কায়সার ও কিসরা - নসীম হিজাযী


আদী ও তার ছেলেরা ওমরকে খুঁজতে বেরিয়েছে এক প্রহর আগে । প্রদীপের ক্ষীণ আলোয় বসে আছে সামিরা । তার ডাগর আঁখিতে বেদনার ছাপ । সামিরা দুহাত উপরে তুলে দরদমাখা কণ্ঠে প্রার্থনা করছিলো : "ওগো মানাত! পৃথিবীর কোন কিছুই তো তোমার কাছে গোপন নেই । ভাইজান কোথায় আছে তা তুমিই জানো.."

..আসেম ভেবেছিলো ওমরকে পৌঁছে দিয়েই ফিরে যাবে সে । শান্তির দিনগুলো শেষ না হলেও আওসের কারো পক্ষে বনু খাজরাজের সীমায় পা রাখা নি:সন্দেহে অবাঞ্চিত ঘটনা..


ইউসুফ বিন তাশফিন (নসীম হিজাযী)

 
বাপকা বেটা : 

এক বাচ্চা ছেলে দশাসই এক লোকের হাত ধরে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে । আগে আগে যাচ্ছে দুই কিশোর । লোকটি ডেকে বলল, 'সাদ, আহমদ, দাঁড়াও'।

সাদ ও আহমদ বাগানের ভাঙা দেয়ালটার কাছে পৌছে ডাক শুনে দাঁড়িয়ে পড়লো । লোকটার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি । সে তার বিশাল দেহটা নিয়ে ওদের কাছে এসে বলল, 'হাসান খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে' ।

আলমাস চাচা, আমরা আজ মদিনাতুজ জোহরা দেখে যাব ।কি হাসান! তুমি কি খুব কাহিল হয়ে পড়েছো ? 'বললো বড় ছেলেটি ।

হাসান কোন জবাব না দিয়ে মুখ কালো করে এক পাথরের ওপর বসে পড়লো । তীর ধনুক নামিয়ে রাখল মাটিতে... (প্রথম চাপ্টার)

ভারত যখন ভাঙলো (নসীম হিজাযী)

 
ইসমাইল হুকার নলটি গোলাম হায়দারের দিকে ফিরিয়ে দিলো । তারপর সেখান থেকে উঠে শ্লথগামী বলদগুলোর পিঠে দু ঘা বসিয়ে দিল এবং আবার আগের জায়গায় এসে বসে পড়লো ।

গোলাম হায়দার হুকায় কয়েকটান দিয়ে বলল, "একটু পরে কেয়ারীটাও একবার দেখে এসো.. 

তুমি কি কোথাও যাচ্ছো ?

আমি একটু মজিদের খবরটা নিয়ে আসি। গতকাল পাটওয়ারীর হাত দিয়ে মাষ্টারজী পয়গাম পাঠিয়েছেন, বিগত দুদিন ধরে সে গরহাজির। আজ আমি তাকে খুব মেরেছি।

ইসমাঈল মুচকি হেসে বললো, মেরে কোন লাভ হবেনা। আমার মনে হয় তার সাথে তুমিও স্কুলে ভর্তি হয়ে যাও । আজ ভাইজান বাড়িতে আসবেন। আমি তাকেও বলবো যদি মজিদকে পড়াতে হয় তাহলে তার দেখাশুনা করার জন্য তার বাপকেও সঙ্গে রাখতে হবে।

লৌহমানব - নসীম হিজাযী

শীতের জমকালো দীর্ঘ-রাত। কনকনে শীতের প্রাবল্য গোটা প্রকৃতিতে খেলে যাচ্ছে একের পর এক। পথপ্রান্তর ও লোকালয় শূণ্য। হিরাত থেকে নিশাপুরের দিকে যাওয়া গিরিপথগুলোতে মৃত্যুর নিস্তব্ধতা। কোথাও কেউ নেই। সহসাই ভেসে এলো দ্রুতগামী অশ্বখুড়ধ্বনি। সেই ধ্বনিতে পাথুরে ভূমি কেপে উঠলো, খানিকবাদে জনা তিনেক অশ্বারোহীকে ঝড়োবেগে নিশাপুরের দিকে যেতে দেখা যায়...

...এশিয়া মাইনরের ইতিহাস নিয়ে এ কাহিনী! ইতিহাসের ধূষর পাতায় চকচক করা এক উপাখ্যান! নিশাপুরের পার্বত্যাঞ্চল থেকে আড়মোড়া দিয়ে জেগে ওঠা সিংহ শার্দুল - তার নাম সুলতান মুহাম্মাদ ঘুরী!  ভারতবিজেতা , মুক্তিকামী কোটি মানুষের ত্রাণকর্তা মুহাম্মাদ ঘুরী! তরাইনের যুদ্ধে ভারতের ভাগ্যাকাশে সুরাইয়া সেতারা হয়ে উদিত হওয়া লৌহমানব মুহাম্মাদ ঘুরী!...

হেজাযের কাফেলা - নসীম হিজাযী

বসন্ত কাল। যতদূর দৃষ্টি যায় কেবল সবুজের সমারোহ। ডান দিকে দৃষ্টির শেষ সীমানা পর্যন্ত সবুজ ক্ষেত-খামার। বাতাসে নাচছে গমের শীষ। বায়ে ফোরাতের পারে লতাগুল্ম ঘেরা গভীর অরণ্য।

হাসান প্রবেশ করলো এ এলাকায়। অনেক পথ হেঁটে ফসলের ক্ষেত আর বাগান পেরিয়ে গাঁয়ের বস্তি ছাড়িয়ে কেল্লার মত এক বাড়ির কাছে পৌঁছল ও। ডুবে যাচ্ছিলো সূর্য। বাইরের মাঠে খেলা করছিলো বালকেরা। এদিক ওদিক তাকিয়ে ও এগিয়ে গেল ফটকের কাছে। ভেতর থেকে ভেসে এল কুকুরের ঘেউঘেউ। কিছুক্ষণ এক ধরনের অস্থিরতা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে। তারপর দরজায় কড়া নেড়ে ডাকলো:''কেউ আছেন?"

ভেঙ্গে গেলো তলোয়ার - নসীম হিজাযী


একদিন ফরহাত বালাখানার এক কামরায় বসে তাঁর পরিচারিকার সাথে কথা বলছেন। আচানক সিঁড়ির উপর  কার ছুটে আসার আওয়াজ শোনা গেল। দেখতে দেখতে বারো বছরের কাছাকাছি বয়সের একটি শ্যামবর্ণ বালক এসে কামরায় প্রবেশ করলো।

পরিচারিকা বললো: মুনাওয়ার, তুমি বড় নালায়েক হয়েছো। বিবিজী কতোবার তোমায় মানা করেছেন সিঁড়ির ওপর ছুটাছুটি করতে!

মুনাওয়ার পরিচারিকার জওয়াব না দিয়ে ফরহাতকে লক্ষ্য করে বললো: আজ এক মেহমান এসেছেন। খুব বড় লোক মনে হচ্ছে। এসেই তিনি ভাইজান আনওয়ার আলী ও ভাইজান মুরাদ আলীর কথা জিজ্ঞেস করলেন। এরপর দীলাওয়ার আলী ও সাবেরের কথা জানতে চাইলেন। সাবের তো মরে গেছে।

সীমান্ত ঈগল - নসীম হিজাযী

পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে এলো পঞ্চাশজন ঘোড় সওয়ার। ঘন বন পেরিয়ে নদীর ভাংগা পুলের কাছে থামল ওরা। নদীর ওপারে বন আরো গভীর। উপত্যকায় জংলী গাছের সাথে আংগুরলতা, আপেল, নাশপাতি আর হরেক ফলের গাছ দেখে বুঝা যায়, কোন কালে এ অরণ্য এক সুদৃশ্য বাগান ছিলো। পুলের ওপাশে রাস্তার দুধারে গাছের ডালপালা ভাঙা সড়কটাকে ছাদের মত ঢেকে রেখেছে। ঘাস আর গুল্মলতা জড়িয়ে রেখেছে সড়কের ভাঙা ইট-পাথর। দেখলেই বুঝা যায়, এ সড়কে মানুষের পা খুব কমই পড়ে।

নদীটা গভীর নয়। সড়ক ছেড়ে কয়েক পা নিচে নামলে সহজেই নদী পেরোতে পারে সওয়াররা। কিন্তু সামনের দু'জন কি ভেবে পুলের কাছে পৌঁছেই পেছন ফিরে সওয়ারদের থেমে যেতে ইশারা করলো।


মরণজয়ী - নসীম হিজাযী

মরণজয়ী নসীম হিজাযীর দাস্তান-ই-মুজাহিদ উপন্যাসের বাংলা অনুবাদ। ইসলামের ইতিহাসের পঁয়ত্রিশ থেকে পঁচাত্তর হিজরী পর্যন্ত সময়কালের পটভূমিতে এটি রচিত হয়েছে। এই চল্লিশটি বছর ছিলো সত্যিকার অর্থে বিশ্ব-ইতিহাসের এক ক্রান্তিকাল যখন আলমে-ইসলামের সীমানা একদিকে স্পেন ছাড়িয়ে ফ্রান্সের পিরিনিজ পর্বতমালা, অপরদিকে ভারতবর্ষ পর্যন্ত, একদিকে আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি, অপরদিকে মধ্য এশিয়ার তুর্কিস্তান তাতারস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এ ছিলো সেই অবিষ্মরণীয় সময়কাল যখন, মুহাম্মদ বিন কাশিম সিন্ধু জয় করেন, মুসা বিন নুসায়ের স্পেন জয় করেন আর কুতায়বা বিন মুসলিম মধ্য এশিয়া জয় করেন। ইসলামের শান্তিময় শীতল ছায়াতলে সারা বিশ্বের কোটিকোটি তপ্তহৃদয় দিগভ্রান্ত মানবতাকে নিয়ে আসেন বীরত্ব ও মমতার মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে!

শেষ প্রান্তর - নসীম হিজাযী

গোবী মরুভূমির দূরন্ত মরুচারী তেমুজিন! ইতিহাসে তার পরিচয় চেংগিস খান! তার নেতৃত্বে মঙ্গোলিয়ার বর্বর বাহিনী জেগে উঠলো দূরন্ত ঝড়ের মত, সভ্যতার দীপশিখা নিভিয়ে দিতে লাগলো একটি একটি করে। ছয়শ' বছর আগে আরব মরু থেকে উঠে এসেছিলো যে মেঘছায়া, তা মানবতার উপর বর্ষন করেছিলো রহমতের বারিধারা। আর ছয়'শ বছর পর গোবীর মরুবুক থেকে উঠলো যে দূরন্ত ধূলিঝড়, তা থেকে বারিবর্ষণ হলোনা। হলো অগ্নিগিরির ধূম উদগীরণ, হলো উত্তপ্ত লাভার উদ্গীরণ!

শেষ বিকেলের কান্না - নসীম হিজাযী

দশ মাইল দীর্ঘ এবং পাঁচ মাইল প্রশস্ত আলফাজরার পার্বত্য এলাকা। হিজরতের পর এটাই ছিলো স্পেনের শেষ মুসলিম সম্রাট আবু আবদুল্লাহর সাম্রাজ্য। পশ্চিমে ছোট ছোট পর্বত শ্রেণী। পর্বতের পাদদেশে একটা পুরনো কেল্লায় আবু আবদুল্লাহর আবাস। পাহাড় শ্রেণী ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে গেছে উত্তর দিকে। পেছনে শস্য-শ্যামল উপত্যকা। সেখানে প্রায় চল্লিশটা বসতবাড়ি। এখানেই আরেক কেল্লায় থাকেন সাবেক উজির আবুল কাসেম।

আবুল কাসেমের জায়গীর দেখাশুনার দায়িত্ব ছিল মাসয়াবের ওপর। সম্পর্কে তার স্ত্রীর চাচাতো ভাই। সুলতানের আগমনের কয়েকদিন পর দেহরক্ষী, চাকর-বাকর এবং ছেলেমেয়েদের নিয়ে এসেছিলেন তিনি। আবুল কাসেম কাজে কর্মে ব্যস্ত থাকতেন গ্রানাডায়, গত তিন বছরে বড় জোর কয়েক সপ্তাহ কাটিয়েছেন এখানে।

আঁধার রাতের মুসাফির -(নসীম হিযাজী)

: 'চাচীজান', বই খুলতে খুলতে বলল আতেকা। 'বইয়ের জন্য সাঈদের ঘরে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তারাতারি-ই ফিরে আসবো। কিন্তু জোবাইদার সাথে কথা বলতে বলতে দেরী হয়ে গেলো। এখনো গ্রানাডা থেকে সাঈদ ফিরে আসেনি। মনসুর খুব চিন্তা করছে। জাফর এবং জোবাইদাও দারুন পেরেশান। জাফর বলল, সন্ধ্যা পর্যন্ত ফিরে না এলে তাকে খুঁজতে সে নিজেই গ্রানাডা যাবে। ওর ভয় হচ্ছে, গোয়েন্দারা তাঁকেও আবার খৃষ্টানদের হাতে তুলে না দেয়।'

কিং সায়মনের রাজত্ব - নসীম হিজাযী


দশ লক্ষাধিক কৌতুহলী দর্শক স্যার জর্জকে বিদায় জানাবার জন্য সমবেত হয়েছিলো। উল্লাসে গগনবিদারী শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠল তারা। মহাশূণ্যে তীব্র গতিতে ছুটে চলা এক অগ্নিশিখা মুহূর্তে তাদের দৃষ্টির অগোচরে চলে গেল।

ঘোষক বললেন, এখন রকেট এতদূরে চলে গেছে যে, তার আলো দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যেও আর দেখা যাচ্ছে না। মি. জর্জ এখন নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে মহাশূণ্যে উড়ে চলছেন।

খুন রাঙ্গা পথ - নসীম হিজাযী

 

ফরহাত এগারো বছর বয়স থেকে পরদা করতে শুরু করেছে।গত দু'বছরে মোয়াযযম আলী তাকে দেখেন নাই। তার মা কখনো কখনো তার কথা বলেন।

একদিন তিনি তাদের বাড়ি থেকে ফিরে এসে মোয়াযযম আলীকে বললেন: বেটা, ফরহাত আজ তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছিলো।

মোয়াযযম আলীর গাল ও কান লজ্জায় লাল হয়ে উঠে। তিনি প্রশ্ন করলেন, আমার কথা সে কি জিজ্ঞেস করেছিলো?

মা বললেন, সে জিজ্ঞেস করেছিলো, কেন তুমি ফৌজে ভর্তি হও নাই?

মোয়াযযম হেসে বললেন, আম্মাজান, আমার আফসোস আমার জন্য আপনাকে ছোট্ট ছোট্ট মেয়েদের বিদ্রুপও শুনতে হচ্ছে।

মা জওয়াবে বললেন, বেটা সে তো আমাকে বিদ্রুপ করেনি, বরং সে আমায় হামদর্দী দেখাচ্ছিলো। ফরহাত এখন আর ছোট্ট মেয়েটি নেই। তাকে এখন বেশ জোয়ান দেখাচ্ছে। মুর্শীদাবাদের বড়বড় ঘর খেকে তার সম্বন্ধ আসছে কিন্তু তার মা কিছুতেই রাজী হচ্ছে না। ফরহাত এমন মেয়ে কোন নবাবের ঘরেই ওকে মানায়।

মোয়াযযম জানতেন, তার মা ফরহাতকে খুব ভালোবাসেন। তাই মা কে চটাবার জন্য বললেন, আম্মাজান, ফরহাত সেই মেয়েটি নয় যার যার নাক চেপ্টা, রঙ মিশকালো আর একটা চোখ খানিকটা ছোট ছিলো ।

মানুষ ও দেবতা (নসীম হিজাযী)

শ্রাবণ মাস। সুরমা নদীতে প্রবল স্রোত। নদীর কিনারায় কয়েকটি ছোট নৌকা তীরবর্তী বড়বড় পাথরের সঙ্গে বাঁধা আছে। বেগবতী নদীর স্রোতে নৌকাগুলো দুলছে। নিকটেই নদীতীরে  কয়েকজন মাঝি নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলাবলি করছে। একজন বুড়ো মাঝি কপালে হাত রেখে বিশাল নদীর অপর তীরের দিকে একবার দেখে পিছন ফিরে জনৈক সুদর্শন যুবককে জিজ্ঞেস করল, 'মহারাজ! সেনাপতিজী কি আজই আসবেন?'

মুহম্মদ ইবন কাশিম (নসীম হিজাযী)


হঠাত চিৎকার ধ্বনি শুনে আবুল হাসান নিচের দিকে চেয়ে দেখলেন। নৌকা থেকে আট দশ গজ দূরে সেই সুন্দরী মেয়েটি পানিতে ডুব দিচ্ছিল। তার চীৎকার শুনেও নৌকারোহীরা নির্বিকার তার দিকে চেয়ে দেখছিল। আবুল হাসান প্রথমে দড়ির সিঁড়ি ফেলে দিলেন। কিন্তু তার মনে হল, মেয়েটির হাত পা অসাড় হয়ে যাওয়ায় সে সিঁড়ি ধরতে পারছে না। তিনি ততক্ষনাৎ পোশাক সমেত সমুদ্রে লাফিয়ে পড়লেন। মেয়েটি হঠাৎ পানিতে অদৃশ্য হয়ে গেল এবং তিনি হতভম্ব হয়ে এদিক সেদিক চাইতে লাগলেন। ইতিমধ্যে জাহাজের পাশে বহু নৌকা জড় হয়ে গিয়েছিল এবং দ্বীপবাসীরা উচ্চস্বরে হাসছিল। তিনবার ডুব দেয়ার পর নিরাশ হয়ে আবুল হাসান দড়ির সিঁই ধএ উঠতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় তার এক সাথী জাহাজ থেকে ডেকে বলল-মেয়েটি ঐদিকে আছে, জাহাজের অন্যদিকে। সে ডুবছে। বোধ হয় তাকে কোন সামুদ্রিক মাছে ধরেছে।

চূড়ান্ত লড়াই - নসীম হিজাযী

ইতিহাসের এক কিংবদন্তী..
তিনি...
এক দিগ্বিজয়ী বীর, যার তলোয়ার কখনো ঝংকৃত হয়েছে তুর্কিস্তানে, আবার কখনো ঝলসে উঠেছে হিন্দুস্তানের মাটিতে। যার ঘোড়া কখনো জাইহুন, আবার কখনো গঙ্গার পানি পান করেছে।

তিনি...
জীবন চলার গৌরবোজ্জ্বল পথে ঐ সব মুসাফিরদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যাদের কাফেলা এক স্থানে স্থায়ী ন হয়ে দুশমনের সকল বধার বিন্ধ্যাচল ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে যেত দূরে-বহুদূরে।

'কায়সার ও কিসরা' - নসীম হিজাযী : (নাস্তিক-আস্তিক সকলের জন্য অবশ্যপাঠ্য এক উপন্যাস)

 আদী ও তার ছেলেরা ওমরকে খুঁজতে বেরিয়েছে এক প্রহর আগে । প্রদীপের ক্ষীণ আলোয় বসে আছে সামিরা । তার ডাগর আঁখিতে বেদনার ছাপ । সামিরা দুহাত উপরে তুলে দরদমাথা কণ্ঠে প্রার্থণা করছিলো : "ওগো মানাত! প্রথিবীর কোন কিছুই তো তোমার কাছে গোপন নেই । ভাইজান কোথায় আছে তা তুমিই জানো..."

..আসেম ভেবেছিলো ওমরকে পৌঁছে দিয়েই ফিরে যাবে সে । শান্তির দিনগুলো শেষ না হলেও আওসের কারো পক্ষে বনু খাজরাজের সীমায় পা রাখা নি:সন্দেহে অবাঞ্চিত ঘটনা...

....ইউসিবার প্রশ্নের জবাবে ইরজকে বিস্তারিত বলতে হলো, "মিসর থেকে সংবাদ পেয়েছি, আসেমের খোজ পাওয়া যাচ্ছেনা..." ইউসিবা চমকে তার দিকে তাকালো.. কিন্তু ইউসিবাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বেড়িয়ে গেলো ইরজ । ....


নীলনদের উপত্যকা বেয়ে দক্ষিণ দিকে চলছিলো ইরানী লশকর......

*.*.*.*.*.*.*.*.*.*


..... কায়সার ও কিসরা হলো আজ হতে পনেরো শতক পূর্বে আরবে দ্বীন ইসলামের আবির্ভাবের সময়কার রোম ও পারস্যের প্রেক্ষাপটের এক অবিষ্মরনীয় ঐতিহাসিক উপন্যাস । কায়সার ও কিসরা যারা পড়েনি, তারা ওই সময়টার পৃথিবীকে চেনে কেবল মক্কা-মদীনা দিয়ে । মুহাম্মাদ সা: এর জন্ম থেকে শুরু করে নবুওয়্যাত - দাওয়াত - নির্যাতনের শিকার হওয়া - হিজরত - যুদ্ধবিজয় - বদর ওহুদ খন্দক - আলী- ওমর - আবুবকর - আব্বাস - হামজা -সালমান ফারসী .. মুসলিম ঘরে ঘরে এই তো গৎবাঁধা পরিচিত ঘটনাপণ্জী । কায়সার ও কিসরা যারা পড়বে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন এঙ্গেল থেকে রুদ্ধশ্বাস আনন্দে জানতে পারবে সেই সময়টাকে ! কসম করে বলছি, এই বইটার প্রথম পাতা থেকে শুরু করে চারশত পনেরো পাতায় পৌছানোর আগে পর্যন্ত কোন পাঠক বই ছেড়ে উঠতে পারবেনা ।

ইয়াসরিব (মদীনা) এর বনু আওস গোত্রের এক যুবক আসেমকে নিয়ে শুরু হয় গল্পটা । এও এক নতুনত্ব । আজ পর্যন্ত সীরাতুন্নবী কিম্বা আরবের ইতিহাসের অন্য কোন গল্প এভাবে শুরু হতে দেখিনি । অস্ত্র কেনার জন্য ঋণ দিয়ে, কখনো রাতের আধারে একগোত্রের বাগানে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে, কখনো গুপ্ত হত্যা করে বনু আওস ও বনু খাজরাজের রক্তাক্ত শত্রুতায় ইন্ধন যুগিয়ে ইয়াসরিবের প্রভাবশালী বিচারক গোষ্ঠীতে পরিনত হয় চিড়দিনের ষড়যন্ত্রকারী ইয়াহুদীরা ।

আরবে কণ্যাশিশুর পিতা হবার অপমানের জ্বালা জুড়াতে জীবন্ত কবর দেয়ার কথা তো এতদিন কেবল বর্ণনা পড়ে এসেছি । কায়সার ও কিসরায় পেলাম তার মর্মস্পর্শী গল্পগাঁথা ।

যারা ভাবছেন, আমরা নবীর জীবনী জানি, আরবের ইতিহাস জানি, নতুন করে সেগুলো পড়তে বিরক্ত লাগবে, তাদের বলছি, এ উপন্যাসে আরবের অংশটা বড় সামান্য । খুব অল্প সময় এটা আরবে থাকে । চলে যায় রোমে - চলে যায় পারস্যে ! সিরিয়া - হেজাজের শহরগুলোতে সরাইখানায় বা যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে - সমুদ্রবন্দরগুলোতে - রাজপথ থেকে রাজপ্রসাদগুলোতে - বস্তিগুলোতে , পাহারে, উপত্যকার সংকীর্ণ রাস্তাগুলোতে- কখনো উষর মরুর উটের চামড়ায় গড়া তাবুগুলোতে। রোম আর পারস্যের যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে চিরদিন পিষ্ট হয় সাধারন অসহায় মানুষগুলি । রোম বা পারস্য কারো বিজয় বা পরাজয়ই তাদের ভাগ্যকে একচুল পরিবর্তন করতে পারেনা

গল্পের পরতে পরতে পাঠকের মনে শান দিয়ে যাবে আইয়্যামে জাহেলিয়ার বিভৎস অন্ধকার । মানবতার ডুকরে ডুকরে কান্নার ফোপানি । সারা দুনিয়া জুড়ে... অসংখ্য অসংখ্য নাটকীয় বাস্তব ঘটনাপঞ্জী! উপন্যাসটা পড়তে পড়তে চরমতম কট্টর মানুষও বুঝতে পারবে, পৃথিবীর ওই কঠিনতম সময়ে নবী মুহাম্মাদ সা: এর ইসলাম ই ছিলো মুক্তির একমাত্র উপায় ! অযুত নিযুত মানুষ জ্ঞাতসারে কিম্বা অজ্ঞাতসারে অপেক্ষা করছিলো মুক্তির সূর্য ইসলামের ।

চরম বিশৃংখল লন্ডভন্ড একটা পৃথিবী শুরু হয় বইয়ের শুরু থেকে । সেই বিশৃংখলা থেকে মুক্তি পেতে অথবা সেই বিশৃঙ্খলার স্রোতে গা ভাসিয়ে অসহায়ভাবে সাতরে চলতে চলতে গল্পের শেষটায় গিয়ে আবিষ্কার হয়, অলৌকিক এক বাস্তবতার । গল্পের নায়ক আসেম, যার উক্তি ছিলো, কখনো সম্ভব নয় এই ভূখন্ডে শান্তি আনবার, সে যখন জীবন নিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে আরব থেকে বহু বহু দূরে, তখন আরবে ঘটে চলে অসংখ্য অভূতপূর্ব ঘটনা যা পাঠেরা আগেই জানে বলে এ উপন্যাসে একেবারেই আসেনি । আসেনি বলেই বড় আফসোস হয় আসেমের জন্য ! সে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হয়ে - রোম পারস্যের অসংখ্য ঝড়ঝাপ্টার অভিজ্ঞতা নিয়ে একসময়ে ফিরে আসে জন্মভূমিতে, এসে খুজে পায়না পুরোনো দিনের দেখে আসা আওস খাজরাজের কুটিল শত্রুতার লেশমাত্র!

সবাই বইটা পড়লে আমার বড় ভালো লাগবে । আমি যে আনন্দ পেয়েছি বইটা পড়ে, যে নতুনত্ব পেয়েছি, যে অদ্ভুত স্বাদ পেয়েছি, কেউ তা থেকে বঞ্চিত হোক, তা চাইনা ।

*.*.*.*.*.*.*.*.*.*

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

'আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ সা: এর পক্ষ থেকে ইরান সম্রাট কিসরার নামে। তাকে সালাম, যে হেদায়াতের অনুসরণ করে । আল্লাহ এবং তার রাসুলের উপর ঈমান আনার পর ঘোষণা করে যে আল্লাহ এক, একক । তিনি আমাকে সমগ্র বিশ্বের নবী করে পাঠিয়েছেন ।প্রতিটি মানুষকে তিনি আল্লাহর ভয় দেখাতে পারেন । যদি তুমি ইসলাম গ্রহণ কর শান্তি পাবে। আর যদি ফিরে যাও তবে প্রজাদের সকল দায় দায়িত্ব তোমার'


দোভাষী সম্রাটকে চিঠির ভাষা বুঝাচ্ছিলো । দরবারীদের হাসি চেপে রাখা ছিলো বড় মুশকিলের ব্যাপার । .....

*.*.*.*.*.*.*.*.*.*

পারভেজ গ্লাস দেয়ালে ছুড়ে মারলেন। দারোগা তখন তাকে তার সেনাপতি সীনের মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকরীর খবর দিচ্ছিলো ।

: সে মানুষের সামনে আমার অপমান করেছে । তার চামড়া তোলার পূর্বে টেনে জিহবা ছিড়ে ফেলার উচিত ছিলো
: তাকে বেশিক্ষণ চিতকার করার সুযোগ দেয়া হয়নি ।
: আমার ব্যাপারে সে কি বলেছিলো ?
: ও বলছিলো আরবের এক নবীর ভবিষ্যঁবানী সত্য হবার সময় হয়ে এসেছে ।
:তোমার কথা আমি বুঝিনি..
: আলীজাহ! আরবের সে নবীর ভবিষ্যতবানী হলো কিছুদিনের মধ্যে রোমানরা বিজয়ী হবে! ধুলায় মিশে যাবে ইরানীদের জুলুমের হাত ।

*.*.*.*.*.*.*.*.*.*

নীরবে উভয়ে পথ চলতে লাগলো । হঠাৎ থেমে আসেম বললোম, সরাইখানার ব্যবসায় আমি তৃপ্ত । আমি শুধু বেচে থাকতে চই।
:না, বর্তমানকে নিয়ে তুমি তৃপ্ত থাকতে পারোনা । আমার বিশ্বাস হঠাৎ তোমার বিবেক তোমাকে সচেতন করে তুলবে ।
: কস্তুনতুনিয়ার লাখো মানুষ ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আমি কিছু করতে পারি, আপনি আমায় কোনদিন বলেন নি ।
: শুধু অপেক্ষা করতে পারো আসেম, তাতারীদের রক্তের পিপাসা মিটাতে পারবেনা ওরা কেউ।


*.*.*.*.*.*.*.*.*.*

: ক্লেডিস ফ্রেমসের সাথে খানিক আলাপ করে আসেমের দিকে ফিরে বলল , আসেম, হেরাকলে আমরা খুব শিঘ্রী একটা মেলার আয়োজন করেছি । আমরা কস্তুনতুনিয়ার সব বন্ধুরা ওখনে চলে যাচ্ছি । কয়েকদিনের ভেতরে তুমিও চলে আসো ।

*.*.*.*.*.*.*.*.*.*

ওহ ! বলা হয়নি , গল্পের নায়িকার নাম ফুস্তিনা । টুকরো টুকরো কিছু কথোপকথোন তুলে দিয়ে আমি সবার আগ্রহ বাড়ানোর চেষ্টা করে গেলাম । জানিনা কতটা পেরেছি ।

*.*.*.*.*.*.*.*.*.*
আরবের নবীর ভবিষ্যৎবানী । যা তিনি করেছিলেন রোমানদের বিজয়ের ব্যাপারে অথচ ইরানীদের আক্রমনে বিশাল রোমান সাম্রাজ্য তখন শুধুমাত্র সবশেষ আশ্রয় কস্তুনতুনা গিয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পারভেজের করুনার ভিখারী হয়ে গিয়েছিলো । পেছন দিক থেকে তারা আক্রান্ত হত জংলী তাতারীদের । এসময়ে পারভেজ তার সেনাপতি সীন কে হত্যা করলো অন্যায়ভাবে । ঘুরে গেলো ইতিহাসের ভাগ্যের চাকা । ..

আলিফ-লাম-মীম৷ রোমানরা নিকটবর্তী দেশে পরাজিত হয়েছে এবং নিজেদের এ পরাজয়ের পর কয়েক বছরের মধ্যে তারা বিজয় লাভ করবে৷ ক্ষমতা ও কতৃত্ব আগেও আল্লাহরই ছিল৷ পরেও তাঁরই থাকবে। আর সেদিনটি হবে এমন দিন যেদিন আল্লাহ প্রদত্ত বিজয়ে মুসলমানরা আনন্দে উৎফুল্ল হবে । আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী ও মেহেরবান৷ আল্লাহ এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, আল্লাহ কখনো নিজের প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধাচরণ করেন না৷ কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না৷ (সূরা আর-রূম : আয়াত ১-৬)


রোমানদের বিজয়ের সাথে সাথেই ৩১৩ জনের মুসলিম বাহিনীও বদরে বিজয়ী হয়ে অসম্ভব সে ভবিষ্যৎবানীকে সত্যে পরিনত করে চমকে দিলো বিশ্ববাসীকে । চমকে দিলো ইতিহাসকে । বইটা পড়লেই বুঝা যাবে, এ ভবিষ্যৎবানী কতটা উদ্ভট আর হাস্যকর মনে হবার কথা ছিলো... 

লেখক : ব্লগার স্বর্ণলতা 

প্রিয় কথাশিল্পী নসীম হিজাজী : তার জীবন ও কাজের কিছুটা বর্ণনা

..আমি যখন কাবা শরীফে পৌঁছলাম- তখন সেখানে বৃষ্টি হচ্ছিল। রহমতের বৃষ্টি। আমার যে কলম দিয়ে 'কায়সার ও কিসরা' লিখেছিলাম, সেটাকে প্রথমে আবে জমজমে চুবালাম। পরে তা মিজাবে রহমতের সেই জায়গাটিতে রাখলাম, যেখানে পানির ধারাটা এসে পড়ছে..


কালজয়ী কথাশিল্পী নসীম হিজাযী

ভারতীয় উপমহাদেশের যে কয়জন বিরল কথা সাহিত্যক স্থান ও কালের সীমানা অতিক্রম করে কালজয়ী সাহিত্যের আসরে স্থান করে নিয়েছেন, নসীম হিজাযী তাদের অন্যতম।

এক সময় বাংলার মুসলিম সমাজে যে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন বিষাদ সিন্ধুর রূপকার মীর মোশাররফ হোসেন বা আনোয়ারা উপন্যাসের স্রষ্টা নজীবুর রহমান সাহিত্যরত্ন অথবা বাংলা ভাষায় জনপ্রিয়তার যে শীর্ষ শিরোপা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। উর্দু সাহিত্যে নসীম হিজাযীর জনপ্রিয়তা তার চাইতে কোন অংশেই কম নয়। যারা তার কোন বই পড়েননি কিন্তু রূপালী পর্দায় দেখেছেন তার কাহিনীর চিত্ররূপ, তারাও উপলব্ধি করতে পারবেন, কাহিনী নির্মানে তিনি কতটা দক্ষ।

নসীম হিজাযীর সব বই

রক্ত নদী পেরিয়ে


সবিস্তার সূচীপত্র
টেম্পলেট কাষ্টমাইজেশন - তরঙ্গ ইসলাম | তরঙ্গ ইসলাম