তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা

১৯৭৫ সালে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে সংঘটিত হয়েছিল তিন তিনটি ভয়াবহ সেনা-অভ্যুত্থান। তিনটি অভ্যুত্থানই যুগান্তকারী ঘটনা, শতাব্দীর অন্যতম ঐতিহাসিক ঘটনা, যেগুলোর মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিমন্ডলে ঘটে ব্যাপক উত্থান-পতন। এমনকি সরকার পরিবর্তনের মত অবিশ্বাস্য ঘটনাও ঘটে যায়।

সৌভাগ্যবশতঃ তিনটি ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানই অতি নিকট থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছিলো। প্রায় প্রতিটি ঘটনার সাথে কমবেশী প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে সংযুক্ত ছিলাম। অন্যরা যেখানে শুনে শুনে লিখেছেন, আমি সেখানে নিজে প্রত্যক্ষ করে লিখেছি। ইতিমধ্যে বেশকিছু লেখক অভ্যুত্থান ঘটনাগুলো না দেখেই শুধু শুনে শুনে রঙ-চং দিয়ে বিভিন্নভাবে অতিরঞ্জিত করে গল্পাকারে অলঙ্করণ করে লিখেছেন। এতে প্রকৃত তথ্য বিকৃত হয়েছে।

দর্পণে আপন ছায়া - খাদিজা আখতার রেজায়ী

১৯৭৪ সালের কথা। চারদিকে ভীষণ অস্বস্তি। রাজনীতি শ্বাসরুদ্ধকর আবহাওয়ায় বিষাক্ত এই জনপদ। দেশজুড়ে শতাব্দীর ভয়ংকর ক্ষুধার আগ্রাসন, মাত্র বছরের ব্যাবধানে পঁচিশ লাখ আদম সন্তান দুর্ভিক্ষের বলি হয়ে নিঃশেষ হয়ে গেলো! চলছে, 'ভাতে মারবো-পানিতে মারবো' এর নিদারুন পরিহাস!

পিতামাতা তাদের বুকের সন্তানকে মাত্র ৫ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে, সোমত্ত মেয়েরা এক মালসা ফেনের জন্য রাজনৈতিক টাউটদের কাছে দেহ বিক্রী করে। এমনই এক ভয়াবহ পরিস্থিতির বেদনাবিধুর স্মৃতি পরবর্তী বংশধরদের কাছে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব যে সাহিত্যিক সাংবাদিক বুদ্ধিজীবিদের হাতে ন্যাস্ত, তাদের বিরাট অংশ খদ্দেরের আশায় 'কলম' হাতে লাইনে দাঁড়ানো, নিবিড় নিদারুন অন্ধকারের একচ্ছত্র রাজত্ব চতুর্ধারে!

আওয়ামীলীগ একটা স্প্রিচুয়াল প্রজেক্ট, যেন ধর্ম-বিশেষ (নবুয়্যত দাবী!)


আওয়ামী লীগকে রাজনীতিক ভাবে মোকাবেলা করা কি সম্ভব?

আওয়ামী লীগ সম্বন্ধে, অন্তত শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সম্বন্ধে আমাদের একটি প্রাথমিক ভুল ধারণা হোলো যে এটি একটি "রাজনীতিক" দল। আওয়ামী লীগ মূলত একটি স্পিরিচুয়াল প্রজেক্ট যার মঞ্জিলে মকসুদ হোলো একটা বিলিফ-সিস্টেম। রাজনীতি, ক্ষমতা, ভোট - এসব খুবই গুরুত্বপুর্ণ কিন্তু আসলে এই বিলিফ-সিস্টেমের ইনএভিটেবল এক্সটেনশান মাত্র।

জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রত্যাহার -১৯৭৩

আজ ১ জানুয়ারি। ১৯৭৩ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ছাত্র, জনতা এবং সাংবাদিকের রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের বছরকাল পার না হতেই বিরোধী দমনে শুরু হয় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। এদিন শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর পুলিশ বেপরোয়া ও নৃশংসভাবে গুলি চালিয়ে ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষ অনার্সের ছাত্র মতিউল ইসলাম এবং ঢাকা কলেজের প্রথমবর্ষের ছাত্র মির্জা কাদেরকে হত্যা করে। 

এ সময় গুরুতর আহত হন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি আবুল কাশেম, দৈনিক বাংলার বাণীর ফটোসাংবাদিক রফিকুর রহমানসহ ৬ জন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন আহূত দেশব্যাপী ‘ভিয়েতনাম দিবস’-এর কর্মসূচি অনুযায়ী ঢাকায় সংগ্রামী ছাত্রসমাজ ভিয়েতনামের মার্কিনীদের বর্বর বোমাবর্ষণের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল বের করলে পুলিশ বেলা সোয়া ১২টায় মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের সামনে ছাত্রদের ওপর বিনা প্ররোচনায়

শেখ মুজিবের পতন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পত্র পত্রিকায় তৎকালীন বিশ্লেষন

শেখ মুজিবের পতনের কারন কি? এ ব্যাপারে আওয়ামীলীগ কখনো তার অবস্থান পরিস্কার করেনি। জাতির সামনে যে প্রোপাগান্ডাটি অনবরত চলতে থাকে তা হল কতিপয় বিপথগামী সেনা অফিসারের ক্যুতে শেখ মুজিব নিহত হয়?

স্বাধীনতা পূর্ব নেতা মুজিব কে আমি শ্রদ্ধা করি। কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর মুজিবকে কোন অবস্থাতেই আমি একজন নেতার আসনে বসাতে পারিনা। সেটা যতটা না মুজিবের অন্যায় আর অবিবেচক সিদ্ধান্তের জন্য তার থেকে তার চারপাশের চাটুকারদের জন্য।

রক্ষীবাহিনী বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় হুমায়ূন আহমেদদের

 

নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এর পিতা শহীদ ফয়জুর রহমান ১৯৭১ সালে পিরোজপুর মহকুমার পুলিশ প্রধান ছিলেন (সাবডিভিশনাল পুলিশ অফিসার, এসডিপিও)। ১৯৭১ সালের ৫ মে তাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বলেশ্বর নদীর তীরে গুলি করে হত্যা করে।

হুমায়ূন আহমেদের মায়ের নাম আয়েশা ফয়েজ। স্বাধীনতার পর আয়েশা ফয়েজ শহীদ পরিবার হিসেবে বাবর রোডে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি বরাদ্দ পেয়েছিলেন। সে বাড়ি বরাদ্দ পেতে তাকে অশেষ লজ্জা, অপমান, হেনস্থা এবং হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছিল সরকারি অফিসে। দিনের পর দিন ঘুরতে হয়েছে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে। এক অফিসার থেকে আরেক অফিসারের টেবিলে ।

“আমি ভুট্টোর আন্তরিকতায় মুগ্ধ”। জনগণকে ৭১ ভুলে যেতে বলেছিলেন শেখ মুজিব

১৯৭৪ সালে পাকিস্তান সফর শেষে শেখ মুজিব কুলদীপ নায়ার সাক্ষাৎকারে কি ছিল সেটা কেউ খুজবেন কি ?

শিমলা চুক্তি করে ভারত পাকিস্তান এর পিছনে কারা?

১৯৭৪ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী দ্যা অবজারভার

The Observer পত্রিকায় ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন মরহুম শেখ মুজিবের।

কলকাতার ইংরেজি দৈনিক স্টেটসম্যানে সাক্ষাত্কারটি ছাপা হয়েছিল।

কুলদীপ নায়ার লিখেন -

শেখ সাহেব এবারে বললেন, “আমি ভুট্টোর আন্তরিকতায় মুগ্ধ”। “আমার প্রতি প্রদত্ত পাকিস্তানের জনগণের স্নেহ এবং ভালোবাসায় আমি অভিভুত। বিমান বন্দর থেকে ইসলামী শীর্ষ সম্মেলন স্থল পর্যন্ত হাজার হাজার জনতা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমার নাম মুজিব উচ্চারণ করে তারা ধ্বনি দিচ্ছিলেন। যখন পরিচিত কোর্তা পায়জামা পরা আমাকে তাদের মধ্যে দেখলো তখন ছেলেমেয়েরা উচ্চকণ্ঠ হর্ষধ্বনি দিল”।

আসল রূপে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ

শেখ মুজিবের আসল রূপ প্রকাশ পায় ১৯৭১-এর পর। পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের ধুম্রজালে তিনি তার আসল চরিত্র বহুলাংশে লুকিয়ে রাখতে পারলেও সেটি বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় প্রকাশ পায় বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠার পর। ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচন। সে নির্বাচনের প্রাক্কালে শেখ মুজির ২৮শে অক্টোবর জাতির উদ্দেশ্যে রেডিও ও টিভি ভাষণ দেন। সে ভাষণে তিনি বহু অসত্য কথা বলেন। তার একটি নমুনা, “তদানীন্তন ক্ষমতাসীন দল (পাকিস্তান মুসলিম লীগ) সমগ্র দেশকে একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, সেই হীন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্যই আমাদের মহান নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ভাবেই আমরা পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আপোষহীন সংগ্রাম শুরু করি।”-(২৯ অক্টোবর ১৯৭০, দৈনিক পাকিস্তান, ঢাকা)। এ তথ্যটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। সত্য হলো, পাকিস্তান মুসলিম লীগ কখনই দেশকে একদলীয় রাষ্ট্র করার চেষ্টা করেনি। তার প্রমাণ, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে যখন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় তখন মুসলিম লীগ সরকারের পক্ষ থেকে এই নতুন দলটির প্রতিষ্ঠায় কোন রূপ বাধাই সৃষ্টি করা হয়নি।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ হয়েছিল যেকারনে !!

১৯৭২ সালের যে কোন খবরের কাগজ খুললে দেখা যাবে প্রায় সব খবরই হচ্ছে খুন, রাহাজানি এবং ছিনতাই সংক্রান্ত।

১৯৭২ সালের যে কোন জাতীয় সংবাদপত্র খুললে প্রথমেই চোখে পড়বে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানী, আর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির খবর। প্রতিদিন দেশের শহরগুলোতে ঘটছিল প্রকাশ্য খুন, ডাকাতি ও রাহাজানীর ঘটনা। গ্রামে-গঞ্জেও চলছিল ত্রাসের রাজত্ব। ক্রমবর্ধমান এ ত্রাসের নাগপাশে জনগণ এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় কাল অতিবাহিত করছিল। যখন জনগণের পরনে কাপড় নেই তখনই ঘটেছিল সুতা নিয়ে কেলেংকারী। পেটে যখন ভাত নেই তখন লাখ লাখ টন বিদেশী সাহায্যে প্রাপ্ত খাদ্য নির্বিবাদে পাচাঁর হয়ে গিয়েছিল সীমান্তের ওপারে।

শেখ-মুজিবুর রহমানের শাসনামল ও অন্যান্য

শেখ মুজিব ও তার দল বাংলাদেশকে যে কতটা বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছিল সে পরিচয় পাওয়া যাবে সে আমলের ঢাকার পত্রিকাগুলো পড়লে। নিজ ঘরে নিরপত্তা না পেয়ে বহু মানুষ তখন বনেজঙ্গলে লুকিয়েছে। ১৯৭৩ সালের ১৭ আগষ্ট দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম ছিল,“নিরাপত্তার আকুতি গ্রাম-বাংলার ঘরে ঘর”। মূল খবরটি ছিল এরূপঃ “সমগ্র দেশে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির ফলে এবং মানুষের জান-মাল ও ইজ্জতের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার অভাবে গ্রাম-গঞ্জ ও শহরবাসীর মনে হতাশার মাত্রা দিন দিন বাড়িয়াই চলিয়াছে এবং আইন রক্ষাকারী সংস্থার প্রতি মানুষের আস্থা লোপ পাইতেছে। অবস্থা এমন দাঁড়াইয়াছে যে,চুরি-ডাকাতি, লুঠ-তরাজ তো আছেই, রাজনৈতিক, সামাজিক ও বৈষয়িক কারণে শত্রুতামূলক হত্যাকান্ডের ভয়ে মানুষ বাড়ীঘর ছাড়িয়া অন্যত্র আশ্রয় লইতেছে। যাহারা বিত্তশালী তাহারা শহরের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ীতে এমনকি শহরের আবাসিক হোটেগুলিতে পর্যন্ত আসিয়া উঠিতেছেন। যাঁহাদের শহরে বাস করিবার সঙ্গতি নাই,তাহার বনে-জঙ্গলে অথবা এখানে-ওখানে রাত্রি কাটাইতেছেন”।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ক্রসফায়ার হত্যাকান্ড

"... সেদিন ছিল ছুটির দিন। আমি অফিসের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামানের রুমের সামনে সবুজ বাতি জ্বলছে। চিন্তা করলাম আজ ছুটির দিন নুরুজ্জামান সাহেব অফিসে কী করছেন? ড্রাইভারকে অফিসের মধ্যে গাড়ি ঢুকাতে বললাম। গিয়ে দেখি সেখানে আনোয়ারুল আলম (শহীদ)ও রয়েছে। তারা আমাকে বিস্তারিত খুলে বললো। জিজ্ঞাসা করলাম, আমাদের এখানে আনা হলো কেন? পুলিশ আছে, গোয়েন্দা আছে তাদের ওখানে নিয়ে যাক। বলল, পুলিশের কাছ থেকে সর্বহারার লোকেরা ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পারে সেই ভয়ে এখানে রেখেছে।

ফিরে দেখা ১৯৭৫ : প্রথম আলোচিত ক্রসফায়ার সিরাজ সিকদার হত্যা

http://www.amardeshonline.com/img/news/p1_Prathom-Alochito.jpg 
সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার—১৯৭৫ সালের ইংরেজি নববর্ষের দ্বিতীয় দিন। এইদিন রাতে (২ জানুয়ারি) রাতে ‘পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি’র প্রধান নেতা সিরাজুল হক সিকদার ওরফে সিরাজ সিকদার তত্কালীন সরকারের নিরাপত্তাবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন। এর আগের দিন অর্থাত্ ১৯৭৫ সালে ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামে গ্রেফতার হন সিরাজ সিকদার। এ দিনই তাকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আনা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে তত্কালীন শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের আমলে প্রথম আলোচিত ক্রসফায়ারের এই ঘটনার বিবরণ পুলিশের প্রেসনোটের উদ্ধৃতি দিয়ে ছাপা হয় সেই সময়ের বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সিরাজ শিকদার গ্রেফতার হওয়ার পর তার পার্টি-কর্মীদের কয়েকটি গোপন আস্তানা এবং তাদের বেআইনি অস্ত্র ও গোলাবারুদ রাখার স্থানে পুলিশকে নিয়ে যেতে রাজি হন। সে অনুযায়ী ২ জানুয়ারি রাতে একটি পুলিশ ভ্যানে তাকে ওইসব আস্তানায় নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি সাভারের তালবাগ এলাকায় ভ্যান থেকে লাফিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে তত্ক্ষণাত্ ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ ব্যাপারে সাভার থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মুজিব-ইন্দিরা গোপন চুক্তি

১।বাংলাদেশে ভারত তার ইচ্ছেমত,তার পছন্দসই লোক দিয়ে পছন্দসই নেতৃত্ব পাঠিয়ে একটি সামরিক বাহিনী গঠন করবে।যার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আধাসামরিক বলে পরিচিত হবে,কিন্তু এদেরকে গুরুত্বের দিক থেকে ও সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের মূল সামরিক বাহিনী থেকে বড় ও তাৎপর্য পূর্ণ রাখা হবে। (ধারনা করা হচ্ছে এই বাহিনীই হচ্ছে রক্ষী বাহিনী।ভারতীয় সৈন্যের পোশাক,ভারতীয় সেনানী মন্ডলীর নেতৃত্ব ও ভারতের অভিরুচি অনুযায়ী বিশেষ শ্রেনীর লোককে শতকরা ৮০ জন এবং বিশেষ বাদ এর সমর্থক ২০জন করে নিয়ে এই বাহিনী গড়ে তোলা হবে।অস্ত্র,গাড়ী,পোশাক,সুযোগ-সুবিধার দিক দিয়ে এই বাহিনী মূল বাহিনীকে ছাড়িয়ে যাবে।এ বাহিনীটি ব্যবহার করা হবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। ভারত বিরুধী কোন সরকার ঢাকায় ক্ষমতায় বসলে ও এ বাহিনী দিয়ে তাকে উৎখাত করা হবে।বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারত বিরুধী রাজনীতির সমর্থকদের এই বাহিনি দিয়ে ধমন করা হবে। এই বাহিনীর মধ্যে ভারত প্রেমীক বিশেষ শ্রেনীর লোকেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় কোনদিন এদেরকে ভারতের বিরুদ্দে লাগানো যাবেনা।এদেশের জনগণ কোন দিন বিপ্লবে অবতীর্ণ হলে, রক্ষীবাহিনীর পোশাক গুনে ভারতীয় সৈন্যরা লাখে লাখে রক্ষীবাহিনী সেজে এদেশের অভ্যন্তরে জনগণকে দমন করতে পারবে।)

২।বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে যা সামরিক সাহায্য নিয়েছে তা পরিশোধ করতে হবে বিভিন্নভাবে
(ক) ভারত ছাড়া অন্য কোন দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশ অস্ত্র কিনতে পারবেনা।মাঝে মাঝে ঘোষণা করতে হবে ভারত থেকে এত কোটি টাকার অস্ত্র কেনা হল।এর দাম ভারত ঠিক করে দিবে।সরবরাহ দেয়া হবে অর্ধেক অস্ত্র।সরবরাহকৃত অস্ত্রও ভারত ইচ্ছামত নিজ দেশে নিয়ে যেতে পারবে।
(অর্থাৎ একই অস্ত্র বারবার দেখিয়ে ১৯৭১ এর পাওনা এবং ভারতের সম্পূর্ণ যুদ্দ খরচ আদায় করা হবে।অভ্যন্তরীন গোলযোগ দমনের জন্য সাধারন অস্ত্র ছাড়া কোন ভারী অস্ত্র সাজোয়া গাড়ী না ট্যংক বাংলাদেশকে দেওয়া হবেনা )

মুজিবের শাসন: একজন লেখকের অনুভব - আহমদ ছফা - ৩

উনিশ শ' বাহাত্তর সালের পর থেকে প্রকৃত প্রস্তাবে চার পাঁচজন ছা্ত্রই স্টেনগান হাতে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ চালাত। উপাচার্যবৃন্দ এই অস্ত্রধারী ছা্ত্রদের কথাতে উঠতেন, বসতেন। স্বাধীনতার পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুক্তির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল, কিন্তু স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যলয়ের বেবাক পরিবেশটাকেই কলুষিত করে তোলা হল। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন চিন্তা, কল্পনা, নিরপেক্ষ গবেষনার পথ একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। সরকার সমর্থক ছা্ত্ররা প্রকাশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করত। দরকারবোধে তারা এগুলো ব্যবহার করতে কোন রকম কুন্ঠা বা সংকোচবোধ করত না। বর্তমানে ঢাকা জেলার জেলা জজের কোর্টে একটি লোমহর্ষক হত্যামামলার বিচার চলছে। সরকার সমর্থক দু'দল ছা্ত্রের মধ্যে মতামতের গরমিল হওয়ায় অবাধে রাতের বেলা অগ্নেয়াস্ত্র ব্যাবহার করে সাতজন সতীর্থকে হত্যা করেছে। আজ থেকে প্রায় একবছর পূর্বে হাজী মুহম্মদ মহসীন ছাত্রাবাসের টিভি কক্ষের সামনেই এই শোকাবহ ঘটনা অনুষ্ঠিত হয়। সরকারসমর্থক ছাত্ররাই যখন মতামতের গড়মিলের জন্য স্বদলীয় ছাত্রের হাতে এভাবে বেঘোরে প্রাণ হারাতে পারে, সাধারণ ছাত্র এবং শিক্ষকদের অবস্থা কি হতে পারে সহজেই অনুমান করা যায়। সরকারসমর্থক ছাত্রের মত শিক্ষকদেরও একটি বিশেষ অসুবিধা হবার কথা নয়। এঁদের অনেকে পুর্ব থেকে ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর সেবা করি আসছেন। সুতরাং এই নতুন শাসনামলেও তাঁরা বস্তু-সম্পদের দিক দিয়ে কিন্চিত লাভবান হওয়ার সাধনা করে যাচ্ছিলেন এবং নানাভাবে সরকারসমর্থক ছাত্ররা সক্রিয় সহায়তা দান করে যা্চ্ছিলেন। আর সরকার নিজস্ব প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে অপর কোন মতামত এবং প্রতিষ্ঠান যাতে মাথা তুলতে না-পারে সেজন্য সম্ভাব্য সকল উপায়ে চেষ্টা করে আসছিল। বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারি মতামতের লালনক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে যেয়ে এমন একটা অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হল, যার সংগে অধিকাংশ শিক্ষক এবং ছাত্র মিলিয়ে নিতে পারলেন না। শেখ মুজিবুর রহমানের রাস্ট্রনৈতিক চিন্তা এবং রাস্ট্রশাসন পদ্ধতিকে মুজিববাদ আখ্যা দিয়ে, তার প্রচার, প্রসার এবং বাস্তবায়নের জন্য সরকারসমর্থক ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়সমুহে এমন একটা সুসংগঠিত অভিযান পরিচালনা করলেন, কোন স্বাধীনচেতা, ন্যায়বান ছাত্র কিংবা শিক্ষক তার সংগে অন্তরের সামান্য সংযোগও অনুভব করতে পারলেন না। এই না-পারার কারণেই সৎ এবং ন্যায়পরায়ন শিক্ষকরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। তাঁরা অপরিসীম মানসিক উৎকন্ঠা নিয়ে শন্কা, ত্রাস এবং ভীতির মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হলেন। অতি শিগ্‌গির গোটা দেশের তাবত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই মুজিববাদী ছাত্রদের এবং তাঁদের পেছন বুদ্ধি-পরামর্শ যোগানো শিক্ষকদের প্রভাব ঘুর্ণিহাওয়ার মত অপ্রতিরোধ্য বেগে ছড়িয়ে পড়ল।


যে সমস্ত শিক্ষক চরিত্র এবং বিদ্যাবত্তার জন্য ছাত্রদের মধ্যে শ্রদ্ধা এবং সম্মানের আসনে অধিষ্টিত ছিলেন মুশকিল হল তাঁদেরই। তাঁরা তাঁদের পরিবারবর্গ নিয়ে নিতান্ত ভয়ে ভয়েই দিবস রজনী অতিবাহিত করতেন। যে-কোন সময়, যে কোন বিবাদ এসে ঘাড়ে আশ্র‌য় করতে পারে। সে সময় আমি নিজে বিশ্ববিদ্যালয় কম্পাউন্ডে বাস করেছি। এই সন্ত্রাসজনক পরিস্থিতির ভয়াবহতা কিছু কিছু অনুভব করেছি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার দু'বছর পরেও দেখেছি শিক্ষকরা ফ্ল্যাটে বাইরের দিক থেকে তালা লাগিয়ে রাখতেন। কোন অচেনা লোক খোঁজ-খবর করতে গেলে বাড়ির লোকেরা জবাব দিতেন, তিনি বাসায় নেই।
যে মুষ্টিমেয় ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছু শক্তহাতে নিয়ন্ত্রন করত সংখ্যায় ছিল তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনরত মোট ছাত্রছাত্রীর এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র। সরকারি পুলিশ সব সময়ে তাদের সাহায্যে মোতায়েন থাকত। ছাত্রাবাসের ভোজনক্ষে খাওয়ার জন্য তাদের কোনো অর্থ দিতে হত না। অধিকন্তু মন্বন্তরের সময় ছা্ত্রাবাসের প্রভোস্ট এবং হাউজ টিউটররে সংগে মিলেমিশে রেশনে পাওয়া চাল, ডাল কালোবাজারে বেচে দিয়ে প্রচুর অর্থ আত্নস্যাত করার সুযোগ তারা পেত। তাছাড়াও সরকারদলীয় লোকদের মধ্যে ব্যাবসা-বাণিজ্য, চাকুরি-বাকরি বন্টন করার বরাদ্দ সুযোগগুলো তো ছিলই।
বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজের ছাত্রসংসদসমূহের নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করত, ভীতি এবং ত্রাসসৃষ্টি করে ছাত্র সাধারণের কাছ থেকে ভোট আদায়ের চেষ্টা করত। তারপরেও যখন দেখা যেত নির্বাচনে তারা শতকরা বিশটি ভোটও লাভ করতে পারেনি এবং পরাজয় অবধারিত, রাতের বেলা আলো নিভিয়ে ভোটের বা্ক্সগুলো লুট করে নিয়ে যেত। তাদের অনুমোদন ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ছাত্রভর্তি হতে পারত না, ছাত্রাবাসসমূহে থাকবার জায়গা পেত না। শিক্ষকদের নিয়োগ বরখাস্ত অনেকটা তাদের খেয়াল-খুশির উপর নির্ভরশীল ছিল।


শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর একদলীয় শাসন চালু করে দেশে যে নতুন শাসনতান্রিক পদ্ধতি চালু করার কথা ঘোষনা করেছিলেন, তাতে বিশ্ববিদ্যলয়গুলোকেও ক্ষমতার অংশভোগী করে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক শ' পনেরজন সদস্যের মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী, জাহান্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যত্রয় এবং বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালিকা ও বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষাকে স্থান দিয়েছিলেন। জাতীয়দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের স্থান দিয়ে সরাসরি বিধিবদ্ধভাবে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে সরকারি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসার আয়োজন সম্পুর্ণ করলেন। অর্থাৎ এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন ঘোরপ্যাচ ব্যাতিরেকে প্রত্যক্ষভাবে সরকারি শাসন বলবত করা হবে। পূর্বেকার সরকারসমূহ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃত্ব করতেন বটে, কিন্তু সে পন্থাটি ছিল সম্পুর্ণ স্বাধীন, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। সরকার প্রশাসন কিংবা পরিচালনায় প্রকাশ্যত কোন হস্তক্ষেপ করতেন না। শেখ মুজিবই প্রথম যিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্ষমতার অংশীদার করলেন। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের আলাদা অস্তিত্ব, আলাদা আইন-কানুন এগুলোকে তিনি ক্রমে ক্রমে ভেঙে নতুন করে সাজিয়ে, তার মধ্যে সরকারি বিরোধীতার বীজকে উপরে ফেলতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, যে আধুনিক শিক্ষাভিমানী পন্ডিত সমাজ তাঁকে অবগ্জ্জা করেন, তাঁদের অন্তরলালিত অহন্কার চূর্ণ করতে পারবেন। নতুন পদ্ধতিটা এমনভাবে রচনা করা হয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পন্ডিতদেরও তাঁর আাওতার বাইরে থাকার উপায় নেই এবং শেখ মুজিবুর রহমানরে সিংহাসনের পেছনে না দাঁড়িয়ে তাঁদের গত্যান্তর থাকবে না। তৃতী্য়ত, বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের হাতের মুঠোতে পুরে তিনি দেশের মানুষ এবং বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করত পারবেন যে তিনি মন্দ অর্থে একনায়ক নন। দেশের কৃষকসমাজ থেকে শুরু করে সারস্বত্ব সমাজ পর্যন্ত তাঁকে এত অনুরোধ উপরোধ করেছেন যে, বাধ্য হয়েই তিনি দেশের কল্যান চান এবং বাংলার মানুষকে ভালবাসেন। সমস্ত দেশের মানুষের সমবেত প্রার্থনা তিনি অগ্রাহ্য করতে পারেনণি।
তাঁর দিক থেকে শেখ মুজিবুর রহমান ভূল চিন্তা করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্ষমতার অংশ দেয়ার সংগে সংগেই এক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রবীণ উপাচার্য এক পত্রিকার প্রতিনিধির সংগে সাক্ষাতকারে বলেই বসলেন যে শেখ মুজিবুর রহমানের মত এমন একজন বলিষ্ঠ নেতা হাজার বছরে জন্মগ্রহন করেননি। শেখ মুজিবুর রহমান যে বলিষ্ঠ নেতা সে বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি তা প্রকাশ করার জন্য এই সময়কে বেছে নিয়েছিলেন কেন তা অনেকের কাছেই খুব তাৎপর্যপূর্ণবহ মনে হয়েছে। বাস্তবেও তিনি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের নিয়ে কর্মচারীদের কেন্দ্রীয়দলে যোগদানের আবেদনপত্রসহ তাঁদের নিয়ে রাস্ট্রপতির সংগে দেখা করে আসলেন। সেই ছবি কাগজে ফলাও করে প্রকাশিত হল।


এই উপাচার্য ভদ্রলোককে দেশের মানুষ আত্নমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে জানতেন। অতটুকু দাস্যতা তাঁর কাছ থেকে কেউ প্রত্যাশা করেননি। তাঁর এ ধরনের কার্যকলাপের দু'রকম প্রতিক্রিয়া হল। তাঁর মত লোকের পক্ষে তথাকথিত জাতীয়দলের এ ধরনের কান্ডজ্গ্জানহীন তোষামোদ দেখে জ্ঞানীগুণী সমাজের একাংশ চিন্তিত হয়ে উঠলেন, আরেক অংশের প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে এল। অন্যদিকে রাস্ট্রপতির সংগে তাঁর দহরম মহরম অন্যান্য উপাচার্য এবং সরকারসমর্থক শিক্ষা-সংস্কৃতির সংগে সংযুক্ত নেতৃ্শ্রনীর মনে ঈর্ষার উদ্রেক করেছিল তাতে সন্দেহ নেই। তিনি যদি রাস্ট্রপতির সংগে অতবেশী মাখামাখি করার সুযোগ আদায় করে ফেলেন, অন্যান্যদের সুযোগ-সুবিধে মাঠে মারা যাবার সম্ভাবনা। তাই অন্যান্যরাও উঠে পড়ে লাগলেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক আবুল ফজল ছাড়া আর সকল উপাচার্যই নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং শিক্ষকদের জাতীয়দলে যোগ দেয়ার জন্য ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছিলেন। এ ব্যাপারে সরকার সমর্থক ছাত্রদল উপাচার্যদের সহায়তা দিয়ে আসছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জাতীয়দলে যোগদান করার জন্য যে জয়ভীতি এবং নানামুখী চাপরে সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তা আমি খুব কাছে থেকে নিজের চোখে ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছি। প্রতিটি অধ্যক্ষ বিভাগীয় শিক্ষকদের মধ্যে আবেদনপত্র বিলি করেছিলেন এবং সরকারি প্ররোচনায় তরুণতর শিক্ষকদের সই করতে অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য করেছিলেন। অনেক শিক্ষকই স্বত:প্রবৃত্ত হয়ে সই করতে চাননি। কিন্তু হুমকি, ভীতি এবং চাপের মুখে তাঁদের বেশীরভাগই আত্নসমর্পন করতে বাধ্য হলেন। যে সকল শিক্ষক সই করেননি, তাঁদের নাম বাকশাল কেন্দ্রীয় অফিসে পাঠিয়ে দেয়া হল। সরকারসমর্থক ছাত্রদল এই বিদ্রোহী শিক্ষকদের দেশদ্রোহী হিসেবে খুব শিগ্‌গির ধরে নেয়া হবে বলে হুমকি দিয়ে গুজব ছড়াতে শুরু করল। এই জোর-জুলুম, ভয়-ভীতি, সন্ত্রাসের মধ্যে চৌদ্দই আগস্ট সন্ধ্যাবেলা দেখা গেল মাত্র পনেরজন শিক্ষক জাতীয়দলে সদস্যপদের আবেদন করে সই করেননি। বাকি সকল শিক্ষকদের সই সম্বলিত আবেদনপত্র সংগৃহীত হয়ে গেছে। আগামীকাল যখন রাস্ট্রপতি আসবেন, তখন প্রায় হাজারখানেক শিক্ষকের আবেদনপত্র তাঁর সকাশে দাখেল করা হবে। তিনি শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভাষন দেবেন এবং তাঁদের কাছে তাঁর নেতৃত্বের প্রতি একনিষ্ঠ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি চাইবেন এবং শিক্ষকরাও হাত তুলে তিনি যা বলবেন তার প্রতি সমর্থন জানাতে বাধ্যা হবেন। এই পর্যন্ত সকলে তাই করছেন।


বাংলাদেশের আগ্নেয়আত্নার জ্বালামুখ বলে কথিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় চিন্তা, ভাবনা, বুদ্ধি এবং মননশীলতার নেতৃত্বদানকারী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোন শক্তিধর মানুষকে যা দেয়নি শেখ মুজিবুর রহমানকে সেই অকুন্ঠ আনুগত্য স্বেচ্ছায় প্রদান করবে। গোটা দেশের মানুষ অবাক বিস্ময়ে এই দৃশ্য দেখার জন্য বেদনাহত চিত্তে প্রতীক্ষা করছিল। রাস্ট্রপতির বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন উপলক্ষে জাতীয় দৈনিকগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করছিল। রেডিও ঘনঘন সংবাদ দিচ্ছিল। টেলিভিষনে উপাচার্যের বিশেষ সাক্ষ্যাৎকার দেখানো হচ্ছিল। এ উপলক্ষে কি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়কে কিভাবে সাজানো গোছানো হয়েছে আনুপূর্বিক সমস্ত বিবরণ রেডিও, টেলিভিষন প্রচার করছিল। এই দিনটিকে ভাবগম্ভীর, পবিত্র এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণরুপে দেশের মানুষরে দৃষ্টিতে চিত্রিত করার জন্য পূর্ণপ্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছিল। সরকারি প্রচারণার ধরণটা এমন ছিল যে-কোন রকমের বাধ্যবাধকতা ছাড়া স্বত:স্ফুর্তভাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে এই এৈতিহাসিক সংবর্ধনা প্রদাণ করছে। পূর্বের একনায়করা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে যে রকম ছা্ত্রদের পূণ্জীভূত ক্ষোভ, আক্রোশ কোন না কোনো পথে ফেটে পড়ে, খুন, জখম, রক্তারক্তি কান্ড অবধারিত ঘটে যেত এবার সে সবের কোন লক্ষণ নেই। তিনি তো আর ওৌপনিবেশিক শাসনকর্তা নন, তিনি স্বয়ং বাঙালি জাতির পিতা। সুতরাং তিনি বিশ্ববিদ্যলয়ে আগমন করছেন, তার জন্য কেন বিক্ষোভ এবং অশান্তি হবে। বরন্চ এই মহানায়ককে আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা তাঁদের মধ্যে পাবেন এ আনন্দে সকলে বিভোর হয়ে আছেন। আগামীকাল উনিশ শ'পচাঁত্তর সালের পনেরই আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের একটি স্মরণী্য় দিন হয়ে বিরাজ করবে।


-- -- 00 -- -- -- -- 00 -- -- -- -- 00 -- -- -- -- 00 -- --


চোদ্দই আগস্ট সন্ধের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। শুনলাম কার্জন হলে এবং লাইব্রেরিতে বোমা ফুটেছে। পরিবেশটা থমথমে হয়ে এসেছে। উৎসবমুখর পরিবেশ হঠাৎ যেন কেমন থিতিয়ে এসেছে। মিনিটে মিনিটে পুলিশের গাড়ি টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। সকলের চোখেমুখে আশংকা। ছাত্রদের সিংহভাগ যাঁরা এই সুবিশাল এলাহিকান্ডের নীরব নিরুপায় দর্শক ছিলেন, তাদের মনের গতিটা অনুসরন করতে চেষ্টা করলাম। তাঁদের চোখমুখ দেখে মনে হল এ রকম একটা অভাবনীয় কান্ড ঘটায় সকলে যেন মনের গভীরে খুশি হয়েছে। হাতে পায়ে শেকল, শেকলের পর শেকল পরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বারুদ এবং আগুনের ভাষায় শেষ পর্যন্ত আসন্ন মূহূর্তটিতেই কথা কয়েছে। অর্থাৎ কোন স্বেচ্ছাচারীকেই এই পবিত্র বিদ্যাপীঠ কোনদিন অতীতে বরন করেনি এবং ভবিষ্যতেও বরণ করতে প্রস্তুত নয়।
কথাগুলো ভেবে নিয়েছিলাম আমি। মনের ভেতর একটা ভয়ার্ত আশংকাও দুলে উঠেছিল। দুয়েকটা বোমা ফুটেছে এই ভয়ে শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা স্থগিত রাখবেন তিনি তেমন মানুষ নন। তুনি নিশ্চিতভাবেই আসবেনই। অপার শক্তিবলে মুখরা নগরীর স্পর্ধিত জিহ্বা যিনি স্তব্ধ করে দিয়েছেন, দুয়েকা বোমা ফুটলে কি তিনি সেই ভয়ে ঘরের কোনে চুপটি করে ভেজাবেড়ালের মত বসে থাকবেন? তাঁর প্রতি সবচেয়ে বিরুপ শ্রেণীটি আগামীকাল সকালে সদলবলে নতমস্তকে বসে থাকবেন? নাটকের এই রোমান্চকর দৃশ্যে তিনি কি করে অনুপস্থিত থাকতে পারেন? হয়ত আরো বোমা ফুটবে। পুলিশ ছাত্রাবাসসমুহের কক্ষে কক্ষে খানাতল্লাসী চালাবে, সন্দেহজনক কিছু ছাত্রদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে। কিন্তু তাঁর আসা বন্ধ হবে না।



রাতে হেটে ফিরছিলাম সাতাশ নম্বর সড়কের দিকে। মনে মনে এসব কথা তোলপাড় করছিল ভয়ংকরভাবে। শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘবাহু প্রসারিত করে সমস্ত দেশটাকে কঠিণ আলিংগনে আবদ্ধ করছেন, যা কিছু বাধা দিচ্ছে, প্রতিবাদ করছে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোন কথা নেই, কোনো বাধা নেই। বাংলাদেশের কন্ঠ একটি, সেটি শেখ মুজিবুর রহমানের ---- মানুষ ওই একজন, তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। ভয়ে দুরুদুরু করছিল বুক। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পনেরজন সই করেননি, তাঁদের অনেকেই আমার চেনাজানা বন্ধু-বান্ধব। তাঁদের অবস্থার কথা চিন্তা করছিলাম। তাঁদের কি হবে? তাঁদের কি চাকরি চলে যাবে? তাঁরা কি খাবেন? এই বাজারে বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে কিভাবে জীবনধারন করবেণ? তাঁদের কি পুলিশে তুলে নিয়ে যাবে? কি হতে পারে এই রাজদ্রোহিতার পুরষ্কার?
ভয়ন্কর চাপ অনুভব করছিলাম। একা একা হাঁটছিলাম। ভয়ানক একা বোধ করছিলাম। চারপাশের লোকজনের কারো সংগে আমার সম্পর্ক নেই, যেন কোনকালে ছিলও না। একা একা আমি যেন সুড়ংগ পথে বিচরন করছি। আমার ইচ্ছে হচ্ছিল আমি ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আমি দেখে আসছি, কিভাবে আমার লালিত মূল্যবোধগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। লোভীর লোভ, প্রবলের অন্যায়কে এমনভাবে রুপ ধরে জেগে উঠতে আমি কোনোদিন দেখিনি। এত অশ্রুতে ভেজা, এতা গাঢ়রক্তে রন্জিত আমাদের স্বাধীনতা আমাদেরকে এমনভাবে প্রতারিত করছে প্রতিদিন, সে কথা কার কাছে যেয়ে বোঝাই। যাদেরকে মনের কথা ব্যক্ত করতে যাব, তাঁদের অবস্থাও আমার মত। এ কেমন স্বাধীনতা, যে স্বাধীনতা আমাদের গোটা জাতীটাকে সম্পূর্ন ভিখিরীতে পরিণত করে? এমন স্বাধীনতা যে স্বাধীনতায় আমরা একটা কথাও বলতে পারব না। চোখের সামনে সত্য মিথ্যের আকার নিচ্ছে। জলজ্যান্ত মিথ্যে নধর তাজা সত্যি হিসেবে এসে প্রতিদিন হাজির হচ্ছে। শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের গোটা জাতিটাকে নিয়ে কি করতে চান? তাঁর কথায় কথায় উঠে বসে এ জাতির তো আর কোনোকিছুই অবশিষ্ট নেই। এত অ্ত্যাচার দেখেছি, এত জমাট দু:খ দেখেছি, এত কাপুরুষতা দেখেছি এ জাতি আর মানুষের পর্যায়ে নেই। ক্রমশ পশুর নিচে চলে যাচ্ছি আমরা। দুর্নীতির জাতীয়করন করে সমাজজীবনের প্রতিটি স্তর তিনি বিষিয়ে তুলেছেন। এই জাতীর যা কিছু গভীর, যা কিছু পবিত্র, উজ্জ্বল এবং গরীয়ান বিগত তিন বছরে সমস্ত কিছু কলুষিত করে ফেলতে পেরেছেন।
তাঁর বাহিনী অশ্বমেধ যগ্জ্জের মত যদিকেই গেছে সবকিছু ভেঙেচুরে তছনছ করে ফেলেছে। শেষমেষ ছিল আমাদের একটা বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা ভাবতে শিখেছি, এই বিশ্ববিদ্যালয়ই স্বাধীনতা, শান্তি, কল্যাণ, প্রগতি, সাম্য এবং হরিৎবরণ আশা-আকাঙ্খার লালনক্ষেত্র। এইখানে এই বিশ্ববি্দ্যালয়ে এমন এক শন্কাহীন স্বাধীনতা নিবাস করেন, বিরাজ করেন এমন এক সুস্থশালীনতা আমাদের জ্ঞানদায়িনী মা বিশ্ববিদ্যায়ের অঙে অঙে এমন এক প্রসন্ন পবিত্রতার স্রোত প্রবাহিত হয়, কোন রাজন্য, কোন সমরনায়ক, কোন শক্তিদর্শী মানুষ কোনদিন তা স্থুল হস্তের অবলেপে কলন্কিত করতে পারেনি। আকাশের মত উদার, বাতাসের মত নির্ভর, অনির্বার ঝর্নার উৎসের মত স্বচ্ছ এবং সুনির্মল স্বত:স্ফুর্ত স্বাধীনতা এইখানে প্রতিদিন, প্রতিদিন বসন্তের নতুন মুকুলের আবেগে অন্কুরিত হয়।এই অন্কুঠিত স্বাধীনতার পরশমনির ছোঁয়ায় প্রতিটি আপদকালে এই জাতি বারেবারে নবীন হয়ে ওঠে। এর প্রতিষ্ঠাকালের পর থেকে আমাদের জন্মভুমির ওপর দিয়ে কতই না ঝড় বয়ে গেছে। কতবার ঘোড়ার খুরে, বন্দুকের আওয়াজে কেঁপে উঠেছে আকাশ, গর্বিত মিলিটারির বুটের সদম্ভ পদবিক্ষেপে চমকে উঠেছে রাত্রির হৃদয়। কত শাসক এল, কত মানুষ প্রাণ দিল। আমাদের এই ধৈর্যশীলা জ্ঞানদায়িনী মা সংহত মর্যাদার শক্তি, সাহস, বলবীর্য সবকিছু ফুরিয়ে যাবার পরেও শিখিয়েছে কি করে প্রতীক্ষা করতে হয়। নীরব ভাষায় মৌন আকাশের কানে কানে বারেবারে জানতে চেয়ে গেছে শক্তি, ক্ষমতা, দম্ভ এসবের পরিণতি কোথায়? ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অতন্রপ্রহরীর দল, তারা কোথায়? কোথায় মি. জিন্না, কোথায় নাজিমুদ্দিন, কোথায় নুরুল আমিন? জেনারেল আইয়ুব খান, আবদুল মোনেম খান, ইয়াহিয়া খান এই সমস্ত শক্তিদর্পী মানুষেরা আজ কোথায়? তাঁরা যে আতন্ক, যে ঘৃণা, যে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে এ দেশের জনপদবাসীর জীবনধারায় ঘুর্ণিঝড়ের সুচনা করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় কি আপন সন্তানদের তার আর্তি থেকে বেরিয়ে আসার প্রেরনা দেয়নি?


20-09-1975
আহমদ ছফা



collected from the book Shei Shob Lekha, 2008
compiled and edited by Nurul Anwar
Khan Brothers & Co.

মুজিবের শাসন: একজন লেখকের অনুভব - আহমদ ছফা - ২

বিরোধীদল তো ছিলই না। বিরোধীদলীয় পত্রপত্রিকাগুলোকেও নির্মমভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সরকার সমর্থক পত্রিকাসমুহ এবং সরকারের অন্য দুটো অংগদলের মুখপত্রগুলো প্রতিটি স্বৈরাচারী পদক্ষেপকে একেবারে নির্লজ্জভাবে অভিনন্দিত করে যাচ্ছিল। তথাপি শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় শাসন কায়েম করার প্রাক্কালে বাংলাদেশে পত্র-পত্রিকার সংখ্যা একেবারে কমিয়ে এনে গণমতের বাহনগুলোর কর্তৃত্ব নির্ভরযোগ্য হস্তে অর্পণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র চারটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হবে ঠিক হল। দুটি বাংলা এবন দুটি ইংরেজি এবং এটাও ঠিক হল যে বাদ বাকি পত্রিকাসমুহ বন্ধ করে দেয়া হবে। "ইত্তেফাক" কাগজটিকে পুরোপুরিভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসা হল। "ইত্তেফাক" ছাড়া অপর যে বাংলা কাগজটি বেঁচে থাকবে সেটির নাম "দৈনিক বাংলা"। ইংরেজি কাগজ দুটির নাম "বাংলাদেশ অবজারভার" এবং "বাংলাদেশ টাইমস"। এসব পত্রিকাগুলো একেবারে সরকারি পত্রিকা এবং সাংবাদিকেরা সরকারি কর্মচারীরুপে চিহ্নিত হবেন বলে ঘোষনা দেয়া হল।


একসংগে অনেকগুলো পত্রপত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে গোটা দেশের সাংবাদিকবৃন্দ এক ভয়াবহ সংকটে নিপতিত হন। এই নির্মম অর্তসংকটের দিনে সাংবাদিকেরা সবান্ধবে বেকার হয়ে পড়ার ফলে তাঁদের সামনে বেঁচে থাকার দ্বিতীয় কোন পন্থা উম্মুক্ত রইল না। যে চারটি পত্রিকা প্রকাশিত হবার সিদ্ধান্ত পাকাপাকি হয়ে গেছে, সেগুলোতে কোনো রকমে স্থান করে নেয়ার জন্য প্রতিটি সাংবাদিকই মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। এই ধরনের পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের কাছ থেকে এর চেয়ে ভিন্ন কোন আচরন আশাও করা বোধহয় সম্ভব ছিলনা। অবশ্য শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার তাঁদের কর্মসংস্থান করে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতিও দান করেছিলেন এবং সরকার থেকে তাঁরা অল্প-স্বল্প মাইনেও পাচ্ছিলেন। এই অনিশ্চিত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সাংবাদিকদের মাথায় যে চিন্তাটা প্রথমে এসেছিল তাতে বাহ্যত দাসোচিত আত্মসমর্পন এবং সুবিধাবাদি চরিত্রের পরিচয় স্পষ্টতভাবে ফুটে উঠলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতির বিচারে তাই-ই ছিল একান্ত বাস্তব এবং যুক্তিসংগত। প্রতিটি আলাদা আলাদা পত্রিকার সাংবাদিকেরা ভাবলেন তারা আগেভাগে যদি সরকারি দলে যোগ দেয়ার আবেদনপত্রে সই দিয়ে বসেন, সরকার অনুকম্পা করে তাঁদের কথাটি বিবেচনা করে দেখবেন। এই ধরনের মনোভাবের বশবর্তী হয়ে যাবার বেশ কয়েকদিন পূর্বে "দৈনিক পূর্বদেশ" পত্রিকার সাংবাদিকবৃন্দ সদলবলে বাকশালের কেন্দ্রীয় দফতরে গমন করে সই করা আবেদনপত্রসমুহ জমা দিয়ে এসে মনে করলেন, যা্ক্‌ নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। এই ঘটনার পর থেকে অন্যান্য চালু এবং বাতিল পত্রিকার কর্রমরত সাংবাদিকদেরও বোধদয় ঘটল। তাঁরা ভাবলেন, পূর্বদেশের সাংবাদিকদের মত তাঁরাও যেয়ে যদি বাকশালের সদস্যপদের আবেদনপত্রে সই না করেন, তাহলে তাদের চাকুরি হবে না এবং চালু পত্রিকায় কর্মরত থাকলে চাকুরিটি টিকবে না। সরকারি পত্রিকায় সরকারিদলের লোকদের কাজ পাবার নৈতিক দাবীই সবচেয়ে বেশী। তারপর থেকে সাংবাদিকেরা দিগ্বিদিক জ্ঙান হারিয়ে দল বেঁধে নিয়মিত বাকশাল অফিসে ধাওয়া করতে থাকলেন। প্রতিটি পত্রিকার সরকারসমর্থক সাংবাদিকেরা উদ্যোগী হয়ে সহযোগী এবং কলাকুশলীদের টেনে নিয়ে জাতীয় দলের অফিসে হাজিরা দিতে আরম্ভ করলেন। রাস্ট্রের তৃতীয় স্তম্ভ বলে কথিত সংবাদপত্রের কারিগরদের একাংশ পেশাগত মর্যাদা, স্বাধীনতাস্পৃহা, সত্য এবং ন্যায় - সাংবাদিকতাবৃত্তির সংগে সংস্লিষ্ট ইত্যাদি মহত অনুষংগসমুহ বাদ দিয়ে যে নাটকের অবতারনা করেছিলেন বাংলাদেশের সমাজে অনতিবিলম্বে তার প্রভাব অনুভুত হতে শুরু করে। অবশ্য সাংবাদিক মাত্রেই যে বাকশালে যোগ দেয়ার জন্য লালায়িত ছিলেন তেমন কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। চাপের মুখে বাকশাল সদস্যপদের আবেদনপত্রে সই করে একজন সাংবাদিককে আমি সত্যি সত্যি নিজের চোখে কাঁদতে দেখেছি। বেশ ক'জন সাংবাদিক ভয়ভীতি অগ্র‌াহ্য করে শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার আদর্শ এবং নীতিতে অটল ছিলেন। "ইত্তেফাক" পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জনাব আসাফউদ্দৌলা রেজা আবেদনপত্রে সই করেননি। এই অভিযোগে সরকারি ব্যবস্থাপনায় "ইত্তেফাক" প্রকাশ পাওয়ার সময় তাঁর চাকরি চলে যায়।


বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের সভাপতি ঘোষনা করেছিলেন যে আমলা, কর্মরত সাংবাদিক, স্বায়ত্বশাসিত এবং আধা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানসমুহের কর্মচারীবৃন্দ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক যে কেউ বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের সদস্যপদের জন্য আবেদন করতে পারবেন। অবশ্য কাকে সদস্যপদ দেয়া হবে, কাকে হবে না সটি সম্পুর্নভাবে কর্তৃপক্ষের বিবেচনার বিষয়।
যে কেউ ইচ্ছে করলে সরকারি দলে যোগদান করতে পারবে, এটা ছিল সরকারি ঘোষনা। আসলে যোগ না দিলে কারো নিস্তার পাবার উপায় ছিলনা। ভেতরে ভেতরে সমস্ত সরকারি বেসরকারি দফতর স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পত্রিকার সাংবাদিক, লেখক, কবি, সাহিত্যিক এবং বুদ্ধিজীবীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছিলেন যে, সবাইকে জাতীয়দলে যোগ দেয়ার আবেদনপত্রে সই করতে হবে। কতৃপক্ষ যাকে বিপজ্জনক মনে করেন সদস্যপদ দেবেন না, কিন্তু বাংলাদেশে বাস করে চাকুরি-বাকরি, ব্যাবসা-বানিজ্য করে বেঁচে-বর্তে থাকতে চাইলে জাতীয়দলের সদস্যপদের আবেদনপত্রে সই করতেই হবে। সর্বত্র বাকশালে যোগদান করার একটা হিড়িক পড়ে গেল। শেখ মুজিবুর রহমান যেদিন আনুস্ঠানিকভাবে বাকশালের কেন্দ্রীয় দফতর উদ্বোধন করতে এলেন তাঁকে স্বাগত সম্ভাষন জ্জাপনের উদ্দেশ্যে গোটা দেশের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, শ্রমিক, কৃষক সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে হাজির থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। সেদিন ছিল মুষলধারে বৃষ্টি। অবিরাম ধারাস্রোতে প্লাবিত হয়ে ভেজা কাকের মত সুদীর্ঘ মানুষের সারি কিভাবে রাস্তায় তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন, যাঁরা এ দৃশ্য দেখেছেন ভুলবেন না। মহিলাদের গাত্রবস্ত্র ভিজে শরীরের সংগে একশা হয়ে গিয়েছিল। এই সুবিশাল জনারন্যে আমাদের দেশের নারীকুলকে লজ্জা-শরম জলান্জলি দিয়ে সশংকিতচিত্তে তাঁর আগমনের প্রতীক্ষা করতে হচ্ছিল।


নাগরিক জীবনের সর্বত্র একটা আতন্কের কৃষছায়া প্রসারিত করে আসছিল। এ ধরনের চিন্তা, বুদ্ধি এবং সাহসরোধী পরিবেশে যেখানে মানুষের বিচার-বুদ্ধি কাজ করে না, বেঁচে থাকা বলতে শুধু বোঝায় কোন রকমে পশু অস্তিত্বের সংরক্ষণ। নৈতিক সাহস, মানবিক মুল্যবোধ ইত্যাকার সুসভ্য জীবনের বোধগুলো বাংলাদেশে সর্বপ্রকারের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। সবখানে আতন্ক, উদ্বেগ। এ তো গেল একদিকের চিত্র। অন্যদিকে গ্রাম-বাংলার মানুষদের অবস্থা দুর্দশার শেষ প্রান্তে এসে উপনীত হয়েছে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের দাম প্রতিদিন হু হু করে বাড়ছে। দেশে অভাব, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ক্ষুধার তাড়নায় মা সন্তান বিক্রি করছে। স্বামী স্ত্রীকে পরিত্যাগ করছে। বিনা কাফনে লাশ কবরে নামছে। সৎকারবিহীন অবস্থায় লাশ শৃগাল-কুকুরের আাহার্য হওয়ার জন্য পথে পথে পড়ে থাকছে। চারদিকে জ্বলন্ত বিভীষিকা, চারদিকে হা-অন্ন, হা-অন্ন রব। এই অন্নহীন বস্ত্রহীন মানুষের দংগল একমুঠো ভাত, এক ফোটা ফেনের আশায় ঢাকা শহরে এসে শহরের ফুটপাতে চিৎ হয়ে মরে থাকছে।


একদিকে উদ্ধত উলংগ স্বৈরাচার, অন্যদিকে নির্মম দারিদ্র, বুভুক্ষা এই দুইয়ের মাঝখানে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে অতি কষ্টে, অতি সন্তর্পনে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হচ্ছিল। অর্থনৈতিক অন্তর্দাহের আঁচ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতেও লেগেছে। অনেকগুলো পরিবার মাছ-মাংস স্পর্শ করা বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে। কোনো কোনো পরিবারের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যারা দু'বেলা ভাত খেত দু'বেলা আাটা খেয়ে জীবন কাটাচ্ছে। আবার অনেক পরিবারের দু'বেলা আটাও জোটে না।


অথচ শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন ক্ষমতার সংগে যাঁরা যুক্ত তাঁদের সুযোগ-সুবিধের অন্ত নেই। তাঁদের হাতে টাকা, ক্ষমতা সবকিছু যেন স্বাভাবিক নিয়মে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। আইন তাঁদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধির সহায়, সরকারি আমলারা আ্জ্গাবহ মাত্র, সামাজিক সুনীতি, ন্যায়-অন্যায়, নিয়ম-কানুন কোন কিছুর পরোয়া না-করলেও তাঁদের চলে। উনিশ শ' একাত্তুর সালের যুদ্ধের পর থেকে এই শ্রেণীটি বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক নৈরাজ্যের থেকে প্রাণরস সংগ্রহ করে ডাঁটো হয়ে মাথা তুলছিল। ঢাকা শহরের প্রশস্ত রাজপথ থেকে শুরু করে সরকারি দপ্তর, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিস্ঠান, ব্যাবসায়ীর আড়ত, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, রেডিও-টেলিভিশন, লেখক-সাহিত্যিকদের আড্ডা, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির এমনকি দূর-দুরান্তের পল্লীগ্রামের মহল্লায় মহল্লায় এই হঠাৎ জন্মানো নব্যনবাবদের সীমাহীন প্রতিপত্তি। এদের অনুমোদন ছাড়া মরণোম্মুখ রোগী এক ফোটা ওষুধ পেত না, শীতার্ত উলংগ অসহায় মানুষের পরনে রিলিফের একখানি বস্ত্র উঠত না, এক সের রেশনের চাল কি আটা বিলি হতে পারত না। বিধ্ধস্ত বাংলাদেশের জনগনের সাহায্যার্থে যে দেশ থেকেই সাহায্য আসুক না কেন এই শ্রণীটির দুষ্ট ক্ষুধার চাহিদা মিটাতে সবকিছু শেষ হয়ে যেত। এদের অনুমোদন ছাড়া কোন অফিসে একজন সামান্য পিয়নের নিয়োগপত্র পাওয়ার সম্ভাবণা ছিল না, যোগ্যতা যাই হোক না কেন। রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করানো যেত না। ছাত্রকে স্কুলে। বেবাক দেশের দশদিকে এরা ছড়িয়েছিল। আমলাদের মধ্যে, নিম্নশ্রেণীদের মধ্যে, শিক্ষকদের মধ্যে, গায়ক-শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে, কৃষক-শ্রমিকদের মধ্যে অন্তরীক্ষে অবস্থান করে একজন মাত্র মানুষ সবকিছুর সুতো ধরে রয়েছেন তিনি বাংলাদেশের রাস্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান।


স্বাধীনতার তিন বছর সময়ের মধ্যে সার্বিক পরিস্থিতি এরকম হয়ে দাঁড়িয়েছে যে বাংলাদেশ এবং শেখ মুজিব এ দুটো শব্দ পরস্পরের পরিপুরক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শেখ মুজিব যদি বলতেন আমিই হলাম গিয়ে বাংলাদেশ, তাহলে তিনি এতটুকুও মিথ্যে বলতেন না। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দেশে ফিরে ক্ষমতার সিংহাসনে অধিষ্টিত হয়ে একে একে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর গলা টিপে ধরেছিলেন। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে তিনি নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছেন। তাদের ঘরবাড়ি ভূ-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছেন, পরিবার-পরিজনের ওপর সীমাহীন অত্যাচার চালিয়েছেন। তাদের কাউকে গ্রেফতার করে কারাগারের উদরে নিক্ষেপ করেছেন। দেদার নেতা এবং কর্মী হত্যা করেছে রক্ষীবাহিনী। বাংলাদেশের গ্রামে-গন্জে বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী দমন করার নামে সরল মানুষদের পাখির মত গুলি করে, গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। শেখ মুজিব বিরোধী কোন কিছুর আভাস পাওয়ামাত্রই রক্ষীবাহিনী আগ্নেয়াস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে ছুটে গেছে। সবকিছু জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে, ভেংগে-চুড়ে তছনছ লন্ড-ভন্ড করে দিয়েছে। পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির নেতা তিরিশ বছর বয়স্ক সিরাজ সিকদারকে নৃশংসভাবে হত্যা করিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান পরিষদ কক্ষে উল্লসিত উদ্‌ঘোষনায় ফেটে পড়ে বলেছিলেন, এখন কোথায় সিরাজ সিকদার? গ্রফতার, নির্যাতন এসব শেখ মুজিব প্রশাসনের একটা অ্ত্যন্ত উল্লেখযোগ্য দিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবদুল মতিন, আলাউদ্দিন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি মেজর জলিল, সম্পাদক আ.স.ম. আবদুর রব সহ অসংখ্য নেতা এবং কর্মী, জাতীয় লীগের অলি আহাদ অনেককেই তিনি কারাগারে প্রেরণ করেছিলেন। বিপ্লবী মতাদর্শী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং কর্মীদের কথা বাদ দিয়েও তিনি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিকবোধ আস্থাশীল রাজনৈতিক দলগুলোর উপস্থিতিও বরদাশত করতে পারতেন না।


পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফেরার পর তিনি দেশের বিপর্যস্ত অবস্থার উন্নয়ন সাধনের জন্য সময়ে অসময়ে হুন্কার দেয়া ছাড়া কোনো বাস্তব কর্মপন্থা গ্রহণ করেননি। পক্ষকান্তরে তার বিরোধীদের সমুলে বিনাশ করার এক সর্বনেশে খেলায় মেতে উঠেছেন। এমনকি সে বিরোধিতা নিজের দলের লোক থেকে এলেও এবং একান্ত ন্যায়সংগত হলেও তিনি সহ্য করেননি। দৃশ্যত বিরোধীদলবিহীন খোলা ময়দানের তিন তিনটি দলের সর্বময় কর্তা হওয়া স্বত্তেও তিনি নিশ্চিত বোধ করতে পারছিলেন না। তিনটি দলকে এক করে একদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করে সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করে রাখার জন্য রাতারাতি প্রধানমন্ত্রী থেকে রাস্ট্রপতি হয়ে বসলেন। সংবিধান বাতিল ঘোষনা করলেন। জাতীয় পরিষদের সদস্যদের সংগে বয়-বেয়ারাদের মত আচরন করলেন। উদারনৈতিক গণতন্ত্রে বিশ্বাসী শেখ মুজিব গণতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ দলের পাটাতনে দাঁড়িয়েই একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরিসরে নিজেকে বাঙালি জাতির সংগ্রামী প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করে নিতে পেরেছিলেন এবং বাঙালি জাতির মুক্তি-সংগ্রামের নায়করুপে সারাবিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তিন বছর যেতে না যেতেই আওয়ামী লীগ দলটির অস্তিত্ব বিলীন করে দিলেন। উনিশ শ' উনসত্তর সালের পর থেকে এ পর্যন্ত তাঁকে ভাগ্যদেবতা অযাচিতভাবে কৃপা করে আসছে। উনিশ শ' উনসত্তর সালে আইয়ুব বিরোধী অভ্যূথ্থানের ফলে আইয়ুব খানকে আগরতলা ষড়যণ্ত্র মামলে উঠিয়ে নিতে হয়। কারাগার থেকে তিনি বেরিয়ে আসেন বাঙালি জাতীর জনক এবং অদ্বিতীয় নেতা হিসেবে। তাঁর প্রতি জনগনের আস্থা ভালবাসা তাঁর মস্তকে হিমালয় পর্বতের চুড়োর মত উত্তুংগ মহিমায় বিভুষিত করেছে। গোটা জাতি তাঁর পেছনে। এর পূর্বে কোন বাঙালি নায়কের পেছনে মানুষ অকৃত্ত্রিম আস্থা এবং স্বত:স্ফুর্ট ভালাবাসা এমন করে বিলিয়ে দেয়নি। তার আগেও এরকমটি ঘটেছে বারবার। যে-কোন বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপ্লব, উপবিপ্লব শুরু হওয়ার পূর্বে শেখ মুজিব কোন যাদুমন্ত্র বলে কারাগারে ঢুকে পড়েছেন। ঘটনার নিয়মে ঘটনাটি ঘটে যাবার পর বিজয়ী বীরের মত শেখ সাহেব দৃপ্ত পদক্ষেপে প্রকাশ্য সূর্যালোকে বেরিয়ে এসে নেতার আসনটিতে বিনাদ্বিধায় বসে পড়েছেন। শেখ মুজিবকেই ঘটনাটির নায়ক বলে লোকে বিনাদ্বিধায় মেনে নিয়েছেন। তাঁর নিজের দলের মধ্যেও এ নিয়ে বোধকরি কোন প্রশ্ন কখনো উঠেনি। উনিশ শ' একাত্তর সালের পঁচিশে মার্চ তারিখে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে আপন বাসভবন থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং উনিশ শ' বাহাত্তর সালের দশই জানুয়ারি তারিখে বাংলাদেশে এসে এমন একটি আসন পেয়ে গেলেন, বাঙালি জাতির ইতিহাসে কোন মানুষ সে রকম মর্যাদা, ভালোবাসা এবং একছ্ত্র ক্ষমতার আসনে উপনিবেশ করতে পারেনি। তাঁর তেজ, বীর্য এবং বাক্যের মন্ত্রশক্তিতে বিস্ময়াবিশ্ট দেশবাসী বহুকাল পূর্বেই তাঁকে বংগবন্ধু এবং বাঙালি জাতির পিতা ইত্যাদি দুর্লভ সম্মানে ভূষিত করেছিলেন। শ্রদ্ধা এবং ভালবাসার আসনে তো তিনি রাজচক্রবর্তী হিসেবে বহুকাল পূর্বে থেকেই আসীন ছিলেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে বাঙালি হ্রদয়ের সিংহাসনের রাজা বাস্তবের সিংহাসনে আরোহন করলেন।


যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি তাঁর দু:শাসনে যতই বিপর্যয়ের শেষ সীমানায় নেমে আসুক-না কেন, বন্যা, মহামারী, চোরাচালানী, ছিনতাইকারী, টাউট, স্বজনতোষনকারীরা বাংলাদেশে যে অবর্ননীয় দু:খ-দুর্দশারই সৃষ্টি করুক-না কেন তাঁর গোচরেই সবকিছু ঘটে আসছিল। যৌবনবতী মেয়ে মানুষ তার প্রেমিককে যে রকম বিশ্বাস করে এবং ভালবাসে, বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে সেই অকৃত্তিম অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে উৎসারিত বিশ্বাস এবং ভালাবাসা দিয়েছিল। তিনি এলেন, প্রধাণমন্ত্রী হলেন। নতুন সংবিধান রচনা করলেন, নির্বাচন ডাকলেন এবং নির্বাচিত হওয়ার পর বছর না ঘুরে না-আসতেই প্রধাণমন্ত্রীর পদ তাঁর হল না। তাঁরই নির্দেশে রচিত সংবিধানের বিধানগুলো আঁটোসাটো জামার মত ক্রমাগত তাঁর বিরক্তি উৎপাদন করছিল। তাই তিনি নিজ হাতে গড়া অনুশাসনের নিগড় ছিন্ন করে ফেললেন। সংবিধান বাতিল ঘোষনা করলেন। যে সংসদীয় গনতন্ররে বাঁধানো সড়ক বেয়ে আকাশস্পর্শী উচ্চকাঙখার নির্দেশে একটি সবল, স্বাস্থ্য এবং দরাজ কন্ঠস্বর মাত্র সম্বল করে এতদুর উর্ধ্বে আরোহন করেছেন সেই সংসদীয় গণতণ্ত্র শেখ মুজিবের হাতেই জখম হয়ে হয়ে লাশটি তাঁরই হাতে কবরস্থ হওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিল। অবিলম্বে তিনি তাঁর কর্তব্যকর্ম সমাপন করলেন। সংসদীয় গনতণ্ত্রের লাশটি কবর দিলেন। একদলীয় সরকারের রা্স্ট্টপতি হিসেবে নতুন পরিচয়ে তিনি নিজেকে পরিচিত করলেন। শেখ মুজিব যা করেন সব নিঁখুত। ইতিহাসের সংগোপন আকান্খা তাঁর প্রতি কর্মে অভিব্যক্তি লাভ করে। এ হচ্চে তাঁর পরিষদের ধারণা। কথাটি তিনিও আপনদল এবং বন্ধুদলের মানুষদের কাছ থেকে এতবেশি শুনেছেন যে নিজেও প্রায় অতিমানব বলে বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন। তিনিও মনে করতে আরম্ভ করলেন, যা কিছু হও বলবেন, অমনি হয়ে যাবে। এ যেন শেক্সপীয়রের নাটকের নায়ক জুলিয়াস সিজার। আকাশের জ্যোতিস্কমন্ডল বারেবারে শুভ-সংকেত বয়ে নিয়ে আসে।


শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্রে সীজারের বীরত্ব এবং গুনাগুন বর্তমান ছিল কিনা বিচার করবেন আগামীদিনের এৈতিহাসিক। তবে একথা সত্য যে, পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশ বাংলাদেশে তিনি যা পয়েছেন, যা আদায় করেছেন, অনুরুপ ভাগ্য কোন রোমান সীজারের কোনদিন হয়নি।
সব শক্তিদর্পী মানুষের যেমন হয়ে থাকে তেমনি শেখ মুজিবর রহমানের মনে কিছু নিরীহ বস্তু না পাওয়ার ক্ষোভ বারবার তাঁর অন্তর্লোককে পীড়ন করেছে। শক্তিদর্পী মানুষেরাও চায় মানুষ তাদের ভালাবাসুক বন্ধুর মত, আবার যমের মত ভয় করুক। আকাশের দেবতাকে যে রকম ভীতিমিশ্রিত ভালবাসা দিয়ে বিচার করে, শেখ মুজিবুর রহমানের মনেও অবিকল সে রকম একটি বাসনার উদয় হয়েছিল।
তিনি বিলক্ষন জানতেন, পান্ডিত্যাভিমানী শিক্ষিত সমাজের মানুষ তাঁকে অন্তর থেকে অবজ্গা করেন। এই শ্রেণীটির চরিত্রের খাঁজগুলো সম্বন্ধে পুরোপুরি অবহিত ছিলেন। উনিশ শ' উনসত্তর সালের পূর্ব পর্যন্ত এই শ্রেনীর লোকেরা তাঁকে বাগাড়ম্বর সর্বস্ব অমার্জিত হামবগ ছাড়া কিছু মনে করতেন না, তা তাঁর অজানা থাকার কথা নয়। বিভিন্ন বিবৃতি, বক্তৃতা, ঘরোয়া বৈঠক এবং আলাপ-আলোচনায় এঁদের প্রতি প্রচ্ছন্ন ঘৃণা এবং বিরক্তি তিনি কুন্ঠাহীনভাবে ব্যক্ত করেছেন। তা সত্তে্ও উচ্চশিক্ষিত আমলা, লেখক-সাহিত্যিক এবং শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষক এবং সম্ভ্রন্ত সমাজের একাংশ তাঁকে বংগবন্ধু বলে যে সম্বোধন কেন করতেন শেখ মুজিব তা বুঝতেন এবং তা তাঁর ক্ষমতার স্বাভাবিক প্রাপ্য হিসাবেই গ্রহণ করতেন। তাছাড়া বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি বলে কথিত শ্রেণীটির হীনমন্যতাবোধ এবং চারিত্রিক দাসত্ব অনেকটা প্রবাদের সামিল। যে-কোন নতুন শাসক এলেই সকলে মিলে তাঁর গুণপনা বাখান করা এখানকার বহুদিনের একটা প্রচলিত প্রথা। কচিত কদাচিত ব্যতিক্রমী কন্ঠ শোনা যায়। এর কারণ নিশ্চয়ই বাংলাদেশের সমাজ শরীরের মধ্যে সংগুপ্ত আছে।


শক্তিদর্পী মানুষেরাও যে শেষ পর্যন্ত একেকটা দিকে কাঙাল থেকে যান শেখ মুজিবের মধ্যেও তার পরিচয় পাওয়া যায়। যে বস্তুটি সহজভাবে পাওয়া যায় না তাকে ভেঙে ফেলার জন্য এঁদের অনেক সময় নিয়মমত খাওয়া-শোয়ার ব্যাঘাত ঘটতে থাকে। তাঁর আসন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের ঘটনাটিকেও এ পর্যায়ে ফেলা যায়। যদিও তিনি দেশের একচ্ছত্র অধিপতি তথাপি তাঁর কানের কাছে অনেক উচ্চকন্ঠ চিৎকার করেছে, বাচাল ও অর্বাচীনেরা অনেক বৃথা লিখেছে, কিন্তু পন্ডিতরা বরাবর নিশ্চুপ থেকেছেন। এই অর্থবোধক নিশ্চয়তা তাঁর বুকে শেলের মত বেজেছে। সেজন্যই তাঁর অত ঘটা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা। যে লোকেরা সহজভাবে তাঁকে স্বীকার করে নেয়নি, তাঁদেরকে তাঁর মহিমা বুঝিয়ে দেয়ার জন্যই বিশ্ববিদ্যলয়ে আসছেন। নইলে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে শেখ মুজিব সকাল-সন্ধে ভাঙা কাপে চা খেয়েছেন, সেখানে আাসার জন্য সাড়ে সাত লক্ষ টাকা ব্যয় করার কি প্রয়োজন থাকতে পারে? বিশষত বাংলাদেশের মত দেশে যেখানে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠেও এক-তৃতীয়াংশ ছাত্রের পয়সার অভাবে সকাল বেলার টিফিন জোটে না।


তাছাড়া আরেকটি কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা তাঁর জন্য অণিবার্য হয়ে পড়েছিল। যতই তিনি জনগনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলেন ততই তাঁর চরিত্রের স্বৈরাচারী লক্ষণসমুহ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল। ক্ষমতার নির্মম একাকীত্ব তাঁকে নিশ্চয়ই বুঝিয়ে দিয়েছিল যে গণতণ্রের ধারাস্রোতে বাহিত হয়ে তিনি এসেছিলেন, তাতে তাঁর পুনরায় অবগাহন করার কোন উপায় নেই। কেননা এই তিন বছরে শরীর অনেক ভারী হয়ে গিয়েছে এবং সাঁতারও প্র‌ায় ভুলে গিয়েছেন। যদি তাঁকে একজন মানুষ হিসেবেই বেঁচে থাকতে হবে - জনতাই তাঁর শাসনের বিষয়বস্তু। তিনি রাজা এঁরা প্রজা। এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি মনে মনে সাংঘাতিক রকম অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন। সংবিধান, জাতীয় পরিষদ, পরিষদের সদস্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতি বলতেন, তিনি জনগনকে ভালবাসেন এটা তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস আর জনগন তাঁকে দেখতে ভিড় করতেন, তাঁর বক্তৃতা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, তাঁর কথায় হাত উঠাতেন এটা জনগনের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা শুনে এবং কথায় কথায় হাত উঠিয়ে অভ্যস্ত। আসলে জনগন অনেকদিন থেকেই তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন। কারণ বাংলাদেশের যে দুর্দশা বন্যা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি ধরে নিয়েও বলা যায় তার আশি ভাগই মানুষের সৃষ্টি এবং তাঁর জন্য মুখ্যত দায়ী তাঁর পরিচালিত তৎকালীন সরকার। গ্রামের সরল মানুষকে, অনাহারক্লিষ্টা বিধবাকে আমি নিজের কানে তাদের তাবৎ অভাব অভিযোগের জন্য দায়ী করে অভিস্পাতের বাণী উচ্চারণ করতে শুনেছি। তিনি যে ধীরে ধীরে স্বখাত সলিলে ডুবে যাচ্ছেন খুবই টের পাচ্ছিলেন। জনগনের রুদ্ররোষ কি বস্তু উপলব্ধি করতে সময় লাগেনি। এই জনগনই আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করিয়ে শেখ মুজিবকে আইুয়ব খানের কারাগার থেকে মুক্তমানব হিসেবে প্রসন্ন দিবালোকে বের করে এনেছে। উনিশ শ' একাত্তর সালের মার্চ মাসের দিনগুলোতে জনগনের সংগবদ্ধ শক্তির গভীরতা, তীব্রতা কতদূর হতে পারে, বাঁধভাঙা বন্যার স্রোতের মত রাস্ট্রীয় এবং সামাজিক জীবনে কি অঘটন ঘটিয়ে তুলতে পারে সে জ্গান তিনি হাতে কলমেই লাভ করেছেন। তাই তিনি ক্রমাগতভাবে জনগনের ক্ষোভ আক্রোশ প্রকাশ করার পন্থা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমুহের মুখে বালির বাঁধ রচনা করে যাচ্ছিলেন। তাই তিনি তিনদল ভেঙে একদল করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী থেকে সরাসরি একনায়ক সেজে বসেছেন।


তিনদিন ভেঙে একদল করার পর তাঁর হাতে প্রভুত ক্ষমতা সন্চিত হয়েছিল বটে, কিন্তু তিনি রাজনৈতিকভাবে সম্পুর্ণ গরঠিকানার মানুষ হয়ে পড়েছিলেন। সম্মিলিতভাবে তিনি তিনদলেরই কর্তা, কিন্তু আসলে কোন দলেরই কেউ নন। এই ঠিকানাহীনতা তাঁকে একনায়কতন্রের দিকে আরো জোরে ঠেলে দিচ্ছিল। জনগন মন অধিনায়ক নেতার পক্ষে একনায়ক পরিচয়ের পথে রাজার পরিচয় আরো প্রীতিপদ এবং সম্মানের। বিশেষত তিনি দেশ এবং বিদেশের সামনে প্রমাণ যখন করতে পেরেছেন, তিনি চাননি তবু জনগন তাঁকে রাজার আসনে বসিয়েছে। এই রাজকীয় পরিচয়টা দেশের মানুষের মনে ভালভাবে দাগ কাটে মত বসিয়ে দেয়ার জন্য তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করে যাচ্ছেন। একদলীয় শাসন কায়েম করেছেন, জাঁকালো রাস্ট্রপতি হয়ে বসেছেন, উপবেশনের সুবিধার জন্য দিনাজপুরের মহারাজার সিংহাসনটা আনিয়ে নিয়েছেন। ব্রিটিশ আমলের ঘূণে ধরা প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করেছেন। পূর্বের জেলা এবং বিভাগগুলোর সীমানা চিহ্ণ মুছে দিয়ে গোটা দেশেকে একষট্টিটি নতুন প্রশাসনিক এলাকা তথা জেলায় বিভক্ত করে, প্রতি জেলার জন্য একজন করে গভর্ণরও দান মনোনয়ন দান করেছেন। জেলা প্রশাসনের সংগে সরাসরি কেন্দ্রীয় শাসনের সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। গভর্ণররা যাতে সর্বেসর্বা হয়ে বসতে না পারে সেজন্য বৈরী গ্রুপ থেকে একেকজন বাকশাল সাধারন সম্পাদককে মনোনয়ন দান করা হয়েছে। শাসনব্যবসথাকে নতুনভাবে ঢালাই করার নামে আইয়ুবের মত শেখ মুজিবও তাঁর সিংহাসনে থাকার পথটি পাকাপোক্ত করেছেন। আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্রের মৌলিক বস্তুটির সংগে জনগনের চাক্ষুষ পরিচয় ঘটেছে। মুজিবের মৌলিক বস্তুটিরও প্রয়োজনীয়তা কতদুর ছিল আগামীদিনের প্রশাসনবিদরা বিচার-বিবেচনা করে দেখবেন। আমার বক্তব্য হল, আইয়ুব সরকার এবং মুজিব সরকা নিজেদের ক্ষমতায় অটুট থাকবার জন্য উদ্ভাবিত পথটিকেই শাসনতান্রিক বিপ্লব বলে আখ্যা দিয়েছেন। জেলাসমুহের গভর্নর এবং বাকশালের সাধারন সম্পাদক নিযুক্ত করার ব্যাপারেও শেখ সাহেব রাজকীয় বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশের শাসক নেতৃশ্রনীতে যত ধরনের চাপ প্রয়োগক্ষম গ্রুপ রয়েছে, সব গ্রুপ থেকে প্রতিনিধি গ্রহন করেছেন - রাজনৈতিক দল ও ন্যাপ থেকে, আমলাদের থেকে, আইনজীবী শ্রেণী থেকে, সেনাবাহিনী থেকে, আনুপাতিকহারে গভর্নর ও সম্পাদক নিয়েগ করার পেছনরে কারণ ছিল সার্বিকভাবে গোটা শাসক নেতৃশ্রণীটার কাছে তাঁর শাসনটা গ্রহণযোগ্য করে তোলা।


ব্যবহারিক দিক দিয়েও তিনি রাজার মতই আচরন করে যাচ্ছিলেন। তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দের কেউ তাঁর সামনে টু-শব্দটি উচ্চারণ করতে সাহস পেতেন না। তাঁকে বুদ্ধি পরামর্শ দিতে পারে মত কেউ ছিলেন না। তিনি যদি কখনো মন্ত্রিসভার সদস্যদের ডাকার প্রয়োজন মনে করতেন, ডাকতেন। এ কারণে যে তাঁর নিজস্ব পরিবারটিকে কেন্দ্র করে একটি রাজপরিবারের ছবি ক্রমশ লক্ষ্যগোচর হয়ে উঠেছিল। তাঁর ছেলে, তাঁর ভাগ্নে, ভগ্নিপতি, ভাই সকলে সত্যি সত্যি দুধের সরের মত বাংলাদেশের শাসকশ্রণীর পুরোভাগে ভেসে উঠেছিলেন। বাকি ছিল রাজমুকুটটা মস্তকে ধারণ করা এবং রাজউত্তরীয়খানি অঙে চড়িয়ে দেয়া। এই জন্যই তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। নেপোলিয়নের মত বিশ্ববিখ্যাত বীরযোদ্ধাও হাতে প্রভুত ক্ষমতা থাকা স্বত্তেও রাজমুকুটটি নিজে নিজে পরে বসেননি। রোম থেকে পোপকে আসতে হয়েছিল। এই সমস্ত শক্তিধর মানুষেরা শক্তি দিয়ে সব কাজ করো আনলেও শেষের কাজটি করাবার জন্য এমন কাউকে খোঁজ করে আনেন, যাঁর প্রতি মানবসাধারণের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা রয়েছে এবং যা এৈতিহ্যসম্মত।


নেপোলিয়নের যুগ গেছে, পোপের যুগ গেছে। কিন্তু মানুষের অন্তরের আগুন সে রকম আছে। উচ্চাকাঙ্খা উদ্ধত হয়ে এখনো আকাশ ফুঁড়ে ফেলতে চায়। তাই শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছেন। একক হাতে বেবাক ক্ষমতা তুলে নেয়ার স্বপক্ষে সাসস্বত সমাজের রায় গ্রহণ করবেন। তাছাড়া আরেকটি গোপন অভিলাষ তাঁর মনের কোনে থাকাও বিচিত্র কি। উচ্চশক্ষাভিমানী পন্ডিতম্মন্য লোকেরা যাঁদের তিনি মনে মনে অপরিসীম তাচ্ছিল্য করেন, তাঁরা সকলে একযোগে এসে তাঁর বিরাটত্ব ও মহত্তের সামনে দন্ডবত হবেন। একজন শিক্ষকও যাতে অনুপস্থিত না-থাকতে পারেন এবং একজনও যাতে অর্থহীন নীরিহ একগুঁয়েমীকে আশ্রয় করে কাগুজে বীর হিসেবে পরিচিত না-হতে পারেন আগেভাগে সে ব্যবস্থা করা হয়েছে।


স্বাধীনতার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ সরকারসমর্থক ছাত্রদের যাবতীয় দুর্নীতির আখড়াতে পরিনত হয়েছিল। পাকিস্তানি শাসনামলে সামরিক সরকারের আরোপিত হাজারো বাধা-বিঘ্ন অগ্রাহ্য করে বাঙালি মনীষা পাথরের ভেতর দিয়ে পথ কেটে একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের পানে অগ্রসর হচ্ছিল। কি সংস্কৃতি চর্চায়, কি রাজনৈতিক চেতনার বিকাশে, কি মননশীলতার লাবণ্য সন্চারে পাকিস্তান আমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে ভুমিকা পালন করেছে তা বাঙালির জাতীয় ইতিহাসে চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে। বাংলাভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ, বাংলার জাতীয় জাগরনের প্রথম আন্দোলন, উনিশ শ' উনসত্তরের আইয়ুব বিরোধী বিক্ষোভ, একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধ এ সকল জাতীয় জীবনে অপরিসীম প্রভাববিস্তারী ঘটনাগুলো ঘটিয়ে তোলার উদ্যোগপর্বে নেতৃত্বদান করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। উন্নয়নশীল দেশসমুহের রাজনীতিতে ছাত্ররা অনিবার্যভাবে কোন্‌ ভুমিকা পালন করে থাকেন শেখ মুজিব তা জানতেন। তিনি নিজেও এরকম ছাত্র আন্দোলনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তাই তাঁকে শুরু থেকেই ছাত্রদের কঠোর নিয়ন্ত্রনে রাখার বিষয়টি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে ভাবতে হয়েছে।
তিনি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করার কিছুদিন পরই দেখেছেন যে, যে ছা্ত্রপ্রতিষ্ঠানটির পেশল সমর্থন তাঁর একমাত্র রাজনৈতিক মুলধন ছিল সেই ছাত্রলীগকে চোখের সামনে দু'টুকরো হয়ে যেতে, তাঁর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়া, ছাত্রলীগের অপরাংশের সক্রিয় সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে অপর একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেখে তাঁকে নিশ্চয়ই হতবাক করে থাকবে। উনিশ শ' তিয়াত্তর সালের পয়লা জানুয়ারির ঘটনা। ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিবাদ করে বাংলাদেশের ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যকেন্দ্রের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে পুলিশ বিক্ষোভকারী ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষন করে। ফলে একজন ছাত্র ঘটনাস্থলে নিহত হয়, কয়েকজন মারাত্বকভাবে আহত হয়। তার প্রতিবাদে ছাত্র ইউনিয়ন সমস্ত ঢাকা শহরে প্রতিবাদ সভা এবং মিছিলের আয়োজন করে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যাকারী আখ্যায় ভুষিত করে। সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চালিত 'ন্যাপ' এবং 'বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টি'র সমর্থক ইউনিয়নের দখলে ছিল। তাঁর এই গুলিবর্ষনের প্রতিবাদস্বরুপ বিক্ষুদ্ধ ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা ছাত্রসংসদের খাতায় যে পৃষ্ঠাটিতে শেখ মুজিবুর রহমান কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের আজীবন সদস্য হিসেবে সাক্ষর করেছিলেন সেই পৃষ্ঠাটিকে ছিড়েঁ ফেলে। অথচ এই ছাত্র ইউনিয়নই পদে পদে শেখ মুজিবুর রহমানকে তাদের মূল রাজনৈতিক দলদু'টোর মত অন্ধভাবে সমর্থনদান করে যাচ্ছিল। নিজের সমর্থক ছাত্ররা যখন এ অভাবনীয় কান্ড ঘটিয়ে তুলতে পারে, বিরোধীদলীয় ছাত্ররা যে প্রতিবাদে কতদূর মারমুখী হতে পারে, একটি সম্যক ধারণা তাঁর হয়েছিল। তাঈ শক্তহাতে বিশ্ববিদ্যালয়সমুহ বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় এবং ছাত্রসমাজকে নিয়ন্ত্রনে রাখার সিদ্ধান্ত্ব তিনি গ্রহণ করেছিলেন।


উনিশ শ' বাহাত্তর সালের পর থেকে প্রকৃত প্রস্তাবে চার পাঁচজন ছা্ত্রই স্টেনগান হাতে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ চালাত। উপাচার্যবৃন্দ এই অস্ত্রধারী ছা্ত্রদের কথাতে উঠতেন, বসতেন। স্বাধীনতার পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুক্তির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল, কিন্তু স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যলয়ের বেবাক পরিবেশটাকেই কলুষিত করে তোলা হল। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন চিন্তা, কল্পনা, নিরপেক্ষ গবেষনার পথ একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। সরকার সমর্থক ছা্ত্ররা প্রকাশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করত। দরকারবোধে তারা এগুলো ব্যবহার করতে কোন রকম কুন্ঠা বা সংকোচবোধ করত না। বর্তমানে ঢাকা জেলার জেলা জজের কোর্টে একটি লোমহর্ষক হত্যামামলার বিচার চলছে। সরকার সমর্থক দু'দল ছা্ত্রের মধ্যে মতামতের গরমিল হওয়ায় অবাধে রাতের বেলা অগ্নেয়াস্ত্র ব্যাবহার করে সাতজন সতীর্থকে হত্যা করেছে। আজ থেকে প্রায় একবছর পূর্বে হাজী মুহম্মদ মহসীন ছাত্রাবাসের টিভি কক্ষের সামনেই এই শোকাবহ ঘটনা অনুষ্ঠিত হয়। সরকারসমর্থক ছাত্ররাই যখন মতামতের গড়মিলের জন্য স্বদলীয় ছাত্রের হাতে এভাবে বেঘোরে প্রাণ হারাতে পারে, সাধারণ ছাত্র এবং শিক্ষকদের অবস্থা কি হতে পারে সহজেই অনুমান করা যায়। সরকারসমর্থক ছাত্রের মত শিক্ষকদেরও একটি বিশেষ অসুবিধা হবার কথা নয়।

মুজিবের শাসন: একজন লেখকের অনুভব - আহমদ ছফা

চোদ্দই আগস্টের রাতে আমি নতুন ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার সাতাশ নম্বর সড়কের একটি হোস্টেলে এক বন্ধুর সংগে ঘুমাতে গিয়েছিলাম। সাতাশ নম্বর আর বত্রিশ নম্বর সড়কের ব্যবধান বড় জোড় তিন থেকে চার'শ গজ। এই বত্রিশ নম্বরেই দারাপুত্র পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন বাংলাদেশের রাস্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান।
আনুমানিক রাত এগারোটা হবে হয়ত। বত্রিশ নম্বর পেরোবার সময় খাকি পোষাক পরা আট দশজন পুলিশ দেখলাম। কয়েকজন অফিসার, বাকিরা সেপাই। বন্দুক উঁচিয়ে রাস্ট্রপতির বাসভবনের সামনের সড়কের মুখে পাহারারত।
এই পথে বেশ ক'দিন থেকে যাওয়া আশা করছি। প্রায়ই দেখতাম ঘুণটি ঘরে দু'জন থেকে তিনজন সেপাই দাঁড়িয়ে। কোন অফিসার দেখেছি মনে পড়ে না। আজ পাহারাদারদের দল ভারি দেখেও মনে কোন ভাবান্তর আসেনি।
আগামিকাল পনেরোই আগস্ট বেলা দশটার দিকে রাস্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এককালের বাংলাদেশের আগ্নেয়আত্মার জ্বালামুখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানিত অতিথি হিসেবে আগমন করছেন। হয়ত সেজন্য এই অধিকসংখ্যক সেপাই-সান্ত্রীর আনাগোনা। এখন পর্যন্ত সবকিছু পুর্ব-নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুসারে ঘটে আসছে। কোথাও কোনো ঝঞ্জাট ঘটেনি।

১৯৭৫ সালের সংবাদপত্রে ১৫ আগস্ট

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ছিল শুক্রবার। সকালে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল। ওই খবর ফলাও করে পত্রিকায় ছাপা হয়। দৈনিক বাংলা ও ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত হয় আট পৃষ্ঠার বিশেষ ক্রোড়পত্র। আর এই পত্রিকা পাঠকের হাতে পৌঁছানোর আগেই সপরিবারে নিহত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৭৫ সালের ১ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সংবাদপত্রের খবর ছিল অনেকটাই বাকশালকেন্দ্রিক। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করা হয়। কিন্তু আগস্টে বাকশালের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এর পাশাপাশি, বঙ্গবন্ধু সরকারকে উত্খাতের ষড়যন্ত্র যে চলছিল তার প্রমাণ ১৫ আগস্ট।

আওয়ামী লীগ ও রক্ষীবাহিনীর নির্যাতন : কেউ ভোলে কেউ ভোলে না (পর্ব-২)

১৯৭২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়। গঠনের পর থেকেই এ রক্ষীবাহিনী সবসময় সরকার প্রধানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থেকে কাজ করেছে। রক্ষী বাহিনী গঠন সম্পর্কে এনায়েতুল্লাহ খান লিখেছেনঃ 'একটি বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এই এলিট ফোর্স সৃষ্টির ইতিহাস আরো বিচিত্র। মুজিব বাহিনীর নেতৃবৃন্দের পরিকল্পনা অনুযায়ী শেখ মুজিবর রহমানের স্বহস্তে লিখিত পত্রের ওপর ভিত্তি করে এবং তারি উত্তরাধিকারীদের নেতৃত্বে এই রাজনৈতিক বাহিনী গঠন করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, দেরাদুনে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত এই বিশেষ প্রতিবিপ্লবী সংগঠন জেনারেল ওসমানী পরিচালিত মুক্তিবাহিনী এমন কি তাজুদ্দিনের নিয়ন্ত্রণেও ছিল না। জনৈক ভারতীয় সেনাবাহিনীর জেনারেল ওবানের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় এর সাংগঠনিক কাঠামো এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে একথাই নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সংগে এই বাহিনীর মৌলিক বিরোধ ছিল।’

অন্যদিকে রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার ও হত্যার লাইসেন্স দেয়া প্রসঙ্গে ১৯৭২ সালের ২ এপ্রিল সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকার ‘স্যাংশান টু দ্য কিল ডিসেন্টার’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলা হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব যখন প্রকাশ্যে জনসভায় নির্দেশ দিলেন, “নক্সালদের দেখামাত্র গুলী কর” তখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চালানোর জন্য অন্য কোনো অনুমোদনের আর দরকার পড়ে না।’ এ পত্রিকার ১৯৭৩ সালের ২০ মে প্রকাশিত ‘ভিসেজ অব কাউন্টার রেভ্যলুশন’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলা হয়, “রক্ষীবাহিনী হচ্ছে প্রতি বিপ্লবের অস্ত্র, যার উপর এমনকি সর্বভুক শাসক শ্রেণীর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ভারতীয় শাসক শ্রেণীর অনুগত এক সরকারকে এবং ভারতীয় উপ-সাম্রাজ্যবাদের সম্প্রসারণবাদী স্বার্থকে রক্ষা করার জন্য এটা হচ্ছে সিআরপির সম্প্রসারণ। এর নিঃশ্বাসে রয়েছে মৃত্যু আর ভীতি। আপনি অথবা আমি যে কেউ হতে পারি এর শিকার এবং বাংলাদেশের প্রশাসনের পুস্তকে আমাদের পরিচিতি হবে ‘দুষ্কৃতকারী’ হিসাবে।”


রক্ষীবাহিনীকে ইনডেমনিটি দেয়া প্রসঙ্গে সাবেক উপরাষ্ট্রপতি ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদের লেখা, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়-‘যখন রক্ষীবাহিনীর আচরণ এবং ভুমিকা নিয়ে জনগণের অসন্তোষ চরম পর্যায়ে উপনীত হয় এবং দেশের সংবাদপত্রগুলো তাদের ক্ষমতা, কতৃ ত্ব ও ভুমিকা নিয়ে অব্যাহতভাবে প্রশ্ন উত্থাপন করতে থাকে তখন ২০ মাস কার্যধারা পরিচালনায় ঢালাও লাইসেস দেয়ার পর সরকার রক্ষী বাহিনীর তৎপরতাকে আইনসিদ্ধ প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যেও একটি অধ্যাদেশ জারি করে।’

আজকের পর্বে রক্ষীবাহিনীর বর্বরতার দুটি চিত্র তুলে ধরবো।

১.
রক্ষী বাহিনী এসে বিপ্লবকে প্রথম খুব মারধর করলো।.. খুব মেরে বিপ্লবের মা ও বাবাকে ডাকিয়ে আনলেন। তারপর বিপ্লবকে বললো,’কলেমা পড়’। বাধ্য হয়ে বিপ্লব হিন্দু হয়েও কলেমা পড়লো। এরপর বললো, ‘ সেজদা দাও পশ্চিমমুখী হয়ে।‘ ভয়ে বিপ্লব তাই করলো। যখন সেজদা দিল, পেছন থেকে বেয়োনেট চার্জ করে বাবা-মা ও অনেক লোকের সামনে হত্যা করলো তাকে। বেয়োনেট চার্জ করার সময় রক্ষীদের একজন বললো, মুসলমান হয়েছো, এবার বেহেশতে চলে যাও।...

আমার সাথে যে ৪০জনের মতো ছেলে রাজনীতি করতো তারা সবাই ছিল ব্রিলিয়ান্ট, ফাস্টক্লাস পাবার মতো ছেলে। শুধু বেঁচে আছি আমি ও আরেকজন। বাকী সবাই রক্ষী বাহিনী, মুজিব বাহিনী ও মুজিবের অন্যান্য বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে গৌতম দত্তকে গ্রেফতার করা হয় ঢাকায় এবং হত্যা করা হয় কাটুবুলিতে তার নিজের বাড়িতে নিয়ে। রশিদকে হত্যা করা হয় রামভদ্রপুরে নিয়ে। ডামুড্যার আতিক হালদার, ধনুই গ্রামের মোতালেব এদেরকেও তাদের বাড়িতে নিয়ে আত্মীয়স্বজনের সামনে হত্যা করা হয়। পঁচাত্তরের প্রথম দিকে মোহর আলীকে ধরেছিল পুলিশে। শিবচর থেকে তাকে নিয়ে গিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তার শরীরের চামড়া খুলে লবণ মাখিয়ে তাকে হত্যা করা হয় এবং তার লাশ ডামুড্যা বাজারে টানিয়ে রাখা হয় কয়েকদিন। .... আঘাত এলো সিরাজ সরদারের উপরে। তিনি পালিয়ে গিয়ে সিরাজ সিকদারের বাহিনীতে আশ্রয় নিলেন। সিরাজ সিকদার তাকে চারজন গার্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। একদিন তাকে ডেকে নিয়ে এলো। এরপর ঘেরাও করে প্রথমে তারা সিরাজ সিকদারের দেয়া চারজন গার্ডকে হত্যা করলো। আর সিরাজ সিরদারকে নিয়ে এলো নদীতে। নৌকার মাঝির বর্ণনামতে, প্রথমে তারা সিরাজ সরদারের হাতের কব্জি কাটল, তারপর পা ও অন্যান্য অংগ প্রত্যঙ্গ কেটে এবং শরীরের মাংস কেটে টুকরো টুকরো করে নদীতে ফেলে দিলো।‘ ( বামপন্থী নেতা শান্তি সেনের বর্ণনা)

২.
’৭৩ সালের প্রথম থেকেই গ্রামে গ্রামে চলে রক্ষীবাহিনীর বর্বর, নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক অভিযান। মুজিব আমলের স্বৈরাচার ও বিরোধী নির্যাতনের একটি দলিল আত্মগোপনকারী কম্যুনিষ্ট নেতা শান্তি সেনের স্ত্রী শ্রীমতি অরুণা সেনের বিবৃতি। অরুনা সেন, রানী সিংহ ও হনুফা বেগমকে ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার রামভদ্রপুর গ্রাম থেকে রক্ষীবাহিনী ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা দায়ের করেনি। তাদেরকে কোন আদালতেও হাজির করেননি। ঢাকার বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয় এবং পরে সুপ্রীম কোর্টে তাদের পক্ষে রীট আবেদন করার পর কোর্টের নির্দেশে তাদেরকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার শুনানির সময় সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণযোগ্য অভিযোগ আনতে অক্ষম হওয়ায় সুপ্রীম কোর্ট অবিলম্বে তাদের তিনজনকেই বিনা শর্তে মুক্তিদানের নির্দেশ দেন। অরুণা সেন ও অন্যান্যদের পক্ষে এই মামলা পরিচালনা করেছিলেন ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ ও ব্যারিষ্টার জমিরুদ্দিন সরকার।

মুক্তি পাবার পর আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যায়-নির্যাতনের স্বরূপ প্রকাশের জন্য শ্রীমতি অরুণা সেনের সংবাদপত্রে একটি বিবৃতি দেন। তিনি বলেন,

“গত ১৭ই আশ্বিন রক্ষীবাহিনীর লোকেরা আমাদের গ্রামের ওপর হামলা করে। ঐদিন ছিল দূর্গাপূজার দ্বিতীয় দিন। খুব ভোরে আমাকে গ্রেফতার করে। গ্রামের অনেক যুবককে ধরে বেদম মারপিট করে। লক্ষণ নামের একটি কলেজের ছাত্র ও আমাকে ধরে তারা নড়িয়া রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমার স্বামী শান্তি সেন ও পুত্র চঞ্চল সেন কোথায়? বলে তারা রাষ্ট্রদ্রোহী, তাদের ধরিয়ে দিন। আরো জিজ্ঞাসাবাদের পর সন্ধ্যার দিকে তারা আমাকে ছেড়ে দেয়। লক্ষণকে সেদিন রেখে পরদিন ছেড়ে দেয়। সে যখন বাড়ি ফেরে, দেখি বেদম মারের ফলে সে গুরুতররূপে আহত ও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। চার/পাঁচ দিন পর আবার তারা আমাদের গ্রামের উপর হামলা চালায়। অনেক বাড়ি তল্লাশী করে। অনেককে মারধর করে। কৃষ্ণ ও ফজলু নামের দু’জন যুবককে তারা মারতে মারতে নিয়ে যায়। আজও তারা বাড়ি ফিরে আসেনি। তাদের আত্মীয়রা ক্যাম্পে গিয়ে তাদের খোঁজ করলে বলে দেওয়া হয় তারা সেখানে নেই। তাদেরকে খুন করে গুম করে ফেলা হয়েছে বলেই মনে হয়। এরপর মাঝে মাঝেই তারা গ্রামে এসে যুবক ছেলেদের খোঁজ করত।

গত ৩রা ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪ রাতে রক্ষীবাহিনী এসে সম্পূর্ণ গ্রামটিকে ঘিরে ফেলে। ভোরে আমাকে ধরে নদীর ধারে নিয়ে গেল। সেখানে দেখলাম, গ্রামের উপস্থিত প্রায় অধিকাংশ সক্ষম দেহী পুরুষ এমনকি বালকদের পর্যন্ত এনে হাজির করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের থানা সম্পাদক হোসেন খাঁ সবকিছুর তদারকি করছে। আমার সামনে রক্ষীবাহিনী উপস্থিত সকলকে বেদম মারপিট শুরু করে। শুনলাম এদের ধরতে গিয়ে বাড়ির মেয়ে-ছেলেদেরও তারা মারধর করে এবং অনেকক্ষেত্রে অশালীন আচরণ করেছে। এরপর আমাকে রক্ষীবাহিনীর কমান্ডার হুকুম করল পানিতে নেমে দাড়াতে। সেখানে নাকি আমাকে গুলি করা হবে। আমি নিজেই পানির দিকে নেমে গেলাম। ওরা রাইফেল উচিঁয়ে তাক করল গুলি করবে বলে। কিন্তু পরষ্পর কী সব বলাবলি করে রাইফেল নামিয়ে নিল। আমি কাঁদা-পানিতে দাঁড়িয়েই থাকলাম। কমান্ডার গ্রেফতার করা সবাইকে হিন্দু মুসলমান দুই কাতারে ভাগ করে দাড় করালো। মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিয়ে বলল, ‘মালাউনরা আমাদের দুশমন। তাদের ক্ষমা করা হবে না। তোমরা মুসলমানরা মালাউনদের সাথে থেকো না। তোমাদের এবারের মত মাফ করে দেয়া হল।’ এই বলে কলিমুদ্দিন ও মোস্তাফা নামের দু’জন মুসলমান যুবককে রেখে বাকি সবাইকে এক একটা বেতের বাড়ি দিয়ে বলল, ‘ছুটে পালাও’। তারা ছুটে পালিয়ে গেল। আমার পাক বাহিনীর কথা মনে পড়ল। তারাও বিক্ষুব্ধ জনতাকে বিভক্ত করতে এমনিভাবে সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় নিয়েছিল। পার্থক্য শুধু তারা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়ীকতার আশ্রয় নিত আর এই ধর্মনিরপেক্ষতার ধব্জাধারীরা ভন্ডামীর আশ্রয় নিচ্ছে। আমাকে ছেড়ে দিয়ে ওরা কলিমুদ্দিন ও মোস্তাফাসহ ২০জন হিন্দু যুবককে নিয়ে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পের দিকে রওনা হল। তিনজন ছাড়া এরা সবাই পেশায় জেলে। মাছ ধরে কোনরকমে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের আত্মীয়-স্বজনরা সব আকুল হয়ে কান্নাকাটি করতে থাকল। সে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য! সন্ধ্যার সময় কলিমুদ্দিন, মোস্তাফা, গোবিন্দনাগ ও হরিপদ ঘোষ ছাড়া বাকি সবাই গ্রামে ফিরে এল। আমি গেলাম তাদের দেখতে। দেখলাম তারা সবাই চলতে অক্ষম। সর্বাঙ্গ ফুলে গেছে তাদের। বেত ও বন্দুকের দাগ শরীর কেটে বসে গেছে। চোখ-মুখ ফোলা। হাতপায়ের গিরোতে রক্ত জমে আছে। তাদের কাছে শুনলাম, সারাদিন দফায় দফায় তাদের চাবুক মেরেছে। গলা ও পায়ের সঙ্গে দড়ি বেঁধে পানিতে বার বার ছুড়ে ফেলে ডুবিয়েছে। পিঠের নিচে ও বুকের উপর পা দিয়ে দু’দিক থেকে দু’জন লোক তাদের উপর উঠে দাড়িয়েছে। মই দিয়ে ডলেছে। এদের অনেককেই আত্মীয়রা বয়ে এনেছে। এদের অবস্থা দেখে মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। ভাবলাম, যারা দিনরাত্রি পরিশ্রম করেও একবেলা পেটপুরে খেতে পায়না, অনাহার, দুঃখ-দারিদ্রের জ্বালায় আজ অর্ধমৃত তাদের ‘মরার উপর খাড়ার ঘাঁ’র অবসান কবে হবে? যে শাসকরা মানুষের সামান্য প্রয়োজন ভাত-কাপড়ের ব্যবস্থা করতে পারছে না, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানী, শোষণ, নির্যাতন যারা বন্ধ করতে পারছে না, তারা কোন অধিকারে আজ নিঃস্ব মানুষের উপর চালাচ্ছে এই বর্বর নির্যাতন? অবশেষে চরম নির্যাতন আমার উপরও নেমে এল।

৬ই ফেব্রুয়ারীর রাতে ভোর না হতেই রক্ষীবাহিনী ঘুম থেকে আমাকে তুলল। আমাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে এলে দেখলাম রানীও রয়েছে। আমাদের নিয়ে তারা দুই মাইল দূরে ভেদরগঞ্জ রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পের দিকে রওনা হল। রাস্তায় তারা রানীর প্রতি নানারকমের অশ্লীল উক্তি করেছিল। ক্যাম্পে পৌঁছে দেখলাম সেখানে কলিমুদ্দিন, মোস্তাফা, গোবিন্দনাগ এবং হরিপদও রয়েছে। বুঝতে পারলাম তাদের উপর চরম দৈহিক নির্যাতন করা হয়েছে। বিশেষ করে কলিমুদ্দিন ও মোস্তাফাকেই বেশি অসুস্থ দেখলাম। কলিমুদ্দিন ও মোস্তাফা দুই ভাই। এদের সংসারে আর কোন সক্ষম ব্যক্তি নেই। অপরের জমিতে চাষ করে ওরা কোনরকমে জীবিকা নির্বাহ করে। এরা বিবাহিত ও ছোট ছোট ছেলেমেয়ের জনক। আমরা ক্যাম্পে আসতেই অনেক রক্ষীবাহিনী এসে আমাদের ঘিরে দাড়াল। কেউ অশ্লীল মন্তব্য করে, কেউ চুল ধরে টানে, কেউ চড় মারে, কেউ খোঁচা দেয়। এমন সব বর্বরতা। কিছুক্ষণ পর আমাদের রোদের মধ্যে বসিয়ে রেখে তারা চলে গেল। সন্ধ্যায় আমাকে উপরে দোতালায় নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই শুনলাম রানীর হৃদয়বিদারী চিৎকার। প্রায় আধঘন্টা পর আর্তনাদ স্তিমিত হয়ে থেমে গেল। নিঃস্তব্ধ রাতের অন্ধকার ভেদ করে ভেসে আসছিল বেতের সপাং সপাং শব্দ আর পাশবিক গর্জন। রানীকে যখন এনে তারা কামরার মধ্যে ফেলল, রাত্রি তখন কত জানিনা। রানীর অচৈতন্য দেহ তখন বেতের ঘায়ে ক্ষতবিক্ষত। রক্ত ঝড়ছে। জ্ঞান ফিরলে রানী পানি চাইলো, আমি তাকে পানি খাওয়ালাম। রানী আস্তে আস্তে কথা বলতে পারল। রাত্রি তখন ভোর হয়ে এসেছে। রানীর মুখে শুনলাম উপরে ভেদরগঞ্জ ও ডামুড্যার আওয়ামী লীগ সম্পাদকরা এবং ঐ দুই স্থানের ক্যাম্প কমান্ডাররা উপস্থিত ছিল। তারা শান্তি সেন ও চঞ্চলকে ধরিয়ে দিতে বলে এবং অস্ত্র কোথায় আছে জিজ্ঞাসা করে। রানী কিছুই জানে না বলায় তাকে এমন সব অশ্লীল কথা বলে যা কোন সভ্য মানুষের পক্ষে বলা তো দূরের কথা কল্পনা করাও সম্ভব নয়। কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ ও গালি বর্ষণের পর ভেদরগঞ্জ ক্যাম্প কমান্ডার বেত নিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এলোপাতাড়ি এমন পেটাতে থাকে যে তিনখানা বেত ভেঙ্গে যায়। আবার জিজ্ঞাসা করে, শান্তি ও চঞ্চল কোথায়? রানীর একই উত্তর। ক্ষীপ্ত হয়ে রানীকে তারা সিলিং এর সাথে ঝুলিয়ে দেয় এবং দু্‌ই কমান্ডার এবার একই সাথে চাবুক দিয়ে পেটাতে শুরু করে। মারার সময় অসহ্য যন্ত্রণায় রানী বলেছিল, ‘আমাকে এভাবে না মেরে গুলি করে মেরে ফেলুন।’ জবাবে একজন বলে, ‘সরকারের একটা গুলির দাম আছে। তোকে সাতদিন ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলব। এখন পর্যন্ত মারার দেখেছোটা কি?’ অল্পক্ষণ পরেই রানী অচেতন হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের চাবুক চালানো বন্ধ হয়নি। যখন জ্ঞান ফেরে রানী দেখে সে মেঝেতে পরে আছে। পানি চাইলে তারা তাকে পানি দেয় নাই।
৮ই ফেব্রুয়ারী প্রথমে আমাকে ও পরে রানীকে দোতালায় নেয়া হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ডামুড্যার আওয়ামী লীগ সেক্রেটারী ফজলু মিঞা ও ভেদরগঞ্জের সেক্রেটারী হোসেন খাঁ। তারা চেয়ারে বসে আছেন।

আমাকে বলল, তোমার স্বামী ও ছেলেকে ধরিয়ে দাও। অস্ত্র কোথায় আছে বলে দাও। তারা ডাকাত, অস্ত্র দিয়ে ডাকাতি করে। আমি বললাম, তারা ডাকাত নয়। তারা সৎ দেশপ্রেমিক, আমার স্বামী রাজনীতি করেন এ কথা কে না জানে। দেশের সাধারণ লোকের অতি প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় তিনি। রানীকে তারা একই প্রশ্ন করেন। রানী কিছুই জানে না বলায় তারা ক্ষীপ্ত হয়ে উঠে। ডামুড্যা ক্যাম্পের কমান্ডার করম আলী এবং ভেদরগঞ্জ ক্যাম্প কমান্ডার ফজলুর রহমান আমাদের অশ্লীল গালাগাল দিতে শুরু করে এবং আমাকে ও রানীকে একসঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়ে রানীর বস্ত্র খুলে নেয়। তারপর আমাদের দু’জনকে দু’দিক থেকে চাবুক মারতে থাকে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান হলে দেখি দু’জনেই মেঝেতে পরে আছি। রানীর সর্বাঙ্গ দিয়ে রক্ত ঝরছে। আমার গায়ে কাপড় থাকায় অপেক্ষাকৃত কম আহত হয়েছি। তবুও এই রুগ্ন বৃদ্ধ দেহে এই আঘাতই মর্মান্তিক। সর্বাঙ্গ ব্যাথায় জর্জরিত। তৃষ্ণায় বুক শুকিয়ে যাচ্ছে। নড়বার ক্ষমতা নেই। ওরা আমাদের দিকে তাকিয়ে নারকীয় হাসি হাসছে। এদের হুকুমে দু’জন সিপাই আমাকে টেনে তুলল। আমি অতিকষ্টে দাড়াতে পারলাম। রানী পারল না। দু’জন রক্ষী তার দুই বগলের নিচে হাত দিয়ে তাকে টেনে তুলল ও তার গায়ে কাপড় জড়িয়ে দিল। তারপর টানতে টানতে নিচে নামিয়ে নিয়ে এল। কমান্ডার পেছন থেকে নির্দেশ দেয় ওকে ভালো করে হাটা নয়তো মরে যাবে। সকালে কমান্ডার কয়জন রক্ষীসহ রানীকে নিয়ে গ্রামের দিকে রওনা হল। বলল, ‘বাচঁবিতো না, চল তোর মাকে দেখিয়ে আনি।’
রানীর সর্বাঙ্গ ফুলে কালো হয়ে গিয়েছে। পা ফেলবার ক্ষমতা নেই। সে অবস্থায় তাকে হেচঁড়াতে হেচঁড়াতে দু’মাইল পথ টেনে নিয়ে যাওয়া হল। রানীর মা রানীকে দেখেই অজ্ঞান হয়ে যান। কমান্ডার রানীকে তার মার মাথায় পানি দিতে বলে। রানীর মার জ্ঞান এলে রানীর চেহারা এমন কেন জিজ্ঞেস করায় কমান্ডার বলে পুকুর ঘাটে পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছে। রানীকে ছেড়ে দেবার অনুরোধ জানালে কমান্ডার বলে ‘খাসী খাওয়ালে ফিরিয়ে দিয়ে যাব।’ এরপর আবার দু’মাইল রাস্তা হেচঁড়াতে হেচঁড়াতে তাকে ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনা হল। ঐ দিন ছিল ৯ই ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪। হনুফাকেও তারা ধরে নিয়ে এল ঐদিন। করিম নামের আর একটি কৃষক যুবককেও ওরা ধরে এনেছে দেখলাম রামভদ্রপুর থেকে। তাকে এত মারা হয়েছে যে তার অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন। নড়িয়া থানার পন্ডিতসার থেকেও একজন স্কুল শিক্ষক ও দু’জন যুবককে এনেছে দেখলাম। বিপ্লব নামের একটি ছেলে নাকি মারের চোটে পথেই মারা যায়। রক্ষীবাহিনীর সিপাইরা বলাবলি করছিল। একজন জল্লাদ গর্জন করে বলছিল, ‘দেখ এখনও হাতে রক্ত লেগে আছে!’ শুনেছি মতি নামের আর একটি যুবককেও তারা পিটিয়ে মেরেছে। আর আমাদের ধরে আনার দু’দিন আগে কৃষি ব্যাংকের পিয়ন আলতাফকে পিটাবার পর হাত-পা বেধে দোতালার ছাদ থেকে ফেলে মেরে ফেলেছে। ৯ তারিখ দুপুরের অল্প পরে তারা হনুফা, রানী ও আমাকে নিয়ে গেল পুকুরের ধারে। সেখানে আমাদের একদফা বেত দিয়ে পিটিয়ে চুবানোর জন্য পানিতে নামাল। প্রথমে ওরা আমাদের সাতঁরাতে বাধ্য করল। আমরা ক্লান্ত হয়ে কিনারায় উঠতে চেষ্টা করি, ওরা আমাদের বাঁশ দিয়ে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়। পরিশ্রান্ত হয়ে যখন আমরা আর সাঁতরাতে পারছিলাম না তখন পানি থেকে তুলে আবার বেত মারতে থাকে। শেষের দিকে আমরা যখন আর সাতঁরাতে পারছিলাম না, তখন আমাদের পানিতে ডুবিয়ে দেহের উপর দু’পা দিয়ে দাড়িয়ে থাকত।

এভাবে আমাদের তিন দফা পেটানো ও চুবানো হয়। কিছুক্ষণ আগেই করিম মারের চোটে মরে গিয়েছে। আমাদের সঙ্গে আর একটি অল্প বয়সী যুবককে চুবিয়ে অচেতন করে ফেলেছিল। তাকে ঘাটলার উপর ফেলে রাখে। আমার আঁচল দিয়ে গা মোছানোর সময় হঠাৎ ছেলেটি চোখ খুলে তাকায়। আমি চোখের জল রাখতে পারলাম না। রক্ষীরা তাকে সরিয়ে নিয়ে যায়। পরে শুনেছি ছেলেটাকে নাকি মেরে ফেলেছে। সন্ধ্যার অল্প আগে আমাদের পানি থেকে তুলে ভিজা কাপড়েই থাকতে বাধ্য করল। দারুন শীতে আমরা কাঁপছি। প্রচন্ড জ্বর এসে গেছে সকলের। এমনি করেই রাতভর ছালার চটের উপর পরে থাকলাম। পরদিন রাতে রানীকে আবার নিয়ে গেল দোতালায়। সেখানে আবার তাকে ঝুলিয়ে বেত মারল। ১১ তারিখে আবার রানীর ওপর চলল একই অত্যাচার। রানী জ্ঞান হারাল। রক্ষী সিপাইদের বলাবলি করতে শুনলাম ‘রানী মরে গিয়েছে’। রানীর কাছে শুনলাম তার যখন জ্ঞান হল তখন সে দেখে তার পাশে ডাক্তার বসা। রানী জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কে,আমি কোথায়?’ ডাক্তার জবাব দেয়, ‘আমি ডাক্তার, তুমি কথা বলো না।’ কিছুক্ষণ পর ডাক্তার চলে গেলে রানীকে তারা ধরাধরি করে নিচে আমাদের কাছে নিয়ে এল।

একজন সিপাই রানী ও হনুফাকে বলল, ‘তোরাতো মরেই যাবি। তার আগে আমরা প্রতি রাতে পাঁচজন করে তোদের ভোগ করব। তারা অবশ্য ‘ভোগ’ শব্দটি বলে নাই, বলেছিল অতি অশ্লীল কথা। একদিন রাতে দু’জন রক্ষী সিপাই ঘরে ঢুকে আলো নিভিয়ে দেয় এবং রানী ও হনুফার মুখ চেপে ধরে। ধস্তাধস্তি করে তারা ছুটে গিয়ে চিৎকার করে। চিৎকার শুনে ক্যাম্পের অন্য রক্ষীরা ছুটে আসে। কমান্ডারও আসে। ওরা তাকে সব বললে সে বলে, ‘খবরদার এ কথা প্রকাশ করবি না। তাহলে মেরে ফেলব।’

রক্ষী সিপাইদের কারও কারও মাঝে মানবতাবোধের লক্ষণ পাচ্ছিলাম। তাদেরই একজন সিপাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছ?’ প্রশ্ন শুনে সে চমকে উঠল। বলল, ‘বাংলাদেশে লেখাপড়া দিয়ে কি করব? আমরা জল্লাদ, জল্লাদের আবার লেখাপড়ার দরকার কি?’ এই বলে সে দে ছুট্‌। মনে হয় যেন চাবুক খেয়ে একটি ছাগল ছুটে পালাল। রক্ষী সিপাইদের কানাঘুষায় শুনছিলাম, আমাকে আর হনুফাকে অন্যত্র কোথাও পাঠিয়ে দেবে আর রানী ও অন্যান্য পুরুষ বন্দীকে মেরে ফেলা হবে। ১২ই ফেব্রুয়ারী আমাকে ও হনুফাকে নিয়ে রক্ষীরা রওনা দিল। আমরা রানীকে ফেলে যেতে আপত্তি জানালাম। রানীও আমাদের সাথে যেতে খুব কান্নাকাটি করছিল। কমান্ডারের কাছে অনুনয়-বিনয় করছিল। কমান্ডার তার সহকর্মীদের সাথে কি যেন আলাপ করে সেদিন আমাদের পাঠানো স্থগিত রাখল। ১২তারিখ রাতেও ওরা আবার রানীকে ঝুলিয়ে হান্টার দিয়ে পেটায়। ১৩ তারিখে তারা রানীকে মারে না, কিন্তু নির্যাতনের নতুন কৌশল নেয়। দম বন্ধ করে রাখে। জোর করে চেপে ধরে রাখে নাক-মুখ-চোখ। এমনি করে জ্ঞান হারালে ওরা তাকে ছেড়ে দেয়।

১৯শে ফেব্রুয়ারী গভীর রাতে ওরা আমাদের তিনজনকে নিয়েই রওনা দিল প্রায় চার মাইল দূরে ডামুড্যা রক্ষীবাহিনী ক্যাম্পের দিকে। কলিমুদ্দিন, মোস্তাফা, গোবিন্দ ও হরিপদ থেকে গেল। রক্ষীরা বলাবলি করছিল তাদের মেরে ফেলা হবে। আমরা কিছুদূর এলে ক্যাম্পের দিক থেকে চারবার গুলির আওয়াজ পেলাম। ভাবলাম ওদের বুজি মেরে ফেলল। মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। আমাদের শরীরের অবস্থা এমন ছিল যে, হাটতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। তবু আমরা বাধ্য হচ্ছিলাম হাটতে। বোধ হয় আমাদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিচ্ছে। বোধ হয় বেঁচে যাব। এ চিন্তাই আমাদের হাটতে শক্তি যোগাচ্ছিল। অনেক রাতে ডামুড্যা রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে পৌঁছলাম। সেখানে কিছুক্ষণ রেখে স্পীডবোট করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল। সর্বক্ষণ আমাদের কম্বল চাপা দিয়ে মুর্দার মত ঢেকে রাখা হল। বেদনা জর্জরিত ক্ষত-বিক্ষত শরীর। তার উপর কম্বল চাপা থাকায় শ্বাসরুদ্ধ হবার উপক্রম। যেন জ্যান্ত কবর! সমস্ত দিন আমাদের ওভাবেই রাখল। খেতে দিল না। শেষরাতে আবার কম্বল চাপা দিয়ে জিপে করে ঢাকার দিকে রওনা দিল। আবার সেই সুদীর্ঘ পথ জ্যান্ত কবরের যন্ত্রণা।

ঢাকায় আমাদের প্রথমে রক্ষীবাহিনীর ডাইরেক্টরের কাছে নিয়ে গেল। সে আমাদের খুব ধমকাল। সেখান থেকে নিয়ে গেল তেজগাঁ থানায়, তারপর লালবাগ থানায়। রাতে সেখানে থাকলাম। পরদিন পাঠাল সেন্ট্রাল জেলে। সেখানে পাঁচদিন রাখার পর আমাদের নিয়ে এল তেজগাঁ গোয়েন্দা বিভাগের অফিসে। জেলে আমাদের তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদীদের মত রাখা হত। দিনরাত সেলে বন্দী। একই আহার্য দেয়া হত। সেখানে রাজনৈতিক অভিযোগে আরোও বন্দিনী আছেন। তার মধ্যে ১৭ই মার্চে গ্রেফতারকৃত জাসদ নেত্রী মোমতাজ বেগম আছেন। অস্ত্র আইনে সাজাপ্রাপ্ত পারভীন। আরও একজন আছেন নাম রুমা। সবাইকেই তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদী করে রাখা হয়েছে। সাধারণ কয়েদীদের মত খাটানো হচ্ছে। এর উপর জমাদারনীরা (মেয়ে সিপাই জমাদার) তাদের নিজেদের জামা-কাপড় সেলাই, কাথাঁ সেলাই, কাপড়-চোপড় ধোয়ানো সবকিছুই মেয়ে কয়েদীদের দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে। রাজনৈতিক বন্দীরাও রেহাই পাচ্ছেন না।”

এমনই হাজার হাজার করুণ কাহিনীর সৃষ্টি হয়েছে মুজিব শাসন আমলে । মুজিবের পরও আওয়ামী লীগ একই ধরনের অসংখ্য ঘটনার জন্ম দিয়েছে এবং এখনও তা অব্যাহত রেখেছে।

আওয়ামী লীগ ও রক্ষী বাহিনীর নির্যাতন : কেউ ভোলে কেউ ভোলে না

একাত্তরে বাঙালীদের ওপর পাকিস্তানীদের বর্বরতা ও নৃশংসতার কাহিনী শুনলে গা শিউরে ওঠে। কিন্তু লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বিশ্বের বুকে একটি স্বাধীন দেশের মর্যাদা লাভের পরও বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতন অব্যাহত থাকে। বাহাত্তর থেকে পচাত্তর এ কয়েক বছরে ২৫ হাজার বিরোধী বামপন্থী রাজনীতিক, পরাজিত বিহারী, রাজাকার ও শান্তি কমিটি, ইসলামপন্থী এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে মুক্তিযোদ্ধা ও হিন্দুদেরকেও পাকিস্তানীদের মতোই পাশবিক কায়দায় হত্যা করে রক্ষী বাহিনী ও আওয়ামী লীগ। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ডের খবর ব্যাপকভাবে জাতির সামনে আসেনি।

অফেন্ডিং শেখ মুজিব-১ : ২৫ মার্চ , ১৯৭১ , টাইম ম্যাগাজিনের অদ্ভুত তথ্য

২৫ শে মার্চের কালো রাত - স্বাধীনতার ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত গা হিম করা এক রাত। এই রাতের প্রতিমুহূর্ত জানার অদম্য কৌতূহল কাজ করে স্বাধীনতা প্রিয় এবং এখনও অন্তরে পাকিস্তান প্রিয় সবার ভেতরে।
অনেক আলোচনা , তথ্য উদঘাটন , ইরফরমেশন ডায়াগনসিস হয়েছে এই রাতের কুখ্যাত-বিখ্যাত ঘটনাগুলো নিয়ে। তার ভেতরে সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ছিলো সেই রাতে পাকিস্তান আর্মির হাতে শেখ মুজিবের আটক হওয়া নিয়ে।

সেটা কি আত্নসমর্পন না গ্রেফতার ছিলো ? ...সেটা কিভাবে ঘটেছিলো ? ..

এই নিয়ে খোদ সেই ঘটনার ভিলেন পাকিস্তানী আর্মির ব্রিঃ জেনাঃ জহিরুল আলম খান নিজেও বই লিখেছেন "দ্য ওয়ে ইট ওয়াজ"।

সবিস্তার সূচীপত্র
টেম্পলেট কাষ্টমাইজেশন - তরঙ্গ ইসলাম | তরঙ্গ ইসলাম