দিক রয়েছে । কোন বিস্ময়কর ঘটনা ঘটলে মানুষ সুবহানাল্লাহ বলে। এর অর্থ হয় , আল্লাহর অসীম কুদরতে এহেন বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে। নয়তো এমন বিস্ময়কর ঘটনা ঘটাবার ক্ষমতা দুনিয়ার কোন শক্তির ছিল না।


৪ ) অর্থাৎ তোমার রবের কাছে দোয়া করো। তিনি তোমাকে যে কাজ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন তা করতে গিয়ে তোমার যে ভুল - ত্রুটি হয়েছে তা যেন তিনি মাফ করে দেন। ইসলাম বান্দাকে এ আদব শিষ্টাচার শিখিয়েছে। কোন মানুষের দ্বারা আল্লাহর দীনের যতবড় খিদমতই সম্পন্ন হোক না কেন , তাঁর পথে সে যতই ত্যাগ স্বীকার করুক না এবং তাঁর ইবাদাত ও বন্দেগী করার ব্যাপারে যতই প্রচেষ্টা ও সাধনা চালাক না কেন , তার মনে কখনো এ ধরনের চিন্তার উদয় হওয়া উচিত নয় যে , তার ওপর তার রবের যে হক ছিল তা সে পুরোপুরি আদায় করে দিয়েছে। বরং সবসময় তার মনে করা উচিত যে তার হক আদায় করার ব্যাপারে যেসব দোষ - ত্রুটি সে করেছে তা মাফ করে দিয়ে যেন তিনি তার এ নগণ্য খেদমত কবুল করে নেন। এ আদব ও শিষ্টাচার শেখানো হয়েছে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে । অথচ তাঁর চেয়ে বেশী আল্লাহর পথে প্রচেষ্টা ও সাধনাকারী আর কোন মানুষের কথা কল্পনাই করা যেতে পারে না। তাহলে এ ক্ষেত্রে অন্য কোন মানুষের পক্ষে তার নিজের আমলকে বড় মনে করার অবকাশ কোথায় ? আল্লাহর যে অধিকার তার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তা সে আদায় করে দিয়েছে এ অহংকার মত্ত হওয়ার কোন সুযোগই কি তার থাকে ? কোন সৃষ্টি আল্লাহর হক আদায় করতে সক্ষম হবে , এ ক্ষমতাই তার নেই।


মহান আল্লাহর এ ফরমান মুসলমানদের এ শিক্ষা দিয়ে আসছে যে , নিজের কোন ইবাদাত , আধ্যাত্মিক সাধনা ও দীনি খেদমতকে বড় জিনিস মনে না করে নিজের সমগ্র প্রাণশক্তি আল্লাহর পথে নিয়োজিত ও ব্যয় করার পরও আল্লাহর হক আদায় হয়নি বলে মনে করা উচিত । এভাবে যখনই তারা কোন বিজয় লাভে সমর্থ হবে তখনই এ বিজয়কে নিজেদের কোন কৃতিত্বের নয় বরং মহান আল্লাহর অনুগ্রহের ফল মনে করবে। এ জন্য গর্ব ও অহংকারে মত্ত না হয়ে নিজেদের রবের সামনে দীনতার সাথে মাথা নত করে হামদ , সানা ও তাসবীহ পড়তে এবং তাওবা ও ইসতিগফার করতে থাকবে।

► ফেসবুকলিঙ্ক
► ওয়েবলিঙ্ক

(সুরা আন নসর) : নামকরণ, শানে নুযূল, পটভূমি ও বিষয়বস্তু (যে সূরা পৃথিবী থেকে রাসুল সা: এর বিদায়ের ভবিষ্যৎবানী করেছিলো)

 
নামকরণ : প্রথম আয়াত  এর মধ্যে উল্লেখিত নসর শব্দকে এর নাম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

নাযিলের সময় - কাল

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) একে কুরআন মজীদের শেষ সূরা হিসেবে উল্লেখ করেছেন । অর্থাৎ এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর আর কোন পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল হয়নি। * ( মুসলিম , নাসায়ী , তাবারানী , ইবনে আবী শাইবা ও ইবনে মারদুইয়া )।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বর্ণনা করেছেন , এ সূরাটি বিদায় হজ্জের সময় আইয়ামে তাশরীকের মাঝামাঝি সময় মিনায় নাযিল হয়। এ সূরাটি নাযিল হবার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উটের পিঠে সওয়ার হয়ে বিখ্যাত ভাষণটি দেন। ( তিরমিযী , বায়যাবী , বাইহাকী , ইবনে শাইবা , আবদ ইবনে হুমাইদ , আবু ইয়ালা ও ইবনে মারদুইয়া )। বাইহাকী কিতাবুল হজ্জ অধ্যায়ে হযরত সারাআ বিনতে নাবহানের রেওয়ায়াতের মাধ্যমে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ সময়ের প্রদত্ত ভাষণ উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেন :

“বিদায় হজ্জের সময় আমি রসূলুল্লাহ (সা) - কে একথা বলতে শুনেছি : হে লোকেরা ! তোমরা জানো আজ কোন দিন ? লোকেরা জবাব দিল , আল্লাহ ও তাঁর রসূল ভালো জানেন। তিনি বললেন , এটি হচ্ছে আইয়ামে তাশরীকের মাঝখানের দিন। তারপর তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন , জানো এটা কোন জায়গা ? লোকেরা জবাব দিল , আল্লাহ ও তাঁর রসূল ভালো জানেন । তিনি বললেন , এটি হচ্ছে মাশ’আরে হারাম। এরপর তিনি বলেন , আমি জানি না , সম্ভবত এরপর আমি আর তোমাদের সাথে মিলতে পারবো না। সাবধান হয়ে যাও , তোমাদের রক্ত ও তোমাদের মান - সম্মান পরস্পরের ওপর ঠিক তেমনি হারাম যেমন আজকের দিনটি ও এ জায়গাটি হারাম , যতদিন না তোমরা তোমাদের রবের সামনে হাযির হয়ে যাও এবং তিনি তোমাদেরকে নিজেদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। শোনো , একথাগুলো তোমাদের নিকটবর্তীরা দূরবর্তীদের কাছে পৌঁছিয়ে দেবে। শোনো আমি কি তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছি ? এরপর আমরা মদীনায় ফিরে এলাম এবং তারপর কিছুদিন যেতে না যেতেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকাল হয়ে গেল।”

এ দু’টি রেওয়ায়াত একত্র করলে দেখা যাবে , সূরা আন নসরের নাযিল হওয়া ও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের মধ্যে ৩ মাস ও কয়েকদিনের ব্যবধানে ছিল। কেননা ইতিহাসের দৃষ্টিতে দেখা যায় , বিদায় হজ্জ ও রসূলের (সা) ওফাতের মাঝখানে এ ক’টি দিনই অতিবাহিত হয়েছিল।

ইবনে আব্বাসের (রা) বর্ণনা মতে এ সূরাটি নাযিল হবার পর রসূলুল্লাহ (সা) বলেন : আমাকে আমার মৃত্যুর খবর দেয়া হয়েছে এবং আমর সময় পূর্ণ হয়ে গেছে। ( মুসনাদে আহমাদ , ইবনে জারীর , ইবনুল মুনযির ও ইবনে মারদুইয়া ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত অন্যান্য রেওয়ায়াতগুলোতে বলা হয়েছে : এ সূরাটি নাযিল হবার পর রসূলুল্লাহ (সা) বুঝতে পেরেছিলেন যে , তাঁর দুনিয়া থেকে বিদায় নেবার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ( মুসনাদে আহমাদ , ইবনে জারীর , তাবারানী , নাসায়ী , ইবনে আবী হাতেম ও ইবনে মারদুইয়া )।

উম্মল মু’মিনীন হযরত উম্মে হাবীবা (রা) বলেন , এ সূরাটি নাযিল হলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : এ বছর আমার ইন্তিকাল হবে। একথা শুনে হযরত ফাতিমা (রা) কেঁদে ফেললেন। এ অবস্থা দেখে তিনি বললেন , আমার বংশধরদের মধ্যে তুমিই সবার আগে আমার সাথে মিলিত হবে। একথা শুনে হযরত ফতিমা (রা) হেসে ফেললেন। ( ইবনে আবি হাতেম ও ইবনে মারদুইয়া ) প্রায় এই একই বিষয়বস্তু সম্বলিত হাদীস বাইহাকীতে ইবনে আব্বাস (রা) থেকে উদ্ধৃত করেছেন ।

ইবনে আব্বাস (রা) বলেন , হযরত উমর (রা) বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বড় বড় জ্ঞানী ও সম্মানিত সাহাবীদের সাথে তাঁর মজলিসে আমাকে ডাকতেন। একথা বয়স্ক সাহাবীদের অনেকেই খারাপ লাগলো। তাঁরা বললেন , আমাদের ছেলেরাও তো এ ছেলেটির মতো , তাহলে শুধুমাত্র এ ছেলেটিকেই আমাদের সাথে মজলিসে শরীক করা হয়েছে কেন ? ( ইমাম বুখারী ও ইবনে জারীর খোলাসা করে বলেছেন যে , একথা বলেছিলেন হযরত আবদুর রহমান ইবন আউফ) হযরত উমর (রা) বললেন , ইলমের ক্ষেত্রে এর যা মর্যাদা তা আপনারর জানেন। তারপর একদিন তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বয়স্ক সাহাবীদের ডাকলেন । তাঁদের সাথে আমাকেও ডাকলেন । আমি বুঝে ফেললাম তাদের মজলিসে আমাকে শরীক করার যৌক্তিকথা প্রমাণ করার জন্য আজ আমাকে ডাকা হয়েছে। আলাচনার এক পর্যায়ে হযরত উমর (রা) বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন  সূরাটির ব্যাপারে আপনাদের অভিমত কি ? কেউ কেউ বললেন , এ সূরায় আমাদের হুকুম দেয়া হয়েছে , যখন আল্লাহর সাহায্যে আসে এবং আমরা বিজয় লাভ করি তখন আমাদের আল্লাহর হামদ ও ইস্তিগফার করা উচিত । কেউ কেউ বললেন , এর অর্থ হচ্ছে , শহর ও দুর্গসমূহ জয় করা। অনেকে নীরব রইলেন এরপর হযরত উমর (রা) বললেন , ইবনে আব্বাস তুমিও কি একথাই বলো ? আমি বললাম : না । তিনি জিজ্ঞেস করলেন , তা হলে তুমি কি বলো । আমি বললাম : এর অর্থ হচ্ছে , রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাত।

এ সূরায় জানানো হয়েছে , যখন আল্লাহর সাহায্যে এসে যাবে এবং বিজয় লাভ হবে তখন আপনার সময় শেষ হয়ে গেছে , এগুলোই আলামত। কাজেই এরপর আপনি আল্লাহর হামদ ও ইস্তিগফার করুন। একথা শুনে হযরত উমর বললেন , তুমি যা বললে আমি ও এ ছাড়া আর কিছুই জানি না। অন্য একটি রেওয়ায়াতে এর ওপর আরো একটু বাড়ানো হয়েছে এভাবে যে , হযরত উমর বয়স্ক বদরী সাহাবীদের বললেন : আপনারা এ ছেলেকে এ মজলিসে শরীক করার কারণ দেখার পর আবার কেমন করে আমাকে তিরস্কার করেন ? ( বুখারী , মুসনাদে আহমাদ , তিরমিযী , ইবনে জারীর , ইবনে মারদুইয়া , বাগাবী , বাইহাকী ও ইবনুল মুনযির)।

* বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায় , এরপর কিছু বিচ্ছিন্ন আয়াত নাযিল হয়। কিন্তু রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর সবশেষে কুরআনে কোন আয়াতটি নাযিল হয় সেটি চিহ্নিত করার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। বুখারী ও মুসলিমে হযরত বারাআ ইবনে আযেবের (রা) রেওয়ায়াতে উদ্ধৃত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে : সেটি হচ্ছে সূরা নিসার শেষ আয়াত  ইমাম বুখারী ইবনে আব্বাসের (রা) উক্তি উদ্ধৃত করেছেন । তাতে বলা হয়েছে : সর্বশেষ আয়াতটি হচেছ রিবা সম্পর্কিত আয়াত। অর্থাৎ যে আয়াতের মাধ্যমে সুদকে হারাম গণ্য করা হয়েছে। ইমাম আহমাদ , ইবনে মাজাহ ও ইবনে মারদুইয়া হযরত উমর (রা) থেকে যে হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন তা থেকেও ইবনে আব্বাসের এ উক্তির সমর্থন পাওয়া যায়। কিন্তু এ হাদীসগুলোতে এটিকে শেষ আয়াত বলা হয়নি। বরং হযরত উমরের উক্তি হচ্ছে : এটি সর্বশেষে নাযিল হওয়া আয়াতের অন্তরভুক্ত। আবু উবাইদ তাঁর ফাদায়েলুল কুরআন গ্রন্থে ইমাম যুহরীর এবং ইবনে জারীর তাঁর তাফসীর গ্রন্থে হযরত সাঈদ উবনুল মুসাইয়েবের উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। তাতে বলা হয়েছে : রিবার আয়াত এবং দাইনের আয়াত ( অর্থাৎ সূরা বাকারার ৩৮-৩৯ রুকূ’) কুরআনের নাযিলকৃত সর্বশেষ আয়াত। নাসায়ী , ইবনে মারদুইয়া ও ইবনে জারীর হযরত ইবনে আব্বাসের অন্য একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন তাতে বলা হয়েছে : আরবী সূরা বাকারার এ ২৮১ নম্বর আয়াতটি হচ্ছে কুরআনের সর্বশেষ আয়াত । আল ফিরইয়াবী তাঁর তাফসীর গ্রন্থে ইবনে আব্বাসের উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। তাতে এতটুকু বাড়ানো হয়েছে : এ আয়াতটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের ৮১ দিন আগে নাযিল হয়। অন্য দিকে ইবনে আবী হাতেম এ সম্পর্কিত সাঈদ ইবনে যুবাইরের উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। তাতে এ আয়াতটি নাযিল হওয়া ও রসূলের (সা) ওফাতের মধ্যে মাত্র ৯ দিনের ব্যবধানের কথা বলা হয়েছে। ইমাম আহমাদের মুসনাদ ও হাকেমের মুসতাদরাকে হযরত উবাই ইবনে কা ’ বের (রা) রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করা হয়েছে । তাতে বলা হয়েছে : সূরা তাওবার ১২৮-১২৯ আয়াত দু’টি সবশেষে নাযিল হয়।

বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য

ওপরে যে হাদীসগুলো আলোচনা করা হয়েছে তাতে একথা বলা হয়েছে যে , আল্লাহ তাঁর রসূলকে বলে দিয়েছিলেন , যখন আরবে ইসলামের বিজয় পূর্ণ হয়ে যাবে এবং লোকেরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকবে তখন এর মানে হবে , আপনাকে যে কাজের জন্য দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছিল তা পূর্ণ হয়ে গেছে। তারপর তাকে হুকুম দেয়া হয়েছে , আপনি আল্লাহর হামদ ও প্রশয়সা বাণী উচ্চারণ করতে থাকুন। কারণ তাঁরই অনুগ্রহে আপনি এতবড় কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন।

আর তাঁর কাছে এ মর্মে দোয়া করুন যে , এই বিরাট কাজ করতে গিয়ে আপনি যে ভুল - ভ্রান্তি বা দোষ ত্রুটি করেছেন তা সব তিনি যেন মাফ করে দেন। এ ক্ষেত্রে একটুখানি চিন্তা ভাবনা করলে যে কোন ব্যক্তিই দুনিয়ার মানুষের একজন সাধারণ নেতা ও একজন নবীর মধ্যে বিরাট পার্থক্য দেখতে পাবেন। মানুষের একজন সাধারণ নেতা যে বিপ্লব করার জন্য কাজ করে যায় নিজের জীবদ্দশাতেই যদি সেই মহান বিপ্লব সফলকাম হয়ে যায় তাহলে এ জন্য সে বিজয় উৎসব পালন করে এবং নিজেই নেতৃত্বের গর্ব করে বেড়ায়। কিন্তু এখানে আল্লাহর নবীকে আমরা দেখি ,তিনি তেইশ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে পুরো একটি জাতির আকীদা বিশ্বাস ,চিন্তাধারা ,আচার - আচরণ , নৈতিক চরিত্র , সভ্যতা - সংস্কৃতি , সমাজনীতি , অর্থব্যবস্থা , রাজনীতি ও সামরিক যোগ্যতা সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছেন।মূর্খতা , অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের মধ্যে আপাদমস্তক ডুবে থাকা জাতিকে উদ্ধার করে এমন যোগ্যতাসম্পন্ন করে গড়ে তুলেছেন যার ফলে তারা সারা দুনিয়া জয় করে ফেলেছে এবং সমগ্র বিশ্বের জাতিসমূহের নেতৃত্ব পদে আসীন হয়েছে। কিন্তু এতবড় মহৎ কাজ সম্পন্ন করার পরও তাঁকে উৎসব পালন করার নয় বরং আল্লাহর প্রশংসা ও গুণাবলী করার এবং তাঁর কাছে মাগফিরাতের দোয়া করার হুকুম দেয়া হয় ।আর তিনি পূর্ণ দীনতার সাথে সেই হুকুম পালন করতে থাকেন।

হযরত আয়েশা (রা ) বলেন : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ওফাতের পূর্বে আরবী  কোন কোন রেওয়ায়াতে এর শব্দগুলো হচ্ছে :  খুব বেশী করে পড়তেন । আমি বললাম , হে আল্লাহর রসূল ! আপনি এই যে কথাগুলো পড়ছেন এগুলো কেমন ধরনের কালেমা। জবাব দিলেন , আমার জন্য একটি আলামত নির্ধারণ করা হয়েছে , বলা হয়েছে , যখন আমি সেই আলামত দেখতে পাবো তখনই যেন একথাগুলো পড়ি এবং সেই আলামতটি হচ্ছে , ( মুসনাদে আহমাদ ,মুসলিম ,ইবনে জারীর , ইবনুল মুনযির ও ইবনে মারদুইয়া )। প্রায় এ একই ধরনের কোন কোন রেওয়ায়াতে হযরত আয়েশা বলেন , রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায পড়ার সময় নিজের রুকূ ’ ও সিজদায় খুব বেশী করে এ শব্দগুলো পড়তেন : এটি ছিল কুরআনের ( অর্থাৎ সূরা আন নসরের ব্যাখ্যা । তিনি নিজেই ব্যাখ্যাটি করেছিলেন ) ( বুখারী ,মুসলিস ,আবু দাইদ , নাসায়ী ইবনে মাজাহ ও ইবনে জারীর )।

হযরত উম্মে সালামা বলেন : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের শেষের দিকে উঠতে বসতে চলতে ফিরতে তাঁর পবিত্র মুখে সর্বক্ষণ একথাই শুনা যেতো : আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম , হে আল্লাহর রসুল ! আপনি এ যিকিরটি বেশী করে করেন কেন ? জবাব দিলেন , আমাকে হুকুম দেয়া হয়েছে , তারপর তিনি এ সূরাটি পড়লেন ।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা ) রেওয়ায়াতে করেন , যখন এ সূরাটি নাযিল হয় করতে থাকেন :ইবনে আব্বাস (রা ) বলেন , এ সূরাটি নাযিল হবার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আখেরাতের জন্য শ্রম ও সাধনা করার ব্যাপারে খুব বেশী জোরেশোরে আত্মনিয়োগ করেন।এর আগে তিনি কখনো এমনভাবে আত্মনিয়োগ করেননি। (নাসায়ী ,তাবারানী ,ইবনে আবী হাতেম ও ইবনে মারদুইয়া )।

সূরা-ফাতিহা : নামকরণ ও শানে-নুজুল


নামকরণ

এ সূরার মূল বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্য রেখেই এর এই নামকরণ করা হয়েছে। যার সাহায্যে কোন বিষয়, গ্রন্থ বা জিনিসের উদ্বোধন করা হয় তাকে ‘ফাতিহা’ বলা হয়। অন্য কথায় বলা যায়, এ শব্দটি ভূমিকা এবং বক্তব্য শুরু করার অর্থ প্রকাশ করে।

নাযিল হওয়ার সময়-কাল  

এটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত লাভের একেবারেই প্রথম যুগের সূরা। বরং হাদীসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে জানা যায়, এটিই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নাযিলকৃত প্রথম পূর্ণাঙ্গ সূরা। এর আগে মাত্র বিচ্ছিন্ন কিছু আয়াত নাযিল হয়েছিল। সেগুলো সূরা ‘আলাক’, সূরা ‘মুয্‌যাম্‌মিল’ ও সূরা ‘মুদ্‌দাস্‌সির’ ইত্যাদিতে সন্নিবেশিত হয়েছে।

বিষয়বস্তু

আসলে এ সূরাটি হচ্ছে একটি দোয়া। যে কোন ব্যক্তি এ গ্রন্থটি পড়তে শুরু করলে আল্লাহ প্রথমে তাকে এ দোয়াটি শিখিয়ে দেন। গ্রন্থের শুরুতে এর স্থান দেয়ার অর্থই হচ্ছে এই যে, যদি যথার্থই এ গ্রন্থ থেকে তুমি লাভবান হতে চাও, তাহলে নিখিল বিশ্ব-জাহানের মালিক আল্লাহর কাছে দোয়া এবং সাহায্য প্রার্থনা করো।

মানুষের মনে যে বস্তুটির আকাংখা ও চাহিদা থাকে স্বভাবত মানুষ সেটিই চায় এবং সে জন্য দোয়া করে। আবার এমন অবস্থায় সে এই দোয়া করে যখন অনুভব করে যে, যে সত্তার কাছে সে দোয়া করছে তার আকাংখিত বস্তুটি তারই কাছে আছে। কাজেই কুরআনের শুরুতে এই দোয়ার শিক্ষা দিয়ে যেন মানুষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, সত্য পথের সন্ধান লাভের জন্য এ গ্রন্থটি পড়, সত্য অনুসন্ধানের মানসিকতা নিয়ে এর পাতা ওলটাও এবং নিখিল বিশ্ব-জাহানের মালিক ও প্রভু আল্লাহ হচ্ছেন জ্ঞানের একমাত্র উৎস--- একথা জেনে নিয়ে একমাত্র তাঁর কাছেই পথনির্দেশনার আর্জি পেশ করেই এ গ্রন্থটি পাঠের সূচনা কর।

এ বিষয়টি অনুধাবন করার পর একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, কুরআন ও সূরা ফাতিহার মধ্যকার আসল সম্পর্ক কোন বই ও তার ভূমিকার সম্পর্কের পর্যায়ভুক্ত নয়। বরং এ সম্পর্কটি দোয়া ও দোয়ার জবাবের পর্যায়ভুক্ত। সূরা ফাতিহা বান্দার পক্ষ থেকে একটি দোয়া। আর কুরআন তার জবাব আল্লাহর পক্ষ থেকে। বান্দা দোয়া করে, হে মহান প্রভু! আমাকে পথ দেখাও। জবাবে মহান প্রভু এই বলে সমগ্র কুরআন তার সামনে রেখে দেন ____ এই নাও সেই হিদায়াত ও পথের দিশা যে জন্য তুমি আমার কাছে আবেদন জানিয়েছ।


সূরা-ফাতিহা : আয়াত 5-6-7

5) তুমি আমাদের সোজা পথ দেখাও, *

* অর্থাৎ জীবনের প্রত্যেকটি শাখা প্রশাখায় এবং প্রত্যেকটি বিভাগে, চিন্তা, কর্ম ও আচরণের এমন বিধি-ব্যবস্থা আমাদের শেখাও , যা হবে একেবারেই নির্ভুল , যেখানে ভুল দেখা , ভুল কাজ করা ও অশুভ পরিণামের আশংকা নেই, যে পথে চলে আমরা সাফল্য ও সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারি ৷ কুরআন অধ্যয়নের প্রাক্কালে বান্দা তার প্রভু , মালিক, আল্লাহর কাছে এই আবেদনটি পেশ করে ৷ বান্দা আর্জি পেশ করে , হে আল্লাহ! তুমি আমাদের পথ দেখাও ৷ কল্পিত দর্শনের গোলকধাঁধার মধ্য থেকে যথার্থ সত্যকে উন্মুক্ত করে আমাদের সামনে তুলে ধর ৷ বিভিন্ন নৈতিক চিন্তা-দর্শনের মধ্য থেকে যথার্থ ও নির্ভুল নৈতিক চিন্তা-দর্শন আমাদের সামনে উপস্থাপিত কর ৷ জীবনের অসংখ্য পথের মধ্য থেকে চিন্তা ও কর্মের , সরল ও সুস্পষ্ট রাজপথটি আমাদের দেখাও ৷

_________________________________
6) তাদের পথ যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ, **
_________________________________

** মহান আল্লাহর কাছ থেকে আমরা যে সোজা পথটির জ্ঞান লাভ করতে চাচ্ছি এটা হচ্ছে তার পরিচয় ৷ অর্থাৎ এমন পথ যার ওপর সবসময় তোমার প্রিয়জনেরা চলেছেন ৷ সেই নির্ভুল রাজপথটি অতি প্রাচীনকাল থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত যে ব্যক্তি ও যে দলটিই তার ওপর চলেছে সে তোমার অনুগ্রহ লাভ করেছে এবং তোমার দানে তার জীবন পাত্র পরিপূর্ণ হয়েছে ৷
_________________________________
7) যাদের ওপর গযব পড়েনি এবং * যারা পথভ্রষ্ট হয়নি ৷
_________________________________

* অর্থাৎ 'অনুগ্রহ' লাভকারী হিসাবে আমরা এমন সব লোককে চিহ্নিত করিনি যারা আপাতদৃষ্টিতে সাময়িকভাবে তোমার পার্থিব অনুগ্রহ লাভ করে থাকে ঠিকই কিন্তু আসলে তারা হয় তোমার গযব ও শাস্তির অধিকারী এবং এভাবে তারা নিজেদের সাফল্য ও সৌভাগ্যের পথ হারিয়ে ফেলে ৷ এ নেতিবাচক ব্যাখ্যায় একথা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে , 'অনুগ্রহ' বলতে আমরা যথার্থ ও স্থায়ী অনুগ্রহ বুঝাচ্ছি , যা আসলে সঠিক পথে চলা ও আল্লাহর সন্তোষ লাভের ফলে অর্জিত হয় ৷ এমন কোন সাময়িক ও লোক দেখানো অনুগ্রহ নয়, যা ইতিপূর্বে ফেরাউন , নমরূদ ও কারূনরা লাভ করেছিল এবং আজো আমাদের চোখের সামনে বড় বড় যালেম , দুস্কৃতিকারী ও পথভ্রষ্টরা যেগুলো লাভ করে চলেছে ৷

 

সুরা ফাতিহা : আয়াত ২-৩-৪

2) যিনি পরম দয়ালু ও করুণাময় *
  الرَّحۡمٰنِ الرَّحِيۡمِ ۙ

* মানুষের দৃষ্টিতে কোন জিনিস খুব বেশী বলে প্রতীয়মান হলে সেজন্য সে এমন শব্দ ব্যবহার করে যার মাধ্যমে আধিক্যের প্রকাশ ঘটে ৷ আর একটি আধিক্যবোধক শব্দ বলার পর যখন সে অনুভব করে যে ঐ শব্দটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জিনিসটির আধিক্যের প্রকাশ করা সন্ভব হয়নি তখন সে সেই একই অর্থে আর একটি শব্দ ব্যবহার করে ৷ এভাবে শব্দটির অন্তরনিহিত গুণের আধিক্য প্রকাশের ব্যাপারে যে কমতি রয়েছে বলে সে মনে করছে তা পূরণ করে৷ আল্লাহর প্রশংসায় 'রহমান' শব্দের পরে আবার 'রহীম' বলার মধ্যেও এই একই নিগূঢ় তত্ত্ব নিহিত রয়েছে ৷ আরবী ভাষায় 'রহমান' একটি বিপুল আধিক্যবোধক শব্দ ৷ কিন্তু সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর রহমত ও মেহেরবানী এত বেশী ও ব্যাপক এবং এত সীমাসংখ্যাহীন যে, তা বয়ান করার জন্য সবচেয়ে বেশী ও বড় আধিক্যবোধক শব্দ ব্যবহার করার পরও মন ভরে না ৷ তাই তার আধিক্য প্রকাশের হক আদায় করার জন্য আবার 'রহীম' শব্দটিও বলা হয়েছে ৷ এর দৃষ্টান্ত এভাবে দেয়া যেতে পারে, যেমন আমরা কোন ব্যক্তির দানশীলতার গুণ বর্ণনা করার জন্য 'দাতা' বলার পরও যখন অতৃপ্তি অনুভব করি তখন এর সাথে 'দানবীর' শব্দটিও লাগিয়ে দেই৷ রঙের প্রশংসায় 'সাদা' শব্দটি বলার পর আবার 'দুধের মতো সাদা' বলে থাকি ৷



3) প্রতিদান দিবসের মালিক
مٰلِكِ يَوۡمِ الدِّيۡنِ

* অর্থাৎ যেদিন মানবজাতির পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত বংশধরদেরকে একত্র করে তাদের জীবনের সমগ্র কর্মকান্ডের হিসেব নেয়া হবে ৷ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার পূর্ন কর্মফল দেয়া হবে ৷ তিনি সেই দিনের একচ্ছত্র অধিপতি , আল্লাহর প্রশংসায় রহমান ও রহীম শব্দ ব্যবহার করার পর তিনি প্রতিদান দিবসের মালিক একথা বলায় এখান থেকে এ অর্থও প্রকাশিত হয় যে, তিনি নিছক দয়ালু ও করুণাময় নন বরং এই সংগে তিনি ন্যায় বিচারকও ৷ আবার তিনি এমন ন্যায় বিচারক যিনি হবেন শেষ বিচার ও রায় শুনানীর দিনে পরিপূর্ণ ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মালিক সেদিন তিনি শাস্তি প্রদান করলে কেউ তাতে বাধা দিতে পারবে না ৷ এবং পুরস্কার দিলেও কেউ ঠেকাতে পারবে না ৷ কাজেই তিনি আমাদের প্রতিপালন করেন ও আমাদের প্রতি করুণা করেন এ জন্য যে আমরা তাঁকে ভালোবাসি শুধু এতটুকুই নয় বরং তিনি ইনসাফ ও ন্যায় বিচার করেন এ জন্য আমরা তাঁকে ভয়ও করি এবংএই অনুভূতিও রাখি যে , আমাদের পরিণামের ভালো মন্দ পুরোপুরি তাঁরই হাতে ন্যস্ত ৷



4) আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদাত করি এবং*  একমাত্র তোমারই কাছে সাহায্য চাই **
(اِيَّاكَ نَعۡبُدُ وَاِيَّاكَ نَسۡتَعِيۡنُ )
* ইবাদাত শব্দটিও আরবী ভাষায় তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে ৷ (১)পূজা ও উপাসনা করা , (২)আনুগত্য ও হুকুম মেনে চলা এবং (৩) বন্দেগী ও দাসত্ব করা ৷ এখানে একই সাথে এই তিনটি অর্থই প্রকাশিত হয়েছে ৷ অর্থাৎ আমরা তোমার পূজা-উপাসনা করি , তোমার আনুগত্য করি এবং তোমার বন্দেগী ও দাসত্বও করি ৷ আর আমরা তোমার সাথে এ সম্পর্কগুলো রাখি কেবল এখানেই কথা শেষ নয় বরং এ সম্পর্কগুলো আমরা একমাত্র তোমারই সাথে রাখি ৷ এই তিনটি অর্থের মধ্যে কোন একটি অর্থেও অন্য কেউ আমাদের মাবুদ নয় ৷


** অর্থাৎ তোমার সাথে আমাদের সম্পর্ক কেবল ইবাদাতের নয় বরং আমাদের সাহায্য প্রার্থনার সম্পর্কও একমাত্র তোমারই সাথে রয়েছে ৷ আমরা জানি তুমিই সমগ্র বিশ্ব-জাহানের রব ৷ সমস্ত শক্তি তোমারই হাতে কেন্দ্রভূত ৷ তুমি একাই যাবতীয় নিয়ামত ও অনুগ্রহের অধিকারী ৷ তাই আমাদের অভাব ও প্রয়োজন পূরণের জন্য আমরা একমাত্র তোমারই দুয়ারে ধর্ণা দেই ৷ তোমারই সামনে নিজেদের সুপর্দ করে দেই এবং তোমারই সাহায্যের ওপর নির্ভর করি ৷ এ জন্য আমাদের এই আবেদন নিয়ে আমরা তোমার দুয়ারে হাজির হয়েছি ৷ 



→ : সূরা-ফাতিহা : আয়াত ২-৩-৪ (ফেসবুক) 
→ : সূরা-ফাতিহা : আয়াত ২-৩-৪ (ওয়েবসাইট)

সবিস্তার সূচীপত্র
টেম্পলেট কাষ্টমাইজেশন - তরঙ্গ ইসলাম | তরঙ্গ ইসলাম