ইসলাম পরিচিতি

বইয়ের আলোচ্যসূচী :

» ইসলাম শব্দটির অর্থ ও কুফরের অনিষ্টকারিতা
» ঈমান ও আনুগত্য
» পয়গাম্বরীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
» হযরত মুহাম্মাদ (সা) -এর নবুয়াত (প্রমান ও অন্যান্য...)
» ঈমানের বিবরণ
» লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’-র প্রকৃত তাৎপর্য ও মানব জীবনে এর প্রভাব
» ফেরেশতা , আসমানী কিতাব ও রাসুলগণের প্রতি বিশ্বাস
» আখেরাতের বিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা ও যুক্তিসমূহ
» মৌলিক ইবাদতসমূহের তাৎপর্য
» ইসলামের সহায়তা
» দ্বীন ও শরীয়াত
» চার ধরনের অধিকার
» বিশ্বজনীন ও স্থায়ী বিধান


*.*.*.*

» ইসলাম শব্দটির অর্থ ও কুফরের অনিষ্টকারিতা
» ঈমান ও আনুগত্য
» পয়গাম্বরীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
» হযরত মুহাম্মাদ (সা) -এর নবুয়াত (প্রমান ও অন্যান্য...)
» ঈমানের বিবরণ
» লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’-র প্রকৃত তাৎপর্য ও মানব জীবনে এর প্রভাব
» ফেরেশতা , আসমানী কিতাব ও রাসুলগণের প্রতি বিশ্বাস
» আখেরাতের বিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা ও যুক্তিসমূহ
» মৌলিক ইবাদতসমূহের তাৎপর্য
» ইসলামের সহায়তা
» দ্বীন ও শরীয়াত
» চার ধরনের অধিকার
» বিশ্বজনীন ও স্থায়ী বিধান





পেজভিউ

অধ্যায় ০১ : ইসলাম শব্দটির অর্থ ও কুফরের অনিষ্টকারিতা

ইসলাম

ইসলাম নামকরন কেন

দুনিয়ায় যত রকম ধর্ম রয়েছে তার প্রত্যেকটির নামকরণ হয়েছে কোন বিশেষ ব্যক্তির নামে। অথবা যে জাতির মধ্যে তার জন্ম হয়েছে তার নামে। যেমন, ঈসায়ী ধর্মের নাম রাখা হয়েছে তার প্রচারক হযরত ঈসা (আ)- এর নামে। বৌদ্ধ ধর্ম মতের নাম রাখা হয়েছে তার প্রতিষ্ঠাতা মহাত্মা বুদ্ধের নামে। জেরদশতি ধর্মের নামও হয়েছে তেমনি তার প্রতিষ্ঠাতা জরদশতের নামে। আবার ইয়াহুদী ধর্ম জম্ম নিয়েছিল ইয়াহুদা নামে বিশেষ গোষ্ঠীর মধ্যে। দুনিয়ায় আরো যেসব ধর্ম রয়েছে, তাদেরর নামকরণ হয়েছে এমনিভাবে। অবশ্য নামের দিক দিয়ে ইসলামের রয়েছে একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। কোন বিশেষ ব্যক্তি অথবা জাতির সাথে তার নামের সংযোগ নেই। বরং ‘ইসলাম’ শব্দটির অর্থের মধ্যের আমরা একটি বিশেষ গুণের পরিচয় পাই, সেই গুণই প্রকাশ পাচ্ছে এ নামে। নাম থেকেই বুঝা যায় যে, ইসলাম কোন এক ব্যক্তির আবিষ্কার নয়, কোন এক জাতির মধ্যে এ ধর্ম সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম কোন বিশেষ ব্যক্তি, দেশ অথবা জাতির সম্পত্তি নয়। তার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইসলামের গুণরাজি সৃষ্টি করা। প্রত্যেক যুগে প্রত্যেক কওমের যেসব খাঁটি ও সৎলোকের মধ্যে এসব গুণ পাওয়া গেছে, তারা ছিলেন ‘মুসলিম’। এ ধরনের লোক আজো রয়েছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন।

ইসলাম শব্দটির অর্থ

আরবী ভাষায় ‘ইসলাম’ বলতে বুঝায় আনুগত্য ও বাধ্যতা। আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও তার বাধ্যতা স্বীকার করে নেয়া এ ধর্মের লক্ষ্য বলেই এর নাম হয়েছে ‘ইসলাম’।

ইসলামের তাৎপর্য

সকলেই দেখতে পাচ্ছে যে, চন্দ্র, সূর্য, তারা এবং বিশ্বের যাবতীয় সৃষ্টি চলছে এক অপরিবর্তনীয় বিধান মেনে। সেই বিধানের বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম হবার উপায় নেই। দুনিয়া এক নির্দিষ্ট গতিতে ঘুরে চলছে এক নির্দিষ্ট পথ অতিক্রম করে। তার চলার জন্য যে সময়, যে গতি ও পথ নির্ধারিত রয়েছে, তার কোন পরিবর্তন নেই কখনো। পানি আর হাওয়া, তাপ আর আলো- সব বিছুই কাজ করে যাচ্ছে এক সঠিক নিয়মের অধীন হয়ে। জড়, গাছপালা, পশু-পাখীর রাজ্যেরও রয়েছে তাদের নিজস্ব নিয়ম। সেই নিয়ম মুতাবিক তারা পয়দা হয়, বেড়ে ওঠে, ক্ষয় হয়, বাঁচে ও মরে। মানুষের অবস্থা চিন্তা করলে দেখতে পাই যে, সেও এক বিশেষ প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন। এক নির্দিষ্ট জীবতাত্ত্বিক বিধান অনুযায়ী সে জম্মে, শ্বাস গ্রহণ করে, পানি, খাদ্য, তাপ ও আলো আত্মস্থ করে বেঁচে থাকে। তার হৃৎপিন্ডের গতি, তার দেহের রক্তপ্রবাহ, তার শ্বাস-প্রশ্বাস একই বাঁধাধরা নিয়মের অধীন হয়ে চলছে। তার মস্তিষ্ক, পাকস্থলী, শিরা-উপশিরা, পেশীসমূহ, হাত, পা, জিভ, কান, নাক-- এক কথায় তার দেহের প্রতিটি অংগ- প্রত্যংগ কাজ করে যাচ্ছে সেই একই পদ্ধতিতে যা তাদের প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত হয়েছে।

যে শক্তশালী বিধানের অধীনে চলতে হচ্ছে দুনিয়া জাহানের বৃহত্তম নক্ষত্র থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রতম কণিকা পর্যন্ত সবকিছু, তা হচ্ছে এক মহাশক্তিমান বিধানকর্তার সৃষ্টি। সমগ্র সৃষ্টি এবং সৃষ্টির প্রতিটি পদার্থ এ বিধানকর্তার আনুগত্য স্বীকার করে এবং সবাই মেনে চলে তাঁরই দেয়া নিয়ম। আগেই আমি বলেছি যে, দুনিয়া- জাহানের প্রভু আল্লাহ তা’য়ালার আনুগত্য ও তারই নিকট আত্মসমর্পণের নামই ইসলাম, তাই এদিক দিয়ে সমগ্র সৃষ্টির ধর্মই হচ্ছে ইসলাম। চন্দ্র, সূর্য, তারা গাছপালা, পাথর ও জীব-জানোয়ার সবাই মুসলিম! যে মানুষ আল্লাহকে চেনে না, যে তাঁকে অস্বীকার করে, যে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে পূজা করে এবং যে আল্লাহর কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে অন্য কাউকে অংশীদার করে, স্বভাব-প্রকৃতির দিক দিয়ে সেও মুসলিম, কারণ তার জীবন-মৃত্যু সব কিছুই আল্লাহর বিধানের অনুসারী। তার প্রতিটি অংগ-প্রত্যংগ, তার দেহের প্রতিটি অণু ইসলাম মেনে চলে কারণ তার সৃষ্টি, বৃদ্ধি ও গতি সবকিছুই আল্লাহর দেয়া নিয়মের অধীন। মূর্খতাবশত যে জিহবা দিয়ে সে শিরক ও কুফরের কথা বলছে, প্রকৃতির দিক দিয়ে তাও মুসলিম। যে মাথাকে জোরপূর্বক আল্লাহ ছাড়া অপরের সামনে অবনত করছে, সেও জম্মগতভাবে মুসলিম, অজ্ঞতার বশে যে হৃদয় মধ্যে সে অপরের প্রতি সম্মান ও ভালবাসা পোষণ করে, তাও সহজাত প্রকৃতিতে মুসলিম। তারা সবাই আল্লাহর নিয়মের অনুগত এবং তাদের সব কাজ চলছে এ নিয়মের অনুসরন করে।

এবার আর এক আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপারটি বিবেচনা করে দেখা যাক।

প্রকৃতির লীলাখেলার মধ্যে মানুষের অস্তিত্বের রয়েছে দু’টি দিক। এক দিকে সে অন্যান্য সৃষ্টির মতোই জীব-জগতের নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা রয়েছে। তাকে মেনে চলতে হয় সেই নিয়ম। অপরদিকে, তার রয়েছে জ্ঞানের অধিকার, চিন্তা করে বুঝে কোন বিশেষ সিদ্ধান্তে পৌছার ক্ষমতা তার করায়ত্ত। নিজের ইখতিয়ার অনুযায়ী কোন বিশেষ মতকে সে মেনে চলে, আবার কোন বিশেষ মতকে সে অমান্য করে কোন পদ্ধতি সে পছন্দ করে, কোন বিশেষ পদ্ধতিকে আবার পছন্দ করে না। জীবনের কার্যকলাপের ক্ষেত্রে কখনো কোন নিয়ম-নীতিকে সে স্বেচ্ছায় তৈরী করে নেয়, কখনো বা অপরের তৈরী নিয়ম-নীতিকে নিজের করে নেয়। এদিক দিয়ে সে দুনিয়ার অন্যবিধ সৃষ্ট পদার্থের মতো একই ধরাবাঁধা নিয়মের অধীন নয়, বরং তাকে দেয়া হয়েছে নিজস্ব চিন্তা, মতামত ও কর্মের স্বাধীনতা।

মানবজীবনে এ দু’টি দিকেরই রয়েছে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব। প্রথম বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে মানুষ দুনিয়ার অপর সব পদার্থের মতই জম্মগত মুসলিম এবং আমি আগে যা বলেছি সেই অনুসারে মুসলিম হতে সে বাধ্য। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে মুসলিম হওয়া বা না হওয়ার উভয়বিধ ক্ষমতা তার মধ্য রয়েছে এবং এ নির্বাচন ক্ষমতার প্রভাবেই মানুষ বিভক্ত হয়েছে দু’টি শ্রেণীতে।

এক শ্রেনীর মানুষ হচ্ছে তারা, যারা তাদের স্রষ্টাকে চিনেছে, তাকেই তাদের একমাত্র মনিব ও মালিক বলে মেনে নিয়েছে এবং যে ব্যাপারে তাদেরকে নির্বাচনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, সেখানেও তারই নির্ধারিত কানুন মেনে চলবার পথই তারা বেছে নিয়েছে, তারা হয়েছে পরিপূর্ণ মুসলিম। তাদের ইসলাম হয়েছে পূর্ণাঙ্গ। কারণ তাদের জীবনই পরিপূর্ণরূপে আল্লাহতে সমর্পিত। না জেনে-শুনে যার নিয়মের আনুগত্য তারা করছে জেনে-শুনেও তারই আনুগত্যের পথই তারা অবলম্বন করেছে। অনিচ্ছায় তারা আল্লাহর বাধ্যতার পথে চলেছিল, স্বেচ্ছায়ও তারই বাধ্যতার পথ তারা বেছে নিয়েছে। তারা হয়েছে এখন সত্যিকার জ্ঞানের অধিকারী। কারণ যে আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছেন জানবার ও শিখবার ক্ষমতা, সেই আল্লাহকেই তারা জেনেছে। এখন তারা হয়েছে সঠিক যুক্তি ও বিচার ক্ষমতার অধিকারী। কারণ, যে আল্লাহ তাদেরকে চিন্তা করবার, বুঝবার ও সঠিক সিদ্ধান্ত কায়েম করবার যোগ্যতা দিয়েছে। তাদের জিহবা হয়েছে সত্যভাষী, কেননা সেই প্রভুত্বের স্বীকৃতি ঘোষণা করেছে তারা, যিনি তাদেরকে দিয়েছেন কথা বলার শক্তি। এখন তদের পরিপূর্ণ জীবনই হয়েছে পূর্ণ সত্যাশ্রয়ী। কারণ ইচ্ছা-অনিচ্ছায় উভয় অবস্থায়ই তারা হয়েছে একমাত্র আল্লাহর বিধানের অনুসারী। সমগ্র সৃষ্টির সাথেই তাদের মিতালী। কারণ সৃষ্টির সকল পদার্থ যার দাসত্ব করে যাচ্ছে, তারাও করেছে তারই দাসত্ব। দুনিয়ার বুকে তারা হচ্ছে আল্লাহর খলীফা (প্রতিনিধি) সারা দুনিয়া এখন তাদেরই এবং তারা হচ্ছে আল্লাহর।

কুফরের তাৎপর্য

যে মানুষের কথা উপরে বলা হলো, তার মুকাবিলায় রয়েছে আর এক শ্রেনীর মানুষ। সে মুসলিম হয়েই পয়দা হয়েছে এবং না জেনে, না বুঝে জীবনভর মুসলিম হয়েই থেকেছে। কিন্তু নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সে আল্লাহকে চেনেনি এবং নিজের নির্বাচন ক্ষমতার সীমানার মধ্যে সে আল্লাহর আনুগত্য করতে অস্বীকার করেছে। এ ধরনের লোক হচ্ছে কাফের। ‘কুফর’ শব্দটির আসল অর্থ হচ্ছে কোন কিছু ঢেকে রাখা বা গোপন করা। এ ধরনের লোকে ‘কাফের’ (গোপনকারী) বলা হয়, কারণ সে তার আপন স্বভাবের উপর ফেলেছে অজ্ঞতার পর্দা। সে পয়দা হয়েছে ইসলামী স্বভাব নিয়ে। তার সারা দেহ ও দেহের প্রতিটি অংগ কাজ করে যাচ্ছে ইসলামী স্বভাবেরই উপর তার পারিপার্শ্বিক সারা দুনিয়ার এবং তার নিজের সহজাত প্রকৃতি সরে গেছে তার দৃষ্টি থেকে। সে এ প্রকৃতির বিপরীত চিন্তা করেছে। তার বপরীতমূখী হয়ে চলবার চেষ্টা করেছে।
এখন বুঝা গেল, যে মানুষ কাফের, সে কত বড় বিভ্রান্তিতে ডুবে আছে।

কুফরের অনিষ্টকারিতা

'কুফর’ হচ্ছে এক ধরনের মূর্খতা, বরং কুফরই হচ্ছে আসল মূর্খতা। মানুষ আল্লাহকে না চিনে অজ্ঞ হয়ে থাকলে তার চায়ে বড় মূর্খতা আর কি হতে পারে? এক ব্যক্তি দিন-রাত দেখেছে, সৃষ্টির এত বড় বিরাট কারখানা চলেছে, অথচ সে জানে না, কে এ কারখানার স্রষ্টা ও চালক। কে সে কারিগর, যিনি কয়লা, লোহা, ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম ও আরো কয়েকটি পদার্থ মিলিয়ে অস্তিত্বে এনেছেন মানুষের মত অসংখ্য অতুলনীয় সৃষ্টিকে? মানুষ দুনিয়ার চারিদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে পাচ্ছে এমন সব বস্তু ও কার্যকলাপ, যার ভিতরে রয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং, গণিতবিদ্যা, রসায়ন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার অপূর্ব পূর্ণতার নিদর্শন; কিন্তু সে জানে না, অসাধারণ সীমাহীন জ্ঞান- বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ কোন সে সত্তা চালিয়ে যাচ্ছেন সৃস্টির এসব কার্যকলাপ। ভাবা দরকার যে মানুষ জ্ঞানের প্রাথমিক স্তরের খবরও জানে না, কি করে তার দৃষ্টির সামনে উম্মুক্ত হবে সত্যিকার জ্ঞানের তোরণদ্বার? যতই চিন্তা-ভাবনা করুক, যতই অনুসন্ধান করুক, সে কোন দিকেই পাবে না সরল- সঠিক নির্ভরযোগ্য পথ, কেননা তার প্রচেষ্টার প্রারম্ভ ও সমাপ্তি সব স্তরেই দেখা যাবে অজ্ঞতার অন্ধকার।

কুফর একটি যুলুম, বরং সবচেয়ে বড় যুলুমই হচ্ছে এ কুফর। যুলুম কাকে বলে? যুলুম হচ্ছে কোন জিনিস থেকে তার সহজাত প্রকৃতির খেলাপ কাজ যবরদস্তি করে আদায় করে নেয়া? আগেই জানা গেছে যে, দুনিয়ায় যত জিনিস রয়েছে, সবাই আল্লাহর ফরমানের অনুসারী এবং তাদের সহজাত প্রকৃতি (ফিতরাত) হচ্ছে ‘ইসলাম’ অর্থাৎ আল্লাহর বিধানের আনুগত্য। মানুষের দেহ ও তার প্রত্যেকটি অংশ এ প্রকৃতির উপর জম্ম নিয়েছে। অবশ্যি আল্লাহ এসব জিনিসকে পরিচালনা করবার বিছুটা স্বাধীনতা মানুষকে দিয়েছেন, কিন্তু প্রত্যেকটি জিনিসের সহজাত প্রকৃতির দাবী হচ্ছে এই যে, আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে যেন কাজে লাগানো হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি ‘কুফর’ করছে সে তাকে লাগাচ্ছে তার প্রকৃতি বিরোধী কাজে। সে নিজের দিলের মধ্যে অপরের শ্রেষ্ঠত্ব, প্রেম ও ভীতি পোষণ করছে অথচ তার দিলের প্রকৃতি দাবী করছে যে, সে তার মধ্যে একমাত্র আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রেম ও ভীতি পোষণ করবে। সে তার অংগ-প্রত্যংগ আর দুনিয়ায় তার আধিপত্যের অধীন সব জিনিসকে কাজে লাগাচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা বিরোধী উদ্দেশ্য সাধনের জন্য, অথচ তাদের প্রকৃতির দাবী হচ্ছে তাদের কাছ থেকে আল্লাহর বিধান মুতাবিক কাজ আদায় করা। এমনি করে যে লোক জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রত্যেকটি জিনিসের উপর এমন কি, নিজের অস্তিত্বের উপর ক্রমাগত যুলুম করে যাচ্ছে, তার চেয়ে বড় যালেম আর কে হতে পারে?

'কুফর’ কেবল যুলুমই নয়, বিদ্রোহ, অকৃতজ্ঞতা ও নেমকহারামিও বটে। ভেবে দেখা যাক, মানুষের আপন বলতে কি জিনিস আছে। নিজের মস্তিষ্ক সে নিজেই পয়দা করে নিয়েছে না আল্লাহ পয়দা করেছেন? নিজের দিল, চোখ, জিভ, হাত-পা, আর সব অংগ-প্রত্যংগ- সবকিছুর স্রষ্টা মানুষ না আল্লাহ? তার চারপাশে যত জিনিস রয়েছে, তার স্রষ্টা মানুষ না আল্লাহ এসব জিনিস মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ও কার্যকরী করে তৈরী করা এবং মানুষকে তা কাজে লাগাবার শক্তি দান করা কি মানুষের নিজের না আল্লাহর কাজ? সকলেই বলবে, আল্লাহরই এসব জিনিস, তিনিই এগুলো পয়দা করেছেন, তিনিই সব কিছুর মালিক এবং আল্লাহর দান হিসেবেই মানুষ আধিপত্য লাভ করেছে এসব জিনিসের উপর। আসল ব্যাপার যখন এই তখন যে লোক আল্লাহর দেয়া মস্তিষ্ক থেকে আল্লাহরই ইচ্ছার বিপরীত চিন্তা করার সুবিধা আদায় করে নেয়, তার চেয়ে বড় বিদ্রোহী আর কে? আল্লাহ তাকে চোখ, জিভ, হাত-পা, এবং আরো কত জিনিস দান করেছেন, তা সবকিছুই সে ব্যবহার করেছে আল্লাহর পছন্দ ও ইচ্ছা বিরোধী কাজে। যদি কোন ভৃত্ব তার মনিবের নেমক খেয়ে তার বিশ্বাসের প্রতিকূল কাজ করে যায়, তবে তাকে সকলেই বলবে নেমকহারাম। কোন সরকারী অফিসার যদি সরকারের দেয়া ক্ষমতা সরকারের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে থাকে, তাকে বলা হবে বিদ্রোহী।

যদি কোন ব্যক্তি তার উপকারী বন্ধুর সাথে প্রতারণা করে সকলেই বিনা দ্বিধায় তাকে বলবে অকৃতজ্ঞ। কিন্তু মানুষের সাথে মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা ও অকৃতজ্ঞতার বাস্তবতা কতখানি? মানুষ মানুষকে আহার দিচ্ছে কোত্থেকে? সে তো আল্লাহরই দেয়া আহার। সরকার তার কর্মচারীদেরকে যে ক্ষমতা অর্পণ করে, সে ক্ষমতা এলো কোত্থেকে? আল্লাহই তো তাকে রাজ্য পরিচালনার শক্তি দিয়েছেন। কোন উপকারী ব্যক্তি অপরের উপকার করছে কোত্থেকে? সবকিছুই তো আল্লাহর দান। মানুষের উপর সবচেয়ে বড় হক বাপ-মার অন্তরে সন্তান বাৎসল্য উৎসারিত করেছেন কে? মায়ের বুকে স্তন দান করেছেন কে? বাপের অন্তরে কে এমন মনোভাব সঞ্চার করেছেন, যার ফলে তিনি নিজের কঠিন মেহনতের ধন সানন্দে একটা নিষ্ক্রিয় মাংসপিন্ডের জন্য লুটিয়ে দিচ্ছেন এবং তার লালন-পালন ও শিক্ষার জন্য নিজের সময়, অর্থ ও সুখ- স্বাচ্ছন্দ্য কুরবান করে দিচ্ছেন? যে আল্লাহ মানুষের আসল কল্যাণকারী, প্রকৃত বাদশাহ, সবার বড় পরওয়ারদিগার, মানুষ যদি তার প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করে, তাকে আল্লাহ বলে না মানে, তার দাসত্ব অস্বীকার করে, আর তার আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে গুরুতর বিদ্রোহ, অকৃতজ্ঞতা ও নেমকহারামী আর কি হতে পারে।

কখনো মনে করা যেতে পারে না যে, কুফরি করে মানুষ আল্লাহর কোন অনিষ্ট করতে পারছে। যে বাদশাহর সাম্রাজ্য এত বিপুল-বিরাট যে, বৃহত্তম দূরবীন লাগয়েও আমরা আজো স্থির করতে পারিনি কোথায় তার শুরু আর কোথায় শেষ। যে বাদশাহ এমন প্রবল প্রতাপশালী যে, তার ইশারায় আমাদের এ পৃথিবী, সূর্য, মঙ্গলগ্রহ এবং আরো কোটি কোটি গ্রহ-উপগ্রহ বলের মতো চক্রাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যে বাদশাহ এমন অফুরন্ত সম্পদশালী যে, সারা সৃষ্টির আধিপত্যে কেহ তার অংশীদার নেই, যে বাদশাহ এমন স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল যে, সবকিছুই তার মুখাপেক্ষী অথচ তিনি কারুর মুখাপেক্ষী নন, মানুষের এমন কি অস্তিত্ব আছে যে তাকে মেনে বা না মেনে সেই বাদশাহর কোন অনিষ্ট করবে? কুফর ও বিদ্রোহের পথ ধরে মানুষ তার কোন ক্ষতি করতে পারে না, বরং নিজেই নিজের ধ্বংসের পথ খোলাসা করে।

কুফর ও নাফরমানীর অবশ্যম্বাবী ফল হচ্ছে এই যে, এর ফলে মানুষ চিরকালের জন্য ব্যর্থ ও হতাশ হয়ে যায়। এ ধরনের লোক জ্ঞানের সহজ পথ কখনো পাবে না, কারণ যে জ্ঞান আপন স্রষ্টাকে জানে না, তার পক্ষে আর কোন জিনিসের সত্যিকার পরিচয় লাভ অসম্ভব। তার বুদ্ধি সর্বদা চালিত হয় বাকা পথ ধরে, কারণ সে তার স্রষ্টার পরিচয় লাভ করতে গিয়ে ভুল করে, আর কোন জিনিসকেও সে বুঝতে পারে না নির্ভুলভাবে। নিজের জীবনের প্রত্যেকটি কার্যকলাপে তার ব্যর্থতার পর ব্যর্থতা অবধারিত। তার নীতিবোধ, তার কৃষ্টি, তার সমাজ ব্যবস্থা, তার জীবিকা অর্জন পদ্ধতি, তার শাসন-পরিচালনা ব্যবস্থা ও রাজনীতি, এক কথায় তার জীবনের সর্ববিধ কার্যকলাপ বিকৃতির পথে চালিত হতে বাধ্য। দুনিয়ার বুকে সে বিশৃংখলা সৃষ্টি করবে, খুন-খারাবি করবে, অপরের অধিকার হরণ করবে, অত্যাচার উৎপীড়ন করবে। বদখেয়াল, অন্যায়- অনাচার ও দুষ্কৃতি দিয়ে তার নিজের জীবনকেই করে তুলবে তিক্ত-বিস্বাদ। তারপর এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে সে যখন আখেরাতের দুনিয়ায় পৌছবে, তখন জীবনভর যেসব জিনিসের উপর সে যুলুম করে এসেছে, তারা তার বিরুদ্ধে নালিশ করবে। তার মস্তিষ্ক, তার দিল, তার চোখ, তার কান, তার হাত-পা এক কথায় তার সব অংগ-প্রত্যংগ আল্লাহর আদালতে অভিযোগ করে বলবেঃ এ আল্লাহদ্রোহী যালেম তার বিদ্রোহের পথে জবরদস্তি করে আমাদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিয়েছে। যে দুনিয়ার বুকে সে নাফরমানীর সাথে চলেছে ও হারাম পথে রোযগার করে হারামের পথে ব্যয় করেছে, অবাধ্যতার ভিতর দিয়ে যেসব জিনিস সে জবরদখল করেছে, যেসব জিনিস সে তার বিদ্রোহের পথে কাজে লাগিয়েছে, তার সবকিছুই ফরিয়াদী হয়ে হাযির হবে তার সামনে এবং প্রকৃত ন্যায় বিচারক আল্লাহ সেদিন মযলুমদের প্রতি অন্যায়ের প্রতিকারে বিদ্রোহীকে দিবেন অপমানকর শাস্তি।

ইসলামের কল্যাণ

এতো গেলো কুফরের অনিষ্টকারিতা। এবার আমরা দেখবো ইসলামের পথ ধরলে কি কি কল্যাণ লাভ করা যায়।
উপরের বর্ণনা থেকে জানা গেছে যে, এ দুনিয়ার প্রত্যেক দিকে ছড়িয়ে রয়েছে আল্লাহর কর্তৃত্বের অসংখ্য নিদর্শন। সৃষ্টির এ বিপুল বিরাট যে কারখানা চলছে এক সুম্পন্ন বিধান ও অটল কানুনের অধীন হয়ে, তাই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, তার স্রষ্টা ও পরিচালক এক মহাশক্তিমান শাসক-- যার ব্যবস্থাপনায় কেউ অবাধ্য হয়ে থাকতে পারে না। সমগ্র সৃষ্টির মত মানুষেরও প্রকৃতি হচ্ছে তার আনুগত্য। কাজেই অচেতনভাবে সে রাত-দিন তারই আনুগত্য করে যাচ্ছে, কারণ তার প্রাকৃতিক নিয়মের প্রতিকুল আচরণ করে সে বেঁচেই থাকতে পারে না।

কিন্তু আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান আহরণের যোগ্যতা, চিন্তা ও উপলব্ধি করার শক্তি এবং সৎ ও অসতের পার্থক্য বুঝবার ক্ষমতা দিয়ে তাকে ইচ্ছাশক্তি ও নির্বাচন ক্ষমতার কিছুটা আযাদী দিয়েছেন। আসলে এ আযাদীর ভিতরেই মানুষের পরীক্ষা, তার জ্ঞানের পরীক্ষা, তার যুক্তির পরীক্ষা, তার পার্থক্য অনুভূতির পরীক্ষা। এছাড়া তাকে যে আযাদী দেয়া হয়েছে, কিভাবে সে তা ব্যবহার করছে, তারও পরীক্ষা এর মধ্যে। এ পরীক্ষায় কোন বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করতে মানুষকে বাধ্য করা হয়নি, কারণ বাধ্যতা আরোপ করলে পরীক্ষার উদ্দেশ্যই হয় ব্যাহত। এ কথা প্রত্যেকেই বুঝতে পারে যে, প্রশ্নপত্র হাতে দেয়ার পর যদি পরীক্ষার্থীকে কোন বিশেষ ধরনের জবাব দিতে বাধ্য করা হয়, তাহলে সে ধরনের পরীক্ষা ফলপ্রসূ হয় না। পরীক্ষার্থীর আসল যোগ্যতা তা কেবল তখনই প্রমাণিত হবে, যখন তাকে প্রত্যেক ধরনের জবাব পেশ করবার স্বাধীনতা দেয়। সে সঠিক জবাব দিতে পারলে হবে সফল এবং আগামী উন্নতির দরযা খুলে যাবে তার সামনে। আর ভুল জবাব দিলে হবে অকৃতকার্য এবং অযোগ্যতার দরুন নিজেই নিজের উন্নতির পথ করবে অবরুদ্ধ। ঠিক তেমনি করেই আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে এ পরীক্ষায় যে কোন পথ অবলণম্বন করার স্বাধীনতা দিয়েছেন।

এ ক্ষেত্রে এখন এক ব্যক্তির কথা বলা যায়, যে নিজের ও সৃষ্টির সহজাত প্রকৃতি উপলব্ধ করেনি, স্রষ্টার সত্ত্বা ও গুণরাজি চিনতে যে ভুল করেছে এবং মুক্তবুদ্ধির যে স্বাধীনতা তাকে দেয়া হয়েছে, তার সাহায্যে না-ফরমানী ও অবাধ্যতার পথ অবলম্বন করে চলেছে। এ ব্যক্তি জ্ঞান, যুক্তি, পার্থক্য-অনুভূতি ও কর্তব্য নিষ্ঠার পরীক্ষায় ব্যর্থকাম হয়েছে। সে নিজেই প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সে প্রত্যেক দিক দিয়েই নিকৃষ্ট স্তরের লোক। তাই উপরে বর্ণিত পরিণামই তার জন্য প্রতীক্ষা করছে।

অন্যদিকে রয়েছে আর এক ব্যক্তি, যে এ পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করেছে সে জ্ঞান ও যুক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে আল্লাহকে জেনেছে ও মেনেছে, যদিও এ পথ ধরতে তাকে বাধ্য করা হয়নি। সৎ ও অসতের মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে সে ভুল করেনি এবং নিজস্ব স্বাধীন নির্বাচন ক্ষমতা দ্বারা সে সৎ পথই বেছে নিয়েছে, অথচ অসৎ পথের দিকে চালিত হবার স্বাধীনতা তার ছিল। সে আপন সহজাত প্রকৃতিকে উপলব্ধি করেছে, আল্লাহকে চিনিছে এবং না-ফরমানীর স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর আনুগত্যের পথ অবলম্বন করেছে। সে তার যুক্তিকে ঠিক পথে চালিত করেছে। চোখ দিয়ে ঠিক জিনিসই দেখেছে, কান দিয়ে ঠিক কথা শুনেছে, মস্তিষ্ক চালনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত করেছে বলেই পরীক্ষায় সে সাফল্য-গৌরবের অধিকারী হয়েছে। সত্যকে চিনে নিয়ে সে প্রমাণ করেছে যে, সত্য সাধক এবং সত্যের সামনে মস্তক অবনত করে দেখিয়েছিল যে, সে সত্যের পূজারী।

এ কথায় সন্দেহ নেই যে, যার মধ্যে এসব গুণরাজির সমাবেশ হয়, সে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় ক্ষেত্রেই সাফল্যের অধিকারী হয়ে থাকে।

এ শ্রেণীর লোক জ্ঞান ও যুক্তির প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সঠিক পথ অবলম্বন করবে, কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহর সত্তাকে উপলব্ধি করেছে এবং তার গুণরাজির পরিচয় লাভ করেছে, সেই জ্ঞানের সূচনা থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত সবকিছুই জেনেছে এ ধরনের লোক কখনো বিভ্রান্তির পথে চলতে পারে না, কারণ শুরুতেই সে পদক্ষেপ করেছে সত্যের দিকে এবং তার সর্বশেষ গন্তব্য লক্ষ্যকেও সে জেনে নিয়েছে পূর্ণ বিশ্বাস সহকারে। এরপর সে দার্শনিক চিন্তা ও অনুসন্ধানের মারফতে সৃষ্টি রহস্য উদঘাটন করবার চেষ্টা করবে, কিন্তু কাফের দার্শনিকের মতো কখনো সংশয়-সন্দেহের বিভ্রান্তি-স্তূপের মধ্যে নিমজ্জিত হবে না । বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সে প্রাকৃতিক নিয়মকে উপলব্ধি করবার চেষ্টা করবে, সৃষ্টির লুক্কায়িত ধনভান্ডারকে নিয়ে আসবে প্রকাশ্য আলোকে। দুনিয়ায় ও মানুষের দেহে আল্লাহ যে শক্তিসমূহ সৃষ্টি করে দিয়েছেন, তার সবকিছুরই সন্ধান করে সে জেনে নেবে। যমীন ও আসমানে যত পদার্থ রয়েছে, তার সব কিছুকেই কাজে লাগাবার সর্বোত্তম পন্থার সন্ধান সে করবে, কিন্তু আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠা তাকে প্রতি পদক্ষেপে ফিরিয়ে রাখবে বিজ্ঞানের অপব্যবহার থেকে। আমিই এসব জিনিসের মালিক, প্রকৃতিকে আমি জয় করেছি, নিজের লাভের জন্য আমি জ্ঞানকে কাজে লাগাব, দুনিয়ায় আনব ধ্বংস-তান্ডব, লুট-তরাজ ও খুন-খারাবী করে সারা দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠা করব আমার শক্তির আধিপত্য, এ জাতীয় বিভ্রান্তিকর চিন্তায় সে কখনো নিমজ্জিত হবে না। এ হচ্ছে কাফের বিজ্ঞানীর কাজ। মুসলিম বিজ্ঞানী যত বেশী করে বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব অর্জন করবে, ততোই বেরে যাবে আল্লাহর প্রতি তার বিশ্বাস এবং ততোই সে আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দায় পরিণত হবে। তার মনোভাব হবেঃ আমার মালিক আমায় যে শক্তি দিয়েছেন এবং যেভাবে আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিয়েছেন, তা থেকে আমার নিজের ও দুনিয়ার সকল মানুষের কল্যাণ সাধনের চেষ্টা আমি করবো। এ হচ্ছে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সঠিক পথ।

অনুরূপভাবে ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যবিধ শাখায় মুসলিম তার গবেষণা ও কর্মতৎপরতার দিক দিয়ে কাফেরের পিছনে পড়ে থাকবে না, কিন্তু দু’জনের দৃষ্টিভংগি হবে স্বতন্ত্র। মুসলিম প্রত্যেক জ্ঞানের চর্চা করবে নির্ভুল দৃষ্টিভংগি নিয়ে, তার সামনে থাকবে এক নির্ভুল লক্ষ্য এবং সে পৌছবে এক নির্ভুল সিদ্ধান্তে। ইতিহাসে মানব জাতির অতীত দিনের পরীক্ষা থেকে সে গ্রহণ করবে শিক্ষা, খুঁজে বের করবে জাতিসমূহের উত্থান-পতনের সঠিক কারণ, অনুসন্ধান করবে তাদের তাহযীব তামাদ্দুসের কল্যাণের দিক। ইতিহাসে বিব্রত সৎ মানুষের অবস্থা আলোচনা করে সে উপকৃত হবে। যেসব কারণে অতীতের বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে, তা থেকে বেচে থাকবে। অর্থনীতি ক্ষেত্রে অর্থ উপার্জন ও ব্যয়ের এমন অভিনব পন্থা সে খুঁজে বের করবে, যাতে সকল মানুষের কল্যাণ হতে পারে, কেবল একজনের কল্যাণ ও অসংখ্য মানুষের অকল্যাণ তার লক্ষ্য হবে না। রাজনীতি ক্ষেত্রে তার পরিপূর্ণ মনোযোগ থাকবে এমন এক লক্ষ্য অর্জনের দিকে যাতে দুনিয়ায় শান্তি, ন্যায়-বিচার, সততা ও মহত্বের রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কোন ব্যক্তি বা দল আল্লাহর বান্দাহদেরকে নিজের বান্দায় পরিণত করতে না পারে, শাসন ক্ষমতা ও সম্পূর্ন শক্তিকে আল্লাহর আমানত মনে করা হয় এবং তা ব্যবহার করা হয় আল্লাহর বান্দাদের কল্যাণে। আইনের ক্ষেত্রে সে বিবেচনা করবে, যাতে ন্যায় ও সুবিচারের সাথে মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা যায় এবং কোন প্রকারে কারুর উপর যুলুম হতে না পারে।
মুসলিম চরিত্রে থাকবে আল্লাহ ভীতি, সত্যনিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়নতা। সবকিছুরই মালিক আল্লাহ, এ ধারণা নিয়ে সে বাস করবে দুনিয়ার বুকে। আমার ও দুনিয়ায় মানুষের দখলে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর দান। কোন জিনিসের এমন কি আমার নিজের দেহের ও দেহের শক্তির মালিকও আমি নিজে নই। সবকিছুই আল্লাহর আমানত এবং এ আমানত থেকে ব্যয় করবার যে স্বাধীনতা আমায় দেয়া হয়েছে, আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী তা প্রয়োগ করাই হচ্ছে আমার কর্তব্য। একদিন আল্লাহ তা’আলা আমার কাছ থেকে এ আমানত ফেরত নেবেন এবং সেদিন প্রত্যেকটি জিনিসের হিসেব দিতে হবে।

এ ধারণা নিয়ে যে ব্যক্তি দুনিয়ায় বেঁচে থাকে, তার চরিত্র সহজেই অনুমান করা যায়। কুচিন্তা থেকে সে তার মনকে মুক্ত রাখবে, মস্তিষ্ককে দুষ্কৃতির চিন্তা থেকে বাঁচিয়ে রাখবে, কানকে সংরক্ষণ করবে অসৎ আলোচনা শ্রবণ থেকে, কারোর প্রতি কুদৃষ্টি দেয়া থেকে চোখকে সংরক্ষণ করবে, জিহবাকে সংরক্ষণ করবে অসত্য উচ্চারণ থেকে। হারাম জিনিস দিয়ে পেট ভরার চেয়ে উপবাসী থাকাই হবে তার কাম্য। যুলুম করার জন্য সে কখনো তুলবে না তার হাত। সে কখনো তার পা চালাবে না অন্যায়ের পথে। মাথা কাটা গেলেও সে তার মাথা নত করবে না মিথ্যার সামনে। যুলুম ও অসত্যের পথে সে তার কোন আকাংখা ও প্রয়োজন মিটাবে না। তার ভিতর হবে সততা ও মহত্বের সমাবেশ। সত্য ও ন্যায়কে সে দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে অধিকতর প্রিয় মনে করবে এবং তার জন্য সে তার সকল স্বার্থ ও অন্তরের আকাংখা, এমন কি নিজস্ব সত্তাকে পর্যন্ত কুরবান করে দেবে। যুলুম ও অন্যায়কে সে ঘৃণা করবে সবচেয়ে বেশী এবং কোন ক্ষতির আশংকায় অথবা লাভের লোভে তার সমর্থন করতে অগ্রসর হবে না। দুনুয়ার সাফল্যও এ শ্রেণীর লোকই অর্জন করিতে পারে।

যার শির আল্লাহ ছাড়া আর কারুর কাছে অবনত হয় না, যার হাত আল্লাহ ছাড়া আর কারুর সামনে প্রসারিত হয় না, তার চেয়ে বেশী সম্মনের অধিকারী, তার চেয়ে বেশী সম্ভ্রান্ত আর কে হতে পারে? অপমান কি করে তার কাছে ঘেষবে?
যার দিলে আল্লাহ ছাড়া আর কারুর ভীতি স্থান পায় না, আল্লাহ ছাড়া আর কারুর কাছে সে পুরস্কারের ও ইনামের প্রত্যাশা করে না, তার চেয়ে বড় শক্তিমান আর কে? কোন শক্তি তাকে বিচ্যুত করতে পারে সত্য-ন্যায়ের পথ থেকে, কোন সম্পদ খরিদ করতে পারে তার ঈমানকে?

আরাম-পূজারী যে নয়, ইন্দ্রিয়পরতার দাসত্ব যে করে না, বল্গাহারা লোভী জীবন যার নয়, নিজ সৎ পরিশ্রম লব্ধ উপার্জনে যে খুশী, অবৈধ সম্পদের স্তুপ যার সামনে এলে সে ঘ্রীনাভরে উপেক্ষা করে, মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ শান্তি ও সন্তোষ যে লাভ করেছে, দুনিয়ায় তার চেয়ে বড় ধনী, তার চেয়ে বড় সম্পদশালী আর কে?

যে ব্যক্তি পত্যেক মানুষের অধিকার স্বীকার করে নেয়, কাউকে বঞ্চিত করে না তার ন্যায্য অধিকারে; প্রত্যেক মানুষের সাথে যে করে সদাচরণ, অসদাচরণ করে না কারুর সাথে, বরং প্রত্যেকেরই কল্যাণ প্রচেষ্টা যার কাম্য, অথচ তার প্রতিদানে সে কিছু চায় না, তার চেয়ে বড় বন্ধু ও সর্বজন প্রিয় আর কে হতে পারে? মানুষের মন আপনা থেকেই ঝুঁকে পড়ে তার দিকে, প্রত্যেকটি মানুষই বাধ্য হয় তাকে সম্মান ও প্রীতি দিয়ে কাছে টেনে নিতে।

তার চেয়ে বেশী বিশ্বস্ত দুনিয়ায় আর কেউ হতে পারে না, কারণ সে কারুর আমানত বিনষ্ট করে না, ন্যায়ের পথ থেকে মুখ ফিরায় না। প্রতিশ্রুতি পালন করে এবং আচরণের সততা প্রদর্শন করে, আর কেউ দেখুক আর না দেখুক আল্লাহ তো সবকিছুই দেখছেন, এ ধারণা নিয়ে সে সবকিছুই করে যাচ্ছে ঈমানদারীর সাথে। এমন লোকের বিশ্বস্ততা সম্পর্কে কে প্রশ্ন তুলবে, কে তার উপর ভরসা না করবে?

মুসলিম চরিত্র ভাল করে বুঝতে পারলেই বিশ্বাস করা যেতে পারে যে, দুনিয়ায় মুসলিম কখনো অপমানিত, বিজিত ও অপরের হুকুমের তাবেদার হয়ে থাকতে পারে না। সবসময়েই সে থাকবে বিজয়ী ও নেতা হয়ে, কারণ ইসলাম তার ভিতর যে গুণের জম্ম দিয়েছে তার উপর কোনো শক্তিই বিজয়ী হতে পারে না।

এমনি করে দুনিয়ায় ইজ্জত ও সম্মানের সাথে জীবন অতিবাহিত করে যখন সে তার প্রভুর সামনে হাযির হবে, তখন তার উপর বর্ষিত হবে আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ ও রহমাত, কারণ যে আমানত আল্লাহ তার নিকট সোপর্দ করেছিলেন, সে তার পরিপূর্ণ হক আদায় করেছে এবং আল্লাহ যে পরীক্ষায় তাকে ফেলেছেন, সে কৃতিত্বের সাথে তাতে পরিপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। এ হচ্ছে চিরন্তন সাফল্য যার ধারাবাহিক চলে আসে দুনিয়া থেকে আখেরাতের জীবন পর্যন্ত এবরং তার ধারা কখনো হারিয়ে যায় না।
এ হচ্ছে ইসলাম--মানুষের স্বাভাবধর্ম। কোন জাতি বা দেশের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নয় এ বিধান। সকল যুগে সকল জাতির মধ্যে ও সকল দেশ যেসব আল্লাহ পরস্ত ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ অতীত হয়ে গেছেন, তাদের ধর্ম-- তাদের আদর্শ ছিলো ইসলাম। তারা ছিলেন মুসলিম- হয়তো তাদের ভাষায় সে ধর্মের নাম ইসলাম অথবা অপর কিছু ছিলো।

অধ্যায় ০২ : ঈমান ও আনুগত্য

ঈমান ও আনুগত্য

আনুগত্যের জন্য জ্ঞান ও প্রত্যয়ের প্রয়োজন

আগের অধ্যায়ের আলোচনা থেকে জানা গেছে যে, আল্লাহর আনুগত্যের নামই হচ্ছে ইসলাম। এখন আমি বলব যে মানুষ ততোক্ষন পর্যন্ত আল্লাহ তা’য়ালার আনুগত্য করতে পারে না, যতোক্ষণ না সে কতগুলো বিশেষ জ্ঞান লাভ করে এবং সে জ্ঞান প্রত্যযের সীমানায় পৌছে।

সবার আগে মানুষের প্রয়োজন আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে পূর্ণ প্রত্যয় লাভ। কেননা আল্লাহ আছেন, এ প্রত্যয় যদি তার না থাকলো, তা হলে কি করে সে তার প্রতি আনুগত্য পোষণ করবে?

এর সাথে সাথেই প্রয়োজন আল্লাহর গুণরাজী সম্পর্কে জ্ঞান। আল্লাহ এক এবং কর্তৃত্বে তার কোন শরীক নেই, এ কথাই যদি কোন ব্যক্তির জানা না থাকে, তা হলে অপরের কাছে মাথা নত করা ও হাত পাতার বিপদ-সম্ভাবনা থেকে সে ব্যক্তি কি করে বেঁচে থাকতে পারে? আল্লাহ সবকিছু দেখছেন, শুনছেন এবং সবকিছুরই খবর রাখছেন, এ সত্য যে ব্যক্তি বিশ্বাস করতে পারে না, সে নিজেকে আল্লাহর না-নাফরমানী থেকে কি করে দূরে রাখবে? এ কথাগুলো নিয়ে যখন ধীরভাবে চিন্তা করা যায়, তখন বুঝতে পারা যায় যে, যতোক্ষণ পর্যন্ত মানুষ আল্লাহর গুণরাজি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অধীকারী না হবে, ততোক্ষণ চিন্তায়, আচরণে ও কর্মে ইসলামের সহজ সরল পথে চলবার জন্য অপরিহার্য গুণরাজি তার ভিতরে সৃষ্টি হতে পারে না। সেই জ্ঞানও কেবল জানার সীমানার মধ্যে গন্ডিবদ্ধ হয়ে থাকলে চলবে না। বরং তাকে প্রত্যেয়ের সাথে মনের মধ্যে দৃঢ় বদ্ধমূল করে নিতে হবে, যেন মানুষের মন তার বিরোধী চিন্তা থেকে এবং তার জীবন তার জ্ঞানের প্রতিকূল কর্ম থেকে নিরাপদ থাকতে পারে।

এরপর মানুষকে আরো জানতে হবে, আল্রাহর ইচ্ছা অনুযায়ী জীবন যাপন করার সঠিক পন্থা কি? কি কি কাজ আল্লাহ পছন্দ করেন যা সে করবে এবং কোন কোন জিনিস অপছন্দ করেনঃ যা থেকে সে দূরে থাকবে এ উদ্দেশ্যে আল্লাহর আইন ও বিধানের সাথে পরিপূর্ণ পরিচয় লাভ করা মানুষের জন্য অপরিহার্য। এ আল্লাহর আইন ও বিধান অনুসরণ করেই যে আল্লাহর সন্তোষ লাভ করা যেতে পারে, এ সম্পর্কে পূর্ণ প্রত্যয় পোষণ করতে হবে। কেননা গোড়া থেকেই এ জ্ঞান না থাকলে সে আনুগত্য করবে কার; আর যদি জ্ঞান থাকে, অথচ পূর্ণ প্রত্যয় না থাকে - অথবা মনে এ ধারণা পোষণ করে থাকে যে, এ আইন ও বিধান ছাড়া আরো কোন আইন ও বিধান নির্ভুল হতে পারে, তা হলে কি করে সঠিকভাবে সে তার অনুসরণ করতে পারে?

মানুষকে আরো জানতে হবে, আল্লাহর ইচ্ছার বিরোধী পথে চলার ও তার পছন্দ মতো বিধানের আনুগত্য না করার পরিণাম কি? আর তার হুকুম মেনে চলার পুরুস্কারই বা কি? এ উদ্দেশ্যে তার আখেরাতের জীবনের, আল্লাহর আদালতে হাযির হওয়ার, না নাফরমানীর শাস্তি লাভের ও আনুগত্যের পুরস্কার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা সম্পর্কে জ্ঞান ও প্রত্যয় থাকা অপরিহার্য। যে ব্যক্তি আখেরাতের জীবন সম্পর্কে অবগত নয়, তার কাছে আনুগত্য ও না-নাফরমানী উভয়ই মনে হয় নিষ্ফল। তার ধারণা, শেষ পর্যন্ত যে ব্যক্তি আনুগত্য করে আর যে ব্যক্তি তা না করে, উভয়ের অবস্থাই এক। কেননা দু’জন তারা মাটিতে মিশে যাবে, তা হলে কি করে তার কাছে প্রত্যাশা করা যাবে যে, সে আনুগত্যের বাধ্যবাধকতা ও ক্লেশ বরদাশত করতে রাযী হবে এবং যেসব গুনাহ থেকে এ দুনিয়ায় তার কোন ক্ষতির আশংকা নেই, তা থেকে সে সংযত হয়ে থাকবে? এ ধরনের ধারনা পোষণ করে মানুষ কখনো আল্লাহর আইনের অনুগত হতে পারে না। তেমনি আখেরাতের জীবন ও আল্লাহর আদালতে হাযির হওয়া সম্পর্কে যার জ্ঞান রয়েছে, অথচ প্রত্যয় সেই, এমন লোকের পক্ষে আনুগত্যের ক্ষেত্রে মযবুত হয়ে থাকা সম্ভব নয়। কেননা সন্দেহ ও দ্বিধা নিয়ে মানুষ কোন বিষয়ে দৃঢ় মত হতে পারে না মানুষ কোন কোন কাজ ঠিক তখনই মন লাগিয়ে করতে পারে, যখন প্রত্যয় জম্মে যে, কাজটি কল্যাণকর। আবার অপর কোন কাজ তারা তাখনই বর্জন করার সংকল্প করতে পারে, যখন কাজটি অনিষ্টকর বলে তাদের পূর্ণ প্রত্যয় জম্মাবে। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে যে, কোন বিশেষ পদ্ধতির অনুসরণের জন্য তার পরিণাম ও ফলাফল স্পর্কে যেমন জ্ঞান থাকা অপরিহার্য তেমনি সে জ্ঞান প্রত্যয়ের সীমানায় পৌছা চাই।

ঈমানের পরিচয়

উপরের বর্ণনায় যে জিনিসকে আমরা জ্ঞান ও প্রত্যয় বলে বিশেষিত করেছি, তারই নাম হচ্ছে ঈমান। ঈমানের অর্থ হচ্ছে জানা এবং মেনে নেয়া। যে ব্যক্তি আল্লাহর একত্ব, তার সত্যিকার গুণরাজি, তার কানুন এবং তার পুরস্কার ও শাস্তি সম্পর্কে জানে এবং দিলের মধ্যে তৎসম্পর্কে প্রত্যয় পোষণ করে, তাকে বলা হয় মু’মিন এবং ঈমানের ফল হচ্ছে এই যে, তা মানুষকে মুসলিম অর্থাৎ আল্লাহর অনুগত ও আজ্ঞাবহ করে তোলে।

ঈমানের এ পরিচয় থেকে সহজেই বুঝতে পারা যায় যে, ঈমান ছাড়া কোন মানুষ মুসলিম হতে পারে না। বীজের সাথে গাছের যে সম্পর্ক, ইসলাম ও ঈমানের সম্পর্কও ঠিক অনুরূপ। বীজ ছাড়া গাছের জম্মই হতে পারে না। অবশ্যি এমন হতে পারে যে, বীজ যমীনে বপন করা হল, যমীন খারাপ হওয়ার অথবা আবহাওয়া ভালো না হওয়ার কারণে গাছ দুর্বল বা বিকৃত হয়ে জম্মালো। তেমনি কোন ব্যক্তির যদি গোড়া থেকে ঈমানই না থাকলো, তার পক্ষে ;'মুসলিম’ হওয়া কি করে সম্ভব হবে? অবশ্যি এরূপ হওয়া খুবই সম্ভব যে, কোন ব্যক্তির দিলের মধ্যে ঈমান রয়েছে; কিন্তু তার আকাংখার দুর্বলতা অথবা বিকৃত শিক্ষা-দীক্ষা ও অসৎ সর্গের প্রাভাবে সে পূর্ণ ও পাকা ‘মুসলিম’ হতে পারলো না।

ঈমান ও ইসলামের দিক দিয়ে বিচার করলে গোটা মানব- সমাজকে চার শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে :

একঃ যাদের ভিতরে ঈমান রয়েছে এবং তাদের ঈমান তাদেরকে আল্লাহর আদেশ -নিষেধের পূর্ণ অনুগত করে দেয়। যেসব কাজ আল্লাহ অপসন্দ করেন তা থেকে তারা এমন করে দূরে থাকে, যেমন মানুষ আগুনের স্পর্শ থেকে দূরে থাকে ।যা কিছু আল্লাহ পসন্দ করেন তা তারা তেমনি উৎসাহের সাথে করে যায় যেমন করে মানুষ ধন- দৌলত কামাই করবার জন্য উৎসাহ সহকারে কাজ করে যায়। এরাই হচ্ছে সত্যিকারের মুসলমান।

দুই : যাদের ভিতরে ঈমান রয়েছে , কিন্তু তাদের ঈমান এতটা শক্তিশালী নয় যে , তা তাদেরকে পুরোপুরি আল্লাহর আজ্ঞাবহ করে তুলবে। তারা কিছুটা নিম্নতর পর্যায়ের লোক হলেও অবশ্যি মুসলমান। তারা না- ফরমান হলেও অবশ্যি মুসলমান। তারা না-ফরমানী করলে নিজস্ব অপরাধের মাত্রা হিসাবে শাস্তির যোগ্য হবে, কিন্তু তারা অপরাধী হলেও বিদ্রোহী নয়। কারণ তারা বাদশাহকে বাদশাহ বলে মানে এবং তাঁর আইনকে আইন বলে স্বীকার করে।

তিন : যাদের ঈমান নেই; কিন্তু প্রকাশ্যে তারা এমন সব কাজ করে , যা আল্লাহর আইন মুতাবিক বলে মনে হয়। প্রকৃত পক্ষে এরা বিদ্রোহী , এদের প্রকাশ্য সৎকর্ম প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর আনুগত্য ও আজ্ঞানুবর্তীতা নয়, তাই তার উপর নির্ভর করা চলে না। তাদের তুলনা চলতে পারে সেই শ্রেণীর লোকের সাথে, যারা বাদশাহকে বাদশাহ বলে মানে না, তার আইনকে আইন বলে গণ্য করে না। এ ধরনের লোকের কার্যকলাপ যদি আইন বিরোধী নাও হয় , তথাপি তাদেরকে বাদশাহর বিশ্বস্ত ও তাঁর আইনের অনুসারী বলতে পারা যায় না। তারা অবশ্যি বিদ্রোহীদের মধ্যেই গণ্য হবে।

চার : যাদের ঈমান নেই এবং কর্মের দিক দিয়ে ও যারা দুর্জন ও দুষ্কৃতিকারী । এরাই হচ্ছে নিকৃষ্টতম স্তরের লোক , কেননা এরা যেমন বিদ্রোহী তেমনি বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী । মানব জাতির এ শ্রেণী বিভাগ থেকে স্পষ্টত বোঝা যায় যে, প্রকৃতপক্ষে মানুষের সাফল্য নির্ভর করে একমাত্র ঈমানের উপর । ইসলাম পূর্ণ হোক আর অপূর্ণ হোক- জন্ম নেয় একমাত্র ঈমানের বীজ থেকে । যেখানে ঈমান নেই সেখানে ঈমানের স্থান অধিকার করে কুফুর -- আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ , তা তার তীব্রতা বেশী হোক আর কমই হোক।

জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম:

আনুগত্যের জন্য ঈমানের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হলো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে , আল্লাহর গুণরাজি ও তাঁর পসন্দ করা আইন ও আখেরাতের জীবন সম্পর্কে জ্ঞান এবং যে জ্ঞানের উপর প্রত্যয় পোষণ করা যায়, তা অর্জন করার মাধ্যম কি ?

আগেই বলা হয়েছে যে, সকল দিকে ছড়িয়ে রয়েছে আল্লাহর কারিগরির নিদশর্ন। সেই সব নিদর্শন সাক্ষ্য দিচ্ছে যে , এ কারখানা একই কারিগরের সৃষ্টি এবং তিনিই তাকে চালিয়ে যাচ্ছেন । এসব নিদর্শনের ভিতরে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে আল্লাহ তা’য়ালার যাবতিয় গুণের দীপ্তি। তাঁর হিকমত , তাঁর জ্ঞান , তাঁর কুদরাত ,তাঁর দয়া, তাঁর প্রভুত্ব ,তার ক্রোধ -- এক কথায় তাঁর এমন কোন গুণ নেই , যা তাঁর কর্মের ভিতর দিয়ে প্রতিফলিত না হয়েছে , কিন্তু মানুষের বুদ্ধি ও মানবিক যোগ্যতা এ সব জিনিস দেখতে ও বুঝতে গিয়ে বারংবার ভুল করছে। এসব নিদর্শন চোখের সামনে মওজুদ রয়েছে। তা সত্বেও কেউ বলছে খোদা দু’জন, কেউ বলছে, খোদা তিনজন , কেউ অসংখ্য খোদা মানছে ; কেউ কেউ আবার আল্লাহর কর্তৃত্ব কে ভেঙে টুকরো টুকরো করছে। তারা বৃষ্টি , হাওয়া আর আগুনের জন্য আলাদা আলাদা খোদা মানছে , মোটকথা তাদের বক্তব্য হচ্ছে প্রত্যেকটি শক্তির খোদা আলাদা এবং ঐ সমস্ত খোদার আবার একজন সরদার খোদা আছেন। তাদের অস্তিত্ব ও গুণরাজি উপলদ্ধি করতে গিয়ে মানুষের বুদ্ধি বহুবার ধোঁকা খেয়েছে । এখানে তার বিস্তৃত বিবরণ দেয়া সম্ভব নয়।

আখেরাতের জীবন সর্ম্পকে ও মানুষ নানা রকম ভুল ধারণা করে বসে আছে । কেউ বলে মানুষ মৃত্যুর পর মাটিতে মিশে যাবে, তারপর আর কোন জীবন নেই। কেউ বলে মানুষ এই দুনিয়ায় বারবার জন্ম নিতে থাকবে এবং নিজের কাজ -কর্মের শাস্তি অথবা পুরস্কার পেতে থাকবে।

আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী জীবন যাপন করবার জন্য যে আইনের অনুসরণ একান্ত অপরিহার্য তা নিজের বুদ্ধি দিয়ে নির্ধারণ করা আরো বেশী কঠিন।

“ যদি কোন মানুষ সঠিক বুদ্ধিবৃত্তি এবং উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকারী হয়, তা হলেও বহু বছরের পরীক্ষা- নিরীক্ষা ও চিন্তা -গবেষণা পর সে এ সব বিষয় সম্পর্কে একটা বিশেষ সীমানা পর্যন্ত সিদ্ধান্ত কায়েম করতে পারে। এরূপ অবস্থায় সে পুরোপুরি সত্য উপলদ্ধি করছে বলে তার মনে পূর্ণ প্রত্যয় জন্মাবে না। অবশ্যি মানুষকে কোন পথ নির্দেশ না দিয়ে ছেড়ে দিলে তাতে তার বুদ্ধি ও জ্ঞানের পুরোপুরি পরীক্ষা হতে পারতো । সেই ক্ষেত্রে যেসব লোক নিজ চেষ্টা ও যোগ্যতা দ্বারা সত্য ও ন্যায়ের পথে পৌঁছতো তারাই হতো সফল; আর যারা পৌঁছতো না , তারা হতো ব্যর্থকাম । কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর বান্দাহকে এরূপ কঠিন পরীক্ষায় ফেলেননি! তিনি তাঁর আপন মেহেরবানীতে মানুষেরই মধ্যে এমন মানুষ পয়দা করেছেন, যাদেরকে তিনি দিয়েছেন নিজের গুণরাজির সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞান। দুনিয়ায় মানুষ যাতে আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী জীবন যাপন করতে পারে তার পদ্ধতি ও তিনি শিখিয়ে দিয়েছেন। আখেরাতের জীবন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দিয়ে তিনি তাঁদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন অপর মানুষের কাছে এ জ্ঞান পৌঁছে দিতে। এরাই হচ্ছেন আল্লাহর পয়গম্বর । তাঁদেরকে জ্ঞান দানের জন্য আল্লাহ যে মাধ্যম ব্যবহার করেছেন , তার নাম হচ্ছে ওহী এবং যে কিতাবে তাঁদেরকে এ জ্ঞান দেয়া হয়েছে , তাকে বলা হয় আল্লাহর কিতাব ও আল্লাহর কালাম । এখন মানুষ এ সব পয়গাম্বরের পবিত্র জীবনের দিকে দৃষ্টি রেখে এবং তাঁদের উচ্চাংগের শিক্ষা পর্যালোচনা করে তাঁদের প্রতি ঈমান আছে কিনা তাতেই হচ্ছে তার বুদ্ধি ও যোগ্যতার পরীক্ষা । সত্যানুসন্ধানী ও সত্যনিষ্ঠ যারা , সত্যের বাণী ও খাঁটি মানুষের শিক্ষা মেনে নিয়ে তারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে; আর না মানলে বোঝা যাবে যে, সত্য ও ন্যায়কে উপলব্ধি করে তাকে মেনে নেয়ার যোগ্যতা তাঁদের মধ্যে নেই, এ অস্বীকৃতি তাদেরকে পরীক্ষায় অকৃতকার্য করে দেবে এবং আখেরাতের জীবন সম্পর্কে তারা কখনো কোন সঠিক জ্ঞান হাসিল করতে পারবে না।

ঈমান বিল - গায়েব

কোন বিশষ জিনিসি সম্পর্কে যদি কারো কোন জ্ঞান না থাকে , তখন সে কোন জ্ঞানী লোকের সন্ধান করে এবং তাঁর নির্দেশ মেনে কাজ করে। অসুস্থ হলে কোন লোক নিজের চিকিৎসা নিজেই করে না, বরং ডাক্তারের কাছে চলে যায়। ডাক্তারের সনদ প্রাপ্ত হওয়া তাঁর অভিজ্ঞতা থাকা, তাঁর হাতে বহু রোগী আরোগ্য হওয়া এবং এমনি আরো বহু খবর জেনে সে ঈমান আনে যে , তার চিকিৎসার জন্য যে যোগ্যতার প্রয়োজন ডাক্তারের ভিতরে তা মওজুদ রয়েছে। তিনি যেসব ঔষধ যেভাবে ব্যবহার করতে নির্দেশ দেন , এ ঈমানের উপর নির্ভর করে সে তেমনি করে তা ব্যবহার করে এবং তাঁর নির্দেশিত জিনিসগুলো সে বর্জন করে। এমনি করে আইন কানুনের ব্যাপারে একজন লোক ঈমান আনে উকিলের উপর এবং তারই আনুগত্য করে যায়। শিক্ষার ব্যাপারে শিক্ষকের উপর ঈমান এনে তাকেই মেনে চলে। কোথাও যাবার সময় রাস্তা জানা না থাকলে তখন কোন জানা -শোনা লোকের উপর ঈমান এনে তার দেখানো পথে চলতে হয়। মোটকথা দুনিয়ার যে কোন কাজে মানুষ নিজের অবগতি ও জ্ঞানের জন্য কোন অভিজ্ঞ লোকের উপর ঈমান আনে এবং তার আনুগত্য করতে বাধ্য হয়। এরই নাম ঈমান বিল -গায়েব।

ইমান বিল-গায়েব বলতে বুঝায় , যা কিছু মানুষের জানা নেই তা কোন জ্ঞানী লোকের কাছে থেকে জেনে নিয়ে তার উপর প্রত্যয় পোষণ করবে। আল্লাহ তা’য়ালার সত্তা ও গুণরাজি সম্পর্কে মানুষ কিছুই অবগত নয়। তাঁর ফিরেশতারা তাঁর হুকুম অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছেন এবং সব দিক দিয়ে মানুষকে ঘিরে রয়েছন , তাও কেউ জানে না। আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী জীবন যাপন করার পন্থা কি তার খবরও কারো জানা নেই। আখেরাতের জীবনের সঠিক অবস্থা সকলেরই অজ্ঞাত। এর সবকিছুর জ্ঞান মানুষকে এমন এক লোকের কাছ থেকে হাসিল করতে হবে, যাঁর বিশ্বস্ততা ,সত্যনিষ্ঠা ,সরলতা আল্লাহভীতি ,পাক -পবিত্র জীবন ও জ্ঞানগর্ব আলোচনা তার মনে বিশ্বাস জন্মাবে যে , তিনি যা বলেন , তা নির্ভুল এবং তার সব কথাই প্রত্যেয়ের যোগ্য, একেই বলে ঈমান বিল -গায়েব। আল্লাহ তা’য়ালার আনুগত্য ও তার ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করার জন্য ঈমান বিল -গায়েব অপরিহার্য , কেননা পয়গাম্বর ব্যতিত অপর কোন মাধ্যম দ্বারা সঠিক জ্ঞান লাভ করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব এবং সঠিক জ্ঞান ব্যতীত ইসলামের পথে সঠিকভাবে চলাও সম্ভব হবে না।

অধ্যায় ০৩ : পয়গম্বরীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

নবুয়াত

আগের অধ্যায় তিনটি বিষয় আলোচিত হয়েছেঃ

প্রথমত , আল্লাহ তা’য়ালার আনুগত্যের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে আল্লাহর সত্তা ও গুণরাজি , তাঁর মনোনীত জীবন পদ্ধতি এবং আখেরাতের সুকৃতির প্রতিদান ও দুষ্কৃতির প্রতিফল সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞান এবং সে জ্ঞানকে এমন পর্যায় পর্যন্ত এগিয়ে নিতে হবে, যেন তার উপর পূর্ণ প্রত্যয় বা ঈমান জন্মে ।

দ্বিতীয়ত , আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে নিজের চেষ্টায় এ জ্ঞান লাভ করার মতো কঠিন পরীক্ষায় ফেলেননি ,নিজে মানুষরেই মধ্য থেকে তাঁর মনোনীত বান্দাকে (যাদেরকে বলা হয় পয়গাম্বর) ওহীর মাধ্যমে এ জ্ঞান দান করেছেন এবং তাঁদের হুকুম করেছেন অন্যান্য বান্দার কাছে এ জ্ঞান পৌঁছে দিতে।

তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের উপর কেবল মাত্র এতটুকু দায়িত্বই রয়েছে যে, সে আল্লাহর সত্যিকার পয়গাম্বর চিনে নেবে। অমুক ব্যক্তি সত্যি সত্যি আল্লাহর পয়গাম্বর ,এ সত্য জানা হলেই তার অপরিহার্য কর্তব্য হচ্ছে তাঁর প্রদত্ত যে কোন শিক্ষার উপর ঈমান আনা , তাঁর যে কোন নির্দেশ মেনে এবং তাঁরই অনুসৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে চলা।

এখন সবার আগে বলবো পয়গাম্বরীর মূলতত্ত্ব এবং পয়গাম্বরকে চিনবার উপায়ই বা কি ?

পয়গাম্বরীর মূলতত্ত্ব

দুনিয়ায় মানুষের যেসব জিনিসের প্রয়োজন, আল্লাহ নিজেই তার সব কিছুর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। শিশুর যখন জন্ম হচ্ছে, তখন কত জিনিস তার সাথে দিয়ে তাকে দুনিয়ায় পাঠানো হচ্ছে তার হিসেব নেই। দেখবার জন্য চোখ, শুনবার জন্য কান , ঘ্র্রাণ ও শ্বাস টানবার জন্য নাক, অনুভব করবার জন্য সারা গায়ের চামড়ায় স্পর্শ অনুভূতি , চলবার জন্য পা, কাজ করার জন্য হাত, চিন্তা করার জন্য মস্তিষ্ক এবং আগে থেকেই সবরকম প্রয়োজনের হিসেব করে আরো বেশুমার জিনিস যুক্ত করে দেয়া হয়েছে তার ছোট্র দেহটির সাথে। আবার দুনিয়ার পা রেখেই সে দেখতে পায় জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় এত সব সরঞ্জাম - যার হিসেব করে শেষ করা সম্ভব নয়। হাওয়া আছে, আলো আছে, পানি আছে, যমীন আছে , আগে থেকেই মায়ের বুকে সঞ্চিত হয়ে আছে দুধের ধারা , মা -বাপ আপনজন -এমনকি ,অপরের অন্তরেও তার জন্য সঞ্চারিত করে দেয়া হয়েছে স্নেহ , ভালোবাসা ও সহানুভূতি -যা দিয়ে সে প্রতিপালিত হচ্ছে। যতই সে বড় হতে থাকে, ততই তার প্রয়োজন মিটাবার জন্য প্রত্যেক রকমের জিনিসই মিলতে থাকে, যেন যমীনও আসমানের সকল শক্তি তারই প্রতিপালন ও খেদমতের জন্য কাজ করে যাচ্ছে ।

এরপর আর একটু এগিয়ে যাওয়া যাক । দুনিয়ার কাজ -কারবার চালিয়ে নেয়ার জন্য যেসব যোগ্যতার প্রয়োজন হয়, তার সবকিছুই দেয়া হয়েছে মানুষকে। দৈহিক শক্তি , বুদ্ধি , উপলব্ধি , প্রকাশ- মতা এবং এমনি আরো কত রকম যোগ্যতা কম বেশী করে মওজুদ রয়েছে মানুষের মধ্যে । কিন্তু এখানে পাওয়া যায় আল্লাহ তা’য়ালার এক এক বিচিত্র ব্যবস্থাপনার পরিচয়। সকল মানুষকে তিনি ঠিক একই ধরনের যোগ্যতা দান করেননি। তাই যতি হত তা হলে কেউ কারুর মুখাপেক্ষী হতনা, কেউ কারুর একবিন্দু পরোয়া করতো না । এর জন্য আল্লাহ তায়ালা সকল মানুষের সামগ্রিক প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষের মধ্যে সব রকম যোগ্যতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন বটে; তার ধরনটা হচ্ছে এই যে , কোন এক ব্যক্তিকে যেমন এক যোগ্যতা বেশী করে দেয়া হয়েছে , তেমনি অপরকে দেয়া হয়েছে আর কোন যোগ্যতা । কেউ অপর লোকের চেয়ে শারীরিক পরিশ্রমের শক্তি বেশী করে নিয়ে আসে । কোন কোন লোক আবার বিশেষ বিশেষ শিল্পকলা বা বৃত্তির জন্মগত অধিকারী হয়, যা অপরের মধ্যে দেখা যায় না। কোন কোন লোকের মধ্যে প্রতিভা ও বুদ্ধি -বৃত্তিক শক্তি থাকে অপরের চাইতে বেশী। জন্মগত গুণের দিক দিয়ে কেউ হয় সিপাহসালার , কারুর মধ্যে থাকে নেতৃত্বের বিশেষ যোগ্যতা । কেউ জন্মে অসাধারণ বাগ্নিতর শক্তি নিয়ে , আবর কেউ স্বাভাবিক রচনাশৈলীর অধিকারী। এমন কোন কোন লোক জন্মে , যার মস্তিষ্ক সবচাইতে বেশী ধাবিত হয় গণিত -শাস্ত্রের দিকে এবং অপরের বুদ্ধি যার ধারে কাছেও ঘেষঁতে পারেনা, এমনি সব জটিল প্রশ্নের সামধান সে করে দেয় অনায়াসে। আবার কোন ব্যক্তি জন্মে বহু বিচিত্র নিত্য নতুন জিনিস উদ্ভাবনের শক্তি নিয়ে , যার উদ্ভাবনী শক্তি দেখে দুনিয়া তাকিয়ে থাকে তার দিকে অবাক বিস্ময়ে । কোন কোন ব্যক্তি এমন অতুলীয় আইন জ্ঞান নিয়ে আসে যে , যেসব আইনের জটিল তথ্য উৎঘাটন করার জন্য বছরের পর বছর চেষ্টা করেও অপরের কাছে তা বোধগম্য হয় না। তার দৃষ্টি আপনা থেকেই সেখানে পৌঁছে যায়। এ হচ্ছে আল্লাহর দান। কোন মানুষ নিজের চেষ্টায় আপনার মধ্যে এ যোগ্যতা সৃষ্টি করতে পারে না। শিক্ষা -দীক্ষার মারফতে ও এসব জিনিস তৈরী হয় না। প্রকৃতপক্ষে এগুলো হচ্ছে জন্মগত যোগ্যতা এবং আল্লাহ তা’য়ালার নিজস্ব জ্ঞান বলে যাকে ইচ্ছা এ যোগ্যতা দান করে থাকেন।

আল্লাহর এ দান সম্পর্কে ও চিন্তা করলে দেখা যাবে মানবীয় সংস্কৃতির বিকাশের জন্য যেসব যোগ্যতার প্রয়োজন বেশী হয়, মানুষের মধ্যে তা বেশী করেই সৃষ্টি হয়ে থাকে,আবার যার প্রয়োজন যতটা কম মানুষের মধ্যে তা ততোটা কমই সৃষ্টি হয়। সাধারণ সিপাহী দুনিয়ায় বহু জন্মে। চাষী, কুম্ভকার ,কর্মকার এবং এমনি আরো নানা রকম কাজের লোক জন্মে অসংখ্য কিন্তু জ্ঞান বিজ্ঞানে অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী রাজনীতি ও সিপাহসালারীর যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ জন্মে কম। কোন বিশেষ কর্মে অসাধারণ যোগ্যতা , দতা ও প্রতিভার অধিকারী লোকেরা আরো কম জন্মে থাকেন। কেননা তাঁদের কৃতিত্বপূর্ণ কার্যাবলী পরবর্তী বহু শতাব্দী ধরে তাঁদের মত সুদ ও প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রয়োজনের চাহিদা মিটিয়ে থাকে।

এখন বিবেচনা করতে হবে যে, মানুষের মধ্যে ইঞ্জিনিয়ার , গণিতশাস্ত্রবিদ , বিজ্ঞানী , আইন বিশেষজ্ঞ , রাজনীতিবিশারদ , অর্থনীতিবিদ ওঅন্যান্য বিভিন্ন দিকের যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ জন্ম নিলেই তা মানুষের পার্থিব জীবনের সাফল্য বিধানের জন্য যথেষ্ট নয়। এদের সবার চেয়ে বৃহত্তর আর এক শ্রেণীর মানুষের প্রয়োজন রয়েছে, যারা মানুষকে আল্লাহর সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারে। অন্যান্য লোকেরা তো কেবল জানতে পারে , দুনিয়ার মানুষের জন্য কি কি রয়েছে, আর কি কি পন্থায় তা ব্যবহার করা যেতে পারে; কিন্তু এ কথা বলার লোকের ও তো প্রয়োজন আছে যে , মানুষ নিজে কিসের জন্য সৃষ্টি হলো ? দুনিয়ার সব জিনিস -পত্র মানুষকে কে দিয়েছেন ? এবং সেই দাতার ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য কি? কেননা মানুষ দুনিয়ায় তাঁর ইচ্ছা অনুসারে জীবন যাপন করেই নিশ্চিত ও চিরন্তন সাফল্য অর্জন করতে পারে। এ হচ্ছে মানুষের প্রকৃত ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন । মানুষের জ্ঞান এ কথা মেনে নিতে রাযী হতে পারে না যে , যে আল্লাহ আমাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রয়োজন মিটাবার সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন , তিনি আমাদের এ গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন না মিটিয়ে থাকবেন। না কিছুতেই তা সম্ভব নয়। আল্লাহ তায়ালা যেমন করে বিশেষ বিশেষ শিল্পকলা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তেমনি করে এমন মানুষও তিনি সৃষ্টি করেছেন, যাঁদের মধ্যে আলাহকে চিনবার উচ্চতম যোগ্যতা ছিল। নিজের কাজ থেকে তিনি তাঁদেরকে দিয়েছেন আলাহ্‌র বিধান (দ্বীন) , আচরণ (আখলাক) ও জীবন যাপন পদ্ধতি (শরীয়াত ) সংক্রান্ত জ্ঞান এবং অপর মানুষকে এসব বিষয়ের শিক্ষা দেয়ার কাজে তাঁদেরকে নিযুক্ত করেছেন । আমাদের ভাষায় এ সব মানুষকেই বলা হয় নবী, রাসূল অথবা পয়গাম্বর ।

পয়গাম্বরের পরিচয়

অন্যান্য জ্ঞান- বিজ্ঞান ও শিল্প -কলার যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ যেমন বিশেষ বিশেষ ধরনের প্রতিভা ও স্বভfব -প্রকৃতি নিয়ে জন্ম লাভ করেন, তেমনি করে পয়গাম্বরও এক বিশেষ ধরনের স্বভাব - প্রকৃতি নিয়ে আসেন।

এক জন্মগত প্রতিভার অধিকারী কবির বাণী শুনেই আমরা বুঝতেপারি যে , তিনি এক বিশেষ যোগ্যতার অধিকার নিয়ে জন্মেছেন , কারণ অপর কোন কোন ব্যক্তি বহু চেষ্টা করেও তেমন কবিতা শুনাতে পারেন না। এমনি করে জন্মগত প্রতিভার অধিকারী বক্তা, সাহিত্যিক , আবিষ্কর্তা , নেতা-সবারই সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় তাঁদের নিজ নিজ কর্মসূচীর ভিতর দিয়ে, কারণ তাঁদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ কার্যেক্ষেত্রে এমন অসাধারণ যোগ্যতা প্রকাশ করেন , যা অপরের মধ্যে দেখা যায় না। পয়গাম্বরের অবস্থাও তাই । তাঁর মন এমন সব সমস্যার চিন্তা করতে সক্ষম হয় । অপরের মন যার কাছে ঘেষতে ও পারেনা। তিনি এমন সব কথা বলে বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করতে পারেন, যা অপরের পক্ষে সম্ভব নয়। বহু বছরের চিন্তা ও গবেষণার পরও অপরের নযর যেসব সূক্ষ্ম বিষয়ের গভীরে পৌঁছতে পারে না, তাঁর নযর আপনা থেকেই সেখানে পৌঁছে যায় । তিনি যা কিছু বলেন , আমাদের যুক্তি তা মেনে নেয়, আমাদের অন্তর তার সত্যতা উপলব্ধি করে দুনিয়ার অন্তহীন পরীক্ষা -নিরীক্ষা ও সৃষ্টির সীমাহীন অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত হয় তার এক একটি বাণীর সত্যতা । অবশ্যি আমরা নিজেরা তেমনি কোন কথা বলতে চেষ্টা করলেও তাতে আমাদের ব্যর্থতা নিশ্চিত । তাঁর স্বভাব- প্রকৃতি এমন নিষ্কলুষ ও পরিশুদ্ধ হয়ে থাকে যে , প্রত্যেক ব্যাপারে তিনি সত্য , সহজ -সরল ও মহত্বপূর্ণ পন্থাঅবলম্বন করেন। কখনো তিনি কোন অসত্য উক্তি করেন না, কোন অসৎ কাজ করেন না। তিনি হামেশা পুণ্য ও সৎকর্মের শিক্ষা দান করেন এবং অপরকে যা কিছু উপদেশ দেন নিজে তার কার্যে পরিণত করে দেখান। তিনি যা বলেন , তার বিপরীত কাজ নিজে করেন এমন কোন দৃষ্টান্ত তাঁর জীবনে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁর কথায় ও কাজে কোন স্বার্থের স্পর্শ থাকে না , অপরের মঙ্গলের জন্য তিনি নিজে তা স্বীকার করেন; কিন্তু নিজের স্বার্থের জন্য অপরের ক্ষতি সাধন করেন না। তাঁর সারা জীবন হয়ে উঠে সত্য -ন্যায়ের , মহত্ব , পবিত্রতা , উচ্চ-চিন্তা ও উচ্চাংগের মানবতার আদর্শ এবং বিশেষ অনুসন্ধান করেও তার ভিতরে পাওয়া যায় না কোন ত্রু“টি- বিচ্যুতি । এ ব্যক্তি যে আলাহ্‌র খাঁটি পয়গাম্বর , তা তাঁর এসব বৈশিষ্ট্য থেকেই পরিস্কার চিনে নেয়া যায়।

পয়গাম্বরের আনুগত্য

কোন বিশেষ ব্যক্তিকে যখনই আল্লাহর খাঁটি পয়গাম্বর বলে চিনে নেয়া যায় , তখন তাঁর কথা মেনে নেয়া তাঁর আনুগত্য স্বীকার করা , তাঁর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে চলা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কোন ব্যক্তি কে পয়গাম্বর বলে স্বীকার করা হবে অথচ তাঁর হুকুম মানা হবেনা এ কথা সম্পূর্ণ যুক্তি বিরোধী। ব্যক্তি বিশেষকে পয়গাম্বর বলে স্বীকার করে নেয়ার মানে , এ কথা মেনে নেয়া যে , তিনি যা কিছু বলেছেন আল্লাহর তরফ থেকে বলেছেন; যা কিছু করেছেন আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জি অনুযায়ী করছেন। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে যা কিছু বলা হবে, যা কিছু করা হবে, তা হবে আল্লাহর বিরুদ্ধে । আর যা কিছু আল্লাহর বিরোধী তা কখনো সত্য হতে পারে না। একারণেই কোন ব্যক্তিকে পয়গাম্বর বলে মেনে নেয়ার পর তাঁর কথা বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়া স্বতঃই অবশ্য কর্তব্য হয়ে পড়ে । তাঁর কথার যৌক্তিকতা ও কল্যাণ বোধগম্য হোক অথবা নাই হোক, তাঁর আদেশ-নিষেধের কাছে মস্তক অবনত করতেই হবে। পয়গাম্বরের কাছে থেকে যে বাণী আসবে, তাকে কেবলমাত্র পয়গাম্বরের বাণী হবার কারণেই সত্য , জ্ঞানগর্ভ ও যুক্তিসংগত বলে মেনে নিতে হবে। তাঁর কোন নির্দেশের যৌক্তিকতা কারো হৃদয়ংগম না হলে ও তার অর্থে এই নয় যে , তার ভিতরে কোন ত্রু'টি রয়েছে , বরং তার অর্থ হচ্ছে এই যে , তাঁর উপলব্ধির মধ্যে কিছু না কিছু ভুল রয়েছে।

এটা সুস্পষ্ট যে , কোন ব্যক্তি কোন বিশেষ শিল্পকলা সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত না হলে তার সর্বপ্রকার সূক্ষ্মতা তার কাছে ধরা পড়ে না, কিন্তু কোন বিশেষজ্ঞের কথা তার বোধগম্য হচ্ছে না, নিছক এ যুক্তিতে তার কথা মেনে নিতে অঙ্গিকার করলে সে কত বড় নির্বোধ বলে প্রমাণিত হবে। দুনিয়ার যে কোন কাজে প্রয়োজন হয় বিশেষজ্ঞের , বিশেষজ্ঞকে স্বীকার করে নেয়ার পর তার ওপর পূর্ণ আস্থা স্থাপন করতে হয়, তার কোন কাজে হস্তক্ষেপ করা চলে না , কারণ সকল লোক সকল কাজে বিশেষজ্ঞ হতে পারেনা। কোন লোকই দুনিয়ার সব জিনিস সমভাবে উপলব্ধি করতে পারেনা। যে কোন উদ্দেশ্যে পূর্ণ জ্ঞান ও সতর্কতা সহকারে একজন বিশেষজ্ঞের সন্ধান করতে হবে এবং যখন কোন ব্যক্তি সম্পর্কে বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের পক্ষে শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ বলে পূর্ণ প্রতীতি জন্মাবে তখন তাঁর উপর পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়াই হবে একমাত্র কর্তব্য। তাঁর কাজে হস্তপে করা এবং তাঁর প্রত্যেকটি কথার ‘আগে আমায় বুঝিয়ে দাও নইলে মানব না’ বলতে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয় , বরং সোজাসুজি নির্বোধেরই কাজ। কোন উকিলের উপর মুকদ্দমার ভার ন্যস্ত করার পর এ ধরনের গোলযোগ করতে গেলে তিনি তাঁর দফ্তর থেকে বের করে দেবেন। ডাক্তারের কাছে চিকিৎসার জন্য গিয়ে তাঁর প্রত্যকটি নির্দেশের সপক্ষে দলীল- প্রমাণ দাবী করলে তিনি চিকিৎসাই ছেড়ে দিবেন। ধর্মের ক্ষেত্রে ও সেই একই ব্যাপার । আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার প্রয়োজন সকলের রয়েছে। সকলেই জানতে চায় আলাহর ইচ্ছা ও মর্জি অনুযায়ী জীবন যাপন করা যায় কোন পদ্ধতিতে। অথচ কারো নিজের তা জানবার কোন সঠিক উপায় নেই। এখন প্রত্যেকের কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর কোন সত্যিকার পয়গাম্বরের সন্ধান করা। এ সন্ধানের কাজে বিশেষ সতর্কতা ও জ্ঞান -বুদ্ধি সহকারে অগ্রসর হতে হবে। কারণ খাঁটি পয়গাম্বর ছাড়া অপর কোন লোককে পয়গাম্বর বলে স্বীকার করে নিলে স্বাভাবিক ভাবেই সে ভুল পথে চালিত করবে; কিন্তু বহু পরীক্ষা -নিরীক্ষার পর যখন বিশ্বাস ও প্রত্যয় জন্মাবে যে , অমুক ব্যক্তি আল্লাহ তা’য়ালার সত্যিকার পয়গাম্বর , তখন তাঁর প্রতি পূর্ণ আস্থা স্থাপন করা এবং তাঁর প্রত্যকটি হুকুমের আনুগত্য করা সকলের জন্য অপরিহার্য ।

পয়গাম্বরগণের প্রতি ঈমানের আবশ্যকতা

যখন জানা গেল যে , আল্লাহর তরফ থেকে তাঁর পয়গাম্বর যে পথের নির্দেশ দেন তাই হচ্ছে ইসলামের সঠিক ও সরল পথ, তখন স্বতঃই বুঝতে পারা যাচ্ছে যে, পয়গাম্বরের প্রতি ঈমান আনা , তাঁর আনুগত্য করা এবং তাঁর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করা প্রত্যেকটি মানুষের জন্য অবশ্য কর্তব্য । যে ব্যক্তি পয়গাম্বরের প্রদর্শিত পথ বর্জন করে নিজের বুদ্ধি অনুযায়ী অন্যবিধ পথ উদ্ভাবন করে সে নিশ্চিতরূপে বিভ্রান্ত।

এ ব্যাপারে মানুষ বহু বিচিত্র ভুলের পথ ধরে চলে । এক শ্রেণীর লোক পয়গাম্বরের সত্যতা স্বীকার করে কিন্তু তাঁর উপর যেমন ঈমান পোষণ করে না, তেমনি তাঁর হুকুমের আনুগত্য করে না। এরা কেবল কাফের নয়, নির্বোধ ও বটে; কারণ পয়গাম্বরকে সত্যিকার পয়গাম্বর বলে স্বীকার করার পর তাঁর নির্দেশ মেনে না চলার অর্থ হচ্ছে জেনে বুঝে মিথ্যার আনুগত্য করা। এর চাইতে বড় আর কোন নির্বুদ্ধিতা যে হতে পারে না , এট সুস্পষ্ট সত্য।

কেউ কেউ আবার বলেঃ পয়গাম্বরের আনুগত্য করার প্রয়োজন আমাদের নেই । নিজেদের বুদ্ধি দিয়েই আমরা সত্যের পথ জেনে নিতে পারব। এও এক মারাত্মক ভুলের পথ। গণিতশাস্ত্র পাঠ করে নিশ্চিত জানা যায় যে, এক বিন্দু থেকে অপর বিন্দু পর্যন্ত মাত্র একটি সরল রেখাই টানা যেতে পারে। তাছাড়া আর যতো রেখাই টানা যাক , তা হয়তো বাঁকা হবে, নইলে অপর বিন্দু পর্যন্ত পৌঁছবে না। সত্যের পথ যাকে ইসলামী পরিভাষায় ‘সিরাতে মুসতাকীম ’ (সরল সঠিক পথ) বলা হয়। তার বেলায় ও সেই একই নীতি প্রযোজ্য । এ পথ মানুষ থেকে শুরু হয়ে আলাহ পর্যন্ত পৌঁছে এবং গণিতের উপরিউক্ত সূত্র অনুযায়ী তা একটিই হতে পারে। এ ছাড়া আর যেসব পথ রয়েছে , তা হয় বাঁকা , নইলে তা আলাহ পর্যন্ত পৌঁছবে না। কাজেই যে পথ সহজ -সরল , পয়গাম্বর তার নির্দেশ দিয়েছেন। তাছাড়া আর কোন রাস্তাই ‘সিরাতে মুসতাকিম’ হতে পারে না। পয়গাম্বরের নির্দেশিত পথ ত্যাগ করে যে ব্যক্তি নিজে কোন পথ খুঁজে বেড়ায় তাকে দু’টি বিকল্প পরিণতির যে কোন একটির সম্মুখীন হতে হবে। হয় তার আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছবার কোন পথ মিলবেনা , অথবা মিললেও তা হবে আকাবাঁকা দীর্ঘ পথ। সরল রেখার পরিবর্তে তা হবে বক্র রেখা । প্রথম পরিণতির দিক দিয়ে তো তার ধ্বংস অনিবার্য , দ্বিতীয় , পরিণতির দিক দিয়েও তার নির্বুদ্ধিতা প্রমাণিত হবার ক্ষেত্রে কোন সন্দেহের অবকাশ থাকেনা। কোন নির্বোধ ও জ্ঞানহীন জানোয়ার ও এক স্থান থেকে স্থানান্তরে যাবার জন্য বাঁকা পথ ছেড়ে সোজা পথে চলতে থাকে। এক্ষেত্রে আল্লাহর কোন নেক বান্দাহ যাকে সোজা পথের নির্দেশ দিয়েছেন , সে যদি তাঁ কে বলতে থাকে ‘‘না, আমি তোমার দেখানো পথে চলবোনা, নিজে বাঁকা পথে হোঁচট খেয়ে খেয়ে আমার গন্তব্যে লক্ষের সন্ধান করে নেবো তাহলে তাকে কি বলা যায় ?"
যে কোন ব্যক্তি এ সাধারণ ভুলটি এক নযরে বুঝে নিতে পারে , কিন্তু বিশেষভাবে চিন্তা করে দেখলে আরো বুঝতে পারা যায় , যে ব্যক্তি পয়গাম্বারের উপর ঈমান আনতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে , তার জন্য আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের বাঁকা বা সোজা কোন পথই মিলতে পারে না। তার কারণ , যে খাঁটি ও সত্যনিষ্ট মানুষের কথা মেনে নিতে অস্বীকার করে , তার মস্তিষ্কে নিশ্চিতরূপে এমন কোন বিকৃতি রয়েছে , যার প্রভাবে সে সত্য পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখছে । তার উপলদ্ধিতে কোন ত্রু“টি থাকতে পারে, অথবা তার স্বভাব কোন সত্য ও সৎ বস্তুকে স্বীকার করে নিতে অনিচ্ছুক হওয়ার মতো বিকৃতি সম্পন্ন । হতে পারে সে বাপ-দাদার অন্ধ অনুকরণে লিপ্ত এবং রীতি হিসেবে যা আগে থেকে চলে এসেছে তার কোন বিরূপ সমালোচনা শুনতে সে রাযী নয়, অথবা সে হয়ে আছে আপন প্রবৃত্তির দাস এবং পয়গাম্বরের শিক্ষা মেনে নিতে সে অস্বীকার করেছে এজন্য যে, তা মেনে নেয়ার পর তার আর কোন পাপাচরণ ও অবৈধ কার্য-কলাপের স্বাধীনতা থাকবে না। এ কারণগুলো এমন যে , এর যে কোন একটি কোন ব্যক্তি বিশেষের মধ্যে থাকলে তার পক্ষে আল্লাহর পথ খুঁজে পাওয়া হয় অসম্ভব । আবার এর কোন কারণ কোন ব্যক্তি বিশেষের মধ্যে না থাকলে ও এটা অসম্ভব যে , একজন সত্যানুসারী , নির্দোষ ও সৎলোক একজন সত্যিকার পয়গাম্বরের শিক্ষা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করবে।
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে ,পয়গাম্বর আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত এবং আল্লাহই তাঁর ওপর ঈমান আনার ও তাঁর আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। যে ব্যক্তি পয়গাম্বরের প্রতি ঈমান পোষণ করে না সে আল্লাহরই বিদ্রোহাচরণ করে। একজন লোক যে বাদশার প্রজা , তাঁর পক্ষ থেকে যাকেই শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হোক , তার আনুগত্য করতে সে বাধ্য । বাদশার নিযুক্ত শাসনকর্তাকে সে অমান্য করলে তার অর্থ হবে বাদশার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। শাসন কর্তৃপক্ষকে মেনে নেয়া আর তার নিযুত্ত শাসনকর্তাকে না মানা সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী ব্যাপার। আল্লাহ ও তাঁর প্রেরিত পয়গাম্বরের ক্ষেত্রে ও এ একই নীতি প্রযোজ্য আল্লাহ সকল মানুষের সত্যিকার বাদশাহ। মানুষের পথনির্দেশের জন্য তিনি যে ব্যক্তিকে প্রেরণ করেছেন এবং যার আনুগত্য স্বীকার করতে তিনি মানুষকে হুকুম দিয়েছেন , প্রত্যেক মানুষের ফরয তাকে পয়গাম্বর বলে স্বীকার করা ও অপর সবকিছুর আনুগত্য ছেড়ে কেবলমাত্র তাঁরই পথ অনুসরণ করা। তাঁর অনুসরণ থেকে যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে নিশ্চিতরূপে কাফের। সে আল্লাহকে মানুক অথবা নাই মানুক ,তাতে কিছুই আসে যায় না।

পয়গাম্বরীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মানব জাতির মধ্যে কি করে পয়গাম্বরীর ধারা শুরু হয়েছে এবং কি করে ক্রমে ক্রমে উন্নতির সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হয়ে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ পয়গাম্বরের মাধ্যমে সে ধারার সমাপ্তি ঘটেছে , এখন সেই কথাই বলছি।

এ কথা জানা গেছে যে, আল্লাহ তা’য়ালা সবার আগে তৈরী করেছিলেন একটি মাত্র মানুষ এবং সেই মানুষটি থেকেই তৈরী করেছিলেন তার সংগিনীকে । তারপর কত শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে গেছে। সেই আদি মানুষের বংশধররা ছেয়ে ফেলেছে সারা দুনিয়ার বুক। দুনিয়ায় আজ যতো মানুষ রয়েছে সবই প্রথম সৃষ্ট এক জোড়া মানুষের সন্তান । সকল জাতির ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বিবরণ সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, মানব জাতির শুরু হয়েছিল একটি মানুষ থেকে। মানুষের উৎপত্তি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে , দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে আলাদা আলাদা মানুষ তৈরী হযেছিল , বরং অধিকাংশ বিজ্ঞানী অনুমান করেনে যে , দুনিয়ায় সবার আগে একটি মাত্র মানুষই পয়দা হয়েছিলেন এবং আজকের দুনিয়ার যেখানে যতো মানুষই দেখা যাচ্ছে তারা সবাই এ একটি মাত্র মানুষেরই বংশধর।

আমাদের ভাষায় দুনিয়ার এ প্রথম মানুষকে বলা হয় আদম। আদম থেকেই আদমী শব্দের উৎপত্তি এবং এ শব্দটি হচ্ছে ইনসান বা মানুষের সমার্থক! আল্লাহ তা’য়ালা সবার আগে হযরত আদম আলাইহিস সালামকে নিযুক্ত করেছিলেন তাঁর পয়গাম্বর এবং তাকে তাঁর সন্তান সন্তুতিকে ইসলামের শিক্ষা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন , যেন তিনি তাদেরকে বলে দেন ঃ তোমাদের ও সারা দুনিয়ার আল্লাহ এক , তোমরা তাঁরই ইবাদাত কর , তাঁরই কাছে মাথা নত কর, তাঁরই কাছে সাহায্য ভিক্ষা কর , তাঁরই ইচ্ছা ও মর্জি অনুযায়ী দুনিয়ার বুকে সততা ও ইনসাফের সাথে জীবন যাপন কর। এমনি করে জীবন যাপন করলে তোমরা পাবে বাঞ্ছিত পুরস্কার এবং তার আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে তোমাদের প্রাপ্য হবে কঠিনতম শাস্তি।

হযরত আদম আলাইহিস সালামের বংশধরদের মধ্যে যারা ছিলেন সৎলোক , তারা পিতার নির্দেশিত সহজ পথ অনুসরণ করে চলতে লাগলেন ; কিন্তু অসৎ লোকেরা সে পথ ছেড়ে চলে গেল। ধীরে ধীরে সব রকম দুস্কৃতির সৃষ্টি হল , কেউ শুরু করলো চন্দ্র , সূর্য ও তারকার পূজা , কেউ আবার শুরু করলো গাছপালা , জীব -জানোয়ার ও নদী -পর্বতের উপাসনা। কেউ কেউ মনে করলো হাওয়া , পানি , আগুন , ব্যাধি , সুস্থতা ও শক্তি এবং প্রকৃতির অন্যান্য কল্যাণকর উপকরণ ও শক্তির খোদা আলাদা আলাদা এবং তাদের প্রত্যেকেরই পূজা করা প্রয়োজন, যাতে প্রত্যেক খোদা -ই খুশী হয়ে তাদের প্রতি মেহেরবান হয়। এমনি করে মূর্খতার কারণে শির্‌ক (অংশীবাদ) ও বুতপরস্তির (পৌত্তলিকতা ) নানা রূপ সৃষ্টি হলো এবং তার মাধ্যমে অসংখ্য ধর্মের উদ্ভব হলো। এ হচ্ছে সেই যুগের কথা যখন হযরত আদম আলাইহি সালামের বংশধররা দুনিয়ার বুকে। প্রত্যেক জাতি একটি নতুন ধর্ম তৈরী করে নিয়েছে এবং প্রত্যেকের রীতি নীতি হয়ে গিয়েছিল স্বতন্ত্র। হযরত আদম (আ) যে বিধান পেশ করেছিলেন তাঁর বংশধরদের কাছে, আল্লাহকে ভুলার সাথে সাথে মানুষ সেই বিধানকেও গেল ভুলে । মানুষ তখন শুরু করেছে তার প্রবৃত্তির দাসত্ব। সব রকম অন্যায় রীতি -নীতি জন্ম লাভ করেছে এবং সব রকম জাহেলী ধারণা প্রসার লাভ করেছে চারদিকে। ভাল-মন্দ বিবেচনায় মানুষ করছে ভুল । বহু অন্যায়কে তারা ভাল মনে করেছে, আর বহু ভাল কাজকে মনে করেছে খারাপ।

আল্লাহ তা’য়ালা প্রত্যেক জাতির মধ্যে পাঠাতে শুরু করলেন তাঁর পয়গাম্বর । প্রথমে হযরত আদম (আ) মানুষকে যে শিক্ষা দিয়েছেলেন , অন্যান্য পয়গাম্বর ও মানুষকে সেই শিক্ষাই দিতে লাগলেন । নিজ নিজ জাতিকে তাঁরা স্মরণ করিয়ে দিতে লাগলেন তাদের ভুলে যাওয়া শিক্ষা। মানুষকে তাঁরা শিখালেন এক আল্লাহর ইবাদাত, তাদেরকে ফিরালেন শির্‌ক ও বুতপরস্তি পথ থেকে। জাহেলী রীতি ভেঙ্গে দিয়ে তারা আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জি অনুযায়ী জীবন অতিবাহনের পথনির্দেশ করলেন এবং নির্ভুল বিধান বিশ্লেষণ করে তাদেরকে চালিত করলেন তাঁর আনুগত্যের পথে।হিন্দুস্তান, চীন, ইরান , ইরাক , মিসর , আফ্রিকা ও ইউরোপ --সোজা কথায় দুনিয়ায় এমন কোন দেশ নেই , যেখানে আল্লাহর তরফ থেকে কোন পয়গাম্বর আসেননি। তাঁদের সবারই ধর্ম ছিল এক ও অভিন্ন যাকে আমরা আমাদের নিজস্ব ভাষায় বলি ইসলাম ১ অবশ্যি তাঁদের শিক্ষা পদ্ধতি ও জীবন বিধান কিছুটা ভিন্ন ধরনের ছিল । প্রত্যেক জাতির মধ্যে যে ধরনের জাহেলীয়াত প্রসার লাভ করেছিল তা দূর করার উপরই বেশী করে জোর দেয়া হয়েছিল । যে ধরনের ভুল ধারণা যতোটা প্রচলিত হয়েছিল , তার প্রতিকারের জন্য ততোটা বেশী করে মনোয়োগ দেয়া প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল , তখন তাদের জন্য সহজ শিক্ষা ও সহজ বিধান দেয়া হয়েছিল । ধাপে ধাপে তারা যখন উন্নাতর পথে এগিয়ে যেতে লাগল , তাদের জন্য শিক্ষা ও অনুসরণীয় বিধানের ও ততো বেশী করে প্রসার হতে লাগলো। শিক্ষা ও বিধানের এ বিভিন্নতা কেবল বাইরের রূপেই সীমাবদ্ধছিল , কিন্তু সবারই প্রাণবস্তু ছিল এক অর্থাৎ বিশ্বাসের দিক দিয়ে তাওহীদ , কর্মে সততা ও সুশৃঙখলা এবং আখেরাতের প্রতিফল ও শাস্তির প্রতি প্রত্যয়ের বুনিয়াদই তার প্রাণ-বস্তু।

পয়গাম্বরের প্রতি ও মানুষ করেছে বহু অদ্ভুত আচরণ । মানুষ প্রথমে তাঁদের সাথে করেছে দুর্ব্যবহার , তাঁদের উপদেশ অগ্রাহ্য করেছে , কাউকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে , কাউকে বা হত্যা করেছে । সারা জীবন মানুষের কাছে শিক্ষা প্রচার করে কারুর আবার বহু কষ্টে দশ পাঁচ জন অনুগামী জুটেছে । কিন্তু আল্লাহর এ মনোনীত বান্দাগণ বরাবর তাঁদের কর্তব্য করে গেছেন অবিচলিত ভাবে। অবশেষে তাঁদের শিক্ষা মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে এবং বড় বড় কওম তাঁদের আনুগত্য স্বীকার করেছে। এরপর মানুষের ভ্রান্তি প্রবণতা (গুমরাহী) আবার নতুন রূপ পরিগ্রহ করল। পয়গাম্বরদের ওফাতের পর তাঁদের উম্মাতরা ভুলে গেল তাঁদের শিক্ষা । তাঁদের কিতাবে নিজেদের তরফ থেকে সব রকম ধারণা মিশ্রিত করে দিল। ইবাদাতের নতুন নতুন রূপ অবলম্বন করল - কোন কোন শ্রেণী খোদ পয়গাম্বরদের উপাসানা শুরু করে দিল । কেউ তার পয়গাম্বরকে বলতে লাগল আল্লাহর অবতার (অর্থাৎ আল্লাহ নিজেই মানব রূপে অবতীর্ণ হয়েছেন) কেউ তার পয়গাম্বরকে বানিয়ে নিল আল্লাহর সাথে শরীক। মোটকথা , মানুষ এমন স্বেচ্ছারিতা শুরু করল যে , যারা মূর্তি ধ্বংস করেছিলেন সেই পয়গাম্বরগণকেই তারা পরিণত করলো মূর্তিতে । পয়গাম্বর তাঁর উম্মাতদের যে জীবন বিধান (শরীয়াত ) দিয়ে গিয়েছিলেন , ধীরে ধীরে তাকেও তারা বিকৃত করে ফেলল । তার মধ্যে তারা সব রকম মূর্খতা - প্রসূত রীতি মিশিয়ে ফেলল , কতো কাহিনী ও মিথ্যা বর্ণনার সংমিশ্রণ করল এবং মানুষের তৈরী বিধান সমূহকে পয়গাম্বরের প্রদর্শিত বিধানের সাথে চালু করে দিল । ফলে পয়গাম্বরদের প্রকৃত শিক্ষা ও বিধান কি ছিল এবং পরবর্তী লোকেরা তার সাথে কি কি মিশ্রিত করে তাকে রূপ দিয়েছে কয়েক শতাব্দীর ব্যবধানে তা বুঝবার আর কোন উপায় থাকলো না । পয়গাম্বরদের নিজেদের জীবন -কাহিনী মিথ্যা ও অলীক বর্ণনা দ্বারা এমন ভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলা হয়েছে যে , তাঁদের জীবনের কোন নির্ভরযোগ্য ইতিহাস পাওয়া যাচ্ছে না। তথাপি পয়গাম্বরদের জীবন সাধনার সবটুকুই ব্যর্থ হয়ে যায়নি। সর্বপ্রকার বিকৃতি ও পরিবর্তন সত্ত্বেও সকল জাতির মধ্যে আজো কিছু না কিছু সত্য বেঁচে রয়েছে । আল্লাহর অস্তিত্ব ও আখেরাতের ধারণা কোন না কোন রূপে সকল জাতির মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। সততা , সত্য ও নৈতিক জীবনের কোন কোন নীতি সাধারণভাবে সারা দুনিয়ার স্বীকৃতি লাভ করেছে। এ সংগে দুনিয়ার বিভিন্ন জাতির পয়গাম্বরগণ আলাদা আলাদা করে এক এক জাতিকে একটা নির্র্দিষ্ট সীমানা পর্যন্ত এমনভাবে তৈরী করে দিয়েছেন, যাতে র্নিবিশেষে সকল মানুষের কাছে গৃহিত হওয়ার মতো এক সাধারণ ধর্মের শিক্ষা দুনিয়ার মানুষের কাছে পেশ করা যেতে পারে।

আগেই বলেছি , গোড়ার দিকে প্রত্যেক জাতির মধ্যে আলাদা আলাদা পয়গাম্বর এসেছিলেন এবং তাঁদের প্রত্যেকের শিক্ষা তাঁর নিজ কওমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এর কারণ , তখনকার দিনে সকল কওমই পরস্পর বিচ্ছিন্ন ছিল। তাদের মধ্যে বড় বেশী মেলামেশা ছিল না। বস্তুত প্রত্যেক কওম নিজ নিজ দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এমনি অবস্থায় সকল কওমের জন্য এক সাধারণ যৌথ শিক্ষা প্রচার অত্যন্ত দুরূহ ছিল। এ ছাড়াও বিভিন্ন কওমের অবস্থা পরস্পর থেকে ছিল স্বতন্ত্র । তখনকার দিনে জাহেলী ধারণার প্রসার হয়েছিল অত্যধিক। এর ফলে নীতি বোধ ও আচরণের যে বিকৃত রূপ দেখা দিয়েছিল , প্রত্যেক জায়গায়ই তার ধরন ছিল স্বতন্ত্র। এর জন্যই আল্লাহর পয়গাম্বরদের জন্য অপরিহার্য ছিল প্রত্যেক কওমের মধ্যেই আলাদা আলাদা শিক্ষা ও হেদায়াত পেশ করা ধীরে ধীরে বিভ্রান্তিকর ধারণার উচ্ছেদ করে সঠিক ধারণা প্রচারের , ক্রমে ক্রমে জাহেলী জীবন পদ্ধতির বিনাশ সাধন করে শ্রেষ্টতম বিধানের আনুগত্য শিক্ষা দেয়ার এবং শিশুদেরকে যেভাবে শিক্ষিত করে তোলা হয়, তেমনি করে শিক্ষা দেয়ার । এমনি করে দুনিয়ার জাতি-সমূহকে শিক্ষিত করে তুলতে কত হাযার বছর চলে গিয়েছিল , তা আল্লাহ -ই জানেন। অবশেষে সে তার শৈশব অবস্থা অতিক্রম করে পরিণতির স্তরে আসতে শুরু করল। বাণিজ্য , শিল্প ও স্থাপত্যের অগ্রগতি হবার ফলে তাদের পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হল। চীন , জাপান থেকে শুরু করে ইউরোপ আফ্রিকায় দূর দূরান্ত পর্যন্ত কায়েম হল জাহাজ চলাচল ও স্থল পথে সফরের ধারা। অধিকাংশ জাতির বর্ণমালা উদ্ভব হল এবং লেখাপড়ার রেওয়ায শুরু হল। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার হল এবং জাহিসমূহের মধ্যে চিন্তা ও জ্ঞানের বিনিময় চলতে লাগল । বড় বড় দিগ্ধিজয়ী জন্ম লাভ করল এবং তারা বড় বড় সাম্রাজ্য কায়েম করে বিভিন্ন দেশ ও বিভিন্ন জাতিকে এক রাজনৈতিক পদ্ধতিতে মিলিত করল । এমনি করে মানব জাতির বিভিন্ন কওমের মধ্যে গোড়ার দিকে যে দূরত্ব ও পার্থক্য দেখা যেতো, ক্রমে ক্রমে তা হ্রাস পেতে লাগলো এবং তখন ইসলামের একই শিক্ষা ও একই জীবন বিধান (শরীয়াত ) তামাম দুনিয়ার কাছে পেশ করার সম্ভাবনা দেখা দিল । আজ থেকে আড়াই হাযার বছর আগে মানুষের এতটা উন্নতি হয়েছিল এবং তারা নিজেরাই এক সার্বজনীন জীবন বিধানের প্রয়োজন অনুভব করছিল। বৌদ্ধধর্ম যদিও কোন পূর্ণাংগ ধর্ম -বিধান ছিলনা এবং তাতে কেবল নৈতিক চরিত্র সংক্রান্ত কতিপয় নীতির সমাবেশ হয়েছিল , তথাপি হিন্দুস্তান থেকে বেরিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম একদিকে জাপান ও মংগোলিয়া পর্যন্ত এবং অপর দিকে আফগানিস্তান ও বোখারা পর্যন্ত প্রসার লাভ করেছিল। এ ধর্ম মতের প্রচারকগণ বহু দূর দূরান্তের নানা দেশ পর্যটন করেছিলেন। এর কয়েক শতাব্দীর পর উদ্ভব হল ইসায়ী ধর্মের । যদি ও হযরত ঈসা (আ) ইসলামের শিক্ষা নিয়েই এসেছিলেন , তথাপি তাঁর তিরোধানের পর ঈসায়ী ধর্ম নামে এক বিকৃত ধর্ম তৈরী করে নেয়া হয়েছিল এবং ঈসায়ীরা এ ধর্মকে ইরান থেকে শুরু করে আফ্রিকা ও ইউরোপের দূর -দূরায নানা দেশ ছড়িয়ে দিল। বস্তুত দুনিয়া তখন এক সাধারন মানব ধর্মের প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভব করছিল এবং তাঁর জন্য এতটা প্রস্তুত ছিল যে , যখন তেমন কোন পূর্ণাংগ ও নির্ভুল জীবন বিধানের সন্ধান পাওয়া গেল না, তখন অপরিণত ও অসম্পূর্ণ ধর্মসমূহকেই বিভিন্ন কওমের মধ্যে প্রচার করতে শুরু করলো ।

অধ্যায় ০৪ : হযরত মুহাম্মাদ (সা) -এর নবুয়াত (প্রমান ও অন্যান্য...)

হযরত মুহাম্মাদ (সা) -এর নবুয়াত

এমন এক সময় এলো , যখন সারা দুনিয়ার ও মানব জাতির সকল কওমের জন্য এক পয়গাম্বর অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (সা) -কে আল্লাহ তা’য়ালা আরব দেশে পয়দা করলেন এবং তাঁকে ইসলামের পূর্ণ শিক্ষা ও পূর্ণাঙ্গ বিধান দান করে তা সারেজাহানে প্রচার করার মহাকর্তব্যে নিযুক্ত করেন।

দুনিয়ার ভূগোল পর্যালোচনা করলে প্রথম দৃষ্টিতে বুঝতে পারা যায় যে , সারা দুনিয়ার পয়গাম্বরীর জন্য যমীনের বুকে আরবের চেয়ে অধিকতর উপযোগী আর কোন স্থান হতে পারে না। এ দেশটি এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের ঠিক কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। ইউরোপও এখান থেকে অত্যন্ত নিকটবর্তী । বিশেষ করে তখনকার দিনে ইউরোপের সভ্য জাতিসমূহ ইউরোপের দক্ষিণ অংশে বাস করতো এবং সে অংশটি আরব থেকে হিন্দুস্তানের মতই নিকটবর্তী ছিল।

আবার তখনকার দিনের দুনিয়ার ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যাবে যে , এ নবূয়াতের জন্য তখনকার দিনে আরব কওমের চেয়ে উপযোগী আর কোন কওম ছিলনা । আর সব বড় বড় কওম তখন দুনিয়ার বুকে নিজ নিজ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কান্ত হয়ে পড়েছিল । কিন্তু আরবরা ছিল তখনো তাজা তারূণ্যের অধিকারী কওম । সভ্যতার ক্রমোন্নতির সাথে অন্যান্য কওমের চালচলনে এসে ছিল বহুবিধ বিকৃতি ; কিন্তু আরব কওমের উপর তখনো তেমন কোন সভ্যতার প্রভাব পড়েনি , যার ফলে তারা আরাম প্রয়াসী , আয়েশ -প্রিয় ও হীন স্বভাব সম্পন্ন হতে পারে । ঈসায়ী ছয় শতকে আরব ছিল সে যুগের সভ্যতা গর্বিত জাতি সমূহের দুষ্ট প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যে জাতির মধ্যে সভ্যতার হাওয়া লাগেনি তার মধ্যে মানবীয় গুণরাজির জৌলুস যতটা থাকা সম্ভব তা আরবদের মধ্যে ছিল। তারা ছিল বীর্যবান, নির্ভীক ও মহৎপ্রাণ ; তারা প্রতিশ্রু“তি পালন করতো , স্বাধীন চিন্তা ও স্বাধীন জীবন ভালবাসতো তারা , অপর কোন জাতির গোলামী তারা স্বীকার করতো না। আপনার ইয্যত বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ বির্সজন দিতে তারা কুন্ঠিত হতো না। তারা অত্যন্ত সরল জীবন যাপন করতো এবং ভোগ-বিলাসের প্রতি তাদের কোন আসক্তি ছিল না। নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে নানা প্রকার দুস্কৃতির অস্তিত্ব ছিল তার বিবরণ পরে জানা যাবে; কিন্তু তাদের সে দুষ্কৃতির কারণ ছিল এই যে, আড়াই হাযার বছরের মধ্যে তাদের দেশে কোন পয়গামম্বরের আবির্ভাব হয়নি , তাদের মধ্যে নৈতিক , সংস্কৃতির সাধন ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা দানের যোগ্যতা নিয়ে কোন সংষ্কারক আসেননি। বহু শতাব্দী ধরে রুক্ষ উষর মরুর বুকে স্বাধীন জীবন যাপনের ফলে তাদের মধ্যে মূর্খতা ও জাহেলী ভাবধারা প্রসার লাভ করেছিল এবং তারা তাদের অজ্ঞতা প্রসূত চালা চলনে এতটা কঠোর ও দৃঢ় বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে , তাদেরকে সত্যিকার মানুষে পরিণত করা কোন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু এর সাথে সাথে তাদের মধ্যে অবশ্যি এমন এক যোগ্যতা সঞ্চিত ছিল যে , কোন প্রতিভা -দীপ্ত মানুষ তাদের জীবন সংষ্কার সাধনের জন্য এগিয়ে এলে এবং তাদেরকে কোন মহান লক্ষের নির্দেশ দিয়ে প্রবুদ্ধ করলে তারা সেই লক্ষ অর্জনের জন্য সারা দুনিয়াকে ওলট পালট করতেও পশ্চাৎপদ হতো না। সারেজাহানের পয়গাম্বরের শিক্ষার প্রসার সাধনের জন্য প্রয়োজন ছিল এমন এক তারুণ্য -দীপ্ত শক্তিশালী কওমের।

এরপর আরবী ভাষাও লক্ষণীয় । আরবী ভাষা পাঠ করলে এবং তার সাহিত্য সম্পদের পরিচয় লাভ করলে সহজেই বুঝতে পারা যায় যে , উচ্চ চিন্তাধারার প্রকাশ এবং আল্লাহর জ্ঞানের মাধুর্য সূক্ষতাপূর্ণ রহস্য বর্ণনা করে মানব-অন্তরকে প্রভাবিত করার জন্য এর চেয়ে উপযোগী আর কোনা ভাষা হতে পারেনা। এ ভাষায় ছোট ছোট সংক্ষিপ্ত কথা বা বাক্যের মাধ্যমে বিরাট বিরাট ভাব প্রকাশ করা যায় এবং তার প্রকাশভংগী এত বলিষ্ঠ যে, তীর বা বর্শার মতো তা মানুষের অন্তরকে বিদ্ধ করে । এ ভাষার মাধুর্য মানব -কর্ণে মধু বর্ষণ করে । তার মধুর সুর -লহরী মানব অন্তরকে অলক্ষে ছন্দ -পাগল করে তোলে কুরআনের মতো মহাগ্রন্থের বাহন হবার জন্য এমনি এক ভাষারই প্রয়োজন ছিল।

এখানেই আল্লাহ তা’য়ালার মহাজ্ঞানের প্রকাশ যে , তিনি তাঁর সর্বশেষ বিশ্বনবীকে প্রেরণের জন্য এ আরব ভুমিকেই মনোনীত করেছিলেন । যে পবিত্র সত্তাকে আল্লাহ তা’য়ালা এ মহাত্তম কর্তব্যের জন্য মনোনীত করেছিলেন , তিনি কেমন অতুলনীয় ছিলেন , এখন তারই বর্ণনা পেশ করব।

নবুয়াতে মুহাম্মদীর প্রমাণ

আজ থেকে চৌদ্দ শ’ বছর পশ্চাতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা যাক। দুনিয়ায় তখন না ছিল তারবার্তায় ব্যবস্থা, না ছিল টেলিফোন না ছিল রেলগাড়ী , না ছিল ছাপাখানা না ছিল পত্র -পত্রিকা না ছিল বই -পত্র , না ছিল বিদেশ সফরের সুযোগ সুবিধা --যা আমরা আজকের দিনে দেখতে পাচ্ছি । এক দেশ থেকে দেশান্তরে যেতে হলে অতিক্রম করতে হতো কয়েক মাসের পথ। এমনি অবস্থায় আরব দেশ ছিল দুনিয়ার আর সব দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন। তার আশে পাশে ছিল ইরান, তুরস্ক ও মিসর এবং সেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা কিছুটা ছিল। কিন্তু প্রকান্ড বালুর সমুদ্র সেসব দেশ থেকে আরবকে আলাদা করে রেখেছিল । আরব সওদাগররা মাসের পর মাস উটের পিঠে পথ চলে সেসব দেশে তেজারতের জন্য যেতো কিন্তু তাদের সে সম্পর্ক কেবল পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আরব ভূমিতে তখনো কোন উচ্চাংগের সভ্যতার অস্তিত্ব ছিলনা সেখানে না ছিল বিদ্যালয় না ছিল গ্রন্থাগার , না ছিল সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে লেখা –পড়ার র্চচা। সারা দেশে গণনা করার মতো স্বল্প সংখ্যক লোক ছিল যারা কিছুটা লেখা -পড়া জানতো , কিন্তু তাও সে যুগের জ্ঞান বিজ্ঞানের পরিচয় লাভের জন্য যথেষ্ট নয়। কোন সুগঠিত সরকারের অস্তিত্ব ছিল না সেখানে। কোন আইন কানুন ছিলনা । প্রত্যেক গোত্র তার নিজ নিজ এলাকায় স্বেচ্ছাতন্ত্র চালিয়ে যেতো। সারা দেশে স্বাধীনভাবে যথেষ্ট লুট -তরায চলতো। খুন -খারাবী ও যুদ্ধ -বিগ্রহ ছিল সেখানকার নিত্য প্রচলিত ব্যাপার । মানুষের জীবনের কোন মূল্য ছিল না সেখানে যার উপর যার কোনরূপ আধিপত্য চলতো তাকে হত্যা করে সে তার সম্পতি দখল করে বসতো। তাদের ভিতরে কোন নীতিবোধ বা সভ্যতার সংস্পর্শ ছিল না। দুস্কৃতি , শরাবখোরী ও জুয়া ছিল অতি সাধারণ ব্যাপার । একে অপরের সামনে নিরাবরণ হতে তাদের দ্বিধা ছিল না। এমন কি আরব --নারীরা উলংগ অবস্থায় কা’বা শরীফ তাওয়াফ করত। হারাম ও হালালের কোন পার্থক্য ছিল না তাদের জীবনে। আরবদের আযাদী এতটা সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল যে , তারা কোন নিয়ম, কোন আইন, কোন নৈতিক পদ্ধতি মেনে চলতে তৈরী ছিল না, কোন নেতার আনুগত্য তারা কবুল করতে পারতো না। আরবদের অজ্ঞতা এমন চরম রূপ গ্রহন করেছিল যে তারা পাথরের মূর্তিকে পূজা করত। পথ চলতে কোন সুন্দর পাথর টুকরা পাওয়া গেলে তা তুলে এনে সামনে বসিয়ে তারা পূজা করত। যে শির কারুর কাছে অবনমিত হতে রাযী হতো না সামান্য পাথরের সামনে তা ঝুঁকে পড়তো এবং মনে করা হতো যে সেই পাথরই তাদের সকল মনষ্কামনা পূর্ণ করতে পারে।

এমন অবস্থায় এমন জাতির মধ্যে একটি মানুষের আবির্ভাব হল । শৈশবেই পিতা -মাতা ও পিতা মহের স্নেহের ছায়া থেকে তিনি বঞ্চিত হলেন। অতীতের সেই অবস্থার মধ্যে যেটুকু শিক্ষা লাভ করা সম্ভব ছিল তাও তাঁর ভাগ্যে জুটলো না। বড় হয়ে তিনি আরব –শিশুদের সাথে ছাগল চরাতে লাগলেন। যৌবনে তিনি আত্যনিয়োগ করলেন বাণিজ্যে । তাঁর উঠা -বসা মেলামেশা সব কিছুই হতে লাগলো সেই আরবদের সাথে , যাদের অবস্থা আগেই বলা হয়েছে। শিক্ষার নাম গন্ধ নেই , এমন কি সামান্য পড়াশুনাও তিনি জানেন না, কিন্তু তা সত্তেও তাঁর চালচলন তাঁর স্বভাব -চরিত্র তাঁর চিন্তাধারা ছিল অপর সবার চেয়ে আলাদা। তিনি কখনো মিথ্যা কথা বলেন না, কারুর সাথে দুর্বাক্য উচ্চারণ করেন না, কঠোর বাক্যের পরিবর্তে মধু বর্ষিত হয় তাঁর মুখ থেকে, আর তার প্রভাবে মানুষ মুগ্ধ হয়ে আসে তাঁর কাছে। কারুর একটি পয়সা ও তিনি অবৈধ ভাবে গ্রহণ করেন না। তাঁর বিশ্বস্ততায় মুগ্ধ মানুষ তাহাদের বহু মূল্যবান সম্পত্তি রেখে দেয় তাঁর হেফাযতে এবং তিনি প্রত্যেকের সম্পত্তি হেফাযত করে নিজের জীবনের মতো। সমগ্র কওম তাঁর সততায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ‘আল আমিন’ নামে আখ্যায়িত করে । তাঁর লজ্জাশীলতাবোধ এমন প্রখর যে শৈশব থেকে কেউ তাকে কোনদিন নিরাবরণ দেখেনি। তিনিএমন সদাচারী যে , দূরাচারী ও দুস্কৃতি পরায়ণ জাতির মধ্যে প্রতিপালিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি সর্বাবিধ অসদাচরণ ও অশোভন কার্যকলাপকে ঘৃণা করেন এবং তার প্রত্যেকটি কার্যে পাওয়া যায় পরিচ্ছন্নতার পরিচয়। চিন্তাধারার পবিত্রতার দরুন তিনি নিজ জাতির মধ্যে লুট -তরায খুন খারাবি দেখে অন্তরে গভীর দুঃখ অনুভব করেন এবং লড়াইয়ের সময়ে তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। তাঁর কোমল অন্তর প্রত্যেক মানুষের দুঃখ -বেদনার শরীক হয় । ইয়াতিম ও বিধবাকে তিনি সাহায্য করেন , ক্ষুধিতের মুখে খাদ্য তুলে দেন , মুসাফিরকে ও সাদরে ঘরে ডেকে নিয়ে খেতে দেন । তিনি কাউকে ও দুঃখ দেন না , নিজে অপরের জন্য দুঃখ বরন করেন। নির্ভুল জ্ঞানের অধিকারী তিনি , মূর্তিপূজারী কওমের মধ্যে থেকেও মূর্তি পূজাকে ঘৃণা করেন। কখনো কোন সৃষ্টির সামনে তাঁর মাথা নত হয় না। তাঁর অন্তর থেকে স্বতঃই আওয়াজ আসে যমীন - আসমানে যা কিছু দেখা যায় , তার মধ্যে কেউ নেই উপাসনা পাওয়ার যোগ্য । তাঁর দিল আপনা থেকেই বলে ওঠেঃ আল্লাহ তো এজনই মাত্র হতে পারেন এবং তিনি অদ্বিতীয় - একক। এক বর্বর জাতির মধ্যে এ মহান ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব হল, যেন এক প্রস্তর স্তুপের মাঝখানে এক দীপ্তমান হীরকখন্ড , যেন ঘনঘোর অন্ধকারের মাঝখানে এক প্রদীপ্ত দীপশিখা।

প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এমনি পবিত্র পরিচ্ছন্ন উচ্চাংগের মহৎ জীবন যাপনের পর তিনি চারিদিকের ঘনিভূত ঘনঘোর দেখে হাঁপিয়ে ওঠেন , অজ্ঞতা , নীতিহীনতা , পাপাচার , দুর্ণীতি , শিরক ও পৌত্তলিকতার ভয়াবহ সমুদ্র বেষ্টন থেকে তাঁর অন্তর চায় মুক্তি , কারণ সেখানকার কোন কিছুই তাঁর মনোভাবের অনুকুল নয়। অবশেষে তিনি জনতা থেকে দূরে এক পর্বতের গুহায় গিয়ে নির্জনতা ও প্রশান্তির দুনিয়ায় কাটিয়ে দেন দিনের পর দিন । অনাহারে থেকে থেকে তিনি আরো পরিশুদ্ধি করে তোলেন তাঁর আত্মাকে , তাঁর চিত্তকে , তাঁর মস্তিষ্ককে । সেখানে তিনি ভাবেন , চিন্তা ও ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে থাকেন, সন্ধান করেন এক নতুন আলোকের যে আলোর দীপবর্তিকা ধারণ করে তিনি দূর করতে পারেন তাঁর চারিদিকের ঘনীভূত অন্ধাকার । তিনি সন্ধান করেন শক্তির উৎস , যা দিয়ে তিনি ভেঙ্গে চুরমার করে দেবেন এ বিকৃত দুনিয়াকে কায়েম করবেন মানবতার সুরু সুন্দর কাঠামো।

এ ধ্যান -তন্ময়তার মাঝখানে তাঁর জীবনে এলো এক বিপুল আত্মিক পরিবর্তন । তাঁর প্রকৃতি এতকাল ধরে সন্ধান করেছিল যে আলোক , আর অন্তরে অকস্মাৎ আবির্ভুত হল তার দীপ্ত রশ্মি । অকস্মাৎ তাঁর অন্তরে এলো এমন এক শক্তি, যার প্রকাশ তিনি আর কোনদিন অনুভব করেনি।পর্বত গুহার নির্জন পরিবেশ ছেড়ে তিনি বেরিয়ে এলেন বাইরে জনতার সামনে, আপন কওমের কাছে এসে তিনি তাদেরকে জানালেনঃ প্রস্তর মূর্তির কোন শক্তি নেই তার পূজা বর্জন কর। এ চাঁদ , এ সূর্য, এ যমীন ও আসমানের সকল শক্তি এক আল্লাহ তা’য়ালার সৃষ্টি তিনিই তোমাদের সকলের স্রষ্টা, তিনিই রিযকদাতা, জীবন -মৃত্যু সব কিছুই তার নিয়মের অধীন । সবাইকে ছেড়ে একমাত্র তাঁরই উপাসনা কর , তারই কাছে মনোবাসনার সিদ্ধি কামনা কর। চুরি ডাকাতি, লুট- তরায , শরাবখোরী , জুয়া প্রতারণা-- যা কিছু করছো তোমরা, এসব পাপ - আল্লাহ ইচ্ছার বিরোধী এসব দুস্কৃতি পরিত্যাগ কর। সত্য কথা বল , ন্যায় বিচার কর, কারুর প্রাণনাশ কর না, কারুর সম্পত্তি হরণ করনা, যা কিছু গ্রহণ কর সত্যের পথে গ্রহণ কর,যা কিছু দান কর সত্য পথে দান কর। তোমরা সবাই মানুষ,সকল মানুষ পরস্পর সমান। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্ব (শরাফত) তার বংশ মর্যাদার নয় --বর্ণ, রূপ ও সম্পদ নয়। আল্লাহ-পরস্তি, সৎকর্ম ও পবিত্র জীবন যাত্রাই হচ্ছে মানুষের শরাফতের নিদর্শন। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ভয় পোষণ করে সৎ ও পবিত্র জীবন যাপন করে সেই হচ্ছে সর্বোচ্চ স্তরের মানুষ । যে ব্যক্তি তার ব্যতিক্রম করে তার কোন গৌরবই নেই। মৃত্যুর পর তোমাদের সবাইকে হাযির হতে হবে স্রষ্টার সামনে চূড়ান্ত বিচার দিনের সেই সত্যিকার ন্যায়বিচারকের সামনে গ্রাহ্য হবেনা কোন সুপারিশ অথবা উৎকোচ।সেখানে প্রশ্ন উঠবেনা কোন বংশ মর্যদার । সেখানে হবে কেবল ঈমান ও সৎকর্মের হিসেব। যার কাছে এসব সম্পদ থাকবে তার বাসভূমি হবে জান্নাত এবং যার কাছে এর কোন কিছুই থাবে না তার জন্য নির্ধারিত রয়েছে হতাশা ও দোযখের শাস্তি।

তখনকার আরবের জাহেল কওম এ পুণ্যাত্মা মানুষটির উপর দুর্ব্যবহার করে তাঁকে হয়রান করেছে কেবলমাত্র এ অপরাধে যে, তিনি তাদের বাপ- দাদার আমলে প্রচলিত কার্যকলাপের নিন্দা করেছেন এবং পূর্ব পুরুষদের অনুসৃত জীবন পদ্ধতির খেলাফ শিক্ষা দান করেছেন। এ অপরাধে তারা তাঁকে অকথ্য গালি দিতে লাগল ,পাথর মেরে মেরে তাঁর জীবন দুর্বিসহ করে তুলল । তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করল। একদিন দু’দিন নয় , ক্রমাগত তের বছর ধরে তাঁর উপর চালিয়ে গেল কঠিনতম নির্যাতন, অবশেষে তাঁকে স্বদেশের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে যেতে হল বিদেশে। দেশ ছেড়ে যেখানে তিনি আশ্রয় নিলেন, সেখানেও তাঁকে তারা কয়েক বছর ধরে পেরেশান করতে লাগল।

এত সব দুঃখ কষ্ট ও নির্যাতন তিনি কেন সহ্য করলেন ? তার একমাত্র লক্ষ ছিল তার কওমকে সত্যের সহজ সঠিক পথ নির্দেশ করা । তার জাতি তাকে বাদশাহের মর্যাদা দান করতে প্রস্তুত ছিল , তার পায়ের উপর ঢেলে দিতে চেয়েছিল সম্পদের স্তুপ । তারা চাইত কেবল তাকে সত্য প্রচার থেকে বিরত রাখতে । তিনি তাদের সকল প্রলোভনকে অকাতরে উপোকারে আপন লক্ষে অবিচল রইলেন । যে মানুষ নিজের স্বার্থের জন্য নয়, অপরের কল্যাণ সাধনের জন্য ক্রমাগত দুঃখ কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করে যান, তার চেয়ে বড় মহৎ অন্তঃকরণ ও সততার কল্পনা আর কারুর মধ্যে করা যায় কি ? যাদের কল্যাণের জন্য তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারাই তাঁকে পাথর মেরে আহত করছে আর তিনি প্রতিদানে তাদের কল্যাণই কামনা করছেন । মানুষ তো দূরের কথা ফিরেশতা ও এমনি সততার নিদর্শন দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়।

বিশেষ করে দেখা দরকার যে , এ মানুষটি যখন পর্বত গুহা থেকে এ সত্যের বাণী নিয়ে বেরিয়ে এলেন মানব সমাজের সামনে, তখন তাঁর মধ্যে ঘটে গেল কত বড় বিপ্লব । যে বাণী তিনি মানুষকে শুনাতে লাগলেন তা এমন স্বচ্ছ -সাবলীল , ভাষা ও সাহিত্যের মানদন্ডে এতই উচ্চাংগের ও অলংকার পূর্ণ যে তার আগে অথবা পরে এমন কথা কেউ কোন দিন বলেনি। কাব্য , বাগ্নিতা ও ভাষার স্বচ্ছতা নিয়ে আরবরা গর্ব করে বেড়াত । আরবের জনগণের সামনে তিনি চ্যালেঞ্জ করলেন কালামে পাকের সূরার মত একটি সূরা পেশ করতে, কিন্তু তাঁর সে চ্যালেঞ্জের সামনে সবারই মাথা নত হয়ে গেল। এ বিশেষ কালামের (কুরআন শরীফ ) ভাষা যেমন ছিল, তাঁর সাধারণ আলাপ আলোচনা ও বক্তৃতার ভাষা কিন্তু তেমন উচ্চাংগের ছিল না। আজও যখন আমরা তাঁর নিজস্ব অন্যান্য বাণীর সাথে এ কালামের তুলনা করি, তখন তার মধ্যে ধরা পড়ে একটা সুস্পষ্ট পার্থক্য ।

এ মানুষটি ---এ আরব মরুর অক্ষরজ্ঞান বর্জিত মানুষটি যে জ্ঞানগর্ভ দার্শনিক বাণী উচ্চারণ করতে শুরু করলেন, তাঁর আগে আর কোন মানুষ এমন কথা বলেনি, তাঁর পরে আজ পর্যন্ত কেউ তেমনি বলতে পারেনি; এমন কি চল্লিশ বছর বয়সের আগে পর্যন্ত তাঁর মুখে কেউ এমন কথা শুনেনি।

এ উম্মী (নিরক্ষর) মানুষটি নৈতিক-জীবন ও সামাজিক- জীবন , অর্থনীতি , রাজনীতি ও মানব -জীবনের অন্যান্য সকল দিক সম্পর্কে এমন সব বিধান রচনা করে গেছেন যে , বড় বড় বিদ্বান ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা বহু বছরের চিন্তা -গবেষণা ও সারা জীবনের পরীক্ষা -নীরিক্ষা দ্বারা বহু কষ্টে তার নিগূঢ় তাৎপর্য কিছুটা উপলব্ধি করতে পারে এবং দুনিয়ার মানবীয় অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষা -নীরিক্ষা যত বেশি করে প্রসার লাভ করছে , ততই তার নিগূঢ় তাৎপর্য মানুষের কাছে সুস্পষ্টতর হয়ে উঠছে। তেরশ' বছরের অধিক কাল অতীত হয়ে গেছে; কিন্তু আজো তাঁর রচিত বিধানের মধ্যে কোন সংশোধনের অবকাশ অনুভুত হচ্ছে না । দুনিয়ার মানব -রচিত বিধান ইতিমধ্যে হাযার হাযার বার রচিত হয়েছে ও বাতিল হয়ে গেছে ; প্রত্যেক পরীক্ষায় এসব বিধান ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে এবং প্রত্যেক বার তার মধ্যে পরিবর্তন সাধন করতে হয়েছে। কিন্তু এ নিরক্ষর মরুবাসী অপর কোন মানুষের সাহায্য ব্যতিরেকে যে বিধান মানুষের সামনে পেশ করে গেছেন , তার একটি ধারাও পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়নি।

নবুয়াতের ২৩ বছরের মধ্যে তিনি নিজস্ব চরিত্র মাধুর্য , সততা , মহত্ত্ব ও উচ্চাংগের শিক্ষার প্রভাবে দুশমন দেরকে বানিয়েছিলেন দোস্ত এবং প্রতিদ্বন্দ্বিদেরকে পনিরণত করেছিলেন সহযোগীতে । বড় বড় শক্তি তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত পরাজয় বরণ করে তাঁর পায়ে আত্মসমর্পণ করেছে। বিজয়ী হয়েও তিনি কোন দুশমনের উপর তার দুশমনির বদলা নেননি, কারুর প্রতি তিনি কঠোর আচরণ করেনি। যে ব্যক্তি তাঁর আপন চাচাকে হত্যা করে তার কলিজা চিবিয়েছিল তার উপর বিজয়ী হলেও তিনি তাকে মাফ করেছিলেন , যারা তাঁকে পাথর মেরেছিল , স্বদেশ থেকে বিতাড়িত করেছিল , তাদেরকে হাতে পেয়েও তিনি মার্জনা করেছিলেন । তিনি কারুর সাথে প্রতারণা করেননি , কখনো কোন প্রতিশ্র“তি ভংগ করেনি । লড়াইয়ের মধ্যে ও তিনি কোন নিষ্ঠুরতার পরিচয় দেননি; তাঁর কঠিনতম দুশমনও কোন দিন তাঁর বিরুদ্ধে অন্যায় আচরণ ও যুলুমের অপবাদ আনতে পারেনি। তাঁর এ অতুলনীয় সততার প্রভাবে তিনি শেষ পর্যন্ত সারা আরবের অন্তর জয় করেছিলেন । উপরের বর্ণনায় যে আরবদের অবস্থার পরিচয় পাওয়া গেল , নিজস্ব শিক্ষা ও হেদায়াতের প্রভাবে তিনি সেই আরবদেরকে বর্বরতা ও অজ্ঞতা থেকে মুক্ত করে এক উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন সুসভ্য জাতিতে পরিণত করলেন। যে আরব কোন আইনের আনুগত্য স্বীকার করতে রাযী ছিল না, তাদেরকে তিনি এমন আইনানুগ করে তুললেন যে দুনিয়ার ইতিহাসে এমন আইননুসারী কওম আর দেখা যেত না। যে আরবদের মধ্যে অপরের আনুগত্য প্রবণতা মোটেই ছিলনা , তাদেরকে তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্যের অনুগত করে দিলেন। যে মানুষের গায়ে কোন দিন নীতি বোধের হাওয়া পর্যন্ত লাগেনি তাদেরকেও তিনি এমন নৈতিক -চরিত্রসম্পন্ন করে তুললেন যে , তাদের অবস্থা পর্যালোচনা করে আজ দুনিয়া বিস্ময় বিমুগ্ধ হয়ে যায়। তখনকার দিনে যে আরবরা দুনিয়ার জাতিসমূহের মধ্যে সবচেয়ে হীন মর্যাদা সম্পন্ন ছিল , এ একটি মাত্র মানুষের প্রভাবে তেইশ বছরের মধ্যে তারা এমন প্রবল শক্তিমান হয়ে উঠলো যে, তারা ইরান, রোম ও মিসরের প্রবল প্রতাপান্বিত সম্রাটদের সিংহাসন উলটিয়ে দিল; দুনিয়াকে তারা দিল তাহযিব -তামাদ্দুন, নৈতিক জীবন ও মানবতার শিক্ষা; ইসলামের এক শিক্ষা ও এক শরীয়াত নিয়ে তারা ছড়িয়ে পড়লো এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার সুন্দরতম এলাকা পর্যন্ত।

এ’তো গেল আরব কওমের উপর ইসলামের প্রভাব। এর চেয়ে বেশী বিস্ময়করভাবে নিরর আরব-নবীর প্রভাব পড়েছিল তামাম দুনিয়ার উপর। তিনি সারা দুনিয়ার প্রচলিত চিন্তাধারা , আচরণ -পদ্ধতি ও আইন-কানুনের মধ্যে আনলেন এক অভূতপূর্ব বিপ্লব। যারা তার নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিল , তাদের কথা ছেড়ে দিলের বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এই যে, যারা তার আনুগত্য স্বীকারে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যারা তার বিরোধিতা করেছে তার সাথে দুশমনী করেছে, তারাও তার প্রভাব থেকে মুক্ত হয়নি। দুনিয়া তাওহীদের শিক্ষা ভুলে গিয়েছিল , তিনি মানুষকে আবার স্মরণ করিয়ে দিলেন সেই শিক্ষা । এবং এমন জোরের সাথে সত্যের ভেরী বাজালেন যে , আজ বুতপরস্ত ও মুশরিকদের ধর্ম পর্যন্ত তাওহীদের স্বীকৃতি দান করতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি এমন বলিষ্ঠ নৈতিক শিক্ষা মানুষকে দিয়ে গেছেন যে, তার বিধিবদ্ধ নীতি আজ তামাম দুনিয়ার প্রচলিত নৈতিক শিক্ষায় প্রসার লাভ করেছে ও করছে। আইন, রাজনীতি , সভ্যতা ও সামাজিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে যে নীতি তিনি নির্ধারণ করে গেছেন, তা এমন সত্যাশ্রিত ও সর্বকালে প্রযোজ্য যে , তার বিরোধী সমালোচকরা পর্যন্ত নীরবে তা থেকে মাল-মশলা সংগ্রত করে নিয়েছে এবং এখনো নিচ্ছে।
আগেই বলেছি , এ অসাধারণ মানুষটি জন্ম নিয়েছিলেন এক জাহেল কওমের মধ্যে এক ঘনঘোর তমসাচ্ছন্ন দেশে। চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত পশু চারণ ও সওদাগরী ছাড়া আর কোন বৃত্তি তিনি অবলম্বন করেননি। কোন রকম শিক্ষা -দীক্ষা তিনি লাভ করেননি। । ভেবে দেখবার বিষয় , চল্লিশ বছর বয়সের পর তাঁর মধ্যে আকস্মিকভাবে এতটা পূর্ণতা এলো কোত্থেকে? কোত্থেকে তার মধ্যে এলো অপূর্ব জ্ঞানসম্ভার ? কোত্থেকে তিনি পেলেন এ বিপুল শক্তি ? একটিমাত্র মানুষ –কখনো তিনি অসাধারণ সিপাহসালার , কখনো এক অতুলনীয় জ্ঞানসম্পন্ন বিচারপতি , কখনো মহাশক্তিধর বিধানকর্তা , কখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী দার্শনিক, কখনো নৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে অতুলনীয় সংস্কারক , আবার কখনো বিস্ময়কর রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন নেতা! জীবনের বহুমুখী কর্মব্যস্ততা সত্ত্বেও রাত্রিকালে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেন আল্লাহ্‌র ইবাদাতে , স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি ও হক আদায় করেন, গরীব ও বিপন্ন মানুষের খেদমত করেন। এক বিশাল সাম্রাজ্যের শাসন-কর্তৃত্ব লাভ করেও ফকীরের মত জীবন যাপন করেন; মাদুরের উপর শয়ন করেন , মোটা কাপড় পরিধান করেন, গরীবের মত খাদ্য গ্রহণ করেন, এমন কি কখনো অনশনে অর্ধাশনে কেটে যায় তার দিন।
এমনি বিস্ময়কর অতি -মানবীয় পূর্ণতার পরিচয় দিয়ে তিনি যদি দাবী করতেন যে , তিনি অতি মানবীয় অস্তিত্বের অধিকারী , তা হলেও কেউ তার সে দাবী অগ্রাহ্য করতে পারতো না, কিন্তু তার বদলে তিনি কি বলেছেন ? তার সে পূর্ণতাকে তিনি নিজস্ব কৃতিত্ব বলে দাবী করেননি, বরং তিনি হামেশা বলতেনঃ

আমার কাছে আপনার বলতে কিছুই নেই; এর সবকিছুর মালিক আল্লাহ এবং আল্লাহর তরফ থেকেই এসব আমি পেয়েছি , যে বাণী আমি পেশ করছি এবং যার অনুরূপ বাণী পেশ করতে সকল মানুষ ব্যর্থ হয়েছে , তা আমার নিজস্ব বাণী নয় তা আমার মস্তিষ্ক প্রসূত রচনা নয়। এ হচ্ছে আল্লাহর কালাম এবং এর সবটুকু প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য। আমার যা কিছু কার্যকলাপ, তাও আমার নিজস্ব যোগ্যতা দ্বারা সম্পন্ন হয়নি, কেবলমাত্র আল্লাহরই নির্দেশে তা সম্পন্ন হয়েছে। আল্লাহর কাছ থেকে যে ইংগিত আমি পাই অনুরূপ ভাবেই আমি কাজ করি এবং কথা বলি।

এমনি সত্যনিষ্ঠ মানুষকে আল্লাহর পয়গাম্বর না মেনে পারা যায় কি করে? তিনি এমন পূর্ণতার অধিকারী যে , তামাম দুনিয়ার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত তার মত একটি মানুষ ও খুঁজে পাওয়া যায় না, কিন্তু তার সত্যনিষ্ঠা এমন অসাধারণ যে, সেই পূর্ণতার গর্ব তাঁর ভিতরে মোটেই নেই । সেই পূর্ণতার জন্য তিনি কোন প্রশংসা অর্জন করতে চান না। সকল প্রশংসা সুস্পষ্টভাবে তাঁরই প্রতি আরোপ করেন ,যিনি তাঁকে সবকিছু দান করেছেন। কি করে তাঁকে সত্য বলে স্বীকার না করে পারা যায়? তিনি নিজে যখন তাঁর সবটুকু শ্রেষ্ঠত্বকে আল্লাহর বলে স্বীকার করেন, তখন আমরা কেন বলবঃ না , এর সবকিছু তোমার আপন মস্তিষ্কের সৃষ্টি ? মিথ্যাচারী মানুষই তো অপরের কৃতিত্বকে আপনার দিকে টেনে নেবার চেষ্ট করে; কিন্তু এ মানুষটি যেসব কৃতিত্বকে সহজেই আপনার বলে দাবী করতে পারতেন যেসব কৃতিত্ব অর্জন করার কারণ কারুর জানা ছিল না। এবং যা প্রদর্শন করে তিনি অতিমানবীয় মর্যাদা দাবী করলে কেউ তা অগ্রাহ্য করত না , সেসব কৃতিত্বকেও তিনি তার আপনার দিকে টেনে নেবার ষ্টো করেননি। তাহলে তার চেয়ে অধিকতর সত্যাশ্রয়ী মানুষ আর কে হতে পারে?

এ মানুষটি--এ অসাধারণ কৃতিত্বসম্পন্ন মানুষটি ছিলেন আমাদের নেতা তামাম জাহানের পয়গাম্বর হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (সা) । তার নিজস্ব সত্যনিষ্ঠাই হচ্ছে তার পয়গাম্বরীর অকট্য প্রমাণ। তার গৌরবময় কার্যকলাপ তাঁর স্বভাব- চরিত্র , তাঁর পবিত্র জীবনের ঘটনা প্রবাহ সব কিছুই ইতিহাসে প্রমাণিত হয়েছে। যে ব্যক্তি স্বচ্ছ অনন্তঃকরণে সত্যানুসন্ধিৎসা ও ন্যায়ের মনোভাব সহকারে তাঁর সে বিবরণ পাঠ করবে , তার অন্তর স্বতঃই সাক্ষ্য দান করবে যে , তিনি নিশ্চিত রূপে আল্লাহর পয়াগম্বর। যে বাণী তিনি পেশ করেছিলেন, তা- হচ্ছে কুরআন , তা-ই আমরা পাঠ করে থাকি । যে ব্যক্তি এ অতুলনীয় কিতাব হৃদয়ংগম করে মুক্ত অন্তরে পাঠ করবে তাকে স্বীকার করতেই হবে যে, এ নিশ্চিতরূপে আল্লাহ্‌র প্রেরিত গ্রন্থ এবং কোন মানুষের মধ্যেই নেই এরূপ গ্রন্থ প্রণয়নের ক্ষমতা।

খতমে নবুয়াত

একথা জেনে রাখা প্রয়োজন যে, এ যুগে ইসলামের সত্য সহজ ও সঠিক পথের নির্দেশ জানার জন্য হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সা) এর শিক্ষা ও কুরআন মাজীদ ছাড়া আর কোন মাধ্যম নেই। মুহাম্মাদ (সা) সমগ্র মানব জাতির জন্য আল্লাহর পয়গাম্বর । তাঁর মধ্যেই পয়াগম্বরীর ধারা শেষ হয়ে গেছে। আল্লাহ তা’য়ালা যেভাবে মানুষকে হেদায়াত করতে চান, তার সবকিছুর নির্দেশ তিনি পাঠিয়েছেন তাঁর আখেরী পয়গাম্বরের মাধ্যমে। এখন যে ব্যক্তি সত্যের সন্ধানী ও আল্লাহর মুসলিম বান্দাহ হতে ইচ্ছুক, তাঁর অপরিহার্য কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর আখেরী পয়গাম্বরের উপর ঈমান আনা, তাঁর প্রদত্ত শিক্ষা মেনে নেয়া এবং তাঁরই প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে চলা।

খতমে নবুয়াতের প্রমাণ

পয়গাম্বরীর তাৎপর্য আগেই বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেই কথাগুলো বুঝে নিলে এবং তা নিয়ে চিন্তা করলে সহজেই জানা যাবে যে, পয়গাম্বর রোজ পয়দা হয় না, প্রত্যেক কওমের মধ্যে সবসময় পয়গাম্বরের আবির্ভাব হওয়ার প্রয়োজন নেই। পয়গাম্বরের জীবই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে তাঁর শিক্ষা ও হেদায়াতের জীবন। যতক্ষণ তাঁর শিক্ষা ও হেদায়াত জীবন্ত থাকে ততক্ষণ তিনি জীবিত থাকেন। পূর্ববর্তী পয়গাম্বরদের মৃত্যু ঘটেছে , কারণ যে শিক্ষা তাঁরা নিয়ে এসেছিলেন দুনিয়ার মানুষ তা বিকৃত করে ফেলেছে। যেসব গ্রন্থ তাঁরা নিয়ে এসেছিলেন তার কোনটিই আজ অবিকৃত অবস্থায় নেই। তাঁদের অনুগামীরাই আজ দাবী করতে পারছেনা যে, তাদের পয়গাম্বরের দেয়া আসল কিতাব তাদের কাছে মওজুদ রয়েছে , তারাই ভুলিয়ে দিয়েছে তাদের পয়গাম্বরের দেখানো পথ! পূর্ববর্তী পয়গাম্বরদের মধ্যে একজনের ও নির্ভুল নির্ভরযোগ্য বিবরণ আজ কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রত্যয় সহকারে আজ বলা যায় না কোন জামানায় তিনি পয়দা হয়েছিলেন ? কি কাজ তিনি করে গেছেন? কিভাবে তিনি জীবনযাপন করেছিলেন? কি কি কাজের শিক্ষা তিনি দিয়েছিলেন এবং কি কি কাজ থেকে মানুষকে বিরত করতে চেয়েছিলেন ? এমনি করেই হয়েছে তাঁদের সত্যিকার মৃত্যু।
পাক্ষান্তরে , হযরত মুহাম্মাদ (সা) আজো রয়েছেন জীবিত , কারণ তাঁর শিক্ষা ও হেদায়াত আজো জীবন্ত হয়ে রয়েছে । যে কুরআন তিনি দিয়ে গেছেন, তা আজো তার তার মূল শব্দ -সম্ভার সহ অবিকৃত অবস্থায় মওজুদ রয়েছে তার একটি হরফ , একটি নোকতা , একটি যের যবরের পার্থক্য ও হয়নি কোথাও । তাঁর জীবন -কাহিনী তাঁর উক্তি সমূহ ও কার্যকলাপ সব কিছুই সুরতি হয়ে আছে । তেরশ বছরের ব্যবধানে আজো ইতিহাসে তাঁর বর্ণনা এমন সুস্পষ্টভাবে আমরা দেখতে পাই , যেন তাঁকে আমরা দেখেছি প্রত্যক্ষভাবে । হযরত (সা) এর ব্যক্তির জীবন -কাহিনী যেমন সুরতি হয়ে রয়েছে , দুনিয়ার ইতিহাসে আর কোন ব্যক্তির জীবন-কাহিনী তেমন অবিকৃতভাবে সুরতি হয়নি । আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজে , প্রতি মুহুর্তে হযরত (সা) এর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। তাতেই প্রমাণিত হয় যে হযরত (সা) এর পর আর কোন পয়গাম্বরের প্রয়োজন নেই।
এক পয়গাম্বরের পর অপর কোন পয়গাম্বরের আবির্ভাবের কেবল মাত্র তিনটি কারণ থাকতে পারেঃ

একঃ যখন পূর্ববর্তী পয়গাম্বরের শিক্ষা হেদায়াত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং পুনরায় তা পেশ করার প্রয়োজন হয় , দুইঃ যখন পূর্ববর্তী পয়গাম্বরের শিক্ষা অসম্পূর্ণ থাকে এবং তাতে সংশোধন ও সংযোজনের প্রয়োজন হয় , তিনঃ পূর্ববর্তী পয়গাম্বরের শিক্ষা যখন কোন বিশেষ জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং অপর জাতি বা জতিসমূহের জন্য অপর কোন পয়গাম্বরের প্রযোজন হয়।

উপরিউক্ত তিনটি কারণের কোনটিই বর্তমানে প্রযুক্ত হতে পারে না, কারণঃ

একঃ হযরত মুহাম্মাদ(সা) এর শিক্ষা ও হেদায়াত আজো জীবন্ত রয়েছে এবং সেসব মাধ্যম এখন পুরোপুরি সংরক্ষিত রয়েছে , যা থেকে প্রতি মুহুর্তে জানা যায়, হযরতের দ্বীন কি ছিল , কোন জীবন পদ্ধতির তিনি প্রচলন করেছিলেন এবং কোন কোন পদ্ধতি মিটিয়ে দেবার ও প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন । যখন তাঁর শিক্ষা ও হেদায়াত আজো মিটে যায়নি , তখন আবার তা নতুন করে পেশ করার জন্য কোন নবী আসার প্রয়োজন নেই।

দুইঃ হযরত মুহাম্মাদ (সা)- এর মাধ্যমে দুনিয়াকে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা দেয়া হয়ে গেছে । এখন তার মধ্যে যেমন কিছু কম - বেশী করার প্রয়োজন নেই , তেমনি তার মধ্যে এমন কোন ঘাটতি নেই , যা পূরণ করার জন্য আর কোন নবী আসার প্রয়োজন হবে। সুতরাং দ্বিতীয় কারণটির কোন অস্তিত্ব নেই।

তিনঃ হযরত মুহাম্মাদ (সা) কোন বিশেষ কওমের জন্য পেরিত না হয়ে তামাম দুনিয়ার জন্য নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন এবং সমগ্র মানব জাতির জন্য তাঁর শিক্ষা যথেষ্ট । সুতরাং এখন কোন বিশেষ কওমের জন্য স্বতন্ত্র নবী আসার প্রয়োজন নেই। তাই তৃতীয় কারণটিও এ ক্ষেত্রে অচল।

এসব কারণে হযরত মুহাম্মাদ (সা) কে বলা হয়েছে ‘ খাতামুন্নাবীয়্যিন ’ অর্থাৎ যাঁর ভিতরে নবুয়াতের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। এখন আর দুনিয়ায় নতুন কোন নবীর আবির্ভাবের প্রয়োজন নেই; প্রয়েজন কেবল এমন মানুষের --যারা হযরত মুহাম্মাদ (সা) -এর পথে নিজেরা চলবেন ও অপরকে চালাবেন ; যাঁরা তাঁর শিক্ষাধারাকে উপলব্ধি করবেন , তদনুযায়ী আমল করবেন এবং দুনিয়ায় যে আইন ও বিধান নিয়ে হযরত মুহাম্মাদ (সা) তাশরিফ এনেছিলেন , সেই আইন ও বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করবেন।

অধ্যায় ০৫ : ঈমানের বিবরণ

ঈমানের বিবরণ

আগের অধ্যায়সমূহে যা বলা হয়েছে আরো সম্মুখে অগ্রসর হবার আগে একবার খতিয়ে দেখা প্রয়োজনঃ

একঃ ইসলাম বলতে যদিও বুঝায় আল্লাহর আনুগত্য ও তার আদেশের অনুবর্তিতা , তথাপি আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী তার ইচ্ছা ও মর্জি অনুযায়ী জীবন যাপনের পদ্ধতি এবং আখেরাতের পুরস্কার ও শাস্তি সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞান কেবল মাত্র আল্লাহর পয়গাম্বরের মাধ্যমেই লাভ করা যেতে পারে। তাই ইসলামের নির্ভুল সংজ্ঞা অনুসারে পয়গাম্বরের শিক্ষার উপর ঈমান আনা এবং তাঁর প্রদর্শিত পদ্ধতিতে আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার করাই হচ্ছে ইসলাম। যে ব্যক্তি পয়গাম্বরের পথ বর্জন করে সোজা-সোজি আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর হুকুমের অনুবর্তিতা করার দাবী করে , সে মুসলিম নয়।

দুইঃ পূর্বে আলাদা আলাদা কওমের জন্য আলাদা আলাদা পয়গাম্বর এবং একই কওমের মধ্যে ক্রমাগত একের পর এক পয়গাম্বরের আবির্ভাব হয়েছে। তখনকার দিনে প্রত্যেক কওমের জন্য , “ইসলাম ” বলতে বুঝাত সেই র্ধম যা বিশেষ করে সেই কওমের পয়গাম্বর বা পয়গাম্বরগণ শিক্ষা দিয়েছিলেন । যদিও ইসলামের প্রকৃতি প্রত্যেক দেশে প্রত্যেক যুগে একই ছিল তথাপি শরীয়াত অর্থাৎ আইন ও ইবাদাতের পদ্ধতি ছিল বিভিন্ন। এ কারণে এক কওমের জন্য অপর কোন কওমের পয়গাম্বরের অনুসরণ অপরিহার্য ছিল না, যদিও সকল পয়গাম্বরের প্রতি ঈমান পোষণ ছিল অপরিহার্য ।

তিনঃ হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সা) যখন দুনিয়ায় পয়গাম্বর হিসেবে প্রেরিত হলেন , তখন তার মাধ্যমে ইসলামের শিক্ষা সুস্পন্ন করে দেয়া হল এবং তামাম দুনিয়ার জন্য একই শরীয়াত প্রেরণ করা , তার আনীত শরীয়াত সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য হল। হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর আবির্ভাবের পূর্ববর্তী সকল পয়গাম্বরের প্রবর্তিত শরীয়াত প্রত্যাহৃত হল এবং এরপর কিয়ামত পর্যন্ত যেমন কোন নবী আসবে না, তেমনি আসবে না কোন নতুন শরীয়াত আল্লাহ তা’য়ালার তরফ থেকে। সুতরাং বর্তমানে একমাত্র হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর আনুগত্যের নামই হচ্ছে ইসলাম। তাঁর নবুয়াতের স্বীকৃতি , তাঁর প্রতি প্রত্যয়ের ভিত্তিতে তাঁর প্রদত্ত শিক্ষা মেনে চলা এবং তার সকল হুকুমকে আল্লাহর হুকুম মনে করে তার আনুগত্য করাই হচ্ছে ইসলাম। আর এমন কোন ব্যক্তি আল্লাহর তরফ থেকে আসবেন না যাঁকে মেনে চলা মুসলমান হওয়ার জন্য অপরিহার্য শর্ত থাকবে এবং যাকে না মানলে মানুষ কাফের হয়ে যাবে।
হযরত মুহাম্মাদ (সা) কোন কোন জিনিসের উপর ঈমান পোষণ করার শিক্ষা দিয়েছেন এবং তা মেনে নিলে মানুষ কিরূপ উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হতে পারে; তা-ই আমি এখন বলব।

অধ্যায় ০৬ : লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’-র প্রকৃত তাৎপর্য ও মানব জীবনে এর প্রভাব

আল্লাহর প্রতি ঈমান

হযরত মুহাম্মাদ (সা)- এর সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছেঃ

“ আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই ।”

এ কালেমা -ই হচ্ছে ইসলামের বুনিয়াদ -- যা দিয়ে এক কাফের এক মুশরিক ও এক নাস্তিক থেকে মুসলিমের পার্থক্য নির্ধারিত হয়। এ কালেমার স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতি দ্বারা এক মানুষ ও অপর মানুষের মধ্যে বিপুল পার্থক্য রচিত হয়। এ কালেমার অনুসারীরা পরিণত হয় এক জাতিতে এবং অমান্যকারীরা হয় তাদের থেকে স্বতন্ত্র জাতি। এর অনুসারীরা দুনিয়া থেকে শুরু করে আখেরাতে পর্যন্ত উন্নতি, সাফল্য ও সম্মানের অধিকারী হয় এবং অমান্যকারীদের পরিণাম হচ্ছে ব্যর্থতা অপমান ও পতন।

ছোট খাট কথাটি কেবল মুখে উচ্চারণ করার ফলেই মানুষে মানুষে এ বিপুল পার্থক্য রচিত হতে পারে না; মুখে দশ লক্ষ্য বার ‘কুইনিন ’ ‘কুইনিন ’ বললে এবং তা সেবন না করলে যেমন ম্যালেরিয়া কখনো ছাড়তে পারেনা, তেমনি মুখে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ উচ্চরণ করলে, অথচ কি তার অর্থ, এ ক’টি শব্দ উচ্চরণ করে কত বড় জিনিসের স্বীকৃতি দান করা হল এবং এ স্বীকৃতির ফলে নিজের উপর কত বড় দায়িত্ব গ্রহণ করা হল তা যদি বুঝতে না পারা যায় তা হলে না বুঝে এমনি উচ্চারণ করার ফলে কারো কোন কল্যাণই সাধিত হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে প্রার্থক্য কেবল তখনই আসতে পারে , যখন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ- র তাৎপর্য অন্তরে প্রতিভাত হবে তার অর্থের উপর পূর্ণ প্রত্যয় জন্মাবে এবং তাঁর বিরোধী যত রকম বিশ্বাস আছে, তা থেকে মন সম্পূর্ণরূপে মুক্তি লাভ করবে এবং আগুনের দাহিকা শক্তি ও বিষের মুত্যু ঘটাবার মতার প্রতি বিশ্বাস যতটুকু প্রভাব বিস্তার করে এ কালেমার প্রতি বিশ্বাস ও মন -মস্তিষ্কের উপর কমপক্ষে ততটা প্রভাব বিস্তার করবে। যেমন করে আগুনের প্রকৃতি সম্পর্কে ঈমান মানুষকে আগুনের স্পর্শ থেকে দূরে রাখে এবং বিষের প্রকৃতির উপর ঈমান বিষ পান থেকে তাকে বাঁচিয়ে রাখে, ঠিক তেমনি করে বিশ্বাস ও কর্মের সকল ক্ষেত্রে এ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’ কালেমার উপর ঈমান শিরক , কুফর , নাস্তিকতা প্রভৃতি দুষ্কুতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রূপ থেকে মানুষ কে বিরত করে রাখবে।

‘লা -ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ র অর্থ

‘ইলাহ ’ বলতে কি বুঝায় , সবার আগে তা-ই বুঝে নিতে হবে। আরবী ভাষায় ‘ইলাহ ’শব্দের অর্থ হচ্ছে ইবাদাতের যোগ্যঃ অর্থাৎ শ্রেষ্ঠত্ব , গৌরব ও মহত্বের যে সত্তা উপাসনার যোগ্য এবং বন্দেগী ইবাদাতে যাঁর সামনে মস্তক অবনিমত করা যায়। ‘ইলাহ ’ শব্দের অর্থে এ তাৎপর্য ও শামিল রয়েছে যে , তিনি হবেন অনন্ত শক্তির অধিকারী যে শক্তির উপলব্ধি মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির সীমানা অতিক্রম করে যায়। ‘ইলাহ’ শব্দের তাৎপর্যের মধ্যে এও রয়েছে যে , তিনি নিজে কারুর মুখাপেক্ষী হবেন না, অথচ আর সবাই জীবনের সকল ব্যাপারে তাঁর মুখাপেক্ষী হবে এবং তাঁর কাছে সাহায্য ভিক্ষা করতে বাধ্য হবে। ‘ইলাহ’ শব্দের মধ্যে রহস্যময়তার অর্থও নিহিত রয়েছে। অর্থাৎ ‘ইলাহ’ তাকেই বলা যায়, যাঁর শক্তির উপর থাকবে রহস্যের আবরণ। ফারসী ভাষায় ‘খোদা ; হিন্দী ভাষায় , দেবতা , ইংরেজী ভাষায় ‘গড’ শব্দও এর কাছাকাছি অর্থে ব্যবহার হয় এবং দুনিয়ার অন্যান্য ভাষায় একই অর্থে বিশেষ বিশেষ শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

‘আল্লাহ ’ শব্দটি হচ্ছে একক -লা শরীক আল্লাহর ‘ইসমে জাত ’ বা মৌলিক নাম, মূল সত্তার পরিচায়ক নাম। ‘লা -ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’ কথাটির শব্দগত তরজমা হচ্ছে কোন ইলাহ নেই সেই বিশেষ সত্তা ব্যতীত যাঁর নাম আল্লাহ। এর তাৎপর্য হচ্ছে এই যে , সমগ্র সৃষ্টিতে আল্লাহ ব্যতীত এমন আর কোন সত্তার অস্তিত্ব নেই, যে উপাসনা পাওয়ার যোগ্য হতে পারে। তিনি ব্যতীত এমন যোগ্যতাসম্পন্ন আর কেউ নেই, ইবাদাত বন্দেগী ও আনুগত্যে যার সামনে মস্তক অবনমিত করা হয়। তিনিই একমাত্র সত্তা, যিনি তামাম জাহানের মালিক ও বিধানকর্তা , সবকিছুই তাঁর মুখাপেক্ষী , সবাই একমাত্র তাঁর কাছ থেকেই সাহায্য কামনা করতে বাধ্য । তিনি মানুষের উপলব্ধির বাইরে লুক্কায়িত এবং তাঁর অস্তিত্ব অনুভব করতে গিয়ে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে।

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’-র প্রকৃত তাৎপর্য

উপরে তা কেবল ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’ কথাটির শাব্দিক অর্থ বিশ্লেষণ করা গেল। এখন তার সঠিক তাৎপর্য পর্যালোচনা করব।
মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম যুগের যেসব তথ্য আমাদের হাতে এসেছে এবং প্রাচীনতম জাতিসমূহের যে সব ধ্বংসাবশেষ সন্ধান আমরা পেয়েছি , তা থেকে বুঝা যায় , প্রত্যেক যুগের মানুষ কোন না কোন খোদাকে মেনে নিয়েছে এবং কোন না কোন ধরনের ইবাদাত করেছে । আজো দুনিয়ার যত জাতি রয়েছে --তারা নিতান্ত আদিম প্রকৃতির হোক অথবা সুসভ্য হোক, তাদের সবারই মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে এই যে , তারা কোন বিশেষ সত্তাকে খোদা বলে মানছে , তার ইবাদাত করেছে। এ থেকে বুঝা যায় যে , খোদার ধারণা মানুষের প্রকৃতির শামিল হয়ে আছে। তার ভিতরে এমন কোন জিনিস রয়েছে যা তাকে বাধ্য করেছে কাউকে খোদা মানতে ও তার ইবাদাত করতে।

এরপর প্রশ্ন ওঠে মানুষের মধ্যে সেই বিশেষ জিনিসটি কি? প্রত্যেকটি লোক তার নিজের অস্তিত্বের প্রতি ও সকল মানুষের অবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে আপনা থেকেই এর জবাব উপলব্ধি করতে পারবে।

প্রকৃতপক্ষে , মানুষ বান্দা হয়েই পয়দা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সে পরমুখাপেক্ষী , দুর্বল ও দুঃস্থ। তার অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য যে অসংখ্য জিনিসের প্রয়োজন , তা তার শক্তির আধিপত্যের অধীন নয়। কখনো আপনা থেকেই তা তার হাতে আসে, আবার কখনো বা সে তা থেকে বঞ্চিত হয়।

এমন অনেক জিনিসই তো রয়েছে , যা তার পক্ষে কল্যাণকর । সে তা অর্জন করতে চায়; কিন্তু সেই সব জিনিস কখনো তার হাতে আসে , কখনো বা আসেনা ; কারণ সেই সব জিনিস অর্জন করার স্বাধীন ক্ষমতা আদৌ তার নেই।

আবার এমন অনেক জিনিস আছে, যা তার অনিষ্ট সাধন করে , তার সারা জীবনের পরিশ্রম মুহুর্তে বিনষ্ট করে দেয় , তার সকল আশা -আকাংখাকে ধূলি -লুন্ঠিত করে দেয় তাকে ব্যাধী ও মৃত্যুর কবলগ্রস্ত করে দেয়। সে চায় সেই সব অনিষ্টকর জিনিসকে ধ্বংস করে দিতে ; কখনো তা ধ্বংস হয়, কখনো হয়না। তার ফলে সে উপলব্ধি করে যে , সেই সব জিনিসের আসা না আসা, দূর হওয়া না হওয়ার উপর তার কোন কর্তৃত্ব নেই।

এমন অনেক কিছুই রয়েছে , যার শান-শওকত ও বৃহত্ব দেখে মানুষ ভীত হয়ে পড়ে । পাহাড়, নদী ও ভয়াবহ হিংস্র জানোয়ারের রূপ তার চোখের সামনে আসে । ঝড়ঝঞ্জা , প্লাবন ও ভুমিকম্পের নগ্নরূপ সে দেখতে পায়। মেঘের গর্জন , অন্ধকার ঘনঘটা , বজ্রের হুংকার বিজলীর চমক ও মুষলধারা-বৃষ্টির দৃশ্য একের পর এক তার চোখের সামনে আসতে থাতে। সে দেখে যে , এসব জিনিস কত বড় ,কত শক্তিশালী , কত মহিমাময় আর তার তুলনায় সে নিজে কত দুর্বল কত নগণ্য।

এসব বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্য ও তার নিজের দীনতার বিভিন্ন প্রমাণ চোখের সামনে দেখে মানুষের অন্তরে স্বতঃই নিজের দাসত্ব (বন্দেগী) , পরমুখাপেক্ষিতা ও দুর্বলতার অনুভুতি জাগ্রত হয় এবং সেই অনুভূতির সাথে সাথেই জন্মে আল্লাহর ধারণা। যে হাতের ইংগিত চালিত হয় এসব মহাশক্তি , তাঁর ধারণা তার মনে জাগ্রত হয়। তাঁর শক্তির অনুভূতি মানুষকে বিনয় -নম্র করে , তারই কাছে সাহায্য ভিক্ষা করতে বাধ্য করে। তাঁর কল্যাণদায়ক শক্তির অনুভূতি মানুষকে বাধ্য করে বিপদ মুক্তির জন্য তাঁরই সামনে হস্ত প্রসরিত করতে। তার অনিষ্টকর শক্তির অনুভূতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে তাঁর ভীতি অন্তরে পোষণ করতে এবং তাঁর গযব থেকে বাঁচার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে।

অজ্ঞতার সর্বনিম্ন স্তর তাকেই বলা যায় , যখন মানুষে এসব ঐশ্বর্য ও শক্তিতে প্রত্যক্ষ ও তাদের কল্যাণকর বা অনিষ্টকর রূপ দেখে মনে করে যে, এরাই খোদা , তারা পূজা করতে থাকে জানোয়ার , পাহাড় ও নদীকে । তারা পূজা করে যমীন,আগুন, বৃষ্টি , হাওয়া , চন্দ্র , সূর্য ও আরো কত শক্তির ।

যখন এ অজ্ঞতার মাত্রা কিছুটা কম থাকে এবং জ্ঞানের আলোক কিছুটা পাওয়া যায় , তখন বুঝা যায় যে , এসব জিনিস মানুষেরই মত পরমুখাপেক্ষি কত বড় জানোয়ার তুচ্ছ মশা -মাছির মত মরে যায়; প্রকান্ড প্রকান্ড নদীর পানি ওঠে , নামে ,শুকিয়ে যায়, মানুষ নিজেই কেটে ফেলে পাহাড়। যমীনের ফলে- ফুলে সমৃদ্ধ হওয়া তার নিজর ইচ্ছাধীন নয়, পানি যখন তাকে সাহায্য করেনা , তখনই যমীন হয় শুষ্ক অনুর্বর । পানিও নিজের খুশী মত চলতে পারে না, তাকেও হতে হয় হাওয়ার মুখাপেক্ষি । হাওয়াও নিজের ক্ষমতার অধীন নয় , তার কল্যাণ অকল্যাণ নির্ভর করে অন্যবিধ কল্যাণের উপর । চন্দ্র , সূর্য , তারকার কোন বিশেষ বিধানের আনুগত্য করে চলে। এ বিধানের বাইরে তারা কখনো তাদের গতির বিন্দুমাত্র রদবদল করতে পারে না। এসব দেখে শুনে মানুষের মন কোন অদৃশ্য রহস্যাবৃত মুক্তির দিকে ফিরে যায় তখন সে ভাবতে থাকে যে , এসব দৃশ্যমান বস্তুসমূহের অন্তরালে রয়েছে এমন রহস্যাবৃত শক্তিপুঞ্জ ,যারা পরিচালিত করছে তাদেরকে এবং সবকিছুই হচ্ছে এ শক্তিপুঞ্জের অধীন। এখান থেকেই বহু খোদা ও বহু দেবতার ধারণার উদ্ভব হয়েছে। এ অবস্থাতেই মানুষ মেনে নিয়েছে আলো , হাওয়া , পানি ব্যাধি , স্বাস্থ্য ও আরো বহু জিনিসের আলাদা আলাদা খোদার অস্তিত্ব। তাদের কাল্পনিক মূর্তি তৈরী করে তারা করে চলেছে তাদের পূজা ।

এরপর যখন আরো বেশী করে জ্ঞানের আলো আসতে থাকে , তখন মানুষ দেখতে পায় যে , দুনিয়ার ব্যস্থাপনা চলছে এক শক্তিশালী আইন ও এক বড় রকমের বিধানের অনুসরণ করে। হাওয়ার গতি , বৃষ্টির আগমন , গ্রহ উপগ্রহের আবর্তন ,ঋতুসমূহের পরিবর্তনের মধ্যে কি নিয়ম শৃঙখলা বিরাজমান ; কিভাবে অগণিত শক্তি মিলে- মিশে কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বজগতের এ সামঞ্জস্য লক্ষ্য করে একজন মুশরিককেও মেনে নিতে হচ্ছে যে,সব ছোট ছোট খোদার উপর রয়েছে সবার বড় এক খোদার সার্বভৌম আধিপত্য ; নইলে এসব ভিন্ন ভিন্ন খোদা অনন্য নির্ভশীল ও স্বতন্ত্র হলে এবং সর্বত্র তাদের স্বেচ্ছাতন্ত্র চালিযে গেলে বিশ্বের এ বিপুল বিরাট কারখানা বির্পযস্ত হয়ে যেত এই বড় খোদার নাম দিয়েছে সে ‘আল্লাহ ’ ‘পরমেশ্বও’ ‘খোদায়ে খোদাগান’ -আরো কত কিছু। উপাসনার ক্ষেত্রে ছোট খোদাকেও শরীক করেন তাঁর সাথে । তার ধারণা আল্লাহর কর্তৃত্ব চলছে পার্থিব রাজা-বাদশাহর রাজত্বেরই মত। যেমন দুনিয়ার এক বাদশাহ রাজত্ব করেন তাঁর থাকে বহু মন্ত্রী , বিশ্বস্ত অনুচর , শাসনকর্তা ও দায়িত্বশীল কর্মচারী , তেমনি করে এ সৃষ্টির উপর রয়েছেন এক বড় খোদা; আর বহু ছোট ছোট খোদা রয়েছে তাঁর অধীনে । যতক্ষণ না এসব ছোট ছোট খোদা কে খুশী করা যাবে , ততক্ষণ বড় খোদার কাছে যাওয়া যাবে না। সুতরাং তাদেরও উপাসনা কর তাদের কাছে হাত পাত , তাদের অসন্তোষের ভয় কর , তাদেরকে বড় খোদার কাছে পৌঁছাবার মাধ্যমে পরিণত কর এবং নযর নিয়ায দিয়ে তাদেরকে খুশী রাখ।
আবার যখন জ্ঞানের ক্ষেত্রে আরো উন্নত হতে থাকে খোদার সংখ্যা তখন আরো কমতে থাকে। অজ্ঞ মানুষেরা যত খোদা তৈরী করে রেখেছে , তার মধ্যে এক একটির চিন্তা করলে মানুষ বুঝতে পারে যে, সে খোদা ই নয়। সে আমাদেরই মত এক বান্দাহ , এবং আমাদের চেয়েও বেশী অসহায় সে। এমনি করে একে একে এসব কাল্পনিক খোদা পরিত্যক্ত হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত কেবল এক খোদাই অবশিষ্ট থাকেন। কিন্তু এ এক খোদা সম্পর্কে ও মানুষের ধারণার অনেকখানি অজ্ঞাতার পরিচয় পাওয়া যায়। কেউ ধারণা করে যে , খোদা আমাদের মত রক্ত মাংসের দেহের অধিকারী এবং তিনি এক নির্দিষ্ট স্থানে বসে তাঁর খোদায়ী চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ মনে করে খোদা স্ত্রী -পুত্র- কন্যা নিয়ে মানুষের মত বাস করেন এবং মানুষের মত তাঁর সন্তান- সন্তুতির ধারা চলে আসছে। কেউ আবার অনুমান করে যে খোদা দুনিয়ার মানুষের আকৃতি ধারণ করে অবতরণ করে দুনিয়ায়। কেউ বলে খোদা এ দুনিয়ার কারখানা চালু করে দিয়ে নির্বিকভাবে বসে আছেন এবং কোথাও আরাম আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন । কারুর ধারণা , খোদার কাছে বুযর্গ লোকদের আত্মা সমূহের সুপারিশ অপরিহার্য এবং তাদের মাধ্যমে ব্যতীত সেখানে কোন কাজ চলতে পারে না। কেউ তার ধারণায় আল্লাহর এক বিশেষ রূপ পিরিকল্পনা করে নেয় এবং উপাসনার জন্য সেইরূপ সম্মুখে স্থাপন করার অপরিহার্য প্রয়োজন অনুভব করে । তাওহীদ বিশ্বাস পোষণ করা সত্ত্বেও এ ধরনের বহুবিধ ভুল ধারণা মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়ে থাকে , যার ফলে মানুষ শিরক অথবা কুফরে নিমজ্জিত হয়। এর সব কিছুই হচ্ছে অজ্ঞতার পরিণতি ।

সবার উপরে রয়েছে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’ কথাটির স্থান । এ হচ্ছে সেই জ্ঞান যা খোদ আল্লাহ তা’য়ালাই প্রত্যেক যুগে তার নবীদের মাধ্যমে মানুষের কাছে প্রেরণ করেছেন। এ জ্ঞান সবার আগে তিনি হযরত আদম (আ) কে দিয়ে তাঁকে দুনিয়ায় অবতীর্ণ করেছিলেন। আদম (আ) এর পরে এ জ্ঞান লাভ করেছিলেন হযরত নূহ (আ) , হযরত ইবরাহীম (আ), হযরত মূসা (আ) ও অন্যান্য সকল পয়গাম্বর। আবার এ জ্ঞান নিয়েই সবার শেষে দুনিয়ায় তাশরীফ এনেছিলেন হযরত মুহম্মাদ (সা) । এ নির্ভুল জ্ঞানের মধ্যে কোন অজ্ঞতার স্পর্শ নেই । উপরে শির্‌ক বুতপরস্তি ও কুফরের যত রূপ আমি বর্ণনা করেছি, মানুষ পয়গাম্বরদের শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজস্ব উপলব্ধি ও বুদ্ধিবৃত্তির উপর নির্ভর করেছে বলেই তাতে জড়িত হয়েছে। এবার এ ছোট খাট কথাটির অর্ন্তনিহিত তাৎপর্য বিশ্লেষণ করব।

একঃ সবার আগে বিবেচ্য প্রশ্ন হচ্ছে আল্লাহর ধারণা। এই সীমাহীন বিশ্ব-প্রকৃতির দিকে দৃষ্টি নিপে করলে এর আদি ব্যবস্তাপনা ও অন্ত সর্ম্পকে ভাবতে গিয়ে আমাদের মন বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পড়ে। এক অজানা যুগ থেকে শুরু হয়েছে এর গতি এবং অজানা যুগের দিকে চলছে এগিয়ে । এর ভিতরে পয়দা হয়েছে সীমাসংখ্যাহীন অনন্ত সৃষ্টি এবং আরো পয়দা হয়ে চলছে। প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এমন বিস্ময়কর যে , তা উপলব্ধি করতে গিয়ে মনুষ্য জ্ঞান বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পড়েছে । এ বিপুল সৃষ্টির খোদায়ী কেবল তাঁরই পক্ষে সম্ভব , যিনি নিজে সীমাবন্ধনহীন , অনন্তকাল ধরে যিনি জীবন্ত , যিনি কারুর মুখাপেক্ষি নন , যিনি স্বাধীন , সর্বশক্তিমান , সার্বভৌম শক্তির অধিকারী ও সর্বজ্ঞ , সকল বস্তুর জ্ঞান যিনি রাখেন, কোন কিছুই তাঁর কাছে গোপন থাকতে পারেনা। সবার উপর যিনি বিজয়ী এবং যাঁর হুকুম অমান্য করতে কেউ পারে না, যিনি অনন্ত শক্তির মালিক এবং আপনা থেকে যাঁর কাছ থেকে সৃষ্টির সকল জীবের কাছে পৌঁছে জীবন ও জীবিকার সামগ্রী, যিনি সকল অভাব ত্রু“টি ও দুর্বলতা দোষ থেকে মুক্তি এবং যাঁর কার্যে অপর কারুর হস্তক্ষেপ চলতে পারে না।

দুইঃ আল্লাহর কর্তৃত্বের এসব গুণ কেবল একটি মাত্র সত্তার ভিতরে সীমাবদ্ধ হওয়াই অপরিহার্য ।একাধিক সত্তার মধ্যে এ সবগুণের অস্তিত্ব সমভাবে থাকা অসম্ভব , কারণ সবার উপর বিজয়ী ও সার্বভৌম শক্তির অধিকারী মাত্র একজনই হতে পারেন। এসব গুণরাজী ভাগাভাগী করে বহু খোদার মধ্যে বন্টন করে নেয়া ও তেমনি অসম্ভব। কেননা এক খোদা যদি হন সার্বভৌম শক্তির অধিকারী , অপর এক খোদা সর্বজ্ঞ , অপর একজন হন জীবন দানকারী তা হলে প্রত্যেক খোদাকে হতে হয় অপরের মুখাপেক্ষী এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতা না থাকলে মুহুর্তে এ সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে যাবে । এও সম্ভব হতে পারে না যে, এসব গুনরাজী এক থেকে অপরের কাছে ন্যস্ত হবে অর্থাৎ এর কোন গুণ কখনো থাকবে এক খোদার মধ্যে ; আবার কখনো থাকবে অপর খোদার মধ্যে ; কেননা যে খোদা নিজেকে জীবন্ত রাখার মতো ক্ষমতার অধিকারী নয় , সারা সৃষ্টিকে জীবন দান করা তার পক্ষে অসম্ভব এবং যে খোদা নিজের খোদায়ী সংরক্ষণ করতে পারে না , এত বড় বিরাট সৃষ্টির উপর কর্তৃত্ব চালানো তার পক্ষে সম্ভব নয়; সুতরাং যত বেশী করে জ্ঞানের দীপ্তি লাভ করা যাবে মনে তত বেশী প্রত্যয় জন্মাবে যে, কেবলমাত্র একই সত্তার মধ্যে আল্লাহর গুণরাজীর সমাবেশ হওয়া অপরিহার্য।

তিনঃ আল্লাহর কর্তৃত্বের পরিপূর্ণ ও নির্ভুল ধারণাকে দৃষ্টির সামনে রেখে সকল সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করা যেতে পারে। যতসব জিনিস দৃষ্টি পথে আসে, যা কিছু জ্ঞানের পরিধির মধ্যে আসে, তার কোন কিছুর মধ্যেই এসব গুণের সমাবেশ দেখতে পাওয়া যাবে না । বিশ্ব -প্রকৃতির সবকিছু অপরের মুখাপেক্ষী ও অপর কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত; তারা জন্মে , পরিবর্তিত হয়, মরে ও বাঁচে। কোনকিছুই অপরিবর্তিত অবস্থায় স্থায়ী হয়ে থাকতে পারে না। কারুরই নিজের খেয়াল খুশী অনুযায়ী কিছু করার মতা নেই। সর্বোপরি যে আইন বলবৎ রয়েছে তার চুল পরিমাণ অতিক্রম করার ক্ষমতা কারুর নেই। তাদের মধ্যে আল্লাহর সামান্যতম দ্যুতিও দেখা যায় না। আল্লাহর কার্যকলাপের মধ্যে তাদের কারুর বিন্দুমাত্র দখল নেই। লা- ইলাহা- র মানে হচ্ছে এই।

চারঃ বিশ্ব-জগতের সকল পদার্থের আল্লাহর কর্তৃত্ব অস্বীকার করার পর একথা অংগীকার করতেই হবে যে সর্বোপরি রয়েছেন আর এক স্বতন্ত্র সত্তা । একমাত্র তিনিই হচ্ছেন সকল কর্তৃত্বের গুণরাজীর অধিকারী এবং তিনি ব্যতীত আর কোন আল্লাহ নেই। ইল্লাল্লাহ -র মানে হচ্ছে এই।

সকল জ্ঞানের সেরা জ্ঞান হচ্ছে এই। যতই অনুসন্ধান ও গবেষণা চালানো যাবে , ততই বুঝতে পারা যাবে যে , জ্ঞানের শুরু এখানেই এবং শেষ সীমানাও এতেই সীমাবদ্ধ। পদার্থবিদ্যা , রসায়ন , জ্যোতিষ , ভূতত্ব , জীবতত্ত্ব , মানবীয় তত্ত্ব -এক কথায় বিশ্ব জগতের রহস্য অনুসন্ধানের যে কোন পথই অবলম্বন করা হবে, সেখানে গবেষণা চালিয়ে অগ্রসর হতে হতে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ- র সত্যতা ক্রমাগত উদঘাটিত হতে থাকবে এবং তার প্রতি প্রত্যয় ক্রমাগত বেড়ে যাবে। জ্ঞান -বিজ্ঞানের গবেষণার ক্ষেত্রে প্রতি পদে অনুভূত হবে যে , সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এ সত্যকে অস্বীকার করার পর সৃষ্টির যে কোন জিনিস নিরর্থক হয়ে যায়।

মানব জীবনে তাওহীদ বিশ্বাসের প্রভাব

‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ ’র স্বীকৃতি ঘোষণা করলে তার ফলে মানব জীবনে কি প্রভাব পড়ে এবং এ কালেমা অমান্যকারী দুনিয়া ও আখেরাতে কেন ব্যর্থ হয়, তার বর্ণনা এখানে পেশ করছি।

একঃ এ কালেমায় বিশ্বাসী ব্যক্তি কখনো সংকীর্ণ দৃষ্টিভংগী সম্পন্ন হতে পারে না। সে এমন এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী যিনি যমীন ও আসমানের স্রষ্টা , মাশরিক ও মাগরিবের মালিক , তামাম জাহানের পালনকর্তা । এ ঈমানের পর সারা সৃষ্টির কোন বস্তুই তার দৃষ্টিতে নিজের থেকে আলাদা মনে হতে পারে না। আপন সত্তার মতই সে এর সবকিছুকে এই মালিকের আধিপত্যের ও একই বাদশাহর প্রভুত্বের অধীন মনে করে। তার সহানুভূতি , প্রেম ও খেদমত কোন বিশেষ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। আল্লাহর বাদশাহী যেমন অনন্ত অসীম, তার দৃষ্টিভংগী ও তেমনি সীমা বন্ধনহীন হয়ে যায় । এ ধরনের দৃষ্টিভংগি এমন কোন লোকের মধ্যে থাকতে পারে না, যে ছোট ছোট খোদার বহু অস্তিত্ব স্বীকার করে অথচ যার খোদার মধ্যে মানুষেরই মত সীমাবদ্ধও ত্রু“টি- বিচ্যুতিপূর্ণ গুণের সমাবেশ হয়, অথবা যে ব্যক্তি গোড়া থেকেই খোদার অস্তিত্বই স্বীকার করে না।

দুইঃ এ কালেমা মানুষের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের আত্মসম্মানবোধ ও আত্মমর্যাদার অনুভুতি জাগিয়ে তোলে ।এর উপর বিশ্বাস পোষনকারী জানে যে , এক আল্লাহ -ই সকল শক্তির মালিক। তিনি ব্যতীত আর কেহ মানুষের কল্যাণ বা অকল্যাণ দান করতে পারে না, কেউ তাকে জীবন দিতে পারে না, মারতে পারে না ,এ জ্ঞানও প্রত্যয় তাকে আল্লাহ ব্যতীত অপর যে কোন শক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত , আত্মনির্ভরশীল ও নির্ভীক করে তোলে । তার শির কোন সৃষ্টির সামনে অবনমিত হয়না; তার হাত কারুর সামনে প্রসারিত হয় না। তার অন্তরে কারুর শ্রেষ্ঠত্বের আধিপত্য স্থান লাভ করে না। তাওহীদ বিশ্বাস ব্যতীত কোন অন্যবিধ বিশ্বাস থেকে গুণের এ জন্ম হয় না। শির্‌ক কুফর ও নাস্তিকতার অপরিহার্য প্রকৃতি হচ্ছে এইযে, মানুষ তার প্রভাবে সৃষ্টির সামনে অবনমিত হয়। তাকেই কল্যাণ অকল্যাণের মালিক মনে করে , তারই ভয় সে অন্তরে পোষণ করে এবং তার কাছে কোন কিছু প্রত্যাশা করে।

তিনঃ আত্মসম্মানবোধের সাথে সাথে এ কালেমা মানুষের মধ্যে বিনয়ও সৃস্টি করে। এ কালেমার স্বীকৃতিদানকারী কখনো গর্বস্ফীত ও উদ্ধত হতে পারে না। শক্তির গর্ব , সম্পদের গর্ব ও যোগ্যতার গর্ব কখনো তার মনে স্থান লাভ করে না, কারণ সে জানে তার যা কিছু আছে , সবই আল্লাহর দান এবং তিনি যেমন সবকিছু দেয়ার শক্তি রাখেন , তেমনি সবকিছু নেয়ার শক্তিও তাঁর রয়েছে। এর মুকাবিলায় এমন লোকও রয়েছে যে কোনরূপ পার্থিব কৃতিত্ব অর্জন করে গর্বস্ফীত হয়ে ওঠে । কারণ সে মনে করে যে , তার সে কৃতিত্ব তার যোগ্যতার ফল। এমনি করে শিরক ও কুফরের সাথে অহংকাররের উদ্ভব অপরিহার্য , কেননা মুশরিক ও কাফের ব্যক্তি এ ধারণা পোষণ করে যে তাদের উপাস্য বহু খোদা ও দেবতার সাথে তাদের একটা বিশেষ সম্পর্ক, যা অপরের ভাগ্যে জোটেনা।

চারঃ এ কালেমায় বিশ্বাস পোষণকারী বেশ ভাল করেই জানে, আত্মার শুদ্ধি ও সৎকর্ম ব্যতীত তার মুক্তি ও সাফল্যের আর কোনপথ নেই। কারণ সে এমন এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস পোষণ করে যিনি আত্মনির্ভরশীল , কারুর সাথে যাঁর কোন বিশেষ সম্পর্ক নেই , যিনি পূর্ণ ন্যায় বিচারক, যাঁর কর্তৃত্বতে আর কারুর হস্তক্ষেপ বা প্রভাব চলতে পারে না। পাক্ষান্তরে যারা মুশরিক ও কাফের তাদের সর্বক্ষণ মিথ্যা আশার উপর নির্ভর করে জীবন যাপন করতে হয়। তাদের মধ্যে কেউ মনে করে যে , খোদ খোদার পুত্র তার পাপের প্রায়শ্চিত করবেন। কেউ মনে করে সে খোদার অনুগৃহীত সুতরাং তার কোন শাস্তি হতে পারে না। কারুর ধারণা তাদের বুযর্গেরা তাদের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন। কেউ আবার দেবতাকে নযর-নিয়ায দিয়ে ভাবছে , দুনিয়ার বুকে সবকিছু করার স্বাধীনতা সে পেয়েছে। এ ধরনের মিথ্যা বিশ্বাস তাকে সর্বক্ষণ পাপ ও দুস্কৃতির চক্রে টেনে নিয়ে যায় এবং সেই মিথ্যা বিশ্বাসের উপর ভরসা করে আত্মশুদ্ধি ও সৎকর্ম থেকে গাফেল হয়ে থাকে। নাস্তিক ব্যাক্তির ব্যাপারে বলা যায়, সে তো শুরু থেকেই এমন কোন শক্তিমান সত্তায় বিশ্বাস করে না ভাল মন্দ কাজের জন্য যার কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তাই সে দুনিয়ায় নিজেকে মনে করে যে কোন কাজ করার স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী। এ ধরনের লোকের অন্তরের আকাংখাই হয় তাদের খোদা এবং তারা হয় ইন্দ্রীয়পরতার দাস।

পাঁচঃ এ কালেমার স্বীকৃতিদানকারী কোন অবস্থায়ই হতাশ ও ভগ্ন হৃদয় হয়না। সে এমন এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে , যিনি আসমান যমীনের সকল ধনভান্ডারের মালিক , যার মহিমা ওঅনুগ্রহ সীমাহীন এবং যাঁর শক্তি অনন্ত । ঈমান তাকে দেয় অসাধারণ শান্তি ও নিশ্চিন্ততা এবং তার অন্তরকে আশায় পরিপূর্ণ করে । দুনিয়ার সকল দুয়ার থেকে সে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরতে পারে, কোন কিছুই তার কাছে না আসতে পারে এবং সকল উপায় ও পন্থা সে একে একে হারাতে পারে , তথাপি এক আল্লাহর উপর নির্ভর- প্রবণতা সে কোন অবস্থায়ই হারায় না এবং তারই বলে সে নতুন আশা বুকে নিয়ে নতুন প্রচেষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করে। এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস ব্যতীত অপর কোন বিশ্বাস থেকেই অন্তরের এ নিশ্চিন্ততা লাভ করা যেতে পারে না। মুশরিক , কাফের ও নাস্তিক যারা তাদের অন্তর ছোট হয়ে থাকে, তাদের নির্ভর করতে হয় সীমাবদ্ধ শক্তির উপর । তাই সংকটের পথে , দ্রুত তাদের ঘিরে ফেলে হতাশা এবং অনেক সময়ে এমনি অবস্থায় তাদের আত্মহত্যার পথ ধরতে হয়।

ছয়ঃ এ কালেমার উপর বিশ্বাস মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে দৃঢ় সংকল্প , উচ্চাকাঙ্খা , অধ্যবসায় ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের বিপুল শক্তি। আল্লাহর সন্তোষ বিধানের জন্য যখন সে কোন মহৎ কাজ করার পথে এগিয়ে যায় তখন অন্তরে প্রত্যয় পাষণ করে যে ,যমীন ও আসমানের বাদশাহর শক্তি রয়েছে তার পশ্চাতে। এ ধারণা তার ভিতরে পর্বতের দৃঢ়তা সৃষ্টি করে দেয় এবং দুনিয়ার সকল সংকট, বিপদ বিরোধী শক্তি সমূহ মিলিত হলেও তাকে তার সংকল্প থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। শির্‌ক কুফর ও নাস্তিকতায় শক্তি কোথায় পাওয়া যাবে ?

সাতঃ এ কালমা মানুষকে বীর্যবান করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে মানুষকে কাপুরুষ করে তোলে দুটো জিনিসঃ এক দিকে ধন- প্রাণ ও সন্তান -সন্তুতির প্রেম, অপরদিকে এ ধারণা যে আল্লাহ ব্যতীত মানুষের মৃত্যু ঘটাবার মত অপর কোন শক্তি রয়েছে এবং মানুষ চেষ্টা করে মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতে পারে। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ’ র প্রতি বিশ্বাস এ দুটো জিনিস অন্তর থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। প্রথমটি দূরিভূত হওয়ার কারণ, এ কালেমায় স্বীকৃতিদানকারী নিজের ধন -প্রাণ ও সবকিছুর মালিক বলে জানে একমাত্র আল্লাহকেই এবং সে আল্লাহর সন্তোষের জন্য সবকিছু কুরবান করতে তৈরী থাকে। তারপর দ্বিতীয় ধারণাটি ও তার অন্তরে অবশিষ্ট থাকে না , কারণ ‘লা-ইলহা ইল্লাল্লাহ ও কালেমার স্বীকৃতিদানকারীর দৃষ্টিতে প্রাণ হরণের ক্ষমতা মানুষ, পশু, তোপ , তলোয়ার ,লাঠি , পাথর কোন কিছুরই নেই এ মতের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ এবং তিনি মৃত্যুর যে সময় নির্দেশ করে রেখেছেন, তার আগে দুনিয়ার সকল শক্তি মিলিত হয়েও কারুর প্রাণ হরণ করতে পারে না। এ কারণেই আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণকারীর চেয়ে বেশী বীর্যবান ও সাহসী দুনিয়ার আর কেউ হতে পারেনা। নাংগা তলোয়ারের চমক, কামানের অগ্নিবর্ষণ , বোমাবৃষ্টি ও দুর্দান্ত সেনাবাহিনীর আক্রমণ সবকিছুই তার কাছে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়। আল্লাহর পথে যখন সে লড়াই করতে এগিয়ে যায় তখন তার চেয়ে দশগুণ শক্তিশালী বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়। মুশরিক কাফের ও নাস্তিক এ শক্তি পাবে কোত্থেকে ? তাদের কাছে প্রাণই সবচেয়ে প্রিয় বস্তু এবং তারা মনে করে ,দুশমনই নিয়ে আসে মৃত্যু ; আর দুশমনকে সরিয়ে দিতে পারলেই মৃত্যুকেও সরিয়ে দেয়া যায়।

আটঃ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র প্রতি বিশ্বাস মানুষের মনে সন্তোষ , পরিতুষ্টি ও অনন্য নির্ভরতার গৌরবময় মনোভাব সৃষ্টি করে এবং লোভ লালসা হিংসা ও বিদ্বেষের অবাঞ্চিত মনোভাব তার অন্তর থেকে দূরীভূত করে দেয়। সাফল্য অর্জনের অবৈধ ও ঘৃণ্য ধারণা তার মনে অনুপ্রবেশের অবকাশই পায় না । সে মনে করে যে , রুযী- রোযাগার আল্লাহরই হাতে , তিনি যাকে ইচ্ছা বেশী করে দেন ,যাকে ইচ্ছা কম করে দেন । সম্মান , শক্তি , খ্যাতি ও আধিপত্য আল্লাহর ইখতিয়ারের অন্তগত ; তিনি আপন বিবেচনা অনুযায়ী যাকে যেমন ইচ্ছা কম করে দেন। আমাদের কর্তব্য হচ্ছে নিজ নিজ সীমানার মধ্যে বৈধ উপায়ে চেষ্টা করে যাওয়া । সাফল্য ও ব্যর্থতা আল্লাহর অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল । তিনি দিতে চাইলে দুনিয়ার কোন শক্তি তাঁকে বাধা দিতে পারে না আর তিনি দিতে না চাইলে কোন শক্তিই তাঁকে বাধ্য করতে পারে না। পাক্ষান্তরে মুশরিক , কাফের ও নাস্তিকেরা নিজস্ব সাফল্য ও ব্যর্থতাকে নিজস্ব প্রচেষ্টা ও পার্থিব শক্তিসমূহের সাহায্য অথবা বিরোধিতার উপর নির্ভরশীল মনে করে এবং সেই কারনেই তারা থাকে প্রলোভন ও হিংসাবৃত্তির দাস হয়ে। তাই সাফল্য লাভের জন্য ঘুস , খোশামোদ , ষড়যন্ত্র ও সর্বপ্রকার নিকৃষ্ট পন্থা অবলম্বন করতে তাদের কোন ভয় নেই। অপরের সাফল্যে তারা পরশ্রীকাতরতা ও প্রতিহিংসায় জ্বলে মরে এবং তাকে -তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার ব্যাপরে কোন রকম চেষ্টার ত্রু“টি করে না।

নয়ঃ সবচেয়ে বড় ব্যাপার এই যে , ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র প্রতি বিশ্বাস মানুষকে আল্লাহর আইনের অনুসারী করে তোলে । কালেমার প্রতি ঈমান পোষণকারী বিশ্বাস করে যে আল্লাহ প্রকাশ্য ও গোপন বস্তু সম্পর্কে অবগত আছেন, তিনি আমাদের শাহ্‌রগ অপেক্ষা অধিকতর নিকটবর্তী। রাতের অন্ধকারে অথচ নিঃসংগ নির্জনতায় যদি আমরা কোন পাপের কাজ করি , তা তিনি জানতে পান। আমাদের অন্তরের গভীরে যদি কোন অসদাকাঙা জন্ম নেয়, তার খবরও অল্লাহ্‌র কাছে পৌঁছে যায়। আর সবার কাছে আমরা যা গোপন করতে পারি , আল্লাহর কাছে তা আমরা গোপন করতে পারি না। সবার কাছ থেকে আমরা পালিয়ে বাঁচতে পারলেও আল্লাহর রাজ্যের বাইরে আত্মগোপণ করার সাধ্য আমাদের নেই । সবার কাছ থেকে বাঁচতে পারলেও আল্লাহর হাত থেকে আমরা বাঁচতে পারি না। এ প্রত্যয় যতবেশী শক্তিশালী হবে, মানুষ তত বেশী আল্লাহর আদেশ-নিষেধের অনুগত হবে। যা কিছু আল্লাহ তায়ালা নিষেধ করে দিয়েছেন , তা তার কাছে ঘেষতে পারবে না। আর যা কিছু করার হুকুম করে দিয়েছেন সে নিঃসংগতা ও অন্ধকারের মধ্যে ও তা পালন করবে । কেননা সে জানে, এমন এক পুলিশ তার পেছনে যে, কখনো কোন অবস্থায়ই তাকে একা ছেড়ে দেবে না এবং এমন এক আদালতের ভীতি তার রয়েছে যার ওয়ারেন্ট এড়িয়ে সে কোথাও পালাতে পারেনা। এ কারণেই মুসলিম হওয়ার সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে জরুরী শর্ত হচ্ছে লা-ইলাহা ইল্লাহ ও উপর ঈমান আনা । আগেই যেমন বলা হয়েছে যে , মুসলিম মানে হচ্ছে আল্লাহর অনুগত বান্দাহ হওয়া , তেমনি আল্লাহর অনুগত হওয়া ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয় যতক্ষণ না মানুষ এ প্রত্যয় পোষণ করে যে আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই।

হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর শিক্ষার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বুনিয়াদ জিনিস হচ্ছে আল্লাহর উপর ঈমান । এ হচ্ছে ইসলামের কেন্দ্র ও মূল এবং তার শক্তির উৎস । এ ছাড়া ইসলামের যেসব বিশ্বাস , আদেশ বিধান রয়েছে সবকিছুই দাঁড়িয়ে আছে এরই উপর নির্ভর করে এবং সব কিছুকেই শক্তি সংগ্রহ করতে হয় এ একই কেন্দ্র থেকে। এ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস কে বাদ দিলে এ ইসলামের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা ।

সবিস্তার সূচীপত্র
টেম্পলেট কাষ্টমাইজেশন - তরঙ্গ ইসলাম | তরঙ্গ ইসলাম