শহীদ হাসানুল বান্না

কর্মতৎপরতার স্বীকৃতি
সকালের এ্যাসেম্বলীর পর ছাত্ররা নিজ নিজ শ্রেণী কক্ষের দিকে যাওয়া শুরু করেছে। এ সময় হাসানুল বান্নাও প্রিন্সিপালের অফিসের পাশ দিয়ে যাচ্ছেন। প্রিন্সিপাল নিজের কক্ষের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অদ্ভূত ভঙ্গিতে হাসানুল বান্নার দিকে তাকিয়ে আছেন।

হাসানুল বান্নার দৃষ্টিও প্রিন্সিপাল আহমদ আবদুল হাদীর উপর পড়ে। হাসানুল বান্না প্রিন্সিপালের মনোভাব বুঝতে পেরে তার কাছে গিয়ে বলেন, আসসালামু আলাইকুম। শুভ সকাল প্রিন্সিপাল সাহেব। সালামের জবাব দিয়ে প্রিন্সিপাল সাহেব বলেন, ভালো আছেন তো? খবর ভালো তো? হাসানুল বান্না বলেন, জী না! মনের মধ্যে কিছু ভেজাল তো আছেই।

অধ্যায় ০২ : উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা চেতনা

একদিন হাসানুল বান্না স্কুলেই ছিলেন। সরকারী পত্রবাহক এসে জানালো যে, শহরের ম্যাজিস্ট্রেট সাবের বেগ তানতাওয়ী তাকে তার দফতরে ডেকে পাঠিয়েছেন। হাসানুল বান্না ম্যাজিস্ট্রেটের দফতরে পৌঁছে দেখতে পান তার সাথে পুলিশ কর্মকর্তাসহ অন্যান্য কর্মকর্তা বসে আছেন।

হাসানুল বান্নাকে বসানোর ব্যবস্থা করে বলেন, সম্মানিত শিক্ষক! আপনি অবগত আছেন যে, প্রধানমন্ত্রী সিদকী পাশা সিনাই উপত্যকা সফরে যাবার কর্মসূচী গ্রহণ করেছেন। এ সফরে তিনি ইসমাঈলিয়া হয়ে সিনাই যাবেন। এ কারণে তাকে অভ্যর্থনা দেয়ার জন্য এখানেও প্রস্তুতি চলছে। অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের জন্য আমরা আপনার সহযোগিতা নেয়া জরুরি মনে করছি।

হাসানুল বান্না বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, আমার সহযোগিতা....? এ অনুষ্ঠানের সাথে আমার কি সম্পর্ক আছে? ‘আমরা চাচ্ছি যে, প্রধানমন্ত্রীর অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে আপনি অভিনন্দনপত্র পাঠ করবেন। আমরা জানতে পেরেছি আপনি খুব ভালো বক্তব্য রাখেন। আর বাকি থাকে সম্পর্কের বিষয়। আপনিও সরকারী কর্মচারী, আমরাও সরকারী কর্মচারী। ‘অতি উত্তম! অতি উত্তম নির্বাচন!’ সরকারী কর্মচারী ও পুলিশ অফিসাররা একযোগে উচ্চ স্বরে বলতে শুরু করেন।


হাসানুল বান্না একান্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, এ সহযোগিতার ব্যাপারে আমাকে মাফ করা হোক। কয়েকজন এক সাথে বলে উঠেন, কিন্তু কেন? প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করার সুযোগ একটা বড় ধরনের প্রাপ্তি। যা পাওয়ার জন্য বহু বড় বড় মানুষ চেষ্টা তদবির চালাচ্ছেন। আপনি এ সম্মান ও সুযোগকে হাতে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন। এটাতো খুব ভালো কথা নয়।

হাসানুল বান্নার মুখমন্ডল ক্রোধে লাল হয়ে ওঠে। তিনি তাদেরকে বলে দেন, আমার জন্য শিক্ষক হওয়ার মর্যাদাই যথেষ্ট। আপনারা কি মনে করেন সরকারী কর্মচারীরা কাঠের পুতুল এবং তাদেরকে যেমন খুশি তেমন নাচানো সম্ভব। আমার নিজেরই বোঝা উচিত যে, আমার মূল্য আমার নিজের কাছে নাকি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে। চাকরির পদত্যাগপত্র সব সময় আমার পকেটে থাকে। আমি একটি বিষয়ে খুবই সতর্ক যে, আমার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে তার সর্বোচ্চ দাবী হচ্ছে, আমি শিক্ষাদান ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে আমার সার্বিক যোগ্যতা ও দক্ষতা দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাবো-এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। এই চুক্তিনামার কোথাও লেখা নেই যে, প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে প্রশংসামূলক কাসিদা পাঠ করবো। হাসানুল বান্নার এই দৃঢ়তা ব্যঞ্জক বক্তব্যের পর অন্য কাউকে বাছাই করা ছাড়া তাদের গত্যন্তর রইলো না।

দারুল ইখওয়ান কমপেস্নক্সের মসজিদের উপরের অংশে হেরা মকতব প্রতিষ্ঠা করা হয়। মক্তব্যের জন্য উচ্চ শিক্ষিত ও দক্ষ শিক্ষক নিযুক্ত করা হয়। তা সত্ত্বেও ছাত্রদের বেতন খুবই অল্প পরিমাণে নির্ধারণ করা হয়। আধুনিক শিক্ষানীতি ও পদ্ধতিকে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির ছাঁচে ঢেলে সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে ছাত্রদের পাঠদান শুরু করা হয়। কখনো কখনো পাঠদান অনুষ্ঠান শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য তাদেরকে ইসমাঈলিয়ার সুদৃশ্য, দৃষ্টিনন্দন ও ছন্দময় পার্কে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্ণমালা, সংখ্যা ও অঙ্ক শিখানোর জন্য মাটি, পাথর ও কাগজ কেটে অক্ষর ও সংখ্যা বানিয়ে তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। শিশুদেরকে তাদের মনের যে কোন প্রশ্ন, দুশ্চিন্তা ও জিজ্ঞাসার ব্যাপারে শিক্ষকদের কাছে নির্ভয়ে কথা বলার স্বাধীনতা দেয়া হয়।

হাসানুল বান্না নিজের স্কুলের ক্লাসের ফাঁকে সময় পেলে সোজা হেরা মকতবে চলে আসেন এবং শিক্ষক ও ছাত্রদেরকে নানা ধরনের শিক্ষামূলক পরামর্শ দেন। কখনো কখনো সন্ধ্যায় ছাত্রদের সাথে বাইরে ঘুরতে কিংবা বাগানে বেড়াতে যান এবং ছাত্রদের সঙ্গে নানা ধরনের খোশ গল্প করেন। খেলাধুলার ছলেও তাদেরকে নানা বিষয়ে পথ নির্দেশনা দান করে থাকেন। মকতবের শিক্ষকরা উপলব্ধি ও অনুভব করতেন যে, অন্য পেশার কর্মচারীদের মতো তারাও কর্মচারী নন বরং নবী রাসূলদের দেখানো পথের দায়িত্ব পালনেই তারা নিয়োজিত।

অনুভব করতেন তারা নিজেরাও বিশেষ এক দৃষ্টিভঙ্গির দায়ী এবং বর্তমান বংশধরদের অভিভাবক ও পথ প্রদর্শক। সমাজ এমন লোকদের প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভব করে যারা নিজের জীবন ও সম্পদ ব্যয় করে সমাজের সেবা করে, নিজের বিবেকের তাড়নায় কাজ করে, অন্যের তত্ত্বাবধানের ভয়ে নয়। অধিকাংশ শিক্ষকের মধ্যেই এ ধরনের অনুভূতি ও প্রেরণা কাজ করে। তবে দুই চারজন এমনও আছেন যাদের কাছে এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা দৃষ্টিভঙ্গি অরণ্যে রোদনতুল্য। এরা আত্মা দিয়ে চিন্তাভাবনা না করে পেট দিয়ে চিন্তাভাবনা করে।

ইসলামী মকতব হেরার নামকরণের প্রস্তাব করেন বিজ্ঞ আলেম মুজাহিদ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব শাইখ মোহাম্মদ সাঈদ আল আরাফী। তিনি সিরিয়ার দির আলজোর এলাকার একজন আলেম এবং দির আলজোর নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য। দেশে ফরাসী জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ। ফরাসীরা তার সমস্ত সহায় সম্পত্তি এমন কি ব্যক্তিগত পাঠাগার পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করেছে। শুধু তাই নয় তাকে দেশ ত্যাগেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সুতরাং এ অবস্থায় তিনি মিসর চলে এসেছেন এবং কায়রোর আল কেলায়া মহল্লায় খুব সাধারণ একটা ঘর ভাড়া করে সেখানে বসবাস করছেন।

যে কোনভাবে ইখওয়ানের লোকদের সাথে তার পরিচয় হয়ে গেছে। তিনি তাদের মধ্যে ঈমান ও বিশ্বাসের দৃঢ়তা, জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ও বিস্তৃতি, সাহস ও শৌর্যবীর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। ইসমাঈলিয়া এসে তিনি কয়েক দিন ইখওয়ান কর্মীদের সাথে অবস্থান করেন। তিনি জানতে পারলেন ইখওয়ান একটি নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়তে যাচ্ছে এবং আন্দোলনের দাওয়াত সেটাই যেটা কুরআনের দাওয়াত। কুরআন সর্বপ্রথম হেরা গুহায় অবতীর্ণ হয়। অতএব তিনি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ইসলামী হেরা মকতব প্রস্তাব করেন। সুতরাং শাইখের প্রস্তাব অনুসারে এই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়।

শাইখ আরাফী রাতে মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমাতেন এবং ফজরের আগেই উঠে গিয়ে ইখওয়ান কর্মীদের দরজার কড়া নাড়তেন। তাদেরকে ডেকে ডেকে বলতেন, জেগে উঠো, জেগে উঠো... এ জীবন শেষ হলে লম্বা ঘুমের সুযোগ পাবে। আল্লাহর দরবারে সেজদাবনত হয়ে তার কৃতজ্ঞতা আদায় করো। হাসানুল বান্নাকে অনেক সময়ই বলতেন, যে সব মানুষের অন্তরে আল্লাহ ভীতির অনুভূতি আছে অথচ তাদের ইবাদত বন্দেগীরও আনুগত্যের কিছুটা ত্রুটি বা ঘাটতি আছে, ছোট খাটো গুনাহের ব্যাপারে দুর্বল-তুমি এ জাতীয় লোকদেরকেও আন্দোলনে নিতে পারো।

সংগঠনের প্রতি আনুগত্যশীল, সম্মান ও ভালবাসাপূর্ণ এ জাতীয় দুর্বল লোকগুলো দ্রুত সংশোধন হয়ে যায়। দাওয়াতী সংগঠন একটা আরোগ্য নিকেতন, সেখানে ডাক্তার চিকিৎসা দানের জন্য এবং রোগী আরোগ্য লাভের জন্য আসে। তুমি চিকিৎসক, তাই কোন আধ্যাত্মিক রোগীর জন্য দরজা বন্ধ করবে না। বরং তাদেরকে যে কৌশল প্রয়োগ করে নিজের দিকে টেনে আনা যায় সেটাই প্রয়োগ করবে। অবশ্য দুই ধরনের এমন লোক আছে যাদেরকে কোন অবস্থাতেই আন্দোলন ও সংগঠনে প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না। এদের একটি গোষ্ঠী হচ্ছে নাস্তিক-যাদের কোন প্রকার বিশ্বাস বা দৃষ্টিভঙ্গি নাই, এরা যতই সৎ এবং সত্যবাদী হোক না কেন। এদের সংশোধন হওয়ার কোন আশা নেই। দ্বিতীয় হচ্ছে ঐ সব সাধক ও কৃচ্ছ্তা সাধনকারী যারা সংগঠনের প্রতি আনুগত্য ও সম্মান প্রদর্শন করতে প্রস্তুত নয় এবং আনুগত্যের অর্থ বুঝতেও অক্ষম। দ্বিতীয় ধরনের লোকেরা ব্যক্তিগতভাবে ভালো হতে পারে। কিন্তু এরা সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত হলে সংগঠনের ভিতরে বিভেদ বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের জন্ম দেয়। এই জাতীয় লোকদেরকে দলের অন্তর্ভুক্ত না করে যদি এদের কাছ থেকে উপকার নেয়া যায় তাহলে অবশ্যই নিবে। সাধারণ মানুষ যদি কোন লোককে দল থেকে বের হয়ে যেতে দেখে তাহলে তারা এটা বলবে না যে অমুক ব্যক্তি দল থেকে বের হয়ে গেছে বরং তারা বলবে যে, এই দলটিই ভুল পথে চলছে।

শাইখ আরাফী কখনো কখনো একথাও বলতেন, দৃঢ় ও শক্তিশালী ঈমানের ধারক ব্যক্তি নিজে দুর্বল ও হীনশক্তি হয়েও সফলকাম হয়ে যায়। যাদের ঈমান শক্ত ও মজবুত নয় তারা পূর্ণ শারীরিক ও আর্থিক শক্তি সত্ত্বেও পরাজিত হয়ে থাকে। তিনি আরো বলতেন, নিজের সঙ্গীসাথী ভাই বন্ধুদেরকে তাদের পূর্বপুরুষের পরিচিতি ও উপাধি উল্ল্যেখ করে ডাকবে। কোন সঙ্গীকে বলো যে, তোমার মধ্যে আবু বকর সিদ্দিকের (রাঃ) গুণাবলী আছে। আবার কাউকে বলো যে, তোমার সাথে ওমরের (রাঃ) গুণাবলীর সাদৃশ্য রয়েছে। এ ধরনের বক্তব্যে তাদের মধ্যে পূর্বসূরীদের আত্মমর্যাদাবোধ ও দৃঢ়তা সৃষ্টি হবে। এতে তারা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত ও আদর্শ চরিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তা অনুসরণে অনুপ্রাণিত হবে। হাসানুল বান্না বলতেন, এ ধরনের কথাবার্তা বললে মানুষ আমাদেরকে তাদের ক্ষুরধার জিহবার লক্ষ্যবস্তু বানাবে। শাইখ বলতেন, মানুষের কথায় তোমার কি আসে যায়। তুমি আল্লাহর সৈনিক হয়ে যাও এবং যে কাজে কল্যাণ আছে তা করে যেতে থাকো।

তিনি বলতেন, আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, প্রত্যেক বিষয়ে পার্থিব সাফল্যও আসে এবং ব্যর্থতাও আসে। যখন সাফল্য বা সৌভাগ্য আসে তখন প্রতিটি বস্তু পায়ের কাছে এসে উপস্থিত হয় এমনকি নিকৃষ্ট ডাকাতও যদি সামনে আসে তাহলে সেও তখন মাথা নত করে। আর যখন ব্যর্থতা ও পতন আসে তখন প্রত্যেক বস্তু মুখ ফিরিয়ে নেয়। এমনকি একান্ত অনুগত বাহনও অবাধ্য হয়ে পড়ে। আমি দু’বার মিসর এসেছি। প্রথমবার যখন এসেছি তখন আমার পরিচয় ছিল মোহাম্মদ সাঈদ আল আরাফী যিনি সিরিয়ার দির আলজোরের নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য। তোমাদের নগরীর সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে এমন স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যর্থনা জানিয়েছেন যাতে আমি মনে মনে লজ্জিত হয়ে ভেবেছি যে, আমার মধ্যে এমনতো কোন গুণাবলী নেই। দ্বিতীয় বার যখন আমি মিসর এসেছি তখনো আমি সেই মোহাম্মদ সাঈদ আল আরাফীই আছি। কিন্তু এখন ফরাসী ঔপনিবেশিক সরকারের পক্ষ থেকে সাঈদ আরাফীকে দেশ ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এখন আমি ধন সম্পদ জায়গা জমি বাড়িঘর সব কিছু থেকে বঞ্চিত ও রিক্তহস্ত। এ সময় আমি এমন একজন মানুষও পাইনি যিনি আমার অপেক্ষায় স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছেন। এ সময়ও আমি ভিন্ন এক ধরনের লজ্জায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি। যা হোক দ্বিতীয় বারই আমি সহমর্মিতা, সমবেদনা ও সহযোগিতার প্রত্যাশী ছিলাম। প্রথম বারের চেয়ে এ বারই বেশী স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যর্থনা আমার প্রাপ্য ছিল। কিন্তু আল্লাহতায়ালা ইখওয়ানুল মুসলেমুনের মাধ্যমেই আমার মনোবেদনা দূর করার ও সাহায্য করার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

অধ্যায় ০৩ : কাফেলার অগ্রযাত্রা শুরু

ইসমাঈলিয়া থেকে পনের কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আবু সুবায়ের স্টেশনে নেমে হাসানুল বান্না এলাকার বাজারে ঢুকে ঘোরাফেরা করতে থাকেন। তিনি বাজারে এমনভাবে পায়চারী করেন যেন কোন ব্যক্তির চেহারা আন্দাজ করার চেষ্টা করছেন। অবশেষে তিনি এক দোকানদারকে গ্রাহকদের সাথে আলাপ আলোচনা করতে ও দোকানদারী করতে দেখতে পেয়ে ধারণা করেন যে, এই দোকানদার প্রশান্ত হৃদয় ও সঠিক পথের যাত্রী এবং বাচনভঙ্গিতেও দক্ষ ও যোগ্য। দোকানদারের কাছে আরো কয়েকজন লোকও বসা আছেন। হাসানুল বান্না তাদেরকে সালাম জানিয়ে তাদের কাছে বসে যান। একজন অপরিচিত ব্যক্তিকে তাদের কাছে বসতে দেখে মুহূর্তের জন্য তারা হতচকিত হলেও পুনরায় নিজেদের আলাপ আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এরই মাঝে দোকানদারের ব্যস্ততা কিছুটা কমে আসে।

হাসানুল বান্না নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, এক ব্যবসাতো আপনি এ মুহূর্তে করে যাচ্ছেন। আরো একটা এমন ব্যবসা আছে যা করলে আমরা সবাই ভয়াবহ আজাব থেকে বাঁচতে পারি। আর এ ব্যবসা হলো, ঈমান আনার পর জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করা। হাসানুল বান্নাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই দোকানদার বলে বসেন, আপনি কি কোন কল্যাণ সংস্থার জন্য আর্থিক সহযোগিতা চাচ্ছেন?

না ভাই! আমার বক্তব্য এর চেয়েও অনেক উচ্চ স্তরের। আমি আপনার মাঝে কল্যাণের লক্ষণ দেখতে পেয়েছি, তাই আমি আপনাকে সে ব্যাপারে দাওয়াত দিচ্ছি যা আপনার জন্য অধিকতর কল্যাণ বয়ে আনবে। হাসানুল বান্নার এ ধরনের বক্তব্যে দোকানদার বিস্মিত হলেন। তিনি তার প্রতি অধিকতর আকৃষ্ট হয়ে বলেন, জী, বলুন! বলুন!।

‘হে আমার ভাই! ইসলামের নির্দেশাবলী কত পবিত্র ও ন্যায়নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আমাদের সমাজে অন্যায় অনাচার ও জুলুম ব্যাপকভাবে শেকড় গেড়ে বসেছে। ভিন দেশীরা আমাদের উপায় উপকরণ দখল করে নিয়েছে আর আমরা তাদের দয়া ও অনুগ্রহের ভিখারী। এটা কেন হয়? আমরা ইসলামের নির্দেশাবলীকে পশ্চাতে ফেলে রেখেছি বলেই আজ আমাদের এহেন পরিণতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। এ মুহূর্তে প্রয়োজন এমন এক বিপ্লবের যার মাধ্যমে সব কিছু সংশোধিত হয়ে যাবে। তা না হলে আমরা সবাই অপরাধী হিসেবে গণ্য হবো। কেন না, সৎ কাজের নির্দেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ এবং উপদেশ দান ও সঠিক পথ প্রদর্শন আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য।’

‘জী হ্যাঁ, আপনি সঠিক কথাই বলেছেন। আমরা তো সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু অন্যায় অনাচারের পৃষ্ঠপোষকরা সংখ্যায় অনেক বেশি।’ ‘খারাপ লোকের সংখ্যা ভালো লোকের চেয়ে বেশি নয়। তবে কথা হলো মন্দ লোকেরা নিজদের অপকর্মের সংরক্ষণ ও বিস্তারে ঐক্যবদ্ধ এবং তারা এক্ষেত্রে একে অপরের সহায়তাকারী। অপরদিকে ভাল লোকেরা নিজদের ভাল কাজে একা একাই নিমগ্ন। এ অবশ্য কর্তব্য পালন বিচ্ছিন্নভাবে সম্ভব নয়। বরং এমন জনমত সৃষ্টি করা জরুরি যা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ দানের পৃষ্ঠপোষকতা করতে সক্ষম। সৎ লোকদের একটি সংগঠন প্রত্যেক মহল্লায় সক্রিয় থাকবে, তারা শুধুমাত্র এই দাওয়াতের প্রতি ঈমান পোষণকারী ও পালনকারীই হবে না বরং তারা সংগঠিত হয়ে এ আহবানকে ছড়িয়ে দিবে। কেন না, আল্লাহ পাকের নির্দেশ হলো, তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল অবশ্যই থাকবে যারা কল্যাণের আহবানের সাথে সাথে অকল্যাণকে প্রতিহত করবে এবং কল্যাণের নির্দেশও দান করবে। একথা স্পষ্ট যে, অকল্যাণের হোতারা এ কাজ কখনোই পছন্দ করবে না। এ জন্য অকল্যাণকারী শক্তির মোকাবেলা সুসংগঠিত কল্যাণ কাজের মাধ্যমেই সম্ভব।’

দোকানদার খাওয়ার দাওয়াত দিলে হাসানুল বান্না অপরাগতা প্রকাশ করে বিদায়ের অনুমতি প্রার্থনা করেন। দোকানদার মসজিদে বক্তৃতা করার জন্য তাকে জোরাজুরি করতে থাকেন। কিন্তু হাসানুল বান্না কফি খানায় বক্তৃতা করাই পছন্দ করেন। দোকানদার গভীর মনযোগের সাথে হাসানুল বান্নার প্রস্তাব শ্রবণ করেন এবং অবশেষে তার প্রস্তাব মঞ্জুর করা হয়। কফিখানায় লোকজন সমবেত হয়। তারা গভীর মনযোগ দিয়ে তার বক্তৃতা শ্রবণ করেন। জনতা যা কিছু দেখেছেন এবং শুনেছেন তাতে তাদের বিস্ময় আরো বেড়ে গেছে। সবার মনেই প্রশ্ন জেগেছে, ইসলামের আহবানকারী সুদর্শন চেহারার এই যুবক শিক্ষক মসজিদের ইমামও নন কিম্বা কোন তরিকার শাইখও না। হাসানুল বান্না ভবিষ্যতে সেখানে যাবেন তারা তার কাছ থেকে এ প্রতিশ্রুতিও আদায় করে নেন।

হাসানুল বান্না মাঝে মাঝেই আবু সুবায়ের আগমন করতে থাকেন। অবশেষে স্থানীয় লোকদের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল্লাহ বাদাওয়ীকে স্থানীয় ইখওয়ানের মুর্শেদ নিযুক্ত করা হয়। তিনি একজন জ্ঞানী মিশুক ও একজন খোদাভীরু মানুষ। সুতরাং তিনি একা একটি পরিত্যক্ত মসজিদ মেরামত করে সেখানে ইখওয়ানের প্রশিক্ষণ কাজের সূচনা করেন। সুতরাং আবু সুবায়েরের লোকজন ইখওয়ানের দাওয়াতের মাধ্যমে নতুন নতুন বিষয় অবহিত হতে থাকেন। এখানকার সাংগঠনিক খরচ পাতি বা ব্যয় নির্বাহের ভার ইসমাঈলিয়ার ইখওয়ানই বহন করতে থাকে। দাওয়াত ও আন্দোলনের ক্ষক্ষত্রে খোদায়ী বিধান হলো, দাওয়াত দানকারী ব্যক্তিবর্গ মানুষের কাছ থেকে কোন প্রকার প্রতিদান কিংবা বিনিময় প্রার্থনা করবে না। যদি কেউ বিনিময় প্রার্থনা করে তা হলে জনগণ কৃপণতা প্রকাশ করবে। দাওয়াতের প্রতি তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে। যখন জনগণের অন্তরে ইমান পরিপক্ব ও সঠিকভাবে গেঁথে যায় তখন তারা স্বেচ্ছায় শুধু সম্পদই ব্যয় করে না বরং নিজদের মূল্যবান জীবন বিলিয়ে দিতেও পিছপা হয় না।

* * * *

ইসমাঈলিয়ায় আহমদ আফেন্দি নামে এক যুবক ছিলেন। তার বয়স ছিল সতেরো/আঠারো বছর। এখানে তার কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি নিজের শহর পোর্ট সাঈদ চলে যান। তিনি সাথে করে নিয়ে যান এ সত্য আহবানের আলোক বর্তিকা। একটি রোগবালাইহীন সতেজ বীজ যেখানেই বপন করা হোক সেখানেই অঙ্কুরোদগম হবে। ঠিক এই পুতঃপবিত্র দাওয়াতের উদাহরণও ঐ বীজের মতই। পোর্ট সাঈদে দাওয়াতের বিস্তার ঘটানোর জন্য আহমদ আফেন্দি অক্লান্ত পরিশ্রম করতে থাকেন। এর ফলে সৎ চরিত্র বন্ধু বান্ধব ও স্থানীয় পুণ্যাত্মা যুব গোষ্ঠী খুব দ্রুত তার চারদিকে সমবেত হতে থাকেন। পোর্ট সাঈদের আলমিনা সড়কে খুবই সাধারণ একটা জায়গা ভাড়া করে তারা সেখানে ইখওয়ানের একটা দফতর স্থাপন করেন। সংগঠনের লোকদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ অফিস খরচ চালানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। অতএব ইসমাঈলিয়ার সংগঠনই এখানকার ব্যয়ভারের একটা অংশ মিটানোর দায়িত্ব নিজদের কাঁধে তুলে নেয়।


পোর্ট সাঈদের সাংগঠনিক মজবুতি অর্জনের পর সেখানকার কর্মীরা দাওয়াতের কাজ সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তারা ১৩৪৭ হিজরীর মহররম মাসে একটি গণজমায়েতের ঘোষণা দেন। এটা ছিল ইখওয়ানের বড় আকারের প্রথম জনসভা। এতে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। এ জনসভার প্রধান বক্তা ছিলেন হাসানুল বান্না। কিন্তু তিনি ঐ দিন আকস্মিক গলা ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন। স্কুলের পরিচালক ডাক্তার মাহমুদ বেগ বলেন, হাসানুল বান্না যদি দিনে ভ্রমণ ও রাতে বক্তৃতাদান অব্যাহত রাখেন তাহলে তিনি নিজের প্রতি অবিচার করবেন। এ সত্ত্বেও হাসানুল বান্না ভ্রমণের বিষয়ে দৃঢ় সংকল্প হয়ে বসেন। অবশ্য দুর্বলতার কারণে তিনি শুয়ে ভ্রমণ করেন। পোর্ট সাঈদ পৌঁছে ক্লান্তির কারণে তিনি বসে বসে নামায আদায় করেন।

নামায শেষ করার পর তিনি অদ্ভূত এক মানসিক অবস্থায় পড়ে যান। তিনি ভাবেন, পোর্ট সাঈদের ইখওয়ান কর্মীরা এই সমাবেশের ব্যাপারে কতটা উৎফুল্ল, লোকজনকে সমবেত করতে তারা জীবনপাত করে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস প্রধান অতিথিই বক্তব্য দানে অপরাগ? এ সব বিষয় নিয়ে ভাবতে গিয়ে হাসানুল বান্না আকস্মিক কেঁদে ফেলেন এবং গভীর এক অচেতনতায় আচ্ছন্ন হয়ে এশার নামাযের পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহ পাকের দরবারে সুস্থতা ও শক্তির জন্য ক্রন্দনরত অবস্থায় কাটিয়ে দেন। এ সময়ে তিনি নিজের মধ্যে কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেন। তিনি দাঁড়িয়ে এশার নামায আদায় করেন। তিনি যখন বক্তৃতা দেয়া শুরু করেন তখন তিনি নিজেও শুনতে পাচ্ছিলেন না যে, তিনি কি বলছেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তার মধ্যে শক্তি সঞ্চারিত হতে থাকে। মনে হয় যেন তিনি পূর্ণ আরোগ্য লাভে সক্ষম হয়েছেন। তার আওয়াজ সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও গাম্ভীর্যপূর্ণ হয়ে উঠে। সামিয়ানার নীচে বসা লোকেরা যেমন শুনতে পাচ্ছেন তেমনি বাইরের লোকেরাও শুনতে পাচ্ছেন। এভাবে আল্লাহ পাকের সাহায্য ও মেহেরবানীতে সমাবেশের কাজ সুষ্ঠুভাবে সমাপ্ত হয়।

অধ্যায় ০৪ : যে আলো ছড়িয়ে গেলো সবখানে

পোর্ট সাঈদের জনসমাবেশে আলজামালিয়ার একটি প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণ করে। সমাবেশের পর তারা থেকে যান এবং আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা করেন। তারা নিজ এলাকায় আন্দোলনের প্রচার প্রসারের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ফিরে যান। উস্তাদ মোস্তফা আততহুরের নেতৃত্বে সেখানে ইখওয়ানের অফিস খোলা হয়।

এক সময় আল মনজিলা নামক স্থানে সমাবেশের আয়োজন করে হাসানুল বান্নাকে বক্তৃতা করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। লোকালয়ের বাইরেই তাকে স্বাগত জানানো হয়। যখন তারা হাসানুল বান্নার সাথে সাক্ষাৎ করেন তখন তাদের ঠোঁটে একটা অর্থপূর্ণ মুচকি হাসি লেগেছিল। অবশেষে হাসানুল বান্না উস্তাদ মোস্তফা আত তহুরকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করেন, এ লোকগুলো মুচকি মুচকি হাসছিলো কেন? শাইখ মোস্তফা বলেন, তাদের হাসির মূল কারণ এটাই যে, তারা আপনাকে যে রকম কল্পনা করেছিলো, আপনি তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

তাদের ধারণা ছিল হাসানুল বান্না নামের ব্যক্তি একজন বয়স্ক বিশাল দেহের অধিকারী নূরানী চেহারার আলেম হবেন। কিন্তু তারা দেখতে পায় যে, এই ব্যক্তি তো একজন যুবক মাত্র- যার বয়স বড় জোর পঁচিশ বছর হবে। এখন আপনার দায়িত্ব হলো এসব লোকের বিশ্বাস ও আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে আপনাকে পুরোপুরি চেষ্টা চালাতে হবে।

জবাবে হাসানুল বান্না বলেন, হে আমার প্রিয় ভাই! সামর্থ্য ও সাফল্য আল্লাহতায়ালার হাতে। তিনি যদি কল্যাণের সিদ্ধান্ত দেন তাহলে সবকিছুই সফলভাবে সাধিত হয়। শরীরের দু’টি অংশের নাম হলো মানুষ। এর একটি হলো জিহবা আর অপরটি হলো অন্তর। আমরা জিহবার করণীয় পালন করতে পারি। আর মানুষের অন্তর রহমানুর রাহিমের আঙ্গুলের মাঝখানে। তিনি চাইলে তাদের অন্তরকে যেকোন দিকে ফিরিয়ে দিতে পারেন। যতদূর চোখ যায়, সমাবেশে শুধু মানুষ আর মানুষ। সমাবেশ শেষে মানুষ হাসানুল বান্নার কাছে এসে তাদের আবেগ প্রকাশ করতে থাকে। কিন্তু বক্তৃতা শুরু হবার আগে তো তারা বিশাল দেহী শাইখকে দেখার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছিলেন। এখন তারা একজন সত্যিকার শাইখকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। এ সমাবেশের পর ঐ এলাকার সব জনপদেই ইখওয়ানের শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়।

লোহিত সাগর এলাকার সকল জনপদ সুয়েজ কেন্দ্রের অধীনস্থ ছিল। হাসানুল বান্না কয়েকবার ঐ এলাকা ভ্রমণ করেন। অবশেষে শাইখ আফিফি আশ শাফীর নেতৃত্বে এ এলাকায় সংগঠন অস্তিত্ব লাভ করে। একবার হাসানুল বান্না সুয়েজ এলাকায় গিয়ে আন্দোলনের এক সাথীর বাড়িতে ওঠেন। সেখানে টেবিলে রাখা একটি বই খোলা মাত্রই একটি হাদিসের উপর তার দৃষ্টি পড়ে। হাদিসটি হলো, রাসূল (সা.) মেহেদী খুব পছন্দ করতেন। রাসূলের (সা.) অনুসরণে হাসানুল বান্নার অন্তরেও মেহেদীর ডালের আকাঙ্ক্ষা জাগে। কিন্তু এখানে সেটা কিভাবে পাওয়া সম্ভব! তিনি তো নিজের শহর ও বাড়ি থেকে অনেক দূরে।


কিছুক্ষণ পর বক্তৃতা করার জন্য তিনি ইখওয়ান অফিসে চলে যান। বক্তৃতা করার সময় তার পিঠ জানালার দিকে ছিলো। জানালার কাছে ও এর আশপাশে ছেলেপেলে ভিড় জমায়। আকস্মিক একটি ছেলে মেহেদীর একটি মোটা ডাল শাইখ আফিফির হাতে ধরিয়ে দিয়ে হাসানুল বান্নার দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বোঝাতে চায় যে, ঐ ডালটি যেন বক্তৃতা দানকারী শাইখকে দেয়া হয়। শাইখ এসে ঐ ডালটি হাসানুল বান্নার সামনে রেখে বলেন, শহরের বাচ্চাদের পক্ষ থেকে এটা আপনার জন্য উপহার। হাসানুল বান্না মুচকি হেসে ঐ ডালটি হাতে নিয়ে বলেন, এটা বাচ্চাদের উপহার নয় বরং রাসূলের (সা.) প্রতি ভালবাসা ও তাকে স্মরণ করার এক সুগন্ধী বাতাস। এই পবিত্র আকস্মিকতায় তিনি পুরো দিন আনন্দে ডুবে থাকেন।

মিসরের রাজধানী কায়রোর আল ফালাকী সড়কে অবস্থিত কমার্শিয়াল স্কুলে জমিয়তে তাহজিবে ইসলাম নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই সংগঠনের প্রাণপুরুষ ছিলেন হাসানুল বান্না থেকে ২ বছরের ছোট তারই সহোদর আবদুর রহমান আল বান্না। তার সাথে যুক্ত ছিলেন আরো অনেক ছাত্র। ছুটির পর স্কুলের মসজিদ তাদের জমায়েত ও কর্ম তৎপরতার কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাদেরকে বেশ কয়েকবার সহপাঠী ছাত্রদের কাছ থেকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ ও স্কুলের কর্মচারীদের পক্ষ থেকে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। তবুও এসব যুবক খুবই ভদ্রতা ও ধৈর্যের সাথে ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রচার চালিয়ে যেতে থাকেন। লেখাপড়া শেষ করে আবদুর রহমান আল বান্না ও তার বন্ধু মাহমুদ সা’দী রেলওয়ের প্রকৌশল শাখায় এক সাথে চাকরি লাভ করেন। তারা সেখানেও ইসলামের মহান শিক্ষা তুলে ধরার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। সেখানে তারা দরস ও আলোচনার অনুষ্ঠান চালু করেন। ধীরে ধীরে বহু জ্ঞানীগুণী লোক তাদের এই সংগঠনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন।

এরই মধ্যে জমিয়তে তাহজীবে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ ইসমাঈলিয়ার ইখওয়ানুল মুসলেমুনের কর্মতৎপরতা, চেষ্টা সাধনার বিষয়ে খোঁজ খবর করার চেষ্টা করেন এবং এ শহরের এলাকায় এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইখওয়ানের শাখাসমূহের সন্ধান লাভ করেন। অতএব, তারা উপলব্ধি করেন যে, অনৈক্যের চেয়ে ঐক্যই উত্তম। সুতরাং তারা ইসমাঈলিয়ার ইখওয়ান কেন্দ্রের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জমিয়তে তাহজীবে ইসলামীকে ইখওয়ানুল মুসলেমুনের সাথে একীভূত করে ফেলেন। এরপর ইখওয়ান কায়রোর সুক আসসালাহ সড়ক এলাকায় একটি নতুন অফিস ভাড়া নেয়। ইখওয়ান কর্মীরা নিজেরা এই অফিসের সংস্কার, মেরামত, সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য বর্ধন করে রাজধানীর জন্য মানানসই একটি দফতরে রূপান্তরিত করেন। কায়রোতে ইখওয়ানের অর্থনৈতিক অবস্থা অফিসের ব্যয়ভার নির্বাহ করার মতো ছিলো না। যতদিন পর্যন্ত এই ব্যয়ভার বহন করার মতো যথেষ্ট সংখ্যক ব্যক্তিবর্গ ইখওয়ানে শামিল না হয়ে ততদিন পর্যন্ত ইসমাঈলিয়ার সংগঠন এ দায়িত্ব বহন করে যেতে থাকে। কেননা ইখওয়ানের সুস্পষ্ট নীতিমালা এই ছিল যে, তারা কারো কাছে আর্থিক সাহায্য চাইবেন না। তারা প্রতীক্ষা করতেন মানুষ যেন ইখওয়ানকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে এবং পরবর্তিতে আপনা-আপনি তাদের মধ্যে আর্থিক ত্যাগের অনুভূতি জাগ্রত হয়।

ইখওয়ান মানুষের অন্তর জয়ের আকাঙ্ক্ষী ছিলো পকেট জয়ের নয়। এ ব্যাপারে তারা কতটুকু আত্মনির্ভরশীল ছিলেন তার একটি উদাহরণ এখানে তুলে ধরা হলো। সবেমাত্র কায়রোতে আন্দোলনের চারা রোপণ করা হয়েছে। ইখওয়ানের আর্থিক সহযোগিতার তীব্র প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে। এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে বিপুল অংকের আর্থিক অনুদানের প্রস্তাব দেয়া হলো। বলা হলো, এর বিনিময়ে ইখওয়ান সরকারের গৃহীত নীতিমালা ও কর্মকান্ডের পক্ষে প্রচার প্রচারণা চালাবে। আবদুর রহমান আল বান্না যিনি একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারী ছিলেন- তিনি এর জবাবে জানিয়ে দিলেন যে, যে সাহায্য বা অনুদানের লক্ষ্য ইসলামী দাওয়াতকে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসান ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে নিয়োজিত করা, আমাদের হাত কেটে ফেলা হলেও তা এমন কোন সম্পদের দিকে সম্প্রসারিত হবে না, যে সম্পদের ওপর আমাদের কোন অধিকার নেই। আমরা যদি বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর সন্তুষ্ট থাকতাম তাহলে নিজদের সেবার বিনিময় গ্রহণ করা ছাড়াই এর স্বার্থে নিজদের জীবন ও সম্পদ বিলিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়াকে অবশ্য কর্তব্য মনে করতাম। আর এভাবেই আল্লাহ তায়ালা প্রথম দফায়ই ইসলামী দাওয়াতকে প্রলোভনের কালিমুক্ত রাখার ব্যবস্থা করেছেন। এই প্রলোভনের কালিমা কোন আন্দোলনের সাথে যুক্ত হলে তা অতি সহজেই ধ্বংস হয়ে যায়।

অধ্যায় ০৫ : প্রচণ্ড প্রতিকূলতা

সুয়েজ কোম্পানির একজন কর্মকর্তা মসজিদ সংলগ্ন কামরায় বসা শাইখ ফরুগলীকে বলেন, ডাইরেক্টর সাহেব আমাকে জানিয়েছেন যে, কোম্পানির আপনার সেবার আর প্রয়োজন নেই। কোম্পানি ভাবছে অন্য কাউকে আপনার স্থলাভিষিক্ত করতে। ডাইরেক্টর সাহেবের নির্দেশ মোতাবেক আজকের দিন পর্যন্ত আপনার পাওনা-দাওনার হিসাব তৈরি আছে।

শাইখ অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে তাকে বলেন, মসিঁয়ে ফ্রাসোয়া! আমার জানা ছিল না যে, আমি হাবাসাতুল বালাহ এলাকায় সুয়েজ কোম্পানির বেতনভুক্ত কর্মচারী। আমি তো জানি যে, ইসমাঈলিয়ার ইখওয়ানের পক্ষ থেকে এখানে প্রতিনিধিত্ব করছি। আমি তাদের কাছ থেকে অর্থগ্রহণ করি যারা আপনার মাধ্যমে তা পাঠিয়ে থাকে। আমার চুক্তি আপনার সাথে নয় ইখওয়ানের সাথে। আমি আপনার কাছ থেকে কোন বেতন কিংবা হিসাব নিতে প্রস্তুত নই। আমি মসজিদে যে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি তা অব্যাহত থাকবে। ইখওয়ান নেতৃবৃন্দ যারা আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন তারা আমাকে এ জায়গা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এখান থেকে এক কদমও নড়ছি না। ইসমাঈলিয়া খুব দূরে নয়, সেখানে গিয়ে যা কিছু করার তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে ঠিক করুন। শাইখ ফরুগলীর এ জবাব শুনে অফিসার ফিরে যান। শাইখের এ জবাব শুনে কোম্পানির লোকেরা বেকায়দায় পড়ে যায়। হাবাসাতুল বালাহ এলাকায় কিছুসংখ্যক শ্রমিক এবং শ্রমজীবী ব্যক্তির সাথে ইসমাঈলিয়ার ইখওয়ানের মেলামেশার সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে এ সুযোগে তারা শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে ইখওয়ানের দাওয়াতী কাজ শুরু করেন। সেখানে ৩ শতাধিক মুসলমান শ্রমিক থাকায় কিছুদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পরই তারা সুয়েজ কোম্পানির কাছে ঐ এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণের দাবি জানায়। কোম্পানি দাবি মেনে নিয়ে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করে এবং ইসমাঈলিয়ার ইখওয়ানের কাছে ইমামতি ও দরসের জন্য একজন দ্বীনী আলেম পাঠানোর অনুরোধ জানায়। হেরা মকতবের শিক্ষক শাইখ ফরুগলীকে ইখওয়ানের পক্ষ থেকে নির্বাচন করা হয়।

সেখানকার সৎ শ্রমিক শ্রেণী শাইখের উন্নত ও উচ্চ নৈতিকতায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শ্রমিকদের মনমগজ ও চিন্তা-চেতনায় সামাজিকতায় প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। তারা নিজেদের মূল্য মর্যাদা বুঝতে সক্ষম হয়। জীবনের উন্নততর লক্ষ্যের সাথে পরিচিতির মাধ্যমেই তাদের অন্তর থেকে ভয়ভীতি ও হীনম্মন্যতার অনুভূতি বিদূরিত করা সম্ভব। ঈমানের সম্পদে বলীয়ান হওয়ার উপলব্ধি তাদের মধ্যে গৌরব ও গর্বের অনুভূতি সৃষ্টি করে। একদিকে তারা কর্তব্যের প্রতি যত্নবান হয়ে উঠে অপরদিকে লোভ-লালসা ও চিন্তা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখার শিক্ষা লাভ করে। আদব কায়দা রক্ষা করে একজন শ্রমিক অফিসারের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শিক্ষা তারা অর্জন করেছে। তারা আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন কিন্তু দৃঢ় ও ধীরস্থির। তাদের পূর্বের অবস্থার সম্পূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

তারা যেমন নিজেদের মানমর্যাদা সম্পর্কে সচেতন তেমনি অফিসারদের মানসম্মানের ব্যাপারেও সজাগ। পারস্পরিক ভালবাসা, পরিশ্রম ও ঈমানদারী এসব শ্রমিকের ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের ভিত্তি তৈরি করেছে।

কোম্পানির বিদেশি অফিসার যারা শ্রমিকদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা নিজেদের অধিকার বলে মনে করতো, তাদের কাছে এই নীরব রাজনীতি মোটেই পছন্দ হয়নি। তারা বুঝতে পারে যে, অবস্থা যদি এভাবেই চলতে থাকে তাহলে ক্ষমতার লাগাম একদিন ঐ শাইখ ফরুগলীর হাতে চলে যাবে। এরপর আর কোন শক্তিই শাইখ ফরুগলী ও শ্রমিকদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। সুতরাং কোম্পানির অফিসাররা এ ধারণার বশবর্তী হয়ে ভাবতে থাকে যে, যে কোন উপায়ে এই সাহসী শাইখকে মসজিদের ইমামতি থেকে সরিয়ে দিতে হবে। তাই সংশ্লিষ্ট অফিসার মসিঁয়ে ফ্রাসোয়াকে শাইখের কাছে পাঠানো হয়েছিল।

শাইখ ফরুগলী ইসমাঈলিয়া পৌঁছে তার ও ফ্রাসোয়ার মধ্যে হয়ে যাওয়া আলোচনার বিষয়ে হাসানুল বান্নাকে অবহিত করেন। হাসানুল বান্না তাকে বলেন যে, তিনি যেন নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন। কেননা তিনি সঠিক অবস্থানে রয়েছেন এবং তিনি কোম্পানির পক্ষ থেকে কোন কাগজপত্র গ্রহণ করেননি। কোম্পানি কিছুদিন অপেক্ষা করে যাচাই করতে চাইলো যে, শাইখ ফরুগলী তাদের কাছে বেতনভাতা দাবি করেন কিনা। অবশেষে তারা তাদের কেন্দ্রের শরণাপন্ন হয়। কোম্পানির ডাইরেক্টর মসিয়ে মেনু সুয়েজ এলাকার প্রশাসকের সাথে যোগাযোগ করেন। সুয়েজের প্রশাসক ইসমাঈলিয়ার পুলিশ ইন্সপেক্টরকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য দ্রুত একদল পুলিশ নিয়ে হাবাসাতুল বালাহ পৌঁছার নির্দেশ দেন। পুলিশ ইন্সপেক্টর একদল পুলিশ নিয়ে কোম্পানির ডাইরেক্টরের অফিসে পৌঁছান এবং শাইখকে ডেকে আনার জন্য একজন কর্মচারীকে পাঠানো হয়।

শাইখ কর্মচারীকে জানিয়ে দেন, পুলিশ ইন্সপেক্টর বা ডাইরেক্টরের সাথে আমার কোন সম্পর্ক বা সংশ্লিষ্টতা নেই। আমার সম্পর্ক বা সংশ্লিষ্টতা হচ্ছে মসজিদের সাথে। তাদের দুইজনের মধ্যে যদি কারো কোনো প্রয়োজন পড়ে তাহলে তারা আমার কাছে আসতে পারেন। এরপর ইন্সপেক্টর নিজেই শাইখের কাছে উপস্থিত হয়ে ডাইরেক্টরের ইচ্ছাকে মেনে নেয়ার জন্য তাকে অব্যাহত চাপ দিতে থাকেন এবং বলে বসেন, আপনি ইমামতি ছেড়ে ইসমাঈলিয়া চলে যান। শাইখ নিজের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বলেন, আপনি ইসমাঈলিয়া বরখাস্ত সংক্রান্ত লিখিত দুই লাইন এনে দিন আমি এখনি চলে যাবো। আপনি যদি শক্তি প্রয়োগ করতে চান তাহলে করে দেখতে পারেন। আমি এখান থেকে কক্ষনোই বাইরে বের হবো না। শুধু আমার লাশই বের হবে।

এরই মধ্যে এ খবর শ্রমিকদের কাছে পৌঁছে। তারা তাৎক্ষণিক কাজ বন্ধ করে মিছিল সহকারে স্লোগান দিতে দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়।

পুলিশ ইন্সপেক্টর এই বিরোধের পরিণতি সম্পর্কে ভীত হয়ে যেখানকার অবস্থা সেখানে রেখেই ইসমাঈলিয়া চলে গিয়ে এ সমস্যার সমাধানে কোন উপায় বের করা যায় কিনা তার জন্য হাসানুল বান্নার সাথে সাক্ষাৎ করেন। হাসানুল বান্না ব্যক্তিগত অপরাগতার কথা তাকে জানিয়ে দেন যে, এ ব্যাপারে কার্যনির্বাহী পরিষদের চিন্তা-ভাবনা, পরামর্শ ও পর্যালোচনার পরই কোন কিছু বলা যেতে পারে।

হাসানুল বান্না কায়রোতে কোম্পানির ডাইরেক্টর জেনারেলের সাথে নিজে সাক্ষাৎ করে জিজ্ঞেস করেন, আপনার শাইখ ফরুগলীর পিছনে কেন আদাপানি খেয়ে লেগেছেন। তার কাছে এর কোন জবাব ছিল না। প্রকৃতপক্ষে তাদের এখন লোক দরকার যিনি তাদের বশ্যতা স্বীকার করে নিবেন এবং তাদের দাবির সামনে মাথানত করবেন। অনেক মুসলমান নেতা আমার বন্ধু। আমি আলজেরিয়ায়ও ২০ বছর ছিলাম। আমি তাদের মধ্যে শাইখের মত কোন লোককে পাইনি। তিনি আর্মির জেনারেলের মত আমাদের ওপর তার নির্দেশ কার্যকর করতে চান।

হাসানুল বান্না তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, এসব কোম্পানি শ্রমিকদের ওপর বরাবর নির্যাতন চালিয়ে আসছে এবং তাদের অধিকার পদদলিত করার চেষ্টা করছে। তাদেরকে এরা মানুষই মনে করে না, এমনকি এদের পূর্ণ মজুরি পর্যন্ত দেয় না। অপরদিকে এসব কোম্পানির লভ্যাংশ ফুলে ফেঁপে স্ফীত হয়ে উঠছে। এ বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসানকল্পে কোম্পানির পরিবর্তন নীতিমালায় পরিবর্তন সাধন অত্যন্ত জরুরি। অবশেষে ডাইরেক্টর ও হাসানুল বান্না এই মর্মে মতৈক্যে পৌঁছান যে, শাইখ ফরুগলী ২ মাস পর্যন্ত যথারীতি নিজের পদে বহাল থাকবেন। এরপর কোম্পানি তাকে সসম্মানে অব্যাহতি দিবে। কোম্পানি নিয়ম মাফিক ইখওয়ানুল মুসলেমুনের কাছে তার স্থলাভিষিক্ত করার জন্য অন্য একজন আলেমের নাম চেয়ে পাঠাবে এবং নতুন ইমামকে দ্বিগুণ বেতন দিতে হবে। যা হোক দুই মাস পর শাইখ ফরুগলী তার সাবেক কর্মস্থলে ফিরে আসেন এবং শাইখ শাফী আহমদকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়। এভাবেই সুয়েজের এ মরুভূমিতে ইসলামী আন্দোলনের কাফেলা এগিয়ে যেতে থাকে।

অধ্যায় ০৬ : অপপ্রচারের মোকাবেলায়

‘শাইখ! শহরে আমাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এই অপপ্রচারের মাত্রা এতো বেশি যে, আমাদের পক্ষে ধৈর্যধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ একজন যুবক বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয় ও ব্যথাভরা কণ্ঠে হাসানুল বান্নাকে একথাগুলো জানান।

‘এখন আপনি অনুমতি দিন আমরা এই অপপ্রচারকারীদের ওপর পুরোপুরি প্রতিশোধ নিবো।’ ঐ যুবকের আরেক সাথী আবেগ আপ্লুতকণ্ঠে শাইখের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে। এসব কথা শুনে হাসানুল বান্নার ঠোঁটে মিষ্টি হাসির রেখা ঝিলিক দিয়ে যায়। তিনি তাদের উদ্দেশে বলেন, এর মাঝেও কল্যাণকর একটি দিক রয়েছে। আল্লাহতা’লা এরশাদ করেছেন, ‘হে মুসলমানগণ! তোমাদের জন্য জীবন ও সম্পদের পরীক্ষা আসবে। আর তোমরা আহলে কিতাব ও মুশরেকদের কাছ থেকে অনেক কষ্টকর ও তিক্ত কথা শুনবে। এ অবস্থায় তোমরা যদি ধৈর্য ও খোদা ভীরুতার পন্থা অবলম্বন করতে পারো তাহলে সেটা হবে তোমাদের জন্য খুবই সাহস ও বীরত্বপূর্ণ কাজ।’ (আলে ইমরান-১৮৬)।

অতএব আমাদের কখনোই ধৈর্য ও খোদাভীতির পথ পরিহার করা সমীচীন হবে না। এ দাওয়াতের সত্যতা ও এর শক্তির বৈশিষ্ট্য হলো, মানুষ এর বিরুদ্ধে মিথ্যা মনগড়া অপপ্রচার চালাবে। আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে আন্দোলনের ব্যাপারে কি কি ধরনের অপপ্রচার চালানো হয়েছিল। রাসূলে পাকের (সা.) ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে পর্যন্ত কাঁদা ছোড়াছুড়ি হয়েছে। অথচ তিনি এই আন্দোলনের দাওয়াত দেয়ার আগ পর্যন্ত তারা তাকে শ্রদ্ধাভরে বিশ্বাসী ও সত্যবাদী নামে অভিহিত করতো। একজন যুবক কথার মাঝখানে বলে উঠে, কিন্তু এগুলো হলো নতুন ধরনের অপবাদ, এসব ব্যাপারে আমরা তো নিশ্চুপ বসে থাকতে পারি না। এটা নেহায়েতই একটা ভয়াবহ অপবাদ এবং এরা এই অপবাদ ছড়ানো অব্যাহত রেখেছে। ঐ সব লোক এসব অপবাদ ছড়াচ্ছে যাদের কাছে মানুষ দ্বীনি শিক্ষা লাভের জন্য ধাবিত হয়।

হাসানুল বান্না যুবকদের প্রশ্ন করেন, কি সেই অপবাদ? অপবাদদাতারা বলে বেড়াচ্ছে যে, আপনি দরসে আল্লাহর ইবাদত ত্যাগ করে আপনার ইবাদত করার জন্য আমাদেরকে শিক্ষা দিচ্ছেন। সুতরাং ইখওয়ানুল মুসলেমুন আপনার নির্দেশনা মোতাবেক এই বিশ্বাস পোষণ করে যে, শাইখ হাসানুল বান্না মানুষ কিংবা নবী অলি নন, বরং তিনি নিজেই একজন খোদা-যিনি উপাসনা বা ইবাদতের যোগ্য।

হাসানুল বান্না জিজ্ঞেস করেন, এই অভিযোগের কারণ বা রহস্য কি? আমরা আপনার কাছে আসার আগে এ অপবাদের উৎপত্তিস্থলের সন্ধান করে এসেছি। যে ব্যক্তি এ অপপ্রচার চালাচ্ছেন তিনি একজন দ্বীনি আলেম এবং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর ধ্বজাধারী। তিনি যা কিছু বলে বেড়াচ্ছেন, মানুষ সেটাকেই সত্য বলে মেনে নিচ্ছে। আমরা তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আপনাকে কে এ কথা বলেছে যে, ইখওয়ানের কর্মীরা হাসানুল বান্নাকে উপাস্য হিসেবে স্বীকার করে? তিনি জবাবে বলেন, আমি নিজের কানে তোমাদের উস্তাদ হাসানুল বান্নাকে এ ধরনের কথা বলতে শুনেছি। আমরা তার জবাব শুনে হতবাক হয়ে গেছি। তাকে আমরা বারবার একই কথা জিজ্ঞেস করেছি। কিন্তু তিনি প্রত্যুত্তরে একই কথা বলে যাচ্ছেন, আমি নিজের কানে উস্তাদকে এ কথা বলতে শুনেছি। আমরা তো তার কথা কখনোই বিশ্বাস করতে পারি না। আমরা সত্যিকার কি ঘটেছে তা জানার জন্য আপনার কাছে এসেছি। সত্য কথা হলো, এ লোকদের দুঃসাহস দেখে আমরা বিস্ময়বোধ করছি।

ইখওয়ানদের কাছে এসব কথা শুনে হাসানুল বান্না বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যান। তিনি ভাবতে থাকেন, মানুষ একে অন্যের বিরুদ্ধে কি করে এমন অদ্ভূত ও অকল্পনীয় মিথ্যাচার করতে পারে। তিনি অনেক চিন্তা-ভাবনা করে দেখলেন, এই মৌলবী সাহেবের সাথে এ বিষয়ে কোন অনুষ্ঠানে তার এ ধরনের কোন কথাবার্তা হয়নি। সুতরাং হাসানুল বান্না সঙ্গীদের নিয়ে ঐ মৌলবী সাহেবের উদ্দেশে রওনা হলেন। তিনি একই সাথে ইখওয়ানের এমন দুইজন আলেমকে ডাকলেন, যাদের সাথে ঐ মৌলবী সাহেবের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এরপর পাঁচজনে মিলে ঐ মৌলবী সাহেবের বাড়িতে পৌঁছান। তাদেরকে দেখে মৌলবী সাহেবের চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে যায় এবং তার চোখে মুখে অস্থিরতার ভাব ফুটে ওঠে। মনে হয় লোকটি এখনি মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। চেয়ারে বসার পর হাসানুল বান্না তাকে সরাসরি প্রশ্ন করেন, উস্তাদ সাহেব! এই দুই ভাইয়ের মাধ্যমে আমি এইমাত্র জানতে পারলাম যে, আপনি আমার উপর ইবাদত করানোর অপবাদ দিয়েছেন। আর একথাও বলেছেন যে, এটা আপনি নিজের কানে শুনেছেন। তারা যা বলেছেন, সেটা কি ঠিক।

মৌলবী সাহেব জবাব দিলেন, হ্যাঁ, ঠিক। হাসানুল বান্না মৌলবী সাহেবকে বলেন, তাহলে তাদের দুইজনের অবস্থান তো পরিষ্কার হয়ে গেল।

অর্থাৎ তারা যা বলেছেন সত্য কথাই বলেছেন। উস্তাদ সাহেব, আপনি আমার কাছ থেকে এ ধরনের কথা কবে শুনেছেন? মৌলবী সাহেব বলতে শুরু করেন, আমার মনে হয়, প্রায় মাস খানেক আগে আমরা মসজিদে বসা ছিলাম। এ সময় মোহাম্মদ আল-লাইসী নামের একজন শিক্ষক আমাদের সাথে এসে বসেন। এরপর ইখওয়ান কর্মীরা আসতে থাকেন। তারা খুবই আবেগ আপ্লুত হয়ে আপনাকে সালাম করতে থাকে। এটা দেখে মোহাম্মদ আল লাইসী আফেন্দি বলতে থাকেন, মাননীয় উস্তাদ। আপনার প্রতি ইখওয়ান কর্মীদের ভালবাসা পূজা করার সীমানায় চলে গেছে। আপনি উত্তরে বলেছিলেন, এ ভালবাসা যদি নির্ভেজাল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, তাহলে এতে বলার কি আছে।

আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করছি তিনি যেন আমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা আরো বৃদ্ধি করে দেন।

হাসানুল বান্না ঐ মৌলবী সাহেবের কথার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, হ্যাঁ, এ ঘটনা আমার স্মরণ আছে। মৌলবী সাহেব নিজের প্রচারণার স্বপক্ষে প্রমাণস্বরূপ বলেন, ‘তাহলে এর পরিষ্কার অর্থ এই নয় কি- এসব লোক আপনার পূজা করে। এ ধরনের কথা বলার সাথে সাথেই হাসানুল বান্নার সাথে আগত ব্যক্তিরা এবং তার বন্ধু ও সহকর্মী শিক্ষক তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হন এবং তারই বাড়িতে তাকে পিটানোর জন্য তৈরি হয়ে যান। তারা বলেন, উস্তাদ এতটুকুই তোমার বিদ্যার দৌড়? এটাই তোমার জ্ঞানের পরিধি’, তোমার উপলব্ধির অবস্থা এই, এটা তোমার আলোচনার মজলিসের তোমার আমানতদারী, এটাই কি একের কথা অন্যের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তোমার বিশ্বস্ততা? হাসানুল বান্না তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে লোকটিকে ধোলাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করেন।

তিনি মৌলবী সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলেন, শিক্ষক সাহেব! আপনিতো একথা অন্যের কাছে প্রচার করে ফেলেছেন। এখন আপনার দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো, আপনি যেভাবে ইচ্ছা এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করুন। কিন্তু আপনি আমার বক্তব্যকে বিকৃত করে প্রচার করেছেন, আমি নিজেই ইখওয়ানীদের আমার ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছি। আল্লাহ রক্ষা করুন। আপনি আরো মিথ্যাচার করেছেন যে, একথা আমার কাছ থেকে নিজ কানে শুনেছেন এবং এটাও বলেছেন যে, ইখওয়ানীরা এ ধরনের আকিদা বিশ্বাসই পোষণ করে। আপনি আমার বক্তব্যের ঐ অংশটুকু কাটছাঁট করে ফেলেছেন, যেখানে আমি মোহাম্মদ আল লাইসি আফেন্দিকে এ ধরনের আপত্তিকর বক্তব্যের ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছি। আমি তাকে একথা বলে দিয়েছিলাম যে, আপনি যা বলছেন, তা ইসলামের পরিপন্থি।

উস্তাদ সাহেব! আপনি ঘটনাতো স্মরণ রেখেছেন কিন্তু আমার বক্তব্য ও সতর্কীকরণকে মুছে ফেলেছেন। যা হোক, আমাদের ওপর আপনার এই যে, অনুগ্রহ এটাই যথেষ্ট। এখন সত্য ঘটনা আলোর মত ফুটে উঠেছে। কিন্তু মৌলবী সাহেবের বন্ধু ও সঙ্গী সাথী ইখওয়ানীরা এতটুকু তিরস্কারেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তারা দাবি করলেন ইখওয়ানের কোন জমায়েতে নিজের দোষ স্বীকার করে বক্তব্য দিবেন, তা না হলে ছোট বেলায় খাওয়া দুধ কিভাবে নাক দিয়ে বের করতে হয় তাদের তা ভালো করেই জানা আছে। সুতরাং মৌলবী সাহেব বন্ধুদের কাছে নতি স্বীকার করে পরবর্তী সাপ্তাহিক সমাবেশেই নিজের অপরাধের কথা উল্লেখ করে ঘটনার পূর্বাপর বর্ণনা করেন এবং কৃত অপরাধের জন্য ক্ষশা প্রার্থনা করেন।

অধ্যায় ০৭ : ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে

“ভাই আব্দুল্লাহ! ওস্তাদ হাসান নিজের সহকারী নিযুক্ত করার ব্যাপারে গতকাল যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এ ব্যাপারে তোমার অভিমত কি?”
বিশাল বপু ও অনেক পাণ্ডিত্যের অধিকারী এক ব্যক্তি দৃশ্যত সরল সোজা অপর এক ব্যক্তির কাছে বসে তাকে প্রশ্ন করেন।

“শাইখ ইমাদ! এ ব্যাপারে আবার আমার মতামত কি হবে? আপনি তো প্রস্তাব করেছিলেন , হাসানুল বান্নার উচিত নিজের একজন সহকারী নিয়োগ করা।”

শাইখ ইমাদ বলেন, হ্যাঁ, তাতো ঠিক! আমি ইখওয়ানের স্বার্থেই এ প্রস্তাব দিয়েছিলাম। ওস্তাদ হাসানুল বান্না যদি আকস্মিক বদলী হয়ে যান তাহলে ইসমাইলিয়ায় বিস্তার লাভ করা আন্দোলনের কাজ তিগ্রস্ত হবে। তার এ দায়িত্ব বহনের জন্য অবশ্যই কোনো সহকারী নিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু একই সাথে একথাও সত্য যে, এ বোঝা বহন করার মত যোগ্যতা সেই সহকারীর থাকতে হবে।

ভাই আব্দুল্লাহ জিজ্ঞেস করেন, শাইখ আল জাদাওয়ীর মধ্যে কিসের ঘাটতি রয়েছে?

তিনি একজন পুণ্যবান ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তি। তিনি শুরু থেকেই ইখওয়ানের সাথে সম্পৃক্ত। শাইখ ইমাদ শীতল নিশ্বাস ছেড়ে বলেন, আমি কি তাকে মন্দ বলেছি! কিন্তু ভাই, খোদাভীরুতাই যথেষ্ট নয়। একজন নেতার জন্য প্রয়োজন পাণ্ডিত্যের গভীরতা, গ্রহণযোগ্য আচরণ ও ব্যক্তিত্ব, এর সাথে কর্মসম্পাদনের যোগ্যতা ও দতা অবশ্যই প্রয়োজন। তুমি কি মনে করো এই কাঠ মিস্ত্রির পুত দল পরিচালনার প্রয়োজন পূরণে সম হবে? এর পর থেকে যায় নিষ্ঠার বিষয়টি। দলের স্বার্থে আমি কি আত্মত্যাগ কম করেছি? আন্দোলনের জন্য আমি অর্থও ব্যয় করে থাকি। আমি নিজের ধন সম্পদ, নিজের জীবন, নিজের ভবিষ্যৎ, সব কিছুই ওস্তাদ হাসানুল বান্না ও আন্দোলনের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছি। কিন্তু আলী আল জাদাওয়ী এসব কাজের কোনটি করতে পেরেছেন? প্রকৃতপে তিনি কিছুই করতে পারেননি। তিনি সম্পদ ও ব্যয় করেননি কিংবা কৃচ্ছ্র সাধনাও করেননি। এতদ সত্ত্বেও হাসানুল বান্না এমন একজন একান্ত নিষ্ঠাবান সাথীকে রেখে সর্বশক্তি নিয়োগ করে কেনো এমন ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করেন যিনি আমার চেয়ে অধিক নিষ্ঠাবান নন। এটি পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট অন্যায়। ভাই আব্দুল্লাহ বলেন , হে শাইখ! ওস্তাদ আল বান্না বিশেষ কোনো যোগ্যতা দেখেই হয়তো আলী আল জাদাওয়ীকে নিজের সহকারী নিযুক্ত করেছেন।

শাইখ ইমাদ এদিক ওদিক তাকিয়ে খুব নিচু আওয়াজে বলেন, ভাই! আমরা দ্বীনদার লোকেরা খুব সহজ সরল হয়ে থাকি। তুমি কি জানো ওস্তাদ হাসানুল বান্না কেনো এ ধরনের একজন লোকের নাম প্রস্তাব করেছেন? আব্দুল্লাহ শাইখ ইমাদের দিকে তাকিয়ে সরলভাবেই বলে ফেলেন, মাননীয় শাইখ আপনার মত জ্ঞানীগুণী মানুষের সামনে আমার কি বক্তব্য থাকতে পারে?

শাইখ ইমাদ বলেন, প্রকৃতপে ওস্তাদ আল বান্না সহকারী নিয়োগের েেত্র এমন ব্যক্তিকে বেছে নিয়েছেন যিনি তার সামনে দ্বিমত পোষণের সাহস দেখাতে পারবেন না। আব্দুল্লাহ বলেন, শাইখ! বাজে ধারণা পোষণ করা আমাদের উচিত হবে না। শাইখ ইমাদ বলেন, ভ্রান্ত ধারণার পথ তো তিনি খুলে দিয়েছেন। সাধারণ পরিষদের কথাই ধরা যাক - যেখানে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তড়িঘড়ি করে সাধারণ পরিষদের সভা ডাকা হয়েছে। সেখানে এমন সদস্যদের ডাকা হয়নি যাদের ডাকলে বৈঠকের সিদ্ধান্ত ভিন্নরকম হতে পারে।

আব্দুল্লাহ বিস্ময়াভিভূত হয়ে শাইখের দিকে তাকিয়ে বলেন আচ্ছা, তাই নাকি! তাহলে তো তারা খুব অন্যায় কাজ করেছেন। শাইখ ইমাদ আব্দুল্লাহকে তার কথায় প্রভাবিত হতে দেখে বলতে শুরু করেন, এখন আমি এটা চাই না যে দলের আরো তি হোক, যদি দলের নেতৃত্বে জ্ঞানগত দিক থেকে দুর্বল ও খোসামোদ প্রিয় লোকদের প্রভাব বেড়ে যায় তাতে পুরো দলেরই ব্যাপক তি হবে। এখন এটাই কি কম তির বিষয় যে, দল একদিকে ঋণগ্রস্ত অপর দিকে আলী আল জাদাওয়ীর জন্য ইমামতির সম্মানি তিরিশ গিনি (মিসরী পাউন্ড) নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে আমি এ দায়িত্ব স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে পালন করতে প্রস্তুত রয়েছি। আব্দুল্লাহ হতাশা ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, মাশাল্লাহ! সুবহানআল্লাহ! আপনার মত নিষ্ঠাবান ব্যক্তিকেই তো দলের পদে বসানো যেতে পারে। জানি না, ওস্তাদ হাসানুল বান্না একথা কেনো বুঝতে পারছেন না। শাইখ ইমাদ দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, হ্যাঁ ভাই আব্দুল্লাহ! বিষয়টি তিনিও বুঝতে পারবেন যদি আপনার মত নিষ্ঠাবান সাথীরা মিলে তার কাছে এ সমস্যাটি তুলে ধরেন। আব্দুল্লাহ বলেন, মাননীয় শাইখ! আমি আপনার সাথে আছি, অন্য সাথীদের বলে বুঝিয়ে দলে ভিড়িয়ে নেবো।

ইসমাইলিয়ার ইখওয়ানরা, পারস্পরিক ভালোবাসা, আধ্যাত্মিক একাত্মতা, নিষ্ঠা ও আল্লাহর পথে পারস্পারিক সম্পর্কের েেত্র একটি উৎকৃষ্টতম উদাহরণ। আল্লাহর পথে ঐক্য, ত্যাগ, সংগ্রামের পথে যন্ত্রণা ও কষ্ট হাসি মুখে বরণ করে নেয়ার েেত্র একের সাথে অপরের চেয়ে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের সাধারণ অভ্যাস। ইখওয়ান সে সময় প্রশস্ত দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে নতুন প্রজন্মের শিা ও প্রশিণ, জনকল্যাণের নতুন নতুন শিা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে তখন সেখানে এমন লোকদের ও নিয়োগ দেয়া হয় যারা প্রচলিত ও প্রথাগত শিাদীায় যোগ্যতা সম্পন্ন। কিন্তু এসব ব্যক্তির আত্মিক শুদ্ধি আন্দোলন ও আন্দোলনপন্থী লোকদের মত চারিত্রিক গুণাবলী ও নৈতিক দৃঢ়তার অভাব পরিলতি হয়। এতে ইখওয়ানের মধ্যে বাড়তি ও বেহুদা উপাদানের সংযুক্তি ঘটে।

এসব শিক কর্মচারী ইখওয়ানের পরিবেশের সাথে অপরিচিত ছিলেন। ইখওয়ানের পদ পদবী ও সম্পদের প্রতি এদের লোভের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে পড়ে। ইখওয়ানের এসব সম্পদ কর্মীরা নিজেদের পেট কেটেই সংগ্রহ করেছেন,অন্যকোথাও থেকে আসেনি। আন্দোলনের মূল ল্েযর সাথে অপরিচিত এসব ব্যক্তি ভাবেন যে ছলচাতুরীর মাধ্যমে আন্দোলনের ভেতরে অগোচরে পারস্পরিক নিন্দার প্রবাহ সৃষ্টি করতে পারলে তাদের অশুভ চিন্তা সফলতা লাভ করবে। এর ফলে তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বড় বড় পদ ধনসম্পদ এমনকি মূল আন্দোলনের পদ ও পদবীতে জেঁকে বসতে পারবে এবং ইখওয়ানের ঘাড়ে বসে নির্দেশ জারি করতে পারবে।

এ ল্য বাস্তবায়নে যিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা (?) পালন করেন তিনি হলেন একজন আলেম, ফিকহ বিশেষজ্ঞ, খ্যাতিমান সাহিত্যিক, সুমিষ্ট কণ্ঠের অধিকারী বক্তা, বাকপটু ব্যক্তি শাইখ ইমাদ উদ্দীন আল আজহারি। তাকে হেরা মক্তবে শিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

ইখওয়ান কর্মীরা তার যোগ্যতার মূল্যায়ন করে তাকে সম্মেলন কমিটির সভাপতির দায়িত্ব প্রদান করেন। সবাই তাকে সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতেন। এর ফলে তার খায়েশ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তিনি ইসমাইলিয়ায় দলীয় প্রধানের মসনদটি দখল করে নেবেন। তারা ভেবেছিলেন, হাসানুল বান্না সরকারি চাকুরে এবং যেকোনো সময় বদলী হয়ে যেতে পারেন।

প্রবৃত্তির এ চাহিদা পূরণে সহজতর প্রাকৃতিক বিধান এটাই হতে পারতো যে, তিনি নিজেকে একজন নিষ্ঠাবান ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত করে আন্দোলনের পথে উৎসর্গকৃত প্রাণ হবার অভিনয় করে যাবেন- যা দেখে কর্মী বাহিনী তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বে। কিন্তু তিনি এ পথে না গিয়ে মত পার্থক্য সৃষ্টি, পর নিন্দা, পরচর্চা ও কানাকানির নিন্দিত পথ বেছে নেন। তিনি ইখওয়ানের কর্ম পরিষদের সদস্যদের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করার চেষ্টা করেন। এদের সম্পর্কে তার ধারণা ছিল- এসব লোকজন ইখওয়ানের অভ্যন্তরে প্রভাবশালী। সুতরাং এসব সদস্যের সাথে ব্যাপক দেখা সাাৎ করে তাদের সাথে ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক বৃদ্ধির প্রয়াস অব্যাহত রাখেন। তার নিজের বাসায় ও এদের দাওয়াত দিতে থাকেন। ইখওয়ানের তৎপরতা ও প্রচেষ্টার ল্যই হলো, আন্দোলনের ডাকে সমবেত লোকদের পারস্পারিক আত্মিক ও নৈতিক সম্পর্কের বন্ধন সুদৃঢ় করা। তাই তারা শাইখের এই তৎপরতাকে পুতপবিত্র ও নিষ্কলুস কর্ম হিসেবে বিবেচনা করেন।

হাসানুল বান্নার আকস্মিক বদলীর আশংকায় শংকিত হয়ে, ইখওয়ানের সাংগঠনিক তৎপরতায় ব্যাঘাত সৃষ্টি রোধে কর্মীরা তাকে সহকারী নিয়োগের প্রস্তাব দেন। এ প্রস্তাব যথেষ্ট যৌক্তিক ছিল। তাই তিনি গভীর ও ব্যাপক চিন্তার পর শাইখ আলী আল জাদাওয়ীকে নিজের সহকারী নিয়োগের প্রস্তাব করেন। আলী আল জাদাওয়ী এক কথায় যেমন ভালো মানুষ ছিলেন তেমনি ছিলেন দ্বীনি দিক থেকেও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। এছাড়াও জ্ঞান গড়িমায়ও মোটেও পিছে ছিলেন না। তিনি ঐ সব নিষ্ঠাবান ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যারা এ আন্দোলনের আহ্বানে সাড়া দেয়ায় অগ্রবর্তী। এ সকল দিক বিবেচনায় ইখওয়ানের মধ্যে প্রিয়তম ব্যক্তি ছিলেন। সুতরাং, এক সাধারণ সভায়, ওস্তাদ হাসানুল বান্না তার সহকারী হিসেবে আলী আল জাদাওয়ীর নাম উত্থাপন করেন। ইখওয়ানের উপস্থিত সব সদস্য আনন্দ ও খুশিতে এ প্রস্তাব অনুমোদন করেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আনন্দের আতিশয্যে এ প্রস্তাব ও করেন যে আলী আল জাদাওয়ী নিজের ব্যবসা বাণিজ্য ছেড়ে দিয়ে ইখওয়ানের মসজিদের ইমামের দায়িত্বও পালন করবেন। এবং আন্দোলনের তহবিল থেকে তার জন্য মাসোহারার ব্যবস্থা করতে হবে- যাতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে সব ধরনের দায়িত্ব পালন করে যেতে পারেন। এ সময় শাইখ আলী আল জাদাওয়ী ফার্নিচারের ব্যবসা করতেন। উপস্থিত সবাই এক বাক্যে এ প্রস্তাব সমর্থন করেন। আলী আল জাদাওয়ীর জন্য নাম মাত্র মাসোহারা নির্ধারণ করা সত্ত্বেও তিনি তাতে সম্মত হয়ে যান।

অধ্যায় ০৮ : পদলোভীর মিথ্যাচার

ইখওয়ানের নেতৃত্বের পদাকাক্সী শাইখ ইমাদ দেখতে পেলেন তার মনে নেতৃত্বের যে বাসনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল তাকে তা থেকে বঞ্চিত করে নতুন এক ব্যক্তিকে সেই আসনে বসানো হয়েছে। তার পে কোনো ভাবেই এটা মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। কারণ “সুতারে”র চেয়ে নিজেকে অধিক যোগ্য, পাণ্ডিত্যের অধিকারী ও নেতৃত্বের গুণাবলী সম্পন্ন ব্যক্তি বলে মনে করে থাকেন। জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ও যোগ্যতার প্রশ্নে কোথায় শাইখ সাহেব ও কোথায় “কাঠমিস্ত্রি” সাহেব। একদিকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী ব্যক্তি অপর দিকে খ্যাতিমান কবি। বক্তৃতার ক্ষেত্রে তার পারঙ্গমতা সর্বজন বিদিত। সাংগঠনিক কাজের বিস্তৃতির ক্ষেত্রেও ছিলেন যথেষ্ট যোগ্যতা ও দতার অধিকারী। মানুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার দতা ছিল নজর কাড়ার মত। সুতরাং সংগঠনের এ পদটি দখলের জন্য তিনি যথারীতি পরিকল্পনা করতে থাকেন।

অতএব , এই ল্য অর্জনে তিনি ঐ সব বন্ধুর সাহায্য নেয়ার চেষ্টা করেন , যাদের সাথে প্রথম থেকেই ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলেছিলেন। এদের মধ্যে একজন ছিলেন ভাই আব্দুল্লাহ। তাকে তিনি বিশেষ বন্ধু হিসেবে বেছে নিলেন। সুতরাং তিনি তাকে সব সময় আয়নায় দেখতে থাকেন এবং তার অন্তরে কুমন্ত্রনা দিয়ে যেতে থাকেন। চাতুর্যের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ইখওয়ানের মধ্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। এসব তৎপরতার ল্য ছিল যাতে তিনি সহকারীর পদ ও একই সাথে ইমামতির দায়িত্ব পেয়ে যেতে পারেন। সহজ সরল ও সাদা দিলের ইখওয়ানীরা তার এ গোপন উদ্দ্যেশ্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকেন।

ভাই আব্দুল্লাহ শাইখের এই আকাক্সার কথা বন্ধুবান্ধবের কানে পৌঁছাতে থাকেন। তার এসব কথায় দু’ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। দাবিটি যে অন্যায়-কেউ কেউ তাকে এ কথা বোঝানোর চেষ্টা করেন। আবার কেউ কেউ তার কথায় প্রভাবিত হয়ে তার প্রতি সমব্যথি হয়ে পড়েন। আরো তিনজন ইখওয়ানী বন্ধু তাদের সাথে সুর মেলান। এর কারণ হলো “তাদের মধ্যে পারস্পারিক বন্ধুত্ব ও শাইখের কুমন্ত্রনার প্রভাব।” আরো একটি কারণ ছিল তারা ব্যক্তিগতভাবে শাইখ আল জাদাওয়ীকে পছন্দ করতেন না। শাইখ আল জাদাওয়ী যে অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিলেন সেটাকে তারা সহ্য করতে পারতেন না। তারা তাকে হিংসা করতেন। কিন্তু তারা তাদের সকল অপকর্মকে আন্দোলনের জন্য কল্যাণকর রূপে প্রকাশ করে অতি উত্তম পোশাকে সুসজ্জিত করার অপচেষ্টা চালাতেন।

শাইখ হাসানুল বান্না পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শয়তানী প্ররোচনায় তাদের মন মগজে বিষয়টি বদ্ধমূল হয়েছিল যে, শাইখ ইমাদ উদ্দীনকে ঐ পদে বসানোর মধ্যেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এ ব্যাপারে হাসানুল বান্নার সব ধরনের চেষ্টা ও সাধনা ব্যর্থ হয়ে যায় এবং তারা নিজেদের চিন্তা ভাবনাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকেন। প্রকৃতপে এটিই সেই জানালা বা ছিদ্রপথ যার মাধ্যমে শয়তান ইমানদার মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে। তাদের ইমানের সত্যতা ও অন্তরের পবিত্রতা নষ্ট করে দেয়।

ওস্তাদ হাসানুল বান্না তাদের বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতেন। কেনো না এসব লোক আন্দোলনের প্রথম যুগে এসেছেন এবং আন্দোলনের জন্য এদের প্রচুর ত্যাগ ও নিষ্ঠা রয়েছে। তিনি কখনোই কামনা করতেন না যে, এতো পরিশ্রম ও চেষ্টা সাধনায় গড়ে তোলা কর্মীবাহিনী ধ্বংস হয়ে যাক। তিনি মনে করতেন, এতো কষ্টে গড়ে তোলা ব্যক্তিদের ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য অধিকতর পরিশ্রম, কষ্ট, প্রজ্ঞা ও বিজ্ঞতার পরিচয় দেয়া উচিত।


সার্বিক দিক বিবেচনায় তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গের ব্যাপারে দ্রুত কোনো পদপে গ্রহণ সঠিক হবে না। কিংবা রাতারাতি তাদের সংগঠনের বাইরে ঠেলে দেয়া ঠিক হবে না। বরং তিনি এমন পথ বেছে নিলেন যা উত্তম ও সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। একদিন তিনি শাইখ ইমাদ দ্বারা প্রভাবিত ব্যক্তিদের ডেকে জিজ্ঞেস করেন “আপনারা কি চান?” “আমরা শুধু এটাই চাই যে, আপনি আপনার সহকারীর পদে শাইখ আলী আল জাদাওয়ীকে বসাবেন না।” “খুব ভালো কথা” হাসানুল বান্না বললেন। “এটাইতো আপনাদের চাওয়া?” কিন্তু এর বিপরীতে আপনাদের অন্য ভাইদের চাওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং তারাই শাইখ আলী আল জাদাওয়ীকে নির্বাচিত করেছেন। “আমি যদি আপনাদের বাসনা পূর্ণ করি তাহলে এর দ্বারা আপনাদের ঐ সকল ভাইয়ের বাসনা অপূর্ণ করা হয়।” “কখনই না”তারা বলতে থাকেন, “সব ইখওয়ান সভায় উপস্থিত ছিলেন না। যদি সবাই উপস্থিত থাকতেন তবে তাদের রায় অন্য কিছু হতো। সভা তাৎণিকভাবে ডাকা হয়েছিল এবং সভার উদ্দেশ্যও স্পষ্ট ছিল না”। হাসানুল বান্না তাদের প্রশ্ন করেন, যদি নতুন করে সবাইকে ডাকি? সবার কাছে সভা আহ্বানের উদ্দেশ্য পরিষ্কার করি এবং সবাইকে খোলাখুলিভাবে নিজের মতবাদ প্রকাশের সুযোগ দেই তাহলে কি আপনারা দলের মতামত মেনে নিবেন? তারা সমস্বরে বলে ওঠেন জ্বী জ্বী অবশ্যই। তাদের সম্মতির পর হাসানুল বান্না বলেন, খুব ভালো কথা এতে কোনো তি নেই। আসুন আমরা সবাই এ বিষয়ে আল্লাহর নামে শপথ করি।

সবাই শপথ নিলেন এবং সভার সময় নির্ধারণ করা হলো। চিঠির মাধ্যমে সভার ল্য ও উদ্দেশ্য পরিষ্কার করা হলো। সভা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সহকারী নির্বাচনের ব্যবস্থা হলো। দেখা গেলো নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি ছাড়া বাকি সবাই আলী আল জাদাওয়ীকে সমর্থন করেছেন।

এেেত্র তারা বিস্ময়কর ঐক্যের পরিচয় দিয়েছেন। নির্বাচিত হবার পর আলী আল জাদাওয়ী গভীরভাবে চিন্তা করে সংগঠন থেকে মাসোহারা না নেয়া এবং বিনা পারিশ্রমিকে মসজিদে ইমামতি করার ঘোষণা দেন। এতে ইখওয়ান কর্মীদের মনে বিরাট প্রভাব পড়ে। আলী আল জাদাওয়ীর এ ঘোষণায় এবং তার ব্যাপারে সর্বসম্মত ঐক্য দেখে প্রতিপ বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে। এই সিদ্ধান্তের পর ইখওয়ান কর্মীরা তার ব্যবসা চালু রাখার জন্য একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেন। তিনি যাতে সব সময় মসজিদ ও মাদরাসার কাছেই থাকতে পারেন সে ল্েয তার ওয়ার্কশপ চালাতে মসজিদের একটি দোকান খালি করে দেয়া হয়।

মনোজগৎ এমনি একটি স্থান সেখানে যদি প্রবৃত্তি পূজা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তাহলে সে কল্যাণের বিরুদ্ধে অন্ধ ও সত্য শ্রবণের ব্যাপারে বধির হয়ে পড়ে। এখানেও এধরনের অবস্থার সৃষ্টি হয়। তারা খুব দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা দেয় যে তারা পাঁচ’শ লোককে সমবেত করবে। এর মধ্যে শতকরা পাঁচজন লোকও যদি তাদের প না নেয় তাহলে মেনে নিবে যে, তারা ভুল পথে রয়েছে। বিরোধীরা সমাবেশ থেকে বের হয়েই তাদের শাইখের কাছে চলে গিয়ে সেখানে যা যা ঘটেছে তা নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা শুরু করে দেয়। আত্মগরিমা, একগুয়েমী ও হঠকারিতা তাদেরকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করে। তারা সত্যের এই আন্দোলনের বিরোধিতার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা এ অশুভ তৎপরতাকে কল্যাণ ও সমবেদনার চাদর পরিয়ে নেয়।

তারা অপপ্রচারে নেমে পড়ে। বলতে শুরু করেন, এসময় হাসানুল বান্নার প থেকে আন্দোলনের কাজ কোনো ইখওয়ানীর দয়া ও অনুগ্রহের উপর ছেড়ে দেয়া, দাওয়াতী কাজের জন্য বিপদজনক। মসজিদ ও কেন্দ্র নির্মাণের প্রেেিত ব্যবসায়ীদের কাছে ইখওয়ানের সাড়ে তিনশ’ পাউন্ড ঋণ রয়েছে। যদি পাওনাদার ব্যবসায়ী ও অন্যান্য ব্যক্তি বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন তাহলে তারা এক্ষুণি এসে পাওনা চেয়ে বসবেন এবং তাদের কথাতেই আমাদের সুনাম সুখ্যাতির উপর কালিমা লেপন হয়ে যাবে। যখন সকল দায় দায়িত্বের বোঝা সহকারীর উপর চাপিয়ে দিয়ে হাসানুল বান্না এখান থেকে বদলী হয়ে যাবেন তখন সহকারী সাহেব কি এসব দায় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়ার যোগ্যতা রাখেন? এটাইকি সঠিক নয় যে, সহকারী একজন সাহসী ও সম্পদশালী ব্যক্তিকে নির্বাচন করা। এতে তিনি সামনে আসা অকল্যাণ ও বিপর্যয় থেকে আন্দোলনকে রা করতে পারবেন।

ধীরে ধীরে এই কথাগুলো সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। হাসানুল বান্না সুধারণার বশবর্তী হয়ে চিত্রের ভালো দিকের প্রতি অগ্রাধিকার দিতেন এবং ছোটখাটো অপবাদকে এড়িয়ে গিয়ে নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন। সুতরাং তিনি ঋণদাতা ব্যবসায়ীদের ডেকে এনে চারজন ব্যবসায়ীর পাওনার দায়িত্ব তাদের মধ্যে যেকোনো একজনকে গ্রহণ করার অনুরোধ করেন। তারা বিষয়টি মেনে নেন।

এই ঋণের দায়িত্ব যিনি গ্রহণ করে তাকে হাসানুল বান্না জানান যে, তার এই ঋণ দীর্ঘ মেয়াদি কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে। অর্থাৎ প্রতিমাসে তাকে আট পাউন্ড করে পরিশোধ করা হবে। ঐ ব্যবসায়ী হাসানুল বান্নার এ প্রস্তাবও মেনে নেন। সম্পূর্ণ পাওনা আদায়ের ব্যাপারে হাসানুল বান্না নিজের প থেকে তাকে অঙ্গীকারনামা লিখে দেন। এর সাথে তিনি তাদের কাছ থেকেও এ স্বীকারোক্তি আদায় করেন যে ইখওয়ানের কাছে কারো কোনো পাওনা নেই। এসব কর্ম সম্পাদনের পর ঐ চার বিরোধী ব্যক্তি ছাড়া বাকি ইখওয়ানকে তিনি ডেকে এনে সব ঘটনা খুলে বলেন, এসব শোনার পর ঐ চার অপপ্রচারকারীর হাতের শিকার ফস্কে যায়। আন্দোলনের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের কৌশল ধসিয়ে দেয়া হয়।

অপপ্রচারকারীরা লজ্জিত হয়ে বলতে থাকে, ওস্তাদ আপনি কেনো নিজের উপর এত বড় বোঝা চাপিয়ে দিলেন? এটাকি কোনো মনুষ্যত্বের কথা হলো যে, আমরা আপনার উপর এত বড় বোঝা চাপিয়ে দিব? এ কল্যাণকর কাজের জন্য অবশ্যি আপনার বিনিময় পাওয়া উচিত।

মনে করুন আপনি আকস্মিক বিপদে পড়লেন এবং এই ঋণ পরিশোধ করতে পারলেন না, তখন প্রতিকার কি হবে? তাদের এই সব চাটুকারিতায় বিভ্রান্ত না হয়ে হাসানুল বান্না জবাব দেন, “বিষয়টা এখন যেহেতু আমার ব্যক্তিগত তাহলে এটা আমার উপরেই ছেড়ে দিন”।

বাকি থাকে কিস্তি আদায়ের বিষয়টি। জেনে রাখুন! কিস্তি এমনভাবে নির্ধারণ করেছি যা আদায় করা আমার আওতা বহির্ভূত নয়। এসব কর্মকাণ্ডের ভিতরে একজন মুসলমান হিসেবে অংশ নিতে যাচ্ছি। নিজের জাতি ও দ্বীনের স্বার্থে অর্থ ব্যয় করা আমার জন্য আবশ্যিক বিষয়।

অতএব আমার বিষয় নিয়ে আপনাদের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের মধ্যকার ঐক্য চিরস্থায়ী হোক-এটাই যথেষ্ট।

হাসানুল বান্নার এ ধরনের বক্তব্যের পর ঐ সব লোকের কিছু বলার বা করার কোনো সুযোগ অবশিষ্ট ছিল না। তাদের মধ্যে যিনি অর্থবিভাগের দায়িত্বে ছিলেন তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তার এই ইচ্ছা সাথে সাথে মঞ্জুর করা হয়। যখন তিনি অর্থবিভাগের লোহার আলমারির চাবি নতুন দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিকে হস্তান্তর করেন তখন তার অবস্থা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মত হয়ে পড়ে। চাবি হস্তান্তর কালে তিনি বলেন, এই নিন চাবি! ইনশাআল্লাহ এখন বায়তুল মাল উজাড় হয়ে যাবে। তার এই কথার প্রতিক্রিয়ায় হাসানুল বান্না বলেন, এই যে ভাই! এমনটি হবে না। আল্লাহর রহমতে এই সিন্দুক সব সময় ভর্তি থাকবে।

ইসমাইলিয়ার সম্মানিত ও দাতা ব্যক্তিবর্গ জানতে পারেন যে হাসানুল বান্না পঁয়তাল্লিশ কিস্তিতে ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করেছেন। ইসামাইলিয়ার সম্মানিত ও ইখওয়ানের প্রতি ভালোবাসা পোষণকারী দাতা ব্যক্তি শাইখ মোহাম্মদ হোসাইন জমলুত শহরের দাতা ব্যক্তিদের নিজের বাড়িতে আহ্বান করেন। তারা এই ঋণ পরিশোধের ল্েয চার’শ পাউন্ড সংগ্রহ করেন। সংগৃহীত অর্থের মাধ্যমে ঋণের সব কিস্তি পরিশোধ করে কিছু অর্থ বেঁচে গেলে তা বায়তুল মালে জমা করা হয়।

অধ্যায় ০৯ : ধোঁকা প্রতারণা ও ভেলকিবাজি

অবাধ্যতার পঙ্কে নিমজ্জিত গুটিকয়েক ব্যক্তি দেখতে পায় যে, তাদের সঙ্গী ইখওয়ানরা আল্লাহর পথে ঐক্যের প্রশ্নে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় কিভাবে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এরা এ উত্তম কর্মে প্রভাবিত হওয়ার পরিবর্তে শত্রুতা ও পরশ্রীকাতরতার কাদায় আরো অধিক পরিমাণে তলিয়ে যেতে থাকে। এই সুমহান উদাহরণ তাদের অন্তরে প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষের আগুনকে আরো উস্কে দিতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের প্রবৃত্তি যদি শুধুমাত্র লোভ লালসায় মত্ত হয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের অন্ধকার পথে ধাবমান হয় তাহলে সে এর বাইরে আর কিছুই উপলব্ধি করতে পারে না। সুতরাং যে ব্যক্তিকে অর্থ বিভাগের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল তিনি তার বন্ধুদের পরামর্শে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে একটি আবেদন দাখিল করেন।

আবেদনে লেখা ছিল, হাসানুল বান্না ইসমাঈলিয়ায় ইখওয়ানুল মুসলেমুনের প্রধান এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি দলের সব সম্পদ টাকা পয়সা কায়রোতে নিজের ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে থাকেন। যার ব্যাপারে তিনি দাবি করে থাকেন যে, সে কায়রোতে দলের প্রধান। পোর্ট সাঈদ এবং আবু সুবায়েরেও টাকা পাঠানো হয়। অথচ এসব টাকা পয়সা ইসমাঈলিয়ার জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। অতএব এসব টাকা পয়সা ইসমাঈলিয়াতেই খরচ করা উচিত ছিল। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আপনার দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের জানমাল ইজ্জত আব্রুর হেফাজত করা। এ কারণে আবেদনকারীর দাবি হচ্ছে, আপনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে হস্তক্ষেপ করত সম্পদের এ অপচয় রোধে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

ম্যাজিস্ট্রেট আবেদনকারী ব্যক্তিকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি ইখওয়ানুল মুসলেমুনের কার্যকরি পরিষদের সদস্য? আবেদনকারী জবাবে বলেন, আমি এর সদস্য ছিলাম এবং অর্থ বিভাগের দায়িত্বে ছিলাম। কিন্তু আমি ইস্তেফা দিয়েছি। অফিসার জিজ্ঞেস করেন, দরখাস্তে বর্ণনাকৃত শাখাসমূহে যে অর্থ পাঠানো হয়, কার্যকরি পরিষদের তাতে কি অনুমোদন রয়েছে? আবেদনকারী জবাবে বলেন, জী, হ্যাঁ! তাহলে আপনি কি সাধারণ পরিষদের সদস্য? ‘আমি প্রত্যেক বিভাগেরই সদস্য ছিলাম। কিন্তু এখন আমি তাদেরকে দেখতেও পছন্দ করি না। এখন আমি নিজকে তাদের কোন বিভাগেরই সদস্য মনে করি না।’ অফিসার জেরার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি মনে করেন খরচের এসব হিসাবপত্র যদি সাধারণ পরিষদে উত্থাপন করা হয় তাহলে তারা এটা অনুমোদন করবেন এবং হাসানুল বান্নার সিদ্ধান্তের সাথে একমত হবেন?

‘খুবই আশ্চর্যের বিষয়! হাসানুল বান্না যদি বলেন, এ অর্থ আমি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে খরচ করেছি, তাহলেও তারা আনন্দের সাথে অনুমোদন দিয়ে দিবেন। হাসানুল বান্না তাদের ওপর যাদু করেছেন। তিনি যা কিছুই করেন এরা তা চোখ বন্ধ করে অনুমোদন করেন।’ সরকারি কর্মকর্তা পুনরায় জেরার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেন, ‘যদি কার্যকরি পরিষদ হাসানুল বান্নার সাথে একমত হয় এবং সাধারণ পরিষদও তাদেরকে সমর্থন করে তাহলে আপনি শূন্যের ওপর কেন লম্ফঝম্ফ দিচ্ছেন? আপনি দলের সদস্য বা কোন কিছুই নন। আর একজন সরকারি কর্মকর্তারই বা এর সাথে কি সম্পর্ক থাকতে পারে?’

এ সব ব্যক্তি অর্থাৎ ইখওয়ানুল মুসলেমনু-এরা একটি দল হিসেবে সংঘবদ্ধ হয়ে নিজদের অর্থ দান করছেন এবং তা ব্যয় করার জন্য একজন ব্যক্তি বা কয়েকজন ব্যক্তির ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। তারা এ অর্থ যেভাবেই ব্যয় করুন না কেন সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহের তাতে অনুমোদন ও আস্থা রয়েছে। তাহলে কিভাবে একজন সরকারি কর্মকর্তা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারেন? এ ব্যক্তিরা স্বাধীন। নিজদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তারা যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। দেখো যুবক! তোমাকে একজন সরল সোজা লোক মনে হচ্ছে। কিন্তু তুমি খুব বড় ধরনের অন্যায় করে ফেলেছো। তোমার প্রতি আমার উপদেশ হলো, তুমি তাদের সাথে মিলেমিশে কাজ করো এবং উল্টাপাল্টা চিন্তা-ভাবনা থেকে বিরত থাক। যদি এদের কাজকর্ম তোমার কাছে ভাল না লাগে তাহলে এদেরকে পৃথক হয়ে অন্য চিন্তা-ভাবনা করো এবং এরা যা কিছু করছে ঝামেলা না বাঁধিয়ে তাদেরকে তা করতে দাও। তুমি যদি নিজের মঙ্গল চাও তাহলে এটাই তোমার জন্য উত্তম।’ একথা শোনার পর যুবকটি ফিরে যায়।

শাইখ হামেদ আসকারিয়া এসব ঘটনা শোনার পর শিবরাহিয়াত থেকে ইসমাঈলিয়া আসেন এবং তিনি তৃতীয় পক্ষ হয়ে এসব হটকারী লোককে দলে ভিড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা শত্রুতার ভ্রান্ত পথ থেকে ফিরে আসতে তৈরি ছিল না। শাইখ হামেদ আসকারিয়া এসব ক্ষেত্রে খুবই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। এসব লোকের সাথে মিশে ও তাদের অবস্থা উপলব্ধি করে তিনি হাসানুল বান্নাকে বলেন, উস্তাদ!

এদের মধ্যে কোন প্রকার কল্যাণ অবশিষ্ট নেই। এরা দাওয়াতের উচ্চ মর্যাদা ও স্তর থেকে বঞ্চিত এবং নেতৃত্বের আনুগত্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যারা এ দুটি অবস্থা থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তারা আমাদের দলের জন্য কোন প্রকার কল্যাণ বয়ে আনতে সক্ষম নয়। সুতরাং আপনি তাদের শত্রুতা ও বিরোধিতাকে প্রতিদান ও পুণ্যের কাজ বুঝে নিবেন এবং নিজের পথে সুদৃঢ় থাকবেন। তিনি নিজের এ মতামত দলচ্যুত ব্যক্তিদেরকেও নিঃসংকোচে অবহিত করেন এবং নিজে শিবরাহিয়াত চলে যান। এসব লোক অগ্রবর্তী হয়ে ইখওয়ানুল মুসলেমুন থেকে ইস্তেফা দিয়ে দেয়। কার্যকরি পরিষদে তা গৃহীত হওয়ার পর এ দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে।

এ অবস্থায় এসব লোক নিজদেরকে ইখওয়ান থেকে অনেক দূরে দেখতে পায় এবং বিষয়টি আপনা আপনি তাদের মনঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা এ সময় ইখওয়ানের বিরুদ্ধে কোন প্রকার ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের জাল বুনতে ব্যর্থ হয়। তাই তারা ইখওয়ানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে বাজার গরম করার চেষ্টা করে। এরা ইখওয়ানের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে নাম ঠিকানাবিহীন চিঠিপত্র পাঠানো শুরু করে। কখনো শিক্ষামন্ত্রী আবার কখনো জেলা প্রশাসকের নামে আবেদন পাঠায়। তারা শহরের ঐ সব লোককেও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে যাদেরকে ইখওয়ানের শুভাকাক্সী মনে করা হয়। তাদেরকে আন্দোলনের প্রতি বিরাগভাজন করার জন্য মিথ্যা ও বানোয়াট কথাবার্তা শোনানো হয়। তাদের এই অপকর্মের সূচনা শাইখ মোহাম্মদ হোসাইন জমলুত থেকে শুরু হয়।

তারা তার কাছে এই বলে মিথ্যাচার চালায় যে, ‘ইখওয়ানুল মুসলেমুন খুবই বিপজ্জনক একটি দল। তাদের গোপন তৎপরতা এমন পর্যায়ের যে, আপনি যদি তা জানতে পারেন তাহলে অবশ্যই এদের থেকে দূরে সরে যাবেন এবং নিজের জীবন বাঁচানোর চিন্তা করবেন। আমরা তাদের এসব তপরতার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকতাদেরকে অবহিত করতে চাই। কিন্তু তার আগে আমরা আপনাকে অবহিত করছি যাতে এ বিষযে অবগত হয়ে আপনি সতর্কতামূলক পন্থা অবলম্বন করতে পারেন এবং তাদের সাথে প্রকাশ্যে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। আর তাদের থেকে পৃথক ও সম্পর্কহীন হওয়ার ঘোষণাও দিতে পারেন।

শাইখ জমলুত জিজ্ঞেস করেন, আপনারা যা কিছু বিবৃত করেছেন তা সত্য হওয়ার বিষয়ে আপনাদের নিশ্চিত বিশ্বাস আছে তো?’ ‘হ্যা, আমরা নিশ্চিত বরং এসব গোপন তৎপরতায় আমরাও অংশ নিয়েছি।’ তাদের চেহারায় গাঢ় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে শাইখ জমলুত বলেন, ‘যুবকগণ! এই মুহূর্তে আমি তোমাদেরকে দুইভাবে বিচার করতে পারি। প্রথমত যদি সত্য বলে থাকো তাহলে তোমরা গাদ্দার ও আমানতের খিয়ানতকারী, দ্বিতীয়ত যদি মিথ্যা বলে থাকো তাহলে তোমরা মিথ্যাবাদী। এ অবস্থায় কি করে তোমাদের কথাকে সত্য বলে মেনে নিয়ে বিশ্বাস করতে পারি! এখান থেকে চলে যাও। ভবিষ্যতে কোনদিন যেন তোমাদের এখানে আর না দেখি।’

অধ্যায় ১০ : শাইখ জমলুতের মহানুভবতা

ঐ ব্যক্তিদের মিথ্যাচারের পর শাইখ জমলুত হাসানুল বান্নার সাথে সাক্ষাতের জন্য স্কুলে যান। তার চেহারার রং লাল বর্ণ ধারণ করে চলেছে। রাগ ও ক্রোধের চিহ্ন তার মুখমণ্ডলে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। স্কুলে গিয়ে অধ্যক্ষের অনুমতি নিয়ে হাসানুল বান্নাসহ বেরিয়ে আসেন।

পায়চারী করতে করতে তারা শহরের বাইরে পৌঁছে যান। তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের কাছ থেকে যা কিছু শুনেছেন এরই মাঝে তা হাসানুল বান্নাকে অবহিত করেন। তিনি ধমকের স্বরে হাসানুল বান্নাকে বলেন, ‘মিঞা সাহেব! এুনি দ্রুত কায়রো চলে যাও। এসব ব্যক্তি যা কিছু বলছে তা যদি সত্যি হয় তাহলে দ্রুত নিজের ব্যবস্থা করে নাও। চেষ্টা করো তোমার গোপন তৎপরতার কোন দিক ... সত্যি যদি তোমার গোপন তৎপরতা থেকে থাকে ...তাহলে তা কোন অবস্থাতেই প্রকাশ পাবে না। যদি গোপন কোন রহস্য ফাঁসও হয়ে যায় এবং কোন ব্যাপারে যদি জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হও তাহলে পরিষ্কার বলে দিবে যে এ দলের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই, এ দলের প্রধান শাইখ জমলুত। মিঞা তুমি এই মুহূর্তে একজন যুবক মাত্র। তোমার একটা ভবিষ্যৎ আছে। তুমি সরকারি কর্মচারী এবং প্রশাসন তোমাকে ঝামেলায় ফেলতে পারে। তুমি আমাদের শহরে একজন অতিথি। তুমি এ দাওয়াতী কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করেছো। সকল দিক বিবেচনায় তুমি আমাদের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতা ও সহানুভূতি পাওয়ার অধিকারী।

হাসানুল বান্না এই ঈমানদার ব্যক্তির সাহসিকতা ও পরিচ্ছন্ন বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে বলেন, জনাব! আপনি সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে পারেন, আমরা যা কিছু করছি তা প্রকাশ্য দিবালোকেই করছি। এই গ্রুপটি যদি সত্যবাদী হতো তা হলে এরা বহু আগেই আমাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করতো। এরা দেখেছে যে, আপনার মতো একজন পবিত্র অন্তরের মানুষ যখন অর্থ সম্পদ ও জায়গা দিয়ে আন্দোলনে সাহায্য করে আসছেন তাই আপনার সহানুভূতি ভালবাসা ইত্যাদি থেকে আমাদের বঞ্চিত করার জন্যই তারা একটি ভীতিপ্রদ চিত্র তুলে ধরেছে।


শাইখ জমলুত অত্যন্ত দরদ ভরা কণ্ঠে বলেন, হে আমার ভাই বান্না! আমি আমার চাচা শাইখ ঈদকে বহুবার বলতে শুনেছি যে, হে আমার আল্লাহ! যতক্ষণ পর্যন্ত আমি ইসলামের বিজয় দেখতে না পাই ততক্ষণ পর্যন্ত আমাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে নিও না। তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছেন, আমার নিজেরও একই আশঙ্কা। আমি ইসলামের বিজয় নিজের চোখে দেখে যেতে চাই। কিন্তু আমি অনুভব করছি এ গন্তব্য এখনো বহুদূরে। কারণ মুসলমানদের কাছে তাদের রক্ত এখনো খুব প্রিয় ও মূল্যবান। যতদিন মুসলমানরা এ রক্তকে মূল্যবান মনে করতে থাকবে ততদিন তারা কোন কিছু অর্জন করতে পারবে না। সম্মান মর্যাদা ও স্বাধীনতা অর্জনের একমাত্র বিনিময় হতে পারে রক্তের ফোঁটা। কুরআন এ সত্যকেই তুলে ধরে। সিরাতে নববী (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামের জীবনচরিত এ সত্যেরই সাক্ষ্য দেয়। কথা এই নয় কি?’

হাসানুল বান্না তার বক্তব্যকে সমর্থন করে বলেন, জী হ্যাঁ! আপনি যা কিছু বলেছেন তা সত্য। আমি আপনাকে দৃঢ়তার সাথে একথা বলছি যে, সত্যিকার ঈমানই মানুষের রক্তকে সস্তা কিংবা মূল্যবান বানাতে পারে। কেননা ঈমানের পথে প্রবাহিত রক্তের প্রতিদান আল্লাহর নিকট অত্যন্ত মর্যাদাবান। আমি দেখতে পাচ্ছি ঈমানের স্ফুলিঙ্গ একটি খোদাপ্রেমিক গোষ্ঠীর অন্তরে প্রজ্বলিত হতে চলেছে। ইনশাআল্লাহ এই গোষ্ঠীর হাতেই মুক্তি ও কল্যাণের মহৎ কার্যাবলী সম্পাদিত হবে। এই নতুন ও তরুণ ইখওয়ানীদের আপনি কল্যাণের প্রতি আগ্রহী হিসেবে দেখতে পারেন।

শাইখ জমলুত বেদনাকাতর কণ্ঠে বলেন, ‘এ গোষ্ঠী একান্তই স্বল্প সংখ্যক।’ ‘ভবিষ্যতে এ সংখ্যাল্পতা সংখ্যাগরিষ্ঠতায় রূপান্তরিত হবে। বরকত এ সংখ্যাল্পতায় লুক্কায়িত রয়েছে। আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন, ‘বহুবার দেখা গেছে, একটি ুদ্র গোষ্ঠী আল্লাহর ইচ্ছায় অনেক বড় দলের ওপর বিজয়ী হয়েছে।’ ‘আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন তোমাকে এভাবেই সুসংবাদ দান করেন।’ শাইখ জমলুত আকাশের দিকে দুই হাত তুলে হাসানুল বান্নার জন্য দোয়া করেন।

এই চার পাঁচজন বিরোধিতাকারী ব্যক্তি দলের ক্ষতি করার আর কোন পথ খুঁজে না পেয়ে মিথ্যা প্রচারপত্র, পুস্তিকা, ভিত্তিহীন কিচ্ছাকাহিনী ছেপে বিলি করতে শুরু করে। কখনো অভিযোগ করতো যে, দল পরামর্শের পন্থা পরিহার করে চলছে। কখনো বলতো যে, মসজিদের হিসাবপত্র এখনো পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে জানানো হয়নি। স্কুলের আসবাবপত্র টেন্ডার দেয়া ছাড়াই কেনা হয়েছে। জনগণের অধিকার রয়েছে দলের নেতাদের সমালোচনা করার।

এসব লোক মনগড়া যেসব প্রচার পত্র ছাপতে যাচ্ছে তার খবর হাসানুল বান্নার কাছে পৌঁছে যায়। তিনি এ প্রেক্ষিতে ঐ গোষ্ঠীর হর্তাকর্তার বাসায় চলে যান। ঐ ব্যক্তি খুব বুদ্ধিমান ছিলেন। প্রথম যুগে আন্দোলনে আসার ও বয়সের কারণে হাসানুল বান্না তাকে খুব সম্মান করতেন। হাসানুল বান্না তাকে জিজ্ঞেস করেন যে, এ ধরনের প্রচারপত্র তৈরি করা হচ্ছে এটাকি ঠিক? এর জবাব না দিয়ে ভদ্রলোক পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। হাসানুল বান্না ছাপা হতে যাচ্ছে এমন প্রচারপত্রের কিছু কিছু বাক্য তাকে দেখান। তিনি নিরূপায় হয়ে স্বীকার করেন যে, এ ধরনের প্রচারপত্র ছাপানোর জন্য ছাপখানায় দেয়া হয়েছে।

তার জবাব শুনে হাসানুল বান্না বলেন, কোন অসুবিধা নেই! আমি আপনার কাছে এখন এ জন্য আসিনি যে, আপনাকে কাকুতি মিনতি করে বলবো, আপনারা এ প্রচার পত্র ছাপানো বন্ধ করে দিন অথবা দলের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করা থেকে বিরত থাকুন। আপনার বিবেকের মালিক আপনি, যা ইচ্ছা তাই করুন। কিন্তু আমি আপনাকে এখনো একজন বুদ্ধিমান ও বিবেকবান লোক বলে মনে করি। প্রতিটি কাজের মূল্য ও মর্যাদা এর পরিণতি ও প্রতিদান দ্বারা সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। প্রতিশোধ স্পৃহা কানাকড়ি পরিমাণ কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। এসব প্রচারপত্র ছাপিয়ে আপনারা কোন পরিণতির আশায় বসে আছেন?’

ষড়যন্ত্রকারী গ্রুপের পালের গোদা বলেন, আমরা জনমতকে সচেতন ও তাদের প্রকৃত সত্য সম্পর্কে অবহিত করতে চাই।’ যে বিষয়কে আপনি সত্য মনে করছেন এবং আমি যেটাকে সরাসরি মিথ্যা মনে করছি এ ধরনের বিষয়ে আমি আপনার সাথে কখনোই বিতর্কে যেতে চাই না। তবে আপনাকে একটি কথাই বলতে চাই যে, আপনি কি ধরে নিয়েছেন যে, আমরা এ মিথ্যাচারের জবাব দিতে অক্ষম। আপনাদের কাছে শুধু মিথ্যা অভিযোগ, আর এর বিপরীতে আমাদের কাছে রয়েছে প্রতিটি বিষয়ের লিখিত দলিল প্রমাণ ও আইনগত প্রয়োজনীয় দস্তাবেজ। আর আপনারা নিজেরাই অন্য লোকদের চেয়ে প্রকৃত সত্য সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত। মসজিদের সব হিসাব আপনার হাতেই ছিল। স্কুলের সকল প্রকার কেনাকাটা আপনার হাত দিয়েই হয়েছে। অতএব আপনারা যখন লোকজনের দৃষ্টি আমাদের দিকে আকৃষ্ট করবেন তখন আমরাই লাভবান হবো, আপনারা কোনভাবেই লাভবান হতে পারবেন না। কেননা আমাদের কাছে প্রচার ও প্রকাশনার ঐসব উপকরণ রয়ে গেছে যা আপনাদের কাছে নেই। সাধারণ মানুষের সাথে আমাদের সম্পর্ক অধিকতর শক্তিশালী। আমরা এসব বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরতে সক্ষম। আমরা এসব বিষয় সভা ডেকে জনগণের কাছে পরিষ্কার করতে পারি এমনকি মসজিদের খুতবায়ও বর্ণনা করতে পারি। মসজিদ, কফিখানা ও বাজারেও আমরা এসব বিষয় প্রচার করতে পারি। সত্য প্রচারের জন্য আমাদের কাছে অসংখ্য বক্তা ও লেখক বর্তমান রয়েছে। আর সত্য সুস্পষ্ট দিবালোকের মত নিজে নিজেই প্রকাশিত হয়ে থাকে। এ বিষয়ে আমার কাছে একটিমাত্র ব্যাপার কষ্টকর ও বেদনাদায়ক, বিষয়টি হচ্ছে, গতকাল পর্যন্ত আপনাকে জনগণের সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করেছি যেভাবে পুত্র তার পিতাকে মানুষের সামনে সম্মান ও মর্যাদার সাথে উপস্থাপন করে থাকে। আপনার সাথে যেসব যুবক রয়েছে তাদেরও ইসলামের জন্য আত্মোৎস্বর্গকারী যুবক হিসেবে মানুষের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। এ মুহূর্তে আপনারা যে অবস্থান গ্রহণ করেছেন তার প্রেক্ষিতে বাধ্য হয়েই আমাকে আন্দোলনের স্বার্থে বলতে হবে আপনারা আন্দোলনের ক্ষতি করার জন্য মিথ্যাচার করেছেন, অপপ্রচার চালিয়েছেন, আমানতের খিয়ানত করেছেন, গাদ্দারী ও অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। এহেন অবস্থার কথা কল্পনা করতেও আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠছে।

এসব কষ্ট ও বেদনা তখনই অধিক বৃদ্ধি পায় যখন ভাবি প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধমূলক এসব অকান্ত পরিশ্রম কোন শুভ ও কল্যাণকর ফল বয়ে আনবে না। এ দ্বন্দ্ব হিংসা বিদ্বেষ ও পারস্পরিক মানমর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কল্যাণকর দিক হলো আপনারা এসব দ্বন্দ্ব সংঘাত পরিহার করবেন। এর পরিণতি আপনাদের জন্য কেমন হবে তা আপনারা নিজেরাই ভালো উপলব্ধি করতে পারেন। যদি প্রতিশোধই আপনাদের কাম্য হয়ে থাকে তাহলে জেনে রাখুন এটা নিতান্তই অকল্যাণকর কাজ। যদি সদোপদেশ ও কল্যাণকামিতাই আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে থাকে তাহলে ইতোমধ্যে আপনারা তা করে ফেলেছেন, আর লোকজনও জেনে গেছে যে, আপনারা কি বলতে চান। আপনাদের দৌড়ঝাঁপ ও বিরোধিতা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চিত জেনে রাখুন আল্লাহ মানুষের অন্তরের খবর জানেন।

হাসানুল বান্নার এ ধরনের বক্তব্যে ঐ ব্যক্তি খুবই প্রভাবিত হয়ে পড়েন। তিনি হাসানুল বান্নাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, উল্লিখিত প্রচারপত্র ছাপা বন্ধ করে দিবেন এবং প্রচারপত্রের মূল কপি ছাপাখানা থেকে ফেরত আনার ব্যবস্থা করবেন।

অধ্যায় ১১ : খোদায়ী ফায়সালা

বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাবেশ। তিনি আত্মিক পরিশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বের উপর বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যে তিনি সব মানুষের কল্যাণ কামনা ও মতবিরোধকালে বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মীমাংসা করা সংক্রান্ত বিষয়ে হৃদয়গ্রাহী ও বাস্তবসম্মত বক্তব্য দান করেন। শ্রোতারা গভীর মনোযোগ সহকারে আত্মিক পরিশুদ্ধির এ সম্পদ আহরণ করেন। তিনি জমায়েত স্থলের এক কোনায় বসে গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে নিজের বিবেক প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে থাকেন।

নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেন, হাসান! তুমি মানুষকে তো ভালো কাজের নির্দেশ দাও এবং নিজকে ভুলে যাও। তোমার এসব কর্মকাণ্ড কি বৈপরীত্যপূর্ণ নয়? আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তি অধিক প্রিয় যে কষ্ট ও আনন্দ উভয় অবস্থায় আল্লাহর পছন্দনীয় পথে অগ্রসর হয়। অপর দিকে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর ক্রোধের পাত্র যে হটকারী ও ঝগড়াটে। রাসূল (সা.) বলেছেন, আমি কি তোমাদের সেই কাজের কথা বলবো না, যা নামাজ, রোজা, সাদকা বা দান খয়রাতের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মর্যাদাবান? সাহাবায়ে কেরাম অনুরোধ করলেন, হ্যাঁ, আপনি বলুন। জবাবে রাসূল (সা.) বলেন, বিবদমান লোকদের মধ্যে সমঝোতা করানো। একের বিরুদ্ধে অন্যকে উস্কে দেয়া জঘন্য অপরাধ-যা মাথা মুণ্ডন করে দেয়ার মতো। আমি একথা বলছি না যে, এটি মাথার চুলকে মুণ্ডন করে দেয় বরং এটা দ্বীনকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

হে হাসান! অন্তরের পবিত্রতা ও আত্মিক পরিশুদ্ধি তোমার যতটুকু প্রয়োজন , অন্যের ততটুকু প্রয়োজন নেই। তুমি অন্যকে উপদেশ দিয়ে নিজের জন্য অপমান কুড়িয়ে নিচ্ছ। নিজের প্রবৃত্তির চাহিদাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে ক্রোধ ও প্রতিহিংসাকে নিশ্চিহ্ন করে দাও। অতএব আপস রফার কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য তুমি আগে নিজের উপর অনুশীলন শুরু করো। বাড়াবাড়ির শুরু যদিও তোমার প থেকে হয়নি তার পরও পরীা করে দেখা খুব জরুরি।

এর পর হাসানুল বান্না কলম হাতে নিয়ে বিরোধী পরে নেতার কাছে চিঠি লিখতে শুরু করেন। তিনি লেখেন , অতীতে আপনারদের প থেকে যা ঘটেছে সার্বিক বিবেচনায় আমি বিষয়টি ভুলে যেতে প্রস্তুত। আপনারা চাইলে আপনাদের ইখওয়ানের কাতারে শামিল করা যেতে পারে। আপনারা যদি সততার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান করতে আগ্রহী হয়ে থাকেন তাহলে আমি তাও মেনে নিতে তৈরি আছি। আপনারা যদি তৃতীয় পরে মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে আগ্রহী হন তাহলে আমি তাও মানতে রাজী। এখনি আমি একথা জানিয়ে দিচ্ছি যে, তৃতীয়প যে রায় ঘোষণা করবেন আমি বিনা বাক্য ব্যয়ে তা মেনে নিতে প্রস্তুত আছি।

ইখওয়ান কর্মীরা যখন জানতে পারেন যে, হাসানুল বান্না নিজেই এই চিঠি নিয়ে তাদের কাছে যাচ্ছেন তখন তারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন।

তারা এটাকে তাদের নেতার জন্য মর্যাদা হানিকর মনে করেন। কিন্তু হাসানুল বান্না নিজের হাতে এই চিঠি পৌছানোর কাজে ভিন্ন রকমের আনন্দ অনুভব করেন। এ চিঠির আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা পূর্ণ বাক্যসমূহ তাদের অন্তরে কোনো প্রভাব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। এছাড়া বিচ্ছিন্ন গ্রুপের নেতা অপপ্রচার মূলক কাগজপত্র ছাপানো থেকেও বিরত থাকেননি। কারণ তাদের মধ্যে এক ব্যক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ের আত্মরম্ভিতায় পৌঁছে যান এবং অন্য সঙ্গীদের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি নিজের নামে প্রচার পত্রগুলো ছাপিয়ে বিলি করেন। এই মিথ্যা প্রচারপত্রগুলো জনগণের মধ্যে প্রচারিত হবার পর ইখওয়ান ‘কালেমাতুল হক’ নামে প্রতিবাদ লিপি ছেপে বিতরণ করে। এ প্রতিবাদ লিপি সাধারণ মানুষ ইখওয়ানের প্রতি ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে। বিরোধীদের এ সমস্ত প্রচার প্রচারণাও সত্যের দাওয়াত ও আন্দোলন ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভে সহায়তা করে। এর ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ ইখওয়ানের কাতারে শামিল হয়ে যান।

ইখওয়ানের উপর সুকৌশলে ও সুসংগঠিতভাবে যে অভিযোগ ও মিথ্যাচার করা হয়েছিল- বিষয়টি আদালতে নেয়া যায় কিনা এই মর্মে আলোচনা পর্যালোচনার জন্য হাসানুল বান্না ইখওয়ানের কার্যনির্বাহী পরিষদের বৈঠক আহ্বান করেন। এশার নামাজের পর মসজিদে বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হয়। নামাজ শেষ হবার পর মসজিদে বসে থাকা এক ব্যক্তি উচ্চ স্বরে কোরআন তেলাওয়াত করতে থাকেন।

‘আর এভাবে আমি সব সময় মনুষ্য জাতীয় শয়তান ও জিন জাতীয় শয়তানদের প্রত্যেকে নবীর দুশমনে পরিণত করেছি। তারা ধোঁকা ও প্রতারণার ছলে পরস্পরকে চমকপ্রদ কথা বলতো। তোমার রব চাইলে তারা এমনটি কখনো করতো না। কাজেই তাদেরকে তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও, তারা মিথ্যা রচনা করতে থাকুক (এসব কিছু আমি তাদের এজন্য করতে দিচ্ছি যে) যারা আখেরাত বিশ্বাস করে না তাদের অন্তর এ (সুদৃশ্য) প্রতারণার প্রতি ঝুঁকে পড়ুক, তারা এর প্রতি তুষ্ট থাকুক এবং যেসব দুষ্কর্ম তারা করতে চায় তা করতে থাকুক।

এমতাবস্থায় আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মীমাংসাকারীর সন্ধান করব? অথচ তিনি পূর্ণ বিস্তারিত বিবরণসহ কিতাব নাজিল করেছেন।

আর যাদের আমি (তোমার আগে) কিতাব দিয়েছিলাম তারা জানে এ কিতাবটি তোমার রবেরই প থেকে সত্য সহকারে নাজিল হয়েছে। কাজেই তুমি সন্দেহ পোষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।’ (আল-আন’আম ১১২-১১৪ )

লোকটির উচ্চস্বরে এই কোরআন তেলাওয়াত বৈঠকে জমায়েত হওয়া ব্যক্তিরা তন্ময় হয়ে শুনতে থাকেন। অপরদিকে হাসানুল বান্নাও নীরব নিস্তব্ধ হয়ে আয়াতের উপর চিন্তা করতে থাকেন। কয়েকটি আয়াত তেলাওয়াতের পর লোকটি নীরবতা অবলম্বন করেন। এর পর ইখওয়ান কর্মীরা পরস্পর নিজেদের জিজ্ঞেস করেন, আমরা এখানে কেন সমবেত হয়েছি? হাসানুল বান্না জবাবে কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, ‘আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্যকোনো সিদ্ধান্ত দাতার সন্ধান করবো?’ এই আয়াত আমাদের সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে। এখন আমি বৈঠকের এজেন্ডার মধ্য থেকে আদালতে যাবার বিষয় সংক্রান্ত প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। আল্লাহর এই নির্দেশই আমাদের জন্য যথেষ্ট।

ইখওয়ানের নেতা হবার খায়েশ পোষণকারী শাইখ ইমাদ উদ্দিন আল আজহারী তখনো ইখওয়ানের শিা প্রতিষ্ঠানে শিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং দূর থেকে নিজের ধূর্ত চালের মাধ্যমে এই উস্কানিমূলক তৎপরতা অব্যাহত রাখার পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছিলেন। তিনি এমনি ধূর্ত ও সতর্ক ছিলেন, তার বিরুদ্ধে আনিত যেকোনো অভিযোগ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে পারতেন। উস্তাদ হাসানুল বান্নাও তার বিরুদ্ধে শুধুমাত্র আন্দাজ অনুমান নির্ভর কোনো প্রদপে গ্রহণে সম্মত ছিলেন না। এ সুযোগে শাইখ ইমাদউদ্দিন ষড়যন্ত্রের গোড়ায় পানি ঢালতে থাকেন। নিজের উপর যাতে কোনো ধরনের দায় দায়িত্ব না চাপে -এ বিষয়টি সতর্কতার সাথে সামলে নিয়ে তিনি তার এ ‘মিশন’ চালিয়ে যেতে থাকেন।

অধ্যায় ১২ : নতুন উপলব্ধি

রাতের তৃতীয় প্রহর। হাসানুল বান্না সারা রাত অনিদ্রায় কাটান। অবশেষে ফজরের আজানের এক দেড় ঘণ্টা পূর্বে অন্তরের প্রশান্তির সন্ধানে মসজিদের দিকে রওনা হয়ে যান। আন্দোলন থেকে দূরে সরে যাওয়া এক ব্যক্তি আব্দুল্লাহর বাসা মসজিদের পথেই পড়ে। সেই বাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় তিনি দেখতে পান যে, বাড়ির সর্বত্রই আলো জ্বলছে, জানালা গুলোও খোলা এবং বাড়ির ভেতর থেকে তর্ক বিতর্কের উচ্চ আওয়াজ আসছে। রাতের নিরবতার কারণে বাইরের সব কথাবার্তাই পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। হাসানুল বান্না ল্য করে দেখেন, শাইখ ইমাদউদ্দিন সেখানে এসেছেন এবং ইখওয়ান থেকে বহিষ্কৃত সদস্যরা তার চার পাশে সমবেত হয়েছেন। শাইখ সাহেব তাদেরকে ধোকা প্রতারণা, দ্বন্দ্ব, মতদ্বৈততার রহস্য ও নিগূঢ়তত্ত্ব বিষয়ে জ্ঞান দান করছেন। এ দৃশ্য দেখে হাসানুল বান্না দ্রুত হাটা শুরু করেন।
 
সকাল বেলা তিনি শাইখ ইমাদউদ্দিনকে ডেকে আনেন। কথায় কথায় তিনি শাইখকে জিজ্ঞেস করেন যে, গত রাতে তিনি কোথায় ছিলেন? উত্তরে তিনি একটি দীর্ঘ কাহিনী শোনান-যার সার সংপে হলো, রাতে তিনি নিজের বাসায়ই ছিলেন। এর পর হাসানুল বান্না কথার প্রসঙ্গ পালটে, চলমান দ্বন্দ্ব সংঘাতের দিকে নিয়ে যান। তিনি ইঙ্গিত প্রদান করেন যে, এ দ্বন্দ্ব সৃষ্টির েেত্র তার যথেষ্ট অবদান (!) আছে বলে লোকজন মনে করেন। এ কথা শোনা মাত্রই তিনি নিজের নির্দোষিতা প্রমাণের পে সাফাই গাইতে শুরু করেন। এছাড়াও তিনি এ অভিযোগ মেনে নিতে অস্বীকার করেন। নিজের নির্দোষিতার পে নানা প্রকারের স্যা প্রমাণের উল্লেখ করতে শুরু করেন। এ ব্যক্তি এ ধরনের মিথ্যাচারের ব্যাপারে কতটুকু যোগ্য ও দ তা দেখে হাসানুল বান্না স্তম্ভিত হয়ে যান। এমনকি নিজের পবিত্রতা প্রমাণের পে স্ত্রী তালাকের শপথ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। কিন্তু হাসানুল বান্না তাকে এ ধরনের অপকর্ম করতে বাধা প্রদান করেন। হাসানুল বান্না দ্রুত তার মুখ চেপে ধরেন।

হাসানুল বান্না চিৎকার করে ওঠেন , খবরদার! আল্লাহকে ভয় করো! এ ধরনের শপথ থেকে বিরত থাকো! এবং বলো,গত রাতে ফজরের আজানের আগে তুমি কার বাড়িতে বসা ছিলে? একথা শোনা মাত্রই তার বুদ্ধি লোপ পায় এবং চু স্থির হয়ে যায়। তিনি চেষ্টা করেন কোনো জওয়াব তৈরি করে উপস্থাপন করা যায় কিনা। কিন্তু তার জিহ্বা আটকে যায়। হাসানুল বান্না তাকে আর অধিক সুযোগ না দিয়ে প্রকৃত সত্য তার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। তার জবাব যে গ্রহণযোগ্য নয় সে প্রমাণও হাসানুল বান্না উপস্থাপন করেন। তাকে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, কারো কাছ থেকে শোনা নয়, তিনি তার এসব চালবাজি নিজের চোখে দেখেছেন। অতএব কোনো প্রকার উপায়ান্তর না থাকায় তাকে দোষ স্বীকার করতে হয়। অবশেষে বলতে বাধ্য হন, আমি লজ্জিত, আপনি আমার প্রতি দয়া, অনুগ্রহ ও উদার আচরণ করুন।

হাসানুল বান্না বলেন, ভয়ের কারণ নেই, নিশ্চিন্ত থাকুন। আপনাকে আঘাত দেয়ার মত কোনো কাজের কথা আমার পে চিন্তা করাও অসম্ভব। কেন না, গতকাল পর্যন্ত আমি আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলাম, আপনাকে সবার সামনে তুলে ধরতাম এবং আপনার পিছনে নামাজ পড়তাম, লোকজনকে আপনার দরসে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করতাম। আর আজকে আমি আপনাকে কি তিরস্কার করতে পারি কিংবা চৌরাস্তায় অপদস্থ করতে পারি? আপনার যে অপরাধ আমার কাছে প্রকাশিত হয়েছে তা কখনো জনসমে প্রকাশ করবো না। কিন্তু আমি এটাও মেনে নিতে পারছি না যে, আপনার মত লোক আমার সাথে দাওয়াত ও আন্দোলনের কাজে সংশ্লিষ্ট থাকবে। আপনার সামনে দুটি পথ খোলা আছে। আপনি এ দুটির যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন। আপনি ইসমাঈলিয়াতেই থাকবেন এবং আমি আপনাকে একটি কাজ জুটিয়ে দিবো। তবে তা হবে ইখওয়ানের গণ্ডির বাইরে। এ অবস্থায় আপনি বর্তমান চাকরি থেকে অব্যাহতির জন্য কোনো যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য কারণ উল্লেখ্য করে পদত্যাগ পত্র দাখিল করবেন। দ্বিতীয় পথ হলো, আপনি নিজের শহরে চলে যাবেন, আমি আপনাকে সেখানে পৌঁছে দিয়ে আসবো।

হাসানুল বান্নার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে শাইখ বলেন, আমি আপনার দ্বিতীয় প্রস্তাবটি মেনে নিচ্ছি। তবে শর্ত হচ্ছে, আমার কিছু ঋণ আছে, আপনি তা পরিশোধ করে দিবেন। হাসানুল বান্না তার শর্ত মেনে নিয়ে বলেন, ঠিক আছে। তিনি শাইখের ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন এবং শাইখ যথাবিহিত পদত্যাগ পত্র পেশ করেন। এতে মাদ্রাসা ও মসজিদের সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু তিনি তার নিজের এলাকায় ফিরে যাবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন। একদিন হঠাৎ শোনা গেলো, তার নেতৃত্বে একটি নতুন স্কুল চালু করা হয়েছে। যে পাঁচ ব্যক্তির সাথে তিনি গাটছড়া বেঁধেছিলেন তাদের সমন্বয়ে একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কিছুদিন অতিবাহিত হবার পর, স্থানীয় আদালতের একজন কর্মচারী হাসানুল বান্নার নিকট আদালতের একটি সমন নিয়ে উপস্থিত হন।

 সমনের বিষয়বস্তু হলো, শাইখ ইমাদ উদ্দিন যতদিন ইখওয়ানের প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন তিনি তত দিনের পাওনা দাবি করেছেন। যা নেহায়েতই একটি মামুলী পরিমান। কিন্তু ঘটনা হলো, এই যৎসামান্য পরিমাণ অর্থ আদায়ের জন্য তার মধ্যে আদালতের শরণাপন্ন হবার খায়েশ জেগেছে। হাসানুল বান্না নিজেই আদালতে উপস্থিত হয়ে যান। শাইখ নিজের দাবি উত্থাপন করেন। হাসানুল বান্না তার দাবি তাৎণিকভাবে স্বীকার করে নিয়ে বিচারকের সামনে ঐ সব কাগজপত্র তোলে ধরেন যাতে সই করে শাইখ ইমাদ প্রচুর পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করেছেন।

বিচারক কাগজ পত্র উল্টে পাল্টে দেখেন এবং গভীর মনোযোগ সহকারে তা পর্যালোচনা করে সেগুলোর আইনগত ভিত্তি স্বীকার করে নেন। বিচারক শাইখের দাবি খারিজ করে দিয়ে তাকে মামলার ব্যয়ভার বহনের নির্দেশ প্রদান করেন। যে স্কুলটির বিষয়ে ধুমধামের সাথে প্রচার করা হয়েছিল তাও আলোর মুখ দেখতে পারেনি। বরং খোলার আগেই তা বন্ধ হয়ে যায়। শাইখ সাহেবকেও তল্পিতল্পাসহ ইসমাঈলিয়া ছেড়ে চলে যেতে হয়।

সাতাশ রমজানের রাত। দারুল ইখওয়ানের মসজিদে আনন্দ উল্লাস। মসজিদের মাঝখানে কিছু লোক খুবই আগ্রহ ও ভালোবাসা নিয়ে একে অপরের গা ঘেঁষে বসেছেন। বসা লোকদের পেছনে কিছু লোক গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এদের সবাই খুব আগ্রহের সাথে শাইখ জমলুতের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। তার সামনে নতুন আভায় সজ্জিত হাসানুল বান্না অত্যন্ত আদব ও শিষ্টাচারের সাথে মাথা নিচু করে বসে আছেন।

শাইখ জমলুত তার পাশে বসা আলহাজ্ব হোসাইন আসসাউলীর সাথে খুবই নিচু স্বরে কথা বলছেন। কিছুণ পর তিনি সামনের দিকে পাশ ফিরে হাসানুল বান্নার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলেন, হোসাইন আসসাউলীর কন্যা লতিফাকে “মহরে মিছালের” বিনিময়ে আহমদ আব্দুর রহমানের পুত্র হাসানুল বান্নার সাথে শাদী দেয়ার প্রস্তাব করা হলো, এতে কি তুমি রাজী আছো? হাসানুল বান্না খুবই নিচু স্বরে জবাব দেন, হ্যাঁ, কবুল। তিন বার ইযাব ও কবুলের পর শাইখ জমলুত দুই হাত তুলে মোনাজাত করেন। তার সাথে মসজিদে সমবেত সবাই দোয়ায় শরীক হন। মোনাজাত শেষ হবার পর মসজিদে ‘মোবারকবাদ’ ‘মোবারকবাদ’ ধ্বনি ওঠে।

ইসমাঈলিয়ার ঈমানদার লোকেরা হাসানুল বান্নার খুবই ভক্ত ছিলেন। তাদের মধ্যে এক পুণ্যবান ব্যক্তি ছিলেন আলহাজ্ব হোসাইন আসসাউলী। তিনি ইসমাঈলিয়ার শরীফ ব্যক্তিবর্গের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি হাসানুল বান্নার দাওয়াত ও চারিত্রিক মাধুর্যে আকৃষ্ট হয়ে তার সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বহু কাজেই তিনি হাসানুল বান্নার পৃষ্ঠপোষকতা করেন। হোসাইন আসসাউলীর সন্তানেরা সবাই হাসানুল বান্নার আদর্শের অনুসারী। সুতরাং হোসাইন আসসাউলী শুধুমাত্র আত্মার আত্মীয়তাকেই যথেষ্ট মনে না করে স্নেহ ভালোবাসার সম্পর্ককে আরো গভীর করার আকাক্সায় তার কাছে নিজের কন্যাকে বিয়ে দেয়ার প্রস্তাব পাঠান। সুতরাং এ উপলে হাসানুল বান্নার পিতামাতা কায়রো থেকে ইসমাঈলিয়ায় আসেন। পহেলা রমজান বিয়ের কথা পাকাপোক্ত করা হয় এবং সাদামাটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সাতাশ রমজান রাতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়।

১৯৩২ সালের গ্রীষ্মের ছুটিতে হাসানুল বান্না কায়রোতে বাবা মা’র কাছে চলে যান। সেখানে পৌঁছে তার মনে নতুন উপলব্ধি জাগে। তিনি অনুভব করেন, যতদিন পর্যন্ত দেশের রাজধানী কায়রোতে ইখওয়ানের কাজ দৃঢ় ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন পর্যন্ত গোটা মিসরে সর্বসাধারণের কাছে ইখওয়ানের আন্দোলন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। ইসমাঈলিয়ায় পাঁচ বছরের চেষ্টা সাধনার ফলে দাওয়াতি ও সাংগঠনিক দৃঢ়তা অর্জিত হয়েছে। এ কারণে অবস্থা ও পরিবেশের দাবি এটাই যে, এ মুহূর্তে রাজধানীকেই ইখওয়ানের দাওয়াতি কাজের কেন্দ্র নির্বাচন করা উচিত। কায়রোতে ইখওয়ানের দাওয়াতি কাজ শুরু হলেও তখনো পর্যন্ত তা কেন্দ্রীয় শহরের দাবি অনুযায়ী বিস্তার লাভ করতে সম হয়নি। সুতরাং হাসানুল বান্না বন্ধুদের সাথে পরামর্শ করে ইসমাঈলিয়া থেকে কায়রো বদলির জন্য শিক্ষা অধিদপ্তরে আবেদন পেশ করেন।

১৯৩২সালের অক্টোবরে তাকে কায়রোর একটি স্কুলে বদলি করা হয়।

অধ্যায় ১৩ : কাঁটা বিছানো পথে জমিদার নন্দন

কায়রো থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাইশ কিলোমিটার দূরত্বে একটি রেল স্টেশন আছে। এর একদিকে নওয়া নামক একটি গ্রাম, অন্যদিকে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে কমলা, মাল্টা, আঙ্গুর, আম, খেজুর, কলা, নাশপাতি ও খোবানীর বাগান। বাগানের মাঝখানে একটি সুরম্য অট্টালিকা- যা দূর থেকেই দৃষ্টিগোচর হয়। অট্টালিকার পাশেই গৃহপালিত পশুর দেয়ালঘেরা খামার। এ খামারে গরু মোষ আর উট বেধে রাখা হয়েছে। একজন রাখাল এগুলোর দেখাশোনায় নিয়োজিত। শহরে যাতায়াতের জন্য আছে ঘোড়ার গাড়ি। এর বিপরীত দিকে আছে বিশাল মুরগির খামার। মুরগি ছাড়াও রঙবেরঙয়ের নানা জাতের পাখি ও খরগোশ খামার মালিকের সৌখিনতার প্রমাণ বহন করছে। অন্দর মহলে নানা জাতের পুষ্প সুশোভিত উদ্যান বসন্তের নবযৌবনের বারতা ঘোষণা করছে।

১৯৩৩ সালের বসন্তকালের কোন এক শুক্রবারের আগের রাত। ত্রিশ বছর বয়সী দীর্ঘ ও সুঠামদেহী এক যুবক পরিবার-পরিজন সমেত অট্টালিকার বাগিচায় খোশগল্পে মশগুল। এ সময় খামারের চৌকিদার বাগানে প্রবেশ করে নেহায়েত আদব ও তমিজের সাথে বলতে থাকে, হুজুর! দুইজন ভদ্রলোক আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন। যুবক পরিবারের সদস্যদের মহিলা মহলে চলে যাবার ইঙ্গিত করে চৌকিদারকে হুকুম করেন, তাদের ভিতরে নিয়ে আসো।

কিছুক্ষণের মধ্যে নতুন পোশাকে সজ্জিত দুইজন শিক্ষিত ভদ্রলোক অট্টালিকার বাগানে প্রবেশ করেন। যুবক তাদেরকে বৈঠক খানায় নিয়ে বসান। দুই অতিথির একজন বসতে বসতে বলেন, আমার অনুমান যদি ভুল না হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চয় আপনি ওমর তিলমেসানী।

গৃহকর্তা ওমর তিলমেসানী বলেন, হ্যাঁ, এ অধমকেই ওমর নামে ডাকা হয়। দুইজনের মধ্যে তুলনামূলক বেশি বয়সের অতিথি বলেন, আমার নাম ইজ্জত মোহাম্মদ হোসাইন আর ইনি আমার বন্ধু মোহাম্মদ আবদুল আল। তিনি ডেল্টা রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার আর আমি শাবিন আল কানাতের শহরের জবাইখানায় চাকরি করি- যেখানে আপনিও ওকালতি করেন। ওমর তিলমেসানী কৌতূকের ভঙ্গিতে বলেন, আমি অবশ্যই ওকালতি করি, তবে কসাইখানায় নয়, শাবিন আল কানাতেরের আদালতে।

ইজ্জত মোহাম্মদ হোসাইন তার কৌতূককে হালকাভাবে নিয়ে বলেন, আমরা দু’জনই ইখওয়ানুল মুসলেমুনের সাথে জড়িত। গৃহকর্তা ওমর কাপে চা ঢালতে ঢালতে বলেন, জি, খুব ভালো কথা। অতিথিরা ভদ্রতার সাথে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে নীরবে গৃহকর্তার চেহারার উত্থান -পতন লক্ষ্য করতে থাকেন। তারা অনুমান করার চেষ্টা করেন, তাদের কথায় গৃহকর্তার কতটুকু আগ্রহ রয়েছে। তাদের মধ্যে ইজ্জত মোহাম্মদ হোসাইন নীরবতা ভেঙ্গে জিজ্ঞেস করেন, আপনি এখানে কি করেন? ‘আমি এখানে মুরগির বাচ্চা পালন করি।’ গৃতকর্তা ওমরের কাছে অতিথিদের প্রশ্ন অ™ভূত ও নির্বুদ্ধিতামূলক ঠেকেছে- এমনভাব দেখিয়ে তাদের প্রশ্নের উত্তর দেন। কিন্তু তার এ ধরনের হাসি ঠাট্টামূলক জবাবে অতিথিদের মাঝে কোন প্রকারের প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। বরং তার জবাব শুনে ইজ্জত মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, আপনার মতো যুবকের জন্য মুরগির বাচ্চা পালনের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ অপেক্ষা করছে। গৃহকর্তা যিনি গাম্ভীর্যের পরিবর্তে হালকা হাস্যরসের সাথে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি ঠিক সেই মেজাজেই জবাব দেন, সেটা কি বস্তু যা মুরগির বাচ্চা পালনের চেয়ে আমার কাছ থেকে অনেক গুরুত্ব ও দৃষ্টি দানের মুখাপেক্ষী। গৃহকর্তার এসব হালকা কথাবার্তার পরও অতিথিরা গম্ভীরভাবে জবাব দেন, মুসলমান সমাজ আপনার মনোযোগ ও দৃষ্টি দানের মুখাপেক্ষী। তারা নিজের দ্বীন থেকে দূরে সরে গেছে এবং অসচেতনতা তাদেরকে মানমর্যাদা ও প্রভাবহীন করে দিয়েছে। নিজ দেশেই তারা গুরুত্বহীন এবং বিশ্ব সমাজে তাদের অস্তিত্ব না থাকারই শামিল। জবাবে ওমর তিলমেসানী বলেন, এসব জটিল বিষয়ে আমার করণীয়ই বা কি আছে,আর আমার সামর্থই বা কতটুকু? ইজ্জত মোহাম্মদ হোসাইন ওমর তিলমেসানীর কথার জবাবে বলেন, আপনি একজন উকিল হিসেবে আইনেরও রক্ষক। আপনি নির্বাচনে হেরে গিয়েও এলাকার রাজনীতিতে নৈতিক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছেন এবং সত্যের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কিন্তু একথাও সর্বজন বিধিত যে, সত্যের লড়াই আপনি একা লড়তে পারেন না। আর এখন এ ময়দানে আপনি একা নন। আপনার মত যুবকদের সংগঠন তৈরি হয়ে গেছে এবং এক মহান ব্যক্তিত্ব জনাব হাসানুল বান্না এ সংগঠনের পথ প্রদর্শক ও মুর্শেদে আম। আমরা শাইখ বান্নার সাথে আপনাকে সাক্ষাৎ করাতে চাই। আপনি আমাদের সময় দিন। গৃতকর্তা বলেন, আমি তো সব সময়ই অবসর আছি বরং হাসানুল বান্নাই ব্যস্ত মানুষ, তিনি যখন বলবেন, তখনই উপস্থিত হয়ে যাবো। হাসানুল বান্নার ব্যস্ততার মাঝে যখনই অবসর পাওয়া যাবে তখনই উপস্থিত হয়ে যাবো।

কিছুদিন পর ঐ ব্যক্তি শাবিন আল কানাতেরে এডভোকেট ওমর তিলমেসানীর চেম্বারে গিয়ে জানান যে, শাইখ হাসানুল বান্নার সাথে তার সাক্ষাতের কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়ে গেছে। মুর্শেদে আম কায়রোতে আলবাকিনা সড়কের আব্দুল্লাহ বেগ মহল্লায় থাকেন। নির্ধারিত সময়ে ওমর তিলমেসানী হাসানুল বান্নার দরজায় পৌঁছে কড়া নাড়েন। কড়া নাড়ার জবাবে আওয়াজ আসে, ‘কে’? ‘এডভোকেট ওমর তিলমেসানী’।

হাসানুল বান্না ওপর তলা থেকে নিচে নেমে অতিথিকে স্বাগত জানিয়ে ডানদিকের কামরার দরজা খোলেন। ওমর তিলমেসানী হাসানুল বান্নার পিছে পিছে কামরায় প্রবেশ করেন। কামরাটি ছিলো অন্ধকার। একজন নতুন লোকের পক্ষে বোঝা মুশকিল এ কামরায় কি রয়েছে।

হাসানুল বান্না কামরার একমাত্র জানালাটি খোলার পর এতে আলো প্রবেশ করে। অতিথি লক্ষ্য করেন, কামরাটি নেহায়েতই সাদামাটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছোট-খাটো একটি দফতর। এতে কয়েকটি মাত্র চেয়ার রয়েছে যা ছোবড়া বা ছনের তৈরি। গৃহকর্তা একটি চেয়ারে বসে আরেকটিতে অতিথিকে বসার ইঙ্গিত করেন। ছোবড়ার চেয়ারে বসতে দামী স্যুট পরা অতিথি কিছুটা ইতস্তত বোধ করেন।

অতিথি পকেট থেকে রুমাল বের করে চেয়ারের ওপর রেখে তাতে বসে যান। গৃহকর্তা গভীর মনোযোগের সাথে তা লক্ষ্য করেন। এ সময় তার ঠোঁটে মুচকি হাসি খেলে যায়। অতিথির বাহ্যিক চাকচিক্য ও চমক গৃহকর্তার মনে যেমন কোন প্রকার প্রভাব ফেলতে পারেনি তেমনি তার মনে কোন প্রকার অস্থিরতা বা অস্বাভাবিকতাও সৃষ্টি হয়নি। সাধারণ মানুষ এ ধরনের লোককে দেখে সত্য পথের দাওয়াতে এগিয়ে আসার অনুপযুক্তই মনে করে বসবে। তারা ধরে নিবে, যে ব্যক্তি এতো কেতাদুরস্ত সেকি করে সত্যপথের দাওয়াতের কঠিন পথে চলতে পারবে? কোথায় বাহ্যিক টিপটপ অবস্থা আর কোথায় আল্লাহর পথে জিহাদের দাবি। সত্য পথের দাওয়াতে দুঃখকষ্ট সহ্য করতে হয় এবং ভোগ বিলাস ও আরাম-আয়েশ থেকে হাত ধূয়ে ফেলতে হয়। হাসানুল বান্না অত্যন্ত নিমগ্নতার সাথে অতিথির সামনে প্রভাব বিস্তারকারী পন্থায় নিজের দাওয়াতি কর্মসূচি তুলে ধরেন। ওমর তিলমেসানী গভীর মনোযোগের সাথে মুর্শেদের কথা শোনেন। তার বক্তব্য শেষে তিনি ওমরকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি আমার বক্তব্যে সন্তুষ্ট কিম্বা আপনার সব প্রশ্নের জবাব পেয়েছেন? অতিথি কোন উত্তর দেয়ার আগেই হাসানুল বান্না পুনরায় বলেন, আপনার সামনে পুরো এক সপ্তাহ সময় রয়েছে, চিন্তা-ভাবনা ও নিজের মনের সাথে বোঝাপড়া করে নিন।


অন্তরের রায় নিন, আমি আপনাকে কোন পিকনিক অথবা আনন্দ ভ্রমণের দাওয়াত দিচ্ছি না। বরং এমন এক পথে আহ্বান করছি যেখানে জীবনের পরিপূর্ণ ঝুঁকি রয়েছে। যদি আপনার অন্তর পরিতৃপ্ত হয়, অন্তরে পূর্ণ আস্থা জন্মায় তাহলে সামনের সপ্তাহে শপথের জন্য এসে যাবেন। আর এ কাজের জন্য আপনার অন্তর যদি সায় না দেয় তাহলে চিন্তার কোন কারণ নেই। আমার জন্য এতোটুকু বিষয়ই পরিতৃপ্তির যে, আপনি ইখওয়ানের বন্ধু ও কল্যাণকামী হয়ে যাবেন। এই বলে হাসানুল বান্না তার বক্তব্য শেষ করেন।

এক সপ্তাহ পর নির্ধারিত সময়ে ওমর তিলমেসানী মুর্শেদে আম হাসানুল বান্নার কাছে উপস্থিত হয়ে বলেন, ‘হে শাইখ! আমি আল্লাহর পথে আনুগত্যের শপথ গ্রহণের জন্য উপস্থিত হয়েছি’। হাসানুল বান্না ওমর তিলমেসানীর চেহারায় দৃষ্টি নিবন্ধ করে বলেন, হে আমার ভাই! আমি প্রথম থেকেই তোমাকে কোন সবুজ উদ্যান দেখাইনি এবং এখনো একথাই বলছি, সত্য পথের দাওয়াতের ব্যাপারে বুঝে শুনে পরিপূর্ণ জ্ঞানের ভিত্তিতে পা ফেলতে হবে। যখন পরীক্ষার চাকা ঘুরতে শুরু করবে তখন অন্য কাউকে দোষারোপ করতে পারবে না। বরং ধৈর্যের আঁচল ধরে দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কেননা এ পথে তোমাকে ফুলের মালা পরানো হবে না। বরং কাঁটার মালাই তোমার গলার সৌন্দর্য বর্ধন করবে। ওমর তিলমেসানী দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলেন, সম্মানিত মুর্শেদ! আমি সব বিষয় ও দিকের ব্যাপারে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে নিয়েছি। সত্যপথের দাওয়াতের পূর্ণতাই হবে আমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য, আপনি হাত এগিয়ে দিন।

হাসানুল বান্না ওমর তিলমেসানীকে শপথ গ্রহণ করিয়ে তাকেও সত্যের এ কাফেলায় যাত্রী বানিয়ে নেন। ওমর তিলমেসানীর আগে ইখওয়ানের কোন উকিল সদস্য ছিল না। সদস্য হওয়ার পর থেকেই কায়রোর বাইরে ইখওয়ানের অধিকাংশ মামলা-মোকদ্দমাই তিনি তদারক করতেন। জীবনের এক পর্যায়ে তার গতিবিধি কায়রো ও শাবিন আলকানাতিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তিতে তিনি গোটা মিসরের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। কখনো হাসানুল বান্নার সফরসঙ্গী হয়ে ভ্রমণ করতেন এবং কখনো হাসানুল বান্নার প্রতিনিধি হিসেবে নানা শহরে যেতেন। সপ্তাহে একসাথে দুইদিন তিনি কায়রোর বাইরে ছোট শহর অথবা গ্রামে যেতেন। হাসানুল বান্নার সাথে সফরে যাবার কালে রেলের সফর হলে তিনি ওমরকে জিজ্ঞেস করতেন, আমাদের ভ্রমণ কি আমাদের খরচে হবে নাকি তোমার খরচে? ওমর তিলমেসানী বলতেন, ‘আমার খরচে’। এরপর দ্বিতীয় শ্রেণীর দু’টি টিকেট কিনে আনতেন। পকেটের অবস্থা ভালো না হলে নির্দ্বিধায় বলতেন, জনাব! সফর আপনার খরচে হবে।

এরপর হাসানুল বান্না তৃতীয় শ্রেণীর দু’টি টিকেট কিনতেন। তৃতীয় শ্রেণীর কামরায় প্রবেশ করার পর ওমর তিলমেসানীর সার্বক্ষণিক চেষ্টা থাকতো যেন তার পরিচিত কেউ তাকে দেখে না ফেলে। অতএব, ভ্রমণের সময় তিনি নিচের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকতেন। হাসানুল বান্না তার এ অবস্থা দেখে মুচকি হাসি হাসতেন এবং বিষয়টি উপভোগ করতেন। এটা ছিল ওমর তিলমেসানীর আন্দোলনে যোগদানের প্রথম দিককার কথা। তখনো ওমর তিলমেসানীর কলিজার রক্তের সাথে পিয়াজের পানির ভালবাসার সংমিশ্রন ঘটেনি। আন্দোলনের প্রেমে বিভোর হয়ে যাওয়ার পর প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্রেণীর কোন বিভেদ টিকে থাকেনি। ইখওয়ানুল মুসলেমুনের আহ্বান মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তিনি দিনরাত একাকার করে ফেলেন। তিনি খুব শিগগিরই দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়ে যান। এক পর্যায়ে হাসানুল বান্না তাকে দলের নায়েবে মুর্শেদে আম নিযুক্ত করার প্রস্তাব করেন। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগত সমস্যার কথা উল্লেখ করে এ পদ গ্রহণে অপরাগতা প্রকাশ করেন।

একবার মজলিশে শূরার (পরামর্শ পরিষদ) সদস্যরা হাসানুল বান্নার কাছে এই বলে অভিযোগ করেন যে, ওমর তিলমেসানী সব সময় বাহ্যিক চাকচিক্য ফিটফাট ও কেতাদরুস্ত পোশাকের প্রতি আগ্রহী। তিনি ফ্যাশন ও সাজসজ্জাকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এ অভিযোগ শুনে হাসানুল বান্না নিশ্চুপ হয়ে যান। একদিন ইখওয়ানের পরামর্শ সভার বৈঠক ছিল। হাসানুল বান্না ওমর তিলমেসানীকে উদ্দেশ করে বলেন, ভাই ওমর! বৈঠকে ছেড়া জুতা, ময়লা নোংরা টুপি ও বেমানান যা তা পোশাক পরে আসবে। মুর্শেদের বক্তব্যে বিস্মিত হয়ে ওমর জিজ্ঞেস করেন, সত্য পথের দাওয়াতে এটা কি আপনার নির্দেশ?

হাসানুল বান্না ক্রোধান্বিত স্বরে বলেন, না! এটা তোমার ভাইদের আকক্সা। তারা তোমাকে এমনি ধরনের বেশভূষায় দেখতে চান। মনে হয় আল্লাহ তার নেক বান্দাদের জন্য সাজসজ্জা ও পবিত্র উপকরণসমূহ নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। আরো মনে হয়, আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি যেসব অনুগ্রহ করেছেন তাদের জীবনে যেন তার কোন প্রকার প্রভাব ও চিহ্ন দেখা যায়। দুনিয়ার সমস্ত নিয়ামতে আল্লাহ-ঈমানদারদের জন্য কোন অংশই রাখেননি। দুনিয়ার সমস্ত নিয়ামত তার অবাধ্য বান্দাদের জন্য। আরো মনে হয়, মুসলমানদের জন্য আবশ্যিক, তারা নিজদের নোংরা অবস্থায় মানুষের সামনে তুলে ধরবে। আমরা কি আল্লাহপাকের সেই নির্দেশ ভুলে গেছি, যাতে তিনি বলেছেন, ‘বলো! আল্লাহর সৌন্দর্যকে কে হারাম করেছে’?

অধ্যায় ১৪ : মুসলমানদের ঐক্যই জরুরি

‘তারাবিহ বিশ রাকাতই?’ ‘না, হুজুর (স.) থেকে আট রাকাতই প্রমাণিত।’ ‘হযরত ওমরের (রা.) সময়ে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) বিশ রাকাত জামায়াতের সাথে আদায় করেছেন। তাহলে তারা কি ভুল করেছেন?’ ‘বিশের দলিল প্রমাণ দুর্বল। আমরা আমাদের মুরব্বীদেরকে আট রাকাতই পড়তে দেখেছি।’ ‘আটের দলিল দুর্বল। আমরা তো বিশই পড়ে আসছি।’

কায়রো থেকে দূরে কোন এক গ্রামের মসজিদে এশার নামাযের পর মুসল্লিদের মাঝে আলোচনা চলছে। এই আলোচনা ঝগড়া ফাসাদে রূপ নেয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু তার আগেই একজন অপরিচিত সুদর্শন চেহারার আগন্তুক- যাকে দেখলে ঈমান ও আমলের বাস্তব নমুনা বলে মনে হয়- এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতেন। পরদেশীর আওয়াজ এতই গরুগম্ভীর ছিল যে, সবাই তার দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য হয়। তিনি উচ্চ আওয়াজে বলতে থাকেন, ‘হে আমার ভায়েরা! তারাবিহর ব্যাপারে আপনাদের তর্ক-বিতর্ক আমি দীর্ঘক্ষণ ধরে শুনে আসছি। মসজিদে হট্টগোল ও হৈ চৈ করা মসজিদের মর্যাদার পরিপন্থী। আর আপনাদের তর্ক-বিতর্ক ঝগড়া ও লড়াইয়ে রূপ নিতে যাচ্ছে। সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে তা বিশৃঙ্খলার রূপ পরিগ্রহ করতে যাচ্ছে। আপনারা যদি আমার দুইটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন তাহলে মনে হয় সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে। আপনারা কি এ ব্যাপারে আমাকে কথা বলার অনুমতি দিবেন?’

মসজিদের বিভিন্ন দিক থেকে এক সাথে আওয়াজ ওঠে, ‘জী, জী, বলুন! সমস্যার সমাধান হওয়া প্রয়োজন।’ আগন্তুক লোকদের দৃষ্টি নিজের দিকে আকৃষ্ট করে বলেন, ‘প্রশ্ন হলো, তারাবিহর শরিয়তী বিধান কি? অর্থাৎ এটা ফরজ না নফল?’ সমস্বরে সবাই বলে ওঠেন, এটা নফল, এটা নফল। ‘খুব ভাল কথা! আচ্ছা, বলুন তো দেখি, ইসলামে মুসলমানদের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসার ব্যাপারে কি নির্দেশ রয়েছে, অর্থাৎ এটা ফরজ না নফল? লোকজন জবাব দেয়, এটা ফরজ, এটা ফরজ।

‘হে আমার ভাইয়রা! নফল হলো সেই কাজ, যদি কখনো কোন কারণে তা পরিত্যাগ করা হয় তাহলে মানুষ গোনাহগার হবে না। আর ফরজ হলো ঐ কাজ, যা পরিত্যাগ করলে বা নষ্ট হয়ে গেলে মানুষ গোনাহগার হয়। আমি কি সঠিক কথা বলেছি?’ সমবেত জনতা এক সাথে জওয়াব দেয়, সম্পূর্ণ সঠিক কথা। ‘আল্লাহর রশিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না’- আল্লাহপাকের এ বাণী আমাদেরকে তার রশি শক্তভাবে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেয় এবং বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করে। তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়ার মাধ্যমে মুসলমানদের সাহস ও শক্তি কমে যাবে এবং তাদের প্রভাব বিনষ্ট হয়ে যাবে। বলা হয়েছে, ‘তোমরা ঝগড়া বিবাদ করো না। তাহলে তোমরা ব্যর্থ হবে এবং তোমাদের শক্তি ও মানমর্যাদা কমে যাবে।’

তারাবিহ হচ্ছে নফল আর মুসলমানদের ঐক্য হচ্ছে ফরজ। এখন আপনারা বলুন, যে ব্যক্তি একটি নফল প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভেদ সৃষ্টি করে সে ব্যক্তি দ্বীন ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণকামী নাকি শত্রু?’ সমবেত জনতা এক বাক্যে বলে উঠে ‘শত্রু! শত্রু!’ ‘আপনাদের শত্রু আপনাদের ঐক্য চায় নাকি অনৈক্য চায়?’ ‘অনৈক্য।’ ‘আপনারা ভেবে দেখুন, যে ব্যক্তি হুজুরের (সা.) উম্মতের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করতে চায় সে ব্যক্তিকে হুজুরের সঠিক অনুসারী বলা যাবে নাকি শত্রুর চর বলে অভিহিত করতে হবে?’ একজন যুবক উঠে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘ঐ ব্যক্তি হুজুর আকরামের (সা.) অনুসারী নয়, বরং সে শত্রুর চর।’ ‘যদি কোনো ব্যক্তি এ ধরনের কাজ করে তাহলে আপনাদের দায়িত্ব তাকে প্রতিহত করা নাকি তার সাথে সহযোগিতা করা?’ ‘আমরা তাকে প্রতিহত করবো।’ ‘আমাদের কাছে আট রাকাত বা বিশ রাকাতের সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত নাকি মুসলমানদের ঐক্য?’ ‘ঐক্য, ঐক্য।’

‘হে আমার ভাইয়েরা! আপনারা যদি ঐক্য চান তাহলে আপনাদের ত্যাগ ও কোরবানী করতে হবে। আপনারা কি এ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত?’ ‘আমরা সকল প্রকার ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত।’ ‘কোরবানী শুধু এতটুকুই করতে হবে যে, আপনারা যে ইমাম কিংবা নিজের বিশ্লেষণের প্রতি সন্তুষ্টি ও আস্থা সৃষ্টি হবে আপনি সেটাই কার্যকর করবেন এবং অন্যদেরকে কোরআন ও সুন্নাহর দলিল দ্বারা বোঝানোর চেষ্টা করবেন। কিন্তু অন্যকেও তার নিজস্ব পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী চলতে দিতে হবে। কেননা, প্রত্যেক মুসলমানই নিজের বিশ্লেষণের স্বপক্ষে কোরআন হাদীস থেকেই দলিল প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকেন। কেউই তওরাত বা ইঞ্জিল থেকে দলিল প্রমাণ উপস্থাপন করেন না। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে ভিন্নতা খুবই স্বাভাবিক বিষয়।’

‘মসলা মাসায়েলের শাখা প্রশাখায় যিনি যেটাকে উত্তম মনে করবেন তিনি সেটাই আমল করবেন। দ্বীনের মৌলিক বিষয় ও সর্বসম্মত বিষয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে যাবেন। আপনাদের শত্রু ইংরেজ অথবা ইহুদীরা আপনাদের বুকে গুলি চালানোর সময় পার্থক্য করবে না যে, কে শাফেয়ী আর কে হানাফী, কে আট রাকাত তারাবিহ পড়ে আর কে বিশ রাকাত তারাবিহ পড়ে। তাদের দৃষ্টিতে কালেমা পাঠ করা সব মুসলমানই শত্রু। তাদের সাফল্য এটাই যে, তারা আপনাদেরকে পরস্পরের সাথে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত রাখতে পেরেছে। এ জন্য আজ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, শাখা প্রশাখার ঝগড়া পরিহার করে কুফরী ও জালেম শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাওয়া এবং নিজদেরকে খাঁটি মুসলমান বানানো।’ মুসাফিরের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর লোকজন উঠে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত ভক্তি শ্রদ্ধার সঙ্গে তার সাথে হাত মিলাতে থাকে। গ্রামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি- যার পোশাক পরিচ্ছদ ও চেহারা দেখে বিত্তশালী ও সম্মানিত ব্যক্তি বলে মনে হয়- তিনি সামনে এগিয়ে এসে মুসাফিরকে জিজ্ঞেস করেন, আমি আপনার কথায় খুবই মুগ্ধ হয়েছি। আপনি অনুগ্রহপূর্বক যদি আপনার পরিচয় দিতেন তাহলে খুবই ভালো হতো। ‘আমার নাম হাসানুল বান্না, কায়রোতে থাকি।’ আগন্তুক তার কাছে দাঁড়ানো সঙ্গীর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, আর ইনি আমার বন্ধু আহমদ সুকরী, ইখওয়ানুল মুসলেমুনের জেনারেল সেক্রেটারি। বিত্তবান ব্যক্তি বলেন, আমি আপনার নাম শুনেছি এবং আজ দেখার সুযোগ হলো। আপনি এখানে কার বাড়িতে অতিথি হয়েছেন? ‘আমরা আল্লাহর অতিথি। ইখওয়ানুল মুসলেমুনের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য আল্লাহর পথে বেরিয়ে পড়েছি।’ ‘তাহলে আজ রাতে আমার বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করুন।’

অধ্যায় ১৫ : দুই নেতার ভিন্নমত

গৃহকর্তার সাথে যেতে যেতে তারা গ্রাম পেরিয়ে একটি বাগানে প্রবেশ করেন। বাগানের মাঝখানে প্রাচীর বেষ্টিত দুর্গের মত একটি বাড়ি।

গৃহকর্তা অতিথিদেরকে বাড়ির মেহমানখানায় বসান। অতিথির আদর যতেœর পর তিনি নিজেও তাদের পাশে বসে যান। শাইখ হাসানুল বান্না তার কাছে ইখওয়ানের দাওয়াত তুলে ধরে বলেন, আল্লাহ পাক আপনাকে সব ধরনের সম্মান ও নিয়ামত দ্বারা সম্মানিত করেছেন। এ গ্রামে আপনি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। এ কারণে আপনার দায়িত্ব দ্বিগুণ। আপনি নিজেই শুধু ইসলামের অনুসারী হলে চলবে না, গ্রমাবাসীদেরকেও ইসলামের অনুসারী বানানোর বিষয়ে নেতৃত্ব দিতে হবে। ইখওয়ানের দাওয়াত এটাই যে, মানুষ আল্লাহর রঙে রঙ্গিন হয়ে যাবে। এটা হলো-পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ করো-একথার প্রতিচ্ছবি হতে হবে। এ কাজের জন্য আপনাকেও ইখওয়ানুল মুসলেমুনের একজন সক্রিয় কর্মী হয়ে যেতে হবে।

অতিথির আলোচনায় আগ্রহ দেখিয়ে গৃহকর্তা বলেন, বর্তমান সময়ে সেটাই একমাত্র করণীয় কাজ যার আহ্বান আপনি করে যাচ্ছেন। প্রশ্ন হলো, এ দাওয়াতী কাজ কিভাবে করতে হবে? হাসানুল বান্না বলেন, আমাদের উদাহরণ আপনার মতো কৃষকের ন্যায়। একজন কৃষক কাপাশের বীজ বপনের পূর্বে জমি খুব ভালো করে চাষ করে নেয়। বীজ বপনের পর চারা গজালে সেগুলোর আশপাশ থেকে আগাছা ও ঘাস পরিষ্কার করে দেয়। গোড়ায় পোকা লাগলে সেগুলো মেরে ফেলার ব্যবস্থা করে। পাতা ও ফুলে আক্রমণকারী পোকা মাকড় পরিষ্কার করে দেয়। ফসল ঘরে তোলার সময় পর্যন্ত কৃষক ধৈর্য ও একাগ্রতার সাথে নিজের কাজের সাথে যুক্ত থাকে। এরপর সে নিজের পরিশ্রমের ফসল ঘরে তুলে আনে। আমরাও এভাবেই আমাদের দাওয়াত বিস্তারের কাজ করে থাকি। আমরা তাড়াহুড়ো করে কাঁচা ফসল তুলে ফেলার প্রবক্তা নই।

গৃহকর্তা বলেন, আপনাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মপদ্ধতির সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। আমিও এ ধরনের কিছু কিছু ভালো কাজ করে থাকি। যেমন ধরুন, দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করা, নামায রোযার ব্যাপারে নিয়মানুবর্তিতা ইত্যাদি। কিন্তু এর সাথে সাথে আমি একটা কবিরাহ গুণাহর কাজ করি। আমার ধারণা, আমি কোনো দিনই এ গুণাহর কাজটি ছাড়তে পারবো না। হাসানুল বান্না জিজ্ঞেস করেন, সেটা কোন গুণাহ যা আপনি ছাড়তে পারবেন না? গৃহকর্তা বলেন, আমি কখনো কখনো মদ পান করি। এ বিষয়টিই ইখওয়ানের দলে যোগদানের ব্যাপারে আমার জন্য প্রতিবন্ধকতা। হাসানুল বান্না বলেন, আপনি আমাদের দলে যোগদান করুন আমরা এ অবস্থায়ও আপনাকে দলের অন্তর্ভুক্ত করে নিবো।

হাসানুল বান্নার এ ধরনের বক্তব্য শুনে আহমদ সুকরী অস্থিরতায় এ পাশ ও পাশ করতে থাকেন। গৃহকর্তা চলে যাওয়া মাত্রই তিনি ক্রোধে ফেটে পড়েন। তিনি হাসানুল বান্নার উদ্দেশে বলেন, কি ভাই! আপনি কি তার মদ পানকে বৈধ মনে করছেন? ইখওয়ানের মানদণ্ড কি এতোই নিচে নেমে গেছে যে, একজন মদখোর ও এ দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। হাসানুল বান্না বলেন, অসম্ভব। মোটেও না, কখনো না।

আমি কি করে মদ পানকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দিবো। কিন্তু আপনি এটা বলুন, যদি এ ব্যক্তিকে এই অবস্থায় ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে তার সংশোধন কি কখনো সম্ভব? অবশ্য তাকে যদি দলে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয় তাহলে তার সংশোধন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যেভাবে মন্দলোকের সংস্বর্গে মানুষের মধ্যে বিকৃতি প্রবেশ করে ঠিক তেমনিভাবে ভালো লোকদের সংস্পর্শে সে ভালোও হয়ে যেতে পারে।

আহমদ সুকরী নিজের অস্থিরতা, সন্দেহ, সংশয় প্রকাশ করে বলেন, কিন্তু এভাবে চারদিক থেকে দরজা খুলে দিলে তো দলের দুর্নাম হয়ে যাবে। হাসানুল বান্না বলেন, ভাই, ইখওয়ানুল মুসলেমুনের দল তো একটা চিকিৎসা কেন্দ্র বা আরোগ্য নিকেতন। এখানে পাপী ও নাফরমান ব্যক্তিরা আসবেই। অসুস্থদেরকে চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ সুস্থ থাকার কোনো পন্থা নয়। গুণাহগার বা পাপীদেরকে গল্লা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়ার পরিবর্তে তাদেরকে কাছে টেনে এনে তাদের আত্মিক স্বাস্থ্যের উন্নতির ব্যবস্থা করা উচিত।

পাপী ব্যক্তিকে ঘৃণা না করে পাপকেই ঘৃণা করা উচিত। আহমদ সুকরী বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে প্রশ্ন করেন, তাহলে আমরা কি সবার জন্য এভাবেই দলের দরজা খুলে দিবো?

হাসানুল বান্না বলেন, হে আমার ভাই। ইসলামী আন্দোলনের দরজা তো সব মানুষের জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু প্রত্যেক রোগীকে তার রোগের ধরন ও প্রকৃতি অনুযায়ী চিকিৎসা ও ওষুধ দিতে হবে। এখন যে ব্যক্তির মধ্যে নিজের মন্দকর্মের ব্যাপারে অনুতাপের অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে এ ধরনের ব্যক্তিকে আল্লাহর পথ থেকে বঞ্চিত ও হতাশ করা এবং গলা ধাক্কা দিয়ে আল্লাহর পথ থেকে দূরে ঠেলে দেয়ার অধিকার আমাদেরকে কে দিয়েছে? আমহদ সুকরী বলেন, তাহলে তো ইখওয়ানের প্রশিক্ষণের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে।

হাসানুল বান্না বলেন, কোনো বিজ্ঞ চিকিৎসক রোগের ভয়ে রোগীর চিকিৎসা ছেড়ে দেয় না। যদি কোনো চোর কিম্বা মদখোর যদি আমাদের দলে প্রবেশ করে তাহলে আমরা তার সাথে মদ খেতে কিম্বা চুরি করতে বেরিয়ে যাবো না। সমষ্টির ভিতরে থেকে হয় সে সংশোধন হয়ে যাবে না হয় সে দলের অবস্থাকে নিজের জন্য অনুকূল মনে না করে আজ হোক বা কাল হোক দল থেকে বেরিয়ে যাবে। যদি একজন মাত্র ব্যক্তির বদ অভ্যাসের চাপ বহন করার যোগ্যতা আমাদের মধ্যে সৃষ্টি না হয়ে থাকে তাহলে বুঝে নিতে হবে আমাদের প্রশিক্ষণ ও কর্মপদ্ধতি যথার্থ নয়, এতে অপূর্ণতা রয়েছে।

কথা বলতে বলতে তারা ঘুমিয়ে পড়েন। রাতের শেষ প্রহরে আকস্মিকভাবে আহমদ সুকরীর চোখ খুলে যায়। কাছেই কোথাও তিনি হেচকির আওয়াজ শুনতে পান। ক্ষীণ আলোতে তিনি বুঝতে পারেন হাসানুল বান্নার বিছানা খালি পড়ে রয়েছে। হেচকির আওয়াজের উৎসের সন্ধানে তিনি সাথে লাগোয়া কক্ষের দরজায় পৌঁছান। সেখানে পৌঁচামাত্রই তিনি বুঝতে পারেন হাসানুল বান্না আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করছেন।

তিনি কেঁদে কেঁদে বলছেন, হে প্রভু! আমিতো শুধু তোমার বান্দার অন্তরের দরজার কড়া নাড়তে পারি। কিন্তু হেদায়েতের জন্য তা খুলে দেয়া তোমার এখতিয়ারভুক্ত।

আহমদ সুকরী ফিরে এসে নিজের বিছানায় শুয়ে পড়েন। সামান্য পরই গ্রামের মসজিদ থেকে ফজরের আযান শোনা যায়। আযানের পর মেহমানখানার দরজার কড়া নাড়ার শুব্দ শোনা যায়। আহমদ সুকরী আলো জ্বালিয়ে দরজা খোলে গৃহকর্তাকে দরজায় দাঁড়ানো দেখতে পান।

হাসানুল বান্নাকে অন্য কামরায় কার্পেটে বসা দেখে তার সামনে গিয়ে বসেন। তিনি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে হাসানুল বান্নাকে বলেন, হে সম্মানিত শাইখ আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি এবং পুরো রাত এ দ্বন্দ্বে ছিলাম যে, আমার মত একজন পাপী ব্যক্তিকে আপনি এ ধরনের একটি পবিত্র দলে প্রবেশ করার দাওয়াত দিয়েছেন। আপনার এ দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করাও যেমন ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়েছে তেমনি মন্দ অভ্যাসসহ এ ধরনের একটি পবিত্র দলে যেগাদানেও আমার বিবেক সায় দিতে পারেনি। সুতরাং আমি নোংরামী ও পাপের এ উৎস থেকে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। এখন আপনি আমাকে আপনার সঙ্গী সাথীদের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে এ পথে আমার অবিচল থাকার জন্য দোয়া করুন।

কায়রোর হেলমিয়া আল জাদিদাহ ইখওয়ানের সদর দফতর। দফতরের প্রশস্ত আঙ্গিনায় যুবক ও মুরুব্বী উভয় শ্রেণীর মানুষের প্রচণ্ড ভিড়।

বারান্দা বেলকোনি এমনকি আশাপাশের ভবনসমূহের ছাদে বসে অত্যন্ত আগ্রহের সাথে লোকজন হাসানুল বান্নার দরস শুনছেন। মনে হচ্ছে যেন এই পবিত্র অনুষ্ঠানের চারদিক ফেরেস্তারা ঘিরে রেখেছে। রহমতের ছায়া এর ওপর বিস্তৃত এবং শান্তির বৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছে। হাসানুল বান্নার মুখ থেকে কথা নয় হীরা, মতি ঝরে পড়ছে। শ্রোতারা নিজ নিজ ভাণ্ড অনুযায়ী হৃদয় কন্দরে এগুলোর স্থান করে নিচ্ছেন। তার মুখ নিঃসৃতবাণী মানুষের অন্তরে প্রভাব সৃষ্টি করছে। এভাবেই এশার আযান পর্যন্ত চলতে থাকে। আযানের সময় তিনি নীরব হয়ে যান। আযানের পরও কিছুক্ষণ তার এ দরস চলতে থাকে, যদিও শ্রতারা সারা রাত ধরে এ দরস শুনতে আগ্রহী।

এ দৃশ্য শুধু মাত্র একদিনের নয়, প্রতি মঙ্গলবার সন্ধ্যার। মাগরিবের আগেই অসংখ্য যুবক ও বয়স্ক ব্যক্তি ইখওয়ানের কেন্দ্রীয় দফতরে সমবেত হতে থাকেন। শুধু কায়রো থেকেই নয়, আশপাশের ছোট বড় জনবসতি ও দূরদূরান্তের গ্রাম থেকেও অনুষ্ঠানে লোকজন আসতে থাকেন। মাগরিবের নামাযের পর হাসানুল বান্না দরস শুরু করেন। তাওহিদ ও রেসালাতের আলোতে পতঙ্গের মত স্বতঃস্ফূর্ত হাজার হাজার শ্রোতার উপস্থিতি দেখা যায়। পুরানো বন্ধুরাই হোন কিম্বা অনুষ্ঠানে নবাগত, সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো মনে হয়। মনে হয় যেন তারা নিজদের হারিয়ে যাওয়া সম্পদ খুঁজে পেয়েছেন। প্রতিটি ব্যক্তি মুসলিম জাতির প্রতি দরদ ও ভালোবাসা এবং ইসলামের পুনরুজ্জীবনের প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

মঙ্গলবারের এ দরসে কোরআনের ধারাবাহিকতা মাঝারি পর্যায়ে শুরু হয়েছিল। হাসানুল বান্না ইসমাঈলিয়া থেকে কায়রো বদলি হয়ে আসার পর তিনি রেল স্টেশনের কাছাকাছি যে বাসায় থাকতেন সেখান থেকেই শুরু হয়। এ সময় কায়রোতে তার পরিচিত লোকজনের সংখ্যা নেহায়েতই কম ছিল। তার সাবতিয়া এলাকার বাসায় মোটামুটি পরিচিত লোকজন উপস্থিত হতেন। একটি প্রশস্ত কক্ষে তারা চাটাইয়ের ওপর বসে যেতেন। শাইখ দরস দিতেন, ছোট ছোট পাত্র উপস্থিত শ্রোতাদের সামনে রাখা হতো এবং সবাইকে চা দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। ইমাম হাসানুল বান্না অত্যন্ত উদার ও দাতা স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কিন্তু তার অর্থনৈতিক উপায় উপকরণ খুবই সীমাবদ্ধ ছিল। যিনি দরসে অংশ নিতেন তিনিই ঈমানী শক্তির সম্পদে পরিপূর্ণ হয়ে ফিরে যেতেন। এভাবে কয়েক ডজন শ্রোতা নিয়ে শুরু হওয়া এ দরসের অনুষ্ঠান হাজার হাজার মানুষের আত্মিক প্রশিক্ষণের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।

হাসানুল বান্নার কায়রো বদলির এক বছরের মধ্যেই ইখওয়ানের সংগঠন মিসরের পঞ্চাশটিরও বেশি শহর ও জনবসতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এ সব শহরে শুধু ইখওয়ানের শাখাই প্রতিষ্ঠিত হয়নি বরং মসজিদ, ইখওয়ানের কেন্দ্র, শিশুদের শিক্ষার জন্য হেরা শিক্ষা কেন্দ্র, মেয়ে শিশুদের পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উম্মুহাতেল মুমেনিন (রা.), হিফজ ও নাজেরা শিক্ষা কেন্দ্র ও কার্পেট তৈরির কারখানাসমূহও প্রতিষ্ঠা করা হয়। ইখওয়ানের দাওয়াত শুধু পুরুষদের মধ্যেই নয়, মহিলাদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করে। মহিলাদের মধ্যে কাজ করার জন্য আখাওয়াত আল মুসলেমাত (মুসলিম ভগ্নিসংঘ) নামে সংগঠন গড়ে তোলা হয়। এ ছাড়া ইসলামের প্রতি ভালোবাসা ও দরদ পোষণকারী মহিলা জয়নব আল গাজালী ইখওয়ানের সাথে নিজের সংগঠন সাইয়্যেদাতে মুসলেমাতের (মুসলিম মহিলা সংঘ) চিন্তার ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেন।

সবিস্তার সূচীপত্র
টেম্পলেট কাষ্টমাইজেশন - তরঙ্গ ইসলাম | তরঙ্গ ইসলাম