অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা - মেজর জলিল

লেখক পরিচিতি :

পারিবারিক নাম মোহাম্মদ আবদুল জলিল। বরিশাল জেলার উজিরপুর থানায় জন্ম। পিতা জনাব আলী চৌধুরীর মৃত্যুর ৩মাস পরে উজিরপুর সদরেই অবস্থিত মামার বাড়ীতে জন্ম। শিশুকাল এবং কৈশোর মামদের পরম স্নেহেই কাটে। উজিরপুরের W.B. UNION INSTITUTION থেকে কৃতিত্বের সংগে ম্যাট্রিক পাস করেন। এ সময়ে ‘পথের কাঙাল’ এবং ‘রীতি’ নামক দু’খানা উপন্যাস রচনা করেন। পরে পান্ডুলিপি হারিয়ে ফেলেন। ১৯৬১ সনে ‘Y’ Cadet স্কীমের অধীনে পশ্চিম পাকিস্তানের ‘মারী হিলস’(রাওয়ালপিন্ডি জেলায়) ভর্তি হন। কৃতিত্বের সংগে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীন্ন হন। ১৯৬৩ সনে পাকিস্তানী মিলিটারী একাডেমী কাকুলে সামরিক বাহিনীর অফিসার কাম ট্রেনিং- এ যোগদান করেন। ১৯৬৫ সনের সেপ্টেম্বর মাসে কমিশন প্রাপ্ত হয়ে ১২ নং ক্যাভালরী রেজিমেন্ট (ট্যাঙক বাহিনী) যোগদান করে

অষ্টম অধ্যায় : আওয়ামী লীগের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির উৎস

১৯৭০ সনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো ৬দফার ভিত্তিতে। এই ৬ দফার মধ্যে আওয়ামী লীগ গৃহীত ৪ রাষ্ট্রীয় মূলনীতির একটিরও উল্লেখ ছিল না। তাছাড়া নির্বাচনী ইশ্‌তিহারে আওয়ামী লীগ আরো উল্লেখ করেছিল যে, তারা ইসলাম ধর্ম বিরোধী কোন আইন-কানুনও পাস করবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ ৭২সনের জানুয়ারীতে ক্ষমতাসীন হওয়ার সাথে সাথেই ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে দেয় এবং গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ নামে রাষ্ট্রের ৪ মূলনীতি নির্ধারণ করে, যা পরবর্তীতে ৭২-এর রাষ্ট্রীয় সংবিধানেও সন্নিবেশিত করা হয়। এই ৪ নীতির মূল উৎস কোথায়? কেনই বা উক্ত ৪ নীতিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করা  হলো? এ প্রশ্নগুলোর জবাব জনগণ আজো পায়নি।
    যে আওয়ামী লীগ ৭০-এর নির্বাচনে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল কুরআন-সুন্নাহ  পরিপন্থী কোন আইন পাস না করার পক্ষে, সেই আওয়ামী লীগই ভারত থেকে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গুটিয়ে নিয়ে এসে ক্ষমতার মসনদে বসার সাথে সাথেই অংগীকার ভংগ করল কেন? স্বেচ্ছাচারী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযদ্ধ করেও আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব স্বেচ্ছাচারমুক্ত হতে পারল না। দেশের জনমতের কোন রূপ তোয়াক্কা না করেই রাষ্ট্রীয় মূলনীতির মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আওয়ামী লীগ নেকৃত্ব জনগণের উপর জবরদস্তিভাবেই চাপিয়ে দিল ।
    আওয়ামী লীগ শাসনকালের বিশ্বাসঘাতকতার আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর এখান থেকেই শুরু। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হলে ৭০-এর নির্বাচনের কথায় ফিরে যেতে হয়। ৭০-এর নির্বাচন ছিল পাকিস্তান কাঠামোর আওতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচন। আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করেছিল পাকিস্তানের অধীনে। নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের অধীনে নয়। সুতরাং ৭২- এর আওয়ামী লীগ কর্তৃক সংবিধান প্রদান নীতিগত দিক দিয়ে মোটেই বৈধ ছিল না। সমগ্র জনগণের স্বত:ষ্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়। অমন একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এখানে আরো উল্লেখযোগ্য যে ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স্বপক্ষে যারা ভোট প্রদান করেনি, তারাও দেশ-মাতৃকার মুক্তির লড়াইয়ে শরীক হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের শরীক হয়েছিল আওয়ামী লীগ বিরোধী অথবা আওয়ামী লীগ বহির্ভূত বিভিন্ন সামাজিক এবং রাজনৈতিক শক্তিসমূহ। এই অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাতীয় রূপ ধারণ করেছিল ।
    কিন্তু যুদ্ধোত্তরকালে আওয়ামী লীগ চরম সংকীর্ণতার পরিচয় দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় রূপকে দলীয় রূপ প্রদানের জন্য বিভিন্নমুখী যড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। যার ফলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আওয়ামী লীগ বহির্ভূত সকল শক্তি হতোদ্যম হয়ে পড়ে এবং তারা তাদের নবতর আশা-আকাংখার বাস্তবায়ন করার সুযোগ থেকে প্রায় সম্পূর্ণভাবেই বঞ্চিত হয়। যুদ্ধোত্তর বিধ্বস্ত বাংলাদেশে যখন জাতীয় ঐক্যের সর্বাধিক প্রয়োজন ছিল, ঠিক সেই সময়েই আওয়ামী লীগ একলা চলোর নীতি অনুসরণ করার মধ্য দিয়ে জনমত এবং জনগণের আশা আকাংখা পদদলিত করে চলতে থাকে। এসব কারণে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার রাতারাতি ভাটা দেখা দেয়। আওয়ামী লীগের যুদ্ধকালীন দুর্নীতি এবাং ব্যর্থতা এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে জনগণের উপর স্বৈরতান্ত্রিক নির্যাতন জনগণ থেকে আওয়ামী লীগকে বিচ্চিন্ন করার উপসর্গ সৃষ্টি করে।
    বস্তুত সেই ভয়ে ভীত আওয়ামী লীগ ৭২-এ জনগণের ম্যান্ডেট নেয়ার চিন্তা থেকে বিরত থাকে। অথচ সংবিধান রচনার পূর্বেই জনগণের তরফ থেকে নতুন ম্যান্ডেট লাভ করা ছিল অত্যাবশ্যকীয়। অতএব, এ কথা নির্দ্বিয়াই বলা চলে যে, ৭২-এ আওয়ামী লীগের এমন কোন বৈধ অধিকার ছিল না যাতে করে তারা দেশ ও জাতির উপর একটি মনগড়া সংবিধান আরোপ করতে পারে। তবুও তারা তা জবরদস্তি করেছে। দেশের জনগণের চীৎকার, প্রতিবাদ কোন কাজেই আসেনি।

এটা তাদের দুঃসাহস কিম্বা ঔদ্ধত্য ছিল না, আওয়ামী লীগের এই আচরণ ছিল অনুগত তল্পীবহকের প্রভুর আদেশ-নির্দেশ পালন করার বাধ্যতা বা ব্যস্ততা। কারণ, এ কথা সর্বজনবিদিত যে, বাংলাদেশের ৭২-এর সংবিধান প্রণেতা হচ্ছে স্বয়ং দিল্লীর শাসক চক্র। ৭২-এর সংবিধানের উৎস তাই বাংলাদেশের জনগণ নয়, সম্প্রসারণবাদী এবং সাম্প্রদায়িক ভারতীয় শাসক চক্রই হচ্ছে মূল উৎস।
এভাবেই যুদ্ধোত্তর বিধ্বস্ত বাংলাদেশের কোটি কোটি বুভুক্ষ মানুষের জন্য অন্নবস্ত্রের পূর্বেই রাষ্ট্রীয় মূলনীতি এসে মাথায় চেপে বসে। এই ৪ মূলনীতি আরোপ করার মধ্য দিয়ে দিল্লীর কর্তারা তাদের মূল লক্ষ্যই স্থির রেখেছে কেবল। কারণ ভারতীয় সংবিধানও ৪ মূলনীতির ব্যতিক্রম নয়। তাই বাংলাদেশের সংবিধানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ সন্নিবেশিত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে মূলত ভারতেরই একটি অংগরাজ্য হিসেবে সুক্ষ্মভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং নীতির গোপন সূত্রে বেঁধে দেয়া হয়েছে।
    কারণ এ যুগে তো আর দেশ দখল করে রেখে অংগরাজ্যে পরিণত করা হয় না, তথাকথিত নীতির জালেই প্যাঁচিয়ে রাখা হয় কোন দেশকে। শক্তিশালী দেশসমূহ দূর্বল দেশ ও জাতিকে বিভিন্ন চুক্তি এবং শর্তে আবদ্ধ করে রাখে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যই ছিল বাংলাদেশকে এমন কিছু দাসত্বমূলক চুক্তি এবং শর্তের মধ্যে বন্দী করে রাখা। ৭২ এর সংবিধান সেই সকল দাসত্বমূলক চুক্তির মধ্যে একটি এবং অন্যতম ।
    এবার তাহলে দেখা যাক, ৭২-এ প্রণীত সংবিধানের ৪মূলনীতি বাংলাদেশের বাস্তবতার সংগে কতখানি সংগতিপূর্ণ। প্রথমে গণতন্ত্র। এখানে সংসদীয় গণতন্ত্রের কথাই বলা হয়েছে। পশ্চিমা ধাঁচের এই সংসদীয় গণতন্ত্র বাংলাদেশের বাস্তবতার মুখে কেবল অচলই নয়, স্বৈরতান্ত্রিকও বটে। সংসদীয় গণতন্ত্র পুঁজিবাদের রাজনৈতিক শ্লোগান। এই সংসদীয় গণতন্ত্র পুঁজিবাদ প্রবর্তিত আমলাতান্ত্রিক প্রশঅসনিক কাঠামোকে বহাল তবিয়তে টিকিয়ে রাখার মূলমন্ত্র।

শোষণ-জুলুম ভিত্তিক সমাজ কাঠামোই হচ্ছে পুঁজিবাদরে ভিত্তি। সম্পদের ব্যক্তি মালিকানায় বিশ্বাসী পুঁজিবাদ তার চরিত্রগত শোষণ-জুলুম অব্যাহত রাখঅর স্বার্থে প্রবর্তন করেছে আমলাতান্ত্রিক প্রশসনিক কাঠামো। এই শোষণমূখী আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামোয় যাতে কেউ কোনরূপ অনিষ্ট সাধন না করতে পারে তার জন্য সংসদীয় নির্বাচনের কাজই হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামোকে ‘নিউ লীজ আফ লাইফ’ প্রদান করা, অর্থাৎ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমলাতান্ত্রিক নতুন জীবন দান করা। এভাবেই সংসদীয় গণতন্ত্র সংসদীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদভিত্তিক শোষণ-জুলুমমূখী আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামোকে ধারাবাহিকভাবে টিকিয়ে রাখে। অন্য কথায়, সংসদীয় গণতন্ত্র পুজিঁবাদী শোষণ-শাসনের ভিতকেই কেবল টিকিয়ে রাখে না, উত্তরোত্তর মযবুতও করে তোলে।
    এ ছাড়াও সংসদীয় গণতন্ত্র সম্পদশালীদেরকেই আইন প্রণয়নকারী সংস্থার প্রতিনিধিত্ব অর্জনে সাহায্য করে। সংসদীয় গণতন্ত্র হচ্ছে বিত্তবানদের গণতন্ত্র, বিত্তহীনদের গণতন্ত্র নয়। সংসদীয় গণতন্ত্রে আইন প্রণয়নকারী সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে বিত্তবান শ্রেণীর লোকেরা নিজেদের স্বার্থ এবং মরযী মাপিক নতুন নতুন আইন প্রণয়ন এবং আইন ভংগেরও বেপরোয়া ক্ষমতার অধিকারী হয়। সমগ্র প্রশাসনই বিত্তবানদের অনুগত তাবেদার হয়ে থাকে। এই ধরনের সমাজ কাঠামোতে কোটি কোটি বিত্তহীন শ্রমজীবী মানুষের যেখানে কর্মসংস্থান হয় না, তারা খুঁজে পায় না এক মুঠো অন্ন, সে সমাজেই মুষ্টিমেয় বিত্তবানের কাছে জমে ওঠে সম্পদের পাহাড় এবং দারুণ স্বেচ্ছাচারিতার সাথে তারা বিভিন্ন আরাম-আয়েশ, ভোগ-বিলাস এবং অনুৎপাদক কর্মকান্ডে বেশুমার অর্থ-সম্পদ অপচয় করে বেড়ায়। সংসদীয় গণতন্ত্রের রাজ্যে এ সকল বিত্তবানের জন্য আইন থাকে নীরব এবং অন্ধ। কারণ আইনের মালিও তারা।
    সংসদীয় গণতন্ত্র এমন একটি ‘মনোহরনী ডাইন’ যা মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং বিত্তহীনদেরকে সংসদীয় নির্বাচনের রঙিন ফানুস উড়িয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল এবং শেয়ার করার জন্য অব্যহত ভাবে প্রলুব্ধ করে বেড়ায়। কিন্তু বিত্তহীনরা আশায় আশায় নিরর্থক ঘুরতেই থাকে কেবল। মরুভূমির ক্লান্ত পথিকের ন্যায় বিত্তহীনরাও ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’ নামক মরীচিকাটির পেছনে ছুটতেই থাকে। গণতন্ত্র বিত্তহীনদের কাছে ধরা দেয় না।
    কোটি কোটি মানুষের ভুখা-নাঙ্গা এবং অবহেলিত রেখে পুঁজিবাদ সংসদীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজের মুষ্টিমেয় বিত্তবানের হাতে যাবতীয় সম্পদ এবং উৎপাদনযন্ত্রের মালিকানা কেন্দ্রীভূত করে-এটাই পুঁজিবাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য চরিত্রগত বৈশিষ্ট। এমন বৈশিষ্টসম্পন্ন একটি রাজনৈতিক দর্শনকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতির প্রথম স্তম্ভ করার মধ্য দিয়ে জনদরদী দেশদরদী নামে পরিচিত শেখ মুজিব এবং তার আওয়ামী লীগ কি ভাবে বাংলার কোটি কোটি দুঃস্থ, শোষিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন? পুঁজিবাদী সমাজ কাঠামো বহাল রেখে যারা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিত নির্যাতিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানের স্বপ্ন দেখেন, কিম্বা ওয়াদা করেন, তারা হয় অজ্ঞ না হয় তারা চরম প্রতারক।
    এতো গেল আওয়ামী লীগ কর্তৃক প্রনীত ৪ রাষ্ট্রীয় মূলনীতির প্রথম স্তম্ভ সম্পর্কে কিছু কথা।
    এবারে ৪ নীতির দ্বিতীয় স্তম্ভকে আলোচনায় আনা যেতে পারে। দ্বিতীয় স্তম্ভ হচ্ছে সমাজতন্ত্র। ভাল কথা। সমাজতন্ত্রের বিস্তারিত সংজ্ঞা দেয়ার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। সমাজতন্ত্র হচ্ছে পুঁজিবাদ বিরোধী দর্শন। বস্তুবাদভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক দর্শন পুঁজিবাদের কবর রচনার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আপোসহীন লড়াই করার মধ্য দিয়ে যেক্ষেত্রে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হয়, সেক্ষেত্রে একই রাষ্ট্রে পুঁজিবদী দর্শন এবং সমাজতান্ত্রিক দর্শন একাই সংগে কি করে রাষ্ট্রীয় মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে? শেখ মুজীব এবং আওয়ামী লীগের দাপটে বাঘ-মহিষকে যেমন এক ঘাটে জল খাওয়ানোর চেষ্টা চলেছে, ঠিক তেমনি হয়ত পুঁজিবাদ এবং বেচারা সমাজতন্ত্রকে একইভাবে একই ঘাটের জল গিলানোর অপচেষ্টা চলেছিল আর কি! উপরোক্ত দু’টি দর্শনের ভিন্ন ভিন্ন উৎপাদন সম্পর্ক রয়েছে। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, উৎপাদন যন্ত্রের ব্যক্তি-মালিকানাভিত্তিক সম্পর্কের অধিকারী হচ্ছে পুঁজিবাদ। আর উৎপাদনযন্ত্রের সমষ্টিগত কিম্বা রাষ্ট্রীয় মালিকানা ভিত্তিক সম্পর্কের অধিকারী হচ্ছে সমাজতন্ত্র। প্রথমটি ব্যক্তির হাতে অর্থ-সম্পদ কেন্দ্রীভূত করে আর দ্বিতীয়টি সমষ্টির মধ্যে অর্থ-সম্পদের বন্টন করে এবং উৎপাদনযন্ত্রের ব্যক্তি-মালিকানার ভিত সম্পূর্ণভাবেই উপড়ে ফেলে। সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী এবং বৈরী সম্পর্কের এই দুটি দর্শনকে কোন ব্যক্তি কিম্বা গোষ্ঠী বিশেষের জনপ্রিয়তার দাপটে বাঘ-মহিসের মত একই ঘাটে জল গিলানো সম্ভবই নয়। কিন্তু কেউ যদি তা সম্ভবে পরিণত করার প্রয়াসও চালায় তাহলে অবশেষে এ একই ঘটনার অবতারণা ঘটবে যা মুজীবকে কেন্দ্র করে ঘটেছে ১৫ই আগষ্ট ১৯৭৫ সনে। পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্রের মধ্যকার সম্পর্ক ঠাট্টা-তামাশার সম্পর্ক নয়, সে সম্পর্ক হচ্ছে রক্তক্ষয়ী আপোসহীন সম্পর্ক-একে অপরের নিঃশেষের মধ্যে টিকে থাকার সম্পর্ক।
    রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে একই সাথে পুঁজিবাদ প্রবর্তিত সংসদীয় গণতন্ত্র এবং মার্কসবাদ প্রবর্তিত সমাজতন্ত্র এই দুই বিপরীতমুখী নীতির সংমিশ্রণের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব এবং তার আওয়ামী লীগ তাহলে কি লক্ষ্য অর্জন করতে চেয়েছিল? আমার মতে তাদের দু’টি প্রধান লক্ষ্য ছিল। প্রথমত সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে রাতারাতি একটি বিত্তবান গোষ্ঠী সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত রাখা। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে- সংসদীয় গণতন্ত্রের অধীনে কোটি কোটি ভুখানাঙ্গা মানুষ এবং শিক্ষিত ও বেকার যুবক শ্রেণী ক্রমশ লাঞ্চনা ও বঞ্চনার কশাঘাতে বিদ্রোহী হয়ে উঠে যাতে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার দাবীতে সশস্ত্র বিপ্লবের পথে ধাবিত না হতে পারে, সে জন্য কেবল প্রতারণার খাতিরেই রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে ‘সমাজতন্ত্র’কে একটি স্তম্ভ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। এটা ছিল নিছক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। সমাজতন্ত্র দিয়ে সমাজতন্ত্র ঠেকানোর পুরানো অপকৌশল। তার রাষ্ট্রীয় মূল নীতির সংগে সমাজতন্ত্র জুড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব তাৎক্ষণিক ফায়দা বেশ লুটে নিয়েছে। পাকিস্তানী পুঁজিপতি এবং কিছু কিছু উঠতি বাঙালী পুঁজিপতির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শিল্প, কল-কারখানাগুলোকে বিনা পরিকল্পনায় রাতারাতি রাষ্ট্রীয়করণ করার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গ সংগঠনসমূহ মূলত বেপরোয়া লুটতরাজ করার সরর্ণ সুযোগ লাভ করেছিল। রাষ্ট্রীয়করণ করার নামে আওয়ামী লীগ ঘেঁষা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকরণ করা হয়েছিল। শিল্প-কলকারখানাসমূহের লুটতরাজের প্রতিযোগিতা বর্বর চেঙ্গিস-হালাকু খানদেরকেও হার মানিয়েছে। শাসক কর্তৃক নিজ দেশের এবং জাতির সম্পদ বেপরোয়া লুন্ঠনের দৃশ্য জাতি এই সর্বপ্রথম প্রত্যক্ষ করল। এখানে যে বিষয়টি অত্যন্ত বিস্ময়কর তা হচ্ছে, পুঁজিবাদী ভারত বাংলাদেশের জনগণের জন্য সমাজতন্ত্র উপহার দেবে এমন একটি দুরাশা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব করলই  বা কি করে? আদৌ কি তারা তা করেছে? না করলেও ভারত থেকে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গুটিয়ে আনার সময় সমাজতন্ত্রের নামাবলী জড়িয়ে তো তারা এসেছে বাংলাদেশের মস্‌নদে।

   



এতো হইলো রাষ্ট্রীয় মূলনীতির দ্বিতীয় স্তম্ভের কিছু কথাবার্তা।

    এবার তৃতীয় স্তম্ভটির কিছু রহস্য উদঘাটন করা যাক। আওয়ামী লীগের ৪ রাষ্ট্রীয় মূলনীতির তৃতীয় স্তম্ভ হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। গভীর ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতি সম্পন্ন বাংলাদেশের জনগণের উপর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ আরোপ করার বিষয়টিকে মোটেই হালকা করে দেখার কোন অবকাশ নেই। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত বাংলাদেশের জনগণের গভীর ধর্মীয় আবেগ-অণুভূতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভাবে ওয়াকিফ্‌হাল থাকা সত্বেও বাংলাদেশের উপর ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবদ’ চাপিয়ে দেয়ার মত এতবড় একটি ভুল পদক্ষেপ নিতে গেল কোন সাহসে? ভারতেরই অনুগত তাবেদার আওয়ামী লীগ সরকারের মাথায় এতবড় একটি ভুলের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে ভারত কি এভাবে আওয়ামী লীগেরই রাতারাতি ধ্বংস কামনা করেছিল? যদি উপরোক্ত প্রশ্নের একটিও সঠিক না হয়ে থাকে তাহলে বাংলাদেশের জনগণের উপর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ চাপিয়ে দেয়ার অন্তরালে ভারতের আসল উদ্দেশ্য কি ছিল? বাংলাদেশের জনগণ কেবল ধর্মপ্রাণই নয়, এ মাটির শতকরা ৯০ভাগেরও অধিক জনগণ পবিত্র ইসলাম ধর্মের অনুসারী। সংখ্যাগরিষ্ঠ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে পবিত্র ইসলাম একটি সার্বিক জীবন সত্তা, কেবল একটি গতানুগতিক ধর্ম নয়। ইসলাম ভিত্তিক গড়ে ওঠা এই সার্বিক জীবন সত্তা বোধকে রক্ষা করার জন্য এদেশের এই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিতেও কুন্ঠাবোধ করে না। প্রতিবেশী ভারত এইতহাস সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কোন কারণই নেই। এতো কিছু অবগতির পরেও ভারত আজ্ঞাবহ আওয়ামী লীগকে বাধ্য করেছে ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজা বহন করতে। এর স্পষ্ট জবাব হচ্ছে ভারত মোটেই ভুল করেনি। আওয়ামী লীগের উপর ধর্মনিরপেক্ষতা চাপিয়ে দিয়ে ভারত আওয়ামী লীগেরও সর্বনাশ কামনা করেনি। ভারতের হিসেবে বিন্দুমাত্র ভুল নেই। আধ্যাত্মিকতার দিক দিয়ে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে ভারতের প্রধান শত্রুকে ভারত চিহ্নিত করতে মোটেও ভুল করেনি। দর্শনগত ভাবে মার্কসবাদ ভিত্তিক সমাজতন্ত্রও তাদের শত্রু, কিন্তু সে শত্রু তেমন জোরালো নয়। সে শত্রু আধ্যাত্মিকতার দিক দিয়ে শূণ্য এবং রাজনৈতিগত ভাবে দুর্বল। ভারতীয় পুঁজিবাদের দাপট এবং ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা এবং নৈতিকতার জোর দিয়ে তারা সমাজতন্ত্র নামক শত্রুটির শ্বাসরুদ্ধ করে রাখতে সক্ষম হবে।
    কিন্তু যে শত্রুটির ভয়ে তার প্রকম্পিত তাকে তো পুঁজিবাদ, কিম্বা পৌত্তলিকতাবাদ ভিত্তিক ঠুনকো আধ্যাত্মিকতার জোরে কোনক্রমেই বশ করা যাবে না। তৌহীদবাদ ভিত্তিক পবিত্র ইসলামকই হচ্ছে ভারতের প্রধানতম ভীতি। ইসলামের ঐতিহ্যবাহী নীতি-নৈতিকতা, ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতি, মূল্যবোধ এবং আশ্চর্যজনক আধ্যাত্মিকতার সম্মুখে ভারত যে কোন এক সময় নিরুপায় হতে বাধ্য হবে সে তত্ত্ব ও রহস্য আমরা অনুভব করতে সক্ষম না হলেও হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের ধারক-বাহক ভারতীয় শাসকচক্রের মোটেও অজানা নয়। বিশাল ভারতের বিভিন্ন সংকটের মধ্যে সাংস্কৃতিক সংকট হচ্ছে একটি অন্যতম প্রধান সংকট। জাতীয় এবং আন্তর্জাহিক ক্ষেত্রে ভারত নীতিগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রচার করলেও ভারতীয় সমাজ জীবনের বুনোট এখনো হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের অভিশপ্ত বর্ণবৈষম্যের প্রভাব মুক্ত মোটেও নয়। হিন্দু ধর্মের এই বর্ণবৈষম্য অথবা ‘জাত ও শ্রেনী’ ভেদ-এর কারণে প্রায়শই ভারতের বুকে যে উদ্‌গীরণ ঘটে, তা অগ্নিগিরির লাভার চেয়েও ধ্বংসাত্মক। এ ধরনের উদ্‌গীরণ ভঅরতীয় জীবনের অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ছক তছনছ করে দেয়। ভারতের ৭৫ কোটি জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও ভারত হিন্দু ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে ঘোষণা না করে ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ অবলম্বন করতে বাধ্য হলো কেন? কারণটা সহজ। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের চাপের মুখে ভারতকে যদি ১৯৪৭ সালে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হতো তাহলে তাতে আপত্তির কিছুই থাকত না। কিম্বা ভারতে বসবাসরত ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের তেমন কিছু করারও থাকত না। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজ তাতে বরং খুশীই হতো। কিন্তু তা করা হয়নি কেবল আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য। কারণ ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র  হিসেবে ঘোষণা করা হলে ভারতের জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষা এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারত। ভারতের বাইরে কোন হিন্দুরাষ্ট্র নেই, তাই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বন্ধু হিসেবে সহজে কাউকে নীতিগতভাবে পেত না। দ্বিতীয়ত, ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে ঘোষিত হলে ভারতের আভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক সংকট তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভবনা থাকত এবং সে কারণেই ভারত জাতীয়ভাবে থাকত বিধ্বস্ত এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে হয়ে পড়ত বন্ধুহীন। এই দ্বিমুখী সংকট উত্তরণের লক্ষ্যেই ভারত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজকে নাখোশ করেও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকেই রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ঘোষনা করতে বাধ্য থেকেছে। ভারতীয় শাসক চক্র এ কথা ভাল করেই জানে যে হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের জাত-শ্রেণীভেদের বিষবাষ্প কেবল তথাকথিত ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ ঘোষনার প্রলেপ দিয়ে মুছে ফেলা যাবে না। তবু তো বাহ্যত চোখ লজ্জা থেকে কিছুটা হলেও নিস্তার পাওয়া গেল। দেশের অভ্যন্তরে হিন্দুধর্মের জাত-শ্রেণীভেদের অনলে দেশ ও জাতি ঝুলতে থাক, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’-এর আনুষ্ঠানিক লেবাস দিয়ে বন্ধু সন্ধানে তো কোন বেগ পেতে হবে না। ভারতের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হওয়ার মূল ব্যাপারটা এখানেই। তবে ধর্মনিরপেক্ষতার’ আড়ালে ভারত যে একটি সাম্প্রদায়িক হিন্দুরাষ্ট্র এ সত্য আজ বিশ্বে কার না জানা?
    এই হিন্দু ভারত হিন্দু ধর্মের জাত-শ্রেণী ভেদের বিপরীতে ইসলামী সাম্যবাদকে যমের মতই ভয় পায়। ভয় তো পাওয়ারই কথা, কারণ জাত-শ্রেণী ভেদের কঠিন অভিশাপের বিরুদ্ধে নির্যাতিত মানুষ বিদ্রোহ যে একদিন করবেই তা ধ্রুব সত্য এবং ইসলামের সাম্যবাদী নীতি ভারতরে নির্যাতিত মানব গোষ্ঠীকে আকস্মিক ভাবেই ইসলামের পতাকাতলে সমবেত করতে পারে। বাংলাদেশের ১১ কোটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১০ কোটিই হচ্ছে ইসলাম ধর্মের অনুসারী।
    তাছাড়া, বাংলাদেশের বিস্ময়কর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। বাংলাদেশের মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা নেই বলেই অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা কখনই নির্যাতিত কিম্বা সামাজিক ভাবে সংকটাপন্নও হচ্ছে না। তেমন একটা কিছু হলেও না হয় আধিপত্যবাদী ভারতীয় চক্র বাংলাদশের উপর সরাসরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার একটা সুযোগ লাভ করত। তেমন তো কোন সুযোগ নেই, কিন্তু বাংলাদেশের উপর ভারতের কর্তৃত্ব কোন না কোন উপায়ে তো প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলে সামরিক কর্তৃত্ব স্থাপনের তেমন কোন প্রয়োজন পড়বে না। সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে ভারতের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বাংলাদেশের উপর অটোম্যাটিক প্রতিষ্ঠা লাভ করে যাবে। বাংলাদেশের মূল সংস্কৃতি হচ্ছে ইসলাম ভিত্তিক, কারণ ইসলামই হচ্ছে শতকরা ৯০ ভাগ জনগণের ধর্ম এবং ধর্মকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক জীবন। তাই ইসলাম ধর্মের গভীর আবেগ অনুভূতির শিকড় থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণকে বিচ্ছিন্ন করতে হলে প্রয়োজন এমন একটি দর্শন, যা মানুষকে ইসলাম ধর্মের কঠিন অনুশাসন মেনে চলার পথে নিরুৎসাহ করে তুলবে। অপরদিকে, তরুণ-যুবক শ্রেণীকে প্রলুব্ধ করবে এক বাঁধনহারা জীবন যাপনের এক ফাঁদে পা দিতে। ধীরে ধীরে ধর্মীয় অনুশাসনের অনুপস্থিতি তরুণ-যুবক শ্রেণীকে বেপরোয়া আরম-আয়েশ, ভোগপূর্ণ উচ্ছৃংখল জীবন পদ্ধিতর দিকে ঠেলে দিলেই তারা হয়ে পড়বে শিকড়হীন পরগাছারমতন। তাদের আবেগ-অনুভূতি সমাজের গভীরে প্রোতথিত থাকবে না বলেই তারা হবে ভাসমান উচ্ছৃংখল জনগোষ্ঠী। তখন তারা আ ইসলামের ঐতিহ্যে গর্ববোধ করবে না এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের জোয়ারে গা ভাসিয়ে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। কারণ তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ তরুণ-যুবকদেরকে ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে এবং ধর্মীয় অনুভূতি একেবারেই মিটিয়ে দেয়া। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ধর্মহীনতারই লেবসী নাম। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হচ্ছে বস্তুভিত্তিক দর্শনের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভংগী। এই দৃষ্টিভংগী চূড়ান্তভাবেই বস্তুকেন্দ্রিক এবং অধিবিদ্যামুক্ত। এই দৃষ্টিভংগীর আওতায় স্রষ্টা কিম্বা পারলৌকিক কোন শক্তির কোন স্থান নেই। সুতরাং ধর্শেরও কোন স্থান নেই। মুসলিম তরুণ-যুব  গোষ্ঠি এই নাস্তিক্যবাদী তত্ত্বে প্রভাবিত হলে তারা স্বেচ্ছায়ই ইসলাম বিদ্বেষী হয়ে উঠবে এবং তাহলেই ভারতীয় শাসকচক্রের গোপন স্বপ্ন বাসতবায়িত হয়ে যায়- অর্থাৎ বাংলাদেশের উপর ভারতীয় সংস্কৃতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদই হচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধে একটি সুকৌশল ঠান্ডা যুদ্ধ। ভারত তাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষবাদ জুড়ে দিয়ে মোটেও ভুল করেনি, অথবা নিছক লক্ষ্যহীন ভাবেই ধর্মনিরপেক্ষবাদ জুড়ে দেয়নি। এতো গেল বাংলাদেশের রাষ্টীয় ৪ মূলনীতির তৃতীয় স্তম্ভ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা। ।
    সর্বশেষ আসে জাতীয়তাবাদ প্রসংগ। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে জাতীয়তাবাদ জুড়ে দেয়ার পেছনেও ইসলাম বিদ্বেষী মতলব রয়েছে। কারণ জাতীয়তাবাদও ধর্মনিরপেক্ষতাবদ- এর ন্যায়ই জাতিকে ধর্মবিমুখ করে তুলতে সহায়তা করে এবং ভাষা, কৃষ্টি এবং জাতীয় ঐতিহ্য ভিত্তিক মনমানসিকতা গঠন করে। এহেন মনমানসিকতা মানুষকে অহেতুক অহংকারী করে তোলে এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে জাত্যাভিমান হিংসা বিদ্বেষের জন্ম দেয়। এই জাত্যাভিমান ইসলামী সাম্যবাদী চেতনার পরিপন্থী। তা ছাড়া ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ বাংলাদেশে বসবাসরত মুসলিম জনগণের সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহ্যগত ধ্যান-ধারণার প্রতিফলনও সঠিক অর্থে ঘটায়। বাংলাদেশের মুসলিম বাঙালী এবং পশ্চিম বাংলার হিন্দু বাঙালীর সাংস্কৃতিক চেতনার উৎসস্থলকে এক ও অভিন্ন করে দেখার কোন অবকাশ নেই। দুই বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের রূপ বাহ্যত এক মনে হলেও সাংস্কৃতিক চেতনার উৎস বিপরীতমুখী। স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চেতনার উৎস হচ্ছে ‘তৌহীদবদ’ যা ইসলাম ধর্ম ভিত্তিক। অপরদিকে, পশ্চিম বাংলার জনগণের সাংস্কৃতিক চেতনার উৎস হচ্ছে ‘পৌত্তলিকতাবাদ’, যা হিন্দুধর্ম ভিত্তিক। সুতরাং বাঙালী ‘জাতীয়তাবাদ’ পশ্চিম বাংলার বাঙালী ভাই-বোনদেরকে যতটা অনুপ্রাণিত করবে বাংলাদেশের মুসলিম বাঙালীকে ততটা অনুপ্রাণিত করবে না। কারণ ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক চেতনায় পৌত্তলিকতাবাদ-এর প্রভাব অধিক। এই দর্শনগত পার্থক্যের কারেণে উভয় বাংলার ভাষা, খাদ্য, পোশাক সহ সংস্কৃতির বাহ্যিক দিকের একটি সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও উভয়ের মধ্যে বিরাজ করছে এক সুকঠিন প্রাচীর, যা কখনো তাদেরকে এক হতে দেবে না। ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদরে মধ্য দিয়ে সেই প্রাচীর ভেঙে চুরমার করা সম্ভব হবে না, তবে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটা অংশকে সেই প্রাচীর টপকিয়ে হয়ত ওপাড়ের সাথে একাত্ম করা যাবে। কিন্তু তাতে ফল হবে বিপরীত। এপারের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনোগাষ্ঠীর মধ্যে জন্ম নেবে আজন্ম অবিশ্বাস এবং রেষারেষি। ভারতীয় শাসকচক্র মূলত উভয় বাংলা মধ্যে এই স্থায়ী রেষারেষিই কামনা করে। যার ফলে সবকিছু জেনেশুনেই ভারতীয় শাসকচক্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতির ৪র্থ স্তম্ভ হিসেবে ‘বাঙালী জাতীয়তাবদ’কে জুড়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের কতিপয় বুদ্ধিজীবী ‘মুসলিম বাঙালী’ এবং ‘হিন্দু বাঙালীর’ সংস্কৃতিগত পার্থক্য উপলব্ধি করতে না চাইলেও পশ্চিম বাংলার বু্দ্ধিজীবি সম্প্রদায় কিন্তু পার্থক্যটা অনেক পূর্ব থেকেই জানেন। এখনে একটা উদাহরণ দিলেই ধারণাটা কিছু পরিষ্কার হবে বলে আমরা বিশ্বাস। উভয়েই একই হিন্দুধর্মের লোক হওয়া সত্ত্বেও যখন উচ্চবর্ণ হিন্দু নিম্ববর্ণ হিন্দু হরিজনকে জীবন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে হত্যা করে, সেই উচ্চবর্ণ হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে মুসলিম বাঙালীদের গ্রহণযোগ্যতা আদৌ থাকতে পারে কি? কেন পারে না? সে উত্তর বাংলাদেশের মুসলিম বুদ্ধিজীবিরা দিতে লজ্জাবোধ করলেও পশ্চিম বাংলার বুদ্ধিজীবিরা অনেক পূর্বেই সে প্রশ্নের উত্তর যুগে যুগে দ্বাথীহীন কন্ঠেই দিয়েছে।
    নিজেদের সত্যিকার পরিচয় প্রদান করতে যে জাতি হীনমন্যতার শিকার হয়, সে জাতির অস্থি-মজ্জা শুকিযে যেতে এক শতাব্দীর অধিক প্রয়োজন হয় না। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি জনগোষ্ঠর মধ্যে এই ‘সত্ত্বা’র সংকট এতই তীব্র রূপ ধারণ করেছে যে, আজ তারা ‘নিজ সত্তা’ প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত। এ ধরনের আচরণ মুক্তবুদ্ধি কিম্বা কোন বাহাদুরীর লক্ষণ মোটেও নয়, বরং এটা হচ্ছে আত্মপরিচয় দনে হীনমন্যতা এবং আত্ম প্রবঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ। পরগাছাবৃত্তি প্রগতিশীলতার লক্ষণ নয়। বাস্তবতার স্বীকৃতির মধ্যেই প্রগতি। তাই ‘জাতীয়তাবাদ’ সম্পর্কে আমার মতামত হচ্ছে বাংলাদেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠী আজ এই বাস্তবতারই স্বীকৃতি চায়-কারো কোন করুণা ভিক্ষা করে না। সংক্ষেপে রাষ্ট্রীয় চার নীতির ‘পোস্ট মরটেম’ এখানেই শেষ।

    আওয়ামী লীগ কর্তৃক প্রনীত বাংলাদেশের ৭২-এর সংবিধানকে যারা দেশ ও জাতির জন্য পবিত্র আমানত বলে মনে করেন, তাদে কাছে একজন মুক্তিযুদ্ধা হিসেবে আমার সবিনয়ে আশ্বাসবানী দেশ ও জাতির জন্য আপনারা ব্রাহ্মণ্যবাদী ভরতীয় শাসকচক্রের তরফ থেকে যে সকল পবিত্র আমানত! ১৯৭১ সন থেকে বহন করে নিয়ে এসেছেন, তার মালিকানা নিয়ে আপনাদের সাথে বাংলাদেশের তৌহিদী জনগণের কোনদিনই প্রতিযোগিতা হবে না। তবে রাষ্ট্রীয় মূলনীতির ৪ স্তম্ভ বিশিষ্ট ইমারতটির উপর যে একটি নির্ভরশীল এবং স্থায়ী ছাদ নির্মাণের প্রয়োজন ছিল, সে বিষয়টি আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কার উপর ছেড়ে দিয়েছিল-ভারত না রাশিয়ার উপরে?
    জনমত এ বিষয়ে বিভ্রান্ত। ছাদহীন স্তম্ভের উপরে আধিপত্য বিস্তারের উন্মাদশক্তি মাত্রই ছাদ বিছাতে আগ্রহী থাকবে। এটাই তো স্বাভাবিক। হলোও তাই, হচ্ছে ও তাই এবং হবেও তাই। আর তাই তো কখনো ভারত, কখনো রাশিয়া এবং কখনো আমেরিকার ইচ্ছা মাফিক লীলাখেলা চলছে আমাদের ৪টি স্তম্ভের অভ্যন্তরে।
    একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা অবুঝের মত কেবল ৪টি স্তম্ভই ধার করলাম, নিরাপদ একটি বাসগৃহ তৈরি করার প্রস্তুতি নিলাম না।
    দেশের কোটি কোটি নির্যতিত মানুষ এবং তৌহিদী জনগণ আজ সেই নিরাপদ একটি বাসগৃহই কামনা করে, বিদেশী প্রভুদের কাছ থেকে পাওয়া স্তম্ভবিশিষ্ট ইমারত নয় ।

সপ্তম অধ্যায় : স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি ও ইসলাম

আওয়ামী লীগের ৬ দফা ভিত্তিক স্বায়ত্ত শাসনের দাবীর অন্তরালেই স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ লুকায়িত থাকলেও ৬দফার প্রণেতারা এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এক জিনিস নয়। ৬দফার অভ্যন্তরে স্বাধীনতা আন্দোলনের সুর ছিল নেহায়েতই প্রচ্ছন্ন এবঙ আন্দোলনের ধাপে ধাপে সে লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পরিকল্পনা হয়ত বা ছিল। তবে আওয়ামী লীগের ৬দফাকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কখনো স্বাধীনতার আন্দোলন হিসেবে সচেতনভাবে মনে করেনি, কিন্তু দেশের সংগ্রামমুখর জনগন ৬ দফার আন্দোলনকে ১ দফার আন্দোলন হিসেবেই যে গণ্য করত এ কথা সত্য। জনগণের কাছে স্বায়ত্তশাসনের দাবীটি স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকরার দাবী হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে। পাকিস্তানী শাসক-শোষকের কাছেও ৬ দফা মুলত এক দফারই শামিল ছিল এবং সে কারণেই তারা ৬দফাকে ৭০-এর নির্বাচনের পরেও মেনে নিতে চায়নি। এটা কিন্তু শাসক গোষ্ঠীর নিছক অনীহাই ছিল না, এটাই ছিল তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত-যার সুস্পষ্ট বহি:প্রকাশ ঘটে ৭০-এর সেই ভয়াল ২৫শে মার্চ রাতে। মরহুম জননেতা জনাব আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠর ষড়যন্ত্র আগেভাগেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই ১ লা মার্চ তারিখেই তাঁর পল্টন ময়দানের জনসভায় জনগণের কাছে ১ দফা ঘোষণা করেছিলেন। সেই জনসভায় ‘বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ এই শ্লোগানটিই প্রাধান্য লাভ করেছিল। তাই পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানী পুজিঁবাদী শোষণ থেকে মুক্ত করে বাংলাদেশ হিসেবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তোলার স্বপ্ন সচেতন বাঙালীদের মধ্যে অবশ্যই বিরাজ করছিল। তবে সেই স্বাধীর বাংলাদেশের রূপরেখা কি হবে সে সম্পর্কে সুষ্পষ্ট ধ্যান-ধারণা তাদের মধ্যে ছিলনা। জনাব সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেম ছাত্র লীগের সচেতন ক্ষুদ্র একটি অংশ বিশেষ এবং বামপন্থী সংগঠন সমূহের চিন্তা চেতনায় পূর্ব পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য স্থির ছিল সে কথা আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি। স্বাধীনতা অর্জনের পরে উক্ত চেতনাকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হিসেবে জাতির উপর আরোপিত করা হয়েছে, যদিও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী রাজনৈতিক, সামাজিক শক্তিসমূহ এবং সংগ্রামী জনগণ উক্ত চেতনা সম্পর্কে মোটেই ওয়াকিফহাল ছিলনা। তথাকথিত ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ লালন করার জন্য সক্রিয় উদ্যোগ কিংবা প্রতিক্রিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ছিল না বল মুষ্টিমেয় লোকের চেতনাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হিসেবে পরিচিত এবং গ্রহন করানোর সকল প্রয়াসই আজ নিষ্ফল রূপ ধারণ করছে। সঠিক এবং আদর্শিক চেতনাহীন ’৭১-এর যুদ্ধটিই প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের রূপ না নিলেও এটি যে নি:সন্দেহে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের রূপ ধারণ করেছিল এ বিষয়টি দিবালোকের মতই উজ্জ্বল। সত্য জনগণের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার আবেগ-অনুভূতি, সত্য তাদের যুদ্ধে অংশ গ্রহণের সক্রিয়তা,স্বত:ষ্ফূর্ততা এবং আন্তরিকতা। এ সত্যগুলো কোন অশুভ শক্তির ষড়যন্ত্রের ফলে মোটেই মিথ্যা কিংবা ভুলে রূপান্তরিত হতে পারে না। বিদেশী ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান রাখা এবং সতর্কতা অবলম্বন করার অর্থ এ নয় যে, জনগণের স্বত:ষ্ফুর্ত আবেগ ও অনুভূতির প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করা কিংবা তা অস্বীকার করা। এই হিসেবে যারাই গরমিল করেছে তারাই প্রকৃত পক্ষে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে তাদের এই ভুলের অর্থ বোধ হয় এ দাঁড়ায় না যে, তারা বাঙালী জনগণের সার্বিক স্বার্থের বিরুদ্ধে ছিল। তারা বাংলাদেশের জনগণের জন্য স্বাধীনতা চেয়েছে কোন বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপ ব্যতীতই। বিশেষ করে বাংলাদেশের ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশ ভারতের হস্তক্ষেপ করাকে তারা স্বাধীনতা নয়, গোলামীরই নতুন এক রূপ হিসাবে বিবেচনা করত। স্বাধীনতা যুদ্ধ বিরোধী বলে যারা পরিচিত তারা সকলেই কম-বেশী ভারত বিরোধী হিসেবেই অধিক পরিচিত। এদের ভারত বিদ্বেষী মনোভাব কোন নতুন উপাদান নয়। ভারত বিভক্তির অনেক পূর্ব থেকেই ‘অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস’ এবং ‘মুসলীম লীগ’- এর মধ্যকার তীব্র দ্বন্দের কারণেই ঐ বিদ্বেষ- এর বীজ অঙ্কুরিত হতে থাকে। ইতিহাসের দীর্ঘ জটিল পথ বেয়ে বেয়ে বিদ্বেষের অংকুর মহীরুহে পরিণত হয়েছে এবং আজ কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে সংঘর্ষের আনুষ্ঠানিক কোন মহড়া না চল্‌লেও উপরোক্ত দল দুটির সংঘর্ষের ফলে জন্ম নেয়া ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে তা তীব্রভাবেই বিরাজমান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সেই বিদ্বেষেরই একটি নতুন বিষ্ফোরণ একটি নব সংস্করণ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শুরু থেকেই ভারতীয় হস্তক্ষেপ বিদ্যমান ছিল এই সন্দেহে ভারত বিদ্বেষী রাজনৈতিক দলগুলো তাই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী সাধারন মুক্তিযুদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ না হয়েও যুদ্ধ করেছে এই লক্ষ্যে ‘যে কোন মূল্যে দেশ স্বাধীন করতে হবে’। যে কোন মূল্যে অর্জিত স্বাধীনতা যে নিজেদের ভোগের বাইরে চলে যেতে পারে এ ধারণা মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল না। প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের সাহায্য-সহযোগিত স্বাধীনতার রূপ ও স্বাদ পাল্টে দেয়, স্বাধীনতা বিনষ্টও করে দেয় এ সচেতনতা সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল না। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এবং ভারতীয় চক্রের মধ্যকার ষড়যন্ত্র সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের জানারও কথা ছিল না। তারা হানাদার বাহিনীকে অত্যাচার করতে দেখেছে, অত্যাচারিত হয়েছে বলে আত্মরক্ষার্থেই রুখে দাঁড়াতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়ে পড়েছে। তাদেরকে আওয়ামী লীগ নেতারা বুঝিয়েছেন ‘আগে দেশ, পরে ধর্ম’, দেশ রক্ষা করতে না পারলে ধর্মও রাক্ষা করা যাবে না। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ধর্ম রক্ষা করার চেয়ে দেশ রক্ষা করার বিষয়টি প্রধান্য লাভ করে।
অপরদিকে, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অংশগ্রহনকারীদের সাধারণ জনগনও এই বিরুদ্ধবাদীদের আসল উদ্দেশ্য জানতে সক্ষম হয়নি। তাদেরকে বুঝানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের নাম করে ভারতই প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশকে দখল করে নিতে চায়। মুক্তিযুদ্ধ ভারতেরই একটি গভীর ষড়যন্ত্র মাত্র। ভারত দেশ দখল করে নিলে বাংলাদেশের মাটি থেকে ইসলাম নিশ্চিন্ন হয়ে যাবে। ধর্মই যদি না থাকে, তাহলে দেশ দিয়ে কি হবে। কাফির হয়ে কাফিরদের অধিনে বেঁচে থাকার চেয়ে ঈমানের সাথে লড়াই করে মুসলমান হিসেবে শাহাদাত বরণ করা অধিক শ্রেয়। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে রাজাকার, আল-বদর এবং আশ-শামস হিসেবে অংশগ্রহণকারী সাধারণ যোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করার তুলনায় ধশক্য রক্ষা করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছে। তারা এ কথা হয়ত বুঝত না যে, নির্যাতনকারীদের পক্ষে যুদ্ধ করে ইসলাম ধর্ম রক্ষা করা যাবে না। পুঁজিবাদী পাকিস্তানকে টিকিয়ে রেখে প্রগতি, শান্তি ও সাম্যের ধর্ম ইসলামকে টিকিয়ে রাখা যাবে না। পুঁজিবাদের অধীনে পাকিস্তান টিকে গেলেও পুঁজিবাদের বিষবাষ্পে ইসলাম বিকৃত এবং পঙ্গু রূপ ধারণ করবে।
মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এবং বিপক্ষের সাধারণ
যোদ্ধারা উভয় পক্ষের কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর কুট প্রোপাগান্ডার শিকারে পরিণত হয়েছে এবং এরই মাঝে অসাহায়ভাবে বলির শিকার হয়েছে শাক্তিপ্রিয় ধর্মভীরু নিরপেক্ষ জনগোষ্ঠী। উভয় পক্ষেরই সাধারণ যোদ্ধার সহজ, সরল এবং নির্দোষ। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এবং বিপক্ষের সাধারণ যোদ্ধাদেরকে উপরোক্ত আলোকেই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক মুল্যায়ন করা এবঙ তার ভিত্তিতে নিজেদের মধ্যকার বিভ্রান্তি দুরীভূত করার আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। দেশ ও জাতির ঐক্য এবং ভারসাম্যপূর্ণ ভবিষ্যত রচনা করার স্বার্থেই এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহন করা আশু প্রেয়োজন।
তবে মুক্তিযুদ্ধকালীন অবস্থায় উভয় পক্ষের যোদ্ধারা যা কিছুই করেছে তা করেছে স্ব স্ব প্রক্রিয়ায় অন্তুর্ভুক্ত হওয়ার কারণেই কেবল । বাঙালী হয়ে যারা বাঙালীর ঘরে আগুন দিয়েছে, বাঙালী মা বোনদের উপর পাশবিক নির্যাতনে শরীক হয়েছে, অহেতুক হত্যাকান্ড চালিয়েছে তারা যে পক্ষেরই হোক না কেন মানবিক দিক থেকে তার অপরাধী। অপরাধীদের কোন পাক্ষ নেই। অপরাধীদের অবস্থান যেখানেই হোক না কেন, তাদের একমাত্র পরিচয়ই হচ্ছে তারা অপরাধী। অপরাধের বিচার কামক্য-এটা নৈতিক, সামাজিক, মানবিক এবং প্রচলিত আইন-প্রশাসনেরই দাবী। কোন অপরাধের বিনা বিচারে ক্ষমা প্রদর্শন একটি ক্ষমাহীন অপরাধই বটে।
স্বাধীনতা পরবর্তী কালে প্রকৃত অপরাধীদের সুযোগ্য বিচারের দাবীতে বাংলাদেশের জনগণ আকুলভাবেই সোচ্চার ছিল, কিন্তু আন্তর্জাতিক মুরুব্বীদের চাপে দুর্বল শাসক গোষ্ঠি অসহায়ভাবেই নতি স্বীকার করেছে। তাদের এই নতি স্বীকার করার ফলে প্রকৃত অপরাধীরা হয়ত জীবনে বেঁচে গেছে, কিন্তু দেশ ও জাতি রক্তক্ষরণের হাত থেকে মোটেই নিস্তার পায়নি। তাই স্বাধীনতার ১৭ বছর পরেও স্বাধীনতা আজো তেতো, মুক্তিযুদ্ধ আজ বিকৃত এবং বিস্মৃতপ্রায়।

হানাদার পাক বাহিনী যারা দীর্ঘ ৯টি মাস ধরে বাংলাদেশের বুকে অবলীলাক্রমে গণহত্যা চালিয়ে ইতিহাসের পাতায় এক জঘন্য অধ্যায় সৃষ্টি করল, তাদেরকে ভারতীয় সেনাবাহিনী কিসের স্বার্থে উদ্ধার করে নিয়ে গেল ভারতে? সেই সকল হত্যাকারী গণদস্যুদেরকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তর করা হল না কেন? যারা মুক্তিযোদ্ধের মৈত্রি বাহিনী হিসেবে বাংলাদেশের দরদী সেজে বাঙালীদেরকে উদ্ধার করতে এলো তারাই বাঙালীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া পাকিস্তানী হত্যাকারী বাহিনীকে নিরাপদ আশ্রয়ে উদ্ধার করে নিয়ে বাঙালী প্রেমের পরিচয় দিয়েছে না পাঞ্জাবী প্রেমের পরিচয় দিয়েছে? মুক্তিযুদ্ধের মৈত্রী বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাকারীদের প্রতি অতটা দরদী হয়ে উঠার পেছনে কারণটা কি ছিল? রসুনের গোড়া নাকি এক জায়গায়। এ সকল মার্সিনারী আর্মীর গোড়াও একই জায়গায়-আমেরিকার পেন্টাগনে। সুতরাঙ ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’, ‘পাক-ভারত যুদ্ধ’ ওসকল কিছু না, লৌকিকতা মাত্র। সংগ্রামমুখর জনগণকে বিভ্রান্ত এবং হতাহত করে আন্তর্জাতিক মুরুব্বীদের প্রভাববলয় ঠিক রাখাই হচ্ছে এ সকল ‘যুদ্ধ যুদ্ধ’, খেলার আসল উদ্ধেশ্য। তা না হলে মানবতার খাতিরেও আন্তর্জাতিক মহল থেকেই বাংলাদেশে গণহত্যাকারী পাকিস্তানী নরপশুদের বিচারের দাবী শোনা যেত। না তেমন কিছুই হয়নি, হবও না যতদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মহল অভিশপ্ত সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত না হবে।
নির্যাতিত বাঙালীরাই কেবল বিচারের দাবীতে চিৎকার করেছে। সে চিৎকার কেউ শোনেনি। বাংলাদেশে সংঘটিত ইতিহাসের একটি নারকীয় গণহত্যা বিনা বিচারেই ধামাচাপা পড়ে রইল। অপরাধের প্রধান নায়করাই যেখানে বিনা বিচারে মুক্ত হলো, সে ক্ষেত্রে প্রধান নায়কদের স্থানীয় সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার বাংলাদেশ সরকারের থাকে কি? সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরশীল কোন সরকারই মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত অপরাধের কোন বিচারই করতে সক্ষম হবে না। তবে মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ আনার চেষ্টা না করে যাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাদের অবশ্যই বিচার হওয়া প্রয়োজন। যতদিন পযর্ন্ত অপরাধীদের বিচার না হবে, ততদিন পর্যন্ত জাতি দুর্ভাগ্যজনক দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকবে এবং এ কারণে বাংলাদেশের মাটিতে (স্বাধীনতা বিরোধীদের কারণেই) পবিত্র ইসলাম ধর্ম বিরোধী প্রোপাগান্ডার অবসানও হয়ত ঘটবে না। স্বাধীনতাবিরোধী প্রায় সকল দল ও গোষ্ঠী যেহেতু ইসলাম ভিত্তিক, সেহেতু ইসলামই সমালোচনার বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ ইসলামে কোন অপরাধীরই আশ্রয় থাকার কথা নয়। ইসলাম অন্যায়, অপরাধ বিরোধী এক সক্রিয় জীবন ব্যবস্থা।
ইসলাম অপরাধমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। ইসলাম শোষণহীন, শ্রেণীহীন, সাম্যবাদী সমাজ কায়েম করে। ইসলাম পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ, রাজতন্ত্র সহ সকল ধরনের স্বৈরশাসনের ঘোর বিরোধী। ইসলঅম মুক্তি এবং শান্তির এক বিপ্লবী ঘোষণা। স্বাভাবিক কারণেই ইসলাম যুক্তিযুদ্ধ চেতনার পক্ষের শক্তি। মানুষের সার্বিক মুক্তির সংগ্রামে ইসলাম প্রতিবন্ধক তো নয়ই, বরং যুগান্তকারী এক সহায়ক শক্তি-মূলশক্তি বলেলও অত্যুক্তি হয় না। সর্ব শক্তিমান আল্লাহকে একমাত্র প্রভু ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইসলাম মানুষকে মূলত স্বাধীন করে দিয়েছে। এই স্বাধীন মানুষের উপর একমাত্র আল্লাহর প্রভুত্ব ব্যতীত যে কোন ধরনের প্রভুত্ব চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ইসলাম আপোসহীন জিহাদ ঘোষণা করে। এমন একটি জীবন দর্শন যা চূড়ান্ত অর্থেই পরিপূর্ণ, সেই ইসলাম সম্পর্কে যারা অসহিষ্ণু মনোভাব প্রদর্শন করে, তা তারা অজ্ঞতাবশতই করে বলে আমার বিশ্বাস।
আর যদি কেউ সজ্ঞানেই ইসলাম বিরোধী প্রচারে লিপ্ত হয়, তা তারা করে কায়েমী স্বার্থেরই কারণে কেবল কোন পরামর্শ কিংবা সমালোচনাই তাদেরকে অপপ্রচারের কুৎসিত পথ থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হবে না। তবে অপপ্রচারকারীদের অধিকাংশই যে হচ্ছেন ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞদের অন্তর্ভূক্ত, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত।
মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তীকালে এই ‘ইসলাম এলার্জী’ শিক্তিত সমাজের মধ্যেএকটা মানসিক ব্যাধির ন্যায়ই বিরাজ করছে। ইসলামের কথা শোনা মাত্রই তারা বিরক্তি ও ঘৃণাভরে কতকটা তোতা পাখির মতনই কতিপয় শব্দ উচ্চারণ করে বসে- যেমন, ‘প্রতিক্রিয়াশীল’, ‘সাম্প্রদায়িক’ ইত্যাদি। বিনা জ্ঞানে কোন কিছু সম্পর্কে মন্তব্য করার স্বভাবটাই যে প্রতিক্রিয়াশীলতার লক্ষণ সে কথা তারা বেমালুম ভুলে যায়। কোন দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করতে হলেও যে সেই দর্শন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা আবশ্যক, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার কোন প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। এখানে একটি কথা বলে রাখা আবশ্যক যে, ইসলামে সাম্রাজ্যবাদের রূপ হচ্ছে সাম্প্রদায়িক এবঙ ইসলামে বিপ্লবের রূপ হচ্ছে সাম্যবাদ। বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রেরই আজ ইসলামে সাম্রাজ্যবাদ বিরাজ করছে। একমাত্র ইরানই হচ্ছে এর ব্যতিক্রম। বিপ্লবী গণজাগরণের মধ্য দিয়ে যেমন সাম্রাজ্যবাদকে হটিয়ে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করা হয়, ঠিক তেমনি আদর্শিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ইসলামকেও সম্রাজ্যবাদমুক্ত করতে হবে। আমাদের মত মুসলিম প্রধান দেশে ইসলামহীন স্বাধীনতা প্রকৃত অর্থে গণমানুষের স্বাধীনতা নয়, ঠিক তেমনি স্বাধীনতাহীন ইসলামও গণমানুষের ইসলাম নয়, তা থেকে যায় ‘দরবারী ইসলাম’ অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরশীল প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত ইসলাম।
যে কোন মূল্যে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে যারা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার ভূত মাথায় বহন করে এনেছে তারা যেমন ভুল করেছে, ঠিক তোমনি ভুল করেছে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিসমুহ, যারা ইসলামকে যে কোন মূল্যে রাক্ষা করতে গিয়ে স্বাধীনতাকেই অস্বীকার করে বসেছে। তাই মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতার প্রকৃত রূপ হতে হবে সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ, রাজতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্রমুক্ত ইসলাম। ইসলামহীন স্বাধীনতা, অথবা সাম্রাজ্যবাদ ও রাজতন্ত্র নির্ভরশীল ইসলাম সহকারে স্বাধীনতা এর কোনটিই বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুক্তির পথে সহায়ক হবে না। ইসলাম ভিন্ন বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যান্য ধর্মাবলম্বী শতকরা ১০ভাগ মানুষও ধর্মভীরু এবং তারও ধর্ম সহকারেই স্বাধীনতা এবং মুক্তি কামনা করে। প্রকৃত ইসলামের সাম্যবাদী নীতি এবং ইসলামের ঐতিহ্যবাহী নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কোন বিরোধ তো নেই-ই বরং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিধান রয়েছে ইসলাম ধর্মে। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীনতাকে প্রশ্রয় দান ইসলঅম তো করেই না, অন্যান্য ধর্ম মতেও তদ্রপ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মানুষের স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ ছিল, ধর্মযুদ্ধ ছিল না। সুতরাং যুদ্ধোত্তর কালে ধর্মের প্রতি উষ্মা কিম্বা কটক্ষ করার কোন যুক্তিই নেই, থাকতেও পারে না। তবুও রয়েছে কেন?

ষষ্ঠ অধ্যায় : বাংলাদেশে ভারতীয় বাহিনীর পরিকল্পিত লুন্ঠন

সশস্ত্র যুদ্ধে জাগ্রত বাঙলী জাতিকে ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠী প্রথম দিকে স্বাগত জানালেও ধীরে ধীরে তাদের সে উৎসাহে ভাটা পড়ে। বাঙালীর দুর্দমনীয় জাতীয়তাবাদী চেতনার বিষ্ফোরণ তাদের ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাহ্যিকভাবে মৈত্রীর বন্ধন রক্ষা করা গেলেও তাদের অন্তরে ছিল ষড়যন্ত্র ও সন্দেহ। পূর্ব বাংলার বাঙালীদের জাগরণ পশ্চিম বাংলার বাঙালীদেরকেও বিদ্রোহী করে তুলতে পারে এ সন্দেহে এবং ভীতির কারণেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত মুক্তিযুদ্ধ অবসানের ফর্মুলা সন্ধানে ব্যতিব্যস্ত ছিল। তাদের এই মহান দায়িত্ব পালনে সক্রিয়ভাবে সহয়তা করেছে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য যেভাবে গনমানুষের ঢল বর্ডার অতিক্রম করছিল তাতে মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে পড়বে এ আশংকায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এবং ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী উভয়ই সমানভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ীত্ব উভয়েরই স্বার্থের বিপক্ষে যেতে পারে বলে তারা অনুমান করেছে।
যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষমতালোভী আওয়ামী লীগও মুক্তিযুদ্ধের উপর তাদের পোদ্দারী হারিয়ে বসবে আশংকা করেছে। মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে পড়লে তাদের মনে আরও যে ভয়টি দানা বেঁধেছিল তা হলো মুক্তিযুদ্ধের উপর যুদ্ধরত বাঙালী সোবাহিনীরও কর্তৃত্ব এবং নের্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার ভয়। এক্ষেত্রেও যুদ্ধবিমুখ আওয়ামী লীগ নের্তৃত্ব হারানোর ভয়ে প্রতিনিয়তই ভারতীয় শাসক গোষ্ঠির কাছে আনুনয়-বিনয় জানাত মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সরাসরি নের্তৃত্ব প্রদানের জন্য। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই যে ভারতীয় সেনাবাহিনী কৌশলের সাথে পেছন থেকে নেতৃত্ব প্রদান করে এসছিল এ সত্য যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কোন মুক্তিযোদ্ধার কাছেই গোপন ছিল না। ভারতীয় বর্ডার ফোর্স বি,এস, এফ, কে সামনের সারিতে নিয়োজিত রেখে সেনাবাহিনী পেছন থেকে সর্বরকম লজিষ্টিক সাহায্য প্রদান করা, সর্বরকম তথ্য সংগ্রহ করা এবং সামগ্রিকভাবে যু্দ্ধের প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত ছিল। বস্তুতপক্ষে ৭১-এর আগস্ট মাস থেকেই ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ-ভারত বর্ডারের সকল অঞ্চলে দৃঢ়ভবে অবস্থান নিয়েছিল। এই দীর্ঘ চার মাস ধরেই বর্ডার অঞ্চলে ভারতীয় সৈন্যের বিন্যাস, পুনঃ বিন্যাস এবং রণ কৌশলগত দিক নিয়ে ব্যাপক তৎপরতা অব্যাহত ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপ ঘটেনি বলে যাদের ধারণা, তারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর রণকৌশল এবং যুদ্ধ তৎপরতা সম্পর্কে মোটেও অবগত নয়। মুক্তিযুদ্ধাদেরকে ভরতীয় সেনা কর্তৃপক্ষ এক ধরনের ‘রেকী ফোর্স’ হিসেবেই গন্য করেছে, এর অধিক নয়।
কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে’গেরিলা ঘাঁটির সম্প্রসারন এবং ট্রেনিংপ্রাপ্ত গেরিলাদের সশস্ত্র তৎপরতা ভারতীয় সেনা-কৃর্তৃপক্ষের মনে যেমন ভীতির সঞ্চার করে, ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কাছেও তা ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দেশের অভ্যন্তরে ‘গেরিলা ঘাঁটিগুলোতে’ যুদ্ধরত গেরিলা বাহিনীদের আনুগত্য ক্ষমতালোভী আওয়ামী লীগের পক্ষে দীর্ঘ দিন নাও থাকতে পারে সেই সন্দেহ এবং ভয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। ভারতীয় কৃর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অনতিবিলম্বে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার মসনদে বসানোর জন্য বেহায়াপনার সাথে ধর্ণা দিতে থাকে। আওয়াম লীগের এহেন আচরণ ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের জন্য সোনায় সোহাগা হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ ভারতীয় চক্র নিজেরাই দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশে এক ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করার পরিকল্পনায় রীতিমত মশগুল ছিল। দুর্বল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অসহায় আত্মসমর্পণই ভারতীয় চক্রকে তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয় । অপরদিকে ১৯৭১ সনের ৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তান কর্তৃক ভারতের পশ্চিম সীমান্তে আকস্মিক যুদ্ধ ঘোষণও ভারতকে বাংলাদেশ অভিযানে সরাসরিভাবে অনুপ্রানিত করে। এক তুমুল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ভারত নিঃস্বার্থভাবে বাঙালীদের সুখ-শান্তির জন্য স্বাধীনতা এনে দেবে এ ধরনের ধারনা যারা পোষণ করেন, তারা হয় ভারতের কট্টর সমর্থক না হয় তারা ভারতের কৃপা ভিক্ষাকারীদের মধ্যে অন্যতম। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয় সাধারণ জনগণ বিশেষ করে পশ্চিম বাংলার বাঙালী জনগণ এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্য এবং নিম্নপদের আফিসারদের বিস্ময়কর মানবতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধ পরিলক্ষিত হয়েছে। তাদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাদের সকল কর্মতৎপরতাই যে নিছক হীন স্বার্থভিত্তিক ছিল তা নয়, অসংখ্য ক্ষেত্রেই তারা অতুলনীয় মানবতাবোধের প্রমাণ রেখেছেন। যুদ্ধরত অবস্থায় প্রচন্ডভাবে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও আমর দৃষ্টি তাদের সেই মানবতাবোধের স্বাক্ষর এড়িয়ে যায়নি। একথা স্মরনীয় যে, একটি দেশের সাধারণ জনগণের মানবতাবোধের সাথে সে দেশের শাসক চক্রের মূল্যবোধের কোন সম্পর্ক বা সংগতি নাও থাকতে পারে। ভারত ঠিক তেমনি একটি নমুনা। ভঅরত আপাত দৃষ্টিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে ধরনের উসাহ-উদ্দীপন নিযে ঝাঁপিযে পড়েছে কই তারা তো সেভাবে ‘নাগাল্যান্ড’, ‘মিজোরাম’, গুর্খাল্যান্ড,’ এবং পাঞ্জাবে শিখদের খালিস্তান স্বাধীন করার যুদ্ধে তেমন উদ্যোগ নিচ্ছে না? সে সকল ক্ষেত্রে তো বরং এর উল্টোটাই সঠিক। নাগা, মিজো, গুর্খা এবং শিখদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সমর্থন নেই কেন? সমর্থনের পরিবর্তে সেখানে ভারতীয় শাসক চক্র শ্বেত সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে কেন? যে শাসক চক্র নিজের দেশের জনগণের স্বাধীনতা কামনা করে না, তারা কি করে পূর্ব বাংলায় বসবাসরত বাঙালীদের স্বাধীনতা কমনা করতে পরে? এটা কি তাদের উদারতা না কি তাদের নির্যাতনমূলক প্রতিক্রিয়াশীল শাসন কাঠামো সম্প্রসারণ করারই উগ্র বসনা? বাংলাদেশের মুক্তিযু্‌দ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অংশগ্রহন এবং বাংলাদেশে ভারতীয় বাহিনীর অভিযানকে উপরোক্ত আঙ্গিকেই বিচার করতে হবে।
১৯৭১ সনের ৩রা ডিসেম্বর থেকে ১৬/১৭ই ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরিভাবে হস্তক্ষেপ করে এবং পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধেও আনুষ্ঠানিকভাবেই যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই দিনগুলোতেও মুক্তিযুদ্ধারাই সম্মুখের সারিতে যুদ্ধ করেছে, অকাতরে শহীদ হয়েছে, পঙ্গু এবং আহত হয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী পেছনেই অগ্রসর হয়েছে। তবে এই চৌদ্দ দিনের যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীরও আনুমানিক ১২ থেকে ১৪ হাজার সদস্য প্রাণ হারিয়েছে। তাদের এই প্রাণ হারনো সার্থক হয়েছে কি? কার স্বার্থে ১৪ হাজার ভারতীয় সৈন প্রাণ বিসর্জন দিল? বাংলাদেশের স্বার্থে? কিসের টানে? না, একটি ‘মার্সিনারী আর্মির’ সদস্যদের কোন স্বার্থ নেই, থাকতে পারে না। তারা কেবল প্রাণ দেয় স্বার্থান্বেষী মহলের নির্দেশে, কোন প্রাণেল টানে নয়। জীবন তাদের কাছেও প্রিয়, কিন্তু তবু তা তুচ্ছ, যেহেতু তারা বেতনভুক্ত কমর্কচারী। বেতনভুক্তদের কোন আপন ইচ্ছে নেই, তারা কেবল প্রভুর ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটাতে বাধ্য থাকে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাধারন সদস্যসহ নিম্নপদবীধারীরা ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল শাসক চক্রেরই সম্প্রসারণবাদী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটিয়েছে কেবল। বাংলাদেশের কোন খালে, কোন বিলে ভারতীয় বাহিনীর কোন সদস্য লাশ হয়ে ভেসে গেছে, সে ইতিহাস কেউ কোন দিন লিখবে না, তবে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সনে ভারতীয় সেনাপতি জেনারেল আরোরার কাছে পাকিস্তানী সেনাপতি জেনারেল নিয়াজী যে আত্মসমর্পণ করেছে, সে ইতিহাস চিরযু্গই অম্লান হয়ে থাকবে। বেতনভুক্তদের ইতহাস লেখঅ হয় না, তারা ইতিহাস নয়, তারা ইতিহাসের খোরাক মাত্র । ঐতিহসিক ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসানের দিন। হানদার পাকিস্তানী বাহিনী ভারতের পূর্ব অঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেঃ জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে ঢাকা রেস কোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করে। যে যুদ্ধ বাঙালীদের সশস্ত্র গণবিষ্ফোরণ এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার শেষ হয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিনায়কের কাছে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর অধিনায়কের আত্মসমর্পণের মধ্য দিযে। হিসেব মিলছে না কেন? হিসেবের এই গরমিলের জন্য দায়ী কো বা কারা? যারা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিল যুদ্ধ শেষে পরাজিত শত্রুপক্ষ সেই মুক্তিযুদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পন করল না কেন? পাকিস্তান এবং ভারতরে মধ্যে তো কোন মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং মুক্তিকামী বাঙালী জনগণের মধ্যে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের হেতুটি দেখা দিল কেন-কোন উদ্দেশ্যে?
মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্ণেল ওসমানীর কাছে পাকিস্তানের পরাজিত জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পন করলেন না কেন? আত্মসমর্পণের সময় কর্ণেল ওসমানী অনুপস্থিত ছিলেন কেন? আত্মসমর্পণের বেশ কয়েকদিন পরে কর্ণেল ওসমানী ঢাকায় এলেন কেন? এ সময়কাল তিনি কোথায় ক্ষেপন করেছিলেন? তিনি কি তাহলে সত্যিই কোলকতায় বন্দী ছিলেন? আজো বাংলাদেশের জনমনে নানান প্রশ্নের ভীড় জমছে। এ সব প্রশ্নের উত্তর দেশবাসী আওয়ামী লীগের কাছে থেকে প্রত্যাশা করছে, কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এবং ভারতে অবস্থানরত প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এ সকল প্রশ্নের জবাব দেয়ার আজ পর্যন্ত কোন তাগিদই বোধ করেনি।
তাছাড়া আত্মসমর্পনের প্রায় ১ সপ্তাহের পরে প্রবাসী আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশে ফিরে এসে বিনা প্রশ্নে গদিতে বসেন। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ঐতিহাসিক আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে কেন অনুপস্থিত ছিলেন, সে সত্যটি উদঘাটন করার জন্য আজ পযন্ত কোন তদন্ত কমিটি গঠন করা হল না। অথচ মুক্তিযুদ্ধের এই অসহায় মহানায়ক কর্ণেল ওসমানীর কতই না প্রশংসা। কেন এই মিছেমিছি প্রশংসা? এর অন্তরালে কি রহস্য? রহস্য তো নিশ্চই রয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিনায়কের কাছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে ১৬ই ডিসেম্বর, যাকে আমরা বিজয় দিবস হিসেবে অভিহিত করি, সেই দিন থেকেই বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধকে সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে। ১৬ই ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধাদের ‘বিজয় দিবস’-এর পরিবর্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে ইতহাসে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ষড় যন্ত্রের পেছনে আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাঙালীর স্বাধীনতা সংগ্রামকে অস্বীকার করা এবং পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্বাঞ্চলের রণাঙ্গনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিজয় ঘোষনা করা।
এই বিজয়ে বাংলাদেশের মুক্তিপিপাসু জনগণ এবং মুক্তিযুদ্ধারা ছিল নীরব দর্শক, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ছিল বিনয়ী তাবেদার এবং কর্ণেল ওসমানী ছিলেন অসহায় বন্দী। এ যেন ছিল ভারতের বাংলাদেশ বিজয় এবং আওয়ামী লীগ সরকার এই নব বিজিত ভারতভূমির যোগ্য লীজ গ্রহনকারী সত্তা। সুতরাং যেমন সত্তা তেমনই তার শর্ত-আর যায় কোথায়! এতো গেল ১৬ ই ডিসেম্বর সম্পর্কে কিছু কথা। অনুরূপভাবে ১৭ই ডিসেম্বর তারিখে খুলনার সার্কিট হাউস ময়দানেও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। নবম সেক্টরের অধিপতি হিসেবে আমি সেখানে উপস্থিত থাকলেও ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্তৃপক্ষ আমাকে একরকম জোর করেই পেছেনের সারিতে ঠেলে দেয়। বারবার প্রচেষ্টা চালানো সত্তেও আমাকে সামনে আসতেই দেয়া হলোনা। আমার প্রতিপক্ষ ভারতীয় সেনবাহিনীর মেজর জেনারেল দালবীর সিংকে দিয়েই সেই আত্মসমর্পনের নেতৃত্ব বজায় রাখা হয়। অথচ দালবীর সিংয়ের অধীনস্ত সৈন্যরা যুদ্ধ ক্ষেত্রে সব সময়েই আমার বাহিনীর অনেক পেছনে অবস্থান করত ।
মুক্তিযুদ্ধাদের দীর্ঘ ন’টি মাসের অসীম ত্যাগ, তিতিক্ষা এবং আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে রচিত বিজয় পর্ব এভাবেই ভারতীয় শাসক চক্র দ্বারা লুন্ঠিত হয়ে যায়। সংগ্রামী, লড়াকু বাঙালী জাতি প্রাণপণ যুদ্ধ করেও যেন বিজয়ী হতে পারল না, পারল কেবল অপরের করুণায় বিজয় বোধ দুর থেকে অনুভব করতে। বিজয়ের সরাসরি স্বাদ থেকে কেবল বাঙালী জাতি বঞ্চিত হলো না। বঞ্চিত হলো প্রকৃত স্বাধীনতা থেকেই। সুতরাং সেই বঞ্চনাকারীদের কবল থেকে বঞ্চিতদের ন্যায্য পাওনা আদায় করার লক্ষ্যে আর একটি প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন কি এখনও রয়ে যায়নি?

পঞ্চম অধ্যায় : ভারতে মুক্তিযু্দ্ধের ট্রেনিং শিবির

২৫শে মার্চের পাকিস্তান হামলার পর থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে স্বতঃষ্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শিবিরগুলো পাকিস্তানী বাহিনীর অব্যাহত হামলার মুখে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধারাও পাল্টা হামলার ধারা পরিচালনা কাতে করতে এক পর্যায়ে বর্ডার অতিক্রম করে ভারতের মাটিতে আশ্রয় নিতে থাকে। অপরদিকে হাজার হাজার তরুণ ছাত্র যুবক দলে দলে ছুটে যেতে থাকে ভারতে। এভাবেই গড়ে ওঠে ভরতে মুক্তিযুদ্ধোর ট্রেনিং শিবির।
মে মসের শেষের দিকে তরুণ-যুবকের দল ভারত অভিমুখী হয়ে ওঠে এর পূর্বে তেমন কোন প্রাণ চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যায়নি। এই মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমি প্রথম ক্যাম্প প্রতিষ্টা করি ইছামতি নদীর ভারতীয় পার ঘেঁষে হাছনাবাদ বন্দরে, হিংগলগঞ্জে এবং ধীরে ধীরে ট্রেনিং শিবির সম্প্রসারিত হতে হতে জুলাই মাসের শেষ পর্যন্ত সর্বমোট ১১টি শিবিরে পরিণত হয়। পশ্চিমবংগের বশীর হাট মহকুমার সর্বত্রই ট্রেনিং শিবিরগুলো ছড়িয়ে ছিল। জুন-জুলাইয়ের মধ্যে হাজার হাজার তরুণ যুবকের প্রচন্ড ভীড় জমতে থাকে। সমগ্র পশ্চিম বংগের বর্ডার এলাকা মুক্তিযুদ্ধাদের তীর্থস্থানে রূপান্তরিত হয়ে ওঠে। যে কোন তীর্থযাত্রীদের তুলনায় তারা ছিল ত্যাগী এবং নিবেদিত। একেবারেই সহায়-সম্বলহীন। কারো সংগে অতি সামান্য পুঁটলি, কারো সংগে শুধু কেবল লুংগি-গামছা, কারো তাও নেই। অধিকাংশ যুবকই কেবল প্রাণটা নিয়ে পালিয়ে এসেছে। পথিমধ্যে পাকিস্তানী বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়ে রক্তভেজা কাপড়ে আহত দেহ নিয়ে কেনমতে হুমড়ি খেয়ে এসে পড়েছে পশ্চিম বাংলার বর্ডার এলাকায়। শত্রুর অব্যাহত তাড়া, অর্ধাহার-অনাহারে একটানা পথ চলার মধ্য দিয়ে এ সকল তরুণ জন্মভূমির ভিটে-মাটি ছেড়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় এসে গড়িয়ে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধের তীর্থস্থান পশ্চিম বাংলায়। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মায়াজালে আত্মসমর্পন করেছে তারা অত্যন্ত নিশ্চিত ভাবেই। অপূর্ব সে দৃশ্য, অতুলনীয় সে আত্মসমর্পন। যুগভেরীর অদৃশ্য আহ্বনে সাড়া দিয়েছে একটি জাতির যুব চেতনা। জাগ্রত চেতনার এই লেলিহান শিখা বিশ্বের যে কোন স্বৈরশক্তির ভিত্‌ পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে যে সমর্থ, সে তথ্য আমি ইতিহাসের পাতায় বহুবার পড়েছি। তাই তরুণ যুবকদের ভীড় যতই বৃদ্ধি পেতে লাগল ততই আমি আশাবাদী হয়ে উঠলাম মুক্তিযুদ্ধের বিজকয় সম্পর্কে। মনেপ্রাণে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেতে শুরু করলাম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে। তারা যদি অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা না বাড়িয়ে দিত, তাহলে পূর্ব বাংলার তরুণ সমাজ মুক্তিযুদ্ধে ততটা সাড়া দিত কিনা সে সন্দেহ অনেকের মাঝেই আছে।
একটি ঘুমন্ত জাতিকে বেয়নেটের খোঁচায় জাগিয়ে তোলার জন্য হানাদার বাহিনীর কৃতিত্ব একেবারে কম নয়। ভেতো বলে ঘৃণিত একটি জাতি রাতারাতি যে কোন ‘মার্শাল রেস’ বা যোদ্ধা জাতির ন্যায় সগর্বে দাঁড়িয়ে যাওয়অর দৃশ্যে পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ কেবল আহমকই বনে যায়নি, দারুণভাবে ভীত-সন্ত্রস্তও হয়ে পড়েছিল। বাঙালী জাতির ইতিহাসই যে হচ্ছে যু্দ্ধের ইতহাস সে কথা জানা থাকলে হানাদার বাহিনী বেয়নেট নিয়ে খোঁচাতে যেত কিনা সন্দেহ। কারণ একটি জাতি কেবল বেয়নেটের আচমকা খোঁচাতেই রাতারাতি যোদ্ধা জাতিতে পরিণত হয়ে যায় না, যুদ্ধের চেতনার সক্রিয় উপস্থিতিই একটি জাতিকে যোদ্ধা জাতি হিসেবে আত্মবিকাশ লাভে সহায়তা করে। পাকিস্তানী বাহিনীর আচমকা আক্রমণ বাঙালী জতির আত্মবিকাশের ধারাকে কেবল ত্বরান্বিত করেছে। আর তাই তো তীর্থযাথীদের ন্যায় ছুটেছে তরুণ-যুবক অস্ত্রের সন্ধানে। বর্ডার অতিক্রম করতে সক্ষম হলেই ট্রেনিং ক্যাম্পের সন্ধানলাভ, সুতরাং ‘চলো চলো বর্ডার চলো’ শ্লোগানের মধ্য দিয়ে দিন-রাত ছুটে চলেছে মুক্তিপিপাসু কিশোর, তরুণ যুবক। মায়ের স্নেহের বাঁধনের চেয়েও নিরাপদ মনে হয়েছে অস্ত্র শিক্ষা। তাই সকল স্নেহের বাঁধন ছেড়ে যেতে দেরী হয়নি, তেমনি দেরী হয়নি অস্ত্র শিক্ষা গ্রহন করতে।
মুক্তিযুদ্ধে ট্রেনিং শিবিরগুলো পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করা বাঙালী তরুণ ক্যাপ্টেন, মেজর পদের অফিসার দিয়েই শুরু হয়। অনেক ক্ষেত্রে নন কমিশনড্‌ অফিসার নায়েক এবং হাবিলদাররাও প্রশংসাজনক উদ্যোগ নিয়ে ট্রেনিং শিবিরগুলো অতি কষ্টে দাঁড় করিয়েছে। কোন ঊর্ধতন মহলের নির্দেশ ব্যতিরেকেই এই দুরূহ কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছাড়া আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ মুক্তিযুদ্ধদের ট্রেনিং শিবির স্থাপনের ব্যাপারে কোন ধরনেরই অবদান রাখতে সক্ষম হয়নি। এই ট্রেনিং শিবিরগুলোই মূলত মুক্তিযুদ্ধের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়ার ক্ষেত্রে ‘নিউক্লিয়াস’ বা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। এই কৃতিত্বের দাবীদার ঐ সকল দেশপ্রেমি বাঙালী আর্মি অফিসার এবং ব্যক্তিবর্গ, যারা সর্বরকম ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ‘নিউক্লিয়াস’ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ছাত্র লীগের খানিকটা ভূমিকা থাকলেও তা আশানুরূপ ছিল না। তবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব চূড়ান্ত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এমনকি পশ্চিম বাংলার নিরাপদ এলাকায় ট্রেনিং শিবির গড়ে ওঠার পরেও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে ট্রেনিং শিবিরের আশে-পাশেও দেখা যায়নি। তবে এর ব্যতিক্রম যারা ছিলেন তাদের সংখ্যা সীমিত।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের এই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে অনেকে বলে থাকেন যে, ‘বেচারারা’ বিচ্ছিন্ন ভাবে যে ভবে যে পেরেছে বর্ডার অতিক্রম করার ফলে পশ্চিম বাংলায় গিয়ে এক রকম কক্ষচ্যূত নক্ষত্রের ন্যায়ই এখানে-ওখানে ছুটোছুটি করেছেন দীর্ঘদিন। তাদের নাকি নিজেদেরই কোনরূপ অবস্থান ছিল না, কি করেই বা যুদ্ধের খবর নিবে? কথাগুলোতে বেশ যু্ক্তি আছে, হবে অতটা জোড়ালো নয়। ‘বেনিফিট অফ ডাউট’ বা ‘সন্দেহের সুযোগ’ নিতে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ মোটেও যে কার্পন্য করেননি তার ভুরি ভুরি প্রমাণ পেয়েছি যখন তাদেরকে দেখেছি কোলকতার অভিজাত এলাকার হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোতে জমজমাট আড্ডায় ব্যস্ত। একাত্তরের সেই গভীর বর্ষায়ত দিনরাতে কোলকতার অভিজাত রেস্টুরেন্টগুলোতে বসে গরম কফির কাপে চুকুক দিতে গিয়ে হাটু তক কাদা জলে ডোবান্ত মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শিবিরগুলোতে অবস্থানরত হাজার হাজার তরুনের বেদনাহত চেহারাগুলো তারা একবারও দেখেছে কিনা তা আজও আমার জানতে ইচ্ছা করে। আমার জানতে ইচ্ছে করে কোলকতার পার্ক স্ট্রীটের অভিজাত নাইট ক্লাবগুলোতে ‘বীয়ার’ হুইসকি পানরত আওয়ামী লীড় নেতৃত্বের মনোমুকুরে একবারও ভেসে উঠেছে কিনা সেই গুলিবিদ্ধ কিশোর কাজলের কথা যে মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত চীৎকার করে ঘোষণা করেছে ‘জয় বাংলা’। আমার জানতে ইচ্ছে করে আরো আরো অনেক কিছু। কিন্তু জানতে ইচ্ছে করলেই তো আর জানা যায় না।
ভারত অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অনেক কিছুই জানতে চেয়েছিলেন স্বনামধন্য সাহিত্যিক এবং চিত্র নির্মাতা কাজী জহির রায়হান। তিনি জেনেছিলেন অনেক কিছু, চিত্রায়িতও করেছিলেন অনেক দুর্লভ দৃশ্যের। কিন্তু অতসব জানতে বুঝতে গিয়ে তিনি বেজায় অপরাধ করে ফেলেছিলেন। স্বাধীনতার ঊষালগ্নেই তাকে সেই অনেক কিছু জানার অপরাধেই প্রাণ দিতে হয়েছে বলে সকলের ধারনা। ভারতের মাটিতে অবস্থান কালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের চুরি, দুর্নীতি, অবৈধ, ব্যবসা, যৌন কেলেংকারী, বিভিন্ন রূপ ভোগ-বিলাস সহ তাদের বিভিন্নমূখী অপকর্মের প্রমাণ্য দলীল ছিল-ছিল সিচিত্র দৃশ্য। আওয়ামী লীগের অতি সাধের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কাজী জহির রায়হানের এতবড় অপরাধকে স্বার্থান্বেষী মহল কোন যুক্তিতে ক্ষমা করতে পারে? তাই বেঁচে থেকে স্বাধীনতার পরবর্তী রূপ দেখে যাওয়ার সুযোগ আর হয়নি জহির রায়হানের। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ৩নম্বর আসামী স্টুয়ার্ড মুজীবেরও ঘটেছিল এই পরিণতি:। এই দায়িত্বশীল নিষ্ঠাবান তেজোদীপ্ত যুবক স্টুয়ার্ড মুজীব আমার ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে এবং পরে ৮ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেছে। তার মত নির্ভেজাল ত্বরিতকর্মা একজন দেশপ্রেমিক যুদ্ধা সত্যিই বিরল। প্রচন্ড সহস ও বীরত্বের অধিকারী স্টুয়ার্ড মুজীব ছিল শেখ মুজীবের অত্যন্ত প্রিয় অন্ধভক্ত। মাদারীপুর থানার অন্তর্গত পালং অধিবাসী মুজীবকে দেখেছি বিদ্যুতের মতই এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ছুটোছুটি করতে। কি করে মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করা যায়, ভারতের কোন নেতার সাথে যোগাযোগ করলে মুক্তিযুদ্ধের রসদ লাভ করা যায় কেবল সেই চিন্তা এবং কর্মেই অস্থির দেখেছি স্টুয়ার্ড মুজীবকে। মুজীব ভারতে অবস্থিত আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেক কুকীর্তি সম্পর্কেই ছিল ওয়াকিফহাল। এতবড় স্পর্ধা কি করে সহবে স্বার্থান্বেষকী মহল। তাই স্বাধনতার মাত্র সপ্তাহ খানিকের মধ্যেই ঢাকা নগরীর গুলিস্তান চত্বর থেকে হ্যাইজ্যাক হয়ে যায় স্টুয়ার্ড মুজীব। এভাবে হারিয়ে যায় বাংলার আর একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।

ভারতে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শিবিরগুলোও ছিল নানান কুকর্মে লিপ্ত আওয়ামী নেতৃত্বের জন্য হুমকি স্বরূপ। তাই সচেতনভাবেই তারা ট্রেনিং শিবিরগুলো এড়িয়ে চলত। এ সকল ট্রেনিং শিবিরে অবস্থান করত সাধারণ জনগণের সন্তান, যাদের ভারতের অন্যত্র কোন ধরনের আশ্রয় ছিল না। যারা হোটেল, কিম্বা আত্মীয়-স্বজনদের কাছে আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে তারা আর মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শিবিরের ধারে-কাছেও ভিড়েনি, অংশগ্রহ করাতো দুরেই থাক। এ ধরনের সুবিধাভোগীগের নিয়ে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ভাগে ভরতীয় স্পাই সংস্থা ‘র’ (RAW) মেজর জেনারেল ওভানের মাধ্যমে ‘মুজীব বাহিনী’ নামে একটি বিশেষ বাহিনী গঠনে হাত দেয়। এই বাহিনীতে বাংলাদেশ ছাত্র লীগের অবস্থাসম্পন্ন সদস্যরাই কেবল অন্তর্ভুক্ত ছিল। এদের ট্রেনিং পরিচালনা করা হয় ভারতের ‘দেরাধন’ শহর। তাদের জন্য বিশেষ সুবিধে এবং অন্যান্য আরাম-আয়েসের সুব্যবস্থা ছিল। ‘মুজিব বাহিনী’ গঠন ছিল বাংলার সাধারণ জনগণের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মুক্তিযুদ্ধাদের বিকল্প ব্যবস্থা। ‘মুজীব বাহিনীর’ মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের পুর্বেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। তাদের দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্যই বলা চলে যে, সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধে তাদের রক্ত ঝরাতে হয়নি। তাদের অভিজাত রক্ত সংরক্ষিত করা হয়েছিল স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সাধারণ মুক্তিযুদ্ধাদের রক্ত ঝরানোর লক্ষ্যে।
অপরদিকে, সাধারণ মুক্তিযুদ্ধাদের ট্রেনিং শিবিরগুলোর ছিল বর্ণনাতীত দুরবস্থা। সাধারণত এক হাটু কাদাজলে ডোবানো ট্রেনিং শিবিরগুলোতে না ছিল পর্যাপ্ত খাবার, না ছিল বাসউপযোগী কোন ব্যবস্থা। দিনরাত খেটেও তারা পেট পুরে খেতে পায়নি। আধপেটা অবস্থায়ই তাদেরকে দুঃসহ জীবন যাপন করতে হয়েছে। সারা দিনে-রাতে দু’বেলা খিচুড়ি জুটে গেলেই সেদিন সৌভাগ্য মনে করা হতো। পরিধানে লুংগি-গামছাও ছিল এক ধরনের বিলাস। অনেক মুক্তিযুদ্ধাকে কেবল একটা হাফপ্যান্ট, কিম্বা লুংগি পরিধান করেই ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। ‘মওসুরেম’ নির্বিচার বৃষ্টির ধারা তাদেরকে সামান্যতম বিশ্রাম পর্যন্ত নিতে দিত না। হাটু কাদা মাটিতে মশার অত্যাচার নির্বিচারে সহ্য করে সারারাত দাঁড়িয়ে কাটাতে হতো তাদেরকে তবু ট্রেনিং গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের উৎসাহে কখনো ভাঁটা দেখিনি আমি। একটা শিবিরে ৩ থেকে ৪ হাজার মুক্তিযুদ্ধা এক সংগে ট্রেনিং গ্রহন করত। প্রত্যেকটি শিবিরই ছিল পরিপূর্ণ। কোন বাধা-বিপত্তি কিম্বা অসুবিধেই তাদেরকে অস্ত্র শিক্ষা গ্রহণ করা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি। অসংখ্য মাসুম কিশোরকেও দেখেছি সোল্লাসে ট্রেনিং গ্রহণ করতে। কোন দুঃখকষ্টই যেন তাদের কাছে লজ্জা বা দ্বিধার ব্যাপার ছিল না। দুঃখবোধ তারা কেবল তখনই করত যখন তাদের কম বয়স বিবেচনা করে অস্ত্র ট্রেনিং থেকে বিরত রেখে অন্যান্য কাজে নিয়োগ করার চেষ্টা চালান হতো। অস্ত্র শিক্ষা তাদের কাছে ছিল যেন প্রাণের ধন অত্যন্ত গর্বের বস্তু। পশ্চিম বাংলার বর্ডার এলাকায় আমার অধীনে পরিচালিত ১১টি ট্রেনিং শিবিরই ছিল অত্যন্ত জমজমাট। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ৪ নম্বর আসামী জনাব সুলতান উদ্দিন আহমদ একজন দক্ষ ন্যাভাল কমান্ডো শিক্ষক হিসেবে এই সকল ট্রেনিং শিবিরগুলো সরাসরিভাবে অত্যন্ত দক্ষতার সথেই পরিচালনা করেছেন। তার হাড়ভাংগা খাঁটুনির দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কষ্টসাধ্য । ইছামতি নদীর তীরে টাকী শহরের বাকুন্দিয়ায় অবস্থিত ছিল বৃহত্তম ট্রেনিং শিবির। কোন কোন সময় ৫ থেকে ৭ হাজার যুবক এক সংগে ট্রেনিং গ্রহন করত।
এই সকল শিবির প্রথমে আমার পরিপূর্ণ তত্ত্বাবধানেই গড়ে ওঠে। প্রথমভাগে ভারতীয় বর্ডার ফোর্স বি.এস.এফ-এর মাধ্যমে কিছু কিছু রসদ এবং খাদ্য সরবরাহ করার ব্যবস্থা ছিল। পরবর্তীকালে ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘ব্যাটেল পজিশন’ নেয়ার পরে সেনা ইউনিট থেকে রেশন নিয়মিতভাবে দেয়া হতো। কিন্তু সে রেশন ছিল নিতান্তই অপ্রতুল, কারণ দিন রাত চব্বিশ ঘন্টাই শত শত নতুন যুবক ট্রেনিংয়ের জন্য হাযির হতো। সুতরাং প্রাপ্ত রেশন সব সময়েই ‘শেয়ার করে চলতে হতো নবাগতগের সংগে। বেসরকারী এবং স্বেচ্ছাসেবীমূলক সংস্থাগুলো প্রভূতভাবে সাহায্য করেছে বলে হাজার হাজর যুবক অনাহারজনিত করণে মৃত্যু থেকে রক্ষা পেয়েছে। মানবতাবাদী এ সকল স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর অবদান অতুলনীয় এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরনীয়। স্বাধীনতার ১৭ বছর পরে আমার এখনো অতি স্পষ্টভাবে মনে আছে পশ্চিম বাংলার হামড়া অঞ্চল প্রধান শ্রী পি,কে রায়ের কথা, যিনি অকাতরে প্রচুর খাদ্য, তার এবং নগদ অর্থসহ বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগীতা করেছেন মুক্তিযুদ্ধে। এক সময়ে এই বাংলার ফরিদপুরবাসী পি,কে রায়ের চোখে দেখেছি মমতাপূর্ণ অনুভুতির স্পষ্ট ছাপ। ছিলেন হাবড়ার স্যামুয়েল সরকার। প্রাণভরা উচ্ছ্বাসে-আবেগ নিয়ে এক এক সময়ের মুক্তিযুদ্ধাদের দুরবস্থা কেঁদেই দিতেন। ট্রাক বোঝাই করে খাদ্যদ্রব্য, তাঁবু, টারপলিন নিয়ে হাযির হতেন মুক্তিযুদ্ধের শিবিরে। ছিলেন দক্ষিণ ভারতের মিঃ মনু ভাই বিমানী। চার্চিলের মত একখানা দেহ টেনেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের শিবিরে শিবিরে ছায়ার মতনই ঘুরে বেড়াতেন সাহায্য-সহযোগিতা সহকারে। আরো দেখেছি ডঃ ত্রিগুণা সেনকে, অরুণা আসফ আলীকে, ব্যারিস্টার জে, পি, মিটারকে এবং শিশির বোস সহ আরো অনেক খ্যাতনামা ভারতীয় সন্তানদেরকে, যারা উন্মাদের মতই ছুটে ফিরতেন মুক্তিযুদ্ধের এক শিবির থেকে অন্য শিবিরে। তাদের চোখে-মুখে আমি যে অব্যক্ত বেদনা এবং উদ্বেগ প্রত্যক্ষ করেছি, তার শতকারা এক ভাগ পরিমানও বেদনা উদ্বেগ আমি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের চেহারায় দেখতে পাইনি। পশ্চিম বাংলার সি,পি এম নেতা শ্রী জ্যোতি বসুর সাথে সাক্ষাতকালেও আমি তার মধ্যে লক্ষ করেছি গভীর উদ্বেক। কিন্তু সে ধরনের উদ্বেগ সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত ছিল ভারতের নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের ভোগরত চেহারায়। নেতৃত্বের এই সীমাহীন দায়িত্বহীনতা এবং সচেতন প্রতারনামূলক আচরণ মুক্তিযুদ্ধাদের ভোগান্তি অনেকগুনে বৃ্দ্ধি করেছে। তারা সচেতনভাবেই যেমন এড়িয়ে চলেছেন মু্ক্তিযুদ্ধের শিবিরগুলো, তেমনিভাবেই এড়িয়ে চলেছেন শরণার্থী শিবিরগুলো। তবে মুক্তিযুদ্ধা এবং শরণার্থীদের নামে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ভারতের বিভিন্ন সম্পদশালী ব্যক্তি, গোষ্ঠ এবং সংস্থাসমূহ থেকে প্রচুর পরিমাণ অর্থসম্পদ মালামাল সংগ্রহ করেছেন একথা সকলেরই জানা। কিন্তু সংগ্রহকৃত সাহায্যের যৎকিঞ্চিত ব্যতীত আর কিছুই পৌঁছেনি মুক্তিযুদ্ধা মুক্তিযুদ্ধা কিম্বা শরনার্থী শিবিরে। সে সংগ্রহীত অর্থে ভারতের বিভিন্ন ব্যাংকে আওয়ামী লীগ নেতাদের নামে বেনামে মোটা অংক যে জমা হয়েছিল তার ইতহাস ভারতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের মোটও অজানা নয়। যুদ্ধরত অবস্থায় দেশ ও জাতিকে ধ্বংসের মুখোমুখি হতে দেখেও যারা ভাররে মাটিতে ভাগ্য উন্নয়নে মত্ত ছিলেন, তারাই যখন আবার মু্ক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দাবী করেন, তখন ইতিহাস হয়ত বা মুচকি হেসে প্রচন্ড কৌতুক বোধ করে বলে আমার বিশ্বাস। শরণার্থী শিবির থেকে অসহায় যুবতী হিন্দু মেয়েদের কোলকতা শহরে চাকরী দেয়ার নাম করে সেই সকল আশ্রয়হীন যুবতীকে যারা কোলকতার বিভিন্ন হোটেলে এনে যৌন তৃষ্ণা মিটাতে বিবেক-দংশনবোধ করেনি তারা বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধের নেতা হবেন না তো হবে আর কে বা কারা! হানাদার পাক বাহিনীর সুযোগ্য উত্তরসূরী তো একমাত্র তারাই আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ!
ভারত সত্যি সত্যিই বিশ্বস্ত বন্ধু! তা না হলে আওয়ামী লীগ নেতাদের এত কুকর্মের খতিয়ান, দোষ-ত্রুটি, আয়েবের খবর জেনেও আজ পর্যন্ত সামান্যতম প্রকাশ করেনি বরং সাধ্যমত গোপন রেখেই যাচ্ছে-এটা একেবারে কম কথা নয়! হাদীস মতে, অপরের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ্যে নাকি বলতেও নেই, বন্ধু ভারত হাদীসটি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলছে দেখা যায়।
ভারতে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শিবির চলাকালীন অবস্থায় এ ধরনের আরো বহুত হাদীস ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত আনুগত্যের সাঙ্গেই মেনে চলেছে বলেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের এতো সব পাপের বোঝা মাথায় নিয়েও মু্ক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দাবী করতে মোটেও লজ্জাবোধ করছেনা। লজ্জার বালাই তাদের নেই, তাদের বুকভরা রয়েছে ঈর্ষা।
ভারতের মাটিতে অবস্থিত ট্রেনিং শিবিরগুলোর কতৃত্ব সেক্টর কমান্ডারদের হস্তেই ন্যস্ত ছিল বলে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মধ্যে বিরাজ করছে প্রচন্ড জ্বালা এবং ঈর্ষা। অবশ্য কিছু কিছু এম,পি এবং এম, এন. এ দেরকে মুক্তিযুদ্ধা ট্রেনিং শিবিরে রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের দায়িত্ব পালনে অনেকেই উৎসাহ প্রদর্শন করেননি। আমার নবম সেক্টরে বাগেরহাটের এম.এন.এ জনাব শেখ আজিজকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করা হলেও তিনি কলকাতার আরম-আয়েশ পরিত্যাগ করে বর্ডার এলাকায় কখনো পদধুলি দেয়ার প্রয়োজনও মনে করেননি। ঠাঁট-বাঁটের পুরুষ শেখ আজিজ সাহেব মনেপ্রাণে হয়ত মন্ত্রীত্বই কামনা করেছিলেন, সেক্ষেত্রে বিনে পয়সায় উপদেষ্টাগিরি তার মর্জি মাফিক হয়নি। পরবর্তীতে খুলনার জনবা সালাউদ্দিন ইউসুফকে ঐ একই পদে নিয়োগ করা হলে তিনি অবশ্য সীমান্ত এলাকায় এসে সপরিবারে বসবাস করেন এবং সাধ্যমত অবদান রাখারও চেষ্টা করেছেন। সাতক্ষীরার এম,এন,এ, আবদুল গফুর সাহেব যথেষ্ট শ্রম দিয়েশেন এবং নিবেদিতচিত্তে মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য কামনা করেছেন। সাতক্ষীরার তরুণ এম,পি, এ, স, ম, আলাউদ্দিন বেশ তৎপর ছিলেন। সর্বাধিক যারা অবদান তিনি ছিলেন বরিশালের জনব নুরুল ইসলাম মনজু, মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শিবিরগুলো গড়ে তুলতে তিনি দিনরাত সক্রিয়ভাবে খেটেছেন আমার সাথে। সাতক্ষীরার সীমান্তঞ্চল দেবহাটার জনাব শাহজাহান মাস্টার এবং জনব আতিয়ার রহমানের অবদানও বিশেষভাবেই উল্লেখযোগ্য।
সকলের সাহায্য সহযোগীতার মধ্যদিয়ে গড়ে ওঠা ট্রেনিং শিবিরগুলোতে ট্রেনিং শেষেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলা ঘাঁটি গঠন করার জন্য ১০ জন থেকে ৩০ জনেরও দল পাঠিয়ে দেয়া হতো। প্রথমে জেলা, মহকুমা, থানা এবং পরে গ্রামে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল গেরিলা ঘাঁটি। জুলাই থেকে নবেম্বর প্রকৃতপক্ষে এই পাঁচ মাসের মধ্যেই আমার সেক্টর থেকে সর্বমোট ৩০ হাজার মুক্তিযুদ্ধা ট্রেনিং সহকারে দেশে সশস্ত্রভবে অনুপ্রবেশ করেছে এবং দেশের অভ্যন্তরে ট্রেনিং শিবির চালু করে মোট ১ লক্ষ ২০ হাজার মুক্তিযুদ্ধাকে ট্রেনিং দিয়েছে। মহিলা মুক্তিযুদ্ধাদের সংখ্যাও নেহায়েত কম ছিল না। তাদেরকে বিশেষ দায়িত্বে অভ্যন্তের পাঠানো হতো। তথ্য সংগ্রহ করা ছাড়াও সরাসরি যুদ্ধেও তারা অংশগ্রহন করেছে। বাগরেহাটের এম.পি.এ. সাহেবের বোন ছাত্রনেত্রী সালেহা বেগম, বরিশালের জয়া, বিথী সহ অনেকেই উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
নবেম্বরে ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং শিবিরগুলোর দায়িত্ব সরাসরি নিতে চেষ্টা করে। আমার সেক্টরে ততটা সুবিধে করতে না পারলেও কর্তৃপক্ষ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসার নিয়োগ করেছিল। ট্রেনিং শিবিরের অস্ত্রগুলোও প্রত্যাহার করে নেয়ার নির্দেশ প্রদান করে। তখনই শুরু হয় বাকবিতান্ড এবং সম্পর্কের অবনতি ঘটতে আরম্ভ করে। আমি ভরতীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করেই অধিকাংশ অস্ত্র বারুদ ক্যাপ্টেন জিয়াউদ্দিন নৌ-কমান্ডো নূর মোহাম্মদ বাবুল, ক্যাপ্টেন শাহজাহান ওমর, নৌ কমান্ডার বেগের হাতে তুলে দেই এবং তাদেরকে ভরতীয় ষড়যন্ত্র সম্পর্কেও সজাগ করে দেই। ভারত মুক্তিযুদ্ধে সকল অস্ত্র দিয়েছে এ কথা সত্য নয়। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অর্থেও প্রচুর অস্ত্র ক্রয় করা হয়েছিল। সে অস্ত্র সম্পদ মুক্তিযুদ্ধেরই সম্পদ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সম্পদ ভরতীয় সেনাবাহিনীর হস্তে সমর্পন করার কোনই যুক্তি ছিল না।
আসলে ভারত বাংলাদেশে অভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত গ্রহনের সাথে সাথেই মুক্তিযুদ্ধাদেরকে নিরস্ত্র করতে চেয়েছেল যাতে তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে আমরা সেন কোনরুপ সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম না হই। কিন্তু যুদ্ধ বিজয়ের চূড়ান্ত মুহুর্তে কোন যুদ্ধাই সহজে নিরস্ত্র হতে চায় না। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অস্ত্র তুলে দেব না এই বিদ্রোহের বানীই ছিল সেদিন আমার মুখে। ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়েই তা করেছিলাম। ভারতীয় কর্মকর্তাগণ আমার দুঃসাহসকে হয়ত মনেপ্রাণে সেদিন ঘৃণা করেছেন এবং আমাকে উচিত শিক্ষা দেয়ারও হয়ত পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন।
প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদ এবং সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানী সাহেবও আমার সাহসের তারিফ না করে দুর্বল চিত্তে নসীহত করতে ছাড়েননি। কিন্তু দেশ-মাতৃকার মুক্তিযুদ্ধের লড়াকু হিসেবে আমি করো করুনায় ভর করে বেঁচে থাকার চেয়ে বীরের ন্যায় মৃত্যু বরণ করাকে শ্রেয় মনে করেছিলাম।
আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল থেকে রাতারাতিই অধিকাংশ অস্ত্রগোলাবারুদ আমি মোটর লঞ্চ ভরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠিয়ে দিতে সমর্থ হই। সেদিন এই দেশপ্রেমজনক অপরাধের জন্য ভারতের মাটিতেই আমার মৃত্যু হতে পারত।
কিন্তু একজন ঈমানদার মুক্তিযুদ্ধার প্রাণ হরণ করার ক্ষমতা কোন জবরদখলকারীর নেই-আল্লাহই ঈমানদারের নিশ্চিত রক্ষক।

চতুর্থ অধ্যায় : মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রকৃত অবস্থা

১৯৬৫ সনের পাক-ভারত যুদ্ধবিরতির পর থেকে ১৯৭১ সনের ১৩ই ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত আমি পাকিস্তানের মুলতান শহরে ১২ নম্বর ক্যাভলরী রেজিমেন্টে(ট্যাংক রেজিমেন্ট) চাকরীরত ছিলাম। ১৪ই ফেব্রুয়ারী ১মাসের ছুটি নিয়ে ঢাকায় অবতরণ করি। তারপরে বরিশালের উজিরপুর থানায় দেশের বাড়ীতে থাকাকালীন অবস্থায় ২৬শে মার্চ সকাল ৮টায় আমি বরিশাল শহরে মুক্তিযুদ্ধে দায়িত্ব গ্রহন করি। মায়ের অসুস্থতার খবর শুনে দেশে আসা সৈনিক দেশ-মাতৃকার দুর্দিনে মায়ের রোগশয্যা ছেড়ে ঝঁপিয়ে পড়ি বৃহত্তর ডাকে সাড়া দিতে। শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। তরুণ যুবকদের বুকে প্রচন্ড আবেগ উচ্ছাস ও উত্তেজনা-বয়স্কদের চোখে-মুখে ভীতি, অনিশ্চয়তা এবং নিরপত্তাহীনতার উদ্বেগ। শিশু-কিশোরদের চোখ জুড়ে সীমাহীন কৌতুহল-নারী সমাজের বুকে অজানা উৎকন্ঠায় প্রকম্পিত অহরহ মায়ের বুক খালি করে হাজার হাজার তরুণ যুবকরা ছুটে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে। দিকে দিকে বাংলার জননীর অশ্রুসিক্ত চোখের উদাস চাহনিই যেন তাদের ছেলে-সন্তানদের পিছু পিছু দোয়া-আশীর্বাদ নিয়ে ছুটছে। পরিবেশ-পরিস্থিতি থমথমে। মানুষ কেবল ছুটে চলছে এখান খেকে ওখানে, শহর থেকে গ্রামে। এর মধ্যে রয়েছে তাড়া খাওয়া সেনা, পুলিশ এবং ই,পি, আর বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরাও। এখানে-সেখানে হঠাৎ গুলীর শব্দ।তরুণ যুবকরা ট্রেনিং নিচ্ছে এবং তাদেরই সংগে প্রতিনিয়ত যোগদান করে চলছে তাড়া খাওয়া সেই সশস্ত্র সদস্যরা। তাদের চোখে-মুখে আগুন ঠিকরে দেশ স্বাধীন করার অংগীকার সোচ্চারিত হচ্ছে।
বিহারী এবং অবাঙালী অধিবাসীরা প্রাণের ভয়ে এদিক-ওদিক, ঝোঁপেজঙ্গলে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কারো সংগে শিশু সন্তান, কারো সংগে যুবতী মেয়ে। প্রাণ এবং সম্ভ্রম দুটোই বাঁচিয়ে চলতে হবে। অথচ মানব হিংস্রতার মুখে এর কোনটিরই সামান্যতম নিরাপত্তা নেই। বাঙালীর ভয়ে বিহারী পালিয়ে বেড়াচ্ছে, আর বিহারী-পাকিস্তানীদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে বাঙালী। অথচ কারো সংগে কারো কোন ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই, তবু ৭১-এর ২৫শে মার্চের পরে শত্রুতার যেন কোন শেষও নেই। স্বাধীনতার নামে স্বার্থবাদী মহলের ক্ষমতা দখলের উন্মত্ততা ঘর সংসার করা সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষের মধ্যে আকস্মিক ভাবেই জন্ম নিয়েছে ভয়াবহ হিংস্রতা এবং প্রতিশোধ গ্রহণের বর্বর নেশা। মানুষ মানুষের মধ্যকার স্বাভাবিক মানবতাবোধ ভিত্তিক সম্পর্কের ছেদ্‌ ঘটেছে, সকলেই যুদ্ধংদেহী।
পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অতর্কিতে হামলা দিচ্ছে বিভিন্ন শহরে বন্দরে। টার্গেট হচ্ছে তরুণ, যুবক, ছাত্র এবং শ্রমিক সমাজ। সুন্দরী নারীরা বিশেষ টার্গেট রূপে বিবেচিত। শহরের বিভিন্ন ডাকবাংলাগুলোতে বিলাস-অনাচারের জমজমাট পাকবাহিনীর আড্ডা। পচা, গলিত লাশের চারিদিকে শেয়াল, কুকুর ও শকুনের ভীড়। রাতের গভীরে নির্যাতিতা নারীর বুকফাটা চীৎকার। বধ্যভুমিতে মেশিনগনের ব্রাশ ফায়ারের ঠা ঠা শব্দ। নদীতে হামলাকারী গানবোটের বিকট উল্লাস। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার দলে দলে শরণার্থীরূপে বর্ডারে আহাজারী। ত্বরিতে নৌকায় নদী পাড়ির সময় মাঝ নদীতে নৌকাডুবি-আপনজনদের হাহাকার। পংগু ও অসহায়দের আর্তনাদ। বাতাসে বারুদের গন্ধ। মুক্তিযুদ্ধ চলছে।
হাট-বাজার জমছে না। ব্যবসা বাণিজ্যে ভাটা। মিল, ফ্যাক্টরী কল-কারখানাগুলো নীরব শূন্য শুন্য। স্কুল, কলেজ, ভারসিটিগুলো নিস্তব্দ। অফিস-আদালতগুলো প্রাণহীন। আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সংদ সদস্যদের অনেকেই দেশের অভ্যন্তরে গা-ঢাকা দিয়ে আছে। কিছু কিছু বর্ডার অতিক্রম করে ভারতে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেছে। সেনাবাহিনী থেকে ছুটে আসা তরুণ অফিসারদের নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং শিবির। দলে দলে তরুণ ছাত্র যুবকরা যোগ দিচ্ছে ট্রেনিং শিবিরে।
সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে সর্বস্তরের সাধারণ জনগণ। দেশ শত্রমুক্ত হবে এটাই তাদের কামনা। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী শত্রুপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। ১৭ই এপ্রিল মুজীব নগরে স্থাপিত স্বাধীন বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্র থেকে ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি মন্ত্রিসভার ঘোষণা করা হয়। শেখ মুজীবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং শেখ মুজীবের অবর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষনা করা হয়। মন্ত্রিসভঅর অন্যান্য সদস্য জনব তাজউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী, জনাব খন্দকার মোশতাক আহমদ বৈদেশিক এবং আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী, জনাব এ, এইচ, এম, কামুজ্জামান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং জনাব মনসুর আহমদকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মোহাম্মদ আতাউল হক ওসমন গণিকে স্বাধীনদা যুদ্ধের জন্য প্রধান সেনাপতি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সনের ১৭ই এপ্রিল তারিখে মুজীব নগর থেকে আরো গোষণা কর হয় ৯ জন সেক্টর কমান্ডারের নাম। সমগ্র রণক্ষেত্রকে ৯টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয় এবং নবম সেক্টরের দায়িত্বভার অর্পিত হয় আমার উপরে। প্রায় সমগ্র দক্ষিণ বাংলা নিয়েই গঠিত হয়েছেল এই ৯ নম্বর সেক্টর। বৃহত্তর বরিশাল জেলা, ভোলা, পটুয়খালী, ফরিদপুর এবং খুলনা সহকারে ৯নং সেক্টর বস্তুত-পক্ষে ছিল বৃহত্তম সেক্টর।
এই ঘোষণার সাথে সাথেই এলোমেলো মুক্তিযুদ্ধ একটা নির্দিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করল। কোন সেক্টরের আওতাধীন নয় এমনও অনেক স্বাধীন গ্রুপ ছিল যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় তৎপর ছিল। এদের মধ্যে টাংগাইলে কাদের সিদ্দিকী এবং বরিশালের একটা অঞ্চলে সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ সিকদার বিশেষ ভাবেই উল্লেখযোগ্য। আরো কিছু বামপন্থী দল তাদের নিজস্ব উদ্যোগেই যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। তারা ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেনি। তবে ৯টি সেক্টর ঘোষণা হওয়ার সংগে সংগেই সেনাবাহিনী অধিকতর সতর্ক এবং সক্রিয় হয়ে পড়ল। হত্যাকান্ড বৃদ্ধি পেল, মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরবাড়ী পোড়ানো শুরু হলো। দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি দানা বাঁধতে লাগল। মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি জন্ম নিল পুরাতন মুসলিম লীগ, নেজাম-ই-ইসলাম সহ অন্যান্য ইসলাম ভিত্তিক রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠনসমূহ থেকে।
তাঁদের যুক্তি হলো যে, তারা বাঙালীর স্বাধীনতার বিরুদ্ধে নয়, তবে তারা ভরতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির সাহায্য নিয়ে দেশ স্বাধীন করার পক্ষে মোটেও নয়। কারণ হিসেবে তারা মত প্রকাশ করেছেন যে, পাকিস্তানী শাসক শোষকের শোষণ-যুলুম থেকে মুক্ত হয়ে ভারতীয় শাসক শোসকদের অধীনস্থ হওয়াকে স্বাধীনতা হিসেবে বিবেচনা হওয়ার কোন যু্ক্তি নেই। তারা ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তিকে পাকিস্তানী আধিপত্যবাদী শক্তির তুলনায় অধিকতর বিপজ্জনক বলে গণ্য করেছেন। তাদের মতে ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী মুসলমানদের বাসভূমি সৃষ্ট পাকিস্তানকে কেবল দ্বিখন্ডিত করতে আগ্রহী নয়, বরং দ্বিখন্ডিত করার পরে পূর্ব অঞ্চল অর্থাৎ বাংলাদেশকে সর্বতোভাবেই গ্রাস করার হীন পরিকল্পনও লিপ্ত। এমন যু্ক্তিকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় সাধারণ দেশবাসী মনেপ্রাণে মেনে না নিলেও একেবারে অগ্রাহ্য করতে পারেনি: কারণ এ কথা অতীব সত্য যে, এদেশের জনগণের মধ্যে একটা স্বভাবিক ভারতভীতি বিদ্যমান।
তবে পাকিস্তানী সেনবাহিনীর হাতে তাড়া খাওয়া বাঙালী আত্মরক্ষার স্বার্থে ৭১-এর সেই দুযোর্গপূর্ণ দিনগুলোতে ভারতের বুকেই নির্দ্বিধায় ঠাঁই নিয়েছিল এবং ঠাঁই সেথায় পেয়েছিলও। এই ঠাঁই লাভের পেছনে উভয় পক্ষেরই স্বার্থ জড়িত ছিল। স্বার্থ ছাড়া কখনো সদ্ধি হয় না। বাঙালীর স্বার্থ ছিল ভারতের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে দেশ মুক্ত করা, আর ভারতের স্বার্থ ছিল দেশ মুক্ত করার নামে তার চিহ্নত এবং প্রমাণিত শত্রু পাকিস্তানকে দ্বিখন্ডিত করার মধ্য দিয়ে শত্রুপক্ষকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে রাখা এবং মুক্ত বাঙলাদেশের উপর প্রাথমিক ভাবে খবরদারী করে পরবর্তীতে সময় ও সুযোগমতে ভারতরে সাথে একীভূত করে নেয়া। এটাকে শুধু কেবল তাদের নিছক স্বার্থ হিসেবে চিহ্নিত করলে ভুল হবে, বরং এটা ছিল তাদের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন।
১৯৪৭ সনের দেশ বিভক্তির সময় বংগ-ভংগের ইচ্ছা ভারতীয় কংগ্রেসী নেতৃবৃন্দের মধ্যে মোটেও ছিল না। তারা সমগ্র বাংলাকেই পেতে চেয়েছিলেন ভারতের সংগে, কিন্তু মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ চেয়েছিলেন ‘বাংলাকে’ একটি পূর্ণ স্বাধীন দেশ হিসেবে দেখতে যা হবে কমনওয়েলথভুক্ত একটি স্বাধীন রাজ্য। শেরেবাংলা জনাব এ,কে, ফজলুল হক, জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবরাও ছিলেন ঐ ধরনেরই স্বাধীন বাংলা রাজ্যের পক্ষে। কিন্তু বাধ সাধলেন কিছু কংগ্রেসী নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে শ্রী প্যাটেল বাবু এবং দেশ বিভক্তির একান্ত শেষ মূহূর্তে অজানা কারণে অবশেষে পূর্ববংলা পশ্চিম বাংলা থেকে বিভক্ত হয়ে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের সংগে শামিল হয়ে পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ রকম একটি নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়েই জাতি ঐতিহাসিক ভাবে দ্বিখন্ডিত হয়ে পড়ে মুসলিম প্রধান পূর্ববাংলা এবং হিন্দু প্রধান পশ্চিম বাংলা হিসেবে। বাঙালী মুসলমান এবং বাঙালী হিন্দুর মধ্যে ধর্মের তারতম্য থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই একে অপরের অনেক কাছাকাছি ছিল। যদিও বা উভয়েরই সাংস্কৃতিক ধ্যান-ধারনার উৎসস্থল ছিল ভিন্ন। ১৯৪৭ সনের দেশ বিভক্তির মধ্য দিয়ে যে ঐতিহাসিক ছেদ ঘটানো হলো তার সাময়িক অবসান ঘটলো ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। তার বড় প্রমাণ লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে পশ্চিম বাংলায় অনায়াসে নিরাপদ আশ্রয় প্রদান। পশ্চিম বাংলার বাঙালী জনগণের প্রাণঢালা আন্তরিকতা, আতিথেয়তা এবং ভালবাসা স্নেহাশীলা মায়ের কোলকেই কেবল স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
পশ্চিম বাংলার আনাচে-কানাচে তাই গড়ে উঠেতে পেরেছে শত শত ট্রেনিং শিবির, অসংখ্য শরণার্থী শিবির। রাস্তা-ঘাটে, হাটে-বাজারে, বাগানে বাগানে, বাড়ীর বারান্দায় পর্যন্ত ভীড় জমেছে শরনার্থীদের। মুক্তিযোদ্ধা এবং শরনার্থীদের সকল ধরনের অত্যাচর নীরবে এবং হাসিমুখে সয়েছে পশ্চিম বাংলার বাঙালী জনগণ। মানবতার এই অপূর্ব নিদর্শন ছিল তুলনাহীন। পশ্চিম বাংলার বাঙালীদের এই মমতাভরা সাহায্য- সহযোগিতার অবর্তমানে মুক্তিযুদ্ধা এবং লাখো শরণার্থীরা আদৌ ভারতে আশ্রয়গ্রহণ করে টিকে থাকতে পারত কিনা আমার সন্দেহ।
বাংলাদেশের স্বাধীন সরকারের প্রথম অফিস ছিল এই পশ্চিম বাংলারই কোলকতা নগরীর ৮ নম্বর থিয়েটার রোড এবং এখানেই প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের হেড কোয়ার্টার। পশ্চিম বাংলার বর্ডারে বর্ডারে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শিবির। আর্থিক, নৈতিক, সামাজিক, মানসিক এবং সংস্কৃতিক দিক দিয়ে প্রতিনিয়ত সাহায্য-সহযোগিতার মধ্য দিয়ে পশ্চিম বাংলার রাজ্য সরকার এবং জনগণ বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধকে বিশেষভাবেই করেছে অনুপ্রাণিত। স্বাধীন বাংলা সরকার ঘোষণা করার সাথে সাথেই তো আর সরকার প্রতিষ্ঠা লাভ করা যায়নি। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সনের জুন মাসের পূর্ব পর্যন্ত ‘স্বাধীন বাংলা’ সরকারের কোন নির্দিষ্ট অফিস পর্যন্ত ছিল না। জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকে ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে অবস্থিত ভারতীয় বি,এস, এফ এর অফিস খালি করে জনাব তাজউদ্দিন গঠিত মন্ত্রিসভাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বসার সুযোগ করে দেয়া হয়। এর পূর্বে এই মন্ত্রিসভার মাননীয় সদস্যবৃন্দকে আমি দেখেছি আনুমানিক ৫৬/এ, বালিগঞ্জে অবস্থিত একটি দোতলা বাড়ীর দোতালায় মেসে ভাড়া থাকা বেকার যুবকদের ন্যায় গড়াগড়ি করতে এবং তাস খেলতে।
এসব কথা বলতে গেলে আর একটু পেছনে যেতে হয়। বরিশালের বিভিন্ন অঞ্চল সহ আমার সেক্টরের প্রত্যেকটি জায়গায় মুক্তিযুদ্ধাদের জন্য ট্রেনিং ক্যাম্প চালু করা শহর প্রতিরক্ষার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থাদি সহ মোটামুটি প্রস্তুতি গ্রহনের পর্ব প্রায় শেষ। কিন্তু অস্ত্রের দিক দিয়ে যে দুর্বলতা ছিল তা পর্বত প্রমাণ। কিছু কিছু পুরানো ধাঁচের থ্রি নট থ্রি রাইফেল, কিছু স্টেনগান এবং গ্রেনেড ছাড়া আমার কাছে তেমন আর কিছুই ছিল না। কেবল মনোবল এবং মানসিক প্রস্তুতিই যুদ্ধের জন্যে যথেষ্ট নয়, সাথে সাথে আধুনিক সমর অস্ত্রও যুদ্ধ জয়ের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। অস্ত্র সংকট আমকে সব সময়েই ভাবিয়ে তুলত। তাই সমগ্র ৯ নং সেক্টরকে কয়েকটি সাব সেক্টরে বিভক্ত করে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা চালু রেখে আমি একুশে এপ্রিল কয়েকটি মোটর লঞ্চ সহকারে সুন্দরবনের পথ ধরে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করি। প্রধান লক্ষ্যই ছিল ভারতরে কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করা। বরিশাল সদর থেকে নির্বাচিত জনপ্রিয় সংসদ সদস্য(প্রাদেশিক) জনব নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ইতিপূর্বেই পশ্চিমবংগ ঘুরে বরিশালে ফেরত এসে আমাকে জানালেন যে, লেঃ জেনারেল অরোরা ভারতের পূর্ব অঞ্চলীয় সর্বাধিনায়ক এবং তিনি মু্ক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাঙালী সামরিক অফিসরের কাছে অস্ত্র সাহায্য প্রদান করতে প্রস্তুত আছেন। এই তথ্র লাভের মাত্র ১ দিন পরই আমি কিছু মু্ক্তিযুদ্ধা সহকারে ভারত অভিমুখে রওয়ানা হয়ে প্রথমে পৌঁছি পশ্চিম বাংলার বারাসাত জেলার হাছনাবাদ বর্ডার টাউনে। ঐ অঞ্চলের বি.এস.এফ-এর কমান্ডার লেঃ কমান্ডার শ্রী মুখার্জীর সংগে হয় প্রথম আলোচনা। কমান্ডার মুখার্জী অত্যন্ত সুহৃদ বাঙালী অফিসার। তিনি সর্বান্তকরণেই্মাকে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে সরাসরি লেঃ জেনারেল জগজিৎ শিং অরোরার কাছে নিয়ে গেলেন। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে তার হেড কোয়ার্টার। তিনি আমাকে প্রথম সাক্ষাতেই সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করতে পারলেন না। সাক্ষী-প্রমাণ দাব করলেণ আমার। তখনই আমাকে সদ্য ঘোষিত স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রধান মন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন এবং সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানী সাহেবের নাম নিতে হয়েছ্ উত্তরে জেনারেল অরোরা সাহেব আমাদের নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে যা বাজে মন্তব্য করলেন, তা কেবল ‘ইয়াঙ্কী’দের মুখেই সদা উচ্চারিত হয়ে থাকে। সোজা ভাষায় তার উত্তর ছিল ‘ঐ দু’টা ব্লাডি ইঁদুরের কথা আমি জানি না, ওদের কোন মূল্য নই আমার কাছে। অন্য কোন সাক্ষী থাকলে আমাকে বলো’।
মহা মুশকিল দেখছি! এই ভারতের মাটিতে আমার মত একটা নাম না জানা তরুণ মেজরকে কোন দুঃখে কেউ চিনতে যাবে? ব্যাটা বলেটা কি? আমার স্বাধীন বাংলায় প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাবাহিনীর প্রথম সর্বাধিনায়ক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের সম্পর্কেই যে ব্যক্তি এরূপ কদর্য উক্তি করতে ছাড়েননি, তিনি আমার মত চুনোপুঁটিদের যে কি চোখে দেখবেন, তা অনুধাবন করতেই একটা অজানা আতঙ্কে আমার সর্বাংগ শিহরিয়ে উঠল। অমনি আমি জেনারেল অরোরনকে অতি স্পষ্ট ভাষায় একজন বিদ্রোহীর সুরে জানিয়ে দিলাম যে, আমার অস্ত্রের কোনই প্রয়োজন নেই, আমি শূন্য হাতেই দেশের অভ্যন্তরে ফিরে গিয়ে যুদ্ধ করতে করতে মৃত্যুবরণ করব তবু তার কাছে আর অস্ত্রের জন্য আসব না। আমার এই বিদ্রোহী ভূমিকায় জেনারেল রীতিমতন চককে উঠেন এবং আমাকে জিজ্ঞাসাবাদরে জন্য তার সিকিউরিটি এবং ইনটেলিজেন্স-এর লোকদের কাছে হাওয়ালা করেন। চারদিন বন্দী অবস্থার মধ্য দিয়ে আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বিশেষ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। আমার দ্রুত মুক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের জন্য অস্ত্র সংগহ করার লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমি পাকিস্তান সেনাবাহিনী সম্পর্কে কিছুটা তথ্য প্রদান করি। পূর্ব অঞ্চলের ‘চীফ অফ স্টাফ’ জেনারেল জ্যাকব আমার দেয়া তথ্য বিশেষ প্রয়োজনীয় মনে করেন এবং আমাকে যে কোন ধরনের অস্ত্রপাতি জোগান দেয়ার আশ্বাসও প্রদান করেন। এভাবে কোলকাতার সেই বৃটিশ রচিত দুর্গফোর্ট উইলিয়ামের অন্ধকুপ থেকে আমি মুক্তি পেয়ে জনাব তাজউদ্দীন সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাই।
দেশের সাধারণ শান্তিপ্রিয় জনগণকে হিংগ্রদানবের মুখে ঠেলে দিয়ে কোলকাতার বালিগঞ্জের আবাসিক এলাকার একটি দ্বিতল বাড়ীতে বসে প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভা সহকারে (খন্দকার মোশতাক আহমদ বাদে)নিরাপদে তাস খেলছিলেন দেখে আমি সে মুহূর্তে কেবল বিস্মিতই হইনি, মনে মনে বলছিলাম ‘ধরণী দ্বিধা হও’। ধরণী সেদিন দ্বিধা না হলেও আমি কিন্তু সেদিন থেকেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের প্রতি চরমভাবে আস্থাহীন এবং বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছি। এর ফলাফল ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য মংগলজনক না হলেও, আমি আমার সকল ক্ষতিকে নীরবে মাথা পেতে নিয়েই আওয়ামী লীগের এই দায়িত্বহীন, উদাসীন এবং সৌখীন মেজাজসম্পন্ন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আপোসহীণ সংগ্রাম অব্যাহত রাখঅর জন্য অংগীকারাবদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। দেশ ও জাতির স্বার্থে বাস্তবেও আমি করেছি তাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসই তার সাক্ষী। যে জাতির নির্বাচিত প্রতিনিধিবৃন্দ জনগণকে যুদ্ধের লেলিহান শিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে কোন নিরাপদ আশ্রয়ে বসে বেকার, অলস যুবকদের মত তাস খেলায় মত্ত হতে পারে, সে জাহির দুর্ভাগ্য সহজে মোচন হবার নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহিসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের আচরণে এ ধরনের ভুরি ভুরি নমুনা রয়েছে। যুদ্ধকালীন অবস্থায় তাদের আরাম-আয়েশী জীবনধারা কোলকাতাবাসীদেরকে করেছে হতবাক।
ব্যক্তিজীবন পদ্ধতিতে সীমাহীন ভোগ-লালসার কারণেই আশ্রয়দানকারী ভারত কর্তৃপক্ষ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের দুর্বলতা সমূহ অতি সহজেই নির্নীত করে নিয়েছে এবং তাদের ভোগ-বিলাসে কোনরূপ বাধা প্রদান করা থেকে বিরত থেকেছে। এ ব্যাপারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ঔদার্য আমাদের মু্ক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে উত্তরোত্তর কলংকময় করে তুলতে সহায়তা করেছে। অপরদিকে , কোলকাতার ৮নম্বর থিয়েটার রোড স্বাধীন বাংলাদেশের অফিস থাকলেও ক্ষমতার সকল উৎসই ছিল ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানী সাহেব একজন ‘সম্মাতি বন্দীর’ জীবন যাপন করা ব্যতীত আর তেমন কিছুই করার সুযোগ ছিল না তার। সেক্টর পরিদর্শন করা তো দুরেরই কথা তার তরফ থেকে লিখিত নির্দেশও তেমন কিছু পৌঁছতে পারেনি সেক্টর কমান্ডারদের কাছে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অস্ত্র সরবরাহ করার আগ্রহ প্রদর্শন যা করেছে তার তুলনায় অধিকতর উৎসাহ এবং আগ্রহ প্রদর্শন করেছে তথ্য সংগ্রহ করার ব্যাপারে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধাদের হাতে অস্ত্র প্রদান নয়, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে জরুরী তথ্য সংগ্রহই ছিল যেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মূল উদ্দেশ্য। তাদের এ ধরনের আচরণই তাদের গোপন লালসা পূরণের ‘নীল নকশা’ তৈরী করার ইংগিত প্রদান করেছে। আমার এ সন্দেহ সত্য বলে প্রমাণিত হতে খুব বেশী সময়ের প্রয়োজন হয়নি।

তৃতীয় অধ্যায় : সশস্ত্র গণ বিষ্ফোরণ, শেখ মুজীব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় বাঙালীদের যেমন উৎসাহিত করেছিল, তেমনি পাকিস্তানী শাসক-শোষক গোষ্ঠিকে করে তুলেছিল ভীত-সন্ত্রস্ত। পশ্চিম পাকিস্তানের জুলফিকার আল ভুট্টোর ‘পিপল্‌স পার্টি’ এবং পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজীবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে নিরংকুশ বিজয় লাভের মধ্য দিয়ে প্রকৃত পক্ষে পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় অঞ্চলের জনগণই যে স্পষ্ট রায়টি দিয়েছিল তা ছিল আর এক রাষ্ট্র নয়, আমরা দুটি ভিন্ন রাষ্ট্র আমাদের আশা-আকাংখা, স্বপ্নসাধ এবং চাহিদা ভিন্নতর। উভয় দেশের জনগণের রায়ই যেন দুই দেশের জন্য দুটি ভিন্ন পতাকা রচনার সিদ্ধান্ত দিয়ে দিল। আর তাই তো মিঃ ভুট্টো পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সংসদ অধিবেশনে যোগদান করতে সরাসরিই অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন। শুধু তাই-ই নয়, তার পিপলস পার্টির কোন সদস্য যদি সেই সংসদ অধিবেশনে যোগদানের লক্ষ্যে ঢাকায় আসে, তাহলে সে সকল সংসদ-সদস্যদের পা ভেঙে দেয়া হবে বলেও হুমকি প্রদান করলেন। এদিকে তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান বার বার সংসদ অধিবেশনের বৈঠক আহবান করেও অধিবেশন বসাতে ব্যর্থতার পরিচয় দিলেন। বেশ কয়েক বার বৈঠকের তারিখ পরিবর্তনকরা সত্ত্বেও সংসদ অধিবেশন হলো না। ঢাকা থেকে লাহোর গমনের এক পর্যয়ে জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঢাকা এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে বিজয়ী নেতা শেখ মুজিবের সংগে করমর্দন করতে করতেই শেখ মুজীবকে পাকিস্তানের ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও উল্লেখ করে ফেলেছিলেন। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হলো ৭০-এর ডিসেম্বরেই, কিন্তু এদিকে ফেব্রুয়ারী মাস অতিবাহিত হয়ে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ চলছে। মার্চের নির্ধারতি সংসদ অধিবেশন বসল না। ঢাকা সহ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে চরম উত্তেজনা বৃদ্ধি পেল। ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম সহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় বাঙালী বিহারী সংঘর্ষের সূত্রপাত দেখা দিল। বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনয় গোটা জাতি হয়ে উঠল বলিষ্ঠ থেকে বলিষ্ঠতর এবং প্রচন্ডভাবে উদ্দীপ্ত। শেখ মুজীবের জনপ্রিয়তার ছাপ দেশের আনাচে-কানাচে, আকাশে-বাতাসে বিদ্যমান হয়ে উঠল। সর্বস্তরের জনগণের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে লাগল একটি প্রিয় নাম ‘মুজীব’। বাউলের এক তারায় শুনেছি তার নাম, মাঝির গাওয়া ভাটিয়ালীতে শুনেছি তার নাম, বস্তাটানা কুলী-মজুরের কন্ঠে শুনেছি তার নাম, কিষাণের ভাওয়াইয়ায় ফুটে উঠেছে তার নাম। সেকি এলোড়ন সারা দেশব্যাপী, সে কি হিন্দোল। এ যেন ছিল মহাসাগরেরই উত্থানের মত দিকে দিকে ভরপুর সে। এক নেতা, এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ, শ্লোগানটি যেন তৎকালীন বাস্তবতার সাথে অঙ্গীভূত হয়ে পড়ল। ‘মুজীব’ জাতীয় চেতনার কেন্দ্রবিন্দু এবং ‘একমাত্র প্রতীক’- এ পরিণত হলেন। এই প্রতীকটিই’ বাঙালীর সশস্ত্র গণবিষ্ফোরণের প্রথম উপাদান হিসেবে পরিণত হয়ে গেল। মুজীবের কন্ঠই তখন যে কোন সশস্ত্র শক্তির তুলনায় অধিকতর শক্তিশালী হয়ে পড়ল। তার নির্দেশে জাতি তখন যে কোন শক্তির মোকাবেলা করার মত মানসিকতা অর্জন করল। এখানেই মুজীবের নেতৃত্বে পরিচালিত গণ- আন্দোলনের চরম সার্থকতা। একটি কন্ঠই যখন যখন সমগ্র জাতিকে সশস্ত্ররূপে সজ্জিত হওয়ার সাহস জোগায় সে জাতি পরাভূত করার শক্তি তখন আর কারোর থাকে না। ১৯৭১ সনের ৭ই মার্চ ঢাকা রেস কোর্সে দেশ ও জাতির উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবের সেই জাদুকরী কন্ঠে যে ভাষণ প্রচারিত হলো, তার মধ্য দিয়েই মূলত পূর্ব পাকিস্তানের সমাধি রচনা এবং আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনা লগ্ন ঘোষিত হয়ে যায়। ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের এবারে সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রম’- তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়-ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল’।
উপরোক্ত বক্তব্যের মধ্য দিয়েই বস্তুতপক্ষে বাঙালীদের জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়ে গেছে। আমি যদি বলি উপরোক্ত বক্তব্য প্রদানের মধ্য দিয়েই শেখ মুজীব একজন জাতীয়তাবাদী নেতার আশা-আকাংখা ও স্বপ্নের চূড়ান্তরূপ ঘোষণা করে দিয়ে তার শেষ দায়িত্ব সার্থকভাবেই সমাপ্ত করেছেন, তাহলে মোটেও ভুল হবে না। বস্তুত তাই একজন প্রকৃতজাতীয়তাবাদী নেতার চরম পাওয়াই হচ্ছে তার জাতিকে স্বাধীনতা অর্জনের মানসিকতা দিয়ে সজ্জিত করা। সেদিক থেকে মুজীব অনেকাংশেই সফল ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র নির্দিষ্ট রূপ যে ছিল না তা নয়, তবে সে চেতনা সীমাবদ্ধ ছিল একটা বিশেষ মহলের মধ্যে এবং তারা হচ্ছে তৎকালীন ছাত্র সমাজের সর্বাধিক সচেতন মহলেরও একট ক্ষুদ্র অংশ বিশেষ-বিশেষ করে বাংলাশ ছাত্র লীগের সেই অংশটি যার নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্র নেতা সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, কাজী আরিফ প্রমুখ। এই অংশটির চিন্তা-চেতনায় সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তানী চক্র থেকে মুক্ত করে এই অঞ্চলকে বাঙালীর জন্য একটি স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল। এর বাইরে যারা এই অঞ্চলকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে মুক্ত করে স্বাধীন-সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন, তারা হচ্ছেন কমিউনিস্ট পার্টি (মণিসিং), ন্যাপ(মোজাফফর), ন্যাপ ভাসানীর একটা অংশ, মরহুম সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি এবং আগরতলা ষড়য্ন্ত্র মামলার অভিযুক্ত কমান্ডার মোয়াজ্জাম সহ অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ। এর বাইরে যে ছাত্র সমাজ বা রাজনৈতিক সংগঠন ছিল তাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ছিল গতানুগতিক দেশ প্রেমিকদের দায়িত্বস্বরূপ, মুক্তিযুদ্ধের উপরোক্ত নিদিষ্ট চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নয়।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী, পুলিশ, ই,পি,আর, আনসার, অন্যান্য চাকরীজীবী, ব্যবসায়ী ইত্যাদি মহলের ক্ষেত্রেও এ কথাই প্রযোজ্য। এদের মধ্যে আবার অনেকেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে নিতান্তই বাধ্য হয়ে-প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে, কেউ কেউ করেছে সুবিধা অর্জনের লোভ-লালসায়, কেউ করেছে পদ-যশ অর্জনের সুযোগ হিসেবে, কেউ করেছে ‘এডভ্যানচার ইজম’-এর বশে। এসকল ক্ষেত্রে দেশপ্রেম, নিষ্ঠা এবং সততারও তীব্র তারতম্য ছিল, কারণ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও যারা যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় এবং যুদ্ধোত্তর কালে চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ করেছে, অপর বাঙালীর সম্পদ লোপাট করেছে, বিভিন্নরূপ প্রতারণা করেছে, ব্যক্তি শত্রুতার প্রতিশোধ নিয়েছে, তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সেই নির্দিষ্ট চেতন যে সম্পূর্ণভাবেই অজানা ছিল তাতে সন্দেহের কোনই অবকাশ নেই। তবে তাদের মধ্যে মুজীবপ্রীতি ছিল,মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিম্বা আদর্শবোধ ছিলনা। ৭১-এর মু্ক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এ ধরনের লোকদের সংখ্যাই ছিল অধিক। যাদের কাছে কেবল শেখ মুজিবই ছিল চেতানা ও আদর্শের বিকল্প, তারা মুক্তিযুদ্ধের সেই সুনির্দিষ্ট চেতনার অভাবে মুক্তযুদ্ধে এবং মুক্তিযুদ্ধের পরে অন্ধ আবেগের বশে বিভিন্নভাবে বাড়াবাড়ি করেছে এবং আজ পর্যন্ত করে চলেছে।
মু্ক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় মু্ক্তিযু্দ্ধের সেই সুনির্দিষ্ট চেতনার ধারাবাহিক বিকাশ ঘটানো সম্ভব হয়নি বলেই অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধাই জানত না তারা কোন লক্ষ্য অর্জনের স্বার্থে ঐ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অবতীর্ণ ছিল। মুক্তিযুদ্ধারা কেবল একটা কথাই জানত-পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীসহ সকল অবাংগালীকেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে তাড়িয়ে দেশকে মুক্ত করতে হবে পনরায় বাপ-দাদার ভিটায় স্বাধীনভাবে ফিরে যেতে হবে। এর অধিকার তারা আর কিছু্ই জানত না বা বুঝত না। তারা এ কথাটি জানতে না বা বুঝত না যে, কেবল অস্থানীয় শোষক গোষ্ঠী বিতাড়িত হলেই দেশ ও জাতি শোষণ হীন বা স্বাধীন হয় না। অস্থানীয় শোষকের স্থানটি যে স্থানীয় শোষক এবং সম্পদলোভীদের দ্বারা অতি দ্রুত পূরণ হয়ে যাবে এ বিষয়টি সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের জ্ঞান বা বোধশক্তির বোধশক্তির বাইরেই ছিল। এ সত্যটি কেবল তারা তখনই অনুধাবন করল, যখন সদ্য স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তন করে সরাসরি প্রত্যক্ষ করল শাসক আওয়ামী লীগ এবং তাদের অণ্যান্য অঙ্গ সংগঠনগুলোর মধ্যে ক্ষমতা এবং সম্পদ ভাগাভাগি এবং লুটপাটের দৃশ্য ও মহড়া। অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধের সেই সেই সুনির্দিষ্ট চেতনায় যারা সমৃদ্ধ ছিল, তার যুদ্ধ চলাকালীণ অবস্থায়ই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিল আওয়ামী লীগের আচার-আচরণ দেশে ফিরে কি হবে।
সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের ঐ চেতনাধারী সামাজিক এবং রাজনৈতিক শক্তিসমূহ স্বাধীনতা-উত্তরকালে আর আওয়ামী লীগের সহযোগিতা করে চলতে তো পারেইনি বরং স্বার্থপর এবং ভোগী আওয়ামী লীগের বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। আর যারা মুক্তিযুদ্ধের ঐ চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিল না বা হতেও পারেনি, তারা মুক্তিযুদ্ধের পরে চরম ভাবে আশাহত হয়েই বাধ্য হয়েছে যার যার পুরানো সামাজিক অবস্থানে ফিরে দিয়ে অতৃপ্ত আত্মার কেবল পরিতাপই ভোগ করে চলতে। সংখ্যায় তারাই অধিক এবং তাদের সাথে রয়েছে সমস্ত জনগোষ্ঠী, যারা পরোক্ষ কিম্বা প্রত্যক্ষভাবে মু্ক্তিযুদ্ধের হয় সমর্থক ছিল, না হয় ছিল মুক্তিযুদ্ধের সুফল লাভের বুকভরা আশায় অপেক্ষমাণ।
এই বিশাল আশাহত জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাধীনতার ১৭ বছর পরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ হওয়ার আবেদন-নিবেদন জানানোর ব্যাপারটি কি সম্পূর্ণই অর্থহীন এবং এক ধরনের প্রতারণা নয়? এই বিশাল জনগোষ্ঠী মু্ক্তিযুদ্ধের ১৭ বছর পরে পুনরায় সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অর্জনের কোন প্রয়োজনবোধ করছে না, কারণ মু্ক্তিযুদ্ধে তারা তাদের সন্তান হরিয়েছে, পিতা হারিয়েছে, স্বামী হারিয়েছে, মা, বোন, কন্যা এবং স্ত্রী হারিয়েছে, ঘর-বাড়ী এবং সম্পদ হরিয়েছে, হারিয়েছে আরো অনেক কিছু। তাদের মধ্যে মু্ক্তিযুদ্ধের চেতনা তখনও ছিল না, তাদের মধ্যে ছিল শেখ মুজীবের প্রতি ভাল বাসা, বিশ্বাস এবং স্বাধীণতা লাভের পর স্বাধীনতা ভোগের নিজস্ব চিন্তা-চেতনা এবং অফুরন্ত আশা। তারা যখন প্রত্যক্ষ করল স্বাধীনতা কেবল শাসক আওয়ামী লীগের লোকজনের জন্যই ভোগ এনেছে, তাদের জন্য নয়, তখন তারা রাতারাতিই আওয়ামী লীগ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে, কারণ যেখানেই প্রত্যাশা, সেখানেই হতাশা। এ দেশের হিন্দু সম্প্রদায় যারা আওয়ামী লীগের ঘোর সমর্থক ছিল, তারা দেশে প্রত্যাবর্তন করে যখন দেখল আওয়ামী লীগই তাদের ভিটে-ভূমি ‘শত্রু সম্পত্তি’র নাম দিয়ে দখল করে নিচ্ছে, তখনই আওয়ামী লীগ সম্পর্কে তাদের মোহভঙ্গ হতে শুরু করে।
বেকার ছাত্র-যুবক যখন দেখল স্বাধীনতা তাদের যোগ্য স্থান কিম্বা কর্মসংস্থান করতে ব্যর্থ হচ্ছে, শিক্ষক যখন দেখল স্বাধীনতা তার মান-মর্যাদা রক্ষা করতে সমর্থ হচ্ছেনা, বুদ্ধিজীবীরা যখন দেখল সমাজে তাদের মূল্য নেই, সেনাবাহিনী যখন দেখল স্বাধীনতা তাদের গৌরব অক্ষুন্ন রাখতে সক্ষম হচ্ছে না, তখনই কেবল তারা নিজ নিজ মানসিকতা দিয়ে মু্ক্তিযুদ্ধের ব্যাখ্যা প্রদান করা শুরু করল। এ দোষ বা ব্যর্থতা তাদের নয়, এ ব্যর্থতার জন্য দায়ী সমাজের সেই সচেতন অংশই, যারা যুদ্ধের সময় ব্যাপক জনগোষ্ঠী এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ঐ চেতানা উপস্থাপন করতে অপারগ হয়েছে।
তাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন, সমর্থন কিম্বা সহযোগিতা করলেই কেবল মুক্তিযুদ্ধা হওয়া যায় না। মু্ক্তিযুদ্ধা প্রকৃতপক্ষে তারাই কেবল হতে পারে,যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পরিপুষ্ট। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যারা পরিপুষ্ট ছিল, তাদের মধ্যে হতাশা নেই, তাদের মধ্যে রয়েছে নবতর সংগ্রামের তীব্র যাতনা-দাহ।
মুক্তিযুদ্ধের জনক হিসেবে পরিচিত মরহুম জনাব শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে অবগত থাকলেও সেই চেতনায় তিনি পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাসী ছিলেন না বলেই ক্ষমতালাভের পরে তার মধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে মারাত্মক দ্বন্দ এবং অস্থিরতা, যার ফলে তিনি কখনো হয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবার কখনো বা দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধান মন্ত্রীত্বের। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যেও তদ্রুপ পরিলক্ষিত হয়েছে দোদুল্যমানতা এবং সীমাহীন ক্ষমতা-সম্পদ লাভের মোহ। তারা সকলেই কেবল ক্ষমতার সখ মিটিয়েছে কারণ মুক্তিযুদ্ধ তাদের কাছে ছিল কেবল ক্ষমতা লাভের হাতিয়ার মাত্র, চেতনার উৎস নয়।
এর বাইরে রয়েছে জনগোষ্ঠীরই আর একটি বিরাট অংশ যারা আদর্শগতভাবে পাকিস্তানের পক্ষে থেকে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান করেছে। এদেরে কাছে সেই ৭১-এও যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কোন মূল্য ছিল না, আজও তেমনি নেই। এরা বরং মু্ক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে কথিত শাসক গোষ্ঠীর ব্যর্থতা অবলোকনের পরে নিজস্ব যু্ক্তি, আদর্শ অবস্থানের দিক দিয়ে পূর্বের তুলনায় অনেক বেশী শক্তিশালী অবস্থানে বিরাজ করছে বর্তমানে। এমতাবস্থায় সমাজের সর্বাধিক সচেতন গোষ্ঠির কাছ থেকেও যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য আহ্বান জানান হয়, তাতেও দেশের বঞ্চিত জনগণের সাড়া পাওয়া যাবে কিনা সে বিষয়টি এখন আর গবেষণারও বস্তু নয়। যে মুক্তর জাগরণ মানুষকে নিরাশ করেছে, সে মুক্তির আহবানে নতুন করে সাড়া না দেয়াটাই স্বাভাবিক। মুক্তির নতুন আহবান কেবল নতুন চেতনা জাগরণের মাধ্যমেই সম্ভব। সমাজের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি অংশের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সীমাবদ্ধ রেখে সেই চেতনাকে মুক্তিযুদ্ধে জনগণের চেতনা হিসাবে আরোপিত করার প্রবণতা কএক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতারই শামিল। এধরনের প্রবণতা ন উক্ত চেতনাকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম, না সক্ষম সেই চেতনার পুনঃবিকাশ ঘটাতে। জনগনের অতি ক্ষুদ্র একটা অংশের খেয়ালী এবং রোমান্টিক চেতনা কোনদিনই বাস্তবতাকে মুছে দিয়ে জাতীয় চেতনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয় না।

দ্বিতীয় অধ্যায় : মুক্তিযুদ্ধপূর্ব তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান

আওয়ামী লীগের ৬দফা দাবী ভিত্তিক নির্বাচনে ব্যাপক বিজয় লাভ সমগ্র জাতীকেই উৎসাহিত এবং অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৯৭০ সনের সেই নির্বাচনী ফলাফল বাঙালী জাতীয়তাবাদেরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। আমার কাছে। সেদিন আওয়ামী লীগের বিজয় জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছিল। আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাসী নয় এবং আওয়ামী লীগ বহিভূত এদেশের বুদ্ধিজীবী, আমলা, সেনাবাহিন, পুলিশ, ই,পি,আর, আনসার সহ সাধারণ জনগণও আওয়ামী লীগের বিজয়ে অভূতপূর্ব উল্লাসিত হয়েছিল। সে মুহূর্তে আওয়ামী লীগ অতি সার্থকভাবেই জাতীয়তাবাদী চেতনার ধারণ এবং লালন করেছিল । স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে, ক্ষেতে-খামারে, অফিস-আদালতে, হাটে-ঘাঠে-মাঠে, নদীতে-সাগরে এমনকি বিদেশে-বিভূঁয়ে বসবাসরত প্রত্যেকটি বাঙালী বুক জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বেলিত আলোড়িত হয়ে উঠেছিল। আমরা বিহারী নই, আমরা নই পাঞ্জাবী, আমাদের পরিচয় ‘আমরা বাঙালী’ এই চেতনাবোধে জাগরিত হয়ে উঠেছিল বাঙালীর মন ও প্রাণ। এর ব্যতিক্রম ছিল কেবল তারাই, যারা ৭০-এর সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিরোধী ভূমিকায় লিপ্ত হয়ে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করেছিল। তারা আওয়ামী লীগের বিজয়ে খুশী তো হতে পারেই নি, বরং শংকিত এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। তখন থেকেই তাদের মনে এ ধারনা বদ্ধমূল হয়ে ওঠে যে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভূতপূর্ব বিজয়ের পেছনে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের কারসাজি ছিল। অনেকে এ কথাও প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, ১৯৪৭ সনের ভারত বিভক্তির সময় যে সকল হিন্দুরা পূর্ববঙ্গ ছেড়ে পশ্চিম বঙ্গে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য চলে গিয়েছিল তাদের বেশ একটা সংখ্যা বর্ডার পাড়ি দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবের পক্ষে ভোট প্রদান করার জন্য চলে আসে। এটা সত্য কি মিথ্যা তা জানা নেই। স্বাধীনতার এত বছর পরে এধরনের একটি অভিযোগ শুনতে অনেকের কাছেই আজগুবি মনে হলেও ব্যাপারটি আজ পর্যন্ত তলিয়ে দেখা হয়নি, কিম্বা দেখার তাগিদও বোধ করেনি কেউ। আদৌ এমনটি হয়েছিল কিনা? হলে তা কি স্বতঃষ্ফূর্ত ভাবেই হয়েছিল, না পূর্ব পরিকল্পিত? এ ধরনের পরিকল্পনার পেছনে উদ্দেশ্য কি ছিল- শুধুই কেবল আওয়াম লীগের বিজয়কে নিশ্চিত করা, না আরো সুদূর প্রসারী কিছু? এটা কি তবে প্রতিবেশী রাষ্ট ভারতেরই মগজের খেলা ছিল, না আওয়ামী নেতৃত্বও এ সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ণ ওয়াকিফহাল? স্বাধীনতার ১৭ বছর পরেও আমার মত একজন সাধারণ লড়াকু মুক্তিযোদ্ধার মনে এ প্রশ্নগুলো নিভৃতে উঁকি-ঝুঁকি মারে এ কারণেই যে, ২৫শে মার্চের সেই ভয়াল রাতের হিংস্র ছোবলের সাথে সাথেই পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী এবং পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংস সদস্যবর্গ কি করে পাকিস্তানের শত্রু হিসাবে পরিচিত ভারতের মাটিতে আশ্রয় গ্রহণের জন্য ছুটে যেতে পারল? কোন সাহসে, কিম্বা কোন আস্থার উপর ভর করেই বা তারা দলে দলে ভারতের মাটিতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল? তাহলে কি গোটা ব্যাপারটিই ছিল পূর্ব পরিকল্পিত? তাহলে কি স্বাধীনতা বিরোধী বলে পরিচিত ইসলামপন্থী দলগুলোর শঙ্কা এবং অনুমান সত্য ছিল? তাদের শঙ্কা এবং অনুমান যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে দেশ প্রেকিক কারা? আমরা মুক্তিযোদ্ধারা না রাজাকার-আলবদর হিসেবে পরিচিত তারা? এ প্রশ্নের মীমাংসা আমার হতে নয়, সত্যের উদ্‌ঘাটনই কেবল এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর নির্ধারণ করবে। উত্তর যা-ই হোক, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার চিরদিনেরই দাবী থাকবে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা-আমিই সাচ্চা দেশপ্রেমিক। অন্যায়কে আমি ঘৃণঅ করতে শিখেছি, অন্যায়কে আমি চিরদিনই ঘৃণা করব। নির্যাতিত মানবতার পাশে আমি দাঁড়িয়েছি বলে আমি গর্বিত। আমার গর্ব খাটো করার অধিকার কারো নেই। ষড়যন্ত্রের কালোহাত আমি দেখিনি, আমি দেখেছি গণহত্যা। তাই রুখে দাঁড়িয়েছি হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে।
কারো পূর্ব-পরিকল্পনা খতিয়ে দেখার সময় আমার ছিল না। আমার সম্মুখে ছিল দায়িত্ব, আমি তা কেবল পালন করেছি। যুদ্ধের মাধ্যমে মানবতার সেবা কতটুকু হয়েছে জানিনে, তবে অপরাধীদের মোকাবেলা আমি সক্ষম ভাবেই করেছি। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাস হিসেবে আমি নিপীড়িত ছিলাম। সেনাবাহিনীতে আমাকে ভেতো বাঙালী বলে উপহাস ও কৌতুক করা হতো। ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পরে আমি ব্যক্তিগত ভাবে দারুণ উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম। রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিক ভাবে হাতেখড়ি না থাকলেও আমি চেতনাহীন ছিলাম না। বাঙালীর জীবনের দুঃখ-কষ্ট আমাকে ভবিয়ে তুলত, বাঙালী, বাঙালী-পাঞ্জাবী দ্বন্ধ আমাকে পীড়া দিত। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য আমাকে লাঞ্চিত করত। তাই ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়ের মধ্যে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম আমার অবিকাশিত সত্তার মুক্তির প্রচ্ছন্ন ইংগিত। সত্য অনুসরণে আমার নিষ্ঠা থাকলেও প্রতিহিংসার অনল আমাকে অহরহ দাহন করেছে। এ অনল আমি জ্বলতে দেখেছি প্রত্যেকটি সাধারণ বাঙালীর বুকে। এই প্রতিহিংসার দাবানল বিষ্ফোরিত হলো আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বিজয়ের মধ্য দিয়ে। বিহারী তাড়াও, পাঞ্জাবী তাড়াও এক কথায় অবাঙালী পূর্ব পাকিস্তান খেকে তাড়াও এই চেতনাটি অত্যন্ত স্বতঃষ্ফূর্ত ভাবেই বিকশিত হতে লাগল। সত্তুরের শেষ এবং একাত্তুরের শুরুর সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে পূর্ব পাকিস্তানের সংগ্রামী জনগনের মাঝে বিজাতীয়দের প্রতি চরম ঘৃণা ও বিদ্বেষ পরিলক্ষিত হলেও ইসলাম ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ মোটেও পরিলক্ষিত হয়নি, অথবা ধর্মহীনতা আমাদের পেয়ে বসেনি। তৎকালীন সময়ে কট্টর আওয়ামী লীগের বলে পরিচিত নেতা-কর্মীদের মুখে ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ নাম গন্ধও শুনতে পাইনি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দামাল তরুণ-যুবকদের অধিকাংশই ছিল এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানের সন্তান-সন্ততি। যুদ্ধের রক্তাক্ত ময়দানেও আমি মু্ক্তিযোদ্ধাদের দেখেছি বাকায়দা নামায পড়তে,দুরূদ পাঠ করতে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শাসককুল পবিত্র ইসলাম ধর্মকে বিভিন্ন সময়ে তাদের হীন স্বার্থে ব্যবহার করেছে বিধায় তাদের বিরুদ্ধে সচেতন জনগণ সোচ্চার ছিল বটে, তবে প্রকাশ্যে পবিত্র ইসলাম ধর্মের প্রতি কোন মহলই ঘৃণা কিম্বা বিদ্বেষ প্রদর্শন করেনি। ইসলাম ধর্মের বিষয়টি আমি এখানে একারণে উল্লেখ করেছি যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বের ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধের পরের ইসলাম-এর মধ্যে হঠাৎ করে এমন কি ঘটে গেল যাতে ইসলামের কথা শুনলে। কোন কোন মহল পাগলা কুকুরের মত খিচিয়ে উঠেন। যে দেশের শতকরা নব্বইজনেরও অধিক পবিত্র ইসলাম ধর্মের অনুসারী, সেদেশে এ করুণ উন্মাদনার মধ্য দিয়ে ধর্মের নিকুচি করা কি আদৌ যুক্তিসম্মত। এই দুঃখজনক এবং লজ্জাকর অধ্যায়ের অধ্যায়ের জন্য দায়ী কে বা করা? বাস্তবতার অস্বীকৃতিই প্রতিক্রিয়াশীলতা নয় কী? অপরদিকে বাস্তবতার স্বীকৃতিই প্রগতির শর্ত এবং দাবী নয় কী? তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভেই বর্তমান বাংলাদেশ ভূমিষ্ঠ হয়েছে। সেই পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের আচার-আচরণ, উৎসব-অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ মুক্তিযুদ্ধের এক খোঁচায়ই কি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে? এটা কি কারো খেয়াল-খুশির উপর নির্ভরশীল, না বাস্তব-নির্ভর? আমাদের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ, আমাদের জাতীয় জীবনকে সুষ্ঠুভাবে বিকশিত করতে সক্ষম। সত্যানুরাগই কেবল আমাদের মুক্তির দিশারী হতে পারে অন্যথায় আমাদের ধ্বংসের জন্য আমরাই যথেষ্ট। এ বিষয়ে অধিকতর আলোচনা পরবর্তী অধ্যায় সমূহে সন্নিবেশিত করা হবে।

সবিস্তার সূচীপত্র
টেম্পলেট কাষ্টমাইজেশন - তরঙ্গ ইসলাম | তরঙ্গ ইসলাম