কাজী নজরুল ইসলামের বইসমূহ

প্রিয়কবির প্রিয় বইগুলো একসাথে রাখার চেষ্টা। এর আগে আমরা প্রিয় কবির কবিতাগুলো আলাদাভাবে সংকলন করার চেষ্টা করেছিলাম (লিঙ্ক) । এবার কিছু পিডিএফ রাখা হলো।

কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের প্রাণের কবি, আমাদের মনন ও চেতনায় তিনিই তো প্রথম ডাক দিয়েছিলেন বিদ্রোহী হতে, কোন শাসকের অন্যায়ের কাছে নয়, মানবতার জন্য জীবনের সব অর্জন- এমনই ছিল কবির জীবনদর্শন।

এক ভাষণে তিনি এও বলেছেন, আপনারা জেনে রাখুন, আল্লাহ ছাড়া আর কিছুর কামনা আমার নেই। ‘লীডার’ হওয়ার লোভ ও দুর্গতি থেকে আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছেন। আজ মোল্লা মৌলভী সাহেবদের মুসলমানীর ফখরের কাছে টেকা দায়। কিন্ত তাদের আজ যদি বলি, যে ইসলামের অর্থ আত্মসমর্পণ, আল্লাহ তায়ালার সেই পরম আত্মসমর্পণ কার হয়েছে? আল্লাহে পূর্ণ আত্মসমর্পণ যার হয়েছে, তিনি এই মুহূর্তে এই দুনিয়াকে ফেরদৌসে পরিণত করতে পারেন।’  -(সোনারবাংলাদেশ)

এক আল্লাহ জিন্দাবাদ

http://a2.sphotos.ak.fbcdn.net/hphotos-ak-ash2/47986_148942065129014_148938045129416_280382_1738352_n.jpg

উহার প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ;
আমরা বলিব সাম্য শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ।
উহারা চাহুক সংকীর্ণতা, পায়রার খোপ, ডোবার ক্লেদ,
আমরা চাহিব উদার আকাশ, নিত্য আলোক, প্রেম অভেদ।

উহারা চাহুক দাসের জীবন, আমরা শহীদি দরজা চাই;
নিত্য মৃত্যু-ভীত ওরা, মোরা মৃত্যু কোথায় খুঁজে বেড়াই!
ওরা মরিবেনা, যুদ্ব বাধিঁলে ওরা লুকাইবে কচুবনে,
দন্তনখরহীন ওরা তবু কোলাহল করে অঙ্গনে ।

ওরা নির্জীব; জিব নাড়ে তবু শুধূ স্বার্থ ও লোভবশে,
ওরা জিন,প্রেত, যজ্ঞ, উহারা লালসার পাঁকে মুখ ঘষে ।
মোরা বাংলার নব যৌবন,মৃত্যুর সাথে সন্তরী,
উহাদের ভাবি মাছি পিপীলিকা, মারি না ক তাই দয়া করি।

মানুষের অনাগত কল্যাণে উহারা চির অবিশ্বাসী,
অবিশ্বাসীরাই শয়তানী-চেলা ভ্রান্ত-দ্রষ্টা ভুল-ভাষী।
ওরা বলে, হবে নাস্তিক সব মানুষ, করিবে হানাহানি ।
মোরা বলি, হবে আস্তিক, হবে আল্লাহ মানুষে জানাজানি।

উহারা চাহুক অশান্তি; মোরা চাহিব ক্ষমাও প্রেম তাহার,
ভূতেরা চাহুক গোর ও শ্মশান, আমরা চাহিব গুলবাহার !
আজি পশ্চিম পৃথিবীতে তাঁর ভীষণ শাস্তি হেরি মানব
ফিরিবে ভোগের পথ ভয়ে, চাহিবে শান্তি কাম্য সব।

হুতুম প্যাচারা কহিছে কোটরে, হইবেনা আর সূর্যোদয়,
কাকে আর টাকে ঠোকরাইবেনা, হোক তার নখ চষ্ণু ক্ষয়।
বিশ্বাসী কভু বলেনা এ কথা, তারা আলো চায়, চাহে জ্যোতি;
তারা চাহে না ক এই উৎপীড়ন এই অশান্তি দূর্গতি।

দাঙ্গা বাঁধায়ে লুট করে যারা, তার লোভী , তারা গুন্ডাদল
তার দেখিবেনা আল্লাহর পথ চিরনির্ভয় সুনির্মল ।
ওরা নিশিদিন মন্দ চায় , ওরা নিশিদিন দ্বন্ধ চায়,
ভূতেরা শ্রীহীন ছন্দ চায়, গলিত শবের গন্ধ চায়!

নিত্য সজীব যৌবন যার, এস এস সেই নৌ-জোয়ান
সবক্লৈব্য করিয়েছে দূর তোমাদেরই চির আত্বদান !
ওরা কাদা ছুড়ে বাঁধা দেবে ভাবে -ওদের অস্ত্র নিন্দাবাদ,
মোরা ফুল ছড়ে মারিব ওদের, বলিব - ‘‘এক আল্লাহ জিন্দাবাদ”

রমজানের ঐ রোজার শেষে (ঈদ-সঙ্গীত বাজনাবিহীন)




ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ।
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাকিদ ।।

তোর সোনাদানা বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ
দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ।।

তুই পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে
যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ।।

আজ ভুলে গিয়ে দোস্ত-দুশমন হাত মিলাও হাতে,
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরীদ।।

যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা নিত্-উপবাসী
সেই গরীব ইয়াতীম মিসকিনে দে যা কিছু মফিদ।।

ঢাল হৃদয়ে তোর তশতরীতে শিরনী তৌহিদের,
তোর দাওত কবুল করবেন হযরত, হয় মনে উমীদ।।

তোরে মারল ছুঁড়ে জীবন জুড়ে ইঁট পাথর যারা
সেই পাথর দিয়ে তোল রে গড়ে প্রেমেরি মসজিদ।।

(কাজী নজরুল ইসলাম)

ছাত্রদলের গান

.                আমরা শক্তি আমরা বল
.                        আমরা ছাত্রদল |
মোদের         পায়ের তলায় মূর্ছে তুফান
.                        ঊর্ধ্বে বিমান ঝড়-বাদল |
.                                আমরা ছাত্রদল ||


মোদের         আঁধার রাতে বাধার পথে
.                        যাত্রা নাঙ্গা পায়,
আমরা                শক্ত মাটী রক্তে রাঙাই
.                        বিষম চলার ঘাস |
.                যুগে যুগে রক্তে মোদের
.                        সিক্ত হ’ল পৃথ্বীতল |
.                                 আমরা ছাত্রদল ||


মোদের         কক্ষচ্যুত-ধূমকেতু-- প্রায়
.                         লক্ষ্যহারা প্রাণ
আমরা                ভাগ্যদেবীর  যজ্ঞবেদীর
.                        নিত্য বলিদান |
যখন                লক্ষ্মীদেবী  স্বর্গে উঠেন
.                        আমরা পশি নীল অতল !
.                                   আমরা ছাত্রদল ||


আমরা                 ধরি মৃত্যু রাজার
.                        যজ্ঞ-ঘোড়ার রাশ,
মোদের         মৃত্যু লেখে মোদের
.                        জীবন--ইতিহাস !
            হাসির দেশে আমরা আনি
.                        সর্বনাশী চোখের জল
.                               আমরা ছাত্রদল ||


.                সবাই যখন বুদ্ধি যোগায়
.                        আমরা করি ভুল !
.                সাবধানীরা বাঁধ বাঁধে সব,
.                        আমরা ভাঙি কূল |
.                দারুণ-রাতে আমরা তরুণ
.                        রক্তে করি পথ পিছল !
.                                   আমরা ছাত্রদল ||       


মোদের                চক্ষে জ্বলে জ্ঞানের মশাল,
.                        বক্ষে ভরা বাক্,
.                কন্ঠে মোদের কুন্ঠাবিহীন
.                        নিত্য কালের ডাক |
আমরা                তাজা খুনে লাল ক’রেছি
.                        সরস্বতীর শ্বেত কমল |
.                                    আমরা ছাত্রদল ||       


ঐ                দারুণ উপপ্লবের দিনে
.                        আমরা দানি শির,
.                মোদের মাঝে মুক্তি কাঁদে
.                        বিংশ শতাব্দীর !
মোরা                গৌরবেরি কান্না দিয়ে
.                        ভ’রেছি মা’র শ্যাম-আঁচল |
.                                আমরা ছাত্রদল ||


.                আমরা রচি ভালোবাসার
.                        আশার ভবিষ্যৎ,
মোদের                স্বর্গ-পথের অভাস দেখায়
.                        আকাশ-ছায়াপথ !
.                মোদের চোখে বিশ্ববাসীর
.                        স্বপ্ন দেখা হোক সফল |
.                                আমরা ছাত্রদল ||


সর্বহারা , কাজী নজরুল ইসলাম

মোহররম

নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া,-
“আম্মা ! লা’ল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া !”
কাঁদে কোন্ ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে,
সে কাঁদনে আঁসু আনে সীমারেরও ছোরাতে !
রুদ্র মাতম্ ওঠে দুনিয়া-দামেশ্ কে-
“জয়নালে পরালো এ খুনিয়ারা বেশ কে ?”
‘ হায় হায় হোসেনা’,  ওঠে রোল ঝঞ্ঝায়,
তল্ ওয়ার কেঁপে ওঠে এজিদেরো পঞ্জায় !
উন্ মাদ ‘দুল্ দুল্’ ছুটে ফেরে মদিনায়,
আদি-জাদা হোসেনের দেখা হেথা যদি পায় !
মা ফতেমা আস্ মানে কাঁদে খুলি কেশপাশ,
বেটাদের লাশ নিয়ে বধূদের শ্বেতবাস !
রণে যায় কাসিম ঐ দু’ঘড়ির নওশা,
মেহেদীর রঙটুকু মুছে গেল সহসা !
‘হায় হায়’ কাঁদে বায় পূরবী ও দখিনা----
‘কঙ্কণ পঁইচি খুলে ফেল সকীনা !’
কাঁদে কে রে কোলে ক’রে কাসিমের কাটা-শির ?
খান্ খান্ হয়ে ক্ষরে বুক-ফাটা নীর !
কেঁদে গেছে থামি’ হেথা মৃত্যু ও রুদ্র,
বিশ্বের ব্যথা যেন বালিকা এ ক্ষুদ্র !
গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা,
“আম্মা গো পানি দাও ফেটে গেল ছাতি মা !”
নিয়ে তৃষা সাহারার, দুনিয়ার হাহাকার,
কারবালা-প্রান্তরে কাঁদে বাছা আহা কার !
দুই হাত কাটা তবু শের-নর আব্বাস,
পানি আনে মুখে, হাঁকে দুশ্ মনও ‘সাব্বাস্’ !
দ্রিম্ দ্রিম্ বাজে ঘন দুন্দুভি দামামা,
হাঁকে বীর “শির দেগা, নেহি দেগা আমামা !”
কলিজা কাবাব সম ভুনে মরু-রোদ্দুর,
খাঁ-খাঁ করে কারবালা, নাই পানি খর্জ্জুর,
মা’র স্তনে দুধ নাই, বাচ্চারা তড়্ পায় !
জিভ চুষে’ কচি জান থাকে কিরে ধড়্ টায় ?
দাউ দাউ জ্বলে শিরে কারবালা-ভাস্কর,
কাঁদে বানু----“পানি দাও, মরে যাদু আস্ গর !”
পেলো না তো পানি শিশু পিয়ে গেল কাঁচা খুন,
ডাকে মাতা, পানি দেবো ফিরে আয় বাছা শুন্ !
পুত্রহীনার আর বিধবার কাঁদনে
ছিঁড়ে আনে মর্ম্মের বত্রিশ বাঁধনে !
তাম্বুতে শয্যায় কাঁদে একা জয়নাল,
“দাদা ! তেরি ঘর্ কিয়া বরবাদ্ পয়মাল !”
‘হাইদরী-হাঁক-হাঁকি দুলদুল-আসওয়ার
শম্ শের চম্ কায় দুষমনে ত্রাস্ বার |
খ’সে পড়ে হাত হ’তে শত্রুর তরবার,
ভাসে চোখে কিয়ামতে আল্লার দরবার !
নিঃশেষ দুষমন্ ; ও কে রণ-শ্রান্ত
ফোরাতের নীরে নেমে মুছে আঁখি-প্রান্ত ?
কোথা বাবা আস্ গর? শোকে বুক-ঝাঁঝরা
পানি দেখে হোসেনের ফেটে যায় পাঁজরা !
ধুঁকে ম’লো আহা তবু পানি এক কাৎরা
দেয় নি রে বাছাদের মুখে কম্ জাত্ রা !
অঞ্জলি হ’তে পানি প’ড়ে গেল ঝর্-ঝর্,
লুটে ভূমে মহাবাহু খঞ্জর-জর্জ্জর !
হল্ কুমে হানে তেগ ও কে ব’সে ছাতিতে ?--
আফ্ তাব ছেয়ে নিল আঁধিয়ারা রাতিতে |
‘আস্ মান’ ভ’রে গেল গোধূলিতে দুপুরে,
লাল নীল খুন ঝরে কুফরের উপরে !
বেটাদের লোহু-রাঙা পিরাহান-হাতে, আহ্----
‘আরশের’ পায়া ধরে, কাঁদে মাতা ফাতেমা,
“ এয়্ খোদা বদ্ লাতে বেটাদের রক্তের
মার্জ্জনা কর গোনা পাপী কম্ বখতের |”
কত মোহর্ রম এলো, গেল চ’লে বহু কাল---
ভুলিনি গো আজো সেই শহীদের লোহু লাল !
মুস্ লিম ! তোরা আজ ‘জয়নাল আবেদীন্’ ,
‘ওয়া হোসেনা-----ওয়া হোসেনা’ কেঁদে তাই যাবে দিন !
ফিরে এলো আজ সেই মোহর্ রম মাহিনা,------
ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না !
উষ্ণীষ কোরানের, হাতে তেগ্ আরবীর,
দুনিয়াতে নত নয় মুস্ লিম কারো শির,-----
তবে শোন ঐ বাজে কোথা দামামা,
শম্ শের হাতে নাও, বাঁধো শিরে আমামা !
বেজেছে নাকাড়া, হাঁকে নকীবের তুর্য্য,
হুঁশিয়ার ইসলাম, ডুবে তব সূর্য্য !
জাগো ওঠ মুস্ লিম, হাঁকো হাইদরী হাঁক |
শহীদের দিনে সব লালে-লাল হ’য়ে যাক্ !
নওশার সাজ নাও খুন-খচা আস্তীন,
ময়দানে লুটাতে রে লাশ এই খাস্ দিন !
হাসানের মতো পি’ব পিয়ালা সে জহরের,
হোসেনের মতো নিব বুকে ছুরি কহরের ;
আস্ গর সম দিব বাচ্চারে কোর্ বান,
জালিমের দাদ নেবো, দেবো আজ গোর জান !
সকীনার শ্বেতবাস দেবো মাতা কন্যায়,
কাসিমের মত দেবো জান রুধি’ অন্যায় !
মোহর্ রম্ ! কারবালা ! কাঁদো “হায় হোসেনা !”
দেখো মরু-সূর্য্যে এ খুন যেন শোষে না !

অগ্নিবীণা , কাজী নজরুল ইসলাম

কোরবানী

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্-বোধন !
.  দুর্ব্বল ! ভীরু ! চুপ রহো, ওহো খাম্ খা ক্ষুব্ধ মন !
.                ধ্বনি ওঠে রণি’ দূর বাণীর,----
.                আজিকার এ খুন কোর্ বানীর !
.                দুম্বা-শির           রুম্-বাসীর
.   শহীদের শির-সেরা আজি !-----  রহ্ মান কি রুদ্র নন ?
.                ব্যস্ !   চুপ খামোশ রোদন !
আজ  শোর ওঠে জোর “ খুন দে, জান দে, শির দে বত্স”  শোন্ !
ওরে  হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’  শক্তির  উদ্-বোধন !


ওরে        হত্যা নয় আজ  ‘সত্য-গ্রহ’  শক্তির উদ্ধোধন !
.                খঞ্জরে মারো গর্দ্দানেই,
.                পঞ্জরে আজি দরদ্ নেই,
.                মর্দ্দানীই             পর্দ্দা নেই,
.        ডর্ তা নেই আজ খুন-খারাবীতে রক্ত-লুব্ধ মন !
.                খুনে          খেল্ বো খুন-মাতন !
দুনো        উন্ মাদনাতে সত্য মুক্তি আন্ তে যুঝ্ বো রণ !
ওরে        হত্যা নয়  আজ ‘সত্য-গ্রহ’  শক্তির  উদ্ধোধন !


ওরে         হত্যা  নয় আজ   ‘সত্য-গ্রহ’  শক্তির উদ্ধোধন !
.                চ’ড়েছে খুন আজ খুনিয়ারার
.                মুস্ লিমে সারা দুনিয়াটার !
.                ‘জুল্ ফেকার’     খুল্ বে তার
.        দু’ধারী ধার শেরে-খোদার,  রক্তে-পূত-বদন !
.                খুনে        আজকে রুধ্ বো মন !
ওরে        শক্তি-হস্তে    মুক্তি , শক্তি রক্তে সুপ্ত শোন্ !
ওরে        হত্যা নয় আজ  ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন !



ওরে        হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’  শক্তির উদ্বোধন !
.                আস্তানা সিধা রাস্তা নয়,
.                ‘আজাদী’ মেলে না পস্তানো’য় !
.                দস্তা নয়                সে সস্তা নয় !
.         হত্যা নয় কি মৃত্যুও ?          তবে রক্ত-লুব্ধ কোন্
.                কাঁদে----     শক্তি-দুস্ত শোন্-------
“এয়্        ইবরাহীম আজ  কোরবানী  কর শ্রেষ্ঠ পুত্র ধন !”
ওরে        হত্যা নয় আজ  ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন !

ওরে        হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’  শক্তির উদ্ভোধন !
.                এ তো নহে লোহু তরবারের
.                ঘাতক জালিম জোর্ বারের !
.                কোরবানের  জোর-জানের
.        খুন এ যে, এতে গোর্দ্দা ঢের রে, এ ত্যাগে ‘বুদ্ধ’ মন !
.                এতে মা রাখে পুত্র পণ !
তাই        জননী হাজেরা বেটারে পরালো বলির পূত বসন !
ওরে         হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন !


ওরে         হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’  শক্তির উদ্বোধন !
.                এই দিন-ই ‘মীনা’- ময়দানে’
.                পুত্র-স্নেহের গর্দ্দানে
.                ছুরি হেনে’ খুন ক্ষরিয়ে নে’
.        রেখেছে আব্বা ইব্ রাহীম্ সে আপনা রুদ্র পণ !
.                ছি ছি !  কেঁপো না  ক্ষুদ্র মন !
আজ        জল্লাদ নয়,  প্রহ্লাদ-সম মোল্লা খুন-বদন !
ওরে        হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’  শক্তির উদ্বোধন !


ওরে        হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন !
দ্যাখ        কেঁপেছে ‘আরশ’ আস্ মানে !
.                মন-খুনী কি  রে রাশ মানে ?
.                ত্রাসে-প্রাণে ----তবে রাস্তা নে !
প্রলয়-বিষাণ ‘কিয়ামতে’  তবে বাজাবে কোন্ বোধন ?
.                সে কি                    সৃষ্টি-সংশোধন ?
ওরে         তাথিয়া তাথিয়া নাচে ভৈরব বাজে ডম্বরু শোন্ !----
ওরে         হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন !


ওরে        হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’  শক্তির উদ্বোধন !
.                মুসলিম-রণ-ডঙ্কা সে,
.                খুন্ দেখে করে শঙ্কা কে ?
.                টঙ্কারে অসি ঝঙ্কারে,
ওরে        হুঙ্কারে, ভাঙি গড়া ভীম-কারা, ল’ড়বো রণ-মরণ !
.                ঢালে বাজ্ বে ঝন্-ঝনন্ !
ওরে        সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন !
ওরে         হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন !


ওরে        হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’   শক্তির উদ্বোধন !
.                জোর চাই, আর যাচ্ না নয়,
.                কোরবানী-দিন আজ না ওই ?
.                বাজ্ না কই ?   সাজ্ না কই ?
.        কাজ না আজিকে জান্ মাল দিয়ে মুক্তির উদ্ধরণ ?
.                বল্----“ যুঝ্ বো জান্ ভি পণ !”
ঐ        খুনের খুঁটিতে কল্যাণ-কেতু, লক্ষ্য ঐ তোরণ,
আজ        আল্লার নামে জান্ কোরবানে ঈদের পূত বোধন !
ওরে        হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন !

অগ্নিবীণা , কাজী নজরুল ইসলাম

রণ-ভেরী

[গ্রীসের বিরুদ্ধে আঙ্গোরা--তুর্ক--গভর্ণমেন্ট যে যুদ্ধ চালাইতেছিলেন, সেই যুদ্ধে কামাল পাশার সাহায্যের  জন্য ভারতবর্ষ হইতে দশ হাজার স্বেচ্ছা-সৈনিক প্রেরণের প্রস্তাব শুনিয়া লিখিত | ]


                ওরে                         আয় !
ঐ       মহা-সিন্ধুর  পার হ’তে ঘন  রণ-ভেরী শোনা যায়-
.                ওরে                        আয় !  
.                ঐ        ইসলাম  ডুবে  যায় !

.                যত                        শয়তান
.                সারা                       ময়দান
জুড়ি’    খুন তার পিয়ে হুঙ্কার দিয়ে জয়-গান শোন্ গায় !

.         আজ সখ ক’রে                 জুতি--টক্করে
তোড়ে   শহীদের  খুলি দুশ্ মন পায়  পায়-
.                ওরে                         আয় !

তোর    জান যায় যাক,  পৌরুষ তোর মান যেন নাহি যায় !
ধরে     ঝঞ্ঝার ঝুঁটি দাপটিয়া  শুধু মুসলিম-পঞ্জায় !
.         তোর মান যায়                      প্রাণ যায়-

তবে     বাজাও  বিষাণ, ওড়াও নিশান ! বৃথা  ভীরু সম্ ঝায় !
.                রণ-দুর্ম্মদ          রণ চায় !
.                ওরে                   আয় !
ঐ        মহাসিন্ধুর পার হ’তে ঘন রণ-ভেরী শোনা যায় !


.                ওরে                    আয় !
ঐ        ঝন-নন-নন   রণ-ঝন-ঝন  ঝঞ্ঝনা শোনা যায় !
শুনি        এই ঝঞ্ঝনা-ব্যঞ্জনা  নেবে গঞ্জনা  কে  রে  হায় ?
.                ওরে                           আয় !
.        তোর    ভাই  ম্লান চোখে চায়,
.                মরি                        লজ্জায়,
.                ওরে                       সব যায়,
তবু     কব্ জায় তোর শম্ শের নাহি কাঁপে আফ্ সোসে হায় ?
.         রণ        দুন্দুভি শুনি’ খুন-খুবী
নাহি        নাচে কি  রে তোর মরদের ওরে দিলীরের গোর্দ্দায় ?
.                ওরে                        আয় !
মোরা  দিলাবার  খাঁড়া তলোয়ার হাতে আমাদেরি শোভা পায় !
তারা   খিঞ্জির যারা জিঞ্জীর-গলে  ভূমি চুমি’  মুরছায় !
.                আরে দূর দূর !   যত কুক্কুর
আসি   শের-বব্বরে  লাথি মারে ছি  ছি  ছাতি চ’ড়ে ! হাতি
.                                        ঘাল হবে ফেরু-ঘায় ?
ঐ      ঝননননন   রণঝন ঝন   ঝঞ্ঝনা শোনা যায় !
.                ওরে                        আয় !
বোলে  দ্রিম্  দ্রিম্ তানা দ্রিম্  দ্রিম্  ঘন রণ-কাড়া নাকাড়ায় !
.        ঐ         শের  নর হাঁকড়ায়------
.                   ওরে                আয় !
.                  ছোড়্                মন-দুখ,
.                  হোক্                কন্দুক
ঐ বন্দুক তোপ, সন্দুক তোর পড়ে থাক্, স্পন্দুক বুক ঘায় !

.        নাচ্  তাতা থৈ থৈ  তাতা থৈ--থৈ |
থৈ        তান্ডব,  আজ পান্ডব সম খান্ডব-দাহ চাই !
.                ওরে                 আয় !
কর্        কোর্ বান আজ তোর জান দিল্ আল্লার নামে ভাই !
ঐ        দীন্  দীন্-রব  আহব বিপুল বসুমতী ব্যোম ছায় !
.                শেল-                গর্জ্জন
.                করি’                 তর্জ্জন
হাঁকে        ‘বর্জ্জন  নয় অর্জ্জন’ আজ,  শির তোর  চায় মা’য় !
.                সব  গৌরব যায় যায় ;
.                ওরে                    আয় !
বোলে  দ্রিম্ দ্রিম্ তানা দ্রিম্ দ্রিম্ ঘণ রণ-কাড়া-নাকাড়ায় !
.                ওরে                    আয় !
ঐ            কড়  কড় বাজে রণ-বাজা,  সাজ সাজ রণ-সজ্জায় !
.                ওরে                    আয় !
.                মুখ  ঢাকিবি  কি লজ্জায় ?
.                হুর্                    হুর্ রে !
.                কত                    দূর  রে
সেই        পুর রে যথা-খুন-খোশ্ রোজ খেলে হররোজ দুশ্ মন-খুনে ভাই !
.        সেই     বীর-দেশে             চল  বীর-বেশে,
আজ        মুক্ত  দেশে রে  মুক্তি দিতে রে বন্দীরা ঐ যায় !
.                 ওরে                     আয় !
বল্        ‘জয় সত্যম্ পুরুষোত্তম্’ ভীরু যারা মা’র খায় !
নারী        আমাদেরি  শুনি’ রণ-ভেরী হাসে খল খল হাত-তালি
.                                                দিয়ে রণে ধায় !
.                মোরা রণ্ চাই              রণ চাই,
তবে        বাজহ দামামা,  বাঁধহ আমামা, হাথিয়ার পাঞ্জায় !
মোরা        সত্য ন্যায়ের সৈনিক,  খুন-গৈরিক বাস  গা’য়
.                ওরে                      আয় !
ঐ        কড় কড় বাজে রণ-বাজা,   সাজ সাজ রণ-সজ্জায় !
.                 ওরে                    আয় !
অব-        রুদ্ধের  দ্বারে যুদ্ধের  হাঁক নকীব ফুকারি’ যায় !
.                তোপ্  দ্রুম্  দ্রুম্  গান গায় !
.                ওরে                       আয় !
ঐ        ঝনন   রণণ   খঞ্জর-ঘাত  পঞ্জরে মূরছায় !
.                হাঁকো                      হাইদার,
.                নাই                      নাই ডর,
ঐ        ভাই তোর ঘুর-চর্খীর  সম খুন খেয়ে  ঘুর্ খায় !
.        ঝুটা    দৈত্যেরে     নাশি’ সত্যেরে
দিবি        জয়-টীকা তোরা,  ভয় নাই ওরে ভয় নাই হত্যায় !
.                ওরে                       আয় !
মোরা        খুন্-জোশী বীর,  কঞ্জুশী লেখা আমাদের খুনে নাই!
দিয়ে        সত্য ও  ন্যায়ে বাদশাহী , মোরা জালিমের খুন খাই !
.        মোরা দুর্দ্দম,                         ভর্ পুর্ মদ
খাই        ইশ্ কের,  ঘাত শম্ শের ফের নিই বুক নাঙ্গায় !
.        লাল-         পল্টন মোরা সাচ্চা,
মোরা         সৈনিক,   মোরা শহীদান বীর বাচ্চা,
.        মরি            জালিমের  দাঙ্গায় !
মোরা         অসি বুকে বরি’  হাসি মুখে করি’ জয় স্বাধীনতা গাই !
.                ওরে                        আয় !
ঐ        মহা-সিন্ধুর  পার হ’তে  ঘন রণ-ভেরী শোনা যায় !!

অগ্নিবীণা , কাজী নজরুল ইসলাম

আনোয়ার



[ স্থান---প্রহরী বেষ্টিত অন্ধকার কারাগৃহ, কনষ্ট্যান্টিনোপল্ |
কাল---অমাবস্যার নিশীথ রাত্রি | ]

চারিদেক নিস্তব্ধ নির্ব্বাক | সেই মৌনা নিশীথিনীকে ব্যথা দিতেছিল শুধু কাফ্রি--সান্ত্রীর পায়চারীর

বিশ্রী খট্ খট্ শব্দ | ঐ জিন্দান খানায় মহাবাহু আনোয়ারের জাতীয় সৈন্যদলের সহকারী এক তরুণ সেনানী বন্দী |তাহার কুঞ্চিত দীর্ঘ কেশ, ডাগর চোখ, সুন্দর গঠন---সমস্ত কিছুতে যেন একটা ব্যথিত -বিদ্রোহের তিক্ত-ক্রন্দন ছলছল করিতেছিল | তুরুণ প্রদীপ্ত মুখমন্ডলে চিন্তার রেখাপাতে তাহাকে তাহার বয়স অপেক্ষা অনেকটা বেশী বয়স্ক বোধ হইতেছিল|

সেই দিনই ধামা-ধরা সরকারের কোর্ট-মার্শালের বিচারে নির্দ্ধারিত হইয়া গিয়াছে যে, পরদিন নিশিভোরে তুরুণ সেনানীকে তোপের মুখে উড়াইয়া দেওয়া হইবে |

আজ হতভাগ্যের সেই মুক্তি-নিশীথ, জীবনের সেই শেষরাত্রি | তাহার হাতে পায়ে, কটিদেশে গর্দ্দানে উত্পীড়নের লৌহ- শৃঙ্খল | শৃঙ্খল-ভারাতুর তরুণ সেনানীর স্বপ্নে তাহার ‘মা’কে দেখিতেছিল | সহসা চীত্কার করিয়া সে জাগিয়া উঠিল | তাহার পর চারিদিকে কাতর নয়নে একবার চাহিয়া দেখিল, কোথাও কেহ নাই | শুধু হিমানী সিক্ত বায়ু হা হা স্বরে কাঁদিয়া গেল, “হায় মতৃহারা |”

স্বদেশবাসীর বিশ্বাসঘাতকতা স্মরণ করিয়া তুরুণ সেনানী ব্যর্থ-রোষে নিজের বামবাহু নিজে দংশন করিয়া ক্ষত-বিক্ষত করিতে লাগিল | কারাগৃহের লৌহশলাকায় তাহার শৃঙ্খলিত দেহভার বারেবারে নিপাতিত হইয়া কারা-গৃহ কাঁপাইয়া তুলিতেছিল |

এখন তাহার অস্ত্র-গুরু আনোয়ারকে মনে পড়িল | তুরুণ বন্দী চীত্কার করিয়া উঠিল,----

“আনোয়ার !”




আনোয়ার ! আনোয়ার !
দিলওয়ার তুমি, জোর তলওয়ার হানো , আর
নেস্ত্-ও-নাবুদ কর, মারো যত জানোয়ার !

আনোয়ার ! আফ্ সোস্ !
বখ্ তেরই সাফ্ দোষ্,
রক্তেরও নাই ভাই আর সে যে তাপ জোশ
ভেঙে গেছে শম্ শের-----পড়ে আছে খাপ কোষ !
আনোয়ার ! আফ্ সোস্ !

আনোয়ার ! আনোয়ার !
সব যদি সুম্ সাম্ , তুমি কেন কাঁদ আর ?
দুনিয়াতে মুসলিম আজ পোষা জানোয়ার !

আনোয়ার ! আর না !------
দিল্ কাঁপে কার না ?
তলওয়ারে তেজ নাই !---- তুচ্ছ স্মার্ণা,
ঐ কাঁপে থরথর মদিনার দ্বার না ?
আনোয়ার ! আর না !

আনোয়ার ! আনোয়ার !
বুক ফেড়ে আমাদের কলিজাটা টানো, আর
খুন কর----খুন কর ভীরু যত জানোয়ার !

আনোয়ার ! জিঞ্জির-
পরা মোর খিঞ্জির !
শৃঙ্খলে বাজে-শোনো রোণা রিণ-ঝিণ্ কির,----
নিবু নিবু ফোয়ারা বহ্নির ফিন্ কির !
গর্দ্দান জিঞ্জির !

আনোয়ার ! আনোয়ার !
দুর্ব্বল এ গিদ্ধড়ে কেন তড়্পানো আর ?
জোর্ ওয়ার শের কই ? জোর্ বার জানোয়ার !

আনোয়ার ! মুশ্ কিল
জাগা কঞ্জুশ-দিল,
ঘিরে আসে দাবানল তবু নাই হুঁশ তিল !
ভাই আজ শয়তান ভাই-এ মারে ঘুষ কিল !
আনোয়ার ! মুশ্ কিল !

আনোয়ার ! আনোয়ার !
বেইমান মোরা, নাই জান আধ-খানও আর !
কোথা খোঁজা মুসলিম ? শুধু বুনো ঝানোয়ার !

আনোয়ার ! সব শেষ !------
দেহে খুন অবশেষ !--------
ঝুটা তেরি তল্ ওয়ার ছিন্ লিয়া যব্ দেশ !
আওরত সম ছি ছি ক্রন্দন রব পেশ !!
আনোয়ার ! সব শেষ !

আনোয়ার ! আনোয়ার !
জনহীন এ বিয়াবানে মিছে পস্ত্ নো আর !
আজো যারা বেঁচে আছে তারা ক্ষ্যাপা জানোয়ার !

আনোয়ার !--------কেউ নাই !
হাতিয়ার ? ----- সেও নাই !
দরিয়াও থম্ থম্ নাই তাতে ঢেউ, ছাই !
জিঞ্জির গলে আজ বেদুঈন-দে’ও ভাই !
আনোয়ার ! কেউ নাই !

আনোয়ার ! আনোয়ার !
যে বলে সে মুসলিম -----জিভ ধরে টানো তার’ !
বেইমান জানে শুধু জানটা বাঁচানো সার !

আনোয়ার ! ধিক্কার !!
কাঁধে ঝুলি ভিক্ষার-----
তল্ ওয়ারে শুরু যার স্বাধীনতা শিক্ষার !
যারা ছিল দুর্দ্দম আজ তারা দিক্ দার !
আনোয়ার ! ধিক্কার !!

আনোয়ার ! আনোয়ার !
দুনিয়াটা খুনিয়ার, তবে কেন মানো আর
রুধিরের লোহু আঁখি ? -----শয়তানী জানো সার !

আনোয়ার ! পঞ্জায়
বৃথা লোকে সম্ ঝায়,
ব্যথা-হত বিদ্রোহী দিল্ নাচে ঝঞ্ঝায়,
খুন-খেগো তল্ ওয়ার আজ শুধু রণ্ চায়,
আনোয়ার ! পঞ্জায় !

আনোয়ার ! আনোয়ার !
পাশা তুমি নাশা হও মুস্ লিম জানোয়ার,
ঘরে যত দুষ্ মন, পরে কেন হানো মার ?

আনোয়ার ! এসো ভাই !
আজ সব শেষ-ও যাই !------
ইসলামও ডুবে গেল, মুক্ত স্ব-দেশও নাই !
তেগ ত্যজি বরিয়াছি ভিখারীর বেশও তাই !
আনোয়ার ! এসো ভাই !!


সহসা কাফ্রী সান্ত্রীর ভীম চ্যালেঞ্জ্ প্রলয়-ডম্বরু-ধ্বনির মত হুঙ্কার দিয়া উঠিল-----“এয় নৌজওয়ান, হুঁশিয়ার !” অধীর ক্ষোভে তিক্তরোষে তরুণের দেহের রক্ত টগ্ বগ্ করিয়া ফুটিয়া উঠিল | তাহার কটিদেশের, গর্দ্দানের, পায়ের শৃঙ্খল খান্ খান্ হইয়া টুটিয়া গেল , শুধু হাতের শৃঙ্খল টুটিল না | সে সিংহ শাবকের মত গর্জন করিয়া উঠিল-----

এয়্ খোদা ! এয়্ আলী ! লাও মেরী তল্ ওয়ার !

সহসা তাহার ক্লান্ত আঁখির চাওয়ায় তুরস্কের বন্দিনী মাতৃ-মূর্ত্তি ভাসিয়া উঠিল | ঐ মাতৃ-মূর্ত্তির পার্শ্বেই তাহার মায়েরও শৃঙ্খলিতা ভিখারিণী বেশ | তাঁদের দুজনেরই চোখের কোণে দুই বিন্দু করিয়া করুণ অশ্রু |

অভিমানী পুত্র অন্য দিকে
মুখ ফিরাইয়া লইয়া কাঁদিয়া উঠিল------


ও কে ? ও কে ছল আর ?
না-----মা, মরা জানকে এ মিছে তর্ সানো আর !
আনোয়ার ! আনোয়ার !!


কাপুরুষ প্রহরীর ভীম প্রহরণ বিনিদ্র বন্দী তরুণ সেনানীর পৃষ্ঠের উপর পড়িল | অন্ধ কারাগারের বন্ধ রন্ধ্রে তাহারই আর্ত্ত প্রতিধ্বনি গুমরিয়া গুমরিয়া ফিরিতে লাগিল-----


“আঃ আঃ আঃ !!

আজ নিখিল বন্দী--গৃহে ঐ মাতৃ-মুক্তি-কামী তরুণেই অতৃপ্ত কাঁদন ফরিয়াদ করিয়া ফিরিতেছে ! যে দিন এ ক্রন্দন থামিবে, সেদিন সে কোন্ অচিন্ দেশে থাকিয়া গভীর তৃপ্তির হাসি হাসিবে জানি না ! তখন হয়তো হারা-মা আমায় “তারার পানে চেয়ে চেয়ে” ডাকিবেন ! আমিও হয়তো আবার আসিব | মা কি আমায় তখন নূতন ডাকে ডাকিবেন ? আমার প্রিয়জন কি আমায় নূতন বাহুর ডোরে বাঁধিবে ? আমার চোখ জলে ভরিয়া উঠিতেছে, আর কেন যেন মনে হইতেছে, “----আসিবে সেদিন আসিবে |”

 অগ্নিবীণা , কাজী নজরুল ইসলাম

কামাল পাশা

ঐ ক্ষেপেছে পাগ্ লী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্ সে সামাল-সামাল তাই !
.                কামাল ! তু  নে  কামাল কিয়া ভাই !
হো  হো         কামাল !  তু  নে  কামাল কিয়া ভাই!

( হাবিলদার মেজর মার্চ্চের হুকুম করিল,----কুইক  মার্চ্চ  !  )


.        লেফ্ ট্!     রাইট্ !       লেফ্ ট্ !!
.        লেফ্ ট্!        রাইট্ !    লেফ্ ট্ !!

  ( সৈন্যগণ গাহিতে গাহিতে মার্চ্চ করিতে লাগিল )


ঐ ক্ষেপেছে পাগ্ লী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্ সে সামাল সামাল তাই !
.                কামাল !  তু  নে  কামাল কিয়া ভাই !
হো  হো         কামাল !  তু  নে  কামাল কিয়া ভাই !


          ( হাবিলদার  মেজর -----   লেফ্ ট্ !   রাইট্ !  )




সাব্বাস্ ভাই !  সাব্বাস্ দিই,  সাব্বাস্ তোর শম্ শেরে |
পাঠিয়ে দিলি দুষ্ মনে সব  যম-ঘর  একদম্-সে রে !
.                বল্  দেখি  ভাই,   বল হাঁ  রে,
দুনিয়ায়  কে  ডর্ করে না তুর্কীর তেজ্ তলোয়ারে ?

  (  লেফ্ ট্ !  রাইট্ !    লেফ্ ট্ ! )


.                 খুব কিয়া ভাই খুব কিয়া !
বুজ্ দিল ঐ দুশ্ মন্ সব বলকুল্ সাফ হো গিয়া !
.             খুব কিয়া ভাই খুব কিয়া,
.                   হুর্ রো  হো !
.                   হুর্ রো  হো !
দস্যুগুলোয় সামলাতে যে এমনি দামাল কামাল চাই !
.              কামাল !   তু  নে কামাল কিয়া ভাই !
হো  হো       কামাল !  তু  নে কামাল কিয়া ভাই !
(  হাবিলদার  মেজর : ----- সাবাস্ সিপাই !  লেফ্ ট্  !  রাইট্ !  লেফ্ ট্ !  )



শির  হতে  পাঁওতক্   ভাই লাল-লালে-লাল  খুন মেখে
.                 রণ-ভীতুদের শান্তি-বাণী শুন্ বে কে ?
.                         পিন্ডারীদের খুন-রঙীন
.                      নোখ-ভাঙা এই নীল সঙীন
.        তৈয়ার হেয়্ হর্দ্দম ভাই ফার্ তে যিগর্ শত্রুদের!
.        হিংশুক-দল ! জোর তুলেছি শোধ্ তোদের !
.                      সাবাস্ জোয়ান্ ! সাবাস্ !
.        ক্ষীণ-জীবি ঐ জীবগুলোকে পায়ের তলেই দাবাস্-----
.                            এম্ নি ক’রে  রে-----
.                            এম্ নি জোরে রে------
.        ক্ষীণ-জীবি ঐ জীবগুলোকে পায়ের তলেই দাবাস্ !------
.        ঐ চেয়ে দ্যাখ্ আস্ মানে আজ রক্ত-রবির আভাস |-----
.                      সাবাস্    জোয়ান্ !       সাবাস্ !!


          (  লেফ্ ট্  !  রাইট্ !   লেফ্ ট্  ! )



.        হিংশুটে’ ঐ জীবগুলো ভাই নাম ডুবালে সৈনিকের,
তারা তারা আজ নেস্ত-নাবুদ,  আমরা মোটেই  হই  নি জের !
.        পরের মুলুক লুট ক’রে খায় ডাকাত তারা ডাকাত !
তাই তাদের তরে বরাদ্দ  ভাই আঘাত শুধু আঘাত !
.                কি বল  ভাই শ্যাঙাত ?
.                        হুর্ রো হো !
.                        হুর্  রো  হো !!
দনুজ দলে দ’ল্ তে দাদা এম্ নি দামাল কামাল চাই !
.            কামাল ! তু নে  কামাল  কিয়া  ভাই !
হো হো     কামাল ! তু  নে  কামাল  কিয়া  ভাই !


( হাবিলদার  মেজর : ----রাইট্ হুইল্ ! লেফ্ ট্  ! রাইট্ !  লেফ্ ট্ !
          সৈন্যগণ ডানদিকে  মোড়  ফিরিল | )



আজাদ মানুষ বন্দী ক’রে , অধীন ক’রে স্বাধীন দেশ,
কুল্ মুলুকের কুষ্টি ক’রে জোর দেখালে ক’দিন বেশ,
মোদের হাতে তুর্কী নাচন নাচ্ লে তাধিন্ তাধিন্ শেষ !
.                        হুর্ রো হো !
.                        হুর্ রো  হো !!


বদ্--নসিবের বরাত খারাব বরাদ্দ তাই  ক’রলে  কি না আল্লায়,
পিশাচগুলো প’ড়্ ল এসে পেল্লায় এই  পাগলাদেরই  পাল্লায় !
.                    এই পাগলাদেরই পাল্লায় !!
.                        হুর্ রো হো !
.                        হুর্ রো---------
ওদের       কল্লা দেখে আল্লা ডরায়,  হল্লা  শুধু  হল্লা,
.                      ওদের হল্লা শুধু হল্লা,
এক মুর্গির জোর গায়ে নেই, ধ’র্ তে আসেন তুর্কী--তাজী,
.                      মর্দ্দ  গাজী  মোল্লা !------
.                      হাঃ !      হাঃ !   হাঃ !
.                হেসে   নাড়ীই  ছেঁড়ে  বা !
.                হা   হা     হাঃ!  হাঃ !  হাঃ !

.         (হাবিলদার-মেজরঃ--- সাবাস্  সিপাই !  লেফট্ ! রাইট্  !   লেফ্ ট্ !
          সাবাস্ সিপাই !   ফের বল ভাই | )


ঐ ক্ষেপেছে পাগ্ লী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্ সে সামাল  সামাল  তাই !
.                কামাল !  তু    নে   কামাল কিয়া ভাই !
হো    হো        কামাল !  তু    নে   কামাল কিয়া ভাই !

( হাবিলদার--মেজর ----লেফ্ ট্  হুইল ! য়্যাজয়ু   ওয়্যার্ | ---- রাইট্  হুইল !-----
                লেফ্ ট্ !    রাইট্ !     লেফ্ ট্ ! )
( সৈন্যদের আঁখির সামনে অস্ত-রবির আশ্চর্য রঙের খেলা ভাসিয়া উঠিল  | )


.        দেখ্ চ কি দোস্ত্ অমন ক’রে ? হৌ  হৌ  হৌ !
সত্যি  তো ভাই !  সন্ধ্যেটা আজ দেখতে যেন সৈনিকেরই বৌ |
.        শহীদ সেনার টুক্ টুকে বৌ লাল-পিরাহাণ- পরা,
.        স্বামীর খুনের ছোপ-দেওয়া, তায় ডগ্ ডগে আন্ কোরা !------
.     না না না,---- কল্ জে’ যেন টুকরো-ক’রে  কাটা
.   হাজার তরুণ শহীদ বীরের, ----শিউরে উঠে গা’টা !
.   আস্ মানের ঐ সিং-দরজায় টাঙিয়েছে কোন্ কসাই !
দেখতে পেলে এক্ষুণি গ্যে এই ছোরাটা কল্ জেতে তার বসাই !
.                মুন্ডুটা তার খসাই !
গোস্বাতে আর পাই  নে ভেবে কি  যে করি দশাই !
( হাবিলদার মেজরঃ ----সাবাস্ সিপাই ! লেফ্ ট্ ! রাইট্ ! লেফ্ট্ ! )


[ ঢালু পার্ব্বত্য পথ, সৈন্যগণ বুকের পিঠের নিহত ও আহত সৈন্যদের ধরিয়া
সন্তর্পণে নামিল ! ]

.               আহা কচি ভাইরা আমার রে !
এমন কাঁচা জানগুলো, খান্  খান্  ক’রেছে কোন্ সে চামার রে ?
.                  আহা কচি ভাইগুলো আমার রে !!

[  সামনে উপত্যকা  ! হাবিলদার--মেজর : ---- লেফ্ ট্  ফর্ম্ম্ |
সৈন্য-বাহিনীর মুখ হঠাৎ বামদিকে ফিরিয়া গেল !
হাবিলদার-মেজর : ---ফরওয়ার্ড !  লেফ্ট্ ! রাইট্ ! লেফ্ ট্ ! ]


.                আস্ মানের ঐ আঙ্ রাখা
.                খুন-খারাবীর রং-মাখা
.                কি খুবসুরৎ বাঃ রে  বা !
.                জোর বাজা ভাই কাহার্ বা !
.        হোক্   না ভাই এ কার্ বালা ময়দান----
.        আমরা    যে গাই  সাচ্চারই জয় গান !
.        হোক্  না  এ তোর  কারবালা ময়দান !!
.                        হুর্ রো  হো
.                        হুর্ রো-------

[ সাম্ নে পার্ব্বত্য পথ----হঠাৎ যেন পথ হারাইয়া ফেলিয়াছে | হাবিলদার-মেজর
পথ খুঁজতে লাগিল | হুকুম দিয়া গেল----“ মার্ক টাইম”!  সৈন্যগণ এক স্থানেই
দাঁড়াইয়া পা আছড়াইতে লাগিল----]


.                দ্রাম্ !    দ্রাম !    দ্রাম !
.                লেফ্ ট্ !   রাইট্ !  লেফ্ ট্ !
.                দ্রাম্ !   দ্রাম্ !      দ্রাম্ !
আস্ মানে ঐ ভাসমান যে মস্ত দুটো রং-এর তাল,
একটা নিবিড় নীল-সিয়া আর একটা খুবই গভীর লাল,-----
.        বুঝলে ভাই !  ঐ নীল সিয়াটা শত্রুদের !
.        দেখ্ তে নারে কারুর ভালো,
তাইতো কালো রক্ত-ধারার বইছে শিরায় স্রোত ওদের |
.                হিংস্র ওরা হিংস্র পশুর দল!
.        গৃধ্নু ওরা, লুব্ধ ওদের লক্ষ্য অসুর বল-----
.                হিংস্র ওরা হিংস্র পশুর দল !
.                জালিম ওরা অত্যাচারী !
.        সার জেনেছে সত্য যাহা হত্যা তারই !
.                        জালিম ওরা অত্যাচারী !
.                সৈনিকের এই গৈরিকে ভাই-----
.                জোর অপমান ক’রলে ওরাই,
তাই তো ওদের মুখ কালো আজ, খুন যেন নীল জল !-------
.                ওরা   হিংস্র পশুর দল !
.                  ওরা    হিংস্র পশুর দল !!

[ হাবিলদার-মেজর পথ খুঁজিয়া ফিরিয়া অর্ডার দিল | -----ফরওয়ার্ড !
লেফ্ ট্ হুইল---সৈন্যগণ   আবার  চলিতে লাগিল-----
                লেফ্ ট্ !   রাইট্     লেফ্ ট্ ! ]


.        সাচ্চা ছিল সৈন্য যারা শহীদ হ’ল মরে !
.        তোদের মতন পিঠ ফেরে নি প্রাণটা হাতে ক’রে,------
.                ওরা  শহীদ হ’ল  ম’রে !
.        পিট্ নি খেয়ে পিঠ যে তোদের টিট্ হ’য়েছে !  কেমন !
.        পৃষ্টে তোদের বর্শা বেঁধা, বীর সে তোরা এমন !
.                মুর্দ্দারা সব যুদ্ধে আসিস্ ! যা  যা !
খুন দেখেছিস্ বীরের ?  হা দেখ্ টক্ টকে লাল কেমন গরম তাজা !
.                মুর্দ্দারা সব যা  যা  !!

[বলিয়াই কটিদেশ হইতে ছোরা খুলিয়া হাতের রক্ত লইয়া দেখাইল  ]



.                এঁরাই বলেন হবেন রাজা !
.                আরে যা  যা ! উচিত সাজা
.        তাই দিয়েছে শক্ত ছেলে কামাল ভাই !

           [  হাবিলদার-মেজর  : ---- সাবাস সিপাই ! ]


.                এই ত চাই !    এই  ত চাই !
থাকলে স্বাধীন সবাই আছি,  নেই ত নাই,  নেই ত  নাই        !
.                        এই  ত  চাই !!

[  কতকগুলি লোক অশ্রু পূর্ণ  নয়নে এই দৃশ্য দেখিবার জন্য ছুটিয়া আসিতে
ছিল, তাহাদের দেখিয়া সৈন্যগণ আরও উত্তেজিত হইয়া উঠিল  ! ]

.                       
.                মার দিয়া ভাই  মার্ দিয়া !
.                দুশ্ মন্ সব হার্ গিয়া !
.                        কিল্লা ফতে হো গিয়া !
পর্ ওয়া নেহি , যা’নে  দো ভাই যো গিয়া !
.                        কিল্লা ফতে হো গিয়া !
.                        হুর্ রো হো !
.                        হুর্ রো হো !

[হাবিলদার-মেজর : ------সাবাস্  জোয়ান !  লেফ্ ট্  !  রাইট্        ! ]


.        জোর্’সে চলো  পা  মিলিয়ে,
.                     গা  হেলিয়ে,
.        এম্ নি ক’রে  হাত দুলিয়ে !
.        দাদ্ রা তালে ‘এক  দুই তিন’ পা মিলিয়ে
.                        ঢেউ-এর মতন যাই !
আজ স্বাধীন এ দেশ !  আজাদ মোরা  বেহেশ্ তও না চাই !
.        আর      বেহেশ্ তও না চাই !!

[ হাবিলদার--মেজর :--- সাবাস্  সিপাই !!   ফের বল  ভাই !  ]


ঐ ক্ষেপেছে পাগ্ লী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্ সে সামাল সামাল তাই !
.        কামাল ! তু  নে  কামাল  কিয়া ভাই !
হো  হো কামাল ! তু নে  কামাল  কিয়া ভাই !

[ সৈন্যদল এক নগরের পার্শ্ব দিয়া চলিতে লাগিল | নগর-বাসিনীরা ঝরকা হইতে মুখ বাড়াইয়া
এই মহান দৃশ্য দেখিতেছিল ; তাহাদের চোখ-মুখ আনন্দাশ্রুতে আপ্লুত | আজ বধুর মুখের
বোর্ কা খুলিয়া পড়িয়াছে | ফুল ছড়াইয়া হাত দুলাইয়া তাহারা বিজয়ী বীরদের অভ্যর্থনা
করিতেছিল |  সৈন্যগণ চীত্কার করিয়া উঠিল | ]



.      ঐ শুনেছিস্ ?   ঝর্ কাতে সব  বল্ ছে ডেকে বৌ-দলে,
.        “কে বীর তুমি ?   কে  চলেছ  চৌদলে?”
চিনিস্ নে কি ?  এমন বোকা বোনগুলি সব !----কামাল এ যে  কামাল !!
.        পাগ্ লী মায়ের দামাল ছেলে !  ভাই  যে তোদের !
.        তা  না হ’লে কার হবে আর রৌশন এমন জামাল ?
.                                        কামাল  এ যে কামাল !
.        উড়িয়ে দেবো পুড়িয়ে দেবো ঘর-বাড়ী সব সামাল !!
.                                           ঘর-বাড়ী সব সামাল !!
.        আজ আমাদের খুন ছুটেছে,  হোশ ঠুটেছে |
.                                ডগ্ মগিয়ে জোশ উঠেছে |
.                                সামনে থেকে পালাও !
.        শোবহরত দাও নওরাতি আজ !  হর্  ঘরে দীপ জ্বালাও !
.                                সাম্ নে থেকে পালাও !
.                                যাও ঘরে দীপ জ্বালাও !!

 [ হাবিলদার-মেজর : ------ লেফ্ ট ফর্ম্ম !  লেফ্ ট্  রাইট্  !   লেফ্ ট্ !------
                          ফরোয়ার্ড !------

বাহিনীর মুখ হঠাৎ বামদিকে ফিরিয়া গেল |  পার্শ্বেই পরিখার সারি | পরিখা-ভর্তি নিহত সৈন্যের
দল  পচিতেছে এবং কতকগুলি অ-সামরিক নগরবাসী তাহা ডিঙ্গাইয়া  ডিঙ্গাইয়া চলিতেছে ! ]



.        ইস্ !  দেখেছিস্ ! ঐ কা’রা  ভাই সামলে চলেন পা,
.        ফ’স্ কে মরা আধ-মরাদের মাড়িয়ে ফেলেন বা !
.        ও  তাই         শিউরে    ওঠে  গা !
.                                হাঃ  হাঃ  হাঃ !
.                         ম’রলো যে সে ম’রেই গেছে,
.                        বাঁচ্ লো যারা রইল বেঁচে !
.        এই ত জানি সোজা হিসাব ! দুঃখ কি তার আঁ ?
.        মরায় দেখে ডরায় এরা !  ভয় কি মরায় ?    বাঃ !
.                        হাঃ  হাঃ  হাঃ  হাঃ !

[ সন্মুখে সঙ্কীর্ণ  ভগ্ন সেতু | হাবিলদার মেজর অর্ডার দিলেন-----“ফর্ম্ম ইনটু সিঙ্গল লাইন !”
এক এক জন করিয়া বুকের  পিঠের নিহত ও আহতদের চাপিয়া ধরিয়া অতি সন্তর্পনে
“শ্লো মার্চ্চ”   করিয়া পার হইতে লাগিল | ]



.                        সত্যি কিন্তু ভাই !
যখন মোদের বক্ষে বাঁধা ভাইগুলির এই মুখের পানে চাই-----
.        কেমন সে এক ব্যথায় তখন প্রাণটা কাঁদে যে সে !
.        কে যেন দুই বজ্র-হাতে চেপে ধরে কল্ জেখানা পেশে !
নিজের হাজার ঘায়েল জখম ভুলে’ তখন ডুক্ রে কেন কেঁদেও ফেলি
.                                                                শেষে !
.                কে যেন ভাই কল্ জে খানা  পেশে !!
.        ঘুমোও পিঠে, ঘুমোও বুকে, ভাইটি আমার, আহা !!
.     অস্ত-পারের দেশ পারায়ে বহুৎ সে দূর তোদের ঘরের রাহা !
.        ঘুমোও এখন ঘুমোও  ঘুমোও ভাইটি ছোট আহা !
.        মরণ-বধূর লাল রাঙা বর !  ঘুমো !
.        আহা,   এমন চাঁদমুখে তোর কেউ দিল না চুমো !
.                        হতভাগা  রে !
.                ম’রেও  যে তুই দিয়ে গেলি বহুৎ দাগা রে !
.        না জানি কোন্ ফুট্ তে-চাওয়া মানুষ-কুড়ির হিয়ায় !
তরুণ জীবন এম্ নি গেল, একটি রাতও পেলিনে রে বুকে কোনো প্রিয়ায়
.                তরুণ খুনের তরুণ শহীদ ! হতভাগা রে !
.                ম’রেও যে তুই দিয়ে গেলি বহুৎ দাগা রে !
তাই যত আজ লিখ্ নে-ওয়ালা তোদের মরণ,  ফূর্ত্তি--সে জোর লেখে
.        এক লাইনে দশ হাজারের মৃত্যু কথা !  হাসি  রকম দেখে !
.        ম’রলে  কুকুর ওদের,   ওরা শহীদ-গাথার বই লেখে !
.                                খবর  বেরোয় দৈনিকে,
.    আর একটি খথায় দুঃখ জানান, “ জোর ম’রেছে দশটা হাজার
.                                                               সৈনিকে!”
.        আঁখির পাতা ভিজলো কি না  কোনো কালো চোখের,
.    জান্ লো না হায় এ-জীবনে ঐ সে তরুণ দশটি হাজার লোকের !
.    প’চে মরিস্ পরিখাতে , মা-বোনেরাও শুনে বলে  ‘বাহা’ !
.       সৈনিকেরই সত্যিকারের ব্যথায় ব্যথী কেউ কি রে নেই ? আহা !-----
.        আয় ভাই তোর বৌ এলো ঐ সন্ধ্যা মেয়ে রক্ত চেলী পরে,
.     আঁধার-শাড়ী প’রবে এখন প’শ্ বে যে তোর গোরের বাসর--ঘরে !----
.         ভাব্ তে নারি, গোরের মাটি ক’রবে মাটি  এ মুখ কেমন ক’রে------
.                        সোনা মানিক ভাইটি আমার ওরে !
.                বিদায়-বেলায় আরেকটিবার দিয়ে যা ভাই চুমো !
.          অনাদরের ভাইটি আমার !  মাটীর মায়ের কোলে এবার ঘুমো !!

[ নিহত সৈন্যদের নামাইয়া রাখিয়া দিয়া সেতু পার হইয়া আবার জোর মার্চ্চ করিতে করিতে
তাহাদের রক্ত গরম হইয়া উঠিল | ]


.                        ঠিক ব’লেছ দোস্ত তুমি !
.                চোস্ত কথা ! আয় দেখি তোর হস্ত চুমি !
.                           মৃত্যু  এরা জয় ক’রেছে কান্না কিসের ?
.        আব্-জম্-জম্  আন্ লে এরা,  আপনি পিয়ে কল্ সী বিষের !
.                কে ম’রেছে ?     কান্না  কিসের ?
.                        বেশ  ক’রেছে !!
.                দেশ বাঁচাতে আপ্ নারি জান শেষ ক’রেছে !!
.                                বেশ করেছে  !!
.                                শহীদ ওরাই শহীদ !
.                বীরের মতন প্রাণ দিয়েছে খুন ওদেরি লোহিত !
.                                শহীদ ওরাই শহীদ !!

[ এইবার তাহাদের তাম্বু দেখা গেল | মহাবীর আনোয়ার পাশা বহু সৈন্য সামন্ত ও সৈনিকের
আত্মীয়-স্বজন লইয়া বিজয়ী বীরদের অভ্যর্থনা করিতে আসিতেছেন দেখিয়া সৈন্যগণ আনন্দে
আত্মহারা হইয়া “ডবল মার্চ্চ” করিতে লাগিল |  ]


.                                হুর্ রো  হো !
.                                হুর্ রো   হো !!
.        ভাই-বেরাদর পালাও এখন !  দূর্  রহো        ! দূর  রহো !!
.                                হুর্ রো  হো ! হুর্ রো  হো  !

              [ কামাল পাশাকে কোলে লইয়া নাচিতে লাগিল | ]


.                        হৌ হৌ হৌ !  কামাল  জিতা রও !
.                                কামাল জিতা রও !
.                        ওকে আসে ?   আনোয়ার ভাই ?-----
.        আনোয়ার ভাই !    জানোয়ার সব  সাফ্ !!
.        জোর নাচো ভাই!      হর্দ্দম্  দাও লাফ্ !
.                        আজ  জানোয়ার সব সাফ্ !
.                        হুর্ রো হো !  হুর্ রো হো !!
সব-কিছ্ আব্ দূর্ রহো ! -------হুর্ রো  হো ! হুর্ রো হো !!
রণ জিতে জোর মন মেতেছে !----     সালাম সবায় সালাম !-----
.                        নাচ্ না  থামা রে !
জখ্ মী ঘায়েল ভাইকে আগে আস্তে নামা রে !
.                        নাচ্ না থামা রে !

          [ আহতদের নামাইতে নামাইতে ]


.                কে ভাই ? হাঁ,    হাঁ,   সালাম !
-----ঐ শোন্ শোন্ সিপাহ্-সালার কামাল-ভাই-এর  কালাম !
.                [ সেনাপতির অর্ডার আসিল ]



.                “সাবাস্ !  থামো ! হো  হো  !
.                সাবাস্  !   হল্ট্!  এক ! দো !!”

[এক নিমেষে সমস্ত কলরোল নিস্তব্ধ হইয়া গেল ! তখনো কিন্তু তারায় তারায় যেন ঐ বিজয়-
গীতির হারা-সুর বাজিয়া বাজিয়া ক্রমে ক্ষীণ হইতে  ক্ষীণ তর হইয়া মিলিয়া গেল-----]


ঐ ক্ষেপেছে পাগ্ লী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই !
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্ সে সামাল সামাল তাই !
.                কামাল !  তু  নে কামাল কিয়া ভাই !
.     হো    হো  কামাল !  তু   নে কামাল কিয়া ভাই !


অগ্নিবীণা , কাজী নজরুল ইসলাম

আগমনী

একি        রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন---
ঝন        রণরণ রণ ঝনঝন !
সেকি        দমকি’ দমকি’
.        ধমকি’  ধমকি’
.        দামা-দ্রিমি-দ্রিমি গমকি’ গমকি’
.                       ওঠে চোটে চোটে,
.        ছোটে লোটে ফোটে !
.        বহ্নি-ফিনিকি চমকি চমকি’
.        ঢাল-তলোয়ারে খনখন !
একি        রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন
রণ        ঝনঝন ঝন রণরণ !


হৈ        হৈ রব
ঐ        ভৈরব
হাঁকে,        লাখে লাখে
ঝাঁকে        ঝাঁকে ঝাঁকে
লাল        গৈরিক-গায়ে সৈনিক ধায় তালে তালে
.        ওই পালে পালে,
.        ধরা কাঁপে দাপে |
.        জাঁকে মহাকাল কাঁপে থরথর !
.        রণে কড়কড় কাড়া-খাঁড়া-ঘাত,
শির        পিশে হাঁকে রথ-ঘর্ঘর-ধ্বনি ঘরঘর !
‘গুরু        গরগর’ বোলে ভেরী তূরী,
.        “হর হর হর”
করি’        চীত্কার ছোটে সুরাসুর-সেনা হনহন !
ওঠে        ঝঞ্ঝা ঝাপটি’ দাপটি’ সাপটি’
.        হু--হু-  হু--হু   হু--হু  শনশন !
.        ছোটে সুরাসুর-সেনা হন হন !
তাতা        থৈথৈ তাতা থৈথৈ খল  খল খল
নাচে        রণ-রঙ্গিণী সঙ্গিনী সাথে,
.        ধকধক জ্বলে জ্বল জ্বল
বুকে        মুখে চোখে রোষ-হুতাশন !
.        রোস্ কোথা শোন্ !


ঐ        ডম্বরু-ঢোলে ডিমিডিমি বোলে,
.        ব্যোম মরুৎ স-অম্বর দোলে,
.        যম-বরুণ কী কল-কল্লোলে চলে উতরোলে
.        ধ্বংসে মাতিয়া,                তাথিয়া তাথিয়া
.                নাচিয়া রঙ্গে !      চরণ ভঙ্গে’
.                সৃষ্টি সে টলে টলমল !
ওকি        বিজয়-ধ্বনি সিন্ধু গরজে কলকল কল কলকল !
.                        ওঠে  কোলাহল
.                        কূট    হলাহল
ছোটে        মন্থনে   পুনঃ  রক্ত-উদধি,
.                ফেনা-বিষ ক্ষরে গলগল !
টলে        নির্ব্বিকার সে বিধাত্রীরো গো
.                সিংহ-আসন টলমল !
কা’র        আকাশ-জোড়া ও’ আনত-নয়ানে
.                করুণা-অশ্রু ছলছল !


বাজে        মৃত সুরাসুর-পাঁজরে ঝাঁঝর ঝম্ ঝম্,
নাচে        ধূর্জ্জটী সাথে প্রমথ ববম্ বম্ বম্ !
লাল        লালে লাল ওড়ে ঈশানে নিশান যুদ্ধের,
.        ওঠে     ওঙ্কার রণ-ডঙ্কার,
নাদে        ওম্ ওম্  মহাশঙ্খ-বিষাণ রুদ্রের !
 ছোটে রক্ত-ফোয়ারা বহ্নির বান রে !
.        কোটি বীর প্রাণ
.        ক্ষণে নির্ব্বাণ
তবু        শত সূর্যের জ্বালাময় রোষ
.        গমকে শিরায় গম্ গম্ !
ভয়ে        রক্ত-পাগল প্রেত পিশাচেরও
.        শির দাঁড়া করে চন্ চন্ !
যত        ডাকিনী যোগিনী বিস্ময়াহতা,
.        নিশীথিনী ভয়ে থম্ থম্ !
বাজে        মৃত সুরাসুর-পাঁজরে ঝাঁঝর ঝম্ ঝম্
ঐ        অসুর-পশুর মিথ্যা দৈত্য-সেনা যত
হত        আহত করে রে দেবতা সত্য !
স্বর্গ,        মর্ত্ত্য, পাতাল, মাতাল, রক্ত-সুরায় ;
.        ত্রস্ত বিধাতা,
মস্ত পাগল পিণাক-পাণি স-ত্রিশূল প্রলয়-হস্ত ঘুরায় !
.        ক্ষিপ্ত সবাই রক্ত-সুরায় !


.চিতার উপরে চিতা সারি সারি,
.        চারি পাশে তারি
ডাকে কুক্কুর গৃধিণী শৃগাল !
প্রলয়-দোলায় দুলিছে ত্রিকাল !
প্রলয়-দোলায় দুলিছে ত্রিকাল !!


আজ রণ-রঙ্গিণী জগৎমাতার দেখ্ মহারণ,
দশদিকে তাঁর দশহাতে বাজে দশ প্রহরণ!
.        পদতলে লুটে মহিষাসুর,
মহামাতা ঐ সিংহ-বাহিণী জানায় আজিকে বিশ্ববাসীকে---
শ্বাশত নহে দানব-শক্তি, পায়ে পিশে যায় শির পশুর !


.                        ‘নাই দানব
.                        নাই অসুর,----
.                        চাই নে সুর,
.                        চাই মানব !’----
.                বরাভয় বাণী ঐ রে কা’র
.                শুনি, নহে হৈ রৈ এবার !
.                        ওঠ্ রে ওঠ্,
.                        ছোট্ রে ছোট্ |
.                        শান্ত মন
.                        ক্ষান্ত রণ !----
.                        খোল্ তোরণ,
.                        চল্ বরণ
.                      কর্ বো মা’য়,
.                      ডর্ বো কায় ?
.                ধর্ বো পা’য় কার্ সে আর,
.                বিশ্ব-মা’ই পার্শ্বে যার ?


আজ        আকাশ-ডোবানো নেহারি তাঁহারি চাওয়া
ঐ        শেফালিকা তলে কে বালিকা চলে ?
 কেশের গন্ধ আনিছে আশিন হাওয়া !
এসেছে রে সাথে উত্পলাক্ষী চপলা কুমারী কমলা ঐ,
.        সরসিজ-নিভ শুভ্র বালিকা
.        এলো বীণা-পাণি অমলা ঐ !
.                এসেছে গণেশ,
.                এসেছে মহেশ,
.                বাস্ রে বাস্ |
.                জোর উছাস !!
.        এলো সুন্দর সুর-সেনাপতি,
.        সব মুখ এ যে চেনা চেনা অতি !
.        বাস্ রে বাস্              জোর উচ্ছাস !!


.        হিমালয় ! জাগো ! ওঠো আজি,
.                তব সীমা লয় হোক |
.        ভুলে যাও শোক---চোখে জল ব’ক
.        শান্তির---আজ শান্ত-নিলয় এ আলয় হোক !
.                ঘরে ঘরে আজি দীপ জ্বলুক !
.                মা’  আবাহন-গীত্ চলুক !
.                        দীপ জ্বলুক !
.                        গীত্ চলুক !!
আজ        কাঁপুক মনব-কলকল্লোলে কিশলয় সম নিখল ব্যোম !
.                        স্বা-গতম !
.                        স্বা-গতম !!
.                        মা-তরম্ !
.                        মা-তরম্ !!
.                ঐ  ঐ  ঐ  বিশ্ব কন্ঠে
.        বন্দনা-বাণী লুন্ঠে---“বন্দে  মাতরম্ !!”


অগ্নিবীণা , কাজী নজরুল ইসলাম

সবিস্তার সূচীপত্র
টেম্পলেট কাষ্টমাইজেশন - তরঙ্গ ইসলাম | তরঙ্গ ইসলাম